নীল সীমানার শেষপ্রান্তে পর্ব-০৩

0
5666

#নীল_সীমানার_শেষপ্রান্তে
#Writer_Mahfuza_Akter
||পর্ব_০৩||
;
;
;

এক সপ্তাহ পর,,,,,
জয়ের ঘরে বধূ সেজে তার অপেক্ষায় বসে আছি আমি। ঘোমটাটা হালকা উঠিয়ে ঘড়ির ঠিকঠিক শব্দ অনুসরণ করে সেদিকে তাকিয়ে দেখলাম রাত বারোটা বাজতে আর সাত মিনিট বাকি আছে। বাইরে থেকে এখনো অনেক মানুষের হৈ-হুল্লোড় শোনা যাচ্ছে। বিয়ে বাড়িতে যা হয় আর কি!

আমার আর জয়ের বিয়েটা সবার মতানুসারেই হয়েছে। বড়ো স্যার, মানে জয়ের বাবা অনেক খুশি হয়েছেন, জয় আমাকে বিয়ে করতে চেয়েছেন বলে। সাথে বাকি সবাইও। কিন্তু তারা তো আর জানে না আমার আর জয়ের মধ্যে কী ডিল হয়েছে! ইদানীং জয় আমার উপর একটু বেশিই রাগ দেখায়, আর কেমন যেন এভয়েড করে চলে। আল্লাহ জানে আজ আমার কপালে কী লেখা আছে! তবে যাই থাকুক না কেন, সব পরিস্থিতি মোকাবেলা করার আর সব কষ্ট সহ্য করার মতো শক্তি যেন পাই এটাই আমার প্রার্থনার বিষয় এখন।

আমি বসে বসে এসব ভাবছিলাম তখনই দরজা খোলার শব্দ পেলাম আর ঘোমটা পুরোটা উঠিয়ে ফেললাম। এতোক্ষণ অদ্রি ভাবির (জয়ের বড় ভাই জায়েদ মাহমুদ এর স্ত্রীর নাম অদ্রি) ভয়ে ঘোমটা দিয়ে বসে ছিলাম। তিনি কড়াভাবে নিষেধ করে গেছেন জয় ঘোমটা তোলার আগে যেন ঘোমটা না তুলি। কিন্তু এখন আর এসব কাহিনী করার দরকার কী?

ঘোমটা তোলার পর দেখলাম, জয় এসেছে। উনি আমার পাশে এসে বসলেন। আমার অনেক ভয় করছে। আমার ভাবনা ভুল পরিণত করে উনি বললেন,
———

এদিকে,,,,
জয়ের মা আয়েশা অদ্রিকে বললেন,
—“অদ্রি মা, মুনের কাপড় চোপড় আর সব ব্যবহার্য জিনিসপত্রের লাগেজটা এখনো ওর ঘরে দিয়ে আসা হয়নি। মেয়েটা রাতে পরবে কী? ঐ ভারী গয়না আর শাড়ি পরে তো রাতে ঘুমাতে পারবে না।”

অদ্রি জিহ্বায় কামড় দিয়ে ডান চোখ বন্ধ করে বললো,
—“এই রে,,,, আমি একদম ভুলে গেছিলাম। এখনি দিয়ে আসছি আমি, মা!

জায়েদ টিটকারি মেরে বললো,
—“আরে মা, তুমি কাকে কী বলছো? ওর (অদ্রির) সারাক্ষণ সাজগোজ, হাসি-তামাশা আর আড্ডা দেওয়া ছাড়া আর কোনো কাজ আছে?”

অদ্রি চোখ গরম করে বললো,
—“তোমাকে তো আমি পরে দেখে নেব। আগে মুনকে ওর জিনিসপত্র গুলো দিয়ে আসি। যত্তসব! ”
বলেই মুখ ভেংচি কেটে যেতে লাগলো। আর এদিকে জায়েদ ওর মায়ের কাঁধে কনুই বসিয়ে হাসতে হাসতে শেষ।

অদ্রি জয়ের রুমের সামনে গিয়ে দেখলো দরজা খোলাই আছে। তাই দরজায় হাত দিয়ে ধাক্কা দিতে যাবে এমন সময় জয়ের একটা কথা শুনে পুরো ফ্রিজড হয়ে গেল।

