#দ্বিতীয় পুরুষ
পর্ব-1+2
নীলাভ্র জহির
বিয়ের প্রথম রাতে স্বামীর ঘরে গুটিশুটি মেরে বসে আছে চিত্রা। বাসর ঘর সাজানো হয়নি। টিনের ঘরে ভাঙাচোরা একটা চৌকির ওপর সে বসে আছে। হঠাৎ দরজা বন্ধ করার শব্দে সে চমকে উঠলো। কিন্তু যে মানুষটা ঘরে ঢুকল সে তার স্বামী নয়!
আতংকিত কণ্ঠে চিত্রা জিজ্ঞেস করল, কে আপনি!
– আমি তোমার নাগর।
এগিয়ে এসে বিছানায় বসল লোকটা। মধ্যবয়সী একজন লোক। চিত্রার ঘোমটা সরিয়ে সরাসরি লোকটা ব্লাউজের কাঁধে হাত দিলো। চিৎকার করে উঠল চিত্রা৷ লোকটা তার মুখ চেপে ধরে বলল, চুপ মাগী৷ চেঁচাইস না। তোর সওয়ামী তোরে আমার কাছে বেইচা দিছে।
চিত্রার গলা শুকিয়ে গেল। তার স্বামী জয়নাল একটা লোকের কাছে তাকে বিক্রি করে দিলো! এটা কিছুতেই হতে পারে না। জয়নাল চিত্রাকে বিয়ে করার জন্য একমাস ধরে চিত্রার বাবা সোহরাব উদ্দীনের পিছনে ঘুরেছে। শুটকি ব্যবসায়ী জয়নালের স্বাস্থ্য ভালো, বাপ মা কেউ নাই। তাতে কি? সদরে বড় শুটকির দোকান আছে তার। সোহরাব উদ্দীন মেয়েকে জয়নালের সঙ্গে বিয়ে দিলেন। বিয়ের দিনই জয়নাল বউ নিয়ে বাড়িতে এলো। ভাঙাচোরা বেড়ায় ঘেরা টিনের একটা ঘর। ঘরের এক কোনায় শুধু একটা চৌকি বসানো৷ আর কোনো আসবাব নাই। চিত্রার খারাপ লাগেনি। সে যখন এসেছে, এই ঘরের শ্রী ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু এ কী হল তার কপালে! জয়নাল বিক্রি করে দিলো তাকে?
লোকটার হাত সরিয়ে জোরে জোরে চিৎকার করে উঠল চিত্রা। কিন্তু কেউ এলোনা। কে আসবে? এই বাড়িতে একটাই ঘর, আর কেউ থাকেনা এখানে। আশেপাশের বাড়ি থেকেও কেউ ছুটে এলোনা তাকে বাঁচাতে!
বুদ্ধি করে চিত্রা বলল, আপনি কে সত্যি কইরা কন?
– কইলাম তো তোমার সওয়ামী তোমারে বেইচা দিছে৷ বিশ হাজার টাকায়। আইজ রাইতে তোমার লগে আমার বাসর হইবো। কাইলকা আমরা চইলা যাবো এই গ্রাম থাইকা। তারপর থাইকা তুমি হইবা আমার সোহাগের কামলা খাটা রানী৷
– জয়নাল কই?
– জয়নাল মদ খাইয়া পইড়া রইছে। সকাল হইতেই সে ভাগবো। ওরে আর পাইবা না।
– কই যাইবো জয়নাল?
– যেখান থাইকা আইছে, সেইখানেই যাইবো। তুমি কি ভাবছ গঞ্জে ওর দোকান আছে? সব তো মিছামিছা কতা। ওর কুনো দোকান নাই। মাগীর ব্যবসা করে হালায়। আইজ এই গেরামে, কাইল ওই গেরামে।
লোকটার কথা চিত্রার অবিশ্বাস করার উপায় নেই। আসন্ন বিপদের কথা ভেবেই ভয়ে শিউরে উঠল চিত্রা। এই লোকটা আজকে তার সর্বনাশ করবে৷ তারপর বাকি জীবন নরকের আগুনে জ্বলার মতো তীব্র কষ্টে কাটবে চিত্রার। এই লোকের সঙ্গে শরীরের জোরে সে কিছু করতে পারবে না। তাকে জিততে হবে বুদ্ধির জোরে। চিত্রা দ্রুত চিন্তা করতে লাগল কি করা যায়।
লোকটা চিত্রার গায়ে হাত দিচ্ছে। হাতে ও পিঠে হাত বুলাচ্ছে। চিত্রা বুদ্ধি করে বলল, আপনারে একটা কথা জিগাই।
হ, জিগাও। কথা না কইলে শইল্যে মজা আসে না।
লোকটা চিত্রাকে টেনে হিঁচড়ে বিছানায় শোয়াতে চেষ্টা করল। চিত্রা বাধা দিতে দিতে বলল, আপনি কি করেন? আমারে বিশ হাজার ট্যাকা দিয়ে কিনছেন। তাইলে তো আপনার ম্যালা ট্যাকা।
লোকটা উচ্চশব্দে হেসে বলল, হ। আমার মেলা ট্যাকা। তোমারে যখন নিয়া যাবো দেখবা কত রানীর মত রাখবো তোমারে। আজ থাইক্যা দুই মাস আগে তোমারে এক ঝলক দেইখা আমার শইলে জোয়ার আইছে। জয়নালের কাছ থাইকা এর আগেও আমি অনেক মাগি কিনছি। হ্যারে আমি কইছিলাম যে এইটারে আমার লাগবো।
ভয়ে শিউরে উঠল চিত্রা। কিন্তু এখন তাকে বুদ্ধি হারালে চলবে না। নিজেকে রক্ষা করতে চাইলে তাকে বুদ্ধি দিয়ে কিছু করতে হবে।
চিত্রা বলল, ওই মাইয়াগুলা এখন কই?
– জায়গামতো আছে। তবে তোমারে ওদের ওইখানে নিমুনা। তুমি আমার লগে থাকবা। আগামী একমাস আমি শুধু তোমার লগে.. দাঁত বের করে হাসল লোকটা।
এমন কুৎসিত ও ভয়ংকর কথা জীবনেও শুনেনি চিত্রা। ভয়ে আতঙ্কে সে বারবার সবকিছু ভুলে যাচ্ছে। কিন্তু সাহস হারালে চলবে না, সাহসী হতে হবে তাকে।
চিত্রা বলল, আপনি যা চান আমি আপনারে সব দিবো। আদরে সোহাগে ভরাইয়া দিবো। সবার চাইতে বেশি সুখ আইনা দিবো। আপনি আমার একটা কথা রাখবেন?
– তাই নাকি। ক দেহি কি কতা?
– আপনি আমারে সবার থাইকা আলাদা রাখবেন। আমি যেটা চাইব সেটা আইনা দিবেন। ভালো ভালো খাওয়াইবেন। ভালো জামা কাপড় তেল সাবান দিবেন। আপনি আমারে সুখে রাখলে আমি আপনারে চরম সুখ আইনা দিবো।
লোকটা কুৎসিত হাসি হেসে বলল, তোর মত মাল আমি আর একটাও পাই নাই। তুইতো বড় ভালা রে।
– হ, রাখবেন আমার কথা?
– ক্যান রাখমু না। তুইতো আমার চান্দের বাত্তি।
– ঠিক আছে রাজি। তাই আমি যেভাবে কমু সেইভাবে কইরেন।
– তা হইব না। আমি আমার মত করমু।
– একবার শুইনাই দেখেন। এমন সুখ জীবনে আপনারে কেউ দিতে পারত না।
লোকটা বিমোহিত হয়ে গেল চিত্রার কথায়। তার জিভ লকলক করে উঠলো। জ্বলজ্বলে চোখে চিত্রার দিকে চেয়ে আছে। চিত্রা বলল, খাড়ান শাড়ির মধ্যে অনেক সিপ্টিপিন আছে। আমি সিপ্টিপিন গুলা খুইলা লই।
বিছানায় শুয়ে শুয়ে দুইটা সেফটিপিন খুললো সে। লোকটা আর তর সইছে না। চিত্রার উপর ঝাপিয়ে পড়ল।
চিত্রা বলল, এমন করলে তো হইবো না। আমারে খুলতে দেন। তারপর দেইখেন। আপনাকে আমি কি দেখাই?
চিত্রা লোকটাকে ঠেলে বিছানায় সরিয়ে দিল। শুয়ে রইলো লোকটা। সেফটিপিন খুলতে খুলতে বিছানার উপর উঠে বসল চিত্রা। একটা সেফটিপিন খুলতে গিয়ে সে অনেক সময় নিল। লোকটা অধৈর্য হয়ে বলল, কই হইলো তোমার।
– এইটা খুলতাছে না। সিপ্টিপিন না খুললে তো আমি শাড়ী-ব্লাউস কিছুই খুলতে পারুম না। একটু ধৈর্য ধরেন। আপনারে কেউ আগে ভালোবাসার কথা বলছে?
– না, আমারে কে ভালোবাসার কথা কইব। সবাই কয় বুইড়া খাটাশ।
– আপনি এখনো জোয়ান। কে কইছে আপনারে বুইড়া?
চিত্রা কথা বলতে বলতে খাট থেকে নেমে মেঝেতে দাঁড়িয়ে পিন খুলতে লাগল। সেফটিপিন খুলে সে একটা দুঃসাহসিক কাজ করে বসলো। বুক থেকে সামান্য শাড়ি সরিয়ে আবার খপ করে ধরে বলল, দেখেনতো এইখানেও একটা সিপ্টিপিন। খাড়ান আমি খুলতাছি। খুইলা আপনারে আসল জিনিস দেখাইতাছি।
লোকটা বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে রইল। চিত্রা বলল, এমন করলে হইবো? আপনি কাপড় চোপড় খুলেন।
– এহনই?
– এহন না হইলে কখন? শার্ট খুইলা ফালান।
লোকটা শার্টের বোতাম খুলতে লাগল। সেই সুযোগে দরজা খুলে এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো চিত্রা। শাড়ি পরে সে দৌড়াতে পারছিল না। শাড়ির আচল এক হাতে ধরে নিজের জীবন বাঁচানোর জন্য সে খুব জোরে দৌড় দিল। রাতের অন্ধকারের মাঝে খুব দ্রুত হারিয়ে গেল। তারপরও তার দৌড়ানো থামল না। মেইন রাস্তায় না গিয়ে এক জংলী রাস্তায় এসে ঢুকলো। খুব এলোমেলোভাবে দৌড়াতে থাকলো। ওই লোকের নিশ্চয়ই তাকে খুঁজে বের করার সাধ্য হবে না। অনেক দূর দৌড়ে আসার পরে বিশ্রামের জন্য একটা জায়গায় দাঁড়ালো। বড় বড় কয়েকবার শ্বাস নিল। আজ বুদ্ধির জোরে সে নিজেকে রক্ষা করতে পেরেছে। ওই সময় জ্ঞান হারিয়ে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে থাকলে তার সবকিছু শেষ হয়ে যেত।
চিত্রা আবারো ছুটতে শুরু করল। অন্ধকারের মধ্যে কতক্ষণ দৌড়েছে সে জানেনা। একটা বাড়ির গোয়াল ঘরের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সারা রাত কাটিয়ে দিল চিত্রা। ভোরের আলো ফুটতে শুরু করলে সে পথ ধরল।
রাস্তায় ভ্যান ও অটোগাড়ি চলছে। একটা অটোওয়ালাকে কুন্দনহাটি গ্রামের নাম বলল। ওখানে তার ফুফুর বাড়ি । এই মুহূর্তে বাবার বাড়িতে যাওয়া একদমই ঠিক হবে না।
অটোর ভেতরে বসে শাড়ীর আঁচল দিয়ে মাথা মুখ ভালোভাবে ঢেকে নিল চিত্রা। কুন্দনহাটি বাজারে এসে অটোওয়ালা বললো আফা নামেন।
– চিত্রার কাছে কোন টাকা নেই। কিভাবে ভাড়া দেবে সেটা বুঝতে পারলো না।
– অটোওয়ালা বলল, নামেন না ক্যান?
– আমি খুব বিপদে পড়ছি ভাই। আরেকটু সামনে যাইলেই আমার বাড়ি। আপনে আমারে বাড়িত পৌঁছায় দেন। বাড়িত গিযয়া আমি আপনারে ভাড়া দিমু।
– অটো আর যাইতো না।
– আপনে আমার ধর্মের ভাই লাগেন। আমারে একটু বাড়িতে পৌছাইয়া দেন। আমি অনেক বিপদে পড়ছি। কোন ট্যাকা নাই আমার কাছে।
– ট্যাকা না থাকলে অটোতে উঠছেন কেন?
– বিপদ তো মানুষেরই হয়। আপনার মা বোন কখনো বিপদে পড়ে না?
অটোচালক আর কোন উত্তর দিল না। চিত্রার দেখানো পথ অনুযায়ী সে অটো চালাতে লাগলো। ফুফুর বাড়ির উঠোনে এসে দাঁড়াল অটোগাড়িটা। অটো থেকে নেমে ওই বাড়ির ভেতরে দৌড় দিলো চিত্রা। এক দৌড়ে তার ফুফুর পায়ের কাছে গিয়ে পড়ল। তারপর শুরু করে দিলো হাউমাউ করে কান্না।
চিত্রার ফুফু বয়স্ক মানুষ। গায়ের চামড়া ঝুলে পড়েছে, কুঁজো হয়ে হাঁটেন। ভালো মতো হাঁটতে পারেন না। চিত্রাকে চিনতেই ওনার অনেক সময় লাগলো। চিত্রার কান্না দেখে তিনি অবাক হয়ে বললেন, আমাগো চিত্রা না? তুই কানতাছোস ক্যান? কোথ থাইকা আইলি?
চিত্রা বলল, আপনারে সব কইতাছি। আগে আমার বিশ টা ট্যাকা দ্যান।
ফুফু ঘরের ভেতরে দৌড়ে গিয়ে তোষকের নিচে থেকে বিশ টাকা বের করে দিলেন।
চিত্রা বলল, অটো আলারে ভাড়াটা দিয়ে আইসেন ফুপু।
অটোকে বিদায় করে দিয়ে তার বৃদ্ধ ফুফু চিত্রার কাছে এলেন। চিত্রার পরনে লাল শাড়ি। ভাতিজির বিয়ে হয়েছে সেটা তিনি জানেন না। কারণ ভাইয়ের সঙ্গে তার খুব একটা যোগাযোগ নেই। জীবন ও সময়ের স্রোতে হারিয়ে গিয়ে কেউ কারো সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি। তাছাড়া সোহরাব উদ্দিন একটা কাজী ডেকে বিয়ে পড়িয়ে মেয়েকে জয়নালের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। পাড়া প্রতিবেশি কিংবা আত্মীয়-স্বজন কাউকেই তিনি দাওয়াত দেন নি।
চিত্রা তার বিপদের সব কথা খুলে বলল। বৃদ্ধ ফুফু অনেক কান্না করলেন তাকে জড়িয়ে ধরে। চিত্রা ফুফুকে বলল, আমি যে এইখানে আইছি এটা এখনই আব্বারে জানাইয়েন না। ওই লোকটা যদি আব্বার কাছ থাইকা খবর পাইয়া এখানে আইসা পড়ে। আব্বারে এখনই কিছু জানানোর দরকার নাই। চিত্রার কথা মেনে নিলেন তাঁর ফুফু। ভাতিজিকে নিরাপদে ফিরে পেয়েছেন এটাই তার কাছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
এরপর মাস ছয়েক চিত্রার ফুফুর বাড়িতেই কেটে গেল। ফুপুর দুই ছেলে ও ছেলের বউ, নাতিপুতি নিয়ে ভরা সংসার। ভাবীদের কাছে বোঝা মনে হলেও ভাইদের কাছে চিত্রা বোনের মতোই রইল। সেই ঘটনার কয়েকদিন পর সোহরাব উদ্দিনকে গোপনে খবর দিয়ে নিয়ে আসা হয়। তিনি নিজের মেয়েকে এমন বিপদে ফেলে দিয়েছেন ভেবে সব সময় হাহাকার করে কান্না করেন। মেয়েকে তিনি বোনের বাড়িতেই রেখে দিলেন। আর বাড়িতে গিয়ে এমন ভাব করলেন যেন মেয়ে তার জামাইয়ের সঙ্গে শ্বশুরবাড়িতে খুব সুখে আছে। গরীব ও অসহায় সোহরাব উদ্দিনের এছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। মেয়েটা টেনেটুনে ক্লাস এইট পর্যন্ত পড়াশোনা করেছে। স্কুলে পড়ার কারনেই মেয়েটার এমন বুদ্ধি হয়েছে। এটাই মনে করেন তিনি। তিনি মেয়েটাকে হারিয়ে ফেলেও মেয়েটাকে ফিরে পেয়েছেন এজন্য সব সময় শুকরিয়া আদায় করেন।
দেখতে দেখতে প্রায় নয় মাস কেটে গেল। ফুফাতো ভাইয়ের বউদের চোখের এখন চিত্রা একটা বিরক্তির নাম। নিজেদের সংসারে এরকম একজন যুবতী মেয়েকে তারা সহ্য করতে পারছে না। তাদের স্বামীরা যথেষ্ট ভালো চরিত্রের অধিকারী হলেও ভরসা করতে পারছে না তারা। চিত্রার উঠতি যৌবন। কখন কি বিপদ ঘটে যায় বলা যায় না। এই আপদকে ঘর থেকে বিদায় করতে চায় তারা।
