#_ধরো_যদি_হঠাৎ_সন্ধ্যে
#_পর্বঃ ০৮
#_আরজু_আরমানি
” সবার জন্য অলক্ষুণে ও। যেখানে থাকবে সেখানেই অঘটন ঘটিয়ে ছাড়বে।”
বড় ফুপির এই জঘন্য কথার মানে আমি খুব ভালো করেই বুঝতে পারছি। তার ছেলেকে রিফিউস করার জন্য এখন আমি তার চক্ষুশূল। এই কথা শোনার পর তো আমার প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু নাহ। আমি প্রতিবাদ করলাম না। খাবার খেয়ে নিজের রুমে ফিরে এলাম। আজ আকাশে প্রচন্ড মেঘ করেছে। পুরো আকাশ কালো হয়ে আছে। কোথাও এক টুকরো নীল আকাশের দেখা মিলছে না। আমি হাতে একটা ছাতা নিয়ে বের হলাম। উদ্দেশ্য কোথাও যাওয়া নয়। তবে বৃষ্টিতে ভিজবো। বাতাস শুরু হয়ে গেছে। ধুলো- বালি উড়ছে। নাকে -মুখে এসে পরেছে। পাশের বিল্ডিংয়ের মনোহর কাকার বাগানে প্রায়ই ভিজতে আসে অনেকে। আমি আজ ওখানেই যাবো। ভদ্রলোক একাই থাকেন। তার স্ত্রী মারা গেছেন অনেক বছর হয়েছে। একটা ছেলে আছে সে ইতালি থাকে। ওখানেই বিয়ে করে সেটেল্ড হয়েছে। দেশে আসেনা। শুধু টাকা পাঠিয়ে দেয়। ঝুম বৃষ্টি নামছে। চুলের বাঁধন আলগা করে দিতেই চুলগুলো পিঠময় ছড়িয়ে গেলে। আকাশের দিকে মুখ করে হাত দুই দিকে প্রসারিত করে দাড়ালাম। বৃষ্টির ফোঁটা গুলো এসে মুখে পরছে। সারা শরীর ভিজিয়ে দিচ্ছে। অন্যরকম একটা প্রশান্তি এসে ভর করলো আমার মুখে।
” ও মেয়ে আর ভিজোনা। জ্বর আসতে পারে। এখনের বৃষ্টি তেমন ভালো না।”
কথাটা শুনে চোখ মেলে তাকালাম। মনোহর কাকা তার বারান্দায় বসে আছে। তিনিই কথাগুলো বললেন। আমি তাকে বললাম,
” কিছু হবেনা কাকা।”
তাকে ঠোঁট নাড়াতে দেখা গেলো। তবে কি বললেন তা আমি বুঝলাম না। বৃষ্টির তোড় কমে আসছে। আকাশ প্রায় তার আকাশী বরন ধারন করা শুরু করছে। হয়তো কিছুক্ষনের মধ্যে বৃষ্টি থেমে যাবে। আমি আমার বাসার দিকে হেটে আসছি। দেখলাম তাহমিদ ভাইয়া গাড়ি পার্ক করছেন। নতুন গাড়ি কিনেছেন। তারমানে খুব শিগ্রই তার বিয়ে। কেননা একবার তিনি বলেছিলেন,
” যখন বিয়ে করবো, তার ঠিক একসপ্তাহ আগে নতুন গাড়ি কিনবো।”
আমি নিজের রুমে ফিরে এলাম। এখনো বড় ফুপি ড্রয়িং রুমে বসে আছে। আজকাল তিনি একটু বেশিই আসছেন আমাদের বাসায়। কারন আমি জানিনা। ড্রেস পাল্টে টেবিলে বসেছি। ইন্টারের বই- খাতা সব কেনা শেষ। এখন শুধু পড়া বাকি। সাহিত্য বইটা নামালাম পড়ার জন্য। একটু পড়া শুরু করতেই ফোন আসলো। পূর্বে কখনো কেউ ফোন করলে ভীষন বিরক্ত হতাম। আজব ব্যাপার আজ বিরক্ত হলাম না।তবে ভালো লাগলো। ইদানীং এই ফোন কলটা আমার প্রশান্তির কারন হয়ে গেছে। কেন তা আমি জানিনা। আমার অনেক প্রশ্নের উত্তর আজকাল জানিনাই হয়। রিসিভ করলাম,
” বৃষ্টিতে ভিজেছো আজ রাত্রি? ”
কন্ঠস্বরটা কেমন যেনো কাঁপা কাঁপা। কথা থেমে থেমে আসছে। আমি বুঝতে পারলাম সাদ নিশ্চয়ই অসুস্থ। কি হয়েছে তার? আমি তার করা প্রশ্নের জবাব না দিয়ে নিজেই প্রশ্ন করে বসলাম,
” আপনি কি অসুস্থ? ”
তিনি একটু কাশলেন। নাক টেনে টেনে বললেন,
” একটু- আধটু।”
“ওহ।”
” বললেনা তো, তুমি আজ বৃষ্টিতে ভিজেছো কিনা?”
আমি হেসে জবাব দিলাম,
” হ্যাঁ। ওই আপনার মতো একটু – আধটু।”
” উহু, অনেক।”
আচমকাই হাঁচি দিয়ে ফেললাম আমি। একটা নয় কয়েকটা। আমি দ্রুত ফোন মিউট করলাম। নাক টেনে টুনে ঠিক হয়ে ফোন আনমিউট করতেই সাদ বললেন,
” এইতো শুরু হয়ে গেছে। এবার হিস্টাসিন খেয়ে নাও। ঠিক হয়ে যাবে।”
ফোন রাখলাম। ভালো লাগলো তার করা এই শাসনটুকু। আজকাল আর তার সাথে আমার ঝগড়া হয়না। মনেহয় আমরা বন্ধু – টন্ধু হয়ে গেছি। সে ইদানীং আমাকে নিয়ম করে দুবেলা ফোন করে। খরর নেয়। আমি সেধে তাকে ফোন করিনা। তবে কথা বলি।
————————————-
বিকাল থেকেই কাঁঁপিয়ে জ্বর এসেছে। রুমের দরজা – জানালা বন্ধ করে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছি। বাইরে এখনো শো শো আওয়াজে বাতাস বইছে। মাঝে মাঝে কিছু বাতাস ভেন্টিলেটর দিয়ে ঢুকে যাচ্ছে। জ্বরের মাত্রা বাড়ছে। আজ নেহাকে পড়াতে যাইনি। সারাদিন বৃষ্টি ছিলো। জ্বরের ওষুধ খাইনি। বাসায় জ্বরের ওষুধ আছে কিনা তাও আমি জানিনা। পাশে থাকা ফোনটা এক পর্যায়ে রিং বেজে উঠলো। আমি হাতড়িয়ে ফোনটা রিসিভ করে হ্যালো বলতেই অপর প্রান্তের লোকটা বললেন,
“পূর্ব পাশের জানালাটা খুলে দাও তো।”
অবাকের চূড়ায় পৌছালাম। সাদ কি করে জানেন আমার রুমের পূর্ব পাশে একটা জানালা আছে? এখান থেকে শুধু মনোহর কাকার বিল্ডিং দেখা যায়। এতো রাতে সাদ এখানে কি করছেন? আজ তো বৃষ্টি ছিলো। প্লে গ্রাউন্ডে তো আজ কেউ খেলতে আসেনি। চিন্তা করে ব্যর্থ হলাম। আমাকে চুপ থাকতে দেখে তিনি আবার বললেন,
” রাত্রি খুলে দাও জানালা টা।”
” আপনি কোথায়? ”
” মনোহর আংকেলের থেকে একটা রুম ভাড়া নিয়েছি। ওখানেই আছি। প্লিজ জানালা টা খুলে দাও।”
তার এই সত্যি বলার সৎ সাহসটা আমার ভীষন ভালো লাগে। তিনি মিথ্যা বলেন না। আমি তাকে বললাম,
” বাইরে খু্ব ঠান্ডা বাতাস বইছে। জানালা খোলা যাবেনা।”
” আচ্ছা। ”
তিনি ফোন কেটে দিলেন। আমার পুরো শরীর থরথর করে কাপছে। আমি বুঝতে পারছি জ্বরের মাত্রা তীব্র হচ্ছে। তিশাকে ফোন করে একটা জ্বরের ওষুধ দিয়ে যেতে বললাম। কিছুক্ষনের মধ্যেই ও চলে এলো। শুধু ওষুধ নয় খাবারও নিয়ে এসেছে। খাবার খেয়ে ওষুধ খেয়ে শুয়ে পরলাম।
————————
আজ শুক্রবার। সকাল সাড়ে পাঁচটা। আজ নামাজ পড়তে উঠতে একটু দেরি হয়েছে। নামাজ পড়ে রান্নাঘরে গেলাম। লতিফা খালা চা বানাচ্ছেন। আমি এসেছিলাম কফি বানাতে। কিন্তু চা দেখে আর কফি বানাতে ইচ্ছে হলোনা। এক কাপ চা নিয়ে এসে বারান্দায় বসলাম। চায়ের সঙ্গে আবার মুড়িও আছে। একহাতে চায়ের কাপ। অন্য হাতে মীর মোশাররফ হোসেনের বিষাদ – সিন্ধু বইটা। অনেক দিন হলো এটা কিনেছি। তবে পড়া হয়নি। আজ থেকে এটা পড়বো। আজ আর বৃষ্টির কোনো আয়োজন নেই। আকাশ নীলের আবরেন আবরিত। আমার জ্বর এখনো আছে। তবে শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে না। চারপাশ থেকে পরিচিত কিছু ফুলের ঘ্রান আসছে। তাদের নামটা ঠিক মনে পড়ছে না। চায়ের কাপে চুমুক দিতেই একটা তরল খুশি যেনো নেমে গেলো গলা বেয়ে। এরকম সময়গুলোতে কোনো অজানা কারনে নিজেকে ভীষন খুশি মনে হয়। আজ ভীষন সুখী লাগছে নিজেকে। মনে হচ্ছে প্রতিটা সকাল যদি এমনভাবে শুরু হতো। জীবন কোনো জটিল হিসেবের মারপ্যাচে না ঢুকে এভাবেই বয়ে চলুক সহজ- সরল গতিতে। ভাবনার ছেদ ঘটলো কাকা আশফিকের ডাকে। এই সুন্দর মুহূর্তটাকে খুব সুন্দরভাবে উপভোগ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তাতেও ব্যাঘাত ঘটালো। একরাশ অনিচ্ছা এসে ভর করলো আমার চোখে – মুখে। উঠতে ইচ্ছে হচ্ছে না। তবুও উঠে দরজা খুললাম। কাকা এসে বারান্দায় রাখা টুলটায় বসলেন। আমার আধ খাওয়া চায়ের কাপটা হাতে নিলেন। কোনো কিছু না ভেবেই তাতে চুমুক বসালেন। অন্যের এঁটো খাবার খাওয়ার জন্য এই লোকটাকে আমার তেমন পছন্দ নয়। কিন্তু আজ এঁটো খাবার খাওয়ার জন্য নয়, আমার এই সুন্দর মুহূর্তটাকে নষ্ট করার জন্য ওনার উপর ভীষন রাগ লাগছে। তবুও আমি চুপ। চা টা শেষ করে কাকা কাপটা সামনের রাস্তায় ছুড়ে মারলেন। কাপের জীবনের সমাপ্তি ঘটলো। আমি তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। বিষাদ – সিন্ধু বইটা ধরতে নিলে আমি ওটা ধরে নিজের কাছে নিয়ে আসি। কাকা গম্ভীরভাবে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
” বই পড়া ভালো। সু অভ্যাস। এতে মন – মস্তিষ্ক দুটোরই উন্নতি হয়। ”
” হ্যাঁ, মন এবং মস্তিষ্ককে মানুষের পর্যায়ে আনতে চাই। ”
কাকা আমার পানে চেয়ে রইলেন কিছুক্ষন। আমি তার এই চাহনির মানে ঠিকঠাক ধরতে পারলাম না। সময় পেরোলো। একটা নিশ্বাস ছেড়ে কাকা বললেন,
” আমিতো বিয়ে করিনি রাত্রি। আর করতেও চাইনা। কিন্তু জানিস আমার একটা ভীষন গোপন আকাঙ্ক্ষা আছে। খুবই প্রখঢ় সেই আকাঙ্ক্ষা। খুবই। আমি কি তোকে আমার এই গোপন আকাঙ্ক্ষাটা জানাতে পারি?”
আমি কাকার দিকে ভালোভাবে তাকালাম। তার চোখ ছলছল করছে। চেহারায় মলিনতা ভেসে উঠেছে। তাকে অসহায় দেখাচ্ছে। আমার তার কথাটা শুনতে ইচ্ছে হলো। আমি তাকে বললাম,
” হ্যাঁ। বলুন।”
তিনি বেশি সময় নিলেন না। খুব দ্রুত বলতে লাগলেন,
” আমি একটা মেয়ের বাবা হতে চাই।”
কাকা কথাটা বলে থামলেন। আমার ভীষন হাসি পাচ্ছে তার কথা শুনে। যে এখনো বিয়ে করেনি, সে নাকি বাবা হতে চায়। চেপেচুপে হাসিটা একটু থামালাম। কাকা আবার বললেন,
” সেই মেয়েটার সারা জীবনের দায়িত্ব নিতে চাই। তার সমস্ত দুঃখ- কষ্টের সঙ্গী হতে চাই। কিন্তু সে কি আমার মেয়ে হবে?”
” কে?’
” আমি তোর বাবা হতে চাই রাত্রি। ”
আমার মধ্যে থেকে হেয়ালি ভাবনা চলে গিয়ে সিরিয়াস হলো। আমি পরপর কয়েকটা শ্বাস ছাড়লাম। তার কথা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। তবুও তাকে প্রত্যাখান করতে মন চাইলো না। আমি কেঁদে ফেললাম। এভাবে কেউ কখনো আমাকে মেয়ে বলে কাছে টানেনি। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
” সবাই তোকে এতো কষ্ট দিতো, জানিস গোপনে গোপনে আমি কাঁদতাম। কিন্তু মুখ ফুটে তোকে ভালোবাসার কথা আমি বলতে পারতাম না। একবার মনে আছে তোর বিয়ে ঠেকাতে বাড়িতে পুলিশ এসছিলো। তাদের আমি খবর দিয়েছিলাম। কারন আমি জানতাম আমার মেয়েটা খুবই ছোট্ট। তোর ড্রয়ারে গোপনে টাকা রেখে যেতাম। যাতে তোর কোনো কষ্ট হয়না। গোপনে তোর জন্য টিউশনির ব্যবস্থা করে দিয়েছি। সবসময় সাদকে তোর দিকে নজর রাখার জন্য বলেছিলাম। সেদিন পরীক্ষা দিতে যাবার সময় গাড়ি নষ্ট হওয়ার পর সাদ তোকে নিয়ে গিয়েছে আমার নির্দেশে। বিদেশে সেটেল্ড হতে চাওয়া ছেলাটা আমার কথায় তোর দিকে নজর রাখতো। সবটা আমি তাকে করতে বলেছি। আর গোপনে থেকে তোকে ভালোবাসতে পারিনি। আমি ব্যার্থ একজন বাবা ঠিকঠাকভাবে হতে পারলাম না। বাবারা তো গোপনে ভালোবাসে। তাদের তো অধিকার নেই জানিয়ে ভালোবাসার।”
আমি নিশব্দে কাঁদছি। চোখের জলে কাকার দুহাত ভিজে উঠেছে। এভাবে হয়তো আমার বাবাও আমাকে ভালেবাসে তবে কোনো কারনে তিনি বলতে পারেন না। আমি আজ বাবাকে ভীষনভাবে নিজের শিরায়- উপশিরায় অনুভব করছি। তাকে অনেক কিছু বলেছি আমি। যা আমার একেবারেই উচিত হয়নি। তার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। আমার জন্যই তিনি আজ হাসপাতালে। আমি মেয়ে হয়ে কিভাবে পারলাম। আমার মন- মস্তিষ্ক নাড়া দিয়ে উঠলো। বাবার জন্য আমার ভীষন বুকে ব্যাথা হচ্ছে। কাকাকে বললাম,
” বাবা কোথায়?”
কাকা আমার প্রশ্ন শুনে অবাক হলেন। তিনি হড়বড়িয়ে বললেন,
” হাসপাতালে।”
আমি কোনো কিছু না ভেবে ছুটলাম। কোনো দেরি করতে চাইনা আমি। আমার একটু দেরীতে যদি বাবার কোনো কিছু হয়ে যায়। বাড়ির গাড়ি ব্যবহার না করা সেই আমি আজ গাড়ি নিয়ে ছুটলাম। এতো সকালে তেমন জ্যাম নেই রাস্তায়। গাড়ি খু্ব দ্রুত চালাচ্ছি। আমার চোখের সামনে ফুটে উঠছে কাকার আর্তনাদ। কিন্তু তার করা কান্নাগুলো আমার কাছে সঠিক মনে হয়নি। মনে হয়েছে এটা তার কোনো ফাঁদ। সে নতুন কোনো ফায়দা লুটতে চায় আমার মাধ্যমে। সে অবশ্যই বিয়ে করবে, তার গার্লফ্রেন্ড আছে। তবে সে আমায় মিথ্যে কেনো বললো? কোনো উত্তর মিলছে না। আমি হাসপাতালের পার্কিং লডে গাড়ি পার্ক করে ভিতরে ঢুকলাম। রিসেপশনে জেনে নিলাম বাবার ঠিকানা। আমার সেদিকে হাটছি আর হঠাৎ সাদের কথা মনে পড়লো। তিনিও ভালো মানুষের মুখোশ পরে কাকার সাথে যুক্ত ছিলেন। ঘৃনা হচ্ছে তার জন্য। তিনি কেনো এমনটা করলেন? তাকে জবাবদিহি করতে হবে। তাকে তো আমি সাহায্য করতে বলিনি। তবে কেন সে সাহায্যের নামে ছদ্মবেশী রুপ নিলো। বাবার কেবিনের সামনে এসে দাড়ালাম। ভিতরে ঢোকার সাহস হচ্ছে না আমার। হাত – পা অসড় হয়ে আসছে। আমার নিশ্বাস নিতে ভীষন কষ্ট হচ্ছে। দরজা ঠেলে ভিতরে চোখ রাখতেই আমি অবাকের চরম সীমায় পৌছালাম।
চলবে…………..
#_ধরো_যদি_হঠাৎ_সন্ধ্যে
#_পর্বঃ০৯
#_আরজু_আরমানী
” বাহ, সাদ সাহেব বাহ। আপনি তো খুব ভালো অভিনয় করতে পারেন। এখানে বাবার সেবা করে তার মন জয় করছেন। অন্যদিকে কাকার সাথে হাত মিলিয়ে আমার মন জয় করার চেষ্টা করছেন। কোন ফায়দা লুটতে চান আপনি?”
বাবাকে খাওয়াচ্ছিলেন তিনি। আমার কথা শুনে স্যুপের বাটিটা টেবিলে রেখে দিলেন। তাকিয়ে রইলেন আমার দিকে। বাবাও তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কিছুক্ষন নিরবতায় কেটে গেলো। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। সাদ কিছু বলার আগেই বাবা বললেন,
” তুমি এখানে কেন এসেছো?”
” কয়েকটা প্রশ্নের উত্তর জানতে।”৷ গম্ভীর কণ্ঠ আমার। বাবা একবার সাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
” তোমার সাথে কি রাত্রির কোনো ঝামেলা হয়েছে সাদ?”
” না।”
এই ছোট্ট উত্তরটুকুই তিনি দিলেন। আর কোনো শব্দ বের হলো না তার মুখ থেকে। তিনি ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার চোখে জল। আমি প্রকম্পিত হলাম। তার চোখে কেন জল? আর কিছু ভাবার আগেই বাবা বললেন,
” রাত্রি তুমি সাদকে কেনো এভাবে বললে?”
আমি কাকার বলা সমস্ত কথা ওখানে দাঁড়িয়ে বাবাকে বললাম। তিনি কিছু বললেন না। আমার হাতে একটা চাবি দিয়ে বললেন,
” আমার স্টাডি রুমের বা দিকের চার নাম্বার ড্রয়ারটা খুললেই তুমি সমস্ত প্রশ্নের জবাব পেয়ে যাবে।”
আমি চাবি নিয়ে আবার ফিরে এলাম বাসায়। বাবার স্টাডি রুমে ঢুকলাম। তার কথা মতো ড্রয়ার খুলে দেখি, ওখানে একটা বড় চিঠি লেখা। এই চিঠিতে সেই সব কথা লেখা যা কাকা আমাকে বলেছে। আমি অবাক হলাম এসব দেখে। তার মানে কাকা সকালে আমাকে যা বলেছে তা সবই বাবার কথা ছিলো। আমার হাত পা কাঁপতে শুরু করেছে। আমি দ্রুত হাসপাতালে চলে এলাম। বাবার কেবিনে ঢুকে দেখি বাবা দাড়িয়ে আছে। আমি তার সামনে গিয়ে কেঁদে ফেললাম। কোনো কথা বলতে পারছিনা। বাবা আমাকে তার বুকে জড়িয়ে ধরলেন। কান্নার মাত্রাটা এবার বহুগুন বেড়ে গেলো। বাবার পাঞ্জাবির খানিকটা অংশ ভিজে গিয়েছে। আমি কান্নাভেজা কন্ঠে বললাম,
” আমাকে ক্ষমা করে দিও বাবা। আমি তোমার ভেতরের কষ্টটা বুঝতে পারিনি। আজ সেই ব্যাথাটা আমি অনুভব করেছি। তারপর আমার মনে হলো তোমার থেকে বেশি কেউ আমাকে ভালোবাসতে পারেনা। বলোনা বাবা তুমি কি আমায় ক্ষমা করেছো?”
বাবা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তার মুখে তৃপ্তির হাসি। তিনি আমার মুখটা আলতো ছুঁয়ে উপরে তুললেন। আমার কপালে চুমু খেয়ে বললেন,
” আমার অপরাধটা একটু বেশিই রে মা। তোর মায়ের আঘাতের বিপরীতে আমার তোকে ভালোবাসা উচিত ছিলো। তোকে সাপোর্ট করা উচিত ছিলো। কিন্তু জানিস মা, কোনো গাছের শিকড় যদি নড়বড়ে হয় তবে সেই গাছ শক্তভাবে দাড়িয়ে থাকতে পারেনা। ঠিক একইভাবে আমি তোর পাশে দাড়াতে পারিনি। কারন আমার শিকড়ও ছিলো নড়বড়ে। ”
” বাবা, থাক না ওসব পুরনো দিনের কথা। ”
বাবা আবার আমার মাথায় চুমু খেলেন। আমি তার বুকে মাথা রেখে চুপ করে আছি। আজ আমার ভীষন শান্তি লাগছে। ঝড় – বাদলার দিনে একটা পাখি তার নিজের বাসা হারিয়ে আজ আবার তার নীড়ের ঠিকানা পেলো। আপন নীড়ের চেয়ে ওতো শান্তি আর কেই বা কোথায় পাবে?
” আংকেল আপনার ছাড়পত্র। ”
বাবার বুক থেকে মাথা তুলে দেখলাম সাদ দাড়িয়ে আছে। বাবা বললেন,
” টেবিলে রাখো।”
” আমাকে যেতে হবে, ডিউটি আছে।”
” আচ্ছা। ”
সাদ চলে গেলেন। আমি বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম,
” উনি কি করেন?”
” সিনিয়র পুলিশ। ”
আমি অবাক হলাম। তিনি আমাকে কখনোই এ ব্যাপারে কিছু বলেনি। তার মাঝে আমি এতো সিরিয়াসনেস কখনো দেখিনি। বাবা বললেন,
” ও কিন্তু আমার কেউ না।৷ তোমার কেউ। তবুও কর্তব্যের খাতিরে ও এ দুদিন যাবত আমার পাশে ছিলো। আমার সেবা – যত্ন করেছে। ”
” উনি সত্যি খুব ভালো মানুষ বাবা।”
আমাদের কথা এ পর্যায়ে থেমে গেলো। কেবিনের দরজায় নক করলো কেউ। বাবা তাকে ভিতরে আসতে বললেন। আমি একটা চেয়ারে বসলাম। ভিতরে মা এলেন। আমার দিকে আড় চোখে তাকালেন। বাবাকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
” এখন তো সুস্থ। এবার বাসায় চলো। হাসপাতালে বসে বসে আর টাকা খরচ করিও না। ”
” হাসপাতালের বিল কত?” বাবার কন্ঠে আমি অন্য কিছুর আভাস পেলাম। যেনো এ সেই আগের ভঙ্গুর রায়হান রেদোয়ান নয়। আমার সামনে কোনো শক্ত -সামর্থবান পুরুষ দাড়ানো। এইবার বাবাকে নিয়ে আমার গর্ব হতে লাগলো। মা বাবার কথা শুনে তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বললেন,
” টাকা তো আছে দুটো বার্মিজ আচার খাওয়ার। সে এসেছে আবার হাসপাতালের বারো হাজার টাকা বিল দিতে।”
” যদি দেই তোমার কোনো আপত্তি আছে? ”
এই পর্যায়ে মা বেশ অবাক হলেন। বাবার কন্ঠে এতোটা দৃঢ়তা তিনি আগে কখনো দেখেননি। তিনি বিশ্বাস করলেন না। মুখ বাকিয়ে বললেন,
” তো দিয়ে দাও।”
কথাটা বলে তিনি আর অপেক্ষা করলেন না। ধাম করে দরজাটা বাড়ি মেরে চলে গেলেন। বাবা ঈষৎ হাসলেন। আমার হাতে একটা চেক ধরিয়ে দিলেন।
” এটা জমা দিয়ে আয়।”
হাসপাতালের বিল বারো হাজার টাকা। কিন্তু চেকে লেখা ত্রিশ হাজার টাকা। আমি বাবাকে কিছু বলতে চাইলে তিনি বললেন,
” প্রশ্ন করিস না। টাকা জমা দিয়ে আয়। ”
আমি টাকা জমা দিয়ে চলে এলাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে দুপুর হলো। সবাই ফ্রেশ হয়ে খেতে বসলো। আমি রান্না ঘরে ঢুকতেই বাবা আমাকে ডাকলেন,
” রাত্রি টেবিলে খেতে বসো। ”
আমি অবাক হলাম। বাবার এখন আমাকে ডাকার কি প্রয়োজন ছিলো? আমি রোজকার মতো নিজের রুমে খেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বাবার জোরে এসে টেবিলে বসতেই আমার মা বললেন,
” আমি কি টেবিলে বসে খেতে পারবোনা রায়হান? ”
” কে বারন করেছে? ” দৃঢ়চিত্তে জবাব বাবার। মা টেবিল ছেড়ে উঠতে নিলেই আমি বললাম,
” রোজ আমি আমার রুমে বসে খাবার খাই। আজো কোনো সমস্যা হবে না। ”
ধমকে উঠলেন বাবা। রাগান্বিত কন্ঠে বললেন,
” এই ফ্ল্যাটের টেবিলে বসে যদি রাত্রি খাবার খেতে না পারে, তবে কারো অধিকার নেই এখানে। ”
” আপু তুমি আমাকে খাইয়ে দাও।”
মা উঠে চলে গেলেন। তার রুমের দরজাটা ধরাম করে আটকালেন। আমি তাসকিনকে খাবার খাইয়ে দিলাম। আজ বড় আনন্দ লাগছে। একটা সময় ভাবতাম, সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাবার খাবো। আজ সেই আশা পূর্ন হলো। তবে মা নেই। কেন তিনি আমাকে এতোটা অপছন্দ করেন তা আমি জানিনা। কোন শত্রুতা তার সাথে আমার? আমাকে জানতে হবে। খুজতে হবে এই প্রশ্নের উত্তরগুলো।
চলবে…………