#দ্বিতীয় পুরুষ
পর্ব ৯+১০
নীলাভ্র জহির
নার্গিসকে দেখে চিত্রার পুরো শরীর তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো। মনের সন্দেহটা আরো তীব্র হলো এবার। একবার রূপকের দিকে আরেকবার নার্গিসের দিকে তাকাল চিত্রা।
রূপক চিত্রাকে বলল, উনারে সালাম করো। উনি সম্পর্কে আমার চাচি হয়।
শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইলো চিত্রা। নার্গিসকে বিয়ে করলে এই মহিলা তার শাশুড়ী হতো। নিশ্চয়ই নার্গিস আর রুপক বিয়ের স্বপ্ন দেখেছিল। এই মহিলা হয়তো সবই জানেন। তাকে মোটেও সালাম করতে ইচ্ছে করলো না। অনিচ্ছাসত্ত্বেও চিত্রা উঠে এসে সালাম করলো মহিলাকে।
জোসনা হারিকেন নিয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এলেন। সেই আলোয় আলোকিত হয়ে উঠল চিত্রার মুখখানা। নার্গিসের মা চিত্রাকে ভালো করে লক্ষ করলেন। শুকনো মুখে হাসি টেনে এনে বললেন, মাশাআল্লাহ বউ তো অনেক সুন্দরী।
চিত্রা শক্ত মুখে দাঁড়িয়ে রইল। জোসনা মহিলাকে বললেন, ঘরের ভিতরে আইসো নাসিমা।
– ভিতরে আইজ আর যামু না। এক জায়গায় কামে গেছিলাম। নার্গিস কইলো চলো বউ দেইখা যাই।
চিত্রা বাঁকা চোখে একপলক নার্গিসকে দেখে নিল। এসময় নার্গিস এসে দাঁড়াল তার পাশে। হাসিমুখে বলল কেমন আছেন ভাবী?
গা জ্বলে গেল চিত্রার। আবার তাকে ভাবি বলে ডাকা হচ্ছে? সে আড়চোখে রূপক ও নার্গিসের চোখাচোখি খেয়াল করছিল। বেশ কয়েকবার যোগাযোগই হয়েছে তাদের। নিশ্চয়ই এর ভিতরে কিছু একটা আছে।
উত্তর না দিলে বিষয়টা খারাপ দেখায়। তাই চিত্রা বলল, জিবভালো আছি। আপনে কেমন আছেন?
ভালো।
কথাটা বলেই নার্গিস আবার রূপকের দিকে তাকালো। কষ্ট হচ্ছে চিত্রার। তার স্বামীর সঙ্গে কি এখনো নার্গিসের কোন সম্পর্ক আছে? এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারবে না। তার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। চিত্রা বলল, আমি একটু আসতেছি।
কথাটা বলেই ঘরে প্রবেশ করল সে। তার বুক ফেটে কান্না আসছে। প্রচন্ড রাগ হচ্ছে। রুপক ঘরে ঢুকে বলল, কি গো বউ চইলা আইলা ক্যান? তাদের লগে৷ কথা কও।
চিত্রা বাঁকা চোখে রূপকের দিকে তাকালো। কিন্তু অন্ধকারে তার অগ্নিদৃষ্টি রূপক দেখতে পেল না।
রূপক বলল, চাচিরে পানের খিলি বানাইয়া দেও।
রাগী মুখে উঠে গেল চিত্রা। তার শ্বাশুড়ীর পানের ডিব্বা থেকে সে খিলি পান বানিয়ে নার্গিসের মায়ের হাতে দিল।
সে মুহূর্তে জোসনা বললেন, খালি হাতে কেউ পান দেয়? পানের বাটা দেখো নাই? পিরিচে কইরা দিতে পারতা।
নার্গিসের মা বললেন, থাক সমস্যা নাই। আমরা কি আর মেহমান নাকি?
– সবকিছু তো শিখতে হইব। এরপর থাইকা কাউরে খালি হাতে পান দিবানা। পিরিচে কইরা পান-সুপারি সাজাইয়া তারপর দিবা। পান দেওনের আগে ভালো কইরা ধুইবা। দেখবা পানির মধ্যে কোন ময়লা আছে কিনা।
চিত্রা মাথা নিচু করে রইল। তার মুখটা কাউকে দেখাতে চায় না বলেই হয়তো লম্বা করে ঘোমটা টেনে দিল।
রূপক জিজ্ঞেস করল, কি অবস্থা নার্গিস ?
নার্গিস বলল, জি ভালো। আপনের কি অবস্থা?
– অবস্থা ভাল। ব্যবসাপাতি ভালো যাইতেছে না। ভাবতাছি দর্জিগিরি শিখমু।
– শিখেন । আমরা একটু কম টাকায় জামাকাপড় বানাইতে পারমু।
চিত্রার গা জ্বলে গেল কথাটা শুনে। নার্গিস নিশ্চয়ই রূপকের দোকানে জামা বানাতে দিতে যাবে। তখন জামার মাপ নেয়ার উসিলায় নার্গিসের গায়ে হাত দিবে রূপক। বিভিন্ন জায়গায় ফিতা ধরে বিভিন্ন অংশের মাপ নিবে। সেই দৃশ্যটা কল্পনা করেই ওর গায়ে আগুন লেগে গেল।
চিত্রা বলল, আজ আমার খুব মাথা ব্যাথা করতাছে আম্মা । আমি একটু ঘরে গিয়া শুইয়া থাকি?
– মাথাব্যথা কেন করব? সব চিন্তা তো আমার পোলার। তুমি তো আরামে খাওয়া-দাও আর ঘুমাও। তোমার কি জন্য মাথা ব্যথা করব?
