পথান্তরে প্রিয়দর্শিনী পর্ব-৩৭+৩৮+৩৯

0
356

#পথান্তরে প্রিয়দর্শিনী
#মম_সাহা
#পর্ব-৩৭+৩৮+৩৯

দীর্ঘ ব্যাথাতুর এক নিকষ কালো রাত্রি যাপনের পর মায়া এখন ফুরফুরে সুস্থ। সকাল হতেই বাড়ি চলে এসেছে তারা। এখন হসপিটালে থেকেও তো কোনো লাভ নেই, ডোনার না পাওয়া অব্দি আর কিছুই করার নেই চিকিৎসকদের। আর বাড়ি ফেরার জন্য মোহনা-ই চাপটা বেশি প্রয়োগ করেছে। যেহেতু হসপিটালে থেকে কাজ নেই তাই মোহনার সিদ্ধান্তকেই সবাই গ্রহনযোগ্য মনে করেছে।

এখন সময়টা ঠিক উষ্ণ মধ্যাহ্ন। মায়া আবার চিলেকোঠার ঘরে হানা দিয়েছে। অসুস্থতার কথা জানার পর মায়া হঠাৎ করেই কেমন যেন মৃত্যুভয় জয় করে ফেলেছে। ভয়-ভীতি কিছুই আর তার ভেতর কাজ করছে না। এ বাড়ির বিভীষিকাময় আঁধারের নিচে থাকা রহস্যকে সে টেনে হিঁচড়ে বের করবে।

চিলেকোঠার ঘরে ঢুকেই প্রথমে ডায়েরিটা খোঁজা শুরু করলো মায়া। মোহনার পাপের একমাত্র সাক্ষী এই ডায়েরি, এটা হাতে না রাখলে মোহনার পাপের বিনাশ করা সম্ভব না। আগে যা করেছে মোহনা সেটা আটকানোর সাধ্যি মায়ার ছিলো না, কিন্তু এবার মোহনা যেটা করতে চাচ্ছে সেটা আটকানোর সাধ্য,সামর্থ্য, ক্ষমতা মায়ার আছে।

বুকসেল্ফটাকে তন্নতন্ন করে খোঁজার পর মায়া হতবাক, ডায়েরিটা নেই? মায়া আবার খুঁজলো, বার-বার খুঁজলো কিন্তু ফলাফল শূণ্য। মায়া দিগ ভ্রষ্ট হলো না, উৎকণ্ঠিত হলো না বরং এমন কিছু না হলেই যেন সে বেশি অবাক হতো। মায়া ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে বাহির থেকে চিলেকোঠার ঘরখানা আটকিয়ে দিলো। ছাঁদের কার্নিশ ঘেষে দাঁড়ালো। হাতের ফোন থেকে হৈমন্তের নাম্বারে ক্ষুদ্র একটা বার্তা পাঠিয়ে দিলো।

মিনিট দুই পেরুতেই হৈমন্ত তাদের ছাঁদে হাজির হলো। বেশ দুশ্চিন্তার ছাপ তার মুখ চোখে। ছাঁদে এসেই বেশ উৎকণ্ঠিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো,
“কী হয়েছে তোর? ঠিক আছিস তো? এই ভরদুপুরে ছাঁদে কী করছিস? শরীরটা যে অসুস্থ সে খেয়াল আছে তোর?”

মায়া হাসলো। হৈমন্তের এত উদ্বিগ্নতা তাকে প্রশান্তি দিচ্ছে। এই পৃথিবীতে এ মানুষটা ছাড়া অত উৎকণ্ঠা দেখানোর মানুষ মায়ার নেই। ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে হারিয়েছে সে সবাইকে। তাই তো প্রতিহিংসার আগুনটা তাকে দিবানিশি পুড়িয়ে যাচ্ছে।

মায়াকে চুপ থাকতে দেখে হৈমন্তের কপালে চিন্তার গাড়ো ভাজ পড়েছে। কণ্ঠ কোমল হয়েছে, চিন্তা গুলো নিবিড় অথচ ধারালো হলো। সে মোলায়েম কণ্ঠে বললো,
“কিছু হয়েছে, মায়া? এত কাঠফাটা রোদের মাঝে তুই ছাঁদে কী করছিস? আমাকেও জরুরী তলব করলি। শরীর কী বেশি খারাপ লাগছে? চল না মায়া, আমরা আগের জায়গায় ফিরে যাই। এই প্রতিহিংসা প্রতিহিংসা খেলাটা বন্ধ করে দে না রে। তোর সাথে আমার যে অনেক গুলো বছর বাঁচার শখ। বৃদ্ধ কালেও তোর হাতটা ধরে আমি বসন্ত কাটাতে চাই। পূরণ করবি না আমার ইচ্ছে?”

মায়ার হাসি মিলিয়ে গেলো। কেমন যেন কঠিন হলো তার গলার স্বর। সে কাঠিন্যতা বজায় রেখেই বললো,
“তুমি যেটাকে কেবল প্রতিহিংসা বলছো আমি সেটার মাঝে আমার বোনের মৃত্যুর সঠিক বিচার দেখতে পাচ্ছি। এখনো অব্দি আমি এর জন্যই বেঁচে আছি হৈমন্ত ভাই। নাহয় দিন দুনিয়ায় একা বাঁচার আমার তো কোনো কারণ ছিলো না।”

মায়ার কথা গুলো অজান্তেই গভীর আঁচড় কাটলো হৈমন্তের কোমল প্রেম মন্দিরে। হাসলো হৈমন্ত। এত গুলো বছর মেয়েটাকে দু হাতে আঁকড়ে রেখেছে সে অথচ মেয়েটার তার প্রতি কোনো টানই জন্ম নিলো না। একেই বোধহয় বলে ভালোবাসা!

ছোট্ট শ্বাস ফেলে চোখের কোণে জমতে থাকা জল গুলো বার কয়েক ডানা ঝাপটিয়ে মিলিয়ে ফেললো চোখের পাপড়িতে। ছেলেদের যে কাঁদতে নেই। ছেলেদের কান্না করা লাগবে এমন কোনো কষ্ট থাকতে নেই। ছেলেরা পাথর, তাদের এসব তুচ্ছ বিষয়ে কান্না করা যে বড্ড বেমানান।

হৈমন্তকে হাসতে দেখে মায়া ভ্রু কুঁচকালো। অবাক কণ্ঠে বললো,
“হাসলে যে হৈমন্ত ভাই?”

“আমি যদি এখন বলি, মায়া তুই বড্ড স্বার্থপর, তুই কী রাগ করবি? রাগ করলেও বলছি, তুই সত্যিই স্বার্থপর। বিপ্রতীপের মতন তুচ্ছ,নোংরা,বিদঘুটে মস্তিষ্ক সম্পন্ন মানুষের উপরও তোর কিঞ্চিৎ হলেও মায়া জন্মে ছিলো। অথচ দেখ আমি কতটা অভাগা, সেই ছোট থেকে তোর বটগাছ হয়েও তা পেলাম না। আসলে আমিই বোকা। বটগাছদের যে কেবল কাজ ছায়া দেয়া, অনুভূতি মায়া কিংবা মানুষ মায়াকে পাওয়ার অধিকার কিংবা ভাগ্য যে তাদের নেই। যাই হোক, বল কী বলবি? আমি জানি তুই এ বাড়ির সম্পর্কেই কিছু একটা বলতে এসেছিস। বলে ফেল।”

হৈমন্তের কথার ধরণে মায়া চুপ করে গেলো। আজ কত গুলো বছরের অভিযোগ ছেলেটা ঢেলে দিলো? একদম চুপ করে থাকা মানুষটারও কী ভীষণ না পাওয়ার কষ্ট, তা কী মায়া জানে না? জানে। কিছু কষ্ট দেখতেও ভালো লাগে, কিছু মানুষকে কষ্ট দিতেও ভালো লাগে কারণ আমরা জানি, হাজার কষ্টের পরও সে মানুষ গুলো আমাদের ছেড়ে যাবে না। বরাবরের মতনই আগলে রাখবে। তাতে আরেকবার আমরা এটা ভেবে তৃপ্তি পাবো যে, আমারও একটা মানুষ আছে, নিজের মানুষ, যে কেবল আমার।

“কিরে, বললি না? কোনো সমস্যা হলো?”

মায়া ধীর কণ্ঠে বললো,
“আসলে হৈমন্ত ভাই তোমারে একটা কথা বলা হয় নি।”

হৈমন্ত ভ্রু কুঁচকে বললো,
“কী কথা?”

“শাশুড়ি জেনে গেছে আমরা যে সব জানতে পেরেছি।”

মায়ার কথায় চমকে উঠলো হৈমন্ত। অতঃপর মায়া গতকালকের সব কথা খুলে বললো। হৈমন্ত অবাকের উপর অবাক হলো। এই মহিলা কতটা ভয়ঙ্কর হলে একটু ঘাবড়ে যায় নি তার অতীত জেনে ফেলেছে কেউ সেটা জেনেও। এই মহিলার সাথে পেরে ওঠাটা সম্ভব হবে না আদৌও।

কপালে জমা বিন্দু বিন্দু ঘাম গুলো বাম হাতের তালু দিয়ে মুছে ফেলে হৈমন্ত। হুশিয়ারি কণ্ঠে বলে,
“তোর আরও সাবধানে থাকতে হবে। তুই সবটা সত্যি জেনে ফেলেছিস, মহিলা তোকে সরাতেও দু’বার ভাববে না। তার শেষ টার্গেট তুই না হলেও সত্যি জানার জন্য তোর ক্ষতি করবে সে।”

মায়া ডানে বামে মাথা নাড়ালো। খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বললো,
“না, উনার শেষ নিশানা আমি না হৈমন্ত ভাই।”

মায়ার এমন সহজ সরল স্বীকারোক্তিতে অবাক হলো হৈমন্ত। অবাক কণ্ঠে বললো,
“তুই কীভাবে জানিস যে তুই না?”

“মারার হলে সে বোঝার সাথে সাথে আমাকে মেরে ফেলতো কিন্তু সে সেটা করে নি। বরং খুব শীতল ভাবে আমাকে ভয় দেখানোর একটা প্রয়াস করেছে। মাঝখানে আমার অসুস্থতা টা উঁকি না দিলে হয়তো আরও কিছু বলতো। সে এটাও সিউর যে আমি তাকে ফাঁসানোর চেষ্টা করবো তাই সে ডায়েরিটা সরিয়ে ফেলেছে। কিন্তু আমাকে কিছু বলে নি। তার টার্গেট অন্য কেউ। আমাদের ভাবনা ঘুরাতে হবে। তাকে তার মতন করে বুঝতে হবে।”

“তুই কী করতে চাচ্ছিস?”

“তার সাথে আপাতত ভালো আচরণ করতে চাচ্ছি। তার মতন ভাবতে চাচ্ছি। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে তার শেষ খু*নটা সে শীগ্রই করবে। কিন্তু কাকে? এটাই বের করতে হবে।”

“যা-ই করিস সাবধানে। তোর জন্য ভয় হয়।”

“আমাকে নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমার যতটুকু মনে হয় তার কাছে আমাকে খু*ন করার শক্তপোক্ত কারণ এতদিন ছিলো না। অথচ খু*নের কথাটা সে একমাস আগে লিখেছে। যদি ডায়েরিটা পড়ে সব জেনে যাওয়ার জন্য মারতে চায় তাহলে সেটা দু একদিনের ঘটনা। দর্শিনী দিদিকে সে অত্যাচার করতো মানসিক ভাবে কিন্তু কখনো তার বাবার বাড়ি থেকে টাকা পয়সা আনার কথা বলে নি, লোভ জিনিসটা তাহলে তার নেই। তারপর গায়ে হাত তুলে নি। কথার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত করতো। আমার মনে হয় দর্শিনী দিদিকে তাড়ানো ছিলো তার উদ্দেশ্য তাই সে এমনটা করেছে। বিপ্রতীপের সাথে আমার বিয়ের কথাও কিন্তু সে বলে নি। আর না আমার পরিবার নিয়ে কোনো খোঁজখবর নিয়েছে, আর না কোনো যৌতুক চেয়েছে,এতদিনও আমার বাবা-মায়ের কথা জিজ্ঞেস করে নি। তার মানে ছেলের বউ নিয়ে তার কোনো ইন্টারেস্ট নেই। কিন্তু ছেলের বৌদের তাড়ানো নিয়ে তার মাথা ব্যাথা। আমাকে যেই দেখলো কথার আঘাতে নুয়ানো যাচ্ছে না তাই শরীরে টুকটাক আঘাত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সবটাই আমাকে তাড়ানোর জন্য এছাড়া মনে হয়না আরও কোনো উদ্দেশ্য আছে। এমনটাও না যে তার পছন্দ করা কোনো মেয়ে আছে যার সাথে সে তার ছেলের বিয়ে দিবে। তাহলে সে এমনটা করছে কেনো? আসল রহস্য টা এখানেই। আগে এটা বের করতে হবে। আমার মনেহয় এটা বের হলেই সবটা হুড়মুড় করে বের হয়ে যাবে।”

মায়ার কথা যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত মনে হলো হৈমন্তের কাছে। হঠাৎ করেই হৈমন্তের ফোন বেজে উঠলো। সে মায়াকে ছাঁদ থেকে নেমে যেতে বলে ফোন রিসিভ করে নিজেও নেমে গেলো। মায়ার জন্য সে ডোনার খুঁজছে। মায়াকে যে বাঁচাতেই হবে।

মায়া হৈমন্তের যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইলো। এ মানুষটার প্রতি মায়ার একটা ভীষণ গভীর নাম না জানা অনুভূতি আছে কিন্তু সেটা কখনো সে প্রকাশ করবে না। থাক না, কিছু অজানা। প্রতিহিংসার অনলে জ্বলে গিয়ে একটা সন্তানকে বাবা ছাড়া আর একটা স্ত্রীকে স্বামী ছাড়া করেছে। অথচ ওদের কোনো দোষ ছিলো না। আর সেই পাপের শাস্তি স্বরূপ সে বেঁচে থাকতে পারবে কিনা সেটা নিয়ে সংশয়। অভিশাপ কখনো পিছু ছাড়ে? নিজের এই অনিশ্চিত জীবনের সাথে হৈমন্তকে জড়িয়ে কী লাভ। সে তো জানে, এত দ্রুত ডোনার খুঁজে পাওয়া সম্ভব না। মায়া হাসে, উত্তপ্ত রোদের দিকে তাকিয়ে গলা ছেড়ে গান তুলে,
“একবারই হয় জন্ম ভবে,
একবারই হয় মরণ,
বাঁচে শুধু বেঁচে থাকার
মিছে আয়োজন।”

_

বড় বৌদির হাতের পায়েসটাকে অগ্রাহ্য করে দর্শিনী বেরিয়ে এসেছিল বাড়ি থেকে। আজকে বড়বৌদির হাতের পায়েসটা খাওয়া মানেই এতদিনের বড়বৌদির করা সকল অপমানকে গিলে ফেলা। অথচ দর্শিনী তো সেটা করবে। আর কত গিলবে অপমান? এবার যে ফিরিয়ে দেওয়ার পালা সবটা।

গ্রামের সরু পথ ধরে হাজার খানেক চিন্তা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে দর্শিনী। তৃণার বিয়ের আরও নয়দিন আছে। এর মাঝে শহরে গিয়ে ফিরে আসা যাবে খুব ভালো ভাবে। বাবার জমির ঝামেলাটাও তো মিটাতে হবে। স্কুলে জয়েনিং দিতে হবে। কত কাজ অথচ সময় সীমিত।

“প্রিয়দর্শিনী, দাঁড়ান।”

ভরাট গম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠে দর্শিনী থামলো। সে জানে কণ্ঠের মালিক কে। তাই নিজেকে যথেষ্ট তৈরী করলো উত্তর দেওয়ার জন্য।

মৃত্যুঞ্জয় এগিয়ে এলো। জলপাই রাঙা শাড়িতে আবৃত হওয়া মানবীর মুখ পানে চাইলো। কিঞ্চিৎ সময়ের জন্য ভুলে গেলো নিজের অস্তিত্ব। কি সুন্দর লাগছে এই নারীটিকে! পৃথিবীর সবটা সৌন্দর্য যেন উজাড় করে দিয়েছে আজ এই মানবী।

মৃত্যুঞ্জয়কে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকতে দেখে দর্শিনী অস্বস্তিতে পড়লো। চোখটা এদিক ওদিক ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,
“কিছু বলবেন?”

মৃত্যুঞ্জয়ের ধ্যান ভাঙলো। নিজেকে স্বাভাবিক করে বললো,
“ফোন ধরছেন না, দেখাও দিচ্ছেন না, ব্যাপার কী?”

দর্শিনী হাসলো। মোলায়েম কণ্ঠে বললো,
“আপনার জন্য সারপ্রাইজ তৈরী করছি।”

মৃত্যুঞ্জয় অবাক হলো। অবাক কণ্ঠে বললো,
“তার জন্য আমার ফোন ধরবেন না? তা কী এমন সারপ্রাইজ শুনি?”

“সারপ্রাইজ যদি বলেই দেই, তাহলে কী সারপ্রাইজ থাকবে?”

দর্শিনীর কথার প্যাঁচে পড়ে খানিক হাসলো সে। মেয়েটা বেশ চালাক। হাসি মুখেই বললো,
“আজ আপনাকে বিশেষ লাগছে। কেনো?”

“প্রতিদিন বুঝি সাধারণ লাগে?”

দর্শিনীর কণ্ঠে মশকরার আভাস। মৃত্যুঞ্জয় অবাক হলো। মেয়েটা তো এত সাবলীল ভাবে কথা বলে না। তবে আজ এত পরিবর্তন! অবশ্য খারাপ লাগছে না তার।

“কোথায়ও যাচ্ছিলেন?”

“হ্যাঁ একটু কাজ আছে।”

“আমি কী আপনার সঙ্গী হতে পারি?”

সুঠাম দেহী পুরুষের আমতা-আমতা করা আবদারে হাসলো প্রিয়দর্শিনী। ঘাড় কাত করে বললো,
“আপনার গাড়িটাও যদি আমাদের সঙ্গী হতো তাহলে আরও বেশি উপকার হতো।”

মৃত্যুঞ্জয় হা হয়ে দর্শিনীর দিকে তাকিয়ে রইলো। মেয়েটা এত সহজে রাজি হয়ে গেলো? অথচ কত ঘুরিয়ে উত্তর জানালো। এই দর্শিনীকে মেলানো যাচ্ছে না আগের দর্শিনীর সাথে। আগের দর্শিনী ছিলো বিষণ্ণতায় ভরপুর তেঁতো। এই দর্শিনী টক ঝাল।

মৃত্যুঞ্জয় শার্টের হাটা গুটিয়ে বা’হাত পিছনের চুলে চালান করে ধীর কণ্ঠে বললো,
“যো হুকুম রাণী সাহেবা।”

আর এক মিনিটও দেরি না করে মৃত্যুঞ্জয় ছুটলো গাড়ি আনতে। দর্শিনী ফিচলে হেসে বললো,
“দেখবেন হোঁচট যেন না খান, এখনো তো মুখ থুবড়ে পড়া বাকি।”

মৃত্যুঞ্জয়ের কান অব্দি হয়তো কথা খানা পৌঁছালো না। তার মুখে সেই আনন্দের ঝিলিক এখনো দেখা যাচ্ছে।

_

মায়া শ্বশুর বাড়ির বাগানে এসেছে। এ দিকটাতে তেমন আসা হয় না তার। ধরতে গেলে এত মাসের মাঝে একবারও এখানে আসে নি সে। বাগানের কিনারের দিকে আসতেই তার পা আপনা-আপনি থেমে গেলো। গাছের আড়ালে মোহনাকে দেখা যাচ্ছে। সে একটা ছুড়ি ধার করছে। পাশেই মোটা একটা দঁড়ি দেখা যাচ্ছে। মায়া কিঞ্চিৎ কেঁপে উঠলো। মোহনা এসব কেনো করছে? নিশ্চিত পরবর্তী শিকার করার জন্য। কি ভয়ানক!

মোহনা দেখার আগেই মায়া চলে যেতে নিলেই মোহনা হেসে উঠে। নিজের কাজ করতে করতে বলে,
“প্রতিহিংসায় অন্ধ হয়েছো আসল দোষী চিনলে না,
সম্পর্ক গুলো খুলে দেখো, কত চেনা মানুষ আসলে অচেনা।”

মায়া থমকালো। মোহনা কি তবে তাকে হিন্টস দিলো? কার কথা বুঝালো সে?

_

বিকেলের শেষ দিকে দর্শিনীদের গাড়ি এসে থামলো কাঙ্খিত জায়গায়। মৃত্যুঞ্জয় গাড়ি থামিয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে অবাক কণ্ঠে বললো,
“পাগলা গারদ!”

#চলবে

#পথান্তরে_প্রিয়দর্শিনী
#মম_সাহা

পর্বঃ আটত্রিশ

ঝলমলে রৌদ্দুর মাখা ভোর। পাখির কিচিরমিচির শব্দের সাথে যান্ত্রিক শব্দ ভেসে আসছে। মায়ার শক্তপোক্ত ঘুমটা হালকা হয়ে এলো অনবরত শব্দে। বিরক্তে খানিক চোখমুখ কুঁচকে গেলো। অলস ঘুম কাটিয়ে ক্লান্ত শরীরটা টেনে উঠে দাঁড়ালো মায়া। সারা রাত সে খুঁজে বেরিয়েছে রহস্যের ঘনঘটা। শাশুড়ির কথার মানেও তার বোধগম্য হয় নি। বরং মনে হচ্ছে বারবার জড়িয়ে পড়ছে রহস্যের বেড়াজালে।

কলিং বেল আবারও বেজে উঠলো। মায়া ঘুম ঘুম চোখে দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকালো। মাত্র সাড়ে পাঁচটা বাজে। এত ভোরে কে আসতে পারে ভেবেই অবাক হলো মায়া। আঁচলটা ঠিক করে ছুট লাগালো দরজার দিকে। মেইন গেইট খুলতেই বিষ্ময়ে হা হয়ে গেলো মায়া। তার চোখে মুখেও সেই বিস্ময়ের ছোঁয়া খেয়াল করা গেলো। বিস্মিত, হতভম্ব হয়েই মায়া প্রশ্ন ছুঁড়লো,
“সই, তুমি! এত সকালে!”

দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা দর্শিনী মায়ার দিকে তাকিয়ে স্মিত হাসি দিলো। আঁচল টেনে নিজের গলায় জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘামের রাশি গুলো মুছে মিষ্টি কণ্ঠে বললো,
“কি গো সই, ভিতরে আসতে বলবে না? কতক্ষণ যাবত বাহিরে দাঁড়িয়ে আছি সে খেয়াল আছে?”

মায়ার দৃষ্টিভ্রম কাটলো। দরজা ছেঁড়ে দাঁড়িয়ে ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বললো,
“হ্যাঁ, হ্যাঁ আসো ভিতরে। এত ভোরে তোমাকে এখানে দেখে আমি এক মুহূর্তের জন্য স্বপ্ন ভেবেছিলাম। আসো ভিতরে। ইশ, কী ঘামছো তুমি। আসো, সোফায় বসলে ঠান্ডা লাগবে ফ্যান চালিয়ে দিলে।”

দর্শিনী তার হাতের ছোট ব্যাগটা নিয়ে ঘরের ভিতরে গিয়ে বসলো। কত গুলো দিন পর আবার সে পুরোনো সংসারটায় ফিরলো? নিজের নিজের করে এ সংসারটাকে কত যত্ন করে গড়ে ছিলো! আজ সে সংসারে কিছুক্ষণের অতিথি সে। ভাবা যায় সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির কি মহিমা! অবশ্য এ সংসারে এখন অতিথি হিসেবেই তাকে বেশ মানাচ্ছে। সংসারটাকে আপন করতে গিয়ে কম কষ্ট তো সহ্য করে নি সে, তবে আজ প্রাপ্তির খাতায় কেনো জ্বলজ্বল করছে শূণ্যতা? ভাগ্যের নির্মম পরিহাসের জন্য!

দর্শিনীর ভাবনার মাঝে স্বচ্ছ কাঁচের গ্লাসে করে এক গ্লাস জল তার দিকে এগিয়ে দিলো মায়া। দর্শিনী কৃতজ্ঞতার হাসি দিয়ে জলটা নিয়ে একদমে খেয়ে নিলো। এই জলটার খুব প্রয়োজন ছিলো তার। সারারাত এতটা জার্নির পর তার একটু বিশ্রামেরও প্রয়োজন।

মায়াকে নিজের দিকে নিরলস তাকিয়ে থাকতে দেখে খিলখিল করে হেসে উঠলো দর্শিনী। ঠাট্টার স্বরে বললো,
“ভয় পেয়ো না, সই, তোমার সংসারে ভাগ বসাতে আসি নি।”

দর্শিনীর ঠাট্টায় কিঞ্চিৎ লজ্জা পেলো মায়া। মাথা নুইয়ে লজ্জামিশ্রিত কণ্ঠে বললো,
“আরে না সই,ভয় পাচ্ছি না। কেবল অবাক হলাম তোমাকে এত সকালে এখানে দেখে।”

“তোমাদের রহস্যের সমাধান করতেই এখানে এসেছি। আমার মনে হয়েছে এখানে না এলে আমাদের গোলকধাঁধায় আটকে থাকতে হবে সারা জীবন। অনেক কিছু জানার বাকি আছে যে।”

“রহস্যের কোনো কূলকিনারা পেলে? সমাধান কীভাবে করবে তাহলে?”

দর্শিনী রহস্যমাখা হাসি ফিরিয়ে দিলো মায়ার প্রশ্নের উত্তরে। মায়া দর্শিনীর পাশে নিবিড় হয়ে বসলো। অনেকদিনের জমিয়ে রাখা অপরাধবোধটাকে যেন উজাড় করার সুযোগ হয়েছে আজ। দর্শিনীর হাতটা সে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বেশ শীতল আর লজ্জিত কণ্ঠে বললো,
“তুমি চাইলে ফিরে আসতে পারো, সই। এই সংসারে আমার সময় ফুরিয়ে এসেছে। হয়তো আর কয়েকটা দিন আমি আছি এখানে। আর আমার স্বামী সংসারের কোনো প্রয়োজন নেই কিন্তু তোমার আছে। যে ছোট শিশুটা আসতে চলছে তার বাবার প্রয়োজন আছে। তুমি কী ফিরে আসবে?”