দুই ভাবির কথামতো চিত্রার ভাইয়েরা তাকে বিয়ে দেয়ার জন্য পাত্র খুঁজতে শুরু করলো। তবে এবার যেন আর কোন ভুল না হয় সেই কথা ছেলেদেরকে ভালোমতো বুঝিয়ে দিলেন চিত্রার ফুফু। এই গ্রামেরই এক ছেলের পছন্দ হলো চিত্রাকে। ছেলেটির নাম রুপক। বাজারে তার বাবার একটা কাপড়ের দোকান আছে। রূপক কাপড়ের দোকানে বেচাকেনা করে আর বাবার জমিজমা দেখাশোনা করে। ছেলে হিসেবে বেশ ভালো। চিত্রার ফুপাতো ভাই আশিকের সঙ্গে একই স্কুলে পড়েছিল রূপক। মেট্রিক পাশ করা ছেলেটি অনেক দায়িত্ববান হিসেবেও সবাই চেনে তাকে। তার সঙ্গেই বিয়ের কথা চলতে লাগলো চিত্রার।
বিয়েতে একদমই ইচ্ছা নেই মেয়েটির। একবার তার জীবনে যে অভিশাপ নেমে এসেছিল সে দ্বিতীয়বার আর এ ভুল করতে চায় না। কিন্তু অন্যের সংসারে আর কতদিন এভাবে বোঝা হয়ে পড়ে রইবে। ভাইদের স্ত্রীর চোখ রাঙানি সে অনুভব করে। কোন মেয়ে তার সংসারে অন্য একটা মেয়েকে সহ্য করতে পারেনা। তারা কেন সহ্য করবে তাকে। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা ভাইয়েরা চিত্রার ভালো চায়। তারা বুঝেশুনে গ্রামেরই ছেলে আর আশিক ভাইয়ার বন্ধুর সঙ্গে তার বিয়ের কথাবার্তা বলছে। এতে চিত্রার মোটেও অমত থাকা উচিত না।
সোহরাব উদ্দিন একদিন বেড়াতে এলে চিত্রা তাকে বলল, আব্বা আমি কি করবো?
সোহরাব উদ্দিন অশ্রুসজল চোখে বললেন, আগেরবার আমি কোন খোঁজ খবর না নিয়া ভুল করছি। এবার তোর ভাইয়েরা অনেক খোঁজ খবর নিছে। তারা তোর জন্য একটা ভাল পাত্র ঠিক করছে রে মা। তুই আর অমত করিস না।
চিত্রা ভেবে পায়না বাবাকে সে কি উত্তর দেবে। তার অতীতের ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার কথা কাউকে বলাও যায় না। সে যে এখনো কুমারী এটা কেউ বিশ্বাসই করবে না। সেই রাতের পর থেকে আর কখনো জয়নালের কোন খোঁজ পাওয়া যায়নি। সোহরাব উদ্দিন গোপনে অনেক খোঁজার চেষ্টা করেছিলেন জয়নালকে। খুঁজে পেলে তিনি জয়নালকে কেটে টুকরা টুকরা করে হয়তো ভাসিয়ে দিতেন। কিন্তু জয়নাল গ্রামে অতিথি হয়ে এসেছিল আবার উধাও হয়েছে অন্য কোথাও। তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। চিত্রার একবার বিয়ে হয়েছিল সেটা পুরোপুরি গোপন রাখল সবাই।
ভরা বর্ষার এক দিনে বেশ আয়োজন করে বিয়ে হয়ে গেল চিত্রার। গ্রামবাসীরা এল, পাত্র পক্ষ থেকে এসেছিল বেশ কয়েকজন। তারা খুব সুন্দর করে বউ সাজিয়ে বিয়ে করে নিয়ে গেল চিত্রাকে।
এবার বাসর ঘরে বসে থাকতে প্রচন্ড ভয় পাচ্ছিল চিত্রা। ঘরে যে মানুষটি প্রবেশ করল সবার আগে তার দিকে একবার ভালো করে খেয়াল করলো সে। বিয়ের আগে একবার মাত্র রূপক কে দেখার সুযোগ হয়েছিল। তাতে লোকটাকে বেশ ভালো মনে হয়েছিল চিত্রার। কথাবার্তা খুব একটা হয়নি। আজকে ঘরে ঢুকেই রূপক বলল, বাইরে বাতাস। আকাশ খারাপ করছে। মনে হয় বৃষ্টি হইবো। আপনার কিছু লাগলে বলেন ঐ ঘর থেকে আইনা দেই। বৃষ্টি শুরু হইলে তো আর ওই ঘরে যাইতে পারবেন না।
ভীষণ অবাক হয়ে রূপকের দিকে তাকাল চিত্রা। তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো। যে মানুষটা ঘরে ঢুকে প্রথম কথাতেই তাঁকে তাঁর প্রয়োজনের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়, সে নিঃসন্দেহে একজন ভালো মানুষ।
এবার চিত্রার বাসর ঘর সাজানো হয়েছে প্লাস্টিকের ফুল দিয়ে। চিত্রা তার নতুন স্বামীকে ভালো করে দেখল। সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত একজন যুবক। মাথায় তার কোঁকড়া চুল। ছেলেটা এসে বিছানার ওপর বসতেই চিত্রার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। তার স্বামী জানতে চায়, বৃষ্টি শুরু হইবো। আপনার কিছু লাগলে কন। আমি আইনা দেই।
চিত্রা ঘাড় বেঁকিয়ে বলে, কিছু আনা লাগবো না। আমার সব জিনিসপত্র এইখানেই আছে।
– তাইলে বাতি নিভাইয়া দেই?
