দ্বিতীয় পুরুষ পর্ব-১১+১২

0
356

#দ্বিতীয় পুরুষ
পর্ব ১১+১২
নীলাভ্র জহির

খালাবাড়ির পুকুর পাড়টা খুব সুন্দর। ছোট্ট পুকুর অথচ চারপাশে সারিবদ্ধ ভাবে লাগানো রয়েছে সুপারি ও আম গাছ। একপাশে শান দিয়ে বাঁধাই করা ঘাট। ঘাট থেকে একটু উঁচুতে খানিকটা দূরেই বাঁশ দিয়ে বানানো রয়েছে টং। টং এর উপর বসে এখানে বিকেল কিংবা সন্ধ্যায় আড্ডা চলে। গরমকালে ভরা জোছনায় রাত্রি বেলাও বসে এখানে হাওয়া খেতে খেতে গল্প গুজব হয়। রূপক চিত্রাকে নিয়ে টং এর উপর এসে বসলো।
দুপুরের রোদ কেবল কমতে শুরু করেছে। ভাবীরা গোসল সেরে উঠে কাপড় ধুচ্ছে। শিরশির করে বাতাস লাগছিল গায়। টং এর উপর শুয়ে পড়ল রূপক। তার ভাবির ছেলে দৌড়ে গিয়ে ঘর থেকে একটা বালিশ নিয়ে এসে দিল। চিত্রা বসে রইল রূপকের পাশে। গরম গরম পোলাও, গরুর গোশত ও মাছ ভাজা দিয়ে ভাত খাওয়ার পর এই রকম শিরশিরে বাতাসে ঘুম চলে আসে। সঙ্গে তার প্রেমিক স্বামী। ভীষণ সুখী সুখী মনে হচ্ছে নিজেকে চিত্রার। ভাবীরা কাপড় শুকাতে দিচ্ছেন। মাথায় গামছা বাঁধা। গামছা খুলে চুল ঝাড়ছিলেন মেজ ভাবি। চিত্রা রূপককে বলল, এইখানে আইসা আমার খুবই ভালো লাগতাছে।
দুইটা দিন থাকো। ভালো লাগবো। খালা অনেক আদর যত্নে রাখবো তোমারে।
হ, তা তো জানি। ভাবিরাও আমার অনেক খেয়াল রাখব।
কিন্তু তোমারে রাইখা গিয়ে আমি যে কেমনে থাকমু?
তাইলে আমারে রাইখা যাইয়েন না। আমারে লগে নিয়ে যান আর নয়তো আপনেও থাইকা যান।
পোলাপাইনের মতো কথা কইও না বউ। দোকানে যাইতে হইবো। কাম কাজ না করলে তোমারে খাওয়ামু কি? ৬ জন মানসের সংসার আমাগো। কাম কাজ করতে হইব না?
চিত্রা কোন কথা না বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। এই বাস্তবতা সে নিজেও বোঝে। মনটা মানতে না চাইলেও তাকে মানিয়ে রাখতে হলো।

রূপক বলল, মুখটা কেমন হইয়া আছে। এত ভালা ভালা খানা খাইলাম। আরসি কোলা খাওন লাগতো।
সবচেয়ে ছোট খালাতো ভাইকে ডেকে রূপক পকেট থেকে৷ পঞ্চাশ টাকা বের করে দিয়ে বলল, দোকান থাইকা একটা আরসি কোলা নিয়া আয়। একটা সিগারেটও আনিস।
ছেলেটা টাকা নিয়ে দৌড়ে চলে গেল। মেজ ভাবী বাটাতে করে পান নিয়ে এসেছেন। রূপক বলল,, বসেন ভাবি। পান একটু পরে খাব। আরসি কোলা আনতে দিছি। আগে আরসি খাইয়া লই।
আপনের ভাইয়ে পেপসি কিনা দোকানে রাখছে। তার নাকি বাড়ি আসতে লেট হইবো। কি একটা ব্যাপার আপনারে আরসি দিতে পারলাম না।

রূপক হাসতে হাসতে বলল আরে সমস্যা নাই বিকেলে আবার খামু। খাওয়ান কি একবেলা? খাওয়ন অনেক বেলাই খামু।
হ, ভাই। নতুন বউ নিয়া আইছো। আইজ রাতটা থাইকা যাও। আমার আম্মায় কইছিল বউরে নিয়া যাইতে। আমাগো বাড়িতে একবেলা ভাত খাইও।
না, ভাবি। অহন আর দাওয়াত খাওনোর সময় নাই। আইজ দোকান ফালাইয়া আইছি। রাতে বাড়ি ফিরতে হইবো। কাল দোকানে যামু।
তাইলে তোমার বউরে নিয়া আমি একদিন বাপের বাড়ি থাইকা ঘুরে আসি।
ও তো দুইদিন থাকবো।
খালি দুই দিন থাকবো? কইলেই হইলো? আমরা যাইতে দিতাছি না। সপ্তাহ খানেক থাকুক। সামনের শুক্রবার আপনি আইসা ওরে নিয়ে যাইয়েন।
আরে না। ওরে এখানে রাইখা আমার মায়ের ঘুমে ধরব না।
খালারে পাঠায় দিয়েন।
বাড়িতে সংসার আছে। গরু ছাগল হাঁস মুরগি আছে। মারে তো আর এখানে পাঠানো যায় না।
অত কথা বুঝি না ভাই। আমি ওরে নিয়া আমার বাপের বাড়িতে বেড়াইতে যামু। আমার মা বারবার কইরা ডাকছে।
ঠিক আছে। আপনে ওরে কালকে নিয়া ঘুইরা আইসেন। পরেরদিন মা আইসা ওরে নিয়া যাইবো।
এসব উল্টোপাল্টা কথা কইয়েন না ভাই। কয়েকটা দিন থাকুক ও এইখানে।

