#পদ্মফুল
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
|৫০|
রাণী তখন থেকে পদ্ম’র পেছন পেছন ঘুরছে তাকে কিছু বলবে বলে। কিন্তু পদ্ম কিছুতেই সেই সুযোগ দিচ্ছে না। সে একের পর এক ব্লকের কাজ করেই যাচ্ছে। আর কাজের সময় পদ্ম কে বিরক্ত করলে সে খুব রেগে যায়, সেটা রাণী জানে। আবার এইদিকে পদ্ম’র কাজও শেষ হচ্ছে না। রাণী দূরে বসে বসে নখ খাচ্ছে আর ভাবছে, কখন এই কাজ শেষ হবে? কখন সে পদ্ম’র সাথে একটু কথা বলতে পারবে।
রাণীকে আরো এক ঘন্টা অপেক্ষা করিয়ে পদ্ম’র কাজ শেষ হলো। রাণীর মনে শান্তি এলো। সে দ্রুত পদ্ম’র কাছে গেল। অস্থির গলায় বললো,
‘আপু, তোমাকে একটা কথা বলবো?’
পদ্ম তার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘বল।’
রাণী বড়ো বড়ো চোখে পদ্ম’র দিকে তাকিয়ে বললো,
‘তোমার টেনশন হচ্ছে না আপু?’
পদ্ম বললো,
‘কিসের টেনশন?’
‘আরে, ডাক্তার সাহেব না বললেন কাল তোমার সাথে সমঝোতা করবেন। আমার কী মনে হয় বলতো, উনি বোধ হয় কাল তোমায় বিয়ে প্রপোজাল দিবেন। শুনো, তুমি কিন্তু সাথে সাথে রাজি হয়ে যেও না। ডাক্তার সাহেব কে একটু ঘুরাতে হবে। এত সহজে নিজেকে উনার কাছে ধরা দিও না।’
পদ্ম বিরক্ত হয়ে বিছানায় শু’লো। বললো,
‘তোর মতো পাগলরাই এসব ভাববে। তোর কী করে মনে হলো ঐ লোকটা আমাকে এত সহজে প্রপোস করে ফেলবে। উনি আর পাঁচটা মানুষের মতো এত সরল সোজা না যে হুট হাট করে এসেই প্রপোস করে বসবে। উনি হলেন একজন ঘাড় ত্যাড়া মানুষ। সহজে কোনো কাজ করেন না। আর তাছাড়া.. উনার মনে অন্য কেউ আছে। এত সহজেই কি উনি সেই মনে আমার জায়গা দিতে পারবেন?’
রাণী চোখ মুখ কুঁচকে বললো,
‘উনার মনে আবার কে আছে?’
পদ্ম দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বললো,
‘সুজানা।’
‘কে সুজানা?’
‘উনার ভালোবাসা।’
রাণীর মন খারাপ হয়ে গেল। বিষন্ন কন্ঠে বললো,
‘তাহলে সেই ভালোবাসা কোথায়?’
‘মা*রা গিয়েছে, না মা*রা গিয়েছে বললে ভুল হবে বরং বলা উচিত মে*রে ফেলা হয়েছে।’
রাণী বিস্ময়ে দু হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। বিছানায় উঠে পদ্ম’র পাশে শুয়ে জিজ্ঞেস করলো,
‘কে মে*রেছে?’
পদ্ম তার দিকে তাকাল। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,
‘বলবো। কোনোদিন সব বলবো, তবে আজ ইচ্ছে করছে না।’
রাণীও জোর করলো না। তবে সেও যেন কিছু আন্দাজ করতে পারলো।
.
রাত দশ’টার দিকে পদ্ম আর রাণী খেতে বসেছে। পদ্ম’র ফোনটা তখন বেজে উঠে। পদ্ম ফোন টা নিয়ে দেখে আননোন নাম্বার। তাই সে আর ধরে না। একবার কল কেটে গিয়ে আরেকবার বেজে উঠে। পদ্ম বিরক্ত হয়ে কল টা রিসিভ করে। ওপাশ থেকে তখন পরিচিত কারোর গলার স্বর শোনা যায়। পদ্ম কিছুটা অবাক হয়ে ফোন টা চোখের সামনে ধরে নাম্বার টা ভালোভাবে দেখে। তারপর আবার ফোন টা কানে লাগিয়ে বলে,
‘হঠাৎ কল দিলেন যে?’
‘শুয়ে পড়েছিলেন নাকি?’
‘না, বলুন।’
‘কাল বিকেলে ফ্রি আছেন?’
