তোমার আসক্তিতে আসক্ত পর্ব-০৮

0
469

#তোমার_আসক্তিতে_আসক্ত
#সুবহী_ইসলাম_প্রভা
#পর্ব-০৮

রাতে আর্শিকার কাছে একটা আননোন নাম্বারে কল আসে।আর্শিকা ফোনটা ধরতেই তার গলা শুকিয়ে আছে।রাগে, ভয়ে কথা বন্ধ হয়ে আসে।অপাশথেকে কোনো পুরুষালি কন্ঠ ভেসে আসে।

“আর্শিকা?”

“কে আপনি?”

“ইউর ফিয়ার।যার কাছে থেকে ছয় বছর আগে পালিয়ে এসেছিলে?”

“মানে?”

“কির্শফ…..”

নামটা কানে যেতেই আর্শিকা কান জ্বলে উঠলো।চোখে আফসা আফসা সব ভেসে উঠতে লাগলো।পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠলো,হাত পা থরথর করে কাঁপতে লাগলো।এই তো সেই লোকটা যার জন্য আর্শিকা আজ নিজের পরিবারের থেকে আলাদা,যার জন্য নিজের জীবনে তাকে চরিত্রহীনা উপাধি পেতে হয়েছিলো তাও তারই পরিবারের কাছ থেকে।আর্শিকা নিজেকে সংযত রেখে বলল,

“কি চাই আপনার?আমার জীবনটা নষ্ট করেও আপনার শান্তি হয় নি?”

ওপাশথেকে মৃদু হাসির আওয়াজের সাথে ভেসে আসলো,”ফ্লিমি স্টাইলে বলবো না তোমাকে চাই কারণ তুমি তো আমারই।আর আমি আমার সেই আমানত নিতে এসে পড়েছি।”

এইটুকু বলেই ফোনটা কেটে দিলো।আর্শিকা বেশ কয়েকবার হ্যালো হ্যালো করেও কোন রেসপন্স পায় না।আর্শিক পুনরায় সেই একই নাম্বারে ফোন দিলে মেয়েলী কন্ঠস্বরে বলে উঠে ফোনটি এই মুহুর্তে বন্ধ আছে।আর্শিকা রাগে ফোনটা ছুড়ে ফেলে দিলো।আর্শিকার এতো বেশি রাগ উঠেছে যে একটা স্লিপিং পিল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।নইলে এই বাড়ি ভেঙে গরু ঘর বানাতে সে দু’মিনিটও সময় নিবে না।

✨✨

শীতের আমেজ পড়ে গেছে।চারিদিকে কুয়াশায় পরিপূর্ণ।বেলা হয়েছে সেই কখন কিন্তু কুয়াশার কারণে এখনও ভোরই মনে হচ্ছে।পাশেই থাকা এলার্ম ঘড়িটা কিরিং কিরিং করে বেঁজে উঠলো। ইচ্ছে না থাকা সত্ত্বেও আর্শিকা শান্তির ঘুম ভেঙে উঠতে হলো।দু’হাত মেলে আলিসান ভাবে আর্শিকা চোখ খুলে বাহিরে তাকাতেই দেখলো এখনো কুয়াশা রয়েছে।আজ আর্শিকার একটুও ভার্সিটিতে যেতে ইচ্ছে করছে না, কিন্তু কিছুদিন ধরে ভার্সিটিতে না যাওয়ায় তার সইগুলো যে তার উপর বড্ড ক্ষেপেছে তাই আজ না গিয়ে উপায় নেই।বেশ কয়েকবার ভার্সিটিতে না যাওয়ার জন্য জয়ার কাছে অনুরোধ করলেও জয়াই বলেছে ভার্সিটিতে আসতে,কি যেনো ভার্সিটিতে হয়েছে।

আর্শিকা ভার্সিটিতে গিয়ে ক্যান্টিনে বসে আছে।আর্শিকার দু’পাশে বসে আছে জয়া আর নয়না কারোর মুখে কোন কথা নেই, সবাই শুধু মুখ টিপে হাসছে যা আর্শিকার ভীষণ বিরক্তিকর লাগছে।আর্শিকা বার্গার মুখে দিয়ে বিরক্ত হয়ে বলে,

“আচ্ছা আমাকে এতো জরুরি ডাকার কারণ কি বল তো?”

জয়া বলে,”আরে ওয়েট কর না দেখতেই পারবি।”

“কিইই?”

