Home "ধারাবাহিক গল্প "দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-১৬+১৭

দৃষ্টির অন্তরালে নিস্তব্ধতা পর্ব-১৬+১৭

0
1

#দৃ্ষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:১৬

রাত আটটা।চৌধুরী নিবাসের ড্রয়িংরুমে গল্পের আড্ডা বসেছে।এই সময়টা বাড়ির তিন গিন্নি বিশ্রাম নেন তারপর নয়টা বাজলেই রাতের খাবারের তোড়জোড় শুরু করে দেয়।সন্ধ্যায় ছেলে মেয়েদের হালকা নাস্তা বানিয়ে দিয়ে তারা ফোন করে রাহিমাকে।একে তো স্বামীর বোন এখন আবার বিয়াইন হবে।ডাইনিং টেবিলের তিনটা চেয়ার এক সাথে টেনে তিন গিন্নি রাহিমার সাথে গল্প করছে আর পুরনো সব কথা বার্তা তুলছে।সেগুলো নিয়ে হাসাহাসিও চলছে।

উৎসের ঘর থেকে এসে মেহেকের মন ফুরফুরে হয়ে আছে।তার উৎস ভাই আজকে তাকে একটু হলেও স্বীকার করেছে এই তো অনেক।আবার তার কপালে তার ওষ্ঠ শুইয়েছে।মেহেকের লজ্জায় গাল লাল হয়ে গেলো।আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। কপালে তার হাত রেখে বলল,
-“উৎস ভাই,আপনি আমার কপাল শুইয়েছেন শুধু কিন্তু আমার তো মনে হচ্ছে আমার হৃদয়ের গহীনে শুইয়ে দিয়েছেন।”

মেহেক আয়নাতেই তাকিয়ে উৎসের সাথে থাকা মুহুর্তগুলো কল্পনা করে মৃদু মৃদু হাসলো।তখনি তার ঘরে আসলো এরিদ।মেহেককে একা একা হাসতে দেখে এরিদ অবাক হলো।
-“মেহেক আপু তুমি একা হাসছো কেনো?”

মেহেক এরিদকে দেখে স্বাভাবিক হলো।
-“মনে রং লেগেছে তাই।”

-“আমার মনেও রং লাগাবো।দাও একটু রং।”

মেহেক হতভম্ব হয়ে যায়। মনে রং লাগানো বলতে সে তো অন্য কিছু বুঝিয়েছে আর এই ছেলে কী বুঝলো।
-“আমার মতো বড়ো হো আগে তারপর দেখবি না চাইতেই লেগে গেছে।”

-“তাহলে আমি বড়ো হতে চাই।”

-“হবি?”

-“হুম।কিন্তু কীভাবে?”

-“বড়ো হতে হলে তো ডিম, দুধ খেতে হবে।এই নে এটা খা।”
মেহেকের চোখের জন্য প্রতিদিন তাকে সন্ধ্যায় এক গ্লাস করে দুধ দিয়ে যায় সুফিয়া।প্রতিদিন খেতে খেতে সে তিক্ত হয়ে গেছে।সুযোগের সৎ ব্যবহার করতে হয় তাই সুযোগটা চাপিয়ে দিলো এরিদের উপর।
-“এটা তো তোমার।”

-“তো কী হয়েছে? তুই না বড়ো হতে চাস।নে এক টান দিয়ে শেষ কর।”

-“সত্যি। খাবো।”

-“হুম খা।”

মেহেকের হাত থেকে গ্লাস নিয়ে এরিদ আবার বলল,
-“খেলে হবো তো বড়ো?”

-“আরে লিটেল বয়।খা তো।খেলেই কয়েক দিনে বড়ো হয়ে যাবি।”

এরিদ দুধের দিকে তাকিয়ে নাক কুঁচকালো। সেও দুধ খেতে পছন্দ করে না।নাফিসা তার পিছনে দুধের গ্লাস নিয়ে ছুটে আর আজ সে নিজেই খেয়ে নিবে!
-“আরে খা না।”

এরিদ দুধের গ্লাসে চুমুক দিলো।এক টানে সব শেষ করে নিলো।
-“এই তো সাব্বাশ।”

-“এবার চলো টিভি দেখবো।”

-“ওকে চল।”
এরিদ মেহেকের পড়ার টেবিলে গ্লাস রেখে দেয়।মেহেক এরিদের কাঁধে হাত রেখে দুজনে নিচে গেলো।
তিন মায়ের গল্প গুজব দেখে মেহেক মুখ বাঁকিয়ে বলল,
-“গল্প করছো করো কিন্তু রিমোট’টা কোথায় সেটা কেউ বলো।”

