তুমিময় আসক্তি পর্ব-৪৪

0
1485

#তুমিময়_আসক্তি
#কলমে_আলো_ইসলাম

“৪৪”

–” সারাদিন’টা রুদ্রর একের পর এক চমক পেতে পেতে কেটে গেছে। দোলা ব্যাপারটা মন থেকে ইঞ্জয় করেছে। কারণ সে তো জানে রুদ্রর কিছুই মনে নেই গতরাতের কথা। তাই তার আর রুদ্রর সম্পর্কটা হঠাৎ স্বাভাবিক হওয়া কিছুই মাথায় যাচ্ছে না রুদ্রর। রুদ্র মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছে না আর না কিছু জিজ্ঞেস করতে পারছে। শুধু অবাক হয়ে ভেতরে কৌতুহল জমিয়ে সবটা দেখে যাচ্ছে। তবে রুদ্র এটা খুব ভালো করে বুঝতে পারছে গতরাতে কিছু একটা হয়েছে৷ সে দোলাকে কিছু হয়তো বলেছে৷ নাহলে সবটা এমন নরমাল হওয়ার কথা নয়৷ কিন্তু কি হয়েছে গতরাতে রুদ্র অনেক চেষ্টা করে মনে করার কিন্তু পারে না৷ হতাশ হয়ে সবটা দেখতে হচ্ছে তাকে মলিন চেহারায়।

–‘ তানিয়া অনেক খুশি রুদ্র আর দোলার সম্পর্কটা স্বাভাবিক হতে দেখে। শুধু তানিয়া নয়! বাড়ির প্রতিটি মানুষ যেনো এখন স্বস্তি পায়। প্রাণ খুলে শ্বাস নেয়৷ এতদিনে সব ঝড়ঝাপটা, ঝামেলা বুঝি শেষ হলো তাদের।

–” সন্ধ্যার একটু আগে! ড্রয়িং রুমে বসে আড্ডা দেয় সবাই। জাহির চৌধুরী নেই শুধু। রত্না চৌধুরী তানভীর আহমেদের সাথে কথা বলছে। তানিয়া আর রুদ্র বসে রিসিপশনের ব্যাপারে আলাপ আলোচনা করছে৷ দোলা সবার জন্য নাস্তার ব্যবস্থা করতে গেছে৷ রুদ্র বারবার বারণ করে দোলাকে রান্নাঘরে যেতে। তারপরও দোলা রুদ্র বা কারো কথা শুনে না।

–” তানিয়া রুদ্রর সাথে কথা বলছে আর মিটিমিটি হাসছে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে। রুদ্র ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থাকে। তানিয়ার হাসার কারণ বুঝতে পারে না। রুদ্র পাত্তা দেয়না সেসবে। কিন্তু তানিয়ার এমন হাসির রহস্য না জানা পর্যন্ত রুদ্রর মধ্যেও শান্তি হচ্ছে না যেনো। রুদ্র নিজের কৌতুহল দমিয়ে আবার তার কাজে ব্যস্ত হয়ে যায়৷ কিন্তু তানিয়ার হাসি যেনো সরে না মুখ থেকে। তানিয়ার কান্ডে রুদ্র এবার বিরক্ত প্রকাশ করে। মুখটা গম্ভীর করে তাকিয়ে থাকে। রুদ্রকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে তানিয়ার হাসিটা কমার পরিবর্তে বেড়ে যায়।

— ইডিয়ট একটা এমন করে হাসছিস কেনো? আমাকে দেখে কি তোর হাসির জিনিস মনে হচ্ছে? রাগী লুকে থমথমে গলায় বলে রুদ্র।
** একদম ঠিক বলেছো ব্রো। তোমাকে দেখলেই কেমন জানি হাসি পাচ্ছে আমার। সকাল থেকে মুখটা যেমন করে রেখেছো৷ শুধু আমি না যে কেউ হাসবে
তোমাকে দেখে। আচ্ছা কেসটা কি বলো তো? কৌতুহল ভরা দৃষ্টিতে বলে তানিয়া।