চিত্রার শরীরে এক ধরনের শিহরণ বয়ে যায়। ভয় ভয় মুখে সে বলে না, আপনার লগে একটু আলাপ পরিচয় হোক।
ছেলেটা হাসিমুখে বলল, তা তো হইবোই। এহন আপনি আমার ঘরের বউ। রূপক মিয়ার বউ। এই হল আপনার পরিচয়।
চিত্রা লাজুক হেসে বলল, আপনার নাম তো জানি। আপনি মানুষটা কেমন এগুলা বুঝি জানতে হইব না?
– না জাইনাই তো বিয়া কইরা ফালাইছেন। এহন সারা জীবন ধইরা জানবেন। আমি কিন্তু মানুষটা খারাপ না।
চিত্রা মুচকি হাসলো। রূপকের হাসিমুখ আর চাহনি দেখেই সে বুঝতে পেরেছে ছেলেটা খারাপ নয়। এত সুন্দর একটা ছেলে তার স্বামী। যে ছেলেটা খুব সুন্দর করে হাসে, সুন্দর করে কথা বলে। নিজের ভাগ্যকে এই প্রথম নিজের ঈর্ষা হলো চিত্রার।
রুপক বলল, বাতিটা নিভাইয়া দেই ?
চিত্রা লাজুক হাসল। মাথা নিচু করে থাকল। বাসর ঘরে স্বামীকে বাতি নিভানোর কথা কোন স্ত্রী কি বলতে পারে? এ তো ভারি লজ্জার কথা।
রূপক ঘরের আলো নিভিয়ে দিল। পায়ের শব্দ শুনে চিত্রা বুঝতে পারলো রুপক এখন তার বিছানায় এসে বসলো। হঠাৎ নিজের গায়ের উপর তার স্পর্শ টের পেল চিত্রা। রূপক তার বাহুতে হাত রেখেছে, একটা গরম হাত।
চিত্রার কেমন ভয় ভয় হতে থাকে। হাত পা কাঁপতে শুরু করল তার। রূপক তাকে ধরে বিছানায় শুয়ে পড়ল। একজন অপরিচিত পুরুষ মানুষ এখন তার এত কাছে! তাকে ধরে তার পাশে বিছানায় শুয়ে আছে। যে মানুষটাকে একটু আগেও চিনতো না। শুধুমাত্র কবুল বলার পর মানুষটা তার ওপর অধিকার খাটাতে শুরু করল সে বাধা দিতে পারবে না। কারণ এটাই জগতের নিয়ম। লজ্জা হলেও তাকেও অধিকার খাটাতে হবে এই অপরিচিত যুবকের ওপর । অচেনা অজানা দু’জন মানুষ কিভাবে শরীরে শরীরে মিলিত হয়। প্রকৃতির নিয়ম বড় অদ্ভুত।
রূপক বলল, আমার গায়ে কোন গন্ধ পাইতাছেন?
– নাতো ।
আমি কিন্তু সিগ্রেট খাই।
কথাটা বলেই শব্দ করে হাসলো রূপক। বলল, সিগ্রেটে আপনার সমস্যা নাই তো।
লাজুক হেসে চিত্রা উত্তর দেয়, না।
– মেলা বন্ধুর কাছে শুনছি তার বউ সিগরেট খাইলে চিল্লাফাল্লা করে। মুখে গায়ে বাজে গন্ধ হয়। আমার গায়ে কি সেরকম গন্ধ পাইতাছেন?
– না,
– পাইবেন না তো। আমি সিগারেট খাওনের সময় হাত লম্বা কইরা সিগ্রেট ধইরা টানসি । ঘরে ঢোকার আগে মেসওয়াক কইরা আইসি। সব আপনার লাইগা।
কথাগুলো শুনতে বড়ই ভালো লাগে চিত্রার। এই প্রথম জীবনে সে ভালোবাসার কথা শুনছে। তার হৃদয়ে দোলা লাগল। একজন মানুষ যাকে সে কখনো চেনেও না, জানেও না, সে তার জন্য দূরে হাত রেখে সিগারেট টেনেছে। ঘরে ঢোকার আগে মেসওয়াক করে এসেছে। এ কথাগুলো শুনতে তার নিজেকে ভীষণ সৌভাগ্যবতী মনে হচ্ছিল। মনে এক ধরনের সুখের দোলা অনুভব করল চিত্রা। রূপকের গরম হাতের স্পর্শ পেল সে। রুপক তার বাহু চেপে ধরে তাকে মৃদু কাছে টেনে নিল। লজ্জা ও সংকোচে অনেকটা কুকড়ে গেল চিত্রা।
রূপক বলল, আমার কিন্তু লজ্জা করতাছে।
কথাটা শুনে লজ্জা পায় চিত্রা নিজেও। লজ্জা তো তারও করছে। এই লজ্জা এক অন্যরকম লজ্জা। যে লজ্জা পেতেও শান্তি লাগে। নিজের স্বামীর কাছে লজ্জা পাওয়াটা খুবই গৌরবের বিষয়।
পাশাপাশি শুয়ে রইলো তারা দুইজন। যুবক বলল, তুমি তো আমার স্ত্রী। আমরা জনম জনম একসঙ্গে থাকব। আজ আমি তোমার কাছে কিছু কথা কই। তুমিও কথা দাও আমার কথাগুলো তুমি রাখবা?