জয় মুনের পাশে বসে মাথা নিচু করে বলছে,
—“দেখো মুন, তুমি তো জানো আমাদের বিয়েটা কন্ট্র্যাক্টের বিয়ে, যেটা আর পাচটা বিয়ের মতো স্বাভাবিক না। আর বিয়ের কন্ট্র্যাক্টের পেপারে লিখাই ছিল যে, আমি তোমার ওপর কখনো স্বামীর অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চাইবো না, তোমায় কখনো স্পর্শ করবো না। আমি তোমায় যথাযথ সম্মান দেওয়ার চেষ্টা করবো এন্ড তোমার ওপর আমার রেসপন্সিবিলিটিস প্রোপারলি পালন করবো। আমি জানি, একটা মেয়ের কাছে তার সম্মান কী জিনিস? সো আমার ওপর বিশ্বাস রাখতে পারো। আর আশা করি, তুমি আমায় তনিমাকে বিয়ে করতে হেল্প করবে।”

ওনার কথা শুনে আমার ঠিক কী রিয়েক্ট দেয়া উচিত, বুঝতে পারছি না। আমার একদিক দিয়ে অনেক খুশি লাগছে আবার আরেক দিকে অনেক কষ্ট হচ্ছে। তবুও সব ফিলিংস সাইডে রেখে আমি মুচকি হেসে বললাম,
—“আমি যথা সাধ্য চেষ্টা করবো। আমার মতো অসহায় একজন মেয়েকে আপনি যথাযথ সম্মান দিয়েছেন, আমায় অনেক হেল্প করেছেন; আমিও তার মান রাখার চেষ্টা করবো। ”

জয় হেসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
—“কে বলেছে তুমি অসহায়? নিজেকে কখনো এতো ছোট ভাববে না। মেয়েরা এতো নগন্য হয়না, বুঝেছো। যদি নগন্যই হতো, তাহলে হাদিস শরীফে এটা বলা থাকতো না যে, ‘যে দম্পতির প্রথম সন্তান কন্যা হয়, সে দম্পতি সবচেয়ে বেশি ভাগ্যবান’। আর পবিত্র কোরআনেও মাতৃকূলকে এতোটা মর্যাদা দেওয়া হতো না। সুতরাং মেয়ে হিসেবে তোমার প্রাউড ফিল করা উচিত। আর তুমি? ঠু মাচ শেইমফুল! ”

আমি চোখ দুটো রসগোল্লার মতো করে ভাবতে লাগলাম,
—“এটা কি সেই জয় মাহমুদ, যার নাকের ডগায় অলয়েজ রাগ বসে থাকে। আমি এক বছর যাবৎ শুধু ওনার রাগটাই দেখে এসেছি। আর আজ? আচ্ছা, আমি স্বপ্ন দেখছি না, তো?”

মুন এসব কিছু ভাবনায় মগ্ন, তখন জয় ওর চোখের সামনে তুড়ি বাজিয়ে বললো,
—“চোখ এমন করে বের করে আমার দিকে তাকিয়ে আছো কেন? যাও এই কাপড় চোপড় চেঞ্জ করে এসো।”

অদ্রি এতোক্ষণ ওদের কথা শুনে ঠোঁট দুটো দুই প্রান্তে ঠেলে তার ওপর ডান হাতের মাঝের তিনটি আঙুল রেখে দাড়িয়ে আছে। মনে মনে ভাবছে,
—“তার মানে এগুলো সব জয়ের প্ল্যান ছিল! ও মুনের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়েছে। আর মুন! ও কীই বা করবে? এই জয় এতো গাধা, মুনের মতো একটা মেয়েকে রেখে ঐ তনিমার মতো একটা বাজে মেয়েকে নিয়ে পড়ে আছে। আমার মুনের সাথে কথা বলতে হবে। কালই বলবো আমি।”
ভেবে দরজায় নক করে বললো,
—“মুন, তোমার লাগেজ নিয়ে এসেছি। আমি কি ভেতরে আসবো?”

অদ্রির গলা শুনে জয় আর মুন দুজনেই হকচকিয়ে যায়। জয় ভাবছে, ভাবি কিছু শুনে ফেললো না তো? আমি জোরপূর্বক হেসে দরজার সামনে গিয়ে বললাম,
—“হ্যাঁ, হ্যাঁ, আসুন না। পারমিশন নেওয়ার কী আছে? ”

অদ্রি ঘরে ডুকে লাগেজটাকে দাড় করিয়ে রেখে আমার নাক টেনে বললো,
—“সেটা তুমি বুঝবে না। এখন শোনো, এখানে তোমার সব কাপড় ও জিনিসপত্র আছে। একটা ড্রেস বের করে পরে নিও। কেমন?”

আমি মাথা নাড়িয়ে তার কথায় সায় দিলাম। অদ্রি জয়ের দিকে একবার তাকিয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল।
—“যাক, ভাবি কিছু শুনেনি। ”
আমি দরজা লাগিয়ে দিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললাম। তারপর লাগেজটা খোলার জন্য ঘোরাতে যাবো, তখনই বাঁ হাতটা লাগেজের নিচে চাপা পড়ে যায় আর আমি চোখ মুখ খিঁচে ‘আহ্’ করে একটা চাপা আর্তনাদ করে উঠি। আমার এমন শব্দে জয় আমার দিকে এগিয়ে আসতে আসতে বললো,
—“কী হলো? কোনো সমস্যা হয়েছে? ”

আমি ডান হাত দিয়ে লাগেজ টা সরানো ব্যর্থ চেষ্টা করছি আর হাতের ব্যথার চোটে চোখ দিয়ে গড়গড় করে পানি পড়ছে।

জয় মুনের গতিবিধি দেখে লাগেজটা একহাত দিয়ে উঠিয়ে ওর হাত সেখান থেকে বের করে নেয়। বাঁ হাতের তিন আঙুলে জোরে চাপ লাগায় ছিলে তো গেছেই, সাথে রক্তও পড়ছে; ব্যথার কারনে হাতটাও ঠকঠক করে কাপছে । জয় আমার দিকে অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললো,
—“বি কেয়ারফুল; ড্যাম ইট। এভাবে হেলেফেলে এতো ভারী একটা জিনিস কেউ নাড়াচাড়া করে? কতখানি কেটে গেছে দেখেছো? চুপচাপ এখানে বসো। একটু নড়লে এক থাপ্পড়ে সব গুলো দাত ফেলে দিবো। স্টুপিড কোথাকার!”
বলেই উঠে গিয়ে ফার্স্ট এইড বক্স এনে খুব যত্ন করে হাতে ব্যান্ডেজ করে দিল। আমি আরো ইনোসেন্ট ফেস করে কাঁদতে লাগলাম। কী মানুষরে ভাই? এমনি ব্যথা পাইসি! একটু আদর দিয়ে কথা বলবে, তা না! ডিরেক্ট থাপ্পড় মারার হুমকি দেয়।

উনি লাগেজ খুলে আমার জন্য একটা লাল থ্রি-পিস বের করে হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো,
—“এতো কেঁদে লাভ নেই। মলম লাগিয়ে দিয়েছি, কালকে দেখবে ক্ষত শুকিয়ে গেছে। এখন যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো।”
আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই ওনার ফোন বেজে ওঠে। ওনি ফোন রিসিভ করে বলে উঠলো,
—“হ্যাঁ তনিমা, বলো।”

তনিমা নাম শুনতেই আমি আর এক মুহুর্ত দেরী না করে ওয়াশরুমে চলে গেলাম। কেন জানিনা একটু কষ্ট হলো? কিন্তু আমায় কষ্ট পেলে চলবে না। বাস্তবতাটা মানতেই হবে।

এদিকে জয় তনিমাকে বলছে,
—“আজ এতো রাতে ফোন দিলে যে! তুমি তো কখনো আমায় এতো রাতে কল দেওনা!”
তনিমা নিবিড়ের কোলে বসে আছে আর লাউড স্পিকার দিয়ে কথা বলছে। তনিমা মনে মনে বলছে,
—“তোকে কেন কল দিবো? আমার বরটার তখন কী হবে? ”
নিবিড় মনে মনে বললো,
—“এ্যাহহহ শখ কতো? আমার কতো বড় ক্ষতি করেছিলি, তোর সেই ক্ষতির শোধ তুলার জন্য ই তনিমা তোর সাথে রিলেশন করছে। সবকিছুর কারণ শুধু তোকে ধ্বংস করে দেওয়া। ”
ভেবেই নিজের হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ফেললো নিবিড়।

–চলবে…….