দুই হৃদয়ের সন্ধি পর্ব-১১

0
481

#দুই_হৃদয়ের_সন্ধি
#পর্বঃ১১
#লেখিকাঃদিশা_মনি

মুসকান প্রচণ্ড ব্যাকুল হয়ে ড্রয়িংরুমের দিকে পা বাড়ায়। ড্রয়িংরুমে গিয়েও আরিফকে দেখতে পায়না। বরঞ্চ আতিকা চৌধুরীকে সোফায় বসে থাকতে দেখে সে। মুসকানের ভ্রুযুগল আপনাআপনি কুচকে যায়। এদিক ওদিক তাকিয়ে আরিফকে দেখতে না পেয়ে সে আতিকা চৌধুরীকে শুধায়,
“আপনার ছেলে কোথায় ম্যাডাম?”

“আরিফকে খুঁজছ? ও তো রুহিকে নিয়ে একটু বাইরে ঘুরতে গেছে।”

“ওহ।”

মুসকানের মুখে বিষন্নতার আধার নামে। সে আর বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে রুমে চলে যায়। রুমে গিয়ে আরিফের অপেক্ষার প্রহর গুনতে থাকে। এমন সময় হঠাৎ তার কানে ভেসে আসে ফোনের রিংটন। এদিক ওদিক তাকিয়ে টেবিলের উপর আরিফের ফোনটা দেখতে পেয়ে হাতে তুলে নেয়। মুসকান ভেবেছিল ফোনটা যেহেতু আরিফের তাই তার রিসিভ করা উচিৎ হবে না। কিন্তু ফোনে জ্বলজ্বল করতে থাকা কূজন নামটা দেখে সে তার ভাবনা বদলে দ্রুতবেগে ফোনটা রিসিভ করে নেয়।

ফোন রিসিভ হতেই বিপরীত দিক থেকে কূজন বলে ওঠে,
“হ্যালো আরিফ। আমরা…”

“আমি আরিফ নই। আমি মুসকান।”

কূজনের কথা থেমে যায়। কিছুক্ষণ মৌনতা বজায় রেখে সে বলে ওঠে,
“আচ্ছা আরিফ এলে বলিস আমি ফোন করেছিলাম।”

কূজন এতটুকু কথা বলে ফোনটা রাখতে যাবে এমন সময় মুসকান বলে ওঠে,
“ফোনটা রেখোনা ভাইয়া। তোমার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে।”

“হ্যাঁ, বল তুই কি বলবি।”

“আমি অনেক ভেবে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি কূজন ভাই। আমি আরিফের সাথে সংসার করতে চাইনা। আমি তোমার সাথে সংসার সাজাতে চাই।”

মুসকানের কথা শোনামাত্র কূজনের পায়ের তলার মাটি সরে যায়। তার মাথা কিছু সময়ের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দেয়। যতই সে মুসকানকে ভালোবাসুক না কেন, মুসকান এখন অন্য কারো স্ত্রী। এখন মুসকান তার জন্য নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। তাই মুসকানের থেকে এমন কথা আশা করে নি কূজন। তাই তো সে গর্জে উঠে বলে,
“এসব কি বলছিস তুই মুসকান? যা বলছিস ভেবে বলছিস তো?”

“আমি একদম ঠান্ডা মাথায় ভেবে চিন্তেই সব বলছি কূজন ভাইয়া।”

“আমার মনে হয় তুই আবেগের বশবর্তী হয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছিস। আরিফের সাথে তোর বিয়ে হয়েছে মুসকান। তোরা এখন স্বামী স্ত্রী, একটা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ তোরা। আর তুই কিনা বলছিস আমার জন্য আরিফকে ত্যাগ করবি।”

“হ্যাঁ, করব ত্যাগ। আর এতে কোন ভুল নেই। তুমি জানোনা কূজন ভাইয়া আমাদের এই বিয়েটা কোন স্বাভাবিক বিয়ে না। আরিফ তো এই বিয়েতে রাজিই ছিলেন না। আমার সৎ বাবা আমার সাথে এক বৃদ্ধ লোকের বিয়ে ঠিক করেছিলেন। ম্যাডাম যখন এই বিষয়ে জানতে পারেন তখন ওনাকে নিয়ে বিয়েটা আটকাতে যান। পরবর্তীতে পরিস্থিতির চাপে পড়ে আরিফ আমায় বিয়ে করতে বাধ্য হোন। কিন্তু উনি কখনো মন থেকে এই বিয়েটা মানতে পারেন নি। তাই তো বাসর রাতেই আমাকে বলে দিয়েছেন যে আমাকে স্ত্রীর মর্যাদা দিতে উনি অপারগ।”