নার্গিসের মা বললেন, জোসনা বউয়ের লগে এমন কেন করো? মাইয়াডা তো ভালো। খুব লক্ষ্মী মনে হইতাছে।
– হ লক্ষীই তো। বিয়া হইলো, ব্যবসা-বাণিজ্যর ব্যাবাগ খারাপ হইয়া গেল।
জোসনার কথাগুলো বরাবরই বিষের কাটার মত চিত্রার গায়ে বিঁধে। তার মায়ের কথা বলার ধরণ এরকম বলেই হয়তো রূপক বিয়ের রাতে তাকে সচেতন করে দিয়েছিল। সেই সঙ্গে ওয়াদা করে নিয়েছে যেন তার মাকে সে কখনও আঘাত দিয়ে কিছু না বলে।
জোসনা বললেন , তুমি দাঁড়াই আছো ক্যান? বসো এইখানে?
বারান্দায় পার্টির উপর বসে পড়লেন নার্গিসের মা। চিত্রা দাঁড়িয়ে আছে বারান্দার নিচে। চিত্রাকে ইশারায় বসতে বললেন তিনি। রূপক বসে আছে পাটিতে। তার দৃষ্টি তখন নার্গিসের দিকে। চিত্রার ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে। সে হঠাৎ রূপককে বলল, আমার ভাইয়ে কল দিছে?
না তো।
কল দেয়ার কথা ছিল। জানাইছে কিছু?
না,
জোসনা ধান ঘরে তোলার ব্যাপারে নার্গিসের মায়ের সঙ্গে গল্পগুজব করছিলেন। এরই ফাঁকে একবার নার্গিস তার মাকে তাগাদা দিলেও বাড়ি ফেরার জন্য। চিত্রা মনে মনে বলল, বাড়ি ফেরার কি দরকার? এখানে থাকতে তো বড়ই ভালো লাগতাছে মনে হইতাছে।
নার্গিসের মা উঠলেন। চিত্রার হাত ধরে বললেন, থাকো জাইগা। আমাগো বাড়িতে আইসো।
নার্গিস নিজেও চিত্রাকে বলল, আইসেন ভাবি।
ভদ্রতার খাতিরে চিত্রা মাথা নাড়িয়ে ম্লান হাসলো। বলল, আপনারাও আবার আইসেন।
কিন্তু মনে মনে সে তখন বলছে, আর জীবনেও যেন আপনার মুখ দেখতে না হয়। তার স্বামীর পুরনো প্রেমিকাকে দ্বিতীয়বার দেখার কোন ইচ্ছাই তার নেই।
নার্গিস ও তার মা বেরিয়ে গেলে চিত্রা উঠে পড়ল ঘরে ঢোকার জন্য। ঘরে আসার পরে শুনতে পেল জোসনা বেগম বললেন, একই গ্রামে থাকি। ওদেরকে তো আসতে মানা করতে পারি না। তোর সাথে নার্গিসের দেখা হইলে কইবি আমাগো বাড়িতে যেন আর না আসে। ঘরে নতুন বউ। বউ কিছু জানতে পারলে কষ্ট পাইব। সংসারে অশান্তি হইবো।
রূপক কোন উত্তর দিল না। এই প্রথম জোসনা বেগমের প্রতি এক ধরনের সম্মান জাগ্রত হল চিত্রার। ভালবাসতে ইচ্ছে করলো শাশুড়ি মাকে। তার শ্বাশুড়ীর কড়া মেজাজ হলেও মনটা অনেক ভালো মনে হচ্ছে। চিত্রা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল মনে মনে।
রূপক ঘরে এসে দেখল চিত্রা বিছানায় শুয়ে আছে । পুরো ঘর অন্ধকার । রূপক চিত্রার পাশে শুয়ে বলল, ছবি দেখবা বউ। আসো একলগে ছবি দেখি।
চিত্রা চোখ বুজে আছে। কথা বলার মত এখন মেজাজ নেই। রুপক তার বউয়ের বাহুতে হাত রেখে বলল, কি হইছে তোমার?
চিত্রা বলল, কিছুই হয় নাই।
তোমার নাকি মাথাব্যথা করতাছে। খাড়াও তোমারে বাম আইনা দেই।
চিত্রা অভিমানী গলায় বলল, বামে তো মাথা ব্যথা দূর হয়। বুকের ব্যথা দূর হয় কেমনে?
রূপক খিলখিল করে হাসতে হাসতে চিত্রাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল বুকের ব্যথার মলম তো আমি। আসো মালিশ কইরা দেই।
দেন।
রূপক আস্তে করে চিত্রার বুকে হাত রাখল। শিরশির করে উঠল চিত্রার শরীর। সে বলল, কি করতাছেন আপনে!
বুকের ব্যথা দূর কইরা দিতাছি।
আপনেরে কইলাম মাথা ব্যথা দূর কইরা দিতে। বুকের যেইখানে ব্যথা করতাছে ওইখানে আপনার হাত যাইবো না।
কি কও? আমি নিভাইতে পারুমনা এমন কোনো ব্যথা আছে তোমার?
থাকবো না কেন? নিজে নিজে ভাইবা দেখেন তো আমি কেমনে কষ্ট পাইতে পারি?
রূপক কিছুক্ষণ ভেবে গম্ভীর হয়ে রইল। কেবল দুইজনের নিশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ শোনা গেল না।
অনেকক্ষণ পর রূপক নিজে থেকে বলল, তোমার মনে অশান্তি কার জন্য? কেউ তোমারে কিছু কইছে?