-“দুধ খেয়েছিস?”
মায়ের প্রশ্নে মেহেক বিরক্ত হলো।কিন্তু সে মায়ের প্রশ এড়িয়ে গেলো।

-“মেহেক আপু পেয়েছি।”

মেহেক এরিদের থেকে রিমোট নিয়ে কার্টুন ছাড়লো।টিভিতে ডরিমোন দেখছে মনোযোগ সহকারে দুই ভাই বোন।এরিমধ্যে রোদসী নিচে নামলো।মেহেকের পাশে এসে বসে তাদের সাথে মিলে ডরি মোহন দেখতে লাগলো।প্রায় মিনিট বিশেক পর উৎস তার ঘর থেকে বেরিয়ে দু’তলার করিডরে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছে।উৎসর গলার স্বর পেতেই মেহেক নড়েচড়ে বসলো।উৎস আড়চোখে নিচে একবার দেখে কথা বলা শেষ করে নিচে নামে।
-“পড়তে বসেছিলি?”

উৎস মেহেকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো কিন্তু মেহেক কথাটা এরিদের উপর চাপিয়ে দিতে চাইলো।
-“কিরে এরিদ বলছিস না কেনো পড়তে বসেছিলি?”

-“তুমি আমাকে কেনো বলছো ভাইয়া তো তোমাক বলেছে।”
মেহেক এরিদকে চোখ রাঙায়।

-“মেহেক।”

মেহেক বোকার মতো দাঁত বের করে বলল,
-“আমাকে বলছেন?”

-“টিভি বন্ধ কর।”

-“আর একটু।”

-“বন্ধ করবি নাকি..”

-“করছি করছি।”
মেহেক টিভি দ্রুত বন্ধ করে দেয়।

-“যেহেতু পড়তে বসিছ নাই সেহেতু টিভি দেখতে পারবি না।”

-“পড়েছি তো।পড়তে পড়তে একটা ছন্দও বানিয়েছি।”
কথাটা মেহেক খুবই গর্ভের সাথে বলল।কিন্তু তার কথা উড়িয়ে দিয়ে উৎস সিঙ্গেল সোফায় গা হেলিয়ে দিয়ে বসে ফোন স্কল করতে লাগলো।উৎসর বেখেয়ালি ভাব দেখে মেহেক রোদসীকে বলল,
-“আপু তুমি আমার ছন্দ’টা শুনবে?”

-“হুম বল।দেখি আমার বোন কী ছন্দ বানিয়েছে তাও পড়তে বসে না পড়ে!”

মেহেক গলা ঝাকি দিয়ে উৎসের দিকে তাকিয়ে খুব সুন্দর ভাবে উচ্চারণ করলো,

-“জীবনে চলার পথে
দেখা হলো এক পথিকের সাথে
সে ছিলো নির্বিকার!
কিন্তু তার চাহনিতে ছিল মুগ্ধতা
আটকে উঠলাম তার ভালোবাসায়।
থমকে গেলাম তার কাতরতায়!
তার ঠোঁটের কোণার বাঁকা হাসি
দূর করে দেয় মনের সুপ্ত কষ্টটুকু।”

উৎস চোখ তুলে তাকাতেই দুজনের চোখের দৃষ্টি মিলে।মেহেক মুচকি হাসি দেয়।উৎস দাঁতে দাঁত পিষে রাশভারি স্বরে বলল,
-“মেজো মা। তোমার মেয়ে কী দুধ খেয়েছে?”

সুফিয়া বসা থেকেই জোরে উওর দিলো
-“তোর সামনেই তো দাঁড়ানো জিজ্ঞেস কর ওকে।”

এবার উৎসের দৃষ্টি পখর হলো।তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালো।মেহেক কাচুমাচু হয়ে দাঁড়ায়।তখনি এরিদ গর্ভের স্বরে বলল,
-“আমি আজকে দুই গ্লাস দুধ খেয়েছি এখন লাফিয়ে লাফিয়ে বড়ো হবো।”

উৎস এরিদকে প্রশ্ন ছুড়লো
-“দুই গ্লাস কেনো?”

রোদসী বুঝতে পারলো মেহেকের তা এরিদকে ভুলভাল বুঝিয়ে খাইয়ে দিয়েছে।মেহেককে ইশারায় বলল আজ তুই শেষ।কিন্তু মেহেক কোনো ভুরুক্ষেপ করলো না।সে ধরে নিয়েছে উৎস তাকে কিছু বলবে না।কারণ তার ধারণা তাকে শাস্তি দিবে না কিন্তু সবাই আছে তাই একটু বকতে পারে।মেহেককে স্বাভাবিক থাকতে দেখে রোদসী অবাক হলো।

-“মেহেক আপু বলেছে দুধ খেলে আমি বড়ো হবো তখন আমার মনে রং লাগবে।তাই মেহেক আপুরটা আমাকে দিয়েছে আমি ডগডগ করে খেয়ে ফেলেছি।”

এরিদের কথায় সবার মনোযোগ গেলো মেহেকের দিকে।কয়েক জোড়া চোখ তাকে গিলে খাচ্ছে। শুধু কী উৎস তার সাথে তার তিন মাও!সুফিয়া রেগে তো বলেই দিলো,
-“দেখেছো ভাবি এই মেয়ের কান্ড।শরীরটাকে তো রোগী বানিয়ে রেখেছে এখন বিছানায় পড়া বাকি।”

উৎস চোয়াল শক্ত করে বলল,
-“রোদসী।”

রোদসী সাথে সাথে জবাব দিলো,
-“জ্বি ভাইয়া।”

-“রান্না ঘর থেকে আরেক গ্লাস দুধ নিয়ে আয়।”

রোদসী দুধ আনতে চলে গেলো।তিন গিন্নি কথা শেষ করে উঠে গেলো রাতের খাবার প্রস্তুত করতে।যেখানে উৎস আছে সেখানে তাদের না হলেও চলবে এটা সবাই জানে।মেহেক উৎসর সামনে স্থির হয়ে অপরাধীর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে।মিনিক খানেক পর রোদসী গরম দুধ নিয়ে উপস্থিত হলো।রোদসীর হাতে দুধের গ্লাস দেখে মেহেক মিনতি স্বরে বলল,
-“আমার খেতে ভালো লাগে না।প্লিজ এটা খেতে বলবেন না।”

উৎস কপাল কুঁচকালো। পাল্টা প্রশ্ন করলো
-“তো কে খাবে?”

-“আপনি খেয়ে নেন।আপনার শক্তির দরকার।”

-“আমার শক্তি নিয়ে তোর চিন্তা করতে হবে না।আগে নিজেরটা ভাব।এখন খা।”

-“আমার বমি আছে। অনেক তিতা!”

-“রোদসী চিনি মিশিয়ে আন।”
রোদসী আবার গিয়ে দুধে চিনি মিশিয়ে আনলো।মেহেকের হাতে দুধের গ্লাস ধরিয়ে দিলে সে নাক কুঁচকায়।

-“এক ডোগে খেয়ে নে।”

-“আপনি আমাকে”

-“অজুহাত চলবে না খেয়ে নে।”

মেহেক কোনো উপায়ন্তর না পেয়ে খেতে বাধ্য হয়।বা হাত দিয়ে নাক চেপে ধরে এক টানে পুরো গ্লাস ফাঁকা করে দেয়।
-“গুড।সকালে রেডি থাকিস কোন পর্যায়ে আছিস তার জন্য ডাক্তার যেতে বলেছে।”

-“ঠিক পর্যায়েই আছি।”

-“ঔষধ খাস সবগুলা?”

-“……”
মেহেকের চুপ থাকায় উৎস তার জবাব পেয়ে গেলো।

-“রাতের ঔষধ মিস দিলে তোর খবর আছে।”

মেহেকের মুখ ভোঁতা হয়ে যায়।কেউ ভালোবাসলে কারো সাথে এমন করে নাকি!

-“মেহেক আপু তোমার মোস হয়েছে।”
বলেই এরিদ শব্দ করে হেঁসে দিলো।

মেহেক হাতের উল্টো পাশ দিয়ে মুখ জোরে মুছা দিয়ে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে সিঁড়ি বেয়ে উঠতে উঠতে বলল,
-“তোমার কথা শুনে বারে বারে
মন হয় উতলা
আমি বুঝি নাই বন্ধু
তুমি এতো রঙ্গিলা
খেলো প্রেমেরই খেলা…”
এরিদ ও রোদসী হা হয়ে তাকিয়ে রইলো।উৎস তো অবাক হলো।এই মেয়ের জ্ঞান বুদ্ধি কিচ্ছু হবে না।কোথায় কী বলতে হয় তার কোনো ধারনা নেই।আর এসব কি আজগুবি কথাবার্তা বলছে?মাথার মধ্যে এসব ঘুরছে ওর!এসব বন্ধ করতে হবে না হলে মাথায় চড়ে নাচবে।

——

একের পর এক চাবুকের আঘাতে গোটা শরীরে অসংখ্য দাগ হয়ে গেছে। তবুও থামার নাম নেই!চাবুকের বাড়ির শব্দের সাথে মিশে যাচ্ছে দীর্ঘ শ্বাস।দেহের শক্তি দিয়ে মাটিতে পড়ে থাকা ছেলেটির গায়ে চাবুক মারছে।তার একটাই দোষ সে ইকবালের হয়ে ইয়াফাকে ডিস্টার্ব করেছে।রাস্তার মধ্যে তার ওড়না টেনেছে। এতো সাহস ওরে কে দিয়েছে তার পছন্দের মানুষের সম্মানে হাত দেওয়ার।ফারাজ তার সব রাগ উগলে দিচ্ছে এই ছেলেটার উপরে।ছেলেটার উপর আর কিছুক্ষন নির্যাতন হলে পৃথিবী ছেড়েই হয়তো চলে যাবে। নিশ্বাসের শব্দ গভীর হতে লাগলেই ফারাজ থেমে যায়।কপাল বেয়ে ঘাম ঝড়ে পড়ছে।ফারাজকে থামতে দেখে ওসমান রুমাল এগিয়ে দেয়।রুমাল নিয়ে ফারাজ মুখ মুছে চেয়ারে বসে।গলার স্বরে গাম্ভীর্যতা রেখে বলল,
-“তোর ওই বা*লের স্যারকে বলে দিবি ওই মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকানোর আগে জেনো আমার চোখে চোখ রাখে।ওসমান পানি দে।”

ওসমান পানির বোতল এগিয়ে দেয়। ডগডগ করে পানি খেয়ে নিলো।গলা ভিজিয়ে মানিব্যাগ বের করে কিছু টাকা ছেলেটার উপর ছুঁড়ে মারলো।
-“ডাক্তার দেখিয়ে নিস।”

ছেলেটা ভয়ার্ত স্বরে বলল,
-“আমাকে মাফ করে দিন আমি আর কোনোদিন কারো কথায় কারো পিছু নিবো না।”

ফারাজের এসিস্ট্যান্ট ওসমান।সে বলল,
-“শিক্ষা হয়ে গেছে?”

-“জ্বি”

ফারাজ বড়ো বড়ো কদমে বেরিয়ে গেলো।ওসমান কোনো প্রশ্ন করলো না।করলেই ত্যাড়া জবাব দিবে না হয় গালি ছুঁড়বে।তার থেকে ভালো মাথা ঠান্ডা হলে বিষয়টা জানাবে তখন আলোচনা করা জাবে।

#চলবে

#দৃষ্টির_অন্তরালে_নিস্তব্ধতা
#লেখনী_মায়মুনা_আক্তার_মারিয়া
#পর্ব:১৭

কাশতে কাশতে গলা শুকিয়ে এলো।কিন্তু ঘুম ভরা চোখে উঠে পানি তৃষ্ণা মেটানো এই অলস মেয়ের হচ্ছে না।যখন অনুভব করলো ঢোক গিললেও গলা ভিজছে না শুকনো গলা আরো কাট কাট হয়ে গেছে।বাধ্য হয়ে উঠে বসে হাত দিয়ে হাতড়িয়ে বেড সাইড টেবিলে পানির বোতল নিলো।তবুও চোখের পাতা মেললো না।বোতলের মুখ খুলে তার ঠোঁটে লাগালো কিন্তু কোনো পানি তার মুখে গেলো না।সে আবার হাত বাড়িয়ে বেড সাইডের বাতি টা ধরালো।চোখের পাতা মেললো।পিটপিট করে তাকিয়ে দেখলো বোতল খালি!বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলল,
-“উফ গলাটা এখোনি শুকাতে হলো!তোর গলা তোর সাথেই বেইমানি করে মেহেক আর তোর উৎস ভাই তো করবেই।”