চিত্রা বলল, হ, রাখমু। আপনি বলেন কি কথা?
রূপক বলল, আমার বাপ মারে তুমি কখনো কষ্ট দিয়ে কথা বলবা না। তারা তোমারে যা ইচ্ছা কইতে পারে। সব সময় মাথায় রাখবা তারা মুরুব্বী। গুরুজন । আমগো ভালো-মন্দের জন্য তারা নানান কথা বলবে। আমার মায়ের একটু রাগ বেশি। সবকিছু কম বুঝে। এইজন্য চিল্লায় বেশি। মা তোমারে কিছু কইলে তুমি যদি কষ্ট পাও আমারে কইও। তোমার কষ্ট আমি দূর কইরা দিব। কিন্তু তুমি আমার মায়ের লগে কোনো খারাপ আচরণ করতে পারবা না। তারে কষ্ট দিয়ে কিছু বলতে পারবানা। হাজার হউক সে আমারে জন্ম দিছে। আমারে অনেক আদর যত্নে মানুষ করছে। সে রাগী হইলেও সে আমার মা। কম বুঝলেও সে আমার মা। আমার মারে কেউ কষ্ট দিলে আর আমার সহ্য হয় না। তুমি আমারে কথা দাও কোনোদিনও আমার মায়ের কষ্ট দিবানা?
চিত্রা বলল, আপনার মা মানে আমারও মা। আপনি জানেন না আমার মা নাই? জন্মের পরেই মারে হারাইছি। পাগলা এক বাপের কাছত মানুষ হইছি। মায়ের আদর পাই নাই। আপনের মায়ের কাছে আমি আমার মায়ের আদর খুজব।
– তাই যেন হয় বউ। তুমি আমার বাপ মারে অনেক আদর সম্মান করবা। আমি সারা জীবন তুমি যা চাইবা তাই আইনা দিব।
মনটা খুশিতে ভরে গেল চিত্রার। খুব আনন্দ হতে লাগলো। বিয়ের প্রথম রাত নাকি অনেক আনন্দের হয়। সেই কথা আজ তার কাছে সত্যি বলে প্রমাণ হলো। সম্পূর্ণ নতুন একজন মানুষ কত দ্রুত তার আপন হয়ে উঠল ভাবতেই অবাক লাগছে তার।
রূপক বলল, আমার বাপ অনেক কষ্ট কইরা দোকান করছে। তার দোকানে আমি কাম করি। আমার বাপে পুরা দোকান আমারে দিয়া দিছে। তুমি কও কয়টা পোলার এত সৌভাগ্য হয়। যে বড় হইয়াই বাপের খাড়া করানো ব্যবসা পাইয়া যায়। আমি পাইছি। আমার বাপ রে আমি অনেক সম্মান করি। তুমিও করবা। কোনদিনও আমার বাপরে আঘাত দিয়া কোন কথা কইবা না। তুমি আমার এই দুইটা কথা রাখবা তো বউ?
চিত্রার চোখ দুটো ছল ছল করে উঠলো। সে বলল , আপনি কোনো চিন্তা কইরেন না। আমার উপর ভরসা রাখেন। আপনের অসম্মান হয় এমন কোন কাজ আমি কখনো করবো না। আপনি যা বলছেন আমি তা সবসময় রাখতে চেষ্টা করব।
রুপক উত্তেজিত হয়ে চিত্রাকে জরিয়ে ধরল। আনন্দিত কন্ঠে বলল, এমন একটা লক্ষী বউই আমি চাইছিলাম। তোমার ভাইয়ের লগে আমি একসঙ্গে পড়ছি। পড়াশুনা বেশি দূর করতে পারিনাই। বাপে কইত দোকানে বইতে। মনে অনেক সাধ ছিল কুন্দনপুর ডিগ্রি কলেজে পড়ব। দোকানে বইলে কি আর কলেজ পড়া হয়। পড়াশোনা তো লাটে উঠছে। তয় আমার খুব শখ আছে আমার পোলা-মাইয়া হোক তারে আমি কলেজ পর্যন্ত পড়াবো। যারা কলেজে পড়ে তাদের ব্রেন বুদ্ধি অনেক ভালো হয়।
মুচকি হেসে চিত্রা বলল, আপনার ব্রেন বুদ্ধি অনেক ভালো। কলেজে না পড়লেও ভালা মানুষ হওয়া যায়। আপনি একটা ভালা মানুষ।
– তোমারে আমার বড়ই ভালো লাগছে। তুমি খুব মিষ্টি কইরা কথা কও। মনডা চায় সারাক্ষণ শুধু তোমার কথাই শুনি।
লজ্জায় এলোমেলো হয়ে যেতে লাগল চিত্রা। এভাবে কেউ কোনদিনও তার কথার প্রশংসা করে নি। কথাও বুঝি সুন্দর হয়!
রুপক বলল, চুপ কইরে রইলা কেন? একটু কথা কও শুনি।
লাজুক হেসে চিত্রা বলল, কি কথা কমু? আপনি কন আমি শুনি। আপনের কথা শুনতে আমার ভালো লাগতেছে।
রূপক চিত্রাকে জড়িয়ে ধরে বলল, কাছে আসো। এত দূরে যাইতাছো ক্যান? তোমার কি শরম করতাছে?