কূজন ঠান্ডা মাথায় মুসকানের সব কথা শোনে। অতঃপর কিছুক্ষণ ভাবনা চিন্তা করে বলে,
“আমার কথা মনোযোগ দিয়ে শোন মুসকান। এভাবে ঝোঁকের মাথায় তুই কোন সিদ্ধান্ত নিস না। যেভাবেই হোক না কেন তোর সাথে তো আরিফের বিয়েটা হয়েছে তাইনা বল? বিয়ে একটা পবিত্র সম্পর্ক। আমার মনে হয়না তোর হঠকারিতার বসে কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে। তুই কিছুক্ষণ ঠান্ডা মাথায় চিন্তা কর অতঃপর আরিফের সাথে বসে কথা বল এই বিষয় নিয়ে। ও আদৌ এই সম্পর্কটাকে কোন সুযোগ দিতে চায় কিনা সেটা জানার চেষ্টা কর। তারপর কোন সিদ্ধান্ত নিস। এভাবে একতরফাভাবে তো কোন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক না বল।”

মুসকান খানিকটা অধৈর্য হয়ে বলে,
“তুমি এভাবে বলছ কেন কূজন ভাইয়া? তুমি কি এখন আর আমাকে চাওনা? তাই আমাকে এভাবে আরিফের সাথে মানিয়ে নিতে বলছ!”

“তুই ভুল ভাবছিস মুসকান। আরিফ যদি তোর সাথে সংসার করতে সত্যিই না চায় তাহলে আমি বলছি আমি তোকে আপন করে নেব। কিন্তু আরিফ যদি এই সম্পর্কটা নিয়ে কিছু ভেবে থাকে তাহলে আমি তোকে বলব তুইও এই সম্পর্কটাকে একটা সুযোগ দে।”

“থাক কূজন ভাইয়া। তোমাকে আর কিছু বলতে হবে না। আমি বুঝতে পেরেছি আমি বিবাহিতা বলে তুমি আমাকে আর নিজের জীবনের সাথে জড়াতে চাও না। আমি তো এখন সেকেন্ড হ্যান্ড হয়ে গেছি।”

“মুসকান!!! খবরদার আর একটাও বাজে কথা বলবি না তুই। আমার ভালোবাসা সম্পর্কে তোর কোন ধারণাই নেই। তুই যদি কষ্টে থাকিস তাহলে তোর হাজারবার বিয়ে হলেও আমি তোকে মেনে নিব বিনা শর্তে কিন্তু আরিফের সাথে তুই তো কষ্টে নেই।”

মুসকান আর কথা না বাড়িয়ে ফোনটা রেখে দেয়। অতঃপর দীর্ঘ শ্বাস ফেলে। ফোনটা সঠিক স্থানে রাখতে যাবে তার পূর্বেই আরিফ রুহিকে কোলে নিয়ে রুমে প্রবেশ করে। মুসকানের হাতে নিজের ফোন দেখে সে মুসকানকে শুধায়,
“কে ফোন করেছিল?”

“কূ..কূজন ভাইয়া।”

“ওহ। তা কি বলল ও?”

“বিশেষ কিছু না। আপনি ফিরলে কল দিতে বলেছে।”

“আচ্ছা। ফোনটা আমায় দিন আমি কথা বলছি।”

মুসকান আরিফের দিকে ফোনটা এগিয়ে দিলো। তার কোলের দিকে তাকিয়ে দেখল মুসকান গভীর ঘুমে আছন্ন। তাই বলল,
“রুহিকে শুইয়ে দিয়ে আপনি একটু বেলকনিতে আসতে পারবেন প্লিজ? আপনার সাথে কিছু জরুরি কথা আছে।”

“ঠিক আছে, আপনি একটু ওয়েট করুন। আমি যাচ্ছি।”

★★★
ত্রস্ত পায়ে বেলকনির মধ্যে পায়চারি করে চলেছে মুসকান। ভীষণ অস্থির হয়ে আছে সে। অল্প অল্প ঘাম বেয়ে পড়ছে শরীর থেকে।

কিছু সময়ের মধ্যে আরিফ বেলকনিতে উপস্থিত হয়। মুসকানকে উদ্দ্যেশ্য করে বলে,
“হ্যাঁ বলুন কি বলার জন্য ডেকেছেন আমায়।”

মুসকান সরাসরি আরিফকে প্রশ্ন করে,
“আপনি কি আমাদের সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখতে চান?”

