#দ্বিতীয় পুরুষ
পর্ব ১৫+১৬
নীলাভ্র জহির
উঠানের মাঝখানে ছটফট করছে চিত্রা। রূপক এসে তার হাত চেপে ধরলো। জানতে চাইল, তোমার কি হইছে বউ। তুমি এমন করতেছ ক্যান?
নিজেকে সামলে নিতে কিছুক্ষণ সময় নিল চিত্রা। তারপর লাজুক কন্ঠে মৃদু স্বরে বলল, আমার বমি আসতাছে। শরীর খারাপ লাগতাছে। ভাত খাইতে পারতাছি না।
এমন ক্যান হইতাছে বউ?
চিত্রা আরো লজ্জায় কুকড়ে গেল। নিজের মুখখানা অন্যদিকে ঘুরিয়ে ফেলল সে। কিন্তু অস্থিরতা আরো বেড়ে গেল রূপকের। তার বউ কেন হঠাৎ করে এমন অসুস্থ হয়ে পড়ল সেটা ভেবেই সে পাগলের মত এদিক সেদিক তাকাতে লাগলো।
রূপক চিত্রার হাত টেনে ধরে বললো, আপনি থামেন। এত অস্থির হইয়েন না। আমার মনে হয় খারাপ কিছু হয় নাই।
কি কও তুমি? ভাত খাইবার পারতাছ না। ক্যামন ছটফট করতাছো? আর কইতাছো খারাপ কিছু হয় নাই?
চিত্রা মুচকি হাসলো। লাজুক কন্ঠে বলল, মনে হয় আপনের মনের আশা পূরণ হইতে যাইতাছে।
মানে ? ও বউ মানে কি আমারে বুঝাইয়া কও?
বিয়ের পর থেইকা আমার এখনো শইল খারাপ হয় নাই।
সেইটা তো আমি জানি। আইজ ক্যান খারাপ হইলো?
আরে এই খারাপ সেই খারাপ না। বুঝেন না আপনি?
ঘোমটার আড়ালে নিজের মুখটা লুকিয়ে ফেলল চিত্রা।
রূপক আরও অস্থির গলায় বলল কি হইছে তোমার বউ। তোমার কি খারাপ লাগতাছে?
চিত্রা মুচকি হেসে বলল, এগুলো আপনি বুঝবেন না। আপনি একটু আম্মারে আসতে কন।
রূপক উঠে দাওয়ায় চলে গেল। জোসনা বেগম ভাত খাচ্ছেন। ছেলের বউয়ের বাড়তি এই উঠে যাওয়ার ঘটনায় তার খাওয়া বন্ধ হয়নি। বরং তিনি আরো জোরে জোরে রাগের বশে ভাত গপগপ করে গিলছেন। ভীষণ মেজাজ খারাপ হয়ে গেছে তার। চিত্রার ভাব দেখে মনে হচ্ছে জোসনা বেগম তাকে বিষ খাইয়েছেন। এসব ঢং ওনার পছন্দ না।
রুপক এসে জোসনা বেগমকে বলল আম্মা চিত্রার কাছে একটু যাও তো। দেখো তো ওর কি হইছে? ওর নাকি বমি আসতাসে। ভাত খাইবার পারতাছে না।
জোসনা বেগম ভ্রু কুঁচকে চোখ বড় বড় করে রূপকের দিকে তাকিয়ে রইলেন। বিষয়টা তিনি আন্দাজ করতে পেরেছেন। ভাতের প্লেট নামিয়ে রেখে হাত ধুয়ে তিনি উঠে গেলেন চিত্রার সাথে কথা বলতে।
চিত্রা লজ্জায় কোন কথা বলতে পারছে না। জোসনা বেগম নিজে থেকে জিজ্ঞেস করলেন কী হইছে বউ।
চিত্রা চুপ করে রইলো। কিছুক্ষণ পর আমতা আমতা করে বললো, আম্মা খুব বমি আসতেছে।
শইল খারাপ হইছিল কোনদিন?
বিয়ার আগে। এরপর তো আর হয় নাই।
বুঝছি । কাইল সকালে তোমার একখান জিনিস আইনা দিমু। ওইটা দিয়া পরীক্ষা কইরা দেইখো।
চিত্রা জানে শাশুড়ি মা কি পরীক্ষা করার কথা বলছেন। লজ্জায় সে আরো মাথাটা নিচু করে ফেলল। আঁচলে মুখ ঢেকে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল চিত্রা।
জোসনা বেগম নরম গলায় বললেন, দুইটা ভাত খাইয়া লও। সারাটা দিন তো কিছুই খাও নাই।
জোসনা বেগমের পিছু পিছু দাওয়ায় এসে বসল চিত্রা। রূপক খুব অস্থির চোখে বারবার তার দিকে তাকাচ্ছে। তার আদরের বউয়ের হঠাৎ করে কি হল সে বুঝতে পারছে না। দুশ্চিন্তার ছাপ রূপকের চোখেমুখে। এমন হওয়াটাই হয়তো স্বাভাবিক। চিত্রা নামের মেয়েটা যে এই কয়েকদিনের তার অর্ধেক অংশ হয়ে উঠেছে। তাইতো চিত্রার কিছু হলে তার হৃদপিণ্ড কেঁপে উঠবে। চিত্রাকে ছাড়া বাঁচতেই পারবে না সে। বাকি ভাত রূপক ভালোমতো খেতে পারল না। মায়ের সামনে চিত্রার প্রতি দরদ দেখাতে লজ্জা করছিল। তাই বারবার চিত্রার দিকে খেয়াল করে মাথা নুইয়ে ভাত খাচ্ছিল রূপক।
খাওয়া শেষ করে ঘরে আসতেই রূপক চিত্রাকে জিজ্ঞেস করল তোমারে কি ওষুধ আইন্না দিমু? ডাক্তারের দোকান এখনো খোলা আছে।
ওষুধ লাগবোনা।
লাগবো না কেন? তুমি তো কইলা তোমার শরীর খারাপ হইছে।
ওইসব আপনার বুঝতে হইবো না।
আমি বুঝছি তোমার কি হইছে?
কী হইছে কন তো দেখি।
মাইয়াগো প্রতি মাসে যা হয়।
অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল চিত্রা। হাসতে হাসতে মুখ শাড়ির আঁচলে লুকালো। রুপক তার হাসির কারণ জানতে চাইলে চিত্রা বলল আপনার জানতে হইব না। এখন ঘুমান। সারাটা দিন কই আছিলেন আপনে?৷
আর কইও না। মন মেজাজ খুব খারাপ হইয়া গেছিল। মাঠে গিয়ে বইসা ছিলাম।
আর আমরা দুইটা মানুষ বাড়িতে চিন্তায় চিন্তায় মইরা যাই। আর কখনো এমন কাম করবেন না। আমরা টেনশনে থাকি আপনি বুঝেন না?
না গেলে তো টেনশনটা হইতো না। সবকিছু ঠিক হইতো না। তুমি আর আম্মা মিইলা ঝগড়া কইরা বাড়ি মাথায় তুলতা। এ বাড়িতে থাকা যাইতো না। এইযে রাইতে ভাত খাইলাম এইটাও হইতো না। বাড়িতে আমি ছিলাম না, মা আমার জন্য আমার পছন্দের খাবার রান্না কইরা রাখছে। এখন বুঝছো মাঝে মাঝে একটু রাগ করতে হয়।
চিত্রা মুচকি হেসে বলল, হ, আপনার রাগে কামে দিছে। সকালে আমি কি যে ভয় পাইছিলাম। ভাবছিলাম সবকিছু বুঝি শেষ হইয়া যাইতাছে। আর কোনোদিনও এমন কাম করবেন না।
রাত বাড়লে পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ হয়ে উঠল। কিন্তু ঘুম এলোনা চিত্রার চোখে। অস্থির হয়ে রইল। সত্যি সত্যিই সে রূপকের সন্তানের মা হয়ে যায় তবে এটাই হবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের বিষয়। কারণ রূপক এটাই চেয়েছিল। রূপকের আশা যেন পূরণ হয় মনে মনে সেটাই প্রার্থনা করতে লাগল চিত্রা।
ভোর হলো। আজকের সকালটা প্রতিদিনের সকালের মতো নয়। একবুক উত্তেজনা নিয়ে চিত্রা ঘুম থেকে উঠেছে। ঘরের বাইরে আসতেই জোসনা বেগমের সঙ্গে চোখাচোখি হল। তিনি মনে হচ্ছে চিত্রার অপেক্ষাতেই ছিলেন। চিত্রা তার দিকে না তাকিয়ে পায়খানার (টয়লেটের) দিকে যাচ্ছিল। জোসনা বেগম ডাক দিয়ে বললেন, খাড়াও । কই যাইতাছো?
