Home "ধারাবাহিক গল্প নীল রঙা উপাখ্যান নীল রঙা উপাখ্যান পর্ব-০১

নীল রঙা উপাখ্যান পর্ব-০১

0
1809

#নীল_রঙা_উপাখ্যান
#পর্ব_০১
#লামিয়া_রহমান_মেঘলা।

বড় আপার বাসর রাতে তারই ভাসুরের কক্ষে বউ সেজে বসে আছে তিতলি।
ঘোমটার নিচে তিতলি ছোট্ট দেহখানা থরথর করে কাঁপছে। এই বাড়ির কেউই জানেনা আরফান নেওয়াজের সাথে তিতলির বিয়ে হয়েছে।
আজ সকালে যে কাহিনিটা আরফান করেছে এরপর তিতলি কি করবে তিতলি নিজেকে কোন ভাবে সামলাতে পারছে না। এরপর তার সাথে কি ঘটবে।
তিতলির কম্পিত শরীর খানা আরও কম্পন দিতে লাগল যখন তিতলি অনুভব করল তার দিকে কেউ এগিয়ে আসছে।
তিতলি জানে এটা কে। যার কামরায় সে বঁধু বেসে বসে আছে।
কিছুক্ষণের ব্যবধানে তিতলি একটা হেঁচকা টান খেল। তিতলি সোজা বিছনায় পড়ল।
তিতলি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর ঘোমটা খুলে ছুড়ে ফেলল মাটিতে আরফান।
তিতলি ভয় পেয়ে যায়।
আরফান, তিতলির গালে স্পর্শ করে।

“কাপছো কেন? তুমিত আমার স্ত্রী তাইনা? আমার স্পর্শে তোমার শরীর এত ভয়ানক ভাবে কাঁপছে কেন?”

“আ আমি।”

তিতলির কন্ঠের কম্পন। আরফানের হাত তিতলির কন্ঠনালী স্পর্শ করে।

” আ আমাকে স সময় দ দিন৷”

“কিসের সময়? তুমিত কাল চলেই যাবে। আমার অধিকার আমি কখন আদায় করব? ”

” আ আমি।”

আরফান, তিতলির কম্পিল গাল স্পর্শ করে।
এরপর কিছুক্ষণ মায়াবী চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে থাকে।
এরপর বিনা বাক্যে তিতলির বুকের উপর শুয়ে পড়ে।
তিতলি নড়বার জায়গা পায়না।

“জাস্ট নীরবে আমাকে একটু শুয়ে থাকতে দেও। নড়াচড়া করলে তোমার জন্য বিষটা ভালো হবেনা। শান্ত থাকো আমাকেও শান্ত থাকতে দেও। ”

কথা গুলো বলে আরফান চোখ বন্ধ করে নেয়। তিতলির হৃদয়টা বেরিয়ে আসার উপক্রম। এমন ভাবে বলল যেন সব কিছুর জন্য তিতলি দ্বায়ী। এই মুহুর্তে তিতলির ভীষণ কান্না পাচ্ছে। কিন্তু শব্দ করলে যদি লোকটা উঠে যায়। তিতলি তাই মুখ চেপে ধরে হাত দিয়ে। তার কান্নার শব্দ আরফানের কান পর্যন্ত না পৌঁছালে হয়।
তিতলির মনে হচ্ছে সে বাড়িতে যেতে চায়। এখানে থাকতে চায়না। বাড়িতে গিয়ে মাকে সব বলতে চায় সে।
এটা কেমন বিয়ে। কেও জানেনা যে তিতলির বিয়ে হয়েছে। না তিতলির পরিবারের কেও না জানে আরফানের পরিবারের কেও।
এটা কেমন পরিক্ষা হচ্ছে তার। এভাবে কি আদও বিয়ে সম্ভব। তিতলির ছোট্টো হৃদয় খানা ভাঙছে বার বার। এই হৃদয় ভাঙার শব্দ শোনা যায় না। তবে যদি শোনা যেত তবে মানুষ কখনো মানুষ কে আঘাত করত না।
তিতলি সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনাটা একবার মনে করে।