কিছুক্ষণ চুপ থেকে চিত্রা উত্তর দিল, হ কইছে।
কে কি কইছে? আমারে খুইল্লা কও তো।
চিত্রা কথায় কথায় বলে ফেলল, সীমা কইছে আমারে।
খুব সম্ভবত এতক্ষণে আসল ব্যাপারটা রূপক আন্দাজ করতে পারল। গম্ভীর হয়ে গেল সে। অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলল না। চিত্রা বলল, সীমা আমারে কি এমন কইতে পারে আপনি কন দেহি। আমি তো নতুন বউ। আপনারে ছাড়া আমার শাশুড়িরে ছাড়া আর কাউকে চিনি না। আপনের এলাকার একটা মাইয়া কি এমন আমারে কইতে পারে।
রূপক একটা নিশ্বাস ফেলে বলল, আমি বুঝছি বউ। আর কইতে হইবো না।
চিত্রা কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল, তাইলে আপনে কন আমার বুকের ব্যাথা আপনি দূর করতে পারবেন কিনা?
– আগে খোলাখুলি কও তো সীমা তোমারে কি কি কইছে?
– কইছে আপ্নেরে আঁচলে বাইন্ধা রাখতে। একটু নজর রাখতে কইছে।
রূপক বিষন্ন হয়ে গেল। চিত্রা খুব ভালো ও হাসিখুশি একটা মেয়ে। প্রথম দিন থেকেই চিত্রা চেষ্টা করছে তার স্বামীকে যথাসাধ্য খুশি রাখতে। অথচ একটা মেয়ে এসে তার সংসারে অশান্তির ঘি ঢেলে দিয়ে গেছে। একজন নতুন স্ত্রীকে কেউ যদি তার স্বামীকে চোখে চোখে রাখতে বলে তাহলে সেই স্ত্রী স্বামীকে সন্দেহ করবে এটাই স্বাভাবিক।
রূপক মুচকি হেসে বললো, মন খারাপ কইরোনা। মাইয়া মানুষরা একটু বেশি চিন্তা করে। সেই জন্য তোমার একটু সতর্ক কইরা গেছে ।
চিত্রা একটা দীর্ঘশ্বাস গোপন করে বলল, তাইলে তো হইতোই । আপনি কি ভাবছেন নার্গিসের লগে আপনার সম্পর্কের কথা আমি শুনি নাই?
এতক্ষণে নড়েচড়ে উঠলো রূপক । চিত্রার কানে তাহলে এই কথাটাও চলে গেছে? চিত্রার দুঃখের যৌক্তিকতা বুঝতে পেরে বলল, তোমারে সবকিছু খুইলা কই। আগে কও তুমি আমাকে ভুল বুঝবা না তো?
– আপনি যা বুঝাইবেন তাই বুঝবো।
– এগুলা কেমন কথা বউ? আমি ছেলেটা কিন্তু খারাপ না।
– আমিও তো তাই জানি। তো আমারে এমনে কইয়া গেল কেন?
– আমার নার্গিসের লগে রিলেশন আছিল। বেশি দিনের না। আমি ওরে পছন্দ করতাম। সেও আমারে পছন্দ করত। আস্তে আস্তে একটু রিলেশন হইছিল আর কি। তেমন কেউ জানে না। সীমা, রুবিনারা জানতো। কিন্তু সীমা যে এই কথা তোমার কানে আইসা লাগাইয়া দিয়া যাইবো সেইটা কেমনে কই?
আম্মা জানত না?
আম্মারে কইছিলাম যে আমি নার্গিস রে বিয়া করতে চাই। আমার আব্বা আম্মা কেউ রাজি ছিল না। তারপর থাইকা আস্তে আস্তে নার্গিসের লগে আমার লাইনটা কাইটা গেছে।
– সত্য কইতাছেন? লাইন কাইটা গেছে?
– হ, তোমারে ছুইয়া কইতাছি।
চিত্রার শরীর ছুঁয়ে কথাটা বলল রূপক। এতক্ষণে খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল চিত্রা। সে বলল, তার লগে এখন আপনার যোগাযোগ নাই?
– না, মাঝেমধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হইলে একটু কথাবার্তা কই। সাধারণ কথাবার্তা। যেহেতু আমাগো রিলেশনের কথা কেউ জানতো না তাই কাউরে কিছু বুঝতে দেইনা।
নার্গিসরে যখন ভুইলা গেছেন আপনার কষ্ট হয় নাই?
সেতো মেলা আগের কথা। ওর লগে কথাবার্তা বন্ধ হইছে মেলা দিন আগে। কষ্ট একটু হইছিল। কিন্তু কিছু করার নাই।
কাল রাইতে আপনারে কে ফোন দিছিল?
সদর থাইকা মাহাজন কল দিছিলো।
সত্য কইতাছেন?
হ, তুমি কি আমার বিশ্বাস করো না? মাহাজন কল দিছিলো। জরুরী আলাপ।
তাইলে আপনি রাইতে বাইরে গিয়া কথা কইলেন ক্যান?
ওরে আমার বউরে।
শব্দ করে হেসে উঠলো রুপক। তার হাসির সঙ্গে চৌকি কাঁপতে লাগলো। এতটা উচ্চশব্দে সে হাসছে।
চিত্রা ভয়ভয় গলায় বলল, আস্তে হাসেন। জোরে হাসলে আব্বা আম্মা রাগ করে। আপনি তো বাড়িতে থাকেন না, আমার লগে চিল্লাচিল্লি করে।
রূপক বলল, কেমনে আস্তে হাসমু কও। আমার হাবাগোবা বউটা যে আমারে এত সন্দেহ কইরা বইসা রইছে শুনলে তো হাসি পাইবোই। জরুরি আলাপ ছিল। আরে ঘরের মধ্যে কল দিলে নেটওয়ার্কে সমস্যা করে। কথা ভালোমতো বুঝা যায় না। এইজন্যে ঘরের বাইরে গিয়া কথা কইছি। উঠান থাইকা ভালো নেটওয়ার্ক পায়। তুমি কি ভাবছো আমি নার্গিসের লগে কথা কইছি? হাহাহা।
শব্দ করে হাসতে লাগল রূপক। ভীষণ লজ্জা পেল চিত্রা। এর আগে কখনো এতটা লজ্জায় পড়তে হয়নি তাকে। এই অন্ধকারেও লজ্জায় কোথায় মুখ লুকাবে বুঝতে না পেরে চিত্রা চুপ করে রইল।
রুপক বলল, আমি তোমার স্বামী। ভালো মন্দ কিছু শুনলে তুমি সবার আগে আমারে কইবা। তুমি কেন মানুষের কথায় কান দাও? কেউ যদি আইসা তোমারে কয় রূপকের আর একটা বউ আছে দুইটা বাচ্চা আছে তুমি কি বিশ্বাস করবা?
না, আপনি ওইরকম মানুষই না।
আমি যদি ঐরকম মানুষ নাই হই তাইলে ঘরে বউ রাইখা আরেকজনের লগে আমি পিরিত করমু?
কথার যুক্তিতে চিত্রা লজ্জা পেয়ে গেল। সত্যি তো তাই। তার স্বামী বড় ভালো মানুষ। তাকে খুশি রাখতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে ছেলেটা। মিছেমিছি রূপককে ভুল বোঝা তার উচিত হয়নি। চিত্রা লজ্জা পাওয়া গলায় বলল, আমার ভুল হইছে। আপনি আমারে মাফ কইরা দেন।
ঠিক আছে বউ। মাফ কইরা দিলাম। কিন্তু এর পরেও যেন আর কোনদিন আমারে ভুল বুইঝা মুখ আন্ধার কইরা থাকতে না দেখি।
দেখবেন না।
হইছে । এখন আসো ছবি দেখি।
চিত্রা রূপকের কাছাকাছি চলে এলো। একই বালিশে মাথা রেখে রূপকের মোবাইলের স্ক্রিনে তাকালো সে। আজ কেবল মাত্র সন্ধ্যা পেরিয়েছে। সিনেমা দেখার যথেষ্ট সময় পাওয়া যাবে আজকে। সেদিনের মত আর ভোররাত হয়ে যাবে না।
কিন্তু সেগুড়ে বালি। খানিক বাদেই চিত্রার শশুর বাড়ি ফিরলেন। মাছ নিয়ে ফিরেছেন তিনি। মাঝারি আকারের বেশ কয়েকটা সিলভার কার্প মাছ। রূপক চিত্রাকে অনুরোধে সুরে বলল, বৌ মাছটা তুমি কাটো গিয়া। আম্মারে কাটতে কইও না।
আচ্ছা, যাইতাছি।
অন্ধকার রান্নাঘরের পাশে কুপির আলোয় বসে মাছ করতে শুরু করলো চিত্রা। এত রাতে এই মৃদু আলোয় মাছ কাটতে তাকে বেশ বেগ পেতে হল। পিচ্ছিল মাছগুলোকে ছাইয়ের সঙ্গে ঘষে ঘষে তারপর কাটতে হচ্ছে। তবুও শঙ্কা হাতের নখ যেন কেটে না যায়। কারণ কাটা হাত নিয়ে সংসারের কাজকর্ম করাটা খুব কষ্টদায়ক। নতুন বিয়ে হয়েছে তার। এখন আঙ্গুল কেটে ফেলে কাজকর্ম না করে বসে থাকলে শাশুড়ি মা নানান কথা বলবেন।
চিত্রা খুব সচেতনভাবে মাছ কেটে যাচ্ছে। রূপক একটা মোড়া নিয়ে তার পাশে বসলো। সমস্ত ক্লান্তি এক নিমেষেই দূর হয়ে গেল তার। এমনিতেই এখন তার ভীষন ভালো লাগছিল। মনটা অনেক ফুরফুরে ছিল। রূপক সবকিছু পরিষ্কার করে দেয়ায় আনন্দ নিয়ে সে মাছ কাটতে বসেছিল। কিন্তু অন্ধকারে মৃদু আলোয় মাছকাটা মোটামুটি কষ্টের কাজ। রূপক পাশে এসে বসায় সেই কষ্টটা যেন মুহূর্তেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল।
রূপক বলল, তুমি হাতে কাচের চুড়ি দেও না কেন? ঝনঝন কইরা বাজবো।
খালি ঝনঝন করলেই তো হইবো না। সংসারে অনেক কাম করতে হয়।
সংসারে থাকলে তো কাম করতে হইবোই। মানুষ হইয়া জন্ম হইলে কাম করতেই হইব। গরু-ছাগলের তো কোন কাম নাই।
চিত্রা হাসতে হাসতে বললো, আমরা গরু ছাগল হইলে কি ভালো হইত?
না, খুব খারাপ হইত। তখন আমি একা একা তোমারে আদর সোহাগ করতে পারতাম না। আরো অনেক গরু করত।
চিত্রা জিব্বায় কামড় দিয়ে বলল, ছি ছি খারাপ কথা কন কেন? আপনি এমন ক্যান?
শব্দ করে হেসে উঠল রূপক। চিত্রা একটা মাছ দিয়ে রূপকের দিকে মাইর দিয়ে মৃদু হাসি দিয়ে বলল, হাইসেন না। আব্বা বাড়িতে আছে।
আচ্ছা, ঠিক আছে। হাসলাম না। এখন তাইলে বইয়া বইয়া কান্দি।
না, কাইন্দেন না। কানলে আপনার আব্বা আম্মা কইবো আমি জানিনা কি করছি?
করছো তো। মাছ দিয়া মাইর দিছ।
আপনে এমন ক্যান?
রূপক হাসতে শুরু করল। চিত্রা চোখ রাঙালে হাসতে হাসতে নিজের মুখ নিজে টিপে ধরল রূপক। তারপর বললো হইছে আর শব্দ কইরা হাসুম না। হাসি হজম কইরা ফেলমু। তারপর সারারাত ঠাস ঠাস কইরা পাদ দিমু।
চিত্রা হাসতে হাসতে বলল, আপনে ঘরে যানতো। খালি শয়তানি করেন আমার লগে।
তোমার লগে করুম না তো কার লগে করুম। আমার দশটা না পাঁচটা না একটা মাত্র বউ।
মানুষের কি দশটা বউ হয়?
কতজনের হয়। সবাই কি আর আমার মত ভাল হয়?
হইছে হইছে নিজের গুণগান নিজেরে গাইতে হইব না। আপনি এখন এখান থাইকা যান। আমারে কাম করতে দেন।
আমি কি তোমারে ধইরা রাখছি?
চিত্রা কোন উত্তর দিল না। এই মানুষটা এরকমই। হাসি রসিকতা সোহাগ ভালবাসায় ভরিয়ে রেখেছে। বিধাতা যেন এই সুখ সারাজীবন তার কপালে রাখেন। সে বড় সুখী স্ত্রী। এমন সৌভাগ্যবতী কয়জন নারী হতে পারে! ভাবল চিত্রা।
চিত্রা এখন নতুন বউ। তাই আত্মীয়-স্বজন সবার বাড়ি থেকে তার দাওয়াত আসছে। আজকে সে রূপকের বড় খালার বাড়িতে দাওয়াত খেতে যাবে। সকালবেলা খাওয়া দাওয়া সেরে গোসল করে খুব সুন্দর একটা শাড়ী পড়ল চিত্রা। এই শাড়িটা সে বিয়েতে পেয়েছিল তবে কখনো পড়া হয়নি। রূপক তাকে গত রাতেই বলেছে বউ তোমার নীল শাড়ীটা পিন্দো। শাড়ির সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজ ছিলনা তাই চিত্রা রূপককে জানিয়েছিল কথাটা। রূপক গতরাতে তার জন্য নীল রঙের ব্লাউজ পিস এনেছিল। সেই রাতেই স্বামীর সঙ্গে পাশের বাড়িতে গিয়ে এক মহিলাকে ব্লাউজ বানাতে দিয়েছিল চিত্রা। এক রাতেই মহিলা ব্লাউজ তৈরি করে দিয়েছে তাকে। একটু আগেই মহিলা ব্লাউজ দিয়ে গেছে। সেটা পরে এখন রানীর মত করে সাজবে সে। সে কোন রাজার রানী নয় সত্যি। তবে রূপক তো তার কাছে একজন রাজা। সে রূপকের রাজ্যের রানী ।
আজকে রূপক দোকানে গেল না। ভাত খেয়ে গোসল করার পর সে নিজেও তার সুন্দর একটা শার্ট পরে নিল। বিয়ে উপলক্ষে শার্ট টা বানিয়েছিল যত্ন করে। ভেবে রেখেছিল বউয়ের সঙ্গে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার সময় এই শার্টটা পরবে।
চিত্রা সুন্দর করে চুল বেঁধে মুখে একটু পাউডার লাগাচ্ছিল। রূপক এসে বলল, বউ তোমার ত্যালডা দাও তো।
চিত্রা বিয়েতে পেয়েছে একটা বড় নারিকেল তেলের বোতল। বোতলটা এগিয়ে দিল রূপকের দিকে। রূপক হাতের তালুতে তেল নিয়ে মাথায় মেসেজ করল। গোসলের পর মাথায় তেল দেয়াটা তার অভ্যাস। বেশিরভাগ সময়ই তার মাথাতে তেল জবজব করে। তৈলাক্ত হাত মুখে ডলতেই চিত্রা চেঁচিয়ে উঠল, আপনি এটা কি করতাছেন?
কেন বউ?
মুখে কেউ ত্যাল দেয়? মুখটা কালা হইয়া গেল।
তাইলে মুখে কি দেয়?
আপনি দেখি কিছুই জানেন না। মুখের স্নো লাগায়।
আমিও ছোনো লাগাবো?
হ, আমার এইখান থাইকা একটা ছোনো লাগান মুখে। একটু পাউডার দিয়া দিই আসেন।
রূপক শার্টের বোতাম খুলে হাত উচু করে তার বগলের নিচ এগিয়ে দিল পাউডার লাগানোর জন্য। চিত্রা রূপকের গলা ও বগলের নিচে পাউডার মাখিয়ে দিল। সাদা রংয়ের ধবধবে পাউডারে কাল শরীরটা একদম একাকার হয়ে গেল। রূপকের বুকের দিকে তাকালে চিত্রের শরীর কেমন টনটন করে ওঠে। চিত্রা নিজের চিরুনি দিয়ে রূপকের মাথাটা ব্রাশ করে দিল।
শার্টের বোতাম লাগাতে লাগাতে রূপক বললো, আপনেরে একটা কথা কইতাম।
কও।
এখন ছেলেদের কিরিম পাওয়া যায়। আপনি একটা কিইনা আইনেন।
কেন আমি কি এমনিতে কম সুন্দর?
না, তাও। আপনি তো আল্লাহ দিলে অনেক সুন্দর। তাও কইলাম আরকি।
আইচ্ছা বউ ঠিক আছে।
চিত্রার ব্লাউজের উপর দিয়ে তার বুকের ওপরের অংশ বের হয়ে আছে। রূপকের দৃষ্টি সেখানে চলে গেল। সেখানে চোখ রেখে মিটমিট করে হাসতে লাগলো রূপক। চিত্রার ভরা যৌবন। সতেজ সৌন্দর্য্যে ভরপুর হয়ে আছে তার শরীর। রূপকের বড় ভালো লাগে তার বউকে দেখতে। বউয়ের দিকে তাকালেই তার শরীরে একধরনের জোয়ার আসে। নিজেকে তখন তাগড়া জোয়ান মনে হয়।
চিত্রার সাজগোজ শেষ হলে রূপক বলল তোমারে আইজ সুন্দর লাগতাছে। তুমি সবসময় এমন সাইজা গুইজা থাকবার পারো না?