চিত্রা উপর নিচে মাথা নাড়ায়। অন্ধকারে সেটা দেখতে পায়না রূপক। বাইরে বাতাস শুরু হয়েছে। সাথে মেঘের হালকা-পাতলা গর্জন। এই গর্জনে তাদের কথা বাইরে থেকে আর কেউ শুনতে পাবে না। আজকের রাতটা বড় মাধুর্যতা পূর্ণ হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে। ঝুম বৃষ্টি নামুক। বৃষ্টি এলে ভীষণ ভালো হবে। কেন যেন আজ চিত্রার মন চাইছে আজ খুব বৃষ্টি হোক। ভোর পর্যন্ত বৃষ্টি হোক।
রূপক বলল, চুপ কইরে রইলা কেন? কথা কও। তোমার মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনি।
– আপনি বড়ই শরম দেন।
– কই শরম দিলাম? আমি তো তোমার সোয়ামী। আমার কাছে তোমার কিসের শরম। কাছে আসো ।
রূপক চিত্রার নরম থলথলে শরীরটা নিজের বুকের মধ্যে নিয়ে নিল। রূপকের শক্ত বুকে নিজেকে শিশুর মনে হলো চিত্রার। উঠতি বয়সি মেয়ে চিত্রা। যৌবনে পা দিয়েছে। তবে বয়সের চাইতে তাকে অনেক বড় দেখায় তার সুন্দর স্বাস্থ্যের কারণে। রোগা পটকা সোহরাব উদ্দিনের মেয়েটা বড়ই স্বাস্থ্যবতী হয়েছে।
রুপক আস্তে আস্তে চিত্রার গলায় হাত দেয়। চিত্রার একটুও ভয় কিংবা দ্বিধা হয় না। এই মানুষটা তার স্বামী, এই ভীষণ সুন্দর মানুষটা। তার কাছে নিজেকে উজার করে দিতে ভালই লাগে তার। রুপকের হাত ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতে থাকে। খিলখিল করে হেসে ওঠে চিত্রা । চিত্রার সুডৌল স্তন স্পর্শ করে রুপক। চিত্রার হাসি থেমে যায়। এক শিহরণ বইতে শুরু করে তার দেহে। সে নড়াচড়া করতে পারল না। মন প্রাণ সব কিছু উজার করে দিয়ে এই মানুষটাকে সে গ্রহণ করতে চায়। স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটা বুঝি এমনই সুন্দর।
সারারাত ধরে বৃষ্টির পর সকালবেলা ঝলমলে রোদ উঠেছে। রোদ ওঠার আগেই উঠে পড়েছে চিত্রা। সে নতুন বউ। দেরিতে ঘুম থেকে উঠলে লোকে নানান কথা বলবে। ফজরের আজানের সঙ্গে সঙ্গে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। এই বাড়ির কোথায় কি আছে সে কিছুই জানেনা। রাতে ঘুমানোর আগেই সে তার স্বামীর রূপককে বলে রেখেছিল,
ফজরে উইঠা আমারে একটু পুকুরপাড়ে নিয়া যাইবেন?
যামু।
আপনের যদি ঘুম না ভাঙ্গে?
– ঘুম না ভাংলে তুমি মিষ্টি কইরে ডাক দিবা।
– আমিতো মিষ্টি কইরা ডাকতে পারিনা।
– কোকিল যদি কয় আমি মিষ্টি কইরা ডাকতে পারিনা সেটা কি বিশ্বাস হওয়ার কথা।
চিত্রা খিলখিল করে হেসে উঠেছিল রূপকের কথা শুনে। তার জীবনে প্রেম এসেছে। রঙিন ভেলায় ভেসে ভেসে। সেই রঙিন রঙে সে নিজেকে রাঙিয়ে নিয়েছে। স্বামীর দেহের এক সর্বশ্রেষ্ঠ সুখের সন্ধান পেয়ে আনন্দে পাগল হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থায় পড়েছিল চিত্রা।
এই আনন্দ সকালবেলাতে ও তার মনে উরু উরু করতে লাগলো। ঘর ও উঠান ঝাড়ু দিয়ে চিত্রা নিজের ঘরের দরজা আলগা করে বসে রইল। নতুন বউয়ের দরজা ধাক্কাধাক্কি করে খুলতে হলে সেটা বড়ই লজ্জার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। তার দরজায় কেউ ধাক্কা দিতে হবে না। দরজায় টোকা দিলেই খুলে যাবে দরজা। তাকে আর লজ্জায় পড়তে হবে না।
জা, ননদ ও পাড়া-প্রতিবেশীরা ইতিমধ্যেই কোলাহল করতে করতে চলে এসেছে। চাচাতো এক জায়ের গলা শোনা গেল, কি লো উঠছো নি?
চিত্রা লম্বা ঘোমটা টেনে দিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল। হাসির রোল পড়ে গেল সবার মধ্যে। আতঙ্কগ্রস্থ হলো চিত্রা। তাকে দেখে হাসার কি হল? তার চেহারায় কোথাও হাসার মতো কোন ছাপ আছে কি?
এক জা বলল, সারারাইত খুব ঝড় বাতাস হয়েছে। শইল্যেও দেহি ভালোই বাতাস লাগছে। টক বাইগনের মত লাল হইয়া রইছ।
হাসির রোল পড়ে গেল সবার মধ্যে। লজ্জায় একদম কুকড়ে গেল চিত্রা।
মহিলারা এসে চিত্রাকে ঘিরে ধরল। ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করতে লাগলো, কেমন হইল?
