পুষ্প কন্যার প্রেম পাবক পর্ব-০২

0
354

#পুষ্প_কন্যার_প্রেম_পাবক
#পর্ব২
#রাউফুন

‘বিয়েটা কি তুই করছিলি? ঐ কো তুই করছিলি? ক্যান আমার এত্তো বড় সর্বনাশ করলি তাইলে?’

ঝুমুরের নরম তুলতুলে গালে পর পর ঋতু শক্ত হাতে কতগুলো থা’প্প’ড় দিতে দিতে কৈফিয়ত চাইলো।

‘আপা বিশ্বাস করো আমি জাইনা করি নাই সইটা।আমি সত্যই জানলে তোমার নাম লিখতাম না। আব্বাই কইলো এই হানে একটা নাম লিইখা দে তো তোর বইনের। তোর আপার তো অসুখ। ওই কিরাম কইরা নাম লিখবো। আমি ছোডো,ওতো কিছু বুইঝা সই করি নাই গো আপা। আমি যদি ঘুনাক্ষরেও টের পাইতাম এতো বড় সর্বনাশ হইতো না।’

তখন তুষার ফোন দিয়েছিলো দেখে ঋতুর চোখ চকচক করে উঠেছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে ডিভোর্স পেপারে সাইন করে পাঠানোর কথা শুনতেই পিলে চমকে উঠে তার।

‘তুমি যে আমার প্রতি এতো মুমুক্ষু বুঝতে পারিনি তো ঋতু?’

‘মানে কি কইতাছেন এগুলা?’

‘আমার থেকে মুক্তি পেতে এতোটাই ইচ্ছুক তুমি যে, আমার বাড়িতে তোমার সাইন করা ডিভোর্স পেপার পাঠিয়েছো?’

‘আল্লাহ আপনি এগুলা কি কন? যার জন্য এতো লড়াই, এতো সর্বংসহা, তাকে কিনা আমি তালাক দিমু? আপনের নিশ্চয়ই কোনো ভুল হইতাছে তুষার!’

‘আমার কোনো ভুল হয়নি। তোমাকে নিশ্চয়ই আমি এমনি এমনি এসব বলছি না।’

‘বিশ্বেস করেন তুষার, আমি তালাক নামাই সই করে পাঠাই নাই।’

‘আচ্ছা করলাম বিশ্বাস! আমি তোমাকে অবিশ্বাস করছি না কিন্তু ডিভোর্স পেপারটা সত্যিই এসেছে। ডিভোর্স পেপার দেখে মাথা ঠিক ছিলো না তাই এভাবে শক্ত গলায় কথা বলেছি তুমি দুঃখ পেও না।’

‘আমি তো অসুস্থ, বিছানা ছাইড়া উঠার শক্তি নাই কেমনে সই করুম?’

‘কি হয়েছে তোমার? ওঁরা কি তোমার গায়ে হাত তুলেছে?’

‘আপনে এতোটা বিচলিত হয়েন না। আমি দেখতাছি ব্যাপারটা!’

তুষার শান্ত হয়ে ফোন কেটে দিতেই ফ্লোরে ধপাস করে বসে পরে ঋতু কাঁদতে থাকে। তারপর আচমকাই ঝড়ের বেগে ঝুমুরকে আঘাত করে। কারণ সে জানে, এই বাড়িতে তীর্থ আর ঝুমুরই পড়াশোনা জানে। তীর্থ তো নেই,ওঁর মামা বাড়ি গেছে।বাকি থাকে ঝুমুর। সে যেহেতু সাইন করে নি সেহেতু ঝুমুর সাইন করেছে। কিন্তু এখন বোনের মুখে সত্যিটা শুনে অনুতপ্ত হলো। তার ছোট, বোকাসোকা বোনকে দিয়ে তার বাপ-চাচাই এতো বড় একটা কান্ড ঘটিয়েছে! সে ভাবতেই পারছে না তার অলক্ষে এতো কিছু ঘটে গেছে। যার গায়ে কেউ একটা ফুলের টোকা দিতে সক্ষম হয়নি তার বাবার জন্য, সেখানে কি না আজ সে না জেনেই বোনের গায়ে হাত উঠালো।

সত্যিই প্রেমে পরলে মানুষ অন্ধ হয়ে যায়। কাউকেই ভালো লাগে না। চারপাশের সবাইকে অবিশ্বাস হয়, শুধু মাত্র সে যাকে ভালোবাসে তাকে ছাড়া। সবচেয়ে বড় কথা, মানুষ বড্ড বেপরোয়া আর স্বার্থপর হয়ে যায় এই প্রেম ভালোবাসার চক্করে। সে সময় আশে পাশের মানুষ যতই আপনার ভালো চাক, ভালো কথা বলুক, সবটাই নিছকই ভুল মনে হবে। এই যে ঋতু তো একবারও তার বাবা মায়ের সম্মানের কথা চিন্তা করেনি। স্বার্থপরের মতো নিজের পছন্দসই লুকিয়ে বিয়ে থা করে বসে আছে। বাবা- মা তার সন্তানকে বিশ-বাইশ বছর এতো ভালোবাসা দিয়ে বড় করেন কি এই দিন দেখার জন্য? মেয়ে তাদের সম্মান নষ্ট করে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছে এটা কি সত্যিই বাবা মায়ের এতো কষ্টের ফল হতে পারে? একবারের জন্য ঋতু ভাবলো না, তার এমন কাজের জন্য বাড়ির মান মর্যাদা ধুলোই লুটাবে?

রাতের দিকে ঋতুর জ্বর মাত্রাতিরিক্ত বাড়লো। এমন হুহু করে শরীরের তাপ মাত্রা বেড়ে যাওয়াই শরীর থরথর করে কাঁপছে। ঝুমুর বড় আপার এমতাবস্থায় দু-চোখের পাতা এক করতে পারছে না। এক সপ্তাহ এভাবেই কেটে গেলো তবুও ঋতুর জ্বর কমছেই না। মেয়ের এমন অবনতির, এমন অবাধ্যতার জন্যই মুখ ফিরিয়ে ছিলেন আজিজ সাহেব। কিন্তু এই জ্বর যদি অন্য সময় হতো কত ওষুধ এনে দিতেন, ডাক্তার, কবিরাজ ডেকে একশাঁ করে দিতেন। কিন্তু একটা ঘটনার জন্য, এতোটাই কষ্ট পেয়েছেন যার জন্য আজিজ সাহেব মেয়ের মুখও দর্শন করেন নি।

সপ্তাহ গড়িয়ে যাওয়ার পরদিন এক প্রকার বাঁধ্য হয়েই গ্রামের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো ঋতুকে। তার প্যাড়া টাইফয়েড জ্বর হয়েছে। দুইদিন পর বাড়িতে নিয়ে আসা হলো ঋতুকে। ওষুধ দেওয়া হয়েছে। ঝুমুর দিন রাত এক করে বড় আপার সেবা করেই যাচ্ছে। মেয়েটা খাওয়া দাওয়াই করতে পারছে না। তার বড় আপা না খেতে পারছে, না গিলতে পারছে, বমি করে ভাসিয়ে দিচ্ছে সবটাই। এমতাবস্থায় সে কি করে বড় আপাকে রেখে খাবার খাবে?

কিছুক্ষন পর মাটির কলস নিয়ে এলেন সুফিয়া। বাড়িতে মাটির কলস ছিলো না, তাই নিজেই চলে গেছিলেন সেটা কিনতে। তীর্থটা থাকলে বড্ড উপকার হতো। জেঠি মায়ের সকল কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে কি না। মাটির কলস ফুটো করে ঠান্ডা পানি ভরে সিলিং এ বেঁধে দিলেন সুফিয়া। গ্রামে জ্বর সারানোর এভাবে আলাদা উপায় থাকে৷ এতে করে জলদি সেরে উঠে জ্বর। মায়েরা সন্তানের উপর যতোই রাগ করুন না কেন, সন্তানের অসুখে মায়েরাই বোধহয় বেশি বিচলিত হোন। সমস্ত রাগ, ক্ষোভ, কিছুই তখন মনে রাখতে পারে না।

ঋতু নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দেওয়াই আজিজ সাহেব একটু নরম হলেন বড় মেয়ের প্রতি। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বিয়ে যেহেতু হয়েই গেছে সেহেতু বড় মেয়ে, জামাই, মেনে নেবেন। ছোট ভাই আসলামের সঙ্গে আলোচনায় বসলেন তিনি।

‘শোন, আসলাম এভাবে আর কতদিন। যতো অন্যায় ই করুক মাইয়াডা তো আমার ই। মাইয়া বিয়া তো দেওন লাগতোই তার চাইতে ভালো লোক জানা জানি হওনের আগে মাইন্না নেই। সামনে ইলেকশন এহন যদি আমার মাইয়ার এই কেলেংকারী মানুষ শুনে আমারে ভোট দেওন তো দূর, কথা শুনাইবো। আমার আড়ালে আমার বদনাম করবো। আর আমি চাই না আমার পিছেও কেউ নিন্দা করুক। তুই তুষার নামের পোলারে আনবার ব্যবস্থা কর। সবাইকে জানাইয়াই বিয়া দিমু আবারও ঋতুর লোগে।’

‘ওর তো আঠারো মাসে বছর, নড়তে চড়তেই কামসারা। ওমন নদের চাঁদরে (দেখতে সুন্দর কিন্তু অপদার্থ!) দিয়া তো আমাগো মাইয়ার সুখ হইবো না! ভাইজান, ঐ পোলায় খাওয়াইবো কি আপনের মাইয়ারে?’

‘বেশি কথা কইস না। সামনে ইলেকশন,এমন সময় যদি আমার বাড়ির মাইয়ার কথা মানুষের মুখে মুখে রটে ভাবছস কি হইবো? তার চাইতে ভালা এহনি মাইনা নেই। ওই পোলা খারাপ হইলে আমার মাইয়া নিজের কফাল নিজেই খাইছে। আমগোর কোনো দায় নাই এতে।’

‘আমি এক খান কথা কই ভাইজান,আপনে এক কাম করেন। ভাবিরে লইয়া শহরের বাড়িতে চইলা যান। ওই হানে তো আর মানুষ জানা জানির ভয় নাই। আমগোর ঝুমুররেও ভালা ইস্কুলে ভর্তি করাইতে পারবেন। মাইয়াডাই তো পড়ালেহায় ম্যালা ভালা!’

আজিজ সাহেব ভেবে দেখলেন কথাটা মন্দ বলে নি তার ছোট ভাই আসলাম। শহরে যেহেতু বাড়ি আছেই তার, সেখানেই থাকুক না হয়।

সেই সময় ঝুমুর তার হাতে ভাতের থালা নিয়ে বাবার কাছে গেলো।

‘আব্বা তুমি জানো না,আমারে তুমি না খাওয়াই দিলে আমার পেট ভরে না। এহন আমার খাওয়াই দিবা!’

‘এই ঝুমুর একদিন একটু নিজের হাতেই খাইয়া নে! ভাইজান আর আমি জরুরি আলাপ করি।’

‘আসলাম,তুই চুপ কর। আমার আম্মারে আমি খাওয়াই দিমু তোর কি রে? আলাপ পরে করমু যাহ এহন!’

ভেতরে ভেতরে ফুসে উঠলেন আসলাম। এই মাইয়ার লাইগা তার পোলার কদর কম। মনে থেকে সে কিছুতেই সইতে পারে না ