#তু্ই_আমার
#Samia_Jarin
পর্ব _১০
📍কপি করা নিষিদ্ধ
কেটে গেছে প্রায় কয়েক মাস, এর মধ্যে কেউ আর ঊষান এর দেখা পায়নি, এতে অবশ্য পরিবার এর কারো কিছু আসে যায় না কিন্তু নুহা ওর তো মনের ভিতর এক অজানা যুদ্ধ চলছে । নুহা পরিবার ওর অগোচরে বিয়ে ঠিক করেছিলো কিন্তু নুহা কেন জানি সব শুনেও কোনো কথা বলে নাই আর যার সাথে নুহার বিয়ে ঠিক হয়েছে সে নুহার বড় মামার ছেলে।আজকে সকাল টা একটু ভিন্ন নুহা কে দেখতে আসবে এর তোড়জোড় চলছে।।
এই কয়েক মাসের মধ্যে ঊষান একবার এসেছিলো কিন্তু নুহা ছাড়া এটা কেউ জানে না। সেদিনও নুহা আবিষ্কার করেছিলো এক ভয়ঙ্কর উন্মাদ পুরুষকে।।
এই কয়েক মাসে ঊষানের কোনো খোঁজ কেউ পায়নি। যেন মানুষটা হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। মির্জা বাড়িতে প্রথম দিকে বিষয়টা নিয়ে দু-একদিন আলোচনা হলেও পরে সবাই নিজের জীবনে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। পরিবারের কারও কাছে ঊষানের অনুপস্থিতি বিশেষ কোনো গুরুত্ব রাখেনি।
কিন্তু নুহার ভেতরে যেন প্রতিদিন এক অদৃশ্য যুদ্ধ চলেছে। সে নিজেও বুঝতে পারে না ঊষানকে ঘৃণা করে, নাকি তার হঠাৎ হারিয়ে যাওয়াটা মেনে নিতে পারছে না। যতবার নিজেকে বোঝাতে চেয়েছে সব শেষ, ততবারই অতীতের কিছু মুহূর্ত অকারণে সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
এই সুযোগেই পরিবারের বড়রা সিদ্ধান্ত নেয়, নুহার নতুন করে সংসার শুরু করা উচিত। অনেক আলোচনা শেষে তারা নুহার অগোচরেই বিয়ের কথা পাকাপাকি করে ফেলে। পাত্র আর কেউ নয় নুহার বড় মামার ছেলে। ছোটবেলা থেকেই দুজন একে অপরকে চিনত, তাই পরিবারের কাছে এই সম্পর্কটাই সবচেয়ে নিরাপদ মনে হয়েছে।এদিকে বেশ কয়েক দিন ধরে নুহার শরীর টা ভালো যাচ্ছে না, নুহার এই শরীর খারাপ এর আসল কারণ জানলে এটা ওর পরিবারের কারো কাছে বিষয় টা সুখকর হবে না।।
ভোর থেকেই বাড়ির প্রতিটি কোণ ব্যস্ত। রান্নাঘরে একের পর এক পদ তৈরি হচ্ছে। ড্রয়িংরুম নতুন করে সাজানো হয়েছে। কাজের লোকেরা শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। অতিথিরা দুপুরের আগেই এসে পড়বেন।
ফুপি নুহার ঘরে ঢুকে মৃদু হেসে বললেন,,,,,,,
তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে নে। ওরা আসতে বেশি দেরি করবে না।
নুহা শুধু রোবোটের মতো সবার সব আদেশ পালন করতে ব্যাস্ত। নুহা আয়নার দিকে তাকিয়েই শান্ত গলায় বলল,,,,,,,
“আমি প্রস্তুত হচ্ছি।
তার মুখে কোনো হাসি নেই। চোখে শুধু ক্লান্তি আর নিজেকে শেষ হতে দেখার আগ্রহ সাথে ঊষান এর প্রতি জমে থাকা এক আকাশ পরিমান অভিমান।।
কিছুক্ষণ পর অতিথিদের গাড়ি বাড়ির সামনে এসে থামল। সবাই তাদের স্বাগত জানাতে বাইরে এগিয়ে গেল। ঠিক তখনই প্রধান ফটকের সামনে আরেকটি কালো গাড়ি এসে দাঁড়াল। সবাই একসঙ্গে তাকিয়ে রইল।গাড়ির দরজা খুলে ধীরে ধীরে নিচে নামল ঊষান।কালো শার্ট, গম্ভীর মুখ, আগের মতোই স্থির দৃষ্টি। এক মুহূর্তে চারপাশের সব কথাবার্তা থেমে গেল।
ওকে দেখে সবার অবস্থা বেহাল, নুহার বাবা অবাক হয়ে বললেন,,,,,,
ঊষান!
ঊষান কারও প্রশ্নের উত্তর দিল না। সে ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকে শুধু একবার নুহার দিকে তাকাল।নুহার হাত থেকে চায়ের ট্রেটা কেঁপে উঠল।দুজনের চোখাচোখি হলো, দুজনের চোখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক হলো।অনেক মাসের নীরবতা, অভিমান আর অমীমাংসিত প্রশ্ন যেন সেই এক দৃষ্টিতেই ফিরে এল।
ড্রয়িংরুমের অস্বস্তিকর পরিবেশ বুঝে নুহা ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর ঊষানও সেদিকে এগিয়ে এলো,দুজনের মাঝে কয়েক হাত দূরত্ব।নুহার মামারা নুহার সম্পর্কে সবই জানে তাই তারা ঊষান কে দেখেই বেরিয়ে গেলো।।
হঠাৎ ঊষান নুহার কাঁদ চেপে ধরে ঝাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল,,,,,,,
“তুই বিয়ে করছিলি ?