লজ্জায় রক্তিম হয়ে ওঠে চিত্রার গাল। মাথার ঘোমটা দ্রুত সামনে টেনে দিলো। রূপক তার ঘোমটাটা পিছন দিকে সরিয়ে দিয়ে বলে, নিজেরে ঢাইকা রাখছো কেন? আমার একটু দেখবার দাও।
চিত্রার আরো লজ্জা লাগে। মুচকি মুচকি হাসি লেগে রইল চিত্রার ঠোঁটে। একটা অটো রিক্সা নিয়ে তারা দুজনে বেরিয়ে পড়ল খালার বাড়িতে যাওয়ার উদ্দেশ্যে। চিত্রাকে সেখানে দুটো দিন থাকতে হবে। দোকান রেখে রূপক থাকতে পারবে না। তাই চিত্রার শুধু নিজের জন্য দুটো শাড়ি ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ব্যাগে করে নিয়ে নিয়েছে।
মতির দোকানের সামনের রিকশা দাঁড় করালো রূপক। খালার বাড়িতে যাচ্ছে সে। এক কেজি জিলাপি নিয়ে যেতে হবে। রূপক জিলাপি কেনার ফাঁকে দৌড়ে এসে চিত্রা কে বলল, বউ তুমি জিলাপি খাইবা?
চিত্রা দুদিকে মাথা নাড়লো, না খামুনা।
সেদিন কইছিলা খাইবা। মাত্র গরম গরম জিলাপি ভাজছে। তোমারে দুইটা আইনা দেই খাও।
আরে না লাগবো না। আমরাতো জিলাপি লগে নিয়া যাইতেছি। ওইখানে গেলে ওরা খাইতে দিবো।
যদি না দেয়? তুমি এইখানে দুইটা খাইয়া লও।
ধুর আপনি যে কি কন? এ রাস্তার মধ্যে গাড়ি খাড়া করাইয়া আমি জিলাপি খামু।
আচ্ছা, ঠিক আছে। তাইলে বেশি কইরা নেই।
খালি জিলাপি নিয়া যাওয়া যাইবো না। এক কেজি আপেল না নিলে কেমন দেখায়? আপনে জিলাপি এক কেজিই নেন। বেশি নেওয়া লাগবো না।
আচ্ছা, বউ।
রূপক রাস্তা পেরিয়ে দৌড়ে গিয়ে মতির দোকান থেকে গরম গরম এক কেজি জিলাপি প্যাকেটে তুলে নিল। আবারো দৌড়ে এসে রিক্সায় উঠল সে। জিলাপির প্যাকেটটা রাখলও বউয়ের কাপড়ের ব্যাগের ভেতর।
চিত্রা লজ্জায় মুখ লাল টকটকে করে রেখেছে। রুপক তার প্রতি যে ভালোবাসা গুলো দেখায় সেগুলো ভালো লাগে তার। নিজের সৌভাগ্যকে এখনো তার খুব ঈর্ষা হচ্ছে।
ফলমূলের দোকানে দাঁড়িয়ে রূপক এক কেজি আপেল কিনল। বড় বড় দুই প্যাকেট বিস্কুট এক প্যাকেট চানাচুর ও কিনলো। তার খালাতো ভাইয়ের দুটো বাচ্চা আছে। বাচ্চাদের জন্য চকলেট কিনে নিল রূপক। চিত্রা রূপকের এত কিছু কেনা দেখে মুগ্ধ হলো। তার স্বামীর দিলটা অনেক বড়। এই মানুষটাকে সে তাই অনেক সম্মান করে।
বড় খালার পাকা বাড়ি। তিন ছেলে ও ছেলের বউ নাতিপুতি নিয়ে তার সুখের সংসার। উঠানে রিকশা এসে দাঁড়াতেই তারা দৌড়ে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলেন। বাচ্চা-কাচ্চারা হইচই করতে লাগলো। শুরু হলো নতুন বউকে বরণ করার তোড়জোড়। চিত্রা রিকশা থেকে নেমে খালা খালুকে সালাম জানায়। খালাতো ভাইয়ের বউ রা এসে সসম্মানে চিত্রাকে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেল। সবার সঙ্গে বিয়ের দিনই পরিচয় হয়েছিল চিত্রার। তাই আজ কথা বলতে খুব একটা অসুবিধায় পড়তে হলো না।
খালার বড় বউ তার ঘরে বসতে দিলে ওদের। খোলা দরজার বাইরে কিছু মহিলা এসে দাঁড়িয়েছে নতুন বউকে দেখতে। ছোট ছোট বাচ্চা কাচ্চারা চিত্রার আশে পাশে এসে ভিড় করছে। তাদের সবাইকে এড়িয়ে গিয়ে কেবলমাত্র চিত্রা ও রূপককে দুই গ্লাস শরবত দেয়া হলো। সবার সামনে শরবত খেতে চিত্রার লজ্জা লাগছিল। কিন্তু কিছু করার নেই। তারা অতিথি বলে তাদের বরণ করতেই শুধু দুইজনকে শরবত দেয়া হয়েছে। রূপক তার নিজের গ্লাসের শরবত ঢকঢক করে খেয়ে নিল। খাওয়া শেষে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলল, শরবত টা ভালো হইছে। খাও বউ।
রূপকের কথা শুনে তার খালাতো ভাইয়ের বউ ফোড়ন কেটে বললেন, দেখছো বউয়ের জন্য পিরিতি দেখছো।
বউ দেখতে আসা মহিলারা হেসে ফেললেন। অনেকেই বউ দেখে তখন চলে যাওয়া শুরু করেছেন। কারণ মেহমানকে এখন নাস্তা দেয়া হবে। রুপকের ভাবি সবাইকে থাকতে বলছিলেন নাস্তা খেয়ে যাওয়ার জন্য।