চিত্র শংকাগ্রস্ত মুখে দাঁড়িয়ে পড়ল। মনে হলো এভাবে তার যাওয়াটা উচিত হচ্ছে না। কিন্তু কারন বুঝতে পারল না সে।
জোসনা বেগম বললেন, আমার লগে আসো।
জ্যোৎস্না বেগমের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ালো চিত্রা। কাপড়ের আড়ালে তিনি একটা কাঠি চিত্রার হাতে দিলেন। সকালের প্রথম প্রস্রাব দিয়ে কিভাবে পরীক্ষা করতে হবে সেটাও শিখিয়ে দিলেন চিত্রাকে।
কাঠি হাতে নিয়ে পায়খানার (টয়লেটের) দিকে যেতে যেতে চিত্রার হাত-পা থরথর করে কাঁপছিল। সে জানে না তার সঙ্গে কি ঘটতে চলেছে। আজকেই হয়তো তার জীবনের মোড় ঘুরে যাবে। মা হবে সে। রূপকের সন্তানের মা। আর কোন ঝড় ঝাপটা তাদেরকে কখনো আলাদা করে দিতে পারবে না। মনে মনে প্রার্থনা করতে করতে ব্যাকুল হয়ে রইলো চিত্রা।
রূপকের চোখে ঘুম। চিত্রার ধাক্কায় তার ঘুম ভাঙলো। বিরক্ত হল রূপক। চোখ কচলে চিত্রার দিকে চেয়ে সে জানতে চাইল, কি হইছে? এত ভোরে ডাকতাছো ক্যান?
চিত্রার চোখ ভেজা। লম্বা করে ঘোমটা টেনে রেখেছে। ঘোমটা সরিয়ে দিতেই ভেজা চোখ দেখে রূপকের বুক শুকিয়ে গেল। আজ সকালেও নিশ্চয়ই মায়ের সঙ্গে কোনো ঝামেলা হয়েছে।
রূপক বলল কি হইছে? কথা কইতাছো না ক্যান?
চিত্রার বুক কাঁপছে। কিছু বলতে পারছেনা। সর্বাঙ্গ কাঁপছে থর থর করে। অনেকক্ষণ পর যখন রূপক অধৈর্য হয়ে আবার বালিশে শুয়ে পড়েছে তখন চিত্রা মৃদু স্বরে বলল, একখান সুখবর আছে।
রূপক মুখ তুললো না। উপুড় হয়ে বালিশে শুয়ে সে জানতে চাইল, কি?
আপনি বাবা হইতেছেন।
মুহূর্তেই তড়াক করে বিছানার উপর লাফিয়ে উঠে বসল রূপক। পলকেই ঘুম চলে গেল তার। অবাক চোখে বড় বড় চোখ করে চিত্রার দিকে তাকিয়ে রইল। চিত্রাকে ঝাকুনি দিতে দিতে রূপক বলল, সত্য কইতাছ? ও বউ তুমি যা কইছো তা সত্য? কওনা সত্য কইতাছো?