— তানিয়ার কথায় রুদ্র চমকানো চোখে তাকিয়ে আমতাআমতা করে বলে কি হবে? কিছু না৷ অনেক বেশি বোঝা শিখে গেছিস তুই৷ তোর একটা ব্যবস্থা সত্যি সত্যি করতে হবে এবার।
— সে তুমি যাই বলো না কেনো। আমি কিন্তু জানি কারণটা। তানিয়ার এইটুকু কথা যথেষ্ট ছিলো রুদ্রকে চমকে দেওয়ার জন্য। অবাক হয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলে কি..কি জানিস তুই?
– রুদ্রর তোতলানো কথায় তানিয়া শব্দ করে হেসে দেয়। তানিয়ার হাসির শব্দে রত্না চৌধুরী আর তানভীর আহমেদ সেদিকে মনোযোগ দেয়।
– কি রে তানুমা! এমন করে হাসছিস কেনো? কৌতুহল নিয়ে বলে রত্না চৌধুরী।
– মামি তোমার ছেলে মাইনকার চিপায় পড়ছে বুঝলা।তানিয়ার কথার কিছু বুঝে না রত্না চৌধুরী আর না তানভীর আহমেদ। এরপর দোলা সবার জন্য নাস্তা নিয়ে চলে আসে৷ রুদ্র অসহায় চোখে দোলার দিকে তাকায়৷ দোলা রুদ্রর এমন ভাবে তাকানোর মানে বুঝতে পারে না।

— তোর কথা তো কিছুই বুঝলাম না তানি। তানভীর আহমেদ বলে।

— এখনই সবটা বুঝে যাবেন আঙ্কেল। হঠাৎ এমন কথায় সবাই সদর দরজার দিকে তাকাতে রাজকে দেখতে পাই সাথে সজলও আছে। রাজের সাথে সজলের রাস্তায় দেখা হয়৷ তাই দুজন একসাথেই চলে আসে রুদ্রর এখানে।
– রাজের কথায় সবার কৌতুহল দ্বিগুণ হয়ে যায়। দোলাও কিছু বুঝে উঠে না। কৌতুহল সরিয়ে মুচকি হাসি দেয় রত্না চৌধুরী আর তানভীর আহমেদ। তানিয়ার মুখের হাসিটা আরো গাঢ় হয় সজলকে দেখে। সজলও তানিয়ার দিকে তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দেয়।

–‘ তুই এই সময়? রুদ্র জিজ্ঞেস করে রাজকে।
– হুম আমি। অনেক আগেই আসতাম৷ একটা কাজে দেরি হয়ে গেলো।
– তা হঠাৎ এত জরুরিতলব কেনো আপনার শুনি? রুদ্রর ব্যঙ্গ করে বলা কথায় রাজ মৃদু হেসে বলে অবশ্যই জানতে পারবেন জনাব। অপেক্ষা করুন।

-; তানিয়া কাজটা করেছো তো? রাজ জিজ্ঞেস করে তানিয়াকে। তানিয়াও অধিক দায়িত্বের সাথে বলে হ্যাঁ ভাইয়া৷ আপনি বলার পরেই আমি কাজ শুরু করে দিয়েছিলাম। আহ কি রোমান্টিক মুহূর্ত। তার সাক্ষি আমি আর আমার ক্যামেরা থাকবো কখনো ভাবিনি কথাটা বলে তানিয়া ফিক করে হেসে দেয়।

– সবার মধ্যে জানার অধীর অপেক্ষা। রুদ্র তো এমনি আপসেট সকাল থেকে দোলার কাজে। আবার এইসব কথা। রুদ্র যেনো শক পেয়ে যাচ্ছে একের পর এক। দোলাও এখন ভীষণ কৌতুহলী হয়ে।

-‘ আচ্ছা কথা না বাড়িয়ে কাজের কাজটা করে ফেলি বলে রাজ উঠে দাঁড়ায়। তানিয়ার থেকে মেমোরি কার্ডটি নিয়ে পেইনড্রাইভে রাখে৷ এরপর রিমোট হাতে টিভি অন করে সেদিকে তাকাতে বলে সবাইকে। টিভি অন হতেই রুদ্র আর দোলাকে দেখায়৷ গতরাতের দৃশ্য দেখানো হচ্ছে টিভিতে। দোলা তো ভীষণ রকম অবাক হয়ে রসগোল্লার সমান চোখ করে তাকিয়ে থাকে টিভির দিকে। রুদ্রতো তার থেকে দ্বিগুণ শকড। সবার মুখে দুষ্টু হাসি। রত্না চৌধুরী আর তানভীর আহমেদ মুচকি হাসেন মুখ ঢেকে। রুদ্র আর দোলা ভীষণ রকম লজ্জায় পড়ে যায় সবার সামনে। দোলা যেনো চোখ তুলে কারো দিকে তাকানোর সাহস পাচ্ছে না। মনে মনে তানিয়াকে অনেক অনেক বকা দিচ্ছে। রুদ্রর সবটা ক্লিয়ার হয়ে যায় এখন। কেনো দোলা আর তার সম্পর্কটা স্বাভাবিক হয়েছে এবার বুঝতে পারে৷ রুদ্র খুশি হয় এটা ভেবে যে, তার মনের কথাটা দোলাকে বলতে পেরেছে। সেটা সজ্ঞানে হোক বা জ্ঞানহীন থাকায়। কিন্তু গুরুজনদের সামনে এইভাবে এইসব দেখানোতে রুদ্রও অনেক লজ্জিত হয়।