বুসরার বিয়েটা হবে কমিউনিটি সেন্টারে।
সবাই রেডি হয়ে বেরিয়ে গেছে।
তিতলি একটা জর্জেট লাল রঙা শাড়ি পরেছে। গোল্ডেন জারি কাজ করা।
শ্যামলতার শরীরে লাল রঙা শাড়িটা বেশ ভালো জমেছে।
তিতলি বেরিয়ে বোনের পাশে এসে বসে।
গাড়ি গুলো কমিউনিটি সেন্টারের দিকে অগ্রসর হয়।
কমিউনিটি সেন্টারে পৌঁছানোর ১০ মিনিটের মাথায় বরযাত্রী উপস্থিত হয়।
বরযাত্রী কে স্বাগতম জানিয়ে তিতলি সরে আসে।
সব মেহমান প্রবেশ করার পর একজন মেইন গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে।
শুভ্র রঙা পাঞ্জাবিতে লোকটাকে কি মারাত্মক সুদর্শন দেখাচ্ছে। বেশ লম্বা সে। তিতলির থেকে অনেকটাই। পেশায় একজন ডক্টর। ডক্টর আরফান নেওয়াজ। দেশের নাম করা কার্ডিয়াক সার্জন।
কিছুদিন আগেই চীন থেকে ইন্টার্নি শেষ করে এসেছেন।
ওনারই ছোট ভাই ইরফান নেওয়াজের সাথে তিতলির বোন বুসরার বিয়ে।
তবে আরফান নেওয়াজের বিয়ের আগেই তার ভাই ইরফান নেওয়াজ কেন বিয়েটা করল এটা কেউই জানেনা। তিতলিও জানেনা এ বিষয়ে কিছু।
তিতলি খানিকটা সময় তাকিয়ে থাকার পর নিজেকেই গালাগাল শুরু করে।
এভাবে কেউ তাকিয়ে থাকে।
তিতলি সরে আসে সেখান থেকে। বুসরাকে একটা রুমে রাখা হয়েছে। তিতলি সেই রুমেই চলে যায়।
বুসরা রূপে লক্ষি। এত সুন্দরী। দুধ আলতা গায়ের রং। কেউ দেখলে চোখই ফেরাতে পারবে না এমন। গোলাপের পাপড়ির ন্যায় ঠোঁট দু’টো তার।
না সাজলেও মারাত্মক সুন্দরী সে। অপর দিকে তিতলি তেমন সুন্দরী নয়। শ্যামবর্ণ তার গায়ের রং। আবার একটু রোগটেও আছে। তিতলি বেশি খাবার খায়না। এটা তার স্বভাব। তবে সে দিকে মা এবং বোন বাদে আহামরি কেউ খেয়াল করেনা। তিতলির কি হলো কি না হলো। বুসরার খেয়াল সবাই করলেও তিতলি এ দিক দিয়ে পিছিয়ে থাকে সব সময়।
তিতলি বুসরার রুমে এসে দেখে বুসরা বসে আছে চেয়ারে, তার বোনকে কি সুন্দর দেখাচ্ছে।

“তোকে কি সুন্দর দেখাচ্ছে আপা।”

বুসরা হেসে তিতলির হাতে হাত রাখে,

“তোকেও সুন্দর লাগছে।’

” ইস আমিত কালো তুই ফর্সা।”

বুসরা, তিতলির হাতে চড় মারে,

“এমন বলবি না। আমার কাছে তুই সেরা সুন্দরী।”

তিতলি বোনের কথায় গাল ভরা হাসি দিল। ছোট থেকে এই গায়ের রং নিয়ে যত কথা শুনেছে সে বুসরা সব সময় তাকে সাহায্য করেছে। বুসরাই সে যে তিতলিকে প্রাণ উজাড় করে ভালোবাসে।