চিত্রা লজ্জায় রূপককে জরিয়ে ধরল। মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, হুম। আর কিছুই বলতে পারলোনা। চোখ বেয়ে ঝর-ঝর করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল।
রুপক আনন্দে হইহুল্লোড় করে উঠলো। লুঙ্গি ভালো করে বেঁধে দৌড়ে বাইরে বেরিয়ে এলো রূপক। তার মাকে ডাকতে ডাকতে বলল ওমা শুনতেছ। এদিকে আসো। আরে খবর শুনছো।
জোসনা বেগম বেরিয়ে এলেন। তিনি শুনেছেন। চিত্রা নিজের ঘরে যাওয়ার আগে তার কাছে জানিয়ে গেছে কথাটা। মূলত তিনিই নিশ্চিত করেছেন চিত্রাকে। তিনি মৃদু স্বরে বললেন কি হইছে চুপ কর। এত আমোদ করতাসোস কেন?
আমোদ করুম না। আরে তোমার নাতি আসতাছে। তুমিও আমোদ করো।
এত ফাল পারিস না। ।
রুপক তার মায়ের হাত ধরে নাচাতে নাচাতে বলল আরে আনন্দতো করমু। আমি যখন তোমার কোলে আইসিলাম তোমরা কি আনন্দ করো নাই। আমার বাপে কি খুশি হয় নাই? বাপ হওয়ার যে কি আনন্দ সেটা আমার বাপে ভালো জানে।
জোসনা বেগম হাসলেন। তিনি খুশি হয়েছেন। তবে খানিকটা বিরক্তও হয়েছেন । এত তাড়াতাড়ি ছেলে বাবা হয়ে যাক সেটা তিনি চাননি। এমনিতেই সংসারের দায়িত্ব হঠাৎ করে রূপক সামলে উঠতে পারছে না। তার ওপর নতুন বউ। এখন আবার বউয়ের সঙ্গে সঙ্গে নতুন বাচ্চা। সবকিছুকে রূপক সামলাবে কি করে? সেসব ভাবছেন তিনি। তবে এসব ভেবে এখন আর কোনো লাভ নেই। ছেলের আনন্দ দেখে তার বুকটা ভরে গেছে। হঠাৎ করেই তার মনে হলো উনার ছোট্ট সেই রুপক অনেক বড় হয়ে গেছে। বাবা হয়ে যাচ্ছে তার ছোট্ট ছেলেটা।
রূপক পুকুর পাড়ে যেতে যেতে বলল গোসল দিয়ে আসি। দোকানে যামু। মিষ্টি আনতে হইব। আরে আমি বাপ হইতাছি।
আনন্দে হইচই করতে করতে রূপক পুকুরে লাফ দিল। কলকল শব্দ তুলে কয়েকবার ডুব দিয়ে দ্রুত উঠে এলো। চিত্রাকে ডেকে বলল, ওগো আমার গামছাটা দিয়া যাও।
চিত্রা গামছা হাতে নিয়ে দৌড়ে পুকুরপাড়ে এল।
রূপক বলল, আরে আস্তে আস্তে। দৌড়ানির দিন শ্যাষ। এখন থাইকা পা টিইপা হাঁটবা।
চিত্রা লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। এখন কারো সামনে যেতেই তার লজ্জা লাগছে। নিশ্চয় এতক্ষণে আশে পাশের বাড়ির সবাই জেনে গেছে কথাটা। শাশুড়ি মা কিংবা রুবিনা হয়তো সবাইকে বলে এসেছে। সবাই কি ভাবছে তাকে নিয়ে? ইস কত লজ্জা লাগছে তার।
রূপকের কথায় সম্বিত ফিরল চিত্রার, দেখতো কান্ড । খালি গামছা নিয়ে আসছো। লুংগি আনবো কে? আমার পোলা?
কথাটা শুনে ফিক করে হেসে ফেললো চিত্রা। একই সঙ্গে তীব্র লজ্জাও পেল। বলল, থামেন তো আপনি। লাজ শরম কিছু নাই ।
রূপক হাসতে হাসতে বলল কিসের লাজ শরম। আমি আমার মায়ের পোলা। আমার মা আমারে পোলা পরিচয় দিতে কী শরম কর? তুমি আইজ থাইকা শরম পাইবা না।
চিত্রা লম্বা করে ঘোমটা টেনে দিল। তারপর ঘর থেকে লুংগি এনে দিল রূপককে। লুঙ্গি বদলানোর পর প্রতিদিন পুকুরঘাটে লুঙ্গিটা ফেলে যায় রূপক। আজকের লুঙ্গি বদলে ভেজা লুঙ্গিটা নিয়ে সে নিজেই পুকুর থেকে ধুয়ে ফেলল। ভীষণ অবাক হল চিত্রা। বিস্মিত চোখে সে রূপকের দিকে তাকিয়ে রইল। রূপক লুঙ্গির পানি ফেলে দিয়ে লুঙ্গি শুকাতে দিল। তারপর হাসিমুখে চিত্রাকে বলল, এখন তোমার রেস্ট নেওয়ার সময়। সবকিছু তোমার লাইগা ফালায় রাখলে তো হইবো না। পান্তাভাত থাকলে দেও দুইটা খাইয়া দোকানে যাই। মিষ্টি নিয়া আসি।
মাথাটা খারাপ হইছে আপনার। এত সকালে কোন দোকানদার মিষ্টি নিয়ে বইসা রইছে আপনার লাইগা?
আরে দোকানদারকে ক্যান লাগবো? দোকানে না পাইলে দোকানদারের বাড়ি থাইকা মিষ্টি নিয়া আসব।
ম্যালা সময় পইরা রইছে । এত অস্থির হইয়েন না ।
তুমিও যে কথা কও আম্মাও সেই কথা কয়। আমি যে পোলার বাপ হইতাছি সেটা কেউ বুঝতেছেনা। বাড়িতে আসমু না সারাদিন। হইছে এবার খুশি তোমর?
চিত্রা শঙ্কায় মুখ কালো করে ফেলল, না না এমন কথা কইয়েন না। কালকের মতো আর পাগলামি কইরেন না। সময়মতো বাড়িতে আইসেন।
হ, সেই জন্যই তো কইতাছি দুইটা মিষ্টি নিয়া আসি। আমাদের দুইটা পান্তাভাত থাকলে দাও।
চিত্রা রান্নাঘরের দিকে এগিয়ে গেল। যেতে যেতে তার মনে হল এ জীবনটা ভীষণ সুন্দর। তার জীবনে আসা এই পুরুষ মানুষটি অন্যরকম একজন মানুষ। গোলাপ ফুলের মতো সুন্দর নিষ্পাপ একটা মানুষ। চিত্রা রূপককে ভালোবাসে। তার সন্তানের মা হতে পারাটা চিত্রার জন্য গৌরবের। এই সুখ যেন তার কপালে চিরস্থায়ী হয়।
একজন পুরুষ মানুষের জীবনে বাবা হতে পারাটা সবচেয়ে গৌরবের। সে যে অবস্থাতেই থাকুক না কেন বাবা হওয়ার খবরে সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হয়। রূপকের হৃদয়টা আনন্দে টইটুম্বুর। সে বাড়ি ফিরল দুই কেজি মিষ্টি নিয়ে। চিত্রা সবেমাত্র চুলা থেকে গরম গরম তরকারি নামিয়েছে। রূপক বাড়িতে পা দিয়েই চিৎকার করে বলতে লাগল, মা তুমি কই? এই রুবিনা নাজমা তোরা কই? সাইদুল কইরে। সব এখানে আয় দেখ কি লইয়া আইছি। আজকে তোরা মিষ্টির শিরা দিয়া গোসল করবি।
রূপকের চিৎকার-চেঁচামেচিতে সবাই এসে হাজির হলো। ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন রূপকের বাবা। বাবাকে দেখে খানিকটা সংকোচ হলো রূপকের। সে আর আগের মত হইচই করতে পারলো না। মিষ্টির প্যাকেট গুলো রুবিনার হাতে তুলে দিয়ে বলল, সবাইরে মিষ্টি দে। যে যতটা খাইতে পারে তারে ততটাই খাওয়া।
জোসনা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বললেন, রুবিনা তুই এই পাগলের কথা শুনিস না। এক প্যাকেট মিষ্টি ঘরে রাইখা আয়। আর এক প্যাকেট থাইকা সবাইরে দে।
রূপক বলল, আরে মা কিপটামু করতাছো কেন? সবাইরে মিষ্টি দিয়ে আজকে স্নান করামু।
তুই চুপ থাক। তোর মাথার তার ছিইড়া গেছে। দুইটা গরম ভাত খাইয়া তুই দোকানে যা।
আইজ এক্কেরে দুপুরের ভাত খাইয়া তারপর দোকানে যামু।
কথাটা শুনে মনটা আনন্দে নেচে উঠল চিত্রার। রূপক আশে পাশে থাকলেই তার পৃথিবীটাকে স্বর্গ মনে হয়। রূপক দুপুরবেলা দোকানে যাবে। তারমানে পুরোটা সময় তারা দুজন কাটাতে পারবে একসঙ্গে। সে তড়িঘড়ি করে রান্নাঘর থেকে উঠে পুকুর পাড়ে যায় হাত মুখ ধুতে। চুলার আঁচে তার গা ভিজে উঠেছে। ভিজে গেছে শাড়ির নিচে থাকা ব্লাউজ। চিত্রা ভালো করে পুকুরে নেমে হাত মুখ ধুয়ে ফেলল। পুকুর থেকে ওঠার সময় রূপক এসে দাঁড়াল তার সামনে। রূপকের চোখের দিকে তাকাতে লজ্জা করছিল চিত্রার।
রুপক বলল, বউ তোমার লাইগা একখান জিনিস আনছি।
কি জিনিস?
আনছি একখান জিনিস। ঘরের আসো তোমারে দেখামু।
আপনি এইখানে ক্যান আইছেন?
তোমারে দেখতে আইছি। আমার পোলারে পেটে ধইরাই তুমি দেখি সুন্দর হইয়া গেছো।
চিত্রা লজ্জায় লাল হয়ে উঠলো। বলল, আপনার খালি ঢং এর কথা। এখন এখান থাইকা যান। সবাই দেখলে আমারে নিয়া হাসাহাসি করব। ঘরে যান আমি আসতাছি।
হাসাহাসি ক্যান করব। তুমি আমার বউ না?
সবার ঘরে বউ আছে। সবাই আপনের মত এত ঢং করে না।
এইডা কি কথা কইলা বউ? আমি ঢং করি? আমিতো তোমার লগে একটু পিরিতি করি।
পুকুরঘাটে পিরিতি করতে হইবো না তো। পিরিত যা দেখানোর ঘরে দেখাইয়েন। এখন এখান থাইকা যান।
ঘরে চলে এলো রূপক। তার পিছুপিছু চিত্রা ঘরে ঢুকতেই রূপক এসে দরজা ভেজিয়ে দিল। তারপর পকেট থেকে বের করল একটা লাল প্লাস্টিকের কৌটা। ভেতরে জ্বলজ্বল করছে একটা গলার চেইন। বাজারের মোড়ে জুয়েলের কসমেটিকের দোকান থেকে ইমিটেশনের একটা চেইন কিনে এনেছে রূপক। অন্য পকেট থেকে বের করল আরও একটা গোল কৌটা। সেখান থেকে বের করল দুইটা হাতের চুরি।
চিত্রার চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে উঠল। আনন্দে ঝলমল করতে করতে লাগলো চিত্রা বললো, এগুলো ক্যান আনছেন?
আমার বউয়ের জন্য আনছি। বউটারে তো কিছুই দিতে পারিনা।
আমার কিছুই লাগবো না। সবই তো আছে। আগের চুড়িগুলান এখনো নতুন আছে। আইজ আবার ক্যান আনছেন?
তাতে কি হইছে? রাইখা দাও। সামনে তো আর একটা দাওয়াত আছে। তখন হাতে পইড়া যাইবা।
চিত্রা খাটের নিচ থেকে তার কাপড়-চোপড়ের সুটকেস বের করল। সেখানে পরম যত্নে রাখা আছে তার বিয়েতে পাওয়া সাজসজ্জা সামগ্রী। চুরি ও চেইনটা সেখানে ঢুকিয়ে রাখল চিত্রা।
রূপক বলল, আরে করতাছো কি? একটু গলায় পইরা আমারে দেখাও।
এখন না। সবাই কি ভাববে?
যা ইচ্ছা ভাবব।
চিত্রা এই প্রথম রূপকের চোখে চোখ রেখে খুব আবেগী গলায় একটা কথা বলল ,আপনি এত ভালো মানুষ ক্যান?
কথাটা হৃদয় স্পর্শ করল রূপকের। সে চিত্রার কোমল মুখটাকে দুই হাতে ধরে চোখে চোখ রেখে বলল, ভালা বউয়ের স্বামী কি খারাপ হইবো?
চিত্রার মুখটা হঠাৎ করে অন্ধকারে ছেয়ে গেল। ভালো বউ! সেকি ভালো বউ? তার শাশুড়ির কাছে সে এখনো পছন্দসই মেয়ে হয়ে উঠতে পারেনি। জানেনা কিভাবে ভালো বউ হয়ে ওঠা যায়। স্বামীর মুখ থেকে কথাটা শুনতে তার ভিষণ ভালই লাগলো। তবে একই সঙ্গে কষ্ট হতে লাগলো। স্বামী কি খারাপ হইবো কথাটা তার বুকে আঘাত করেছে। সে তো পূর্বেও ভালো বউই হতে চেয়েছিল। সোহরাব উদ্দিন তাঁকে কার হাতে তুলে দিয়েছিল সে সব কিছুই ভাবেনি চিত্রা। বাবা তাকে যার সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিল তার হাত ধরেই বাড়ি ছেড়েছিল সে। অথচ সেই মানুষটা তাকে বিক্রি করে দিয়েছিল এক শয়তানের কাছে। একজন মানুষ কতটা খারাপ হলে নিজের কুমারী স্ত্রীকে পর পুরুষের কাছে বিক্রি করে দিতে পারে। অবশ্য লোকটা বিক্রি করার জন্যই বিয়ে করেছি। চিত্রার মন গ্লানিতে ভরে গেল। ভালো বউয়ের স্বামী কখনো খারাপ হয় না। তবে সে কি ভাল ছিলনা? নাকি তার কপালটা খারাপ ছিল। চিত্রা আর কপালকে কোনো দোষারোপ করবে না। তার জীবনে রূপক এসেছে। এখন থেকে ওকে ঘিরেই তার সমস্ত কিছু আবর্তিত হবে। সে একেবারেই দুর্ভাগা নয়। রুপক তার সৌভাগ্য।
দেখতে দেখতে কেটে গেল দুটো মাস। রূপকের পরম আদরে ও যত্নে মাখামাখি হয়ে আছে চিত্রা। প্রতিদিন দোকান থেকে ফেরার সময় কোন না কোন খাবারের জিনিস নিয়ে ফেরে রূপক। কখনো বা মাথার তেল, চুল বাঁধার হেয়ার ব্যান্ড, কিংবা কখনো নিয়ে ফেরে দোকানের সবথেকে সুন্দর শাড়ি।
আজকাল জোসনা বেগম রীতিমত ঈর্ষান্বিত বোধ করেন ছেলের এই আদিখ্যেতা দেখে। কোন এক অজানা কারণে এসব সহ্য হচ্ছে না ওনার। তাই তিনি সবসময় খেমটা মেরে কথা বলেন চিত্রার সঙ্গে। সাইকেলের বিষয়টা পুরোপুরি ধামাচাপা পড়ে গেছে। রুপক সাইকেলটা কিনেছে সেটা নিয়ে সে দোকানে যাতায়াত করে। গত দুই মাসে একবারের জন্যও খোঁজ নেয়নি চিত্রার ফুপাতো ভাই কিংবা ভাইয়ের বউয়েরা। চিত্রা বেশ বুঝতে পারছে সাইকেলের আশায় বসে থাকলে এতদিনে তার সংসারে অশান্তির আগুন জ্বলত। ভাগ্যিস তার স্বামী নিজে থেকেই কিনে ফেলেছে সাইকেলটা। নয়তো কি যে হত তার কপালে? সকাল থেকে চিত্রা এই কথায় ভাবছিল।
