নিষিদ্ধ বরণ পর্ব-১০+১১

0
382

#নিষিদ্ধ_বরণ
#রোকসানা_রাহমান

পর্ব (১০)

নিহিতা কান্না প্রায় গলায় বলল,
” সেতুকে খুঁজে পাচ্ছি না! ”

মাহদী সাথে সাথে কোনো প্রতিক্রিয়া করল না। এক পলকে সবার দিক থেকে দৃষ্টি ঘুরিয়ে এনে বলল,
” খুঁজে পাচ্ছ না বলতে? সে কি বাচ্চা? ”

নিহিতা ভেতর থেকে বেরিয়ে আসল। দিশাহারা ভঙ্গিতে বলল,
” না। সেতু আমাদের বন্ধু। ভেতরের রুমে আড্ডা দিচ্ছিল। তারপর…”

নিহিতা চুপ হয়ে গেলে মাহদী জিজ্ঞেস করল,
” তারপর? ”

নিহিতার মনে পড়ল সানোয়ারকে নিয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনায় সকলেই ব্যস্ত ছিল। সেই ফাঁকে কি সেতুর সাথে কিছু হলো? ”

” নিহিতা? ”

নিহিতা ভাবনা থেকে বেরিয়ে বলল,
” তারপর আর কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না। ”

মাহদী ব্যাপারটাকে সাধারণভাবে নিয়ে বলল,
” হয়তো কোথাও বেরিয়েছে। ”

নিহিতা মনে করিয়ে দিল,
” না। দরজা ভেতর থেকে আটকানো ছিল। আপনি যখন আসলেন তখন খুলেছি। ”

এবার মাহদীর কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ল। চোখে-মুখে উদ্বিগ্নতা স্পষ্ট! গুরুতর চিন্তায় পড়তে টনক পড়ল। সহসা বলল,
” মেয়েটি কি কালো রঙের কিছু পরেছিল? ”

নিহিতা আরেকপা এগিয়ে আসল মাহদীর দিকে। দ্রুত মাথা নেড়ে অশ্রুসিক্ত নয়নে বলল,
” হ্যাঁ। আপনি কী করে জানলেন? ”
” আমি যখন দরজায় কড়া নাড়ছিলাম তখন একটা মেয়ের গলা পেয়েছিলাম। পেছন ঘুরে দেখি একজন মাঝ বয়সী লোকের কাঁধে মাথা ফেলে উঠোন পার হয়ে কোথাও একটা যাচ্ছে। ”

সুমি জায়গায় দাঁড়িয়ে বিস্ময় নিয়ে বলল,
” এটা কী করে হতে পারে? ”

পেছন থেকে সানোয়ার জিজ্ঞেস করল,
” কী বলতে চাচ্ছিস? ”
” সেতু বাইরে গেল কী করে? যদি দরজা খুলে যায় তাহলে ভেতর থেকে আটকাল কে? ”

সকলের চোখ গিয়ে পড়ল নাঈমের উপর। সে ভয় পেয়ে গেল। শরীর থেকে ঘাম ছোটার পূর্বে মিনমিনে বলল,
” আমি লাগাইনি। ”

সানোয়ার বন্ধুর কাছে গিয়ে বলল,
” তাহলে কে আটকাল? ”

নাঈম সাথে সাথে উত্তর দিতে পারল না। কিছুক্ষণ চুপ থেকে হঠাৎ বলল,
” রান্নাঘর দিয়ে বেরিয়েছে মনে হয়। ওখানে আরেকটা দরজা আছে। ব্যবহার করা হয় না। ”

সুমি সকলের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রাখল,
” সামনে দরজা থাকতে রান্নাঘরের দরজা দিয়ে বের হলো কেন? ”
” ও বের হয়নি। কেউ বের করেছে। ”

নিহিতার কথা শুনে সকলে চমকে তাকাল। সচকিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল সুমি,
” কে? ”

নিহিতা নাঈমের দিকে তাকাল। পরক্ষণে দৃষ্টি সরিয়ে দুর্বল স্বরে বলল,
” নাঈমের চাচা। ”

সানোয়ার এগিয়ে এসে বলল,
” নাঈমের চাচা বললেই ও যাবে কেন? ”

এবার মুখ খুলল মাহদী। রুষ্ট স্বরে বলল,
” বোধ শক্তি হারিয়েছে বলে। সেতু এলোমেলো পায়ে হাঁটছিল। মদ খেয়েছিল নাকি? ”

কেউ উত্তর দিল না। মাথা নিচু করে ফেলল সকলে। এতে মাহদীর রাগ আকাশ ছুঁলো। রাম ধমক দিয়ে বলল,
” এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে সেতুকে খুঁজে বের করো গাধার দল। কী ঘটতে যাচ্ছে তোমরা ভাবতেও পারছ না! ”

মাহদী আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। বারান্দা পেরিয়ে উঠোনে চলে আসল। নিজের উপর রাগ হচ্ছে খুব। তখন যদি একটু ভালো করে খেয়াল করত তাহলে ব্যাপারটা এত দূর গড়াত না!

নিহিতা, সুমি, সানোয়ার এমনকি নাঈমও সেতুর অনুসন্ধানে নেমে পড়ছে। একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ছুটাছুটি করছে বাড়ির ভেতর ও বাহিরে। নিহিতা বাড়ির মধ্যেই খুঁজছিল। আশেপাশের পুরো জায়গাটা চষে বেরিয়ে এসে দাঁড়াল দেয়ালের কাছের পেয়ারা গাছটির নিচে। চিন্তা আর অস্থিরতায় শরীর বেয়ে ঘাম ছুটছে তার। দুর্বল শরীরে নিশ্বাস নেওয়া কষ্টসাধ্য। বড় নিশ্বাস টেনে ডানে তাকাল। সাথে সাথে চোখ দুটো স্থির হয়ে গেল বাড়ি ও দেয়ালের মধ্যের সরু জায়গায়টায়। অন্ধকারে পুরুষের ছায়া নড়ছে। নিহিতা উদ্বেগ নিয়ে একটু এগিয়ে গেল। ছায়াটি দৃষ্টি সীমায় আসতেই নিহিতা ভয়ে জমে গেল। হা-পা কাঁপছে! কাঁপুনি নিয়ে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে নাঈমের চাচার দিকে। শরীরের উপরের ভাগে কাপড় নেই। অঙ্গপ্রতঙ্গে পাগলের মতো অস্থিরতা। সে অবস্থায় সেতুর কালো জামাটি ছিঁড়ে ফেলার তুমুল প্রচেষ্টা!

নিহিতার জমে যাওয়া শরীরটি আরও এক বার কেঁপে উঠল মাহদীর কণ্ঠ স্বরে। নাঈমের চাচার গলা চেপে ধরে চিৎকার করছে। চোখে-মুখে উগ্র ভাব। ভয়াবহ কিছু করে ফেলার মতো অবস্থা। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছে প্রায়। নিহিতা ভয় ফেলে ছুটে এসে মাহদীকে সাবধান করল,
” উনি মারা যাবেন তো! ছাড়ুন। ”

ততক্ষণে সুমি, সানোয়ার, নাঈমও চলে এসেছে। নিহিতার মতো সাহস করে উঠতে পারল না কেউ। এক হাত দূরে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষণ করছে সবটা। নিহিতার কথায় হোক অথবা অন্য কিছু মাহদী লোকটাকে ছেড়ে দিল। লোকটা দেয়ালের সাথে লেগেই মাটিতে বসে পড়ল। কাঁশি থামছেই না!

নিহিতা ছুটে যায় সেতুর কাছে। সে অজ্ঞান হয়ে গেছে! সুমি একটু সাহস সঞ্চয় করে নিহিতার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। সেতুকে ধরে রাখতে সাহায্য করছে। সেই ফাঁকে মাহদীকে দেখছে বার বার। রাগে তার চোখ-মুখ লাল হয়ে গেছে। কণ্ঠ হার বের হয়ে যাওয়ার যোগাড়! তপ্ত নিশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে পায়চারি করছে। কয়েক বার এপার থেকে ওপার ঘুরে অকস্মাৎ ভারী ইট তুলে নিল হাতে। তীর বেগে ছুটে এসে লোকটির মাথায় বাড়ি দিতে গিয়েও থেমে গেল। রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলল,
” নায়রার জন্য বেঁচে গেলি! ”

তারপরেই নিহিতার উদ্দেশ্যে বলল,
” এর কী শাস্তি হওয়া উচিত বলো। তুমি যা বলবে তাই করব। ”

নিহিতা লোকটার দিকে তাকাল। ঘৃণায় ভেতরটা তেতো হয়ে আসলে চোখ ফিরিয়ে নিল। বলল,
” মৃত্যু ব্যতীত যা ইচ্ছে হয়। ”

মাহদী নির্দয় দৃষ্টিতে তাকাল। ইচ্ছে হচ্ছে ইট দিয়ে বিকৃত মস্তিষ্কটা ছেঁচে দিতে! পারছে না বলে রাগটা কমছে না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
” তোমরা গেইটের বাইরে গিয়ে দাঁড়াও, আমি আসছি। ”

সেতুকে নিয়ে নিহিতা আর সুমি সাবধানে হাঁটা ধরে। সানোয়ার আর নাঈম পেছন ধরলে মাহদী বলল,
” নাঈম, তুমি এখানেই থাকো। ”

নাঈমের পা আটকে গেল। ভীত চোখে মাহদীর দিকে তাকালে সে বলল,
” বাসায় দড়ি আছে? মোটা দড়ি? ”

নাঈম মাথা নাড়লে মাহদী বলল,
” নিয়ে আসো। জলদি। ”

নাঈম বাসার ভেতর ঢুকে গেল। দড়ি নিয়ে যখন ফিরল তখন লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেলল। তার চাচার শরীরে সুতো বলতে কিছু নেই!

মাহদী বস্ত্রহীন লোকটিকে পেয়ারা গাছের সাথে বেঁধে নাঈমের উদ্দেশ্যে বলল,
” আজ রাতটা তুমি আমার সাথে ঘুমাবে। চলো। ”

_________________
সে রাতে সেতু আর সুমি নিহিতাদের বাড়িতেই ছিল। শেষ রাতের দিকে ঘুমিয়েছিল বিধায় সুমির ঘুম ভাঙল দেরিতে। সেতু তখনও বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। নিহিতা নেই। তাকে খোঁজার আগ্রহ দেখা গেল না সুমির মধ্যে। সে অগোছাল ভাবে গিয়ে দাঁড়াল বারান্দায়। উঠোনের দক্ষিণ পাশে নজর পড়তে তার ঘুম ঘুম ভাব কেটে গেল। ফোলা চোখ দুটিতে মুগ্ধতা ভর করল। ঘোর লাগা সেই দৃষ্টি আটকাল মাহদীর উপর। একটা বাচ্চা ছেলের সাথে দুষ্টুমিতে নেমে কী সুন্দর হাসছে!

” এখানে কী করছিস? চল নাস্তা করবি। ”

নিহিতার দিকে ফিরেও তাকাল না সুমি। বিমুগ্ধ চোখ জোড়া তখনও মাহদীর সুশ্রী মুখখানায়! নিহিতা সুমির চুলগুলো খোঁপা করে দিল। গলায় পড়ে থাকা ওড়নাটা মেলে মাথাসহ বাহু ঢেকে বলল,
” বাবা বাইরে বের হবেন। ভেতরে চল। ”

নিহিতার কথা উপেক্ষা করে সুমি ঘোর লাগা কণ্ঠে বলল,
” এই মানুষটাকে পাওয়ার জন্য শুধু বাবার অবাধ্য কেন পুরো পৃথিবীও ছাড়া যায়। নায়রা আপুর পছন্দ নেশা ধরানোর মতো! ”

নিহিতা ভ্রু বাঁকাল। সুমিকে জোর করে নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল,
” কী বিড়বিড় করছিস? ”

সুমি আপ্লুত কণ্ঠে বলল,
” আপুর লাভ স্টোরি শোনা হলো না। ”
” কোন আপুর? ”
” নায়রা আপুর। আজ শুনাবি? ”

নিহিতা বিরক্ত কণ্ঠে বলল,
” নায়রা আপুর লাভ স্টোরি থাকলে তো শোনাব। ”

সুমি অবাক হয়ে বলল,
” লাভ স্টোরি নেই? কিন্তু আমি যে শুনেছিলাম নায়রা আপু ভালোবেসে মাহদী ভাইয়াকে বিয়ে করেছিল।
” না। ”
” তাহলে? ”
” তাহলে কী? ”
” তাহলে বিয়ে করেছিল কেন? ”

নিহিতা উত্তর দিল না। তার হঠাৎ মনে হলো সে নিজেও জানে না তার আপু কেন বিয়ে করেছিল।

নিহিতার চুপ থাকার মধ্যেই সুমি আরেক বার মাহদীর দিকে তাকাল। বলল,
” উনার হাসিটা দেখেছিস? মনে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো। ”

সুমিকে অনুসরণ করে নিহিতাও তাকাল মাহদীর দিকে। নিমিষেই নিহিতার বিস্ময়াভিভূত চোখ জোড়া চুম্বকের মতো আটকে গেল মাহদীর মুচকি হাসি টানা ঠোঁট জোড়ায়।

চলবে।

#নিষিদ্ধ_বরণ
#রোকসানা_রাহমান

পর্ব (১১)

” উনার হাসিটা দেখেছিস? মনে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো। ”

সুমিকে অনুসরণ করে নিহিতাও তাকাল মাহদীর দিকে। নিমিষেই নিহিতার বিস্ময়াভিভূত চোখ জোড়া চুম্বকের মতো আটকে গেল মাহদীর মুচকি হাসি টানা ঠোঁট জোড়ায়। সেই সময় মায়ের কণ্ঠ পেল। নাস্তা খেতে ডাকছেন। নিহিতা চমকে উঠল। শরীর কেঁপে উঠল। চোখের পাতা পড়ল ঘন ঘন। ভ্রান্ত বদনখানি স্বাভাবিক হতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। অতঃপর তাড়া দিল সুমিকে,

” চল, ভেতরে চল। ”

সুমি গড়ি-মসি চালে নিহিতার পেছন ধরল। দরজার কাছটাতে এসে থেমে গেল নিহিতা। পর্দা সরিয়ে ভেতরে না তাকিয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে নিল পেছনে। আড় চোখে আরও এক বার স্থির চাহনি আঁকল মাহদীর উপর। দৃষ্টি গাঢ় হতেই কানের কাছে অদৃশ্য স্বরে বেজে উঠল হযরত আলী (রা) কে বলা নবী (স) এর উক্তিখানা, ‘হে আলী, এক নজরের পর দ্বিতীয় নজর দিও না। প্রথম নজর তো ক্ষমাপ্রাপ্ত কিন্তু দ্বিতীয় নজরে ক্ষমা নেই।’ নিহিতার ভেতরটা কেঁপে উঠল! উত্তপ্ত ছ্যাকা পড়ল বুঝি অন্তরে! গলে গেল এত বছরের গড়ে তোলা আত্ম অহমের ভিত! আপনমনে উচ্চারণ করল, ‘ আমার পর্দা ছুটে যাচ্ছে! ‘

__________
নাস্তা খেতে খেতে মায়ের দিকে তাকাল নিহিতা। একটা প্রশ্ন গলার মধ্যেখানে এসে আটকে আছে। না করে শান্তি পাচ্ছে না। খাবার বিস্বাদ লাগছে। এত সময় খাবার নিয়ে বসে থাকার মেয়ে নয় নিহিতা। সুমি অর্ধেক খেয়ে উঠে পড়তে নিহিতা প্রশ্ন করে বসল,
” আম্মু, নায়রা আপুর বিয়েটা কিভাবে হয়েছিল? ”

আসমা রহমান সুমির ফেলে যাওয়া প্লেট গুছাচ্ছিলেন। চোখে-মুখে অসন্তোষের ছাপ! তন্মধ্যে মেয়ের প্রশ্ন শুনে ভ্রু কুঁচকে ফেললেন। রুক্ষ স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,
” কেন? ”

নিহিতা উত্তর দেওয়ার সাহস পেল না। আগ্রহান্বিত চাহনি নামিয়ে ফেলে খাবারে মনোযোগ দিল। মুখে খাবার তুলতে তুলতে মনে পড়ল, নায়রা আপুর বিয়ের খবরটা ফোনে শুনেছিল নিহিতা। তখন সে মাদরাসায় থেকে পড়াশোনা করছে। পড়ালেখার ভারি চাপ! মাসের শেষের এক দিন কী দুই দিনের জন্য বাড়িতে বেড়াতে আসে। আপুর বিয়ের খবর শুনে সে খুব দুঃখ পেয়েছিল। বিস্মিতও হয়েছিল। বিস্ময় নিয়ে জানতে চেয়েছিল বিয়ের ব্যাপারে। মা কিছু না বলেই ফোন কেটে দিয়েছিলেন। এরপর ছুটিতে বাড়ি এসে সামনাসামনি একই প্রশ্ন করেছিল আম্মুকে। সেবারও বলেননি, উল্টো ধমক দিয়ে বলেছিলেন, ‘ ছোটদের এসব জানতে নেই। ‘ নিহিতা স্বগতোক্তি করল, ‘ আমি কি এখনও ছোট? ‘

চেয়ার টানার শব্দে পাশে তাকাল নিহিতা। মায়ের মুখের দিকে চেয়ে বলল,
” শরীর খারাপ লাগছে, আম্মু? ”

আসমা মেয়ের প্রশ্ন বোধ হয় শুনলেন না। নিজ থেকে বলতে শুরু করলেন,
” সেদিন তোর নানির বাড়ি থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। পথিমধ্যে রিকশা থামালেন পাশের গ্রামের এক ভাবি। বললেন, ‘ তোমার বেটি নাকি একলা একলা বিয়া করছে হ! জামাই নিয়া পুরা গ্রাম ঘুরি বেড়াউছে?’ আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। আমার মেয়ে যে এমন কাজ করতে পারে না এটা বিশ্বাস করাতে চাইলাম। উনি বিশ্বাস করলেন না উল্টো আমাকে বিশ্বাস করিয়ে দিলেন আমার মেয়ে এমন কাজ করতে পারে, করেছে। আমার মন অস্থির হয়ে পড়ল। বাড়ি ফিরেই নায়রার রুমের দরজা আটাকালাম। জানতে চাইলাম ছেলেটি কে? নায়রা প্রথমে কিছু বলল না। মাথা নিচু করে কেঁদে দিল। আমার মায়া হলো। বুঝতে পারলাম কিছু একটা হয়েছে। নায়রার পাশে বসতে নায়রা আমাকে জড়িয়ে ধরল। কাঁদতে কাঁদতে জানাল, ছেলেটির নাম মাহদী। স্টেশনে দেখা হয়েছিল। সে ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার কলেজে একটা ঝামেলা হয়ে যায়। ভুল করে বিয়ের কথা ছড়িয়ে পড়ে পুরো কলেজে। সেখান থেকে গ্রামে গ্রামেও ছড়িয়ে পড়ে। আমি ভীষণ চিন্তায় পড়লাম। এই সমস্যার সমাধান কী হতে পারে বুঝতে পারলাম না। ভাবলাম, তোর বাবাকে বলে দেখি। নায়রাকে ছেড়ে তোর বাবার খোঁজে বাইরে আসতে দেখলাম উঠোনে কয়েক জন অপরিচিত মানুষ। সাথে সাথে বুঝতে না পারলেও পরে জানতে পেরেছিলাম উনারা মাহদীর মা-বাবা। মাহদীর জন্য নায়রাকে চায়তে এসেছে। ”
” তারপর বিয়ে হয়ে গেল? ”

মাঝখানে মেয়ের প্রশ্ন শুনে চোখ পাকালেন আসমা রহমান। নিহিতা কৌতূহল দমিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল। আসমা রহমান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,
” না হয়নি। তোর বাবা ভেবেছিল মাহদী হিন্দু। পরে অবশ্য জেনেছিল সে মুসলমান। তবুও রাজি হলেন না। তিনি চেয়েছিলেন ধর্মপ্রাণ, খোদা ভীরু, ইসলামিক ধারায় জীবনযাপন করা কোনো সাদামাটা ছেলেকে মেয়ের জামাই করতে। সে দিক দিয়ে দেখলে মাহদী একদমই উল্টো। উগ্র স্বভাব, রগচটা, চাল-চলনে অভদ্রভাব। তোর বাবার মুখেই শোনা ধর্মে বিশ্বাস নেই একদম। চোখ বন্ধ করে নাস্তিকদের দলে ফেলে দেওয়া যায়।
তিনি ভেবেছিলেন ব্যাপারটা ওখানেই মিটে যাবে। কিন্তু না মিটেনি। নায়রাকে নানাভাবে উত্যক্ত করতে শুরু করল।রাস্তা-ঘাটে নায়রার সাথে এমন অশালিন আচরণ করত যে, দূর থেকে দেখে যে কেউ ভাববে মাহদী নায়রার স্বামী। ভেবেছিলও। সকাল-বিকাল বাড়িতে মানুষজন এসে তোর বাবার কাছে নালিশ করে যেত। তিনি বাধ্য হয়ে নায়রার বাইরে যাওয়া বন্ধ করলেন। এতে মাহদী আরও হিংস্র হয়ে উঠল। যখন তখন বাড়িতে ঢুকে চ্যাঁচামেচি করত, এটাসেটা ভাঙত। নায়রাকে তুলে নিয়ে যাবে এসব বলে শাসাত। নায়রার বাবা ধৈর্য্য হারিয়ে থানাই যাওয়ার তোরজোর করছিলেন। তার যাওয়ার পথ আটকাল নায়রা। হঠাৎ বলে বসল, ‘ আমি উনাকে বিয়ে করতে রাজি। ‘ তোর বাবা সাথে সাথে কিছু বললেন না। আপত্তি করলেন। বাবা-মেয়ের মধ্যে কথার দ্বন্দ্ব চলল অনেক্ষণ। এক পর্যায়ে তোর বাবা জানতে চাইলেন, ‘ তার মধ্যে এমন একটা গুন দেখা যার উপর ভরসা করে তোকে তার হাতে তুলে দেব। ‘ নায়রা বাবার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারল না। মাথা নিচু করে থাকলে তিনি আবার বললেন, ‘ আজ পর্যন্ত যা যা করেছে সবটাই তোর জানা। আমার থেকে বেশি জানা। তাহলে বল কোন বিশ্বাসে এই বিয়েতে রাজি হব? যেখানে আমি অনুমান করতে পারছি তুই সুখে তো দূর ভালোও থাকতে পারবি না। ‘ নায়রা আর চুপ থাকল না মুক্ত গলায় বলে দিল, ‘ বিশ্বাস আসলে কোনো মানুষের উপরে নয়, সৃষ্টিকর্তার উপর রাখা উচিত। কারণ, তিনিই সমগ্র মানব মন ও শরীরের একমাত্র নিয়ন্ত্রণকারী। আমি তাঁর উপর বিশ্বাস রেখে এই রাগী, একরোখা, পথভ্রষ্ট মানুষটাকে বিয়ে করতে চাই। বাবা, তুমি কি আমাকে সেই অনুমতি দিবে? ‘

তোর বাবা আর কিছু বলতে পারলেন না। শুধু মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ”
” তারপর বিয়েটা হলো? ”

আসমা বেগম শক্ত চোখে তাকালেন। পর মুহূর্তে মন খারাপের গলায় বলল,
” হ্যাঁ। কিন্তু বিয়ের পর মেয়ের জামাইয়ের মুখদর্শন করেননি। মাহদীও না। দুজন একে অপরের সাথে কথা পর্যন্ত বলেনি। নায়রা অনেক চেষ্টা করেছিল দুজনের রাগ ভাঙাতে। পারেনি! ”

ছোঁয়াচে রোগের মতো মায়ের মন খারাপটা নিহিতার মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ল। প্লেটের শেষ খাবারটুকু জোর করে শেষ করল।

_______________
কিছু একটা ভাঙার শব্দ পেয়ে রুম থেকে ছুটে এলো নিহিতা। রান্নাঘরের কাছাকাছি পৌঁছাতে মায়ের গলা পেল। কাউকে ধমকাচ্ছেন খুব! নিহিতা রান্নাঘরে ঢুকে দেখল নতুন কাজের মহিলাটিকে বকছেন। অপরাধ চায়ের কাপ ভেঙে ফেলেছে।

কাজের মহিলাটি নিহিতার খুব একটা পরিচিত নাহলেও আসমা রহমানের পরিচিত। বাপের বাড়িতে রিন্টুর মা নামে ডাকে সবাই। ঐ বাড়িতে কাজ করছেন দীর্ঘদিন। কয়েক দিনের জন্য এ বাড়িতে আনা। মাকে দেখার জন্য যখন তখন ছুটতে হয় আসমা রহমানের। তার অনুপস্থিতিতে রিন্টুর মা এ বাড়িতে থাকবে। হাতে-হাতে এটাসেটা এগিয়ে দিবে।

নিহিতা রিন্টুর মাকে আড়াল করে দাঁড়িয়ে বলল,
” ইচ্ছে করে ফেলেনি তো, আম্মু। ছেড়ে দেও। ”

আসমা রহমানের রাগ আরও বেড়ে গেল। বলল,
” তোকে বলেছি সালিশি করতে? তুই ও কে চিনিস? ইচ্ছে করেই এমন করে। যাতে কিছু করতে না দেয় কেউ। আমার মায়ের কাপ-পিরিচ তো এই ভেঙেছে! ”

নিহিতা চোখের ইশারায় রিন্টুর মাকে চলে যেতে বলল। সে ও আর এক দণ্ড দাঁড়াল না। অনেকটা দৌড়ভঙ্গিতে ছুটে পালাল। নিহিতা মাকে শান্ত করে বলল,
” আজ কী রান্না হচ্ছে, আম্মু? ”
” চচ্চড়ি, মুরগির মাংস আর ভর্তা। ”
” ভর্তা? কী ভর্তা? ”
” মাছের ভর্তা। ”

কথা বলতে বলতে সেদ্ধ করা মাছে হাত দিলেন আসমা রহমান। কাঁটা ফেলায় মনোযোগি হলে নিহিতা কৌতূহল নিয়ে বলল,
” কাঁটা ফেলছ যে? পাটায় বাটলেই তো হবে। ”

আসমা রহমান সামান্য হাসলেন। বললেন,
” কাঁটা থাকলে মাহদী খাবে না। ”
” কেন? ”
” ভয় পায়! কাঁটা দেখলেই নাকি গলা ব্যথা করে। ”
” উনি বলেছে তোমাকে? ”
” না, নায়রার কাছে শুনেছিলাম। ও বেছে দিলে তবে খেত। নাহলে খেত না। ”
” কেন? উনি বাছতে পারেন না? ”
” পারবে না কেন? ”
” তাহলে? ”
” নিজের উপর ভরসা নেই। ”

নিহিতা কিছু বলতে চেয়েছিল, বলল না। অজান্তেই হেসে ফেলল।

” চ্যাঁচাচ্ছিলে কেন? ”

বাবার কণ্ঠ পেয়ে নিহিতা তটস্থ হলো। চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়িয়েও দরজার একপাশে দাঁড়িয়ে থাকল।

এরশাদ রহমান স্ত্রীর নিকটে এসে হতাশা কণ্ঠে বললেন,
” তোমাকে কথা বলা শেখাতে পারলাম না। ”

আসমা রহমান মাছ ফেলে স্বামীর দিকে ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন,
” পারবেও না। ”