‘না, কেন?’
ওপাশের মানুষটা শক্ত গলায় বললো,
‘এত কিসের ব্যস্ততা আপনার?’
পদ্ম ভাব নিয়ে বললো,
‘আজকাল আপনার চেয়ে বেশি ব্যস্ত থাকি আমি। এখন আপনি বলুন আপনার কী প্রয়োজন।’
পদ্ম জানে মানুষ টা তার কথায় রাগছে। রাগুক, তার কী তাতে। আদিদ দাঁতে দাঁত চেপে বললো,
‘দয়া করে কাল বিকেলের দিকে আধ ঘন্টা আমাকে দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি।’
পদ্ম মনে মনে হাসে। তবে গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে বলে,
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। কালকে চার’টার পর আধ ঘন্টার জন্য আমি ফ্রি আছি, সে সময় টা না হয় আপনাকে দিলাম।’
আদিদ শান্ত গলায় বললো,
‘খুব ভাব নিচ্ছেন, তাই না? ভালো, এখন তো আপনারই সময়। তবে খুব শীঘ্রই আমারও ভাব নেওয়ার সময় আসবে। তখন আমিও দেখবো, আপনি কী করেন।’
পদ্ম পাল্টা কিছু বলার আগেই আদিদ বললো,
‘একটা এড্রেস টেক্সট করে দিয়েছি, ঐ এড্রেসে কাল বিকেলে চলে আসবেন। রাখছি।’
পদ্ম ফোন রেখে রাগি গলায় বললো,
‘আমি নাকি ভাব দেখায়, নিজে যে ভাব দেখাতে দেখাতে শহীদ হয়ে যায় সেটার সময় কিছু না। যাবো না আমি, কী করবে হ্যাঁ। যত্তসব আজাইরা মানুষ।’
রাণী মুখের ভাত টা গিলল। তারপর বললো,
‘ডাক্তার সাহেব ছিলেন বুঝি, কালকে দেখা করার কথা বলছেন?’
‘হু।’
‘শুনো, আমার মাথায় একটা দারুণ বুদ্ধি এসেছে।’
পদ্ম তাকে পাত্তা না দিয়ে বললো,
‘তোর বুদ্ধি আমার জানা আছে।’
‘তুমি আগে একবার শুনেই দেখো না।’
পদ্ম খেতে খেতে বললো,
‘না শুনলেও যে জোর করে শুনাবি সেটা জানি। বলে ফেল।’
.
.
বিকেলের স্নিগ্ধ রোদ। রোদের সোনালী আভায় চারদিক ঝলমল করছে। গাছের পাতাগুলো সোনালী লাগছে। এই রোদে তেজ নেই। কেমন নরম স্পর্শ তার। গায়ে লাগলে আরাম বোধ হয়।
রাণী মাঠের মাঝখানে বসে আছে। রোদে তার গায়ের রংটা চকচক করছে যেন। শ্যামলা বর্ণের মেয়েটা ডাগর ডাগর চোখগুলো মেলে এদিক ওদিক তাকিয়ে কী যেন দেখছে। তার থেকে অনেক টা দূরে দাঁড়িয়ে আছে পদ্ম আর অনিক। অনিকের চোখে মুখে বিরক্তির ভাবটা স্পষ্ট। পদ্ম মুখ কাঁচুমাচু করে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝে মধ্যে বাঁকা চোখে সে রাণীর দিকে তাকাচ্ছে। মেয়েটাকে মাথায় তুলে আছাড় দিতে মন চাচ্ছে তার। বার বার বলেছিল, এসব করার কোনো দরকার নেই। কিন্তু, এই ফাজিল মেয়ে তার কোনো কথা শুনেনি। আর তার ফল এখন তাকে ভোগ করতে হচ্ছে। অনিক এবার রেগে গেল। অনেকক্ষণ হয়েছে সে এখানে এসেছে, অথচ পদ্ম তাকে কিছু বলছেই না। সে অত্যন্ত বিরক্ত গলায় বললো,
‘আপনি কি আমাকে এখানে এভাবে দাঁড় করিয়ে রাখার জন্য ডেকে এনেছেন, পদ্ম?’
পদ্ম “না” সূচক মাথা নাড়াল। অনিক তখন পুনরায় প্রশ্ন করলো,
‘তাহলে?’
পদ্ম আমতা আমতা করে বললো,
‘না মানে আসলে আম..’