বিছানার এক কোনে পড়ে থাকা ওড়নাটা কোনো মতে গায়ে জড়িয়ে বোতলটা নিয়েই ঝিমতে ঝিমতে তার ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।পানি খেয়ে এবং তার হাতের বোতল ভরিয়ে তার ঘরের দিকে গেলো।হঠাৎ উৎসর কথ মনে হতেই তার পা থেমে গেলো।সে ভেবে নিলো উৎস হয়তো ঘুমিয়ে আছে।তার ঘুম যেহেতু ভেঙেছে সুতরাং একটু বিরক্ত করে আশা যাক।যেমন ভাবনা তেমন কাজ মেহেক চলে গেলো উৎসের ঘরের দরজার বাহিরে গিয়ে দাঁড়ায়। দরজায় কয়েকবার টোকা দিলো।ভিতর থেকে কোনো সাড়া শব্দ পেলো না।
-“আমাকে বলে আমি নাকি মরার মতো ঘুমাই।এখন যে তিনি ঘুমাচ্ছে তার বেলায় কিছু না।দাঁড়া বেটা তোর ঘুম আজ হারাম করবো।”
মেহেক দাঁত বের করে হি হি করে হেঁসে দেয়।তারপর দরজা হালকা ফাঁকা করে উঁকি দেয়।ঘুটঘুটে অন্ধকার।সে কিচ্ছু দেখতে পেলো না।ধীরে ধীরে খাটের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।অন্ধকার হলেও রাস্তার ল্যাম্পোস্টের আলো এসে পৌঁছেসে উৎসের ঘরে।সেই আলোয় পুরো ঘর’টা ঝাপসা দেখা যাচ্ছে। কিন্তু উৎসর অস্তিত্ব নেই।তাহলে কী ওয়াশরুমে আছে।মেহেক ওয়াশরুমের সামনে গিয়ে কান পাতলো।না,এখানেও নেই।ঘরে কী নেই উৎস।কিন্তু কোথায়?এতো রাতে কোথায়ই বা জাবে?আর গেলেও বড়ো আব্বুর কানে পৌঁছালে এক বড়ো ঝড় বয়ে যাবে।মেহেক বেরিয়ে গেলো উৎসর ঘর থেকে। দরজাটা আস্তে করে চাপিয়ে দেয়।দু’তলার করিডর দিয়ে হাঁটছে আর আনমনে ভাবছে এতো রাতে কোথায় যেতে পারে উৎস ভাই।হঠাৎ সে শুনতে পেলো টুংটাং শব্দের।মেহেক হতবাক হয়ে শুনার চেষ্টা করে এতো রাতে এটা কীসের শব্দ সে পাচ্ছে। শান্ত পরিবেশে শব্দ স্পষ্ট শুনা গেলে মেহেক বুঝতে পারলো গিটারের আওয়াজ ভেসে আসছে।এ বাড়িতে তো শুধু উৎস ভাই গিটার বাজাতে পারে। তাহলে কী উৎস ভাই?আওয়াজটা কোন দিক থেকে আসছে খেয়াল করলে মেহেক বুঝতে পারে ছাঁদের থেকে আসছে।তাই সেও কয়েক কদম এগিয়ে যায়।ছাঁদের সিঁড়ি দিয়ে যতো এগোচ্ছে ততো মনে হচ্ছে শব্দটা কাছে আসছে।মেহেক শব্দ ধরেই এগোত লাগলো।ছাঁদে এসে পৌঁছাতেই সে দেখতে পেলো ছাঁদের কার্নিশে দাঁড়িয়ে আছে কেউ উল্টো পাশে ঘুরে।তার হাতে গিটার।গিটারে কয়েকবার টুংটাং শব্দ হলে মৃদু পুরুষালী কন্ঠে ভেসে আসে,

“চলে আয় চুপটি করে
ভেসে যাই প্রেম সাগরে
চল কুড়োই মুক্ত ঝিনুক
দু’জনে আলতো করে…||
তোর টানে মন বাগানে
ফুল ফুটবে আজীবন…
জানে মন তুই জীবন
জানে মন তুই জীবন…”

উৎস থামতেই মুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মেহেক বলল,
-“চুপটি করে তো এসে পড়েছি।এবার আমার মনের বাগানে ফুল ফুটিয়ে দেন।”

উৎস হতভম্ব হয়।কপালে ভাঁজ পড়ে তার।গিটার নিচে রেখে পাশ ফিরলে মেহেকের মুখবিবর দেখে দাঁতে দাঁত পিষে।এতো রাতে তার উপস্থিতিতে উৎস বিরক্ত হলো।কিন্তু সেটা প্রকাশ করলো না বরং আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
-“পানি দে।”

মেহেক তার কাঙ্ক্ষিত উত্তর না পেয়ে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে উৎসের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।মেহেককে দাঁড়াতে দেখে উৎস হাত বাড়ায়।মেহেক পানির বোতল এগিয়ে দেয়।উৎস নিয়ে গলা ভেজায়।
-“চাঁদের আলোয় হাতের বোতলটা দেখে নিজের তৃষ্ণা মিটিয়ে নিলেন।আর আমার চোখের ভাষা বুঝলেন না।”

-“বুঝিয়ে বল তারপর না হয় বুঝে নিবো।”

-“…..”