— রত্না চৌধুরী মুচকি হেসে চলে যায়। তানভীর আহমেদও উঠে যায় ওদের আড্ডা দিতে বলে। তারা বুঝে গেছে দোলা আর রুদ্র অনেক লজ্জা পাচ্ছে তাদের সামনে।
– ওরা যেতেই রুদ্র রাজের উপর হামলে পড়ে।

– শা’লা তোর জন্য মান সম্মান কিছুই থাকলো না মা আর আঙ্কেলের সামনে। এইগুলো তো একাও দেখাতে পারতি আমাকে ভাই। সবার সামনে কেনো? অসহায় ফেস করে বলে রুদ্র। রুদ্রর কথায় রাজ দাঁত কেলিয়ে হেসে বলে বিনোদন আমরা একাই নেবো। তাই ভাবলাম আঙ্কেল আন্টিও দেখুক। যদিও আঙ্কেল মানে তোর বাবা মিস করে গেলো। রাজের কথায় রুদ্র রাজের গলা টিপে ধরে বলে যা এবার গিয়ে উনাকেও দেখিয়ে আয়। তোকে আজ মেরে ফেলবো আমি বলে রাজকে মারতে থাকে রুদ্র৷ ওদের কান্ডে সজল আর তানিয়া হেসে উঠে শব্দ করে। দোলাও মুচকি হাসে।

— গতরাতে রাজ রুদ্রকে রেখে যাওয়ার সময় তানিয়াকে বলে যায় রুদ্র আর দোলার রুমে ক্যামেরা রাখতে। যাতে করে রুদ্র যেগুলো দোলাকে বলবে সব রেকর্ড হয়ে থাকে। রাজ জানে রুদ্র ড্রিংক করলে ওর কিছুই মনে থাকে না। তাই পরবর্তীতে যেনো রুদ্রকে দেখানো যায় তাই এই ব্যবস্থা।

— আরে ছাড়। মেরে ফেলবি নাকি? সামনে আমার বিয়ে আছে ভাই৷ বিয়ের আগে বউটাকে বিধবা করে দিসনা৷ অসহায় কন্ঠে বলে রাজ। রাজের কথায় রুদ্রর হাত থেমে যায়। অবাক চোখে তাকিয়ে বলে বিয়ের আগে বিধবা হয় কেমনে? রুদ্রর কথায় রাজ একটা ক্যাবলাক্লান্ত হাসি দিয়ে বলে ও তুই বুঝবি না। ওদের কথায় সবাই সেই মজা নেয়। হাসিঠাট্টার মাঝে কাটে কিছু সময়।

— সজল শুনো তোমাকে একটা কথা বলি । যত তাড়াতাড়ি পারো বিয়ে করে এই আপদটাকে নিয়ে যাও ভাই। দিন দিন অনেক ফাজিল হয়ে যাচ্ছে। তবে সাবধান ওকে! প্রস্তুত থেকো সব দিক থেকে। আমার বোন যে দুষ্টু তুমি সামলাতে পারবে কি-না বুঝতে পারছি না৷ চিন্তিত হয়ে বলে রুদ্র। রুদ্রর কথায় তানিয়া মুখটা গম্ভীর করে বলে তুমি আমাকে এই বাড়ি থেকে তাড়াতে চাচ্ছো ব্রো। আমি এতটা জ্বালায় তোমাদের৷ আমি বোঝা হয়ে গেছি তোমার কাছে৷ এমন কথা বলতে পারলে বলে তানিয়া ভ্যা ভ্যা করে কান্না জুড়ে দেয়। ওর কান্না দেখে রুদ্র সেন্টি খাওয়া লুকে তাকিয়ে বলে থাক বইন আর ড্রামা করিস না। তুই এই বাড়িতে থাক সারাজীবন। দরকার হয় সজল আসবে বিয়ে করে এইবাড়িতে। রুদ্রর কথায় সজল বড় বড় চোখ করে বলে। এইসব কি বলছো রুদ্র তুমি। বিয়ে করে মেয়েরা ছেলের বাড়ি। ছেলে আসে না।