নুহা তার দিকে না তাকিয়েই উত্তর দিল,
সেটাই সবাই চায়।
আর তুই ?
নুহা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
আমি কী চাই সেটা কখনো কেউ জানতে চায়নি।না আপনি আর না আমার পরিবার। অবশ্য এটাতে আমার পরিবার এর কাউকে দোষ দেওয়া ঠিক হবে না আমি আমার ভুলের শাস্তি পাচ্ছি।।
আর কোনো কথা হলো না। দুজন শুধু নীরবে দাঁড়িয়ে রইল। দূরত্ব এখনও রয়ে গেছে, কিন্তু বহুদিন পর তারা আবার একই মুহূর্তে, একই নীরবতায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে। নুহা আর কথা না বাড়িয়ে ঊষান এর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে চলে এলো,,ঠিক তখনই ভেতর থেকে হৈচৈ শোনা গেল নুহা পরে গেছে ।নুহা হঠাৎ মাথা ঘুরে ভারসাম্য হারিয়ে মেজেতে পরে গেলো । ঊষান দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলল।
বাড়ির সবাই ছুটে এলো।আরমান মির্জা উদ্বিগ্ন হয়ে বললেন,,,,,,ডাক্তারকে খবর দাও।।
নূর দ্রুত ডক্টর কে খবর দিলো এদিকে নুহার মা যেন মেয়ের সাথে ঘটা সব কথা মনে পড়তেই কেঁপে উঠলেন।
কিছুক্ষণ পর চিকিৎসক নুহাকে পরীক্ষা করে বাইরে এলেন। চারপাশে নিস্তব্ধতা।
ডাক্তার শান্ত গলায় বললেন,
ভয়ের কিছু নেই।নুহা মা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আর একটি বিষয় আপনাদের জানানো দরকার। নুহা মামনি মা হতে চলেছে।।।
এক মুহূর্তে পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।কারও মুখে কোনো কথা নেই।সবার দৃষ্টি একসঙ্গে নুহা আর ঊষানের দিকে গিয়ে থামল।
ঊষানের মুখে প্রথমবারের মতো কঠিন অভিব্যক্তির আড়ালে বিস্ময়ের ছাপ ফুটে উঠল। আর নুহা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। এতদিন ধরে নিজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সত্যটি আজ সবার সামনে প্রকাশ পেয়ে গেছে।
★ ★ ★ ★ ★
ডাক্তারের মুখে কথাটা শোনার পর পুরো ঘর নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
নুহা মা হতে চলেছে।।
কথাটা যেন কারও কানে বিশ্বাস হচ্ছিল না। সবাই একবার নুহার দিকে, আবার ঊষানের দিকে তাকিয়ে দেখছে।।নুহা কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইল। তার চোখ দুটো ধীরে ধীরে ভিজে উঠল। হঠাৎ সে মাথা তুলে বাবার দিকে তাকাল।
“আব্বু!!!
জী মা বলো?
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।মেয়ের এমন ডাক,,,,
আমি এই বাচ্চা রাখব না।
এক মুহূর্তে ঘরে চাপা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল।নুহার মা বিস্ময়ে বললেন,,,,,,,
নুহা কী বলছিস!
নুহা এবার দৃঢ় গলায় বলল,
আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি। আর যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমার আর ঊষান ভাইয়ের ডিভোর্সের ব্যবস্থা করো, আব্বু। আমি আর এই সম্পর্ক রাখতে চাই না।।।
কথাগুলো শুনে নুহার বাবা নির্বাক হয়ে গেলেন। তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কোনো উত্তর দিতে পারলেন না।
বড় কাকা ধীর স্বরে বললেন,
এত বড় সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া ঠিক হবে না। আগে সবাই শান্ত হও।
নুহার বাবা যোগ করলেন,,,,,,,
“নুহার মানসিক অবস্থাও দেখতে হবে। তাড়াহুড়ো করে কিছু করা উচিত নয়।
ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা ঊষান এতক্ষণ একটাও কথা বলেনি। তার দৃষ্টি স্থির ছিল নুহার ওপর।
কয়েক সেকেন্ড নীরব থাকার পর সে শান্ত স্বরে বলল,
কোনো ডিভোর্স হবে না আমি তোকে ডিভোর্স দিচ্ছি না আর একবার আমার বাচ্চা কে মারার কথা মুখ দিয়ে উচ্চারণ করলে তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো বেয়াদপ।।
নুহা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল সাথে একটা তিক্ত হাসি হাসলো তারপর ওর কাকার দিকে তাকিয়ে বললো,,,,,,,,,,
এটা রাগ না অনেক ভেবে বলা সিদ্ধান্ত নিয়েছি যার কোনো ভবিষ্যত নেই তার পৃথিবীর আলো না দেখাই মঙ্গল।আমি কালকেই ডক্টর এর কাছে যাচ্ছি
বলেই ঊষান এর দিকে তাকালো কিন্তু ঊষান আর কোনো উত্তর দিল না। তার মুখ আগের মতোই কঠিন, কিন্তু চোখের গভীরে প্রথমবারের মতো এক অদ্ভুত অস্থিরতা ফুটে উঠল।ঘরে উপস্থিত সবাই বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে কোনো তর্কের সমাধান হবে না। সামনে আরও কঠিন সিদ্ধান্ত অপেক্ষা করছে।ঊষান নুহার সাথে আর কোনো কথা না বলে হনহন করে উপরে চলে গেলো
★ ★ ★ ★ ★
#চলবে