নয়না মিট মিট করে বলে,”সামনে তো দেখো”

আর্শিকা সামনে তাকাতেই বিশাল বড় একটা শক খায়। পিহু লাল শাড়ি পড়ে এসেছে,মুখে হালকা সাজ, কানে হালকা দুল, একহাতে চুড়ি আরেক হাতে ব্র্যাসলেট,উঁচু হাই হিল,চুলগুলো আবার ছাড়া।পিহু দেখতে কোন অংশে নায়িকার চেয়ে কম লাগছে না।পিহু সোজা আর্শিকার সামনে দাঁড়ায়ে বলল,

“আশু বেবি,হাও এম আই লুকিং?”

এতোক্ষণ জয়া আর নয়না মিটমিট করে হাসলেও এবার আর হাসি চেঁপে রাখতে পারে না।অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে।ওদের হাসির শব্দে আর্শিকা ধ্যান ভেঙে বলে,

“পিহু?তুই আদোও ঠিক আছিস তো?এসব তোর কি সাজ?”

“কেনো আশু বেবি?আমাকে কি ভালো লাগছে না।”

“তোকে মারাত্নক সুন্দর লাগছে কিন্তু হটাৎ এমন সাজের কারণ কি?”

আর্শিকা আর পিহুর কথার মাঝেই একজন যুবক এসে হাজির হয়।যুবকটি সবার উদ্দেশ্য বলে,

“এখানে আর্শিকা কে?”

আর্শিকা যুবকটির দিকে তাকিয়ে বলে,”আমি কেনো?”

“তোমাকে রাদাফ ডাকছে।”

বলেই রহস্যজনক হাসি দিয়ে চলে যেতে নিলে পিহু পিছন থেকে ডাক দেয়।

“কায়ান স্যার?”

পিহুর কথায় কায়ান পিহুর দিকে এগিয়ে গিয়ে বলে,”হুম বলো।”

“স্যার হাও এম আই লুকিং?”

পিহুর এমন কথায় কায়ান একটু লজ্জায় পড়ে যায়।একটা স্টুডেন্টকে শাড়ি পড়ে কেমন লাগবে এটা কি করে একজন স্যার বলবে।কায়ান একটু বিব্রত হয়ে বলে,

“লুকিং নাইস।”

বলেই কায়ান পিছনে না ফিরে চলে যায়।পিছনে ফিরলে হয়তো দেখতে পারতো শাড়ি পরিহীতা নারী তাহার তুচ্ছ মন্তব্য শুনে জ্ঞান হারাবার উপক্রম হয়েছে।পিহু কায়ানের মন্তব্য শুনে বুকে হাত দিয়ে পড়ে যেতে নিলেই তার অপর তিন বান্ধুবী তাকে ধরে ফেলে।পিহু কায়ানের যাওয়ার পানে তাকিয়েই বলে,

“দোস্তত্তত্তত্ত আমি সিরিয়াস ক্রাস খাইছি।”

জয়া নয়না আর্শিকা একসাথে বলে,

“ব্যস হয়ে গেলোওঅঅঅঅঅঅঅঅ।”

✨✨

আর্শিকা ভার্সিটির আনাচে কানাচে খুঁজেও রাদাফকে পায় নি।আর্শিকার এখন রাদাফকে কোন অংশে ভুতের চেয়ে কম মনে হচ্ছে না।মনে মনে সে রাদাফের উপর যেমন বিরক্ত তেমনই ক্ষুব্ধ। আর্শিকা রাদাফকে খুঁজতে খুঁজতে এমন একটা জায়গায় চলে এসেছে যেখানের মানুষের আনাগোনা খুব কম।আর্শিকা আরও কিছুদুর আগাতেই একটা হাত আর্শিকা টেনে একটা বদ্ধ ঘরে নিয়ে গেলে আর্শিকা চিৎকার দেওয়ার আগেই অপরহাত আর্শিকার মুখ চেঁপে ধরেছে।

আর্শিকা সেই হাত থেকে বাঁচতে অনেক নড়াচড়া করতে লাগলো।এতো বেশি নড়াচড়া দেখে সেই হাতের মালিক এবার মুখ খুললেন।

“ও সুইটহার্ট এতো বেশি মোচড়ামুচড়ি করো না তো আমার তোমাকে আদর করতে কষ্ট হয়।”

কথাটা শোনা মাত্রই আর্শিকা কান গরম হয়ে ধোঁয়া বের হতে লাগল।কন্ঠটা কেমন নেশাক্ত যা প্রবল মাত্রার আর্শিকার ভয় বৃদ্ধি করছে এদিকে ব্যক্তিটির যেনো এসবে ভ্রুক্ষেপই নেই, সে তো এক দৃষষ্টিতমী চোখের তৃষ্ণা মিটাচ্ছে।ঘরটা অন্ধকার থাকায় আর্শিকা ব্যক্তিটির মুখ দেখতে পারছে না শুধু আফসা আলোয় ব্যক্তির চোখ দৃশ্যমান।আর্শিকা আমতা আমতা গলায় বললো,

“কে আপনি?”

“কির্শফ…”

এবার আর আর্শিকার নিজেকে সামলে রাখতে পারলো। রাগ তার তরতর করে বাড়ছে, অগ্নিদৃষ্টিতে ব্যক্তিটার দিকে তাকিয়ে আসে।রাগে আর্শিকার গলা শুকিয়ে গিয়েছে।মোচড়ামুচড়ির পরিমাণ দ্বিগুন বেড়ে গেছে। একপর্যায়ে আর্শিকা তার উঁচু হিল দিয়ে কির্শফের পায়ে গুঁতা মারলেও কির্শফের মতিভ্রম হয় না।আর্শিকা মনে মনে ভাবছে,

“এ কি লোহার তৈরি? এতো জোরে গুঁতা মারলাম তাও লাগলো না।আর এখানে উনি এলেনই বাহ কি করে?”

আর্শিকা ভাবনার মাঝেই কির্শফ তার হাত দিয়ে আর্শিকার গালে স্লাইড কাটতে কাটতে বলে,

“সুইটহার্ট শরীরের আঘাত কিছুই না তুমি আমাকে মনে যে আঘাত করেছো তার ফল তো তোমায় ভোগ করতেই হবে।”

“আপনার জন্য আমি আমার পরিবারের কাছে চরিত্রহীনা হয়েছি।”

“কিন্তু আমার কাছে তুমি উত্তম চরিত্রের নারী।”

“আপনার কাছে কি তা আমি কখনো জানতে চাই নি আর জানবোও না কারণ আপনি আমার কাছে সবথেকে বেশি ঘৃণিত ব্যক্তি।”

আর্শিকা বলা বাক্য শুনে কির্শফ নিজেকে সংযত করতে পারলো না।রাগে আর্শিকার অধর নিজের দখলে এনে নিলো।এদিকে আকস্মিক এমন কিছু হওয়ায় আর্শিকা হতবাক। আর্শিকা মোচড়ামুচড়ি পরিমাণ বাড়ালেও বলিষ্ট হাতের কাছে তা অসাড়।এদিকে কির্শফের দখলে এখনও তার অধর। আর্শিকা দম নিতেও ভুলে গেছে রাগে চোখ দিয়ে পানিও বেরিয়ে এসেছে।শেষ পর্যন্ত আর্শিকা বলিষ্ট ব্যক্তির গায়ে জ্ঞানশূন্য অবস্থায় নেতিয়ে পড়ল।কির্শফ আর্শিকা ডেভিল হাসি দিয়ে বলে,

“খুব শীঘ্রই তোমাকে তোমার ঘৃণিত ব্যক্তির রাজ্যের রাণি বানাবো।”

✨✨

ভার্সিটির রেস্ট রুমে শুয়ে আছে আর্শিকা।পাশে দাঁড়িয়ে আছে তার তিন বান্ধুবীসহ কায়ান স্যারও।মূলত কায়ান স্যারই সেই অন্ধকার ঘর থেকে আর্শিকা তুলে এখানে নিয়ে আসে সাথে তার তিন বান্ধুবীকেও খবর দেও।কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই একজন পরিচিত ডাক্তার আসে।ডাক্তার ভালো ভাবে আর্শিকার চেকাপ করে বলে।

“আচ্ছা উনি কি কোন কিছু নিয়ে মাত্রাতিরিক্ত ভয় পেয়েছিলেন?”

জয়া বলে,”বলতে পারবো না আংকেল।আমরা আশুকে অজ্ঞান অবস্থায়ই পাই।”

ডাক্তার একটা ইঞ্জেকশন দিয়ে বলে,”খুব শীঘ্রই উনার জ্ঞান ফিরে আসবে।আর হ্যা উনার শরীরটাও খুব দূর্বল জ্ঞান ফিরলেই কিছু খাইয়ে দিবেন।”

ডাক্তার চলে যাওয়ার কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই আর্শিকার জ্ঞান ফিরে।জয়া,পিহু,নয়না আর্শিকাকে ঘিরে ধরে একের পর এক প্রশ্ন করেই চলেছে।শেষে কায়ান ওদের সবাইকে থামায়।

“আচ্ছা তোমরা যদি ওকে এভাবে ঘিরে ধরো তাহলে ও কথা বলবে কি করে?আর কার প্রশ্ন রেখে কারটার উত্তর দিবে।আসতে আসতে সবাই প্রশ্ন করো।আর ডাক্তার না বলল আর্শিকার শরীর দূর্বল আগে ওর কিছু খাওয়া প্রয়োজন।”

কিন্তু কায়ানের কথা কারোর কানেই যায় নি।শেষে আর্শিক তার বান্ধুবীদের মিথ্যা বলল যে অন্ধকার ঘর দেখে ভয় পেয়ে সে অজ্ঞান হয়েছে।তার বান্ধবীরা বিশ্বাস করতে না চাইলেও উপায়ন্তর না দেখে বিশ্বাস করে নেয়।

আর্শিকার বিশ্রামের প্রয়োজন তাই তাকে এক রেখে সবাই একটু বাইরে বের হয়।সেই মুহুর্তে আর্শিকার ফোনে টুং করে একটা মেসেজ আসে।

“বাহ খুব সুন্দর তো মিথ্যা বলা শিখে গেছো।অবশ্য অভ্যাস করে নেও কাউকে তো আর স্বামীর সোহাগের কথা বলা যাবে না।”

মেসেজটা দেখতেই আর্শিকা পুনরায় রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে গেলো।আশেপাশের সবকিছু ভাঙতে শুরু করে দিয়েছে।জয়া আর্শিকার কাছেও ছিলো, ভাঙচুরের শব্দ শুনে জয়া আর্শিকার কাছে আসে।আর্শিকা জয়াকে জড়িয়ে কান্নারত হয়ে বলে,

“দোস্ত আমি বাঁচতে চাই।ও আমাকে তিলে তিলে মেরে ফেলছে।আমি মুক্তি চাই।”

✨✨

আজমল চৌধুরী দেশে এসে পড়েছে।আজমল চৌধুরী দেশে আসতেই তার বিরাট বহুল ভবনে উঠলো।এই বাড়িটা বিরাট বহুল হলেও আজ সে একা বড্ড একা।না পাচ্ছে স্ত্রীর সহযোগিতা, না পাচ্ছে সন্তানের ভালোবাসা।আর এক সপ্তাহ পর কি হবে তা ভাবতেই আজমল চৌধুরী কেঁপে উঠছে।সে কিভাবে তার মেয়ের সামনে দাঁড়াবে?এসব ভাবতে ভাবতে তার স্ত্রী সুমনা চৌধুরী তাকে পানি এগিয়ে দিলো।

আজমল চৌধুরী একবার মিসেস চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে পানি নিয়ে এক ঢোঁকে সম্পূর্ণটা খেয়ে ফেলে।সুমনা চৌধুরী আজমলের পাশে বসে বলে,

“আর্শিকার কথা ভাবছো বুঝি?”

“ও ছাড়া আমার আছেই বাহ কে?মেয়েটাকে আমি কতই নাহ কষ্ট দিয়েছি কিন্তু কেনো আমি এসব করেছি তা একবারও ও জানতে চায় নি।”

“সময় এলে ও ঠিক তোমায় বুঝবে।”

“হুম তাই যেনো হয়।”

✨✨

বসন্ত উৎসব উপলক্ষ্যে ভার্সিটিরা আনাচে কানাচে পরিপূর্ণ ভাবে সাজানো হচ্ছে।কিন্তু এর মধ্যে আর্শিকার ভিতরে ভয়,রাগ কাজ করছে।আর্শিকার কাছে কাল কির্শফের মেসেজ এসে বসন্ত উৎসবে কির্শফ আর্শিকার প্রকাশ্যে আসবে।আর বসন্ত উৎসবেই আজমল চৌধুরীর সাথে তার দেখা হবে।দুটো রিয়েক্সন আর্শিকা কিভাবে কাটিয়ে উঠতে পারবে তা আর্শিকার অজানা।

আর এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তার বন্ধুমহল তার কাছে নেই।আর্শিকা একা একা মনমরা হয়ে বসে আছে।আচমকা কোনো পুরুষালি কন্ঠে আর্শিকা কেঁপে উঠে।

“বসন্ত মানুষের জীবনে রঙ ঢেলে দেয়,তবে তোমার মনে রঙ নেই কেনো কন্যা?”

#চলবে