চাঁদের আলোয় আকাশটা পরিষ্কার। সেই আলোয় তন্ধ্যাচ্ছন্ন প্রিয় মুখটি দেখা যাচ্ছে। তার দৃষ্টি ওই দূর আকাশে জ্বলজ্বল করা চাঁদের দিকে।

-“আমাকে ভালোবাসিস?”

মেহেক তার দৃষ্টি নিয়ে আসলো উৎসের মুখবিবরে।অত্যাধিক বিনম্র স্বরে জবাব দিলো,
-“হুম বাসি।”

-“কতোটুকু?”

মেহেক শূন্যে হাত তুলে উৎসকে বলল,
-“ওই যে দেখছেন না মাথার উপর আকাশ।সেই আকাশের কোনো পরিমাপ আপনি করতে পারবেন?”

উৎস স্বাভলিল ভবে জবাব দিলো,
-“না। পারবো না।”

-“তাহলে আমার ভালোবাসারও কোনো পরিমাণ নেই।”

উৎস খানিকক্ষণ বাকরূদ্ধ হলো।তারপর পুনরায় প্রশ্ন ছুড়লো,
-“তো ভালোবাসাটা কী আজই হলো?”

মেহেকের ঠোঁটের কনায় হাসি এসে জমা হলো।কিন্তু হাসিটা ঢোক গিলে ভেতরেই রেখে দিলো।
-“উহুম।”

-“তাহলে কী প্রথম দেখাতে ভালোবেসেছিলি?”

-“না। প্রথম দেখাতে ভালোবাসিনি আমি তবে ধীরে ধীরে জাগলো এই অনুভূতি।”

উৎস মুচকি হেঁসে বলল,
-“তাহলে এই অনুভূতির একটা নাম দেওয়াই যায়।কী বলিস?”

মেহেক কাতর চোখে চেয়ে বলল,
-“হুম দেওয়াই যায়।”

-“তো ফুল কী বাগানে এখোন থেকেই ফুটাতে হবে?”

উৎসের করা প্রশ্নে মেহেক অবাক হয়।তার সাথে খুশি হয়। উৎসের চোখে মুখে মুগ্ধতায় ঘেরা।মেহেক উৎসের ডান হাতের কনুইয়ের ভিতর দিয়ে তার হাত ধুঁকিয়ে দিলো।উৎস পাশ ফিরে এক পোলক তাকিয়ে মেহেকের হাত বগল থেকে সড়িয়ে নেয়।এতে মেহেকের মুখ ছোট হয়ে যায়।অভীমান হয় তার কিশোরী মনে।উৎস হাঁফ ছেড়ে বলল,
-“দূর থেকে ভালোবাসা শ্রেয়।স্পর্শ করে ভালোবাসা নামক অনুভূতিককে নষ্ট করার মানেই হয় না।”

মেহেক শান্ত স্বরে জবাব দিলো,
-“আপনার ভালোবাসা বুঝা বড়ো দায়।”

রাতের অন্ধকার কেটে গিয়ে শুরু হলো এক মিষ্টি সকাল।আজকের সকালটা ব্যস্ততায় ঘেরা।সবার মুখে হাসির ছোঁয়া।বাড়ির তিন গিন্নি লেগে পড়েছে কাজে।সম্পর্কে ননদিনী আসলেও এখন তো নতুন সম্পর্কে গড়াবে।আজ সিজান তার সকল কর্ম ব্যস্ততাকে অবজ্ঞা করে সিদ্ধান্ত নেয় চৌধুরী নিবাসে জাবে।বিয়ের জন্য সবাই যখন রাজি হয়েছে সুতরাং দেরি করার কোনো মানেই হয় তাই সে খুব দ্রুত রোদসীকে তার ঘরে তুলতে চাইছে।সিজান তার বাবা মাকে নিয়ে আসছে এই খবরটা সবার কাছে পৌঁছাতেই সকলে লেগে পড়েছে কাজে।রোজগার মতো আজও এরিদ ও মেহেক ছুটাছুটি করছে। তারা খিব খুশি তাদের বোনের বিয়ে হবে।আজ পাকা কথা।কিছুক্ষন পর পর রোদসীর ঘরে উঁকি দিয়ে দুষ্টু দুষ্টু কথা বলে দৌড় দেয়।নিশাত তিন মাকে সাহায্য করছে।ফারাজ হাত ভর্তি করে বাজার করে নিয়ে সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করলো।দু’তলার বেলকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা এরিদ, মেহেক তাকে দেখে এক ছুটে ফারাজের কাছে আসে।
-“তাকিয়ে কী দেখছিস?ধর ধর।”