হঠাৎ করে সে শুনতে পেল জোসনা বেগম একজনের সঙ্গে রীতিমতো জোর গলায় কথা বলছে, কি আর কমু রে বইন। জনমভরা দুঃখ। এত ভালো পোলা আমার। নায়কের মত চেহারা। বাপের দোকান নিজেই সামলায়। এখন আবার দর্জির কাম শিখছে। একবার দোকান দেখে একবার দর্জির কাম করে। এত কামাই রোজগার করে আমার পোলায়। এক ফকিরের বেটিরে বউ কইরা আনছি। আমার পোলারে একটা সুতা পর্যন্ত দিল না। অন্য কোথাও বিয়ে দিলে আমার পোলারে যেমন সাজাইয়া দিত পোলার ঘরদোর সব সাজাইয়া দিত। এত বড় টিনের ঘর তুলছে আমার পোলায় অথচ ঘরটা পুরা ফাকা। ফুটবল খেলার মাঠ হইয়া গেছে ঘর। কোন জিনিস পাতি নাই। পোলা আমার দুইটা টাকা কামাই কইরা নিজের আয় করব না ঘরের জিনিস করব? অন্য কোথাও বিয়া দিলে কতইনা জিনিস পাইতো আমার পোলাডা।
চিত্রার কানে কথাগুলো আসতেই তার বুকের ভিতর চিনচিন করে বেজে উঠলো। আজ এতদিন পর তার শাশুড়ি মা আবার যৌতুকের বিষয়ে কথা বলছেন। তবে এই কথাটা হয়তো সে শুনতে পারছে তার আড়ালেও নিশ্চয়ই সবাইকে তিনি এসব বলে বেড়ান। এসব ভেবেই ভয়ে তার বুক কেঁপে উঠতে লাগলো।
চিত্রা আড়াল থেকে দেখার চেষ্টা করল তিনি কথাগুলো কাকে বলছেন। দেখতে পেল পাশের বাড়ির দু জন মহিলা। ওনারা অবাক হয়ে রূপকের মায়ের কথা শুনছেন। ওনারা মৃদুস্বরে কি বলল চিত্রা তা শুনতে পেল না। সে দূর হতে দেখল তার শাশুড়ি মা বিড়বিড় করে তাদেরকে কি যেন বলতে লাগলো।
চিত্রার মন খারাপ হয়ে গেল। জোসনা বেগম তার ব্যাপারে দুর্নাম করছে না তো?
চিত্রা মন খারাপ করে শুয়ে রইলো। রাতে রূপক বাসায় ফিরলে জিজ্ঞেস করল, আপনারে একটা কথা জিগাই।
হ বউ কও।
আপনের কি মাঝে মাঝে মনে হয় অন্য কোথাও বিয়ে হইলে অনেক জিনিসপাতি পাইতেন?
এই কথা জিগাইতাছ ক্যান ?
আমারে বিয়া কইরা আপনি কিছুই পান নাই । জামাইয়ের খাতির সম্মানটুকুও পান নাই ।
আমি কি কখনো তোমারে সেসব কথা কইছি?
কন নাই । কিন্তু মনে মনে কি দুঃখ পান না?
না পাই না । আমি তোমারে নিয়ে খুশি আর তাছাড়া এই রূপক মানুষের জিনিস আশা করেনা।
চিত্রা ভীষণ আশ্বাস পায়। রূপকের এই ধরনের কথাগুলো তাকে শান্তি দেয়। তখন নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে হয়। ইচ্ছে করে হাজার বছর বেঁচে থাকতে রূপকের বুকে।
চিত্রা সব সময় ভয় পায় এত সুখ তার কপালে সইবে তো? তার এই শঙ্কা বাস্তবে রূপান্তরিত হতে আর খুব বেশি দেরি নেই। সে ধারণাও করতে পারছে না ভবিষ্যতে কি অপেক্ষা করছে তার জন্য!
চলবে..