– কি হইব?
আবারো হাসির রোল পড়ে গেল মেয়েদের মধ্যে। বাচ্চা কোলে নেয়া এক মহিলা এগিয়ে এলো। চিত্রার মাথার ঘোমটা সরিয়ে চিত্রার ভেজা চুলে হাত দিয়ে শব্দ করে হাসতে হাসতে বলল, প্রথম রাইতেই হইয়া গেছে।
উচ্চ হাসির রোল পড়ে গেল সবার মধ্যে। কয়েকজন চিত্রাকে টানতে টানতে একটা খড়ের ঘরের দিকে নিয়ে গেল। জানতে চাইল, সব হইছে?
লজ্জায় কথা বলতে পারলোনা চিত্রা। মাটির দিকে মাথা নিচু করে রইল সে। মেয়েরা আবারো শব্দ করে হাসতে লাগলো। একজন বৃদ্ধা মহিলা এসে চিত্রার হাত ধরে বলল, নাতি বউ । ওরা তোমারে জালাইয়া মারবো। তুমি আমার লগে আহো।
বৃদ্ধা চিত্রাকে টেনে নিয়ে উঠোনের মাঝখানে এলেন। মেয়েগুলো সেখানে এসে ঘিরে ধরলো চিত্রাকে। কিন্তু বৃদ্ধাকে ডিঙিয়ে তারা কিছু বলতে পারলো না। বৃদ্ধা বললেন, বইয়া আমার লগে সুপারি কাটো।
উঠানে একটা ডালি ভর্তি সুপারি। দুইজন মহিলা বটিতে বসে সুপারি কাটছে। একজন মহিলা উঠে গিয়ে একটা পিড়ি ও বটি এগিয়ে দিল চিত্রার দিকে।
– বহেন ভাবি। সুপরি কাটেন। কাটতে পারেন তো?
দাদি বললেন, কেন পারব না? মাইয়া মানুষ সবই পারতে হইবো। না পারলে শিখাইয়া দিমু। আমার যখন বিয়া হইছে আমার তখন আট বৎসর বয়স। কোন কামই করতে পারতাম না। আমি কি সংসার করছি না? আটজন পোলা-মাইয়া জন্ম দিছি।
চিত্রা সুপারি কাটতে শুরু করলো। তার নতুন শাড়ির আচল বারবার মাথা থেকে পড়ে যাচ্ছে। এক হাত দিয়ে চিত্রা আবারো ঘোমটা টেনে দেয়। গায়ে হলুদ হয়েছে গত পরশু। হলুদের রং লেগে রয়েছে ত্বকে। লাল সুতি একটা কাপড়ে তাকে নতুন বউ হিসেবে ভারী সুন্দর মানিয়েছে।
সকালের মিষ্টি আলোয় বসে তারা সবাই মিলে সুপারি কাটতে থাকে। দু চারজন মহিলা এসে পাশে বসে। জিজ্ঞেস করে, আমারে চিনছো। আমি তোমার জেঠতো ভাইয়ের বউ। আমিই হইলাম সবার বড় বউ।
চিত্রা একঝলক তাকে দেখে আবারও সুপারি করতে শুরু করে। ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে লোকজন আসর জমাতে থাকে। পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয় স্বজন যার যার ঘুম ভাঙলে সবাই এসে হাজির হয়। নতুন বউ দেখতে এসেছে সবাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে হয় পুরো গ্রামের সব মহিলা এসে হাজির। সকলে বউ দেখতে এসেছে। কানাকানি ফিসফিসানি কিংবা কখনো উচ্চ হাসির শব্দ কানে আসে চিত্রার। সে লজ্জায়, সংকোচে কারো দিকে তাকাতে পারে না। মাথা নিচু করে মাটির দিকে চেয়ে থাকে। চিত্রার শাশুড়ি এসে বলে, আর সুপারি কাটা লাগবো না। সবাই তোমারে দেখতে আইছে। উঠ, রুবিনা তোমারে সাজাইয়া দিবে। যাও সাজুগুজু করো। বিয়ের শাড়ি পিন্দো। সাজুগুজু কইরা চেয়ারে বইসা থাকো।
চিত্রা কি করবে বুঝতে পারে না। রুবিনা নামের মেয়েটি এসে বলল, উঠেন ভাবি। আসেন আপ্নারে সাজাইয়া দেই।
চিত্রা রুবিনার সঙ্গে আসে। তার স্বামীর ঘরের পাশের একটা ঘরে নিয়ে এসে বসানো হয় তাকে। মেয়েরা তাকে ঘিরে ধরে থাকে। দুইজন মেয়ে গিয়ে তাঁর ঘর থেকে বিয়ের স্যুটকেসটা নিয়ে আসে। সুটকেস খুলতেই সব মেয়েরা হুড়মুড় করে ঝুঁকে দেখতে থাকে ভিতরে কি কি জিনিস আছে। সব জিনিস এলোমেলো করে রুবিনা চিত্রাকে সাজুগুজু করিয়ে দেয়। বড় আনন্দ হয় চিত্রার। বিয়ে ব্যাপারটাই আনন্দের।
তখন শুনতে পায় তার স্বামী রূপকের গলাখাকারি। রূপক বলে, রুবিনা তোর ভাবীর সঙ্গে একটু দরকার ছিল।
মেয়েদের মধ্যে ফিসফিসানি হাসির রোল ওঠে। তারা ঘর থেকে বেরিয়ে রূপককে ঘরে ঢুকতে বলে। ভীষণ লজ্জা হয় চিত্রার। রূপক ঘরে ঢুকে তার পাশে দাঁড়ালো।
চলবে..