বড় ট্রেতে করে বিস্কুট, চানাচুর, আপেল, জিলাপি ও পেয়ারা খেতে দেয়া হলো।
নাস্তা খাওয়ার পর চিত্রা বাইরে রান্নাঘরের পাশে এসে বসলো। আদা রসুন বাটার ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে। বাড়িতে মেহমান এলে একসঙ্গে অনেকগুলো আদা রসুন পেঁয়াজ কাটা হয়। মসলা বাটাবাটির এই সুঘ্রাণ চিত্রার খুবই ভালো লাগে। বড় খালা একটা পাতিলে করে মুরগির মাংস ধুচ্ছেন। অন্য একটা গামলায় লাল টকটকে গরুর মাংস। কিছুক্ষণ আগে মাছ ভাজি হয়েছে। মাছ ভাজার ঘ্রাণ পাওয়া যাচ্ছে।
দুইটা চুলার একটা চুলায় খালা করাইতে তেল তুলে দিয়েছেন। তেল গরম হয়ে ধোয়া উঠতেই সেখানে ছেড়ে দিলেন পিঠা। নারিকেলের পুলি পিঠা। অন্য একটা পিঠা তৈরি করছেন ভাবীরা। পিঠা গুলো ভাজা হতেই একটা পিরিচে করে ঘরে রূপককে দিয়ে আসা হলো। রুপক বিছানায় শুয়ে তার মোবাইলের ছবি দেখছে। মচমচে পিঠা গুলো দেখে খুশি হয়ে উঠল রূপক।
খালা বললেন মা তুমি ঘরে যাও। পিঠা খাইয়া লও।
সমস্যা নাই খালা। আমি পরে খাব।
পরে কি খাইবা? একলগে খাইয়া লও। আমি আরো ভাইজা পাঠাইয়া দিতাছি। ঘরে যাও গা।
সমস্যা নাই তো খালা। আপনেরা আছেন। ভাবির আছে। আমি আপনের লগে খামু।
চিত্রার বড় ভাবী বললেন, আমরা তো আর মেহমান না।
চিত্রা সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল আমারে মেহমান বানায়া দিয়েন না ভাবি। মনে করেন আমিও আপনেদের বাড়ির মানুষ।
ও তাই আর মনে করলে হইল। প্রথমবার আইসেন আমাগো বাড়িতে। যান ভাবি আপনি নাস্তা খাইয়া লন।
এখুনি তো নাস্তা খাইছি।
পিঠা গুলা গরম গরম খাইতে ভালো লাগবো।
খালা আরো এক বাটি পিঠা চুলা থেকে নামিয়ে দিলেন। সেগুলো চিত্রার হাতে দিয়ে বললেন, ঘরে যাও।
এবার আর চিত্রা মানা করতে পারলো না। নতুন শাড়ির আচল বারবার মাথা থেকে পড়ে যাচ্ছিল। এভাবে শাড়ির আঁচল টেনে ধরে রাখল সে। রূপক তাকে দেখে খুশি খুশি গলায় বললো, তুমি আইসো। একলা খাইতে মন চাইতাছে না।
হইছে। কইতে হইবো না। ভাবীরা আমারে শরম দিতাছে।
আমার বউরে খাইতে কইসি। মানসের বউরে খাইতে কই নাই।
চিত্রা মাথায় ঘোমটা টেনে দিয়ে চৌকির উপর এসে বসলো। গরম গরম পিঠা খেতে শুরু করল। পিঠা গুলো খুবই মজা হয়েছে। লবণ একটু বেশি লাগলেও খেতে খুবই সুস্বাদু।
হঠাৎ গত সন্ধ্যার কথা মনে পড়ল চিত্রার। খাওয়া বন্ধ হয়ে গেল। রূপকের সব আত্মীয় স্বজন তাকে দাওয়াত দিচ্ছে। গতকালও একজন এসেছিলেন চিত্রাকে নিয়ে যেতে। রূপকের মা বলেছেন অন্য একদিন যাবে, যাওয়ার দিন শেষ হয়নি। কিন্তু তখনই কঠিন একটা কথা বলেছিলেন তিনি, বিয়ের এক মাস প্রায় হইয়া গেক। বিয়ের পরের দিন সেই যে একবার নাইওর নিয়ে গেল এরপর আর কোনদিনও দাওয়াত দিল না । আমার পোলাটার কপালটাই এমন খারাপ শ্বশুরবাড়িতে একবেলা কারো ঘরে দাওয়াত খাওয়ার সৌভাগ্য তার হয় নাই।
শাশুড়ির মুখের কাটা কাটা কথাগুলো শুনে চিত্রার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গিয়েছিল।
সে বলেছে, মা আপনি মন খারাপ কইরেন না। আমার তো সেরকম কোনো আত্মীয়-স্বজন নাই।
হ, আমার চেয়ে পোলাডার কপাল খারাপ। অন্য জায়গায় বিয়া দিলে কত দাওয়াত পাই তো। খালি কি দাওয়াত কত আদরও পাইত।
চিত্রা তখন খুব বলতে ইচ্ছে করছিল তাহলে অন্য কোথাও বিয়ে দিতেন। কিন্তু সেটা বললে শাশুড়ি নিশ্চয়ই অনেক রেগে যাবে। তাই সে আর কোন কথা না বলে চুপ করে রইলো।
মহিলা তখন বললেন পোলাডা আমার জীবনে শশুরের বাড়ির দাওয়াত পাবো না। জৈষ্ঠ মাসে আম কাঁঠাল খাইতে পারবো না। শ্বাশুড়ীর হাতের পিঠা পুলি খাইতে পারবো না। এমন কপাল কইরা জন্মাইছে।