কথাটা বলেই ভাবি চিত্রাকে আলতো করে জড়িয়ে ধরলো। ভাবির এই পরম স্নেহে নিজেকে মাখিয়ে ফেলল চিত্রা। মহিলাটাকে তার খুব আপন বলে মনে হল। ওনার গা থেকে বেরোচ্ছে লাক্স সাবানের ঘ্রাণ। খুব ভালো লাগলো চিত্রার।
চিত্রা বললো ভাবী আপনি ভাত খান নাই। এত কইরা কইলাম আমার লগে খাইয়া লইতে। আপনি যান। গিয়া খাইয়া লন।
না বইন। তোমার ভাই দোকান থাইকা আসুক।
ভাইজান দুপুরে বাড়িতে ভাত খায়?
হ, বাড়িতে আইসা খাইয়া যায়।

চিত্রার মনটা কেমন যেন করে উঠলো। তার স্বামীও যদি দুপুরবেলা বাড়িতে এসে ভাত খেয়ে যেত তাহলে কতই না ভালো হতো। দুপুরের আগেই রান্না-বান্না শেষ করে গোসল করে সে সেজেগুজে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করতো। তার স্বামী খেতে বসলে সে পাখা দিয়ে বাতাস করতে পারত। ভাত খাওয়ার পর এক খিলি পান বানিয়ে দিত সে স্বামীকে। পান খেতে খেতে ঘুমিয়ে পড়তো রূপক। কখনো বা ঘুমের ফাঁকে তাকে একটু জড়িয়ে ধরে সোহাগ করতে চাইত। দশ মিনিট বিশ্রাম নিয়েই আবার দৌড়ে দোকানে যেতে হতো তাকে। চিত্রার ইচ্ছে করতো না স্বামীকে ছাড়তে তবুও ছেড়ে দিত সে। কারণ তাকে আবার কাজে ফিরতে হবে। প্রতিদিন সারাটাদিন অপেক্ষায় না থেকে যদি দুপুরবেলা একবার রূপক বাসায় ভাত খেতে আসত তাহলে দিনটা আরো সুন্দর হয়ে যেত তার। কথাগুলো কল্পনা করেই চিত্রার অন্যরকম আনন্দ হতে লাগলো। কিন্তু তাদের দোকান বাড়ি থেকে অনেক দূরে। যাতায়াত খুব কষ্টকর হয়ে যাবে। ভালো হবে যদি রূপকের একটা সাইকেল হয়ে যায়। সাইকেল থাকলে সে স্বামীকে অনুরোধ করে বলবে দুপুরে বাড়িতে খাইতে আসেন। তাহলে নিশ্চয়ই সাইকেল চালিয়ে তার স্বামী প্রতিদিন না হলেও অন্তত সপ্তাহে দু তিন দিন বাড়িতে খেতে আসবে। এবার বাবার সঙ্গে যোগাযোগ করে বাবাকে সাইকেলের ব্যাপারে একটু চাপ দিতেই হবে। অনেক দিন তো হয়ে গেল। শুধু ফুপাতো ভাইদের আশায় বসে থাকলে চলবে না। আনমনে কথাগুলো ভাবছিল চিত্রা।

এমন সময় রূপকের খালাতো ভাই আরসি কোলা নিয়ে ফিরলো। মেজ ভাবী দৌড়ে ঘরে গেলেন গ্লাস নিয়ে আসতে। ঢকঢক করে এক গ্লাস কোক খেয়ে সিগারেট ধরালো রূপক। চিত্রা আবার কোক খেতে পারে না। সামান্য একটু খেয়ে সে ভাবিকে খেতে অনুরোধ করল। ভাবি আরসির বোতলটা হাতে করে নিয়ে বাড়ির ভিতরে গেলেন। বললেন তার স্বামী বাড়িতে ফিরলে ভাত খেয়ে তারপর খাবে।
রূপকের সিগারেটের গন্ধে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল চিত্রা।
রূপক বলল তোমার কি গন্ধ লাগতাছে। তুমি একটু ঐদিকে গিয়া খাড়াও।
সমস্যা নাই। আপনি খান।
সিগারেট শেষ করে পানের খিলি মুখে দিল রূপক। তার মুখ থেকে এখন পানের ঘ্রান বের হবে। চুন মুখে দিতেই তার উপরের ঠোট লাল হয়ে গেল। একটু পানের পিক মাটিতে ফেলল সে। শিরশির করে বাতাস আসছে। টঙের বালিশে মাথা রেখে রূপক শুয়ে পড়ল। ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে আসছিল। চিত্রাকে বলল বউ কেমন লাগতেছে তোমার।

চিত্রা বলল, আমার তো খুবই ভালো লাগতাছে। যদি আপনেরে লইয়া এইখানে আরো দুইটা দিন থাকতে পারতাম তাইলে আরো ভালো লাগতো। আপনে চইলা গেলে আমার মনটা বড় খারাপ হইয়া যাইবো। মন চাইতাছে আপনারে আমার শাড়ির আচল এর লগে বাইন্ধা রাখি।

রূপক চিত্রার কথার কোন উত্তর দিল না। চিত্রা খেয়াল করে দেখল ঘুমে ঢলে পড়েছে রূপক। তার ভীষণ মায়া লাগলো রূপকের ঘুমন্ত মুখ দেখে। চিত্রার ও খুব লোভ হচ্ছে এখানে শুয়ে শিরশিরে বাতাসে একটু ঘুম দিতে। কিন্তু এখানে এসে এসব ছেলেমানুষি মানায় না। সে নতুন বউ এই বাড়ির মেহমান। রুপক ঘুমিয়ে পড়লে চিত্রা উঠে বাড়ির ভিতরে এল। মেজো ভাই বাড়িতে ফিরেছেন। বারান্দায় বসে ভাবি সহ ভাত খেতে বসেছেন তিনি। চিত্রা ওনাকে সালাম দিতেই তিনি হাসিমুখে বললেন আরে ভাবি কি অবস্থা?
চিত্রা বলল জি ভাই ভালো। আপনি ভালো আছেন?
হ, ভাবী ভালো আছি। বসেন ভাত খান।
আমরা খাইছি ভাইজান। আপনেরা খাইয়া লন।

চিত্রাকে একটা চেয়ার নিয়ে এসে দিল একজন। বারান্দায় বসল চিত্রা। ইটের পাকা ঘর খালাদের৷ কিন্তু মেঝে কাঁচা মাটি দিয়ে তৈরি। বারান্দার উপরে টিনের ছাউনি। নিচে মাটি। বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা একটা পরিবেশ পুরো বাড়িতে। গাছগাছালি রয়েছে অনেক। তবে বাড়িতে লোকজন বেশি থাকায় সব সময় একটা গমগমে ভাব বিরাজ করে।

প্রায় ঘণ্টাখানেক পর একটা বাচ্চা এসে চিত্রাকে বলল রূপক তাকে ডাকছে। চিত্রা তখন খালার সঙ্গে বসে গল্প করছিল। মুরুব্বির সামনে থেকে উঠে যেতে তার লজ্জা লাগলেও খালা ইশারায় বললেন যাও ওর ঘুম ভাঙছে মনে হয়।

চিত্রা তৎক্ষণাৎ পুকুর পাড়ে এসে দেখল রূপক বালিশে শুয়ে তার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে।
চিত্রা বলল, আপনার ঘুম হইল
হ, বউ খুব আরামের একটা ঘুম দিসি। মনে হইতাছে বেহেশত থাইকা ঘুইরা আইলাম।
ভালো হইছে। মেজো ভাই বাড়িতে আইছিল। আপ্নারে ডাকতেছিল কথা কওনের লাইগ্যা। আপনি ঘুমাইছেন শুইনা আর ডাকে নাই।
ভাইয়া কই?
উনিতো ভাত খাইয়া দোকানে চইলা গেছে।
ও আচ্ছা।
রূপকের চেহারায় ঘুমের দাগ স্পষ্ট। সে টং থেকে নেমে ঝোপের আড়ালে গিয়ে প্রস্রাব করল। তারপর পুকুরের ঘাটে গিয়ে হাত মুখ ধুয়ে কুলি করে চিত্রা কে বলল, কত সুন্দর বাতাস আইতাছে খেয়াল করছো?
হ, খুব সুন্দর বাতাস লাগতাছে।
এইডারে কয় বেহেশতী হাওয়া।
আপনারে কইসে?
কইছে তো। আমি আবার তোমারে কইলাম।
আপনারে কে কইছে? ফেরেশতা আইসা কইছে?
হ,
ঘুমের মধ্যে কি ফেরেশতার লগে কথা কইতে ছিলেন?
রূপক হাসতে হাসতে বলল হ।
কি কইলো ফেরেশতা?
কইল আমার নাকি একটা পোলা হইবো।
ধুর আপনে খালি প্যাক প্যাক করেন।

চিত্রা অন্য দিকে মুখ ফিরিয়ে নিল। স্বামীর কথায় সে খুশি হল নাকি বিরক্ত হল বোঝা গেল না। তবে ঘোমটার আড়ালে রাঙ্গা হয়ে উঠল তার লাজুক মুখ খানা। রূপক তখন বাড়ির ভেতরের দিকে যেতে যেতে চিত্রাকে বলল, আসো ভিতরে যাই।

খালা বললেন, জমেনা দের বাড়ি থাইকা বউরে নিয়ে ঘুইরা আয়।
খালার বাড়ির আশেপাশে দু একজন মহিলার সঙ্গে রূপকের বেশ ভালো পরিচয়। মুরুব্বী মহিলাগুলো রূপককে একসময় অনেক স্নেহ করতেন। নতুন বউকে নিয়ে তাদের ঘর থেকে একটু ঘুরে না আসলে হয় না। রুপক তার মেজ ভাবী ও বউকে সঙ্গে নিয়ে পাড়া ঘুরতে বের হলো। বের হওয়ার আগে মাথার চুল আঁচড়ে মুখে আরেকটু ক্রিম লাগিয়ে নিল চিত্রা। নতুন শাড়িতে তখন কুঁচকে গিয়ে বেশ কিছু ভাঁজ পড়েছে। তবুও তাকে বেশ নতুন বউ এর মতই দেখাচ্ছে। কানে ও গলায় ইমিটেশনের গয়না। হাত ভর্তি কাচের চুরি রিম ঝিম করছে। মাথায় লম্বা করে ঘোমটা টেনে দিল চিত্রা।

আশে পাশের বাড়িতে ঘুরতে ঘুরতে বিকেল গড়িয়ে এলো। কোন কোন বাড়িতে খেতে দিল মুড়ি চানাচুর কেউবা দিল বিস্কুট। নাস্তা খেয়ে পেট ভরে গেছে। তারওপর বাড়িতে ফিরতেই খালা আবার কিছু পিঠাপুলি খেতে দিলেন। দুপুর জুড়ে তিনি নানান রকমের পিঠা তৈরি করেছেন। খালার আতিথেয়তায় মুগ্ধ হয়েছে চিত্রা ও রূপক।

সন্ধ্যাবেলা সবাই মিলে আড্ডা দিতে বসল। গল্পগুজব চললো রাত পর্যন্ত। রাত প্রায় ন’টা বাজে তখন রূপক ভাত খেয়ে বলল, আমি বাড়ি যাই।
চিত্রার মনটা কেমন যেন করে উঠলো।
খালা তখন রূপককে বললেন, এত রাইতে আর বাড়ি যাইতে হইবো না। মেলাদিন পর আইছোস। একটা রাত থাইকা যা। কোন দিন বাঁচি কোন দিন মরি কওন যায় না।
খালা কাইল দোকানে যাইতে হইবো।
সকাল সকাল দুইটা ভাত খাইয়া দোকানে যাইস। আমি মেহেদিরে কইয়া দিমু তোরে হুন্ডাই কইরা কুন্দনপুর বাজারে রাইখা আইতে।

রূপকেরও মনটা চাইছে আজকের রাতটা এখানে থেকে যেতে। এত ভাল ভাল খাবার খাওয়ার পর তার শরীরে যে জোয়ার এসেছে, বউকে কাছে পেয়ে তা মেটাতে হবে। আজকে অনেকক্ষণ ধরে বউকে সে আদর সোহাগ করতে পারবে। শরীরে যেন নতুন করে লোভ জাগলো। অলসতায় বিছানায় শুয়ে পড়ল রূপক। বলল, আচ্ছা ঠিক আছে। আজকের রাতটা থাইকাই যাই। মেজ ভাবী আমারে একটা লুংগি আইনা দেন। আমিতো জামাকাপড় কিছুই নিয়া আসি নাই।

মেজ ভাবী তার ঘর থেকে একটা গেঞ্জি ও লুঙ্গি নিয়ে এসে দিলেন। সেগুলো পরে হাতমুখ ধুয়ে এসে বিছানায় শুলো রূপক। রাত বেড়ে যাচ্ছে। সারাদিন অনেক ঘোরাঘুরি খাওয়া-দাওয়া ও গল্প গুজব হয়েছে। এখন একটু বিশ্রাম নেয়া দরকার। চিত্রা ঘরে ঢুকতেই রূপক বলল বউ দুয়ার আটকাইয়া দিয়া আসো।
এত তাড়াতাড়ি? বাড়ির সবাই জাইগা রইছে।
তাতে কি হইছে? সবাই ভাববো আমরা ঘুমাইয়া পড়ছি। তুমি দরজা আটকাইয়া দিয়া আসো আমরা একটু ছবি দেখি।

দরজা বন্ধ করে দিয়ে চিত্রা বিছানায় এল। খালার বাড়িতে সৌর বিদ্যুতের আলো আছে। টিমটিম করে জ্বলছে একটা সাদা রঙ্গের বাতি। বিছানার পাশেই বাতির সুইচ। হাত বাড়িয়ে আলোটা নিভিয়ে দিল রূপক। তারপর সে তার বউকে খুব শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো। স্বামীর আলিঙ্গন পেয়ে চিত্রার শরীরটাও যেন হঠাৎ করেই জেগে উঠলো। সেও খুব করে চাইছিল তার স্বামীকে। আর এক মুহূর্ত দেরি করল না রূপক। ভালোবাসার অন্য রকম স্পর্শে চিত্রাকে ভরিয়ে দিতে লাগলো।

নবযৌবনা চিত্রা স্বামীর স্পর্শে যেন পূর্ণযৌবনা হয়ে উঠেছে। তার দিকে তাকালেই রূপকের হৃদয়ে দোলা দিতে শুরু করে। এমন একজন নারীকে স্ত্রী হিসেবে পেয়ে সে নিজেকে ধন্য মনে করছে। তাইতো সকালবেলা স্ত্রীকে নাইওরে রেখে চলে যেতে মন চাইছিলো না তার। খুব ভোরে উঠে খালা তার জন্য হাঁসের মাংস রান্না করেছে। গরম ভাত দিয়ে হাঁসের গোশত দিয়ে ভাত খেয়ে রূপক কুন্দনপুর এর উদ্দেশ্যে রওনা দিল। রূপক চলে যাওয়ার পর বিষাদ নেমে এলো চিত্রার মনে ও দেহে। কোথাও যেন এতটুকুও শান্তি নেই। কোন কাজই করতে ভালো লাগছিল না। খালাতো ভাইয়ের বউয়েরা এসে তাকে সঙ্গ দিতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু আজকে যেন গল্প করতেও চিত্রার মন বসলো না। নারী মনের অদ্ভুত রহস্য বুঝতে পারল না চিত্রা।

খালা বাড়িতে এক রাত থেকে পরদিন মেজ ভাবী বাপের বাড়িতে চিত্রাকে নিয়ে বেড়াতে গেলেন। নতুন বউ বলে সবাই বেশ খাতির যত্ন করলো তাকে। ভালো ভালো খাবারের আয়োজন করা হয়েছে, আশেপাশের প্রতিবেশীরা তাকে দেখতে আসছিলো। সব মিলিয়ে ভালো সময় কাটলো সেদিন। খালাবাড়িতে আসার একদিন পর জোসনা এলেন চিত্রাকে নিতে। সারা রাত চিত্রার ঘুম হয়নি। শশুর বাড়িতে যাওয়ার জন্য সে শুধু ছটফট করেছে। বার বার বার মনে হচ্ছিল তার আত্মা বোধহয় ফেটে যাচ্ছে রূপককে কাছে পাওয়ার জন্য, রূপককে একটু দেখার জন্য। সকাল হতেই নিজের ব্যাগটা গুছিয়ে চিত্রা অপেক্ষা করছিল কখন জোসনা আসবেন।

জ্যোৎস্না এসে খাওয়া-দাওয়া ও গল্পগুজব করলেন তার বোনের সঙ্গে। এক ফাঁকে উঠল যৌতুকের কথা। চিত্রাকে শুনিয়ে শুনিয়ে জ্যোৎস্না তার বোনের পুত্রবধূদের বাড়ি থেকে নিয়ে আসা যৌতুকের কথা বলছিলেন, তোর ছেলের বউয়েরা বাড়ি থেকে সব আনছে। ঘরের আসবাবপত্র , খাট শোকেস ,থালা-বাসন হাড়ি পাতিল, সংসারের যাবতীয় জিনিসপত্র তারা বাপের বাড়ি থাইকা নিয়া আইছে। মেজ বউয়ের বাপেরা তো ঘর ভর্তি কইরা জিনিস দিছে। অথচ আমার পোলার কপালটা এত খারাপ। এতো ভালো পোলা আমার, রাজপুত্তুর। অথচ ঘোড়ার আণ্ডা পাইছে। এমন ঘরের মাইয়া আনছি যেইখানে পোলা শ্বশুরবাড়িতে গিয়া একবেলা ভাত খাওয়ার সৌভাগ্য হইব না।

কথাগুলো শুনে চিত্রার কষ্টে বুক ফেটে যাচ্ছিল। তার স্বামী রূপকের এসব জিনিসপত্রের প্রতি কোন আগ্রহ নেই। রুপক কখনো তাকে যৌতুকের ব্যাপারে কোন কথা শোনায় না। অথচ সুযোগ পেলেই জোসনা তাকে ইনিয়ে বিনিয়ে বিভিন্ন জিনিস নিয়ে খোটা দিতে থাকেন। এসব কখনো শেষ হবে না হয়তো। চিত্রা মনে-মনে আক্ষেপ করতে থাকে। কেন তার সোহরাব উদ্দিনের ঘরে জন্ম হলো? সেও তো কোনো বড়লোকের আদরের দুলালী হতে পারত।

জ্যোৎস্নার সঙ্গে বাড়ি ফিরে এলো চিত্রা। বড় খালা সঙ্গে করে পিঠাপুলি বানিয়ে দিয়েছেন। বাড়ি ফিরতেই জোসনার ননদ ও প্রতিবেশীরা পিঠা খেতে ভীড় করলো। রূপকের জন্য সে আলাদা করে কিছু পিঠা রেখে দিল ঘরে। রূপক কখন ফিরবে সেই অপেক্ষায় তার যেন গলা শুকিয়ে আসছিল বারবার।
রাত নামলেই চিত্রা হাতমুখ ধুয়ে মাথায় সুগন্ধি তেল মাখলে। চুল আঁচড়ে খোঁপা করে একটা নরম সুতির শাড়ী পরল। মাথা ঢেকে ফেলল শাড়ির ঘোমটা দিয়ে। গালে হালকা করে ফেস পাউডার ও ঠোঁটে একটু লিপস্টিকও দিল। কুপির আলোয় বসে বসে হাতে লাগালো আলতা। রূপক কখন ফিরবে? তার খুব জোরে জোরে হৃদস্পন্দন হচ্ছে। তার অপেক্ষায় এমন তো হয়নি আগে। তিন দিন তাদের দেখা হয়নি বলেই কি এত প্রতীক্ষা?

অবশেষে ফিরলো রূপক। তার হাতে একটা ব্যাগ। ব্যাগটা জোসনার হাতে তুলে দিল রূপক। বলল, মা এইখানে জিলাপি আছে। আমার ঘরে থালে কইরা একটু পাঠাইয়া দিও।
তারপর সোজা এসে ঘরে ঢুকলো রূপক। মিষ্টি মধুর সুরে ডাকলো, বউ ও বউ। ঘরে আছো?
চিত্রার কলিজায় যেন পানি ফিরে এলো। সে জবাবে কোন উত্তর দিতে পারল না। কেবল নিঃশব্দে গুটি গুটি পায়ে রূপকের সামনে এসে দাড়ালো। হারিকেনের মৃদু আলোয় রূপক দেখলো তার মিষ্টি বউটাকে। মনে হল যুগযুগান্তর ধরে সে তার বউকে দেখেনি। যেন দুজনের দুটি মন বহু দূরে সরে গিয়েছিল। রূপককে দেখে একই অবস্থা হল চিত্রারও। নিজেকে সংযত করে রাখা বড় দায়। চিত্রা থরথর করে কাঁপছিল। রূপক দুই হাত দিয়ে চিত্রাকে জাপ্টে ধরলো। মাথা থেকে ঘোমটা সরিয়ে চিত্রার গলায় সে মুখ ডুবিয়ে দিলো। চিত্রার প্রতীক্ষিত দেহ-মন রূপককে পেয়ে যেন পাগলপারা হয়ে গেল। রূপকের চুল খামচে ধরল সে। দুজন মিলে বেশ কিছুক্ষন ধস্তা-ধস্তি চলতে লাগলো। এমন সময় শোনা গেল জোসনার গলা। হঠাৎ ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন জোসনা। ভেজানো দরজা ঠেলে ঘরে প্রবেশ করলেন। চিত্রা অপ্রস্তুত অবস্থায় একে অপরকে ছেড়ে দিয়ে দূরে সরে দাঁড়ালো।
ঘোমটা টা বড় করে টেনে দিল চিত্রা।
জোসনা কিছু না বলে জিলাপির প্লেট টেবিলের উপর রেখে বেরিয়ে গেলেন।
রূপক বলল, আস বউ জিলাপি খাই।
লজ্জায় চিত্রার মুখটা লাল টকটকে হয়ে গেছে।

রুপক কাছে এসে পেছন দিক থেকে তার পেটে হাত বুলাতেই খিল খিল করে হেসে উঠল চিত্রা। সে গায়ের জোরের ওকে ঠেলে সরিয়ে দিতে চেষ্টা করলো কিন্তু তবুও রূপক এমনভাবে তাকে ধরছিল যে বারবার তার হাসি চলে আসছিল। অনেক কষ্টে চিত্রা হাসি সংবরণ করে জিলাপি খেতে বসলো। জিলাপি খাওয়া প্রায় শেষ হয়েছে এমন সময় রুবিনা এসে বলল মা আপনারে ডাকতাছে।
চিত্রা মাথায় ঘোমটা টেনে দিল। হাতে এখনো অর্ধেক জিলাপি রয়ে গেছে তার। জিলাপি ফেলে রেখে সে শাশুড়ির ঘরে এলো।
বিছানার উপর মুখ গোমড়া করে বসে আছেন জোসনা। তার চোখে-মুখে রাজ্যের বিরক্তি। রাগে গমগম করছেন। চিত্রার ভীষণ ভয় হতে লাগলো।
জোসনা বললেন, তোমার কি লাজ শরম কিছু নাই? কিছু শিইখা আসো নাই? অবশ্য কেমনে শিখবা? মা নাই। বাপ একটা পাগলা। কে শিখাইবো তোমারে এসব নিয়ম কানুন? এত রাইতে যে তোমরা এমন বেসরমের মত হাসতাছো পাড়ার লোকে কি কইবো? মানসের কাছে শরমে মুখ দেখতে পারুম না। এত কিসের হাসি। রঙ্গ-তামাশা করবা ভালা কতা। পাড়ার লোকরে জানাইয়া করতে হইবো নাকি। আমাদের কি বিয়ে হয় নাই? আমরাও তোমাদের মত সময় পার কইরা আইছি। এত বেশরম আছিলাম না।

চিত্রা মাথা নিচু করে রইল। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেছে। বিষন্নতার ভাড় এ শাড়ির আঁচল আলগা হয়ে যাচ্ছিল মাথা থেকে। আঁচল ধরে রাখার মতো শক্তিটুকুও তার নেই। জোসনার কথাগুলো তার গায়ে কাঁটার মতো বিঁধ ছিল।
জোসনা বললেন, তোমার বাপের বাড়িত খবর পাঠাও। তিন-চার দিনের মধ্যে সাইকেলটা দিতে কও। এক মাস তো হইয়াই গেল। আমার পোলায় আর কত কষ্ট করবো। খালার বাড়িতে তো গেছ। দেখছো ঘরভর্তি কত জিনিসপত্র। এইগুলা সব মেয়েরা বাপের বাড়ি থাইকা আনছে। তোমার কাছে তো এত জিনিস চাই নাই বাপু। এত জিনিস চাইলেও তো পাইতাম না। আমরা তো জাইনা শুইনাই বিয়া দিছি। পোলার কপাল খারাপ। আমি আর কি কমু? পোলায় কয় আমি এই মাইয়ারে বিয়া করমু। এখন তোমার বাপেরে তাড়াতাড়ি সাইকেলটা দিতে কও। আইজ হইল সোমবার। শুক্কুরবার এর মধ্যে দিতে কইবা। কথাটা কানে ঢুকছে। নাকি আবার কমু?

খুব কঠোর গলায় জোসনা কথাটা বলে গেলেন। চিত্রার বুকে হাতুড়ি পেটার মতো শব্দ হচ্ছে। মনে হচ্ছে তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। জোৎস্না যখন তাদের ঘরে গিয়ে তাদেরকে অন্তরঙ্গ অবস্থায় দেখে ফেলেছেন তাই হয়তো তার মনে আগুন জ্বলছে। হোক সে মা কিংবা অন্য কেউ। কাউকে কাছাকাছি দেখলে হিংসা জেগে ওঠে। অন্যের প্রেম কেউ সহ্য করতে পারেনা। এখন জ্যোৎস্না খুব কঠোর গলায় চিত্রাকে যৌতুকের ব্যাপারে চাপ দিতে লাগলেন। চিত্রা মাথা নিচু করে ঘর থেকে বের হয়ে এলো। জিলিপি খাওয়ার পর হাত ধোয়া হয়নি। হাতে লেগে রয়েছে জিলাপির রস। কিন্তু এই মুহূর্তে হাত ধুতে ইচ্ছে করছে না। রান্নাঘরের পাশে একটা মোড়ার উপর ধপ করে বসে রইল চিত্রা। সে এখন কি করবে? সেদিন তার ভাই অনেক সুন্দর করে অনুরোধ করার পরও এখন ভাইয়ের কাছে কিছু চাইলে তার লজ্জা করবে। তারপরও অনেক চিন্তাভাবনা করে চিত্রা মনস্থির করল আগামীকাল সকালে একবার ওই বাড়ি থেকে ঘুরে আসবে।

অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে চিত্রা রান্না ঘরের দাওয়ায় বসে রইল। কিছুক্ষণ পর এসে দাঁড়ালো রূপক।
কিগো বউ তোমারে কখন থাইকা ডাকতাছি।
চিত্রা কোন উত্তর দিল না।
রূপক বলল, কথা কইতাছো না কেন?
চিত্রা তবুও নিশ্চুপ হয়ে রইল।
রুপক বলল, মেজাজটা খারাপ করতেছ কিন্তু। কি হইছে কইবা তো? মায় কিছু কইছে তোমারে?
চিত্রা নিরুত্তর। রূপক বসল তার সামনে। বেশ রাগী গলায় বলল, মন চাইতেছে একটা থাপ্পড় বসাইয়া দেই।
সঙ্গে সঙ্গে চিত্রা কান্না ভেজা গলায় বলল, দেন। কে নিষেধ করছে আপ্নারে?
রাগ সংবরণ করে নিল রূপক। মেজাজ ঠান্ডা করার চেষ্টা করে বলল, কি হইছে? কান্দো কেন?
চিত্রা কান্না ভেজা গলায় বলল, খুব কপাল কইরা জন্মাইছি তো তাই কানতেছি। আপনার সেইগুলা শোনা লাগবোনা। মেজাজ খারাপ হইয়া গেছে তাইনা। পিটাইতে মন চাইতাছে। পিডান আমারে।
চুপ করো বউ। মেজাজটা একটু খারাপ হইয়া গেছিল। তোমারে কখন থাইকা ডাকছি তুমি কোন উত্তর দিতেছ না। কতকিছু জিগাইতাছি তাও কিছু কইতাছো না। তাই মাথাটা গরম হইয়া গেছিলো। মায় কিছু কইছে তোমারে।
খুব তো হাসাহাসি করতে ছিলেন। এত কইরা মানা করলাম তাও শুনতে ছিলেন না। আপনার মায় খেইপা গেছে। আমাগো সুখ কারো সইতেছে না।
রূপক বলল, আস্তে কথা কও। এত জোরে কইও না।
কিছুই কমু না। কওনের দরকার নাই। সব মুখ বুইজা সইহ্য কইরা যামু।
রূপক কিছুক্ষন চুপ করে রইলো। সে খুব ভাল করেই জোসনার স্বভাব জানে। জ্যোৎস্না ভয়ঙ্কর রাগী মহিলা। ছোট ছোট ব্যাপারে তিনি অনেক রেগে যান। রেগে গেলে কাকে কি বলছেন মাথা ঠিক থাকেনা। নিশ্চয়ই চিত্রাকে খারাপ কিছু বলেছেন তিনি। রূপক চিত্রার হাতটা ধরে বলল রাগ কইরোনা বউ। আসো ঘরে আসো। কতদিন পর মনে হইতাছে তোমারে দেখতাছি। তোমারে একটু ভালো কইরা দেখমু। তোমার লগে একটু সুখ দুঃখের কথা কমু। এর মধ্যে তুমি মন খারাপ কইরা থাইকো না। তোমার মুখ আন্ধার দেখলে আমার কষ্ট হয়।

চিত্রা চুপ করে রইলো। তাকে হাত ধরে টেনে দাঁড় করালো রূপক। বলল, ঘরে চলো বৌ।
রূপকের পিছুপিছু চিত্রা ঘরে চলে এলো। এবার সে ঘরের দরজা বন্ধ করতে ভুল করল না। বিছানার ওপর পড়ে রয়েছে আধ খাওয়া জিলাপি। নিশ্চয়ই তার জন্য রেখে দিয়েছে রূপক। স্বামী তাকে অনেক ভালোবাসে। শত কষ্টের মধ্যে এটাই তার সৌভাগ্যের জায়গা।

রূপকের ফোন থেকে ফুফুর বাড়িতে একটা কল দিলো চিত্রা। তার ফুফুর সঙ্গে কথা বলে জানাল সাইকেল এর ব্যাপারে। সোহরাব উদ্দিনের সঙ্গে ফুপু যেন জরুরী কথা বলে। দু চার পয়সা যা পারে তাই দিয়েই সে যেন মেয়েকে সাইকেল কিনে দেয়ার ব্যাপারে তার ফুফাতো ভাইদেরকে সহায়তা করে। কথাগুলো বলে ফোন কেটে দিয়ে চিত্রা হাউমাউ করে কান্না চলে এলো। বালিশে মুখ গুঁজে কান্না চেপে রাখল সে।
রুপক বললো, এখনো তুমি কানতাছ। মায় কি তোমারে সাইকেল এর ব্যাপারে কিছু কইছে?
না,
তাইলে তুমি ফুফু আম্মারে কইলা?
কইলাম জানি আমার অশান্তি না হয়।
তোমারে কেউ অশান্তি দিব না। আমি কি তোমারে সাইকেলের কথা কিছু কইছি?

চিত্রা চুপ করে রইলো। স্বামীর কাছে শাশুড়ির দুর্নাম করতে চাইল না। তাই কথাটা হজম করে গেল সে।
এমন সময় রবিনা এসে দরজা ধাক্কা দিয়ে ডাকতে লাগলো, ভাইজান মা ভাত খাইতে ডাকতাছে।
চিত্রা বলল,আপনে যান। আমার আইজ খিদা নাই। আপনে খাইয়া লন।
রূপক হাত ধরে টানতে টানতে বলল, এত রাগ কইরা থাইকা লাভ নাই। উঠো আমার লগে ভাত খাইবা।

রূপকের টানাহেচড়ায় বাধ্য হয়ে উঠতে হলো চিত্রাকে। কিন্তু গলা দিয়ে ভাত নামল না। তিন চার দিনের ভিতরে কিভাবে সে সাইকেল জোগাড় করবে। তার বাপ-ভাই কেউই সেটা পারবে না। না পারলে নিশ্চয়ই সংসারে অনেক অশান্তি হবে। ভবিষ্যতের কথা ভেবে চিত্রা ভাত খেতে পারছিল না। অল্প একটু ভাত নিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করছিল সে।
জোসনা বললেন, কিসের ঢং শুরু করছো। খাইতাছো না কেন?
মাথা নিচু করে রইল চিত্রা।
জোসনা বললেন, কাউরে দেখি কিছু কওন যায়না। ভালো কথা কইলেও দোষ। আমি তোর বউরে খালি কইছি এত জোরে হাইসোনা। পাড়ার লোকে খারাপ কয়। তাতেই সে খাওন বন্ধ কইরা দিছে। জমিদারের বেটি হইছে। কিছু কওন যাইবো না।

চিত্রার গাল বেয়ে টপটপ করে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। সেই অশ্রু চোখের আড়াল হলোনা রূপকের। নিশ্চুপ হয়ে রইল রূপক। চিত্রার চোখের জল ভাতে মিশে যাচ্ছে।

চলবে..