দর্শিনীর হাসি হাসি চেহারা টা মুহূর্তেয় ঘন কালো আঁধারে পরিপূর্ণ হলো। সে বিরক্ত চোখে তাকালো মায়ার দিকে। মায়ার দৃষ্টি উদাস, চোখমুখে বিষণ্নতার ছাপ। অতঃপর দর্শিনীর জেগে উঠা বিরক্তিটা মুহূর্তেই আবার নিভে গেলো। তার ডান হাত আঁকড়ে রাখা মায়ার দুই হাতের উপর নিজের বা’হাতটা রাখলো সে। ছোট্ট, ধীর,শীতল কণ্ঠে বললো,
“ভেঙে যাওয়া সংসারে, ছেঁড়ে আসা অতীতে ফিরে গিয়ে কী আর হবে? বড়জোর দালান-কোঠা, ইট-সিমেন্ট ই আমার পরিচিত রবে। বদলে যাবে সবটা। যেই ঘরটাতে একসময় আমার আধিপত্য ছিলো, সে ঘরটায় পাবো অন্য কারো শরীরের ঘ্রাণ। যে আলমারীতে আমি নিজের শাড়ি ছাড়া অন্য কারো কাপড় রাখতে দিতাম না, সে আলমারী খানায় দেখবো অন্য কারো রঙ বেরঙের কাপড়। এই বাড়ির আঙিনায় থাকবে অন্য কারো হাসির ঝংকার, মুছে গেছে আমার আগের স্মৃতি গুলো। আপন মানুষ গুলোও আমাকে ছাঁড়া ঠিক ভালো থাকতে শিখে গেছে। এই সংসারে ফিরেও বা কী হবে বলো? যে সংসারে সবচেয়ে বড় সম্পদ স্বামী, তারই হৃৎপিণ্ডে যখন অন্য কারো বসবাস! আমি বিহীন আমার সংসার কখনো হবে? এ সংসারে হয়তো সব পাবো কিন্তু নিজের অস্তিত্ব পাবো না। নিজেকেই যেখানে খুঁজে পাবো না, সেখানে ফিরে আদৌও লাভ আছে? এ সংসারে ফিরে এলে বরং আমার শূণ্যতার হাহাকার বাড়বে। আরও গুটিকয়েক কষ্ট বাড়বে। হয়তো বেঁচে থাকার ইচ্ছে ফুরাবে। নিজেকে না পাওয়ার শূণ্যতা হলো বড় শূণ্যতা, সে শূণ্যতা নিয়ে ভেঙে যাওয়া সংসার আর জোরা লাগবে না। মানুষ সব জায়গায় নিজের অস্তিত্ব খুঁজে বেড়ায়। মানুষ চায় সে যেখানেই থাকুক তার অস্তিত্ব যেন সর্বত্র বিরাজিত থাকে। অথচ গোটা একটা সংসারে আমার অস্তিত্ব থাকবে না কিন্তু আমি নিজের সংসার বলে চালিয়ে নিবো এটা কখনো সম্ভব! তুমিই বরং থেকে যাও এ সংসারে। তোমার হয়তো স্বামী সংসারের প্রয়োজন নেই কিন্তু তোমার নিশ্চুপ একটা অস্তিত্ব আছে এখানে যেটাকে আঁকড়ে ধরে তুমি থেকে যেতে পারবে নির্দ্বিধায়। গোটা একটা সংসারে তোমার অস্তিত্ব, একটা নারীর আর কী চাই?”

মায়া চুপ করে দর্শিনীর সবটা কথা শুনলো। দর্শিনীর কথা গুলোর বিপরীতে ঠিক কী উত্তর দিবে বা কী কথা বলবে সেটা বোধগম্য হলো না তার। বরং নিজের অপরাধবোধটা কিঞ্চিৎ বাড়লো। দর্শিনীর কথা গুলোর ভিতরে এখনও যে না পাওয়ার কত বীভৎস হাহাকার ভেসে বেড়াচ্ছে সেটা আর বুঝতে বাকি রইলো না মায়ার।

দুজনের নিরবতার মাঝে তৃতীয় ব্যাক্তির অস্তিত্ব লক্ষ্য করা গেলো। তৃতীয় ব্যাক্তিটি ঘুম ঘুম চোখে বেশ অবাক হয়ে বললো,
“বৌমা,তুমি এখানে!”

মায়া আর দর্শিনী উভয়েরই ধ্যান ভাঙলো। কণ্ঠের অধিকারী’র দিকে তাকিয়ে ঈষৎ হাসলো দর্শিনী। কপট ঠাট্টার স্বরে বললো,
“কেনো? আসতে পারি না বুঝি!”

দর্শিনীর হাসি মুখ আর ঠাট্টার কণ্ঠ শুনে সামান্য ভড়কালো মোহনা। নিজের ইয়া বিশাল মোটা চুলের মাঝে খোপা করতে করতে দর্শিনীর দিকে এগিয়ে গিয়ে বললো,
“আসতে পারবে না কেনো,অবশ্যই আসতে পারো। তবে, আসার কথা তো ছিলো না কখনো।”

মোহনা বেশ বিচক্ষণ মহিলা। সে যে এমন উত্তরই দিবে সেটা জানা ছিলো দর্শিনীর। তাই মোহনার উত্তরের বিপরীতে এক গাল হেসে বললো,
“কথা তো অনেক কিছুরই ছিলো না। আমার এ বাড়ি ছাড়ার কথা ছিলো না, আমার সন্তানের বাবার পরিচয় ছাড়া বড় হওয়ার কথা ছিলো না, না আমার এত অপমান সহ্য করার কথা ছিলো তবুও তো হয়েছে এগুলো। তাই এটাও হলো। আপনি কী এর জন্য খুশি হন নি?”

“অখুশি হওয়ার যেহেতু কারণ নেই তাই খুশি হলাম। তা এত সকালে যে?”

“একটা জরুরী কাজে এসেছিলাম। আজকের দিনটা থাকা দরকার এইখানে তাই আপনাদের বাড়ি আসলাম। থাকতে দিবেন কী?”

মোহনা কেবল ঘাড় কাত করে চলে গেলো আবার নিজের ঘরে। দর্শিনী মায়ার দিকে ঘুরে বসে একে একে প্রশ্ন শুরু করে দিলো। তার অনেক কিছু জানতে হবে।

_

সকালে আবহাওয়া যতটা উত্তপ্ত ছিলো,দুপুর হতেই সবটা ঝিমিয়ে গেছে। ভর সন্ধ্যা বেলার আকাশে ছড়ানো ছিটানো মেঘের আভাস। কৃষ্ণ কালো মেঘে সজ্জিত প্রকৃতি। মায়া আর দর্শিনী আজ একসাথে চিলেকোঠার ঘরে দাঁড়ানো। প্রত্যেকের ভিতরে অনাকাঙ্খিত উত্তেজনা। কিছু লুকায়িত রহস্য। তারা কেবল একটা জিনিসই জানে, মোহনা অনেক গুলো খু*ন করেছে আরও একটা করার কথা চিন্তা ভাবনা করছে।

মায়া চিলেকোঠার ঘরটাতে আরেকবার তল্লাশি চালালো। দর্শিনী বাতিল, পরিত্যক্ত খাটতাতে বসে রইলো নিশ্চুপ। মায়াই তাকে নড়াচড়া করতে না করেছে। চিলেকোঠার ঘর বড্ড অপরিষ্কার। দর্শিনীর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হবে।

খুঁজতে খুঁজতে মায়া আবার আলমারি থেকে সেই বহু পুরানো জামাটা বের করলো। দর্শিনীর দিকে মেলে ধরলো জামাখানা। দর্শিনী ভ্রুকুঞ্চিন করে কিঞ্চিৎ অবাক কণ্ঠে বললো,
“এটা কার জামা? বেশ পুরানো তো। ফর্মাল জামা, কোনো স্কুল ড্রেস হবে তাই না!”

মায়াও ভালো করে দৃষ্টি দিলো। জামাটার এদিক-ওদিক দিয়ে বেশ ছেঁড়া। দর্শিনী নিজের ভারী পেটতাতে হাত দিয়ে উঠে এলো। জামাটা নিজের হাতে নিয়ে ভালো করে পর্যবেক্ষণ করে বললো,
“জামাটা বোধহয় ধস্তাধস্তি করার সময় ছিঁড়েছে। যদি ধরি বিহুর জামা, তাহলে এতটা ধস্তাধস্তির চিহ্ন কেনো! বিহুর সাথে কী খুব বাজে কিছু হয়েছিলো!”

মায়া কতক্ষণ জামাটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তার চোখে ভেসে এলো আবছা অতীত। দুই বেণী করা এক সদ্য বয়ঃসন্ধির কিশোরী। যার শরীরে সবুজ রাঙা স্কুল ড্রেস, কাঁধে ব্যাগ। খিল খিল করে সেই কিশোরী হাসছে। হ্যাঁ জামাটার সাথে পরিচিত মায়া। সে হঠাৎ অস্ফুটস্বরে বললো,
“এটা, এটা আমার দিভাইয়ের জামা।”

দর্শিনী অবাক কণ্ঠে বললো,
“তোমার দিভাইয়ের জামা এখানে কী করে আসবে! কি বলছো!”

“আমার দিভাইকে ওরা ঠকিয়ে ছিলো। এ বাড়ির বড় ছেলেই আমার দিভাইকে ঠকিয়ে ছিলো। আমার দিভাইকে প্রেমের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ছেঁড়ে দিয়ে ছিলো। ওরা খারাপ। বড্ড খারাপ।”

মায়ার একেকটা বাক্যে দর্শিনী বিস্মিত হচ্ছে। কাল পাগলা গারদে যে ছেলেটাকে দেখে আসছে সে, সেই ছেলেটাকে দেখে এক মুহুর্তের জন্য মনে হয় নি সে কাউকে ঠকাতে পারে। কোনো হিসেবই যেন তার মিলছে না। দর্শিনী তার অস্বচ্ছ ভাবনা পরিষ্কার করার জন্য বললো,
“আচ্ছা, তোমার দিভাইয়ের নাম মৃত্তিকা?”

মায়া অবাক হলো। বড় বড় গোল গোল চোখে তাকালো দর্শিনীর দিকে। হতভম্ব অনুভূতি নিয়ে সে মাথা নাড়ালো। যার অর্থ ‘হ্যাঁ’।

দর্শিনী যেন কূল কিনারা পেলো না। কাল মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেটা বার বার এই নামটাই জপ ছিলো। যদি সে বিশ্বাসঘাতকতাই করতো তাহলে এই নামটা বলে এমন ক্ষণে ক্ষণে আনন্দে নেচে উঠতো না। কখনো বা হুটহাট কেঁদে বুক ভাসাতো না। তাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছিলো সে ব্যর্থ প্রেমিক নয়। প্রেমিক হিসেবে সে বেশ দৃঢ় মানব। তাহলে প্রেমের পরিণতি এত ভয়াবহ কেন?

দর্শিনী নিজের ভিতর প্রশ্ন চেপে না রেখেই বললো,
“তোমার দিদি কোথায়, মায়া?”

“মারা গেছে বহু আগে। একদিন স্কুল থেকে গিয়েই আত্ম*হত্যা করেছে। এর আগের দিন বিয়ের জন্য তাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল এ বাড়ির মানুষ।”

দর্শিনী দু’কদম পিছিয়ে গেলো। কি হয়েছে, কেন হয়েছে কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না। কাল মানসিক ভারসাম্যহীন ছেলেটাকে দেখে মনে হয়েছিল সে এককালে প্রচুর ভালোবেসেছে এখনও বাসে তবে প্রত্যাখ্যান করলো কেনো? আর প্রত্যাখ্যান এর পরের দিন কী এমন হলো যে মেয়েটা মরতে বাধ্য হলো!

দর্শিনী হঠাৎ মায়াকে বললো,
“মা মানে তোমার শাশুড়ি তোমাকে কী বলছিলো? সব চেনা অচেনা হয়ে যাবে তাই না?”

মায়া মাথা নাড়ালো। দর্শিনী আবার বললো,
“তাহলে শাশুড়ির শেষ টার্গেট,,,”

পুরো কথা না বলে থেমে গেলো সে। কম্পনমান কণ্ঠে মায়াকে প্রশ্ন করলো,
“তুমি তো পড়ে আসছো চিলেকোঠায়, আসার আগে মাকে কোথায় দেখেছো?”

“তাদের নিজেদের ঘরে যেতে দেখেছি।”

“কোন ঘরটাতে? সে যে ঘরে ঘুমায় ওটাতে নাকি তাদের নিজেদের রুমে,যেখানে বাবাসহ থাকতো?”

“যেখানে একসাথে থাকতো,সেখানে।”

মায়ার সাবলীল উত্তরে ঘাম ছুটে গেলো দর্শিনীর। কোনো কিছু না বলে ছুট লাগালো সে নিচে। মায়াও দর্শিনীর পিছে পিছে ছুটে গেলো।

শ্বশুর শাশুড়ির ঘরে দিকে এসে গগণ বিদারক চিৎকার দিয়ে উঠলো মায়া। দর্শিনী কেবল সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে রইলো নিশ্চুপ। সিলিং ফ্যানের সাথে ঝু*লে থাকা শরীরটার পা বেয়ে টপটপ করে ঝড়ে পড়ছে র*ক্তের স্রোত।

#চলবে

#পথান্তরে_প্রিয়দর্শিনী
#মম_সাহা

পর্বঃ উনচল্লিশ

নিস্তব্ধ, ভয়ঙ্কর,রোমাঞ্চকর একটি সন্ধ্যা হুড়মুড় করে যেন অতিবাহিত হলো। সিলিং ফ্যানের ঝু*লে থাকা লাশ, সেই লাশের পা বেয়ে গলগল করে পড়তে থাকা র*ক্তের স্রোত, আর এ সবগুলো জিনিসের চেয়ে বেশি অবাক করা কান্ড হলো ড্রেসিং টেবিলের সামনে নিজেকে পরিপাটি করতে থাকা মোহানার হাসি হাসি মুখের দৃশ্য। মায়ার চিৎকারে বিপ্রতীপ আর বিহঙ্গিনীও এসে বাবার এমন করুণ দশা আর মায়ের এমন শীতল রূপ দেখে হতভম্ব হয়ে গেছে। দর্শিনী কেবল চেয়ে রইলো প্রাণহীন শ্বশুরের দেহখানার দিকে। চোখের সামনে টুকরো টুকরো কিছু সুন্দর স্মৃতি ভেসে উঠেছে। শ্বশুর বাড়িতে তার যত গুলো ভালো স্মৃতি রয়েছে তার দুই তৃতীয়াংশ স্মৃতির কারণ এ মানুষটা। কখনো বাবার অভাব অনুভব করতে দেয় নি মানুষটা। যেদিন এ বাড়ি ছেড়ে সে চলে যাচ্ছিলো, সেদিনও মানুষটা নিঃস্বার্থ ভাবে দর্শিনীর পাশে ছিলো। রাস্তায় খিদে লাগবে ভেবে দর্শিনীর জন্য খাবার দিয়েছিলো। অথচ এ মানুষটার আজ বিভৎস মৃত্যু!

“ও মা, বাবার কী হলো? মা গো, তুমি বাবার সাথে কী করেছো? বাবা, ও বাবা, কী হলো তোমার? বাবা গো? চোখ খুলো না গো বাবা।”

বিহঙ্গিনীর আর্তনাদে কেঁপে উঠলো মায়া। এ মানুষটার এমন নিষ্ঠুরতা কেউ ই যেন মেনে নিতে পারছে না। মোহনা নিজের মতন শাড়ির আঁচল ঠিক করে বড় করে সিঁদুর দিলো সিঁথির মাঝে। বড় লাল এক ফোঁটা দিলো ললাটে। শরীরে জড়ানো টকটকে লাল জামদানী শাড়ি। সাদা কালো মিশ্রণের মোটা চুল গুলো পুরো পিঠে ছড়ানো। কোমড়ের নিচ অব্দি গড়াগড়ি খাচ্ছি সেই চুলের ঝিলিক। মনে হচ্ছে স্বর্গীয় কোনো দেবী স্বয়ং এখানে দাঁড়িয়ে আছে। চোখের মাঝে মোটা করে কাজল লেপে দেওয়া। দর্শিনী কখনো নিজের শাশুড়ির এমন রূপ দেখে নি। মনে হচ্ছে অপ্সরাও যেন হার মানবে সেই রূপের কাছে। কেমন গা ছমছমে রূপ। শরীরের লোমকূপ শিরশির করে উঠার মতন রূপ। চোখ ধাধানো অথচ রোমাঞ্চকর।

বিপ্রতীপ দ্রুত গিয়ে বাবার ঝুলে থাকা লাশ খানা সযত্নে নামায়। ছুটে নিয়ে যায় ড্রয়িংরুম অব্দি। হয়তো বাঁচানোর চেষ্টা করার জন্য ছুটছে। কিন্তু মোহনার বজ্রকণ্ঠের কাছে বাবাকে বাঁচানোর অগাধ ইচ্ছে খানা খানিক চুপসে এলো। উপস্থিত বাকি তিন নারীরও শরীর কেঁপে উঠলো নিবিড়ে। মোহনা বড় বড় পা ফেলে মিনিট দুইয়ের মাঝেই ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হলো তার পিছে পিছে মায়া,বিহু,দর্শিনীও উপস্থিত হলো সেখানে। বিপ্রতীপ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো মায়ের দিকে। অবাক কণ্ঠে বললো,
“মা,বাবার অবস্থা দেখেছো! তুমি কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠেছো দেখো। তাও কীভাবে তুমি এখন আবার আমাকে আটকাচ্ছো?”

মোহনা হা হা করে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতেই হাতের ছুরি খানা ঘুরাতে ঘুরাতে বললো,
“মৃত মানুষকে বাঁচানোর সাধ্যি এ পৃথিবীর কারো নেই। তোর বাবার প্রান গিয়েছে কমপক্ষে আধাঘন্টা হয়ে গেছে। কাকে বাঁচাতে যাচ্ছিস, বাবু? উনারে এখানেই শোয়া। রেখে দে বলছি। নাহয় আমাকে তো চিনিসই, ভয়ঙ্কর কিছু করতে আমার দু’বার ভাবতে হবে না। চাচ্ছিস এমন কিছু?”

বিপ্রতীপ বরাবরই ভীতু,কাপুরুষ। মায়ের এমন ভয়ঙ্কর হুমকির পরও বাবাকে বাঁচানোর ইচ্ছে তার মাঝে অবশিষ্ট ছিলো না। সে দ্রুত তার বাবার নিথর দেহটা মাটিতে রেখে দিলো। দর্শিনী এগিয়ে এলো শ্বশুরের দিকে। তার মাথায় ঘুরছে অনেক রকমের রহস্য। কিন্তু সবকিছুকে ছাড়িয়ে দিয়েছে তার বিষণ্ণতা। সে যেন মানতেই পারছে না মানুষটা নেই।

ড্রয়িংরুমে যখন পিনপতন নিরবতা, তখন কলিংবেল বেজে উঠলো বিকট শব্দ করে। মোহনা উচ্চশব্দে হেসে উঠলো। হাসতে হাসতে নরম সোফায় গিয়ে বসতে বসতে মায়াকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“যাও আমার দুষ্টুবুদ্ধি সম্পন্ন বৌমা। দরজাটা খুলে দিয়ে আসো। তোমার কাঙ্খিত মানুষ বোধহয় এসে গেছে।”

মায়া অনেকটাই চমকালো। চমকে গিয়ে ভীতু স্বরে বললো,
“মানে!”

“ওমা, মিনিট খানেক আগেই তো কাউকে আসতে বলে ক্ষুদ্র বার্তা পাঠালে ঐ যন্ত্র খানা দিয়ে। ভেবেছো আমার চোখে ফাঁকি দিবে! ভয় পাওয়ার কারণ নেই। গিয়ে দরজাটা খুলে দেও।”

মায়ার ভয়ে হাত-পা কাঁপা শুরু করলো। মোহনাকে যতটা ভয়ঙ্কর মনে হয়েছিলো, মোহনা তার চেয়েও বেশি কিছু। সবদিকে তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বিরাজমান।

মায়াকে কাঁপতে দেখে দর্শিনীই দরজার দিকে এগিয়ে গেলো। দরজা খুলতেই হুড়মুড় করে ঘরে প্রবেশ করলো হৈমন্ত। হৈমন্ত ঘরে প্রবেশ করতেই বাড়ির গেইটের সামনে আরেকটা গাড়ি এসে থামলো। সেখান থেকে বেড়িয়ে এলো দু’জন পুরুষ। দর্শিনী তাদের ঘরে প্রবেশ করার জায়গা দিয়ে সড়ে দাঁড়ালো। তারা প্রবেশ করতেই মোহনার আদেশে দরজাটা আবার আটকে দিলো সে।

হৈমন্তকে দেখে মোহনার মুখে যেই কুটিল হাসিটুকু ছিলো তা পরক্ষণেই উধাও হয়ে গেলো হৈমন্তের পিছে দাঁড়ানো মানসিক ভারসাম্য হীন পঁয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছরের ছেলেটাকে দেখে। যাকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে মৃত্যুঞ্জয়। মোহনা অবাক, বিষ্ময়ে হা হয়ে রইলো। কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললো,
“মৈত্র, বাবা! তুই এখানে!”

চুল এলোমেলো কিঞ্চিৎ ফরমাল পোশাকে আবৃত মানসিক ভারসাম্য হীন ছেলেটা খুশি খুশি চোখে মোহনার দিকে তাকিয়ে হাত তালি দিতে দিতে বললো,
“ছোটমা, ছোটমা। আমার ছোটমা, ভালোমা। আসো আসো, আমারে বুকে নেও, মা।”

মৈত্রের ব্যবহারে তাজ্জব বনে গেছে উপস্থিত সবাই। বিহঙ্গিনী ‘দাভাই’ বলে লুটিয়ে পড়লো ছেলেটার বুকে। ছেলেটা দু’কদম পিছিয়ে গেলো। মায়া তাকিয়ে রইলো মৈত্রের দিকে। এইতো, অনেক বছর আগের আবছা স্মৃতির মানুষটা। ছোট্ট মায়ার আদুরে মানুষটা, যাকে দেখলে সে ঝাঁপিয়ে পড়তো আহ্লাদে। সে মানুষটার এরকম দশা! এতটা ভয়াবহ! অথচ এ মানুষটার উপর প্রতিহিংসার নেশায় সে ছুটে এসেছিলো এ বাড়ি অব্দি। কী হচ্ছে, কী হবে, সবটাই যেন কারোই বোধগম্য হচ্ছে না। কেনো হিসেব গুলো এত গড়মিল!

মৈত্র বিহঙ্গিনীকে ঠেলে তার বুক থেকে উঠিয়ে দিলো। কি যেন ক্ষানিকটা বিড়বিড় করলো। হঠাৎ তার নজর গেলো মাটিতে লেপ্টে থাকা নির্জীব মানুষটার দিকে। সে ক্ষেপে উঠলো আচমকা। মৃত মানুষটার বুক বরাবর কয়েকটা লাথি মারলো। অনবরত লাথি মারতে মারতে কেঁদে দিলো। দুহাতে চোখের পানি মুছলো সাথে অনবরত লাথি চালিয়ে যেতে যেতে বললো,
“মেসো খারাপ ছোটমা। অনেক খারাপ। তুমি জানো ছোটমা ও অনেক খারাপ। মে*রে দেও ওকে, ছোটমা। তুমি না বলেছো মারবে ওকে। মা*রছো না কেনো? মারো।”

মৈত্রের এমন কাণ্ডে আরেক ধাপ অবাক হলো উপস্থিত সবাই। বিহঙ্গিনী অবাক কণ্ঠে বললো,
“মা, দাভাই বাবাকে মেসো কেন বলছে? আর এমনই বা কেন করছে ও? ও না বাবার ভক্ত ছিলো। তাহলে!”

মোহনা উত্তর দিলো না বিহুকে। কেবল মৈত্রকে টেনে নিয়ে সোফায় বসিয়ে ধীর কণ্ঠে বললো,
“চিন্তা করিস না, বাবা। তোকে দেওয়া কথা আমি রেখেছি। দেখ, ও মরে গেছে। মে*রে দিয়েছি আমি, তুই খুশি তো!”

_

গ্রাম জুড়ে হৈচৈ ভাব। কলঙ্কের দাগ ছিটিয়ে দিচ্ছে সবাই। রাত আটটা বাজেও মানুষ এখান ওখান থেকে ছুটে আসছে গ্রামের নতুন কাহিনী দেখার জন্য। কেউবা ছিঃ ছিঃ করছে। দর্শিনীদের পুরো পরিবার বিচার সভায় মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। সাথে পুরো গ্রামবাসীও আছে। মৃত্যুঞ্জয়ের পরিবারও এখানে দাঁড়িয়ে আছে।

বিচারের মধ্যমনি হলো হিমাদ্রি আর দর্শিনীর ছোট কাকী কুহু। যার স্বামী মারা গিয়েছে অনেক বছর আগে। প্রতাপ সাহা মাথা নত করে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে যেই তথ্য নিয়ে এত রমরমা আর যাই হোক এই তথ্য যে সত্যি না সেটা তার ঢের জানা আছে। কিন্তু কীভাবে থামাবে গ্রামবাসীকে!

বিচারকের আসনে হরমোহন কুটিল হাসছে। প্রতাপ সাহার এমন বিশ্রী ভাবে নাক কাটা অবস্থান দেখতে তার যেন বেজায় খুশি লাগছে। প্রতাপ সাহার ছোট ভাইয়ের বিধবা বধূ পরকীয়া করতে গিয়ে হাতে নাতে ধরা! কি দারুণ খবর!

কুহু কেবল ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে। ঘৃণায় তার মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে। এত বছর যে সম্মান নিয়ে সে বেঁচে ছিলো আজ সে সম্মান ভরা বাজারে ধূলিসাৎ হচ্ছে! একটা নারীর জন্য এরচেয়ে অপমানজনক আর কী হতে পারে!

প্রতাপ সাহা অসহায় হয়ে বার বার খুঁজে যাচ্ছে তার মেয়েকে। দর্শিনী থাকলে হয়তো আজ ভরা বাজারে পবিত্র মেয়েটাকে বেঁচে থাকার পরও মৃত্যুর স্বাধ পেতে হতো না।

#চলবে