মেহেক ও এরিদ নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলো।বাজারে ভীড় থাকায় ফারাজে শরীর ঘেমে গেছে তাই সে ফ্যান ছেড়ে সোফায় গা হেলিয়ে বসলো।মেহেক আর এরিদ কিছু আঙুল ফল বাটিতে করে নিয়ে এসে ফারাজের পাশে বসলো।ওদের থেকে ফারাজ আঙুল নিয়ে মুখে দিলো।তিন জন মিলে খেতে লাগলো আয়েশ করে।হঠাৎ উৎস নেমে এলো।আজ কেউই বাহিরে যায়নি শাহাদাত চৌধুরীর আদেশে।বোনের বিয়েতে বাবার পর সকল দায়িত্ব বর্তায় ভাইদের উপর।বড়োরা না থাকলে তো তাদেরই করতে হবে সব।
-“ভাইয়া তোমাকে একটা কথা বলি।”

-“হুম বল।”

-“এই যে তুমি রোদসী আপুর পাকা কথার জন্য বাজার করে আনলে তো আমার বিয়ের সময়ও কী তুমি করবে?”

মেহেকের উদ্ভট প্রশ্ন শুনে ফারাজ তাকালো উৎসের দিকে।না তার মুখে কোনো গম্ভীর্যতা দেখতে পেলো না।তাই ফারাজও মজা নিতে বলল,
-“আমি কেনো করবো? উৎস আছে না। ও করবে।”

-“পড়াশোনার বয়সে বিয়ের বাজার নিয়ে চিন্তা করে বলেই তো সবাই বলে মেয়েদের বুদ্ধি হাঁটুর নিচে।”

উৎসর খোঁচা মারা কথায় যে মেহেককে থামানোর একমাত্র রাস্তা তাই সে সুযোগ বুঝে বলে দিলো।যাকে বলে সুযোগের সৎ ব্যবহার নয়তো দেখা যাবে এই রবট মুখটাকে বন্ধ করাই যাবে না।
উৎস ভাই যে ইচ্ছে করে এই কথা বললো তা ছোট মাথায় বেশ এঁটেছে।কিন্তু মেহেক চাইলো না কথা বাড়াতে না হয় হিতে বিপরীত হয়ে যাবে।
তখনি রোদসী নিচে নামছে।রোদসীকে দেখে মেহেক, এরিদ পুনরায় দুষ্টুমি স্বরে বলতে লাগলো,

-“রোদ আপুর বিয়ে ভাঙা ঢোল দিয়ে।সিজান ভাই আসবে বর সেজে নিয়ে যাবে পালকি দিয়ে।পালকির ঠেঙ ভেঙে দিবো রোদ আপু যাবে কীসে? সিজান ভাইয়ের কোলে।”
বলেই উচ্চস্বরে হেসে দিলো।বড় দুই ভাইয়ের সামনে ওদের কথা শুনে রোদসী লজ্জায় কাচুমাচু হয়ে যায়।গাল টমেটোর মতো লাল হয়ে যায়।মাথায় যদি একটু বুদ্ধি সুদ্ধি থাকতে এদের তাহলে এভাবে তাকে নিয়ে মজা করতে পারতো ভাইদের সামনে।উৎস অগ্নি দৃষ্টি বর্ষন করতেই মেহেকের হাসি মিইয়ে যায়।রোদসী তড়িৎ গতিতে জায়গা প্রস্থান করে রান্না ঘরে চলে যায়।

———

আয়নায় হালকা প্রসাধনী দেওয়া গুটিয়ে থাকা মুখে নিজেকে দেখে মুগ্ধ আঁখিতে তাকিয়ে আছে।কখনো সাজগোজের ধারে কাছে না যাওয়া মেয়েটাও আজ প্রিয় মানুষের আবদারের জন্য সেজেছে।সিজান কল দিয়ে বলে দিয়েছে আজ এসে জেনো তার রোদকে হালকা সাজে দেখতে পায়।আর সেই গুরু দায়িত্বটা দিয়েছে তার উড়নচণ্ডী বোনটাকে।যার বায়না আর আজগুবি যুক্তিগুলোর কাছে রোদসীর হার মানতে হয়।মেয়েটা বড্ড পেকেছে।আর পাঁচটা পাএ পক্ষ মেয়ে দেখতে আসলে যেমন পরিস্থিতি হয় ঠিক তেমনি পরিস্থিতি চৌধুরী নিবাসে।সিজান বোনের ছেলে হলেও চৌধুরী বাড়ির মেয়ের জামাই হতে হলে এক চুলও ছার পাবে না।সুতরাং সব কিছু তেমন ভাবেই এগোবে।সিজানরা এসেছে পর থেকে রোদসী তার ঘরের দরজাই পেরোয় নি।মেহেক ধরে বেঁধে নিশাতের কাছে শাড়ি পরিয়েছে।হালকা সাজগোজে সম্মতি দিলেও রোদসী শাড়িতে নাকচ করে দেয়।কিন্তু তার কথায় কী কোনো কাজ হবে?সবার জোরাজুরিতে অবশেষে সে পড়তে বাধ্য হয়।
তবে এই মুহূর্তে তার ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে সবার সামনে উপস্থিত হওয়ার মতো তার সাধ্যে কুলাচ্ছে না।
ড্রয়িং রুমে সবাই উপস্থিত কিন্তু রোদসী নেই।সবাই গল্পের ঝুড়ি নিয়ে বসেছে।সিজান বিরক্ত হলো
তার বিয়ের জন্য এসেছে তা নিয়ে কথা বলবে তা না করে সংসারের আলোচনা শুরু করে দিয়েছে।আসার সময় তার বাবা মাকে কতো বার বলেছে বিয়ের কথা আগে ফাইনাল করতে কিন্তু এখানে এসেই মা যোগ দিয়েছে মামিদের সাথে আর বাবা যোগ দিয়েছে মামাদের সাথে!

সিজান আসার পর থেকে তার রোদকে না দেখতে পেয়ে বসতেও পারছে না শান্তিতে।কিছুক্ষন পরপর উপরে তাকাচ্ছে কিন্তু রোদসীকে দেখতে পাচ্ছে না।অন্য সময় হলে না হয় যাওয়া যেতো কিন্তু আজ বড়োদের মাঝ থেকে উঠা আর কিছু বলা মানে মানসম্মান খুয়ানো।সিজান মনে মনে ঠিক করে নিলো একবার শুধু দেখা পাক তারপর তার মন উতল করার শাস্তি মিটিয়ে নিবে।সিজান করুন দৃষ্টিতে উৎসের দিকে তাকায় কারণ তাকে উৎসই সাহায্য করতে পারবে।তার ভাবভঙ্গি দেখে উৎস বেশ বুঝতে পারলো আসল ঘটনা।গলায় কিছুটা গম্ভীরতা টেনে বলল,
-“এভাবে বসে থাকার কোনো মানে দেখছি না।আমার কাজ আছে।যা করার দ্রুত করো।আর রোদসী কোথায়? ওকে ডাকছে না কেনো?”

উৎসের কথায় সবাই নড়েচড়ে বসলো।ঠিকই তো সবাই এখানে রোদসী নেই।গল্প পড়েও করা যাবে আগে বিয়ের কথাবার্তা তো শেষ করতে হবে।রাহিমা ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলো তার ছেলের মুখ কালো হয়ে আছে।আসার আগে কান ঝালাপালা করে দিয়েছে আর তারা এখানে এসে গল্প করতে মেতে উঠেছে।কখন জানি মুখ খুলে লাগামহীন কথা বার্তা বলে বসে তার থেকে ভালো এখানেই থেমে যাওয়া।তাই তিনি প্রসঙ্গ পালটে বললেন,
-“দেখেছো আমার বউমার কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। ওকে আসতে বলো।”

ফুপুর কথায় মেহেক জবাব দেয়,
-“ফুপু রোদ আপু তো লজ্জা পাচ্ছে। আসতেই চাইছে না।”

-“মেহেক তুই যা তো নিয়ে আস।”

-“আচ্ছা ফুপু।”
বলেই মেহেক সিজানের পিছে গিয়ে কানে ফিসফিস করে বলল,
-“দুলা ভাই বখশিশ রেডি রাখেন। আপনার হবু বউ শাড়ি পড়েছে দেখে আবার অজ্ঞান টোজ্ঞান হইয়েন না।”

উৎস আড়চোখে তাকাতেই মেহেক সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছুটে গেলো রোদসীকে আনতে।আর উৎস তার ব্যাক্তিগত রোজের দুষ্টুমি দেখে ঠোঁট টিপে হাসলো।

#চলবে