– ওহ! সব কিছু গুলিয়ে যাচ্ছে কেমন। একটা হতাশার দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে।

– আচ্ছা অনেক হয়েছে। এবার কাজের কথায় আসি। তোদের রিসিপশনটা কবে হবে তাই বল। অনেক দিন মাস্তি করি না। তোর রিসিপশনে একদম হৈ-হুল্লোড় করবো আর কব্জি ডুবিয়ে খাবো কি বলো তানিয়া৷ রাজের কথায় তানিয়া আগ্রহ নিয়ে বলে অবশ্যই ভাইয়া। আমি তো অনেক এক্সাইটেড।

— তোদের খাওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ নেই। আমার রিসিপশনের সব দায়িত্ব তোদের৷ আমি তো শুধু এটেন্ড করবো ভাব নিয়ে বলে রুদ্র।
– দুলহা বলে আর কিছু বললাম না যাহ। ওকে সমস্যা নেই৷ আমরাই করব সব এরেঞ্জ। ডেট ফিক্সড করলি কবে সেটা বল জিজ্ঞাসু চোখে বলে রাজ।

— এইতো সামনের সপ্তাহে। ড্যাডের সাথে কথা বলে জানিয়ে দেবো। এরপর সবাই কিছুখন আড্ডা দিয়ে চলে যায় রাজ আর সজল।

——————————————-

–” চৌধুরী বাড়িতে মানুষের সমাগম। চারিদিকে হৈচৈ, মানুষের ভীড়। রুদ্রর বাড়িটা অনেক সুন্দর করে সাঁজানো হয়েছে। দোলার প্রিয় ফুল নীল গোলাপ দিয়ে সারা বাড়ি সাজানো৷ সাথে আছে সাদা গোলাপও। সব কিছু দোলার পছন্দ অনুযায়ী করা হয়েছে৷ দোলা অনেক খুশি আজ সাথে রুদ্রর পুরো পরিবার। দোলা সবার সামনে স্বীকৃত পাবে রুদ্রর স্ত্রী হয়ে। যদিও সবাই জানে দোলা রুদ্রর অর্ধাঙ্গিনী। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ভাবে তো কোনো কিছু করা হয়নি। এমন একটা দিন আসবে দোলা কল্পনা করেনি কখন৷ এই কঠিন মনটা পরিবর্তন করে আবার নতুন করে যে ভালবাসার বীজ বপন করতে পারবে এটাও যেনো দোলা ভাবতে পারছে না।
–” রাজ আর সজল ছোটাছুটি করছে। কারণ সব দায়িত্ব তো তাদেরই। রুদ্র তাদের উপর সব ছেড়ে দিয়ে রিলাক্সে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রাজ আর সজল সব এরেঞ্জ করছে বললে ভুল হবে৷ তানিয়াও আছে তাদের সাথে। কিন্তু আজ তানিয়া নেই। এই খুশির দিনেও একটা দুঃখের ছাপ রয়ে গেছে তাদের মধ্যে। আজ জেসমিন চৌধুরীকে কোর্টে তোলা হবে। রিসিপশনের ডেট করার পর তারা জানতে পারে একই দিনে জেসমিন চৌধুরীকে কোর্টে নেওয়া হচ্ছে। ইনভাইট করা হয়ে গিয়েছিলো বলে রুদ্র আর ডেট চেঞ্জ করতে পারেনা। তাছাড়া জাহির চৌধুরী আরো করতে দেয়নি চেঞ্জ। সে অনেক রেগে আছে জেসমিন চৌধুরীর উপর। তাই জেসমিন চৌধুরীর কবে কি হলো না হলো তাতে কিছু যায় আসে না তার। তার জন্য আর কোনো কিছু থামিয়ে রাখতে চাইনা সে।