চিত্রা কোন কথার উত্তর দেয়নি। চুপচাপ শুনেছে সবকিছু। এসব কথা শোনার পর তার নিজেরও আজকে খালার বাড়িতে যাওয়ার কোনো মন মানসিকতা ছিল না। কিন্তু গতরাতে রূপক তার জন্য ব্লাউজ পিস নিয়ে এসে তার হাতে দিয়ে বলেছে কালকে খালার বাড়ি যাইতে হইবো। তুমি খুব সুন্দর কইরা সাজবা। আমার অনেক দিনের শখ আছিল আমি খালার বাড়িতে বউ নিয়া যামু। খালা খুব ভালা মানুষ।
রূপকের কথা শুনে না করতে পারেনি। সকালবেলা খুশিমনে তাই তৈরি হয়ে নিয়েছে।
দুপুরে খাওয়া দাওয়ার পর রূপক চিত্রা বিছানায় শুয়ে বিশ্রাম নিয়েছিল। চিত্রার খুব লজ্জা লাগছিল। কিন্তু আর ভাবিরা তখন গোসল করতে গেছে। খালাও বাড়িতে নেই। তাই স্বামীর সঙ্গে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেয়ার জন্য শুয়েছে সে। অনেক মজার মজার খাবার খাওয়ার পর শরীরে এক ধরনের ভাব এসে গেছে। রূপক দাঁত খোঁচাতে খোঁচাতে বলল, আমার খালা বড় ভালা মানুষ কইছিলাম না।
হ, আমার তো ভালোই লাগলো।
তোমারে ও তার ভালো লাগছে।
হাতের কাশিটা রূপক ফেলে দিয়ে চিত্রাকে তার বুকের মধ্যে টেনে নিল। চিত্রার থলথলে পেটে হাত দিয়ে মৃদু চাপ দিতে দিতে বলল, শইলডা কেমন জানি করতাছে?
কেমন করতাছে?
বুঝতাছ না? হইবো নাকি?
চিত্রা জিভে কামড় দিয়ে বলল মাথা খারাপ হইছে নি আপনার। মেহমানের বাসায় আইসা এগুলা।
রূপক চিত্রাকে আরো কাছে টেনে নিতে নিতে বলল তাতে কি হইছে? বেশীক্ষন লাগবেনা। অল্প একটু। তুমি দুবার আটকায় দিয়ে আসো।
আমি পারুম না। এখন ঐসব হইব না।
কেন? অল্প একটু।
কইলাম তো এখন ঐসব হইবো না। ভাত খাইছেন এখন শুইয়া একটা ঘুম দেন। আর যদি বেশি মন চায় তাইলে থাইকা জান। কাল বাড়ি যাই।
রূপক হতাশ হয়ে বউকে ছেড়ে দিল। তারত দু-একটা দিন মন আরাম আয়েশ করতে মন চায়। ইচ্ছে করছে খালার বাসায় একটা রাত থেকে যেতে। প্রতিদিন সকাল থেকে রাত দোকান করা আর এসবের মধ্যে থাকতে তার ভালো লাগে না। বউয়ের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটিয়ে ধান ক্ষেতের পাশ দিয়ে হেঁটে বেড়াতে তার ইচ্ছা করছে। আজকে সে দোকান কামাই দিয়েছে। আগামী কাল যদি সে দোকানের না যায় তাহলে ঝামেলা হয়ে যাবে। তার বাবা এখন তাকেই সবকিছু বুঝিয়ে দিয়েছে। সে এখন একা নয়। ঘরে নতুন বউ এসেছে। বাপ মা-বোন নিয়ে তার সংসার। এতগুলো মানুষের দায়িত্ব নেয়াটা কম কথা না। সবকিছু ভেবে সে কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে দোকানে যাওয়া থেকে বিরত থাকে না। কিন্তু আজ তার খুব ইচ্ছা করছে বউয়ের সঙ্গে সুন্দর মুহূর্ত কাটাতে। পুকুর পাড়ে গিয়ে কিছুক্ষন বসে গল্প করতে।
রূপক বলল, উঠ বউ। চলো পুকুর পাড়ে যাই। খালার বাড়ির পুকুর পাড় টা খুব সুন্দর। চলো টং এর উপর বইসা একটু বাতাস খেয়ে আসি।
ঘুমাইবেন না আপনি।
না, ঘুম ধরতেছে না। আইজ একটু ছুটি পাইছি। দিনটা ঘুমায়া কাটাইতে চাইতেছি না।
রূপকের কথা শুনে চিত্রে স্পষ্ট বুঝতে পারল আজকেই রূপক চলে যাবে বাড়িতে। তাকে এখানে একা রেখে যাবে। খালা শ্বাশুড়ীর বাড়ীতে সে দুইদিন নাইওর করবে। কিন্তু রূপককে ছাড়া থাকতে হবে ভেবেই চিত্রার কেমন যেন বুকের ভেতর ব্যথা করতে থাকলো। রূপককে ছাড়া এক মুহূর্ত থাকার কথা সে ভাবতে পারেনা। রূপক দোকানে গেলে সারাদিন ছটফট করে কখন বাড়িতে ফিরবে। অথচ দুদিন দেখা হবে না তার প্রিয় স্বামীর সঙ্গে। চিত্রার বুকটা হঠাৎ করে ফাঁকা হয়ে যেতে লাগল। কিন্তু কিছুই করার নেই। সে দ্রুত বিছানা থেকে উঠতে উঠতে বলল, আসেন।
গল্প বরাবরই আমি পাঠকের চাহিদামতো করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করি। সুতরাং যেমনটি মনে হয় মন্তব্য করুন নেক্সট না লিখে পরামর্শ কিংবা উত্সাহিত করবেন।
চলবে..