“মানে?”

“আপনি কি আমাকে কখনো নিজের স্ত্রীর মর্যাদা দিতে পারবেন নাকি আজীবন নিজের ভাগ্নির মা করে রাখার জন্যই এনেছেন আমায়?”

আরিফ কিছুটা সময় নেয় ব্যাপারটা বুঝতে। অতঃপর দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে বলে,
“আপনি কি এই সম্পর্ক থেকে মুক্তি চাইছেন?”

“আমি আপনাকে একটা প্রশ্ন করেছি মিস্টার আরিফ। আপনি আমার প্রশ্নের কোন উত্তর না দিয়ে উলটে আমাকেই প্রশ্ন করছেন?”

আরিফ মুসকানের দিকে শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,
“আমি আপাতত আপনাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নিতে পারব না। আমার কিছু সময় প্রয়োজন। আপনি যদি মনে করেন এত সহজে আমাদের সম্পর্কটা আর চার-পাঁচটা স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মতো হবে তাহলে আপনি ভুল ভাবছেন। আপনাকে কিছুটা ধৈর্য ধরতে হবে, আমাকে সময় দিতে হবে সবটা মানিয়ে নেওয়ার।”

মুসকান অধৈর্য হয়ে রাগী গলায় বলল,
“আপনার কিসের জন্য সময় চাই বলতে পারেন আমায়? আপনি কি নিজের পক্ষে কোন যুক্তি দিতে পারবেন? এমন তো নয় যে, আপনার কোন গার্লফ্রেন্ড ছিল বা বউ ছিল যাকে ভুলতে আপনার সময় চাই যে কারণে আপনি সম্পর্কটা সহজ করতে পারছেন না।”

“আমার সমস্যাটা আপনি বুঝবেন না। তাছাড়া আপনার এতটা অধৈর্য হওয়ার কারণ তো আমি বুঝছি না। আমি তো আপনাকে এখানে কোন সমস্যায় ফেলিনি। আমি জাস্ট কিছুটা সময় চেয়েছি সম্পর্কটা স্বাভাবিক করার জন্য। এমন তো নয় যে, আপনি এখানে খুব খারাপ আছেন তাহলে সমস্যাটা কোথায় সেটা বলুন?”

“সমস্যা হলো এটা যে আমি হিন্দি সিরিয়ালের নায়িকার মতো নই। আপনি আমায় বিয়ে করবেন তারপর এমন ভাব করবেন যে আমায় দয়া করেছেন একটা বাচ্চাকে আমার কোলে তুলে দিয়ে বলবেন আপনাকে শুধু এই বাচ্চার জন্য বিয়ে করেছি আর আমি সেই বাচ্চাকে বুকে টেনে সংসার করব। সবার মন জয় করব, অপেক্ষা করব কবে আমার স্বামী আমাকে মেনে নেয় তাইতো? শুনুন আমি ঐরকম মেয়ে নই। আমাকে এমন ভাবলে খুব ভুল ভেবেছেন। আমি নিজের অধিকার বুঝে নিতে জানি। কারো পায়ের কাছে পড়ে থাকার মেয়ে আমি নই। আপনার কাছে আমাকে স্বার্থপর মনে হতেই পারে কিন্তু আমি নিজের কাছে একদম পরিস্কার।”

কথাগুলো বলে একটু দম নিয়ে সে বলে,
“হয় আপনি সম্পর্কটাকে যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক করুন আর নাহয় আমাকে মুক্তি দিন এই সম্পর্ক থেকে।”

কথাটা বলেই মুসকান রুমে চলে আসে। আরিফ উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে তার যাওয়ার পানে।

চলবে ইনশাআল্লাহ ✨