— দোলাকে সাঁজানো হচ্ছে৷ পার্লার থেকে মানুষ এসেছে দোলাকে সাঁজানোর জন্য। দোলা সাঁজতে চাইনি৷ কিন্তু রুদ্রও নাছরবান্দা। তাই বাধ্য হয়ে দোলা সাঁজতে বসে বিরক্তসূচক চেহারা নিয়ে। দোলার মনটা ভালো নেই তানিয়ার কথা ভেবে৷ দোলা জানে তানিয়ার অনেক মন খারাপ তার মায়ের জন্য। যেদিন শুনেছি জেসমিন চৌধুরীকে কোর্টে তোলা হবে সেদিন থেকে তানিয়া কেমন ঝিমিয়ে গেছে। অবশ্য কাউকে বুঝতে দেয়না সেটা তবে দোলা সবটা বুঝে তানিয়াকে দেখে৷ দোলা তো তানিয়াকে খুব ভালো করে চেনে। তানিয়ার হাসি মুখের আড়ালে কালো ছায়ার ছাপ একমাত্র দোলায় উপলব্ধি করতে পেরেছে। তানভীর আহমেদেরও একই অবস্থা। সে মুখে যতই জেসমিন চৌধুরীর শাস্তি চাইনা কেনো। সত্য তো এটা যে জেসমিন চৌধুরীকে বড্ড বেশি ভালবাসে সে৷ ভালবেসে তো বিয়েটা করেছিলো জেসমিন চৌধুরীকে তিনি। সে মানুষটার সাথে যে কখনো থাকতে পারবে না কল্পনা করেনি।

— “” দোলাকে মোটা পাড়ের নীল জামদানী শাড়ি পড়ানো হয়েছে৷ চুল গুলো খোপা করে তাতে নীল গোলাপ দেওয়া একপাশে। নীল চুড়ি দুহাত ভরে। চোখে গাঢ় কাজল, মুখে হাল্কা মেকাপের প্রলেপ, ঠোঁটে গাঢ় করে খয়েরী রঙের লিপস্টিক দেওয়া। অনেক সুন্দর লাগছে দোলাকে আজ। রুদ্রকেও একটা নীল পাঞ্জাবি পড়ানো হয়েছে সাথে চুল গুলো গোছানো। হাতে কালো ঘড়ি। পাঞ্জাবির হাতাটা ফোল্ড করে রাখা কনুই পর্যন্ত। ফর্সা মানুষ নীল পাঞ্জাবিতে দারুণ মানিয়েছে রুদ্রকে।
— সন্ধ্যার একটু পরেই দোলাকে নিয়ে এসে স্টেজে বসানো হয়। একা একা ভীষণ বোরিং লাগছে দোলার। তানিয়া বিকালের দিকে ফিরে এসে ঘরে বসে আছে৷ জেসমিন চৌধুরীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। জেসমিন চৌধুরী নিজ মুখে সবটা স্বীকার করে নেয়৷ তানিয়া আর তানভীর আহমেদ জেসমিন চৌধুরীর সাথে কথা বলতে চাইলে জেসমিন চৌধুরী রাজি হয়না৷ এতে আরো ভেঙে পড়ে তানিয়া৷ তার মা যে অনুশোচনা, অপরাধবোধ থেকে তাদের সামনে আসতে চাইছে না এটা বেশ ভালো বুঝতে পারছে। তানিয়া কোনো ভাবে নিজেকে সামলাতে পারছে না আজ৷ সে চেয়েছিলো তার না শাস্তি পান তার করা অপরাধের জন্য। কিন্তু আজ সেটা কোনো ভাবে নিজেকে বোঝাতে পারছে না। তানভীর আহমেদ অনেক বুঝিয়েছে তানিয়াকে। নিজেকে শক্ত রেখেছে শুধু মাত্র তানিয়ার জন্য। কিন্তু ভেতর ভেতর তিনিও গুমরে মরছে।

–‘ দোলা এদিক ওদিক তাকাচ্ছে শুধু। আশা এখনো আসেনি। এতে দোলার একটু না অনেকটা অভিমান হয় আশার প্রতি। আশাকে সকালে আসতে বলেছিলো দোলা। কিন্তু সন্ধ্যা হয়ে গেছে তাও কোনো খোঁজ নেই তার৷ দোলা তানিয়ার জন্যও অপেক্ষা করছে৷ এই বুঝি তানিয়া আসছে তার কাছে সেঁজেগুজে।

— মেহমান’রা একে একে আসে দোলার সাথে দেখা করে গিফট দিয়ে চলে যায়। রুদ্র এখনো আসেনি স্টেজে৷ কোথায় কি করছে কে জানে৷ রুদ্রর প্রতিও একটু রাগ আসে দোলার। একা একা পাঠিয়ে দিয়েছে তাকে এখানে ভেবে কান্না করতে ইচ্ছে করছে দোলার। দোলা একা বললে ভুল হবে৷ সাথে কিছু মেয়ে আছে কিন্তু তাদের দোলা চিনে না। তাই আনকমফোর্ট লাগছে দোলার। দোলার স্বস্তি মিলে দূরে আশাকে আসতে দেখে। মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠে। কিন্তু সাথে সাথে সে হাসিটা আবার মিলিয়েও যায়। মুখটা গম্ভীর করে অন্য দিকে ঘুরায় দোলা। সে আশার সাথে কথা বলতে চাইনা একদম।

– সরি সরি ইয়ার। বিশ্বাস কর আমার কোনো দোষ নেই। সব দোষ রাজের৷ আমি সকালে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু উনি বললেন তিনি নাকি আমাকে নিয়ে আসবেন। তার আগে যেনো আমি না আসি। সেই সকাল থেকে রেডি হয়ে অপেক্ষা করছি কিন্তু শা’লা উগান্ডা এখন নিয়ে আসছে আমাকে মুখটা ফ্যাকাসে করে বলে আশা। আশার কথায় দোলা ছোট ছোট চোখ করে বলে তুই রাজ ভাইয়াকে গালি দিয়েছিস আশা৷ দোলার কথায় আশা জিভ কেটে বলে সরি। কিন্তু মনের মধ্যে যা বলছে না। উনাকে তো আমার গলা টিপে.. তার আগে দোলা হাত উঠিয়ে থামিয়ে দিয়ে বলে থাক আর অজুহাত দিতে হবে না। একা একা কতটা খারাপ লাগছিলো বলে বোঝাতে পারবো না।

— তুই একা কেনো। তানিয়া কোথায়? আর রুদ্র ভাইয়া সেও বা কোথায়? আশার কথায় দোলা মুখটা মলিন করে বলে উনার তো কোনো খবরই নেই দুপুরের পর থেকে। আর তানিয়ার মনটা ভালো নেই। কত খুশি ছিলো আজকের দিনটা নিয়ে জানিস৷ কিন্তু আজই এমন হতে হলো। এরপর দোলা সবটা খুলে বলে আশাকে। শোনার পর আশারও খারাপ লাগে তানিয়ার জন্য।

–‘ বারান্দায় মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে আছে তানিয়া। চোখে দিয়ে এখন আর পানিও পড়ছে না। কিন্তু কান্নার ফলে চোখ গুলো ফুলে গেছে সাথে চোখ মুখ লাল হয়ে আছে৷ নিজেকে সামলে যে নিচে যাবে তাও পারছে না কোনো ভাবে। দোলার জন্য চিন্তা হচ্ছে তানিয়ার কিন্তু নিজের আবেগগুলোকেও আটকাতে পারছে না সে।
– সজল এসে তানিয়ার পাশে দাঁড়ায়। তানিয়ার জন্য তার মনটাও ভীষণ খারাপ। সজল তানিয়াকে কিছু সময় একা থাকতে দিয়েছিলো। যাতে করে তানিয়া নিজেকে সামলে নিতে পারে৷ কিন্তু তানিয়া আজ ভীষণভাবে আপসেট হয়ে পড়েছে৷ তাই সজলকে আসতে হলো তানিয়াকে বোঝানোর জন্য।
– সজল এসে দাঁড়াতে তানিয়া তার দিকে একবার তাকিয়ে আবার অন্য দিকে ফিরে৷ সজল কিছুখন চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে তানিয়ার পাশে। এরপর নুয়ে যাওয়া কন্ঠে বলে খুব মন খারাপ? সজলের কথার কোনো জবাব দেয়না তানিয়া। সজল তানিয়ার কাছে আর একটু এগিয়ে গিয়ে তানিয়ার দুই বাহু ধরে তার দিকে ঘুরিয়ে বলে, ম্যাডামের মনটা কি অনেক খারাপ? সজলের কথায় আর ধরে রাখতে পারে না তানিয়া৷ লুটিয়ে পড়ে সজলেত বাহুডোরে। সজলও আগলে নেয় তানিয়াকে শক্ত করে।

— সজলের বুকে মাথা রেখে তানিয়া কান্না করছে শব্দ করে। সজল আটকায় না তানিয়াকে৷ সজল চাই তানিয়া কাঁদুক। অনেক কাঁদুক৷ তানিয়া এতদিন ভেতরে যে দুঃখ, কষ্ট চেপে রেখেছিলো তার মায়ের জন্য সেটা আজ সব প্রকাশ হয়ে যাক। চোখের পানির মধ্য দিয়ে সব বেরিয়ে যাক।

— কয়েক মিনিট পর সজল তানিয়ার মাথাটা উঁচু করে চোখ মুছতে মুছতে বলে অনেক হয়েছে তানিয়া৷ আর নয়। দেখো আমাদের বাস্তবতা মানতে হবে। তোমার মা যা কিছু করেছে তার জন্য শাস্তি পাওয়াটা তার স্বাভাবিক ছিলো৷ জানি যতই অপরাধ করুক না কেনো মা তো মা’ই হয়। কিন্তু এরপরও আমাদের মানতে হবে বুঝতে হবে। নিজেকে সামলাতে হবে। খারাপ তোমার একার লাগছে তা কিন্তু নয়। দোলা, রুদ্র, রাজ, মনিমা, আঙ্কেল সবাই অনেক আপসেট তোমার মায়ের জন্য। সবাই ভীষণ কষ্ট পাচ্ছে ভেতরে ভেতরে। এর মধ্যে যদি তুমিও এমন ভাবে মন খারাপ করে ঘরে বসে থাকো। তাও আজকের দিনে তাহলে কারো ভালো লাগবে বলো? দোলা তো দেখলাম মন খারাপ স্টেজে বসে আছে৷ ও বেচারি তো আজকের দিনে তোমাকে পাশে চেয়েছিলো।

— সজলের কথায় তানিয়া ফুঁপিয়ে উঠে।
– প্লিজ তানু আর কেঁদো না৷ আমি তোমার কান্না দেখতে পারছি না আর। যা হওয়ার তো হয়ে গেছে। তুমি বা আমি আর কিছু বদলাতে পারবো না। তাই বলি কি ওইসব ভেবে আর মন খারাপ করো না৷ আন্টি আজ কথা বলেনি তো কি হয়েছে আমরা আবার যাবো আন্টির কাছে। কতদিন ফেরাবে আন্টি৷ তোমার জন্য হয়তো আন্টিরও মন খারাপ করছে৷ অপরাধী মুখ দেখাতে চাইনা তাই লজ্জায় সামনে আসতে পারছে না। সজলের কথায় তানিয়া আবারও জড়িয়ে ধরে। কান্নারত কন্ঠে বলে মায়ের মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে জানো। দেখে মনে হচ্ছে ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করে না৷ সব সময় চিন্তিত থাকে৷ কি এমন হতো আজ যদি মা আমাদের সাথে থাকতো। সবার সাথে আনন্দে কাটাতো৷ কত করে বুঝিয়েছিলাম। বাবা বুঝিয়েছিলো৷ কিন্তু মা শুনেনি। একবারও ভাবেনি পরে কি হবে। আমার বাবার কি দোষ বলো। তিনিও কিন্তু শাস্তি পেলেন আমার মায়ের সাথে৷ আর কেউ না জানুক আমি তো জানি বাবা কতটা ভালবাসে মাকে৷ আমি এত কিছু সহ্য করতে পারছি না সজল। কোনো ভাবে সামলাতে পারছি না নিজেকে।

– তারপরও তোমাকে শক্ত হতে হবে তানু৷ তোমার জন্য কিন্তু আঙ্কেল আরো কষ্ট পাবে৷ সেটা কি তুমি চাও? সজলের কথায় তানিয়া সজলের বাহু থেকে মাথা উঠিয়ে না বলে ঘাড় নাড়িয়ে। এতে সজল মুচকি হেসে বলে তাহলে আর মন খারাপ করো না৷ রেডি হয়ে নিচে আসো। সবাই অপেক্ষা করছে তোমার জন্য সাথে আমিও। কথাটা মুচকি হেসে বলে সজল। তানিয়া ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করে হুম বলে। সজল তানিয়ার দুই গালে হাত রাখে এবার৷ তানিয়া অবাক হয়ে তাকায় সজলের দিকে ছলছল চোখে।

— আর কাঁদবে না কথা দাও? আমি যাওয়ার পর রেডি হয়ে নিচে আসবে। নিজেকে সামলে সেই আগের তানিয়া হয়ে সবার সামনে যাবে? আমার তানিয়া তো অনেক স্ট্রং আর সাহসী। সে যদি এমন করে কান্না করে তাও ঘরবন্দি হয়ে তাহলে কি ভালো লাগে বলো? সজলের কথায় তানিয়া মুচকি হাসার চেষ্টা করে না বলে এতে সজলের মুখের হাসিটা চওড়া হয়।
– তাহলে এবার গুড গার্লের মতো রেডি হয়ে সুন্দর করে সেঁজেগুজে চলে আসো। আমি কিন্তু নিচে অপেক্ষা করবো আমার মহারানীর জন্য। এরপর ছোট করে একটা ভালবাসার পরশ এঁকে দেয় তানিয়ার কপালে। এতে তানিয়া লজ্জামিশ্রিত হাসি দিয়ে ফ্লোরের দিয়ে তাকিয়ে থাকে৷ সজল আর কিছু না বলে মুচকি হেসে চলে আসে। সজলের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রেডি হতে যায় তানিয়া।

–” দোলা আর আশা গল্প করছে৷ রুদ্র এখনো স্টেজে আসেনি। তানিয়া বারবার এদিক ওদিক তাকিয়ে রুদ্রকে খুঁজছে৷ কিন্তু রুদ্রর টিকিটিও নজরে আসে না দোলার। এখন দোলার অনেক অনেক হচ্ছে রুদ্রর উপর। একটিবারে জন্য দেখা করতেও আসলো না রুদ্র ভেবে দোলার মন খারাপ হয়।

— রুদ্রকে খুঁজতে গিয়ে দোলার চোখ যায় তার বাবা আর ভাইয়ের উপর। রোকন হাসি মুখে এগিয়ে আসছে দোলার দিকে। সাথে তার বাবার মুখে যেনো প্রাপ্তির হাসি৷ দোলা তার বাবাকে দেখে দাঁড়িয়ে যায়। মুখের হাসিটা গাঢ় করে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকে তার বাবার দিকে৷

— রাশেদ মিয়া দোলার কাছে এসেই দোলাকে জড়িয়ে ধরে। বাবার আদরে দোলা নিজেকে বিলিয়ে দেয়৷ কেমন আছিস মা তুই? রাশেদ মিয়ার কথায় দোলা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে অনেক ভালো বাবা। তুমি কেমন আছো?
– রাশেদ মিয়া মুখের হাসিটা দ্বিগুণ করে বলে আমি তো অনেক ভালো আছি রে মা। যেদিন থেকে শুনেছি আমি নানু হবো সেদিন থেকে আমার সব খারাপ থাকা এক নিমিষে শেষ হয়ে গেছে। আমি যে কতটা খুশি হয়েছি তোকে বলে বোঝাতে পারবো না রে মা। আমি নানু হবো ভাবতে পারছি না৷ তোর শ্বশুর যেদিন আমাকে এই খুশির খবরটা দেয় আমি যে কি পরিমাণ খুশি হয়েছি বোঝানোর মতো না। জীবনে এতটা খুশি হয়তো আমি কখনো হয়নি৷

— জানিস তো আপু বাবা সারা এলাকায় মিষ্টি বিলিয়েছে তোর বেবি হবে শুনে৷ আমার যে কত ভালো লাগছে৷ আমি মামা হবে ভাবতেই আমার শরীর কাটা দিয়ে উঠছে দেখ আপু হাত এগিয়ে দিয়ে বলে রোকন। রোকনের কথায় দোলা মুচকি হেসে রোকনের চুলগুলো নেড়ে দেয়৷

– নিজেকে অপরাধী ভাবতাম তোকে জোর করে বিয়ে দেওয়ার পর৷ ভাবতাম আমি হয়তো নিজ হাতে তোর জীবনটা শেষ করে দিয়েছি। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে আমি কোনো ভুল করিনি সেদিন। আমার মেয়েটার সাথে আমি কোনো অন্যায় করিনি। রাশেদ মিয়ার কথায় দোলা ছলছল চোখে বলে একদম না বাবা৷ তুমি কোনো অন্যায় করোনি। তোমার প্রতি কোনো অভিযোগ আমার কখনো ছিলোও না। বরং আমি তোমার কাছে কৃতজ্ঞ আমাকে এমন একটা পরিবার দেওয়ার জন্য। ছোট সাহেবের মতো একটা স্বামী দেওয়ার জন্য। উনি বদমেজাজি রাগী ছিলেন ঠিকই কিন্তু খারাপ ছিলেন না বাবা। উনি তো পরিস্থিতির স্বীকার ছিলেন। আমি যে সব কিছু সামলে নিতে পেরেছি৷ সব কিছু ঠিক করতে পেরেছি এটাই অনেক বড় পাওয়া আমার কাছে৷ আর এই সব কিছু আমি তোমার জন্য করতে পেরেছি বাবা৷ তুমি আমাকে সেদিন বিয়েটা দিয়েছিলে বলে এইসব সম্ভব হয়েছে৷ দোলার কথায় রাশেদ মিয়ার চোখ থেকে এক ফোটা পানি পড়ে। এটা আনন্দ প্রাপ্তির পানি। রাশেদ মিয়া কথা বলে জাহির চৌধুরীর কাছে যায়৷ রোকন দোলার কাছেই থাকে। রোকনের সাথে কথা বলতে বলতে দোলার চোখ আটকে যায় এক জনের উপর।

– চলবে…