তখনই তার কাছে রাণী দৌড়ে এলো। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,
‘আপু, ডাক্তার সাহেব চলে এসেছেন।’
পদ্ম আর অনিক দুজনেই সামনের দিকে তাকাল। দেখল আদিদ তাদের দিকেই আসছে। অনিক বুঝতে পারে না কিছু। সে ব্রু কুঁচকে বলে,
‘পদ্ম, কী হচ্ছে বলবেন কিছু?’
পদ্ম কিছু বলার আগেই রাণী তাড়াহুড়ো করে বলতে লাগল,
‘আসলে স্যার, ঐ যে ডাক্তার সাহেব কে দেখানোর জন্য আপনাকে এখানে ডেকেছি। ডাক্তার সাহেব যেন আপনাকে আর আপুকে একসাথে দেখে জেলাস হয়, তাই। কিছু মনে করবেন না প্লীজ, এইসব কিছু আমার বুদ্ধি।’
অনিক এবার ক্ষেপে গেল। পদ্ম কে বললো,
‘এসব কী পদ্ম? এজন্য আপনি আমাকে ডেকেছেন? আশ্চর্য, আপনারা কি ছোট নাকি? আপনারা তো যথেষ্ট ম্যাচিউর। তাহলে এসব টিনেজ বয়সের বাচ্চাদের মতো কাজ কর্ম কেন করছেন?’
তাদের কথাবার্তার মাঝেই সেখানে এসে আদিদ উপস্থিত হলো। তাকে দেখে সবাই চুপ। আদিদের কাছে অনিক কে চেনা চেনা লাগল। অনিক তখন বললো,
‘ভালো আছেন, আদিদ ভাই?’
আদিদ কিছুটা অবাক হলো। বললো,
‘জ্বি, ভালো। তবে আপনাকে তো চিনলাম না।’
অনিক হেসে বললো,
‘আমি অনিক। অভি ভাইয়ের কাজিন। অনেক আগে একবার আমাদের দেখা হয়েছিল। হয়তো আপনার মনে নেই।’
আদিদের এবার মনে পড়ল। সে হেসে বললো,
‘ওহ হ্যাঁ, চিনতে পেরেছি। তা, তুমি এখানে?’
অনিক পদ্ম আর রাণীর দিকে তাকিয়ে বললো,
‘আরে বলবেন না, এই দুজন মহীয়সী নারী আপনাকে জেলাস ফিল করানোর জন্য আমাকে এখানে ডেকেছেন।’
পদ্ম আর রামী দুজনেই লজ্জায় স্তব্ধ। বিশেষ করে পদ্ম’র তো লজ্জায় ম*রে যেতে ইচ্ছে করছে। পদ্ম দাঁতে দাঁত চেপে রাণীর দিকে তাকাল। বেচারা ভয়ে আর লজ্জায় এই বুঝি কেঁদে ফেলবে।
আদিদ এই অবস্থায় কী বলবে বুঝতে পারছে না। তার অবশ্য হাসিও পাচ্ছিল। তবে সে সেটা চেপে রাখল। ভীষণ গম্ভীর গলায় বললো,
‘রাণীর সাথে থাকতে থাকতে আপনিও দেখছি বাচ্চা হয়ে যাচ্ছেন, পদ্ম। আচ্ছা যাকগে, অনিক তোমার সাথে আবার দেখা হয়ে ভালো লাগল। আর এই বাচ্চাদের ব্যবহারে আমি আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।’
‘না না ভাই, আপনি কেন দুঃখিত হবেন। আসলে আমি এসব কিছু আগে থেকে জানতাম না। জানলে আমি কখনোই এখানে আসতাম না। তবে এখন মনে হচ্ছে এসে ভালোই হয়েছে, আপনার সাথে দেখাটা হয়ে গিয়েছে। আর একটা কথা ভাই, এই যে এই মহান নারী, উনি আপনাকে ভালোবাসেন। কিন্তু নিজের জেদের কারণে সেটা প্রকাশ করতে চাইছেন না। উনি যদি আপনাকে ভালো না বাসতো তাহলে আমি উনাকে বিয়ে করতাম। তবে এখন আপাতত, আমি আপনাদের বিয়ে খাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছি। আশা করছি, খুব শীঘ্রই দাওয়াত পাবো।’
পদ্ম বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। আদিদ সেই সময় বলে উঠল,
‘ইনশাল্লাহ।’
পদ্ম আঁতকে উঠল। “ইনশাল্লাহ?” তার মানে কি আদিদ সত্যি সত্যিই তাকে বিয়ে করতে চায়?
চলবে…
#পদ্মফুল
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
|৫১|
আদিদের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে অনিক সেখান থেকে চলে গেল। অনিক চলে যেতেই পদ্ম’র লজ্জা যেন আরো তরতরিয়ে বাড়তে লাগল। আদিদ কে কী বলবে সে বুঝতে পারছে না। রাণীও লজ্জায় নত মস্তিষ্কে দাঁড়িয়ে আছে। আদিদ কিয়ৎক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সে ঠান্ডা গলায় পদ্ম কে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘আমার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিবেন পদ্ম, আপনি কি আমাকে বিয়ে করতে চান?’
পদ্ম ভয়ে ভয়ে তাকাল। রাণীর চোখে মুখে বিস্ময়। অতিরিক্ত বিস্ময়ে পদ্ম ও যেন কথা হারিয়ে ফেলেছে। আদিদ প্রচন্ড স্বাভাবিক। পদ্ম বোঝেনা এই মানুষ টা সবসময় এত স্বাভাবিক কী করে থাকে। পদ্ম’র নিরবতা দেখে আদিদ ফের প্রশ্ন করে,
‘কী হলো পদ্ম, কিছু বলছেন না কেন?’
রাণী পদ্ম কে হালকা ধাক্কা দিয়ে বললো,
‘এই আপু, বলো না কিছু।’
পদ্ম ঢোক গিলল। বুকের ভেতরে তার ধুকধুক করছে। সত্য বলতে বুক কাঁপে, ভয় লাগে। পদ্ম তাই সত্যটাও বলতে পারছে না। রাণী হাঁসফাঁস করছে। পদ্ম এখনো কেন চুপ করে আছে। আদিদের শীতল দৃষ্টি পদ্ম’র চোখে মুখে আছড়ে পড়ছে। পদ্ম চোখ বুজে ফেলল। দুবার বড়ো বড়ো নিশ্বাস নিয়ে বললো,
‘হ্যাঁ, আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।’
রাণী খুশিতে হাত তালি দিয়ে উঠল। পদ্ম’র চোখের পাতা এখনো নিমজ্জিত। আদিদ স্বাভাবিক। বললো,
‘ঠিক আছে, আমি মা’কে বলবো।’
পদ্ম এবার চোখ মেলল। এতো বড়ো বিস্ময় কাটিয়ে উঠা এতো সহজ নয়। সে অবাক কন্ঠে বললো,
‘আপনি সত্যিই আমাকে বিয়ে করবেন, ডাক্তারবাবু?’
‘কেন, আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না?’
পদ্ম শুকনো মুখে বললো,
‘এতো কিছুর পরেও আপনার আমাকে বিয়ে করতে চাওয়াটা, সত্যিই অবিশ্বাস্য।’
আদিদ সরব গলায় বললো,
‘কী করবো বলুন, আপনার কাছে হেরে গেলাম। মন, মস্তিষ্ক প্রচুর জ্বালাচ্ছিল আমাকে তাই ভাবলাম এবার এর একটা বিহিত করা দরকার। আর মনে হলো, বিয়েই হলো এর একমাত্র বড়ো সমাধান।’
পদ্ম আদিদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,
‘আমি কি কোনোভাবে আপনাকে বাধ্য করেছি, ডাক্তারবাবু?’
‘আমি কারোর বাধ্য না। আমার মন যা বলে আমি তাই করি। তবে, এক্ষেত্রে একটা কথা বলতে চাই পদ্ম; আপনি আমাকে চেনেন, আমার অতীতও জানেন। তাই আশা করছি, আমার অতীত কে আমার বর্তমানে আপনি টেনে আনবেন না। অতীতে যে মানুষ টা আমার ছিল, সে আজীবন আমারই থাকবে। হয়তো তাকে ভুলতে পারবো না, তবে তার জন্য আমি আপনাকে কষ্ট দেব না, এইটুকু ওয়াদা আমি আপনাকে করতে পারি।’
পদ্ম ঠোঁট জোড়া প্রশস্ত করে হাসল। বললো,
‘আমিও আমার সীমা কখনো লঙ্ঘন করবো না, ডাক্তারবাবু।’
আদিদ আলতো হাসল। বললো,
‘প্রিপারেশন নিন। কাল মা’কে নিয়ে আসবো।’
পদ্ম কিঞ্চিত অস্বস্তি নিয়ে বললো,
‘ঠিক আছে।’
রাণীর খুশি দেখে কে। সে খুশিতে পদ্ম কে জড়িয়ে ধরলো। আদিদ তখন বললো,
‘কিন্তু আপনাদের পরিকল্পনা টা তো ভেস্তে গেল।’
রাণী তাকিয়ে বললো,
‘কোন পরিকল্পনা?’
আদিদ হেসে বললো,
‘ঐ যে আমাকে জেলাস ফিল করানোর পরিকল্পনা?’
‘এটা রাণীর প্ল্যান ছিল।’
পদ্ম’র কথায় রাণী সম্মতি দিল। আদিদ বললো,
‘থাক, এখন আর অন্যজনের উপর দোষ চাপিয়ে লাভ নেই। আর এমনিতেও আপনাদের একসাথে দেখে আমি জেলাস হতাম না।’
রাণী তখন বললো,
‘এখানে যদি অনিক স্যার না থেকে অন্য কেউ থাকতো তাহলে অবশ্যই হতেন। অনিক স্যার কে তো আপনি চেনেন, তাই আপনি সবকিছু বুঝে গিয়েছেন।’
‘হু, আর আপনিও তো একগাদা মিথ্যে বলেছেন আমাকে উল্টা পাল্টা বোঝানোর জন্য।’
পদ্ম ব্রু কুঁচকে বললো,
‘ও আপনাকে কী বলেছে, ডাক্তারবাবু?’
‘না, কিছু না। যা হয়েছে হয়েছে, আগের কথা টেনে কোনো লাভ নেই। আমরা বরং এখন বিয়ে নিয়ে ভাবি। অনেক কাজ করতে হবে, বিয়ে বলে কথা।’
পদ্ম বুঝতে পারে রাণী কথা কাটানোর চেষ্টা করছে। আদিদ ও তাই তখন আর কিছু বললো না। তাকে হসপিটালে যেতে হবে বলে সে আর বেশিক্ষণ সেখানে দাঁড়াতে পারলো না, চলে গেল।
আদিদ চলে যাওয়ার পর রাণী আর পদ্মও তাদের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা দিল। রাণীর উত্তেজনা যেন শেষ হচ্ছে না। পদ্ম কে বিরক্ত করে তুলছে সে। কতকিছু কিনতে হবে, কত ব্যবস্থা করতে হবে। রাণীর উপর খুব চাপ। সে কীভাবে কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না। পদ্ম বারবার তাকে ধমক দিচ্ছে, “রাস্তার উপর এইভাবে লাফালাফি করিস না, পড়ে যাবি।” কিন্তু কে শুনে কার কথা, সে লাফিয়ে লাফিয়ে হাঁটছে আর বিয়ে নিয়ে বিশদ আলোচনা করছে।
.
.
রাতের আকাশ। কৃষ্ণবর্ণ তার গায়ের রং। কাদম্বিনী গুচ্ছের ন্যায় ভাসমান। কী সুন্দর, সুশীল তার চলন। কত নিখুঁত তার বিস্তৃত। আজ দিন টা সুন্দর ছিল। রাত টাও ভীষণ সুন্দর। এই সুন্দর আকাশে একটা সুন্দর চাঁদ থাকলে ব্যাপারটা আরো পরিপূর্ণ হতো।
পদ্ম চমৎকৃত চোখে তাকিয়ে আছে কৃষ্ণাঙ্গ আকাশের দিকে। যেন তার আশ্চর্যের অন্ত নেই। এত অসুন্দর জীবনে এবার কি সত্যিই সুন্দর কিছু হতে চলছে? পদ্ম ভেবে পায় না, সত্যিই কি সে ডাক্তারবাবু কে পেতে চলছে? এটা আবার তার কল্পনা নয়তো? চোখ খুললেই সবকিছু হারিয়ে যাবে না তো? এতো এতো কল্পনা সে জীবনে দেখেছে যে এখন সত্যিটাকেও মানতে কষ্ট হয় তার। মনে হয় এটাও বুঝি কল্পনা।
_________________________________________
‘তুই কিন্তু এবার বেশি বাড়াবাড়ি করছিস, রাণী।’
পদ্ম’র ধমক রাণী কে থামাতে পারলো না। সে পদ্ম কে সাজিয়ে তবেই দম ফেলবে। পদ্ম রেগে মেগে আগুন হয়ে যাচ্ছে। তাও রাণী কে সে থামাতে পারছে না। পদ্ম’র নড়াচড়ায় রাণী বিরক্ত হয়ে বললো,
‘একটু বসো না শান্ত হয়ে। শাড়ি টা খুলে যাবে তো।’
‘যাক খুলে। তোর এতো যন্ত্রণা আমার ভালো লাগছে না। এতকিছু করার কী দরকার বলতো? উনারা কী আমাকে প্রথম দেখতে আসছেন। উফফ, এইভাবে ডাক্তারবাবুর সামনে যেতে আমার অস্বস্তি লাগবে।’
‘কোনো অস্বস্তি লাগবে না। বসে থাকো চুপচাপ।’
রাণী তার মন মতো পদ্ম’কে সাজিয়ে দিল। আয়নায় নিজেকে দেখে পদ্ম’র লজ্জা লাগল। নতুন বউ লাগছে, এইভাবে আদিদের সামনে যেতে হবে ভেবে পদ্ম’র অস্বস্তি কেবল বাড়ছে।
বিকেলের দিকে আদিদ এলো মা’কে নিয়ে। সাথে অভিও এলো। রাণী তাদের আপ্যায়ন করলো। চা নাস্তার ব্যবস্থা করলো। তারপর সে ভেতরে গিয়ে পদ্ম কে নিয়ে এলো। পদ্ম লজ্জায় তাকাতে পারছে না। পদ্ম কে ওভাবে দেখে আদিদ চমকালো। রুবি হোসেন ভীষণ খুশি হলেন। পদ্ম কে তার পাশে নিয়ে বসলেন। খুশি খুশি গলায় বললেন,
‘এই যে আমার আদিদের বউ, আমি আর এক মুহূর্তও দেরি করবো না। আমি আমার বউ মা কে আজই ঘরে তুলবো।’
চলবে..
#পদ্মফুল
#জান্নাতুল_ফারিয়া_প্রত্যাশা
|৫২|
‘আজ’ই!’
দুজনে একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল। রুবি হোসেন তখন বললেন,
‘হ্যাঁ, আজ’ই। তোমাদের বেশি সময় দিলে তোমরা আবার উল্টা পাল্টা কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে। তাই কোনো রিস্ক নিতে চাইছি না। আমি আজই তোমাদের বিয়ে দিব। সবকিছু রেডি আছে। ছেলে পক্ষের স্বাক্ষী হবে অভি। আর মেয়ে পক্ষের স্বাক্ষী হবে রাণী। আর কাজীও আমি আগে থেকেই বলে রেখেছি। আমি একটা কল দিলেই উনি চলে আসবেন।’
পদ্ম হতভম্ব হয়ে পড়ল। আদিদ মা’কে বুঝিয়ে বললো, কিছুদিন অন্তত সময় নেওয়ার জন্য। এইভাবে হুট করেই এতকিছু না করতে। কিন্তু রুবি হোসেন তার সিদ্ধান্তে অটুট। সাথে অভি আর রাণীও সাঁই দিল। বেচারা আদিদ আর পদ্ম, একপর্যায়ে আর কোনো উপায়ান্তর না দেখে তাদেরও বাধ্য হতে হলো।
কাজী এলো। নতুন করে বিয়ে পড়ানো শুরু হলো। পদ্ম’র কথায় নয়শত নিরানব্বই টাকা দেনমোহর করা হলো। পদ্ম, আদিদ দুজনেই সপ্রতিভ গলায় বললো, “কবুল”।
অন্য মেয়েদের মতো পদ্ম আর আজ কাঁদলো না। অনেক কেঁদেছে সে। তার এই পঁচিশ বছরের ক্ষুদ্র জীবনটা তার কেঁদেই পার করতে হয়েছে। তাই আজ আর কাঁদলো না সে। মনে মনে ঠিক করলো, আর কাঁদবে না। এবার হাসবে, নতুন করে বাঁচবে। নতুন মানুষকে সাথে নিয়ে নতুন ভাবে পথ চলা শুরু করবে।
রুবি হোসেন তাড়া দিতে লাগলেন। পদ্ম কে নিয়ে এখনই বাড়ি ফিরবেন তিনি। সেই মুহুর্তে রাণী হঠাৎ থমকে গেল। তার তখন মনে পড়ল, সে তো এতদিন পদ্ম’র সাথে থাকতো। কিন্তু আজ থেকে যদি পদ্ম আদিদের বাড়িতে থাকে তবে সে কোথায় থাকবে। মুহুর্তেই রাণীর চোখ মুখ কালো হয়ে গেল। পদ্ম কে ছেড়ে কোথায় যাবে সে। ঐ আশ্রমেই কি আবার তাকে ফিরতে হবে?
পদ্ম রুবি হোসেনকে শান্ত হতে বললো। সে বললো,
‘আমি আজ’ই যেতে পারবো না, বড়ো মা। আমার এইদিকে সবকিছু গোছাতে হবে। বাড়ির মালিককে বলতে হবে। হুট করেই তো আর বাসা ছেড়ে দেওয়া যায় না। তাই এই সবকিছুর জন্য কিছুদিন সময় লাগবে আমার।’
‘সমস্যা নেই পদ্ম, আপনার যতদিন খুশি সময় নিন। এত তাড়াহুড়ো করতে হবে না।’
আদিদ সম্মতি দিয়ে দেওয়ায় রুবি হোসেনকেও মানতে হলো। তিনি বললেন,
‘ঠিক আছে তাহলে, আজ যেহেতু বাইশ তারিখ সেহেতু আর আট দিন পর এই মাস শেষ হলে তোমাকে আমাদের বাড়িতে তুলবো। এর মধ্যে তুমি এইদিকের সব কাজ শেষ করো, কেমন?’
পদ্ম হাসি হাসি মুখে বললো,
‘আচ্ছা।’
তাদের কথাবার্তা শুনে রাণী আর কিছু বললো না। সে পদ্ম কে বলে রান্নাঘরের দিকে গেল। রান্নাঘরে গিয়েই কেঁদে ফেলল সে। পদ্ম কে ছেড়ে থাকতে পারবে না। এখন মনে হচ্ছে, বিয়েটা না হলেই ভালো হতো, পদ্ম আজীবন তার সাথে থাকতে পারতো। রাণী ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। হঠাৎ তখন সে তার কাঁধে কারোর হাতের স্পর্শ পায়। তাড়াতাড়ি করে চোখ মুখ ওড়না দিয়ে মুছে পেছন ফিরে তাকায়। পদ্ম কে দেখে মেকি হাসে সে। পদ্ম তীক্ষ্ণ চোখে রাণীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। রাণী আমতা আমতা করে বলে,
‘কী হলো আপু, কী দেখছো?’
‘কাঁদছিলি কেন?’
পদ্ম’র প্রশ্নে রাণী থতমত খায়। কী জবাব দেবে ভেবে পায় না। চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকায়। পদ্ম আবারো প্রশ্ন করে,
‘কী হলো বল, কাঁদছিলি কেন?’
রাণী নিজেকে খুব কষ্টে সংযত করে রেখেছে। বুক ফেটে যাচ্ছিল তার। তাও ঠোঁটের কোণে সে হাসি ফুটিয়ে তুললো। হাসতে হাসতে বললো,
‘কই, কাঁদছিলাম না তো। কাঁদবো কেন, আজ তো আমার খুশির দিন। তবে একটু কষ্ট লাগছে এই ভেবে যে, আমি এতো এতো প্ল্যানিং করে রেখেছিলাম কিন্তু তার কিছুই হলো না। হুট করে এলো আর বিয়ে হয়ে গেল। আমি একটু শপিংও করতে পারলাম না, তোমাকে ভালোভাবে সাজাতেও পারলাম না।’
পদ্ম’র চোখ মুখের কঠোরতা কমলো না। সে গম্ভীর গলায় বললো,
‘খুব মিথ্যে বলতে শিখেছিস দেখি। কেন কাঁদছিলি বল?’
রাণী চোখ বুজে জোরে নিশ্বাস নেয়। বুকের ভেতরের তীব্র আর্তনাদ যেন সেই উষ্ণ নিশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে এলো। পদ্ম হুট করেই রাণীকে তখন জড়িয়ে ধরলো। রাণী এবার আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো, শব্দ করে কেঁদে উঠল সে। পদ্ম আরো শক্ত করে চেপে ধরলো তাকে। মাথায় হাত রেখে মোলায়েম গলায় বললো,
‘কাঁদছিস কেন, বোকা? তুই তো আমার সাথেই থাকবি।’
রাণী নাক টানল। বললো,
‘তুমি তো তোমার শ্বশুর বাড়িতে চলে যাবে।’
‘তুইও সেখানে আমার সঙ্গে থাকবি।’
রাণী মাথা তুলে তাকায়। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলে,
‘এটা হয় নাকি? আমি কীভাবে তোমার সাথে তোমার শ্বশুর বাড়িতে থাকবো?’
‘কেন, হয় না কেন? তুমি তো পদ্ম কে আপু ডেকেছো। তো, বোনের সাথে থাকতে অসুবিধা কোথায়?’
রুবি হোসেনের কথা শুনে পদ্ম খুশি হলো। রাণীকে বললো,
‘এবার হয়েছে তো, বড়ো মাও বলে দিয়েছে। এখন কান্না থামা।’
রাণী চোখ মুখ মুছে রুবি হোসেনকে উদ্দেশ্য করে বললো,
‘আন্টি, আপনি খুব ভালো।’
পদ্ম’র মনের ভেতরটা তখন ধক করে উঠল। প্রথম দেখায় এই মানুষটাকে সেও খুব ভালো ভেবেছিল, কিন্তু…
.
আদিদ সেই কবেই বেরিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু নাছরবান্দা রাণী তাকে আজ কোনোভাবেই ছাড়বে না। এইসবের মাঝে সে আবার পদ্ম আর আদিদের বাসরের আয়োজনও করে ফেলেছে। আদিদ কিছু বলতেও পারছে না সইতেও পারছে না। পদ্ম ভীষণ রাগ দেখাচ্ছে। বিয়েটা হুট করে হয়ে গিয়েছে, তাই বলে বাসরের জন্য তারা মোটেও প্রস্তুত না। পদ্ম রাণীকে অনেক ধমকিয়েছে কিন্তু লাভ হয়নি। রাণীর সাথে অভি থাকায় পদ্ম আর তাকে আটকাতে পারেনি। তার উপর রুবি হোসেনও তাদের সাথে তাল মেলাচ্ছিলেন। পদ্ম আর আদিদ দুজনের জন্যই ব্যাপারটা ছিল ভীষণ অস্বস্তির। পদ্ম তো কবুল বলার পর থেকে আদিদের দিকে তাকাতেও পারছে না। কেমন যেন আদিদ কে এখন অপরিচিত অপরিচিত লাগছে। এখন আর সে শুধু তার ডাক্তারবাবু না তার স্বামীও, ভাবলেই তার গায়ে শিহরণ জাগে।
রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে অভি তার বাসায় ফিরে যায়। রুবি হোসেন আর আদিদকে থাকতে হয়। যদিও আদিদ এর মাঝে অনেকবারই চেয়ে ছিল কিছু বলে কেটে পড়ার জন্য কিন্তু ঐ রাণীর কাছ থেকে সে কোনোভাবেই ছাড় পায়নি।
পুরোটা সময় পদ্ম’র ব্যস্ততায় কাটে। রাণী ছাড়া তো তার কেউ নেই, সে নিজেই তাই সব রান্না-বান্না করে সবাইকে খাইয়েছে। খাওয়া দাওয়া শেষ করে পদ্ম তরকারিগুলো গোছাচ্ছিল। রাণী তখন পেছন থেকে এসে বলে,
‘আর কাজ করতে হবে না। এবার রুমে যাও, একটু সাজুগুজু করো। একটু পর তো…’
কথাটা রাণী শেষ করবার আগেই পদ্ম তরকারি থেকে একটা আলু নিয়ে তার মুখে পুরে দিল। রাণী হা হয়ে আছে। পদ্ম রাগি গলায় বললো,
‘তুই কিন্ত বেশি বাড়াবাড়ি করছিস রাণী। দেখছিস সবকিছু কীভাবে হুট করে হয়ে গেল। তার মধ্যে তুই আবার এইসব বাসর ঘরের আয়োজন শুরু করলি। তুই একবার ভাবতো, আমি কীভাবে আজকে উনার সামনে যাবো। এখনই যা অস্বস্তি হচ্ছে, উনার সামনে রুমে একা থাকলে আমি বোধ হয় অস্বস্তিতে ম*রেই যাবো।’
রাণী আলু টা মুখ থেকে বের করে হেসে বললো,
‘ডাক্তার মানুষ, বাঁচিয়ে ফেলতে পারবে।’
পদ্ম চোখ ঘুরিয়ে তাকাতেই রাণী চুপচাপ আলু খেতে লাগল।
ভেতরের রুমে পদ্ম কে রেখে রাণী বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর রাণী আবার সেই রুমে ঢুকল। একটা দুধের গ্লাস টেবিলের উপর রেখে বললো,
‘আপু, দুলাভাই আসলে দিও।’
পদ্ম আহাম্মকের মতো বসে বসে রাণীর কান্ড দেখল। মেয়েটা যে তখন থেকে কী কী করছে। উফফ, আজকের মতো এতো বকা সে জীবনেও শুনেনি হয়তো তাও তার মধ্যে বিন্দুমাত্র বিষন্নতা নেই। কত খুশি মনে এটা ওটা করেই চলছে, যেন পদ্ম তার নিজের বোন।
.
.
দরজায় দু’বার নক করে আদিদ ভেতরে ঢুকল। আদিদ কে দেখে পদ্ম বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। সে এক পা এগুতেই আদিদ বললো,
‘মুখে সালাম দিলেই হবে।’
চলবে…