কিছুক্ষণ পর বুসরাকে নিয়ে যাওয়া হয়। বিয়ে পড়ানোর জন্য।
তিতলি ক্যামেরায় বন্দি করবে সব দৃশ্য। কিন্তু হটাৎ করে তিতলি লক্ষ করল তার ক্যামেরাটাই আনা হয়নি। সে বুসরাকে বসিয়ে রাখা রুমেই ক্যামেরাটা রেখে এসেছে।
তিতলি যখন সেই রুমের দিকে যাচ্ছিল। তখন ভিড় আড়ালে কেও তার মুখ চেপে ধরে। তিতলি কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর মুখ বন্ধ করে একটা ঘরে নিয়ে আসে।
তিতলি নিজেকে ছাড়াতে ছাড়তে ঘটনা ঘটে যায়।
তিতলিকে লোকটা একটা বন্ধ কামরায় এনে ফেলে।
তিতলি মাথা তুলে আরফান কে দেখে অবাক হয়ে যায়।

“আ আপনি?”

“হ্যাঁ আমি। কেন অন্য কাউকে আশা করেছিলে?”

“জি না। কাউকেই আশা করিনি। এগুলো কি আচরণ? ”

আরফান তিতলির কথায় কোন উত্তার দেয়না। তার বদলে সে তিতলির পায়ের কাছে বসে হাঁটু ভাজ করে। একটা কাগজ ধরে তিতলির সামনে,

“তিতলি। সাইন করো।”

তিতলি অবাক হয়ে তাকায় কাগজের দিকে। রেজিস্ট্রি পেপার।

“কিসের কাগজ এইটা?”

“বিয়ের।”

“কিহ। কার বিয়ে কিসের বিয়ে?”

“তোমার সাথে আমার বিয়ে।’

” ইয়ারকি করছেন ভাইয়া?”

কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে তিতলির গালে পড়ল একটি থাপ্পড়। থাপ্পড়ের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে তিতলি কিছুক্ষণের জন্য শব্দই শুনতে পারেনি আশেপাশের।
তিতলির চোখ বড় বড় হয়ে যায়।

“হবু জামাইকে কেউ ভাইয়া বলে ডাকে। বোঝনা কিছু?”

তিতলি এবার ভয় পেয়ে যায়। তিতলি একটু পিছিয়ে যেতে নিলে আরফান তিতলির কুনুই ধরে বসে।

‘এমন কেন করছেন। যেতে দিন আমায়। আমি বাবাকে বলে দেব সব। ”

“বেশত তাহলে তোর বোনের বিয়েটাও হবেনা আর৷”

“মানে!”

” মানে সোজা। ওই দেখ। বিয়েটা আঁটকে আছে আমার জন্য। ”

তিতলি, আরফানের ইসারা করে দেখানো দিকে মাথা ঘোরায়।
বিরাট এক কাঁচের জানালা দিয়ে সব দেখা যাচ্ছে।
ইরফান বসে আছে আরফানের জন্য। আরফান না গেলে বিয়ে হবেনা।
তিতলি উঠে দাঁড়ায়। জানালার কাছে গিয়ে আঘাত করতে থাকে,

“ইরফান ভাইয়া, আপা। আপা। আম্মা, আব্বু। আব্বু কথা শোনো। ”

কিন্তু না কেউ কথা শুনছে না।
আরফান তিতলির এই ব্যার্থ প্রচেষ্টা দেখে শব্দ করে হাসে।
তিতলির শরীরে এখন আর কোন শক্তি নেই। তার শরীর কাঁপছে ভয়ে।

“বিয়েটা হবেনা তিতলি। তোর বোনের বিয়েটা আমি আটকে দেব।”

আরফানের প্রতিটা কথার সাথে তিতলির গালে ওর মুঠো খানা শক্ত হচ্ছে।
তিতলি হাত খানা আরফানের হাতে রাখে,

“ক কেন এমন ক করছেন? কি দ দোষ আমার? ”

“তোকে যা বলেছি সেটা করবি। আর এখনি করবি।”

“এমন করবেন না।”

আরফান, প্রচন্ড ক্রোধে তিতলিকে ছুড়ে ফেলে।
তিতলি সোজা গিয়ে ছিটে পড়ে।

“সাইন করবি? শেষ বার জিজ্ঞেস করছি।”

“এমনটা কেন করছেন? আপনি আমার বোনের ভাসুর সম্পর্কে।”

“ত কি করব? বল ছিন্নভিন্ন করে দেব সব সম্পর্ক? জানিসত এরপর কি হবে? তোর বোনের পেটের বাচ্চা টার কি হবে? তোর বোন সুইসাইড করবে।”

তিতলি, আরফানের পায়ের কাছে হাঁটু ভাজ করে বসে পড়ে,

“কেন করছেন আপনি এমন। আমি কি দোষ করেছি?”

আরফান, তিতলির গাল চেপে ধরে পুনরায়। দাঁতে দাঁত চেপে বলে,

“সাইন করবি?”

তিতলি পাশে ফিরে দেখে। বিয়েটা সত্যি থেমে আছে। আরফানের জন্য।
তিতলি, মাথা নামিয়ে নেয়।

“করব।”

আরফান হাতের কাগজ খানা তিতলির সামনে রাখে,

“সাইন কর। ”

তিতলির চোখ দু’টো খালি দেখাচ্ছে। এ যেন অদ্ভুত এক গোলক ধাঁধা।
তিতলির মন বলছে এটা একটা দুঃস্বপ্ন। তা ছাড়া হয়ত আর কিছুই না। স্বপ্ন টা ভেঙে গেলেই সে মুক্ত হয়ে যাবে।
কিন্তু না। মুক্তি তার মিলল না। কাগজে তাকে সাইন করা লাগল।
তিতলির কাজল লেপ্টে থাকা ভেজা আখি জোড়া আরফানের দিকে স্থির।
আরফান কাগজটা হাতে উঠিয়ে তিতলির গালে হাত রাখে।

“কংগ্রাচুলেশনস, মিসেস নেওয়াজ। কোন চালাকি করতে যাবেন না। তাহলে আপনার বোনের যে বাচ্চা টা বিয়ের আগে থেকেই পেটে ছিল সেটা পুরো গ্রাম বাসি জানবে। ”

কথা গুলো বলে সে প্রস্থান করল।
ওরা এতক্ষণ ওয়েডিং হলের এমন একটা জায়গায় বসে ছিল যেখান থেকে বাহিরের সব দেখা গেলেও ভেতরের কিছুই দেখা যায়না।
তিতলির হাত পা কাঁপছে।
ওদিকে আরফান হাসি মুখে ভেনুতে পৌছে গেলেই তিতলির বোন বুসরা এবং ইরফানের বিয়েটা শুরু হয়ে যায়।
তিতলি মেঝেতে বসে সেই দৃশ্য দেখে।
কি থেকে কি হয়ে গেল বিষয়টা ভেবেই কেমন সব উলট পালট হয়ে যাচ্ছে তিতলির।

এরপর কেউই জানল না এই আশে হয়েছে দু’টো বিয়ে।
তিতলি তখন থেকেই মন মরা হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সবাই ভাবে বোন চলে যাবে আজ এই জন্য ই হয়ত তিতলির মন খারাপ।
বুসরার বিদায়ের সময় তিতলিকে পাঠানো হয় বুসরার সাথে। বিয়ের দিন কনের সাথে কাউকে পাঠানো হয়। সেই জন্য বুসরাকে পাঠানো হয়।

আরফান দের বাড়িতে পৌঁছানোর পর,
অনেক অনুষ্ঠান হয়। সেখানে অনেক হৈ-হুল্লোড় হয়। সব কিছুর মাঝে তিতলি থেকেও ছিলনা। তবে এখানে আসার পর তিতলির সাথে আরফানের দেখা হয়নি।
সব অনুষ্ঠানের শেষে তিতলিকে গেস্ট রুমে থাকতে দেওয়া হয়।
তিতলি বিছনায় শুয়ে পড়ে।
সারা দিনে ঘটে যাওয়া ঘটনা তাকে এখনো তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
মাঝ রাত তখন সব দিকে নিরব।
তিতলিকে হটাৎ করেই কেও পাজকোলে তুলে নেয়। তিতলি কিছু বলার আগেই আরফানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর শোনা যায়।

“বিয়েটা যখন হলো বাসর টাও হওয়া প্রয়োজন। তাইনা।”

চলবে?