এরশাদ রহমান ভ্রু বাঁকালেন। স্থির চোখে চেয়ে থাকলেন স্ত্রীর দিকে। কতক্ষণ পর নরম গলায় বললেন,
” মেয়েদের কথা বলতে হয় নরম হয়ে, নীচু স্বরে। যাকে বলছ সে ছাড়া যেন অন্য কেউ শুনতে না পারে। ”

আসমা রহমান মুখ বাঁকালেন। বললেন,
” পারব না। অনেক শিখিয়েছ, আর শেখাতে হবে না। ”

স্ত্রীর অশিষ্ট আচরণে রাগ করার বদলে নীঃশব্দে হেসে ফেললেন এরশাদ রহমান। সেই মুচকি হাসিতে মুগ্ধ দৃষ্টি নিহিতার। বাবার এই হাসিটা খুব পছন্দ তার। মায়ের এই আচরণটাও। বাবা-মায়ের এই মিষ্টি ঝগড়াটুকু সেই প্রায় লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে। আজও দেখল। তবে অন্য দিনের তুলনায় আজ অন্য রকম লাগছে। কেন? নিহিতার ভাবনা পথেই হঠাৎ মাহদীর হাসিমাখা মুখখানা উঁকি দিয়ে হারিয়ে গেল!

__________
সন্ধ্যার চা বানিয়ে মাহদীর রুমের দিকে যাচ্ছিলেন আসমা রহমান। হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়াল নিহিতা। বলে বসল,
” আমি নিয়ে যাই, আম্মু? ”

আসমা রহমান সন্দেহ চোখে তাকালেন। বললেন,
” তুই নিবি? কেন? ”

নিহিতা কিছুক্ষণ ইতস্ততায় ভুগে বলল,
” তুমি তো রান্না বসিয়েছ। পুড়ে গেলে? ”

আসমা রহমান মেয়ের কথায় গলে গেলেন। নিহিতার হাতে চা দিয়ে বললেন,
” তোকে যেতে হবে না। বারান্দায় রিন্টুর মা আছে। ওর কাছে দিয়ে আয়। ”

নিহিতা চা হাতে বারান্দায় গেল। রিন্টুর মাকে দেখেও যেন দেখল না। উঠোন পেরিয়ে মাহদীর রুমের দরজায় কড়া নাড়ল। মাহদী দরজা খুলে আশ্চর্য হয়ে গেল। আশ্চর্যান্বিত প্রশ্ন করল,
” তুমি? ”

নিহিতা ঘাবড়ে গেল। হাত-পা কাঁপছে। কাপ থেকে চা ছিটকে পড়তে মাহদী চটজলদি চায়ের কাপ নিজের হাতে নিয়ে বলল,
” তুমি ঠিক আছো? ”

নিহিতা উত্তর দিতে পারল না। মাহদীর দিকে তাকাতে পারল না। ফিরে যেতেও পারল না। সেই সময় মন ছুটে এলো। নিহিতার পেট জড়িয়ে বলল,
” খালামনি! ”

নিহিতা পড়ে যাচ্ছিল প্রায়। দরজার একপাশ চেপে ধরে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করল। মনকে অন্য হাতে জড়িয়ে বলল,
” ছোট বাবা! কিছু বলবে? ”

মন নিহিতাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
” বাবা, খালামনিকে বলো ভেতরে আসতে। আমাদের সাথে খেলবে। ”

মাহদী আপত্তি দেখালেও নিহিতা মনকে কোলে নিয়ে ভেতরে ঢুকে বলল,
” তোমরা বুঝি খেলছিলে? ”
” হ্যাঁ, তুমি খেলবে? ”
” কী খেলছ? ”

মন উত্তর দেওয়ার আগে মাহদী বলল,
” তেমন কিছু নয়। তোমার মনে হয় পড়া আছে। ”

নিহিতা বুঝতে পারল মাহদী তাকে চলে যেতে বলছে। তবুও না বুঝার ভান ধরে মনকে বলল,
” চলো খেলি। ”

নিহিতা মনকে নিয়ে বিছানার কাছে পৌঁছাতে মাহদী বলল,
” তোমরা খেল। আমি একটু বাইরে থেকে আসছি। ”

কথাটা বলেই মাহদী বেরিয়ে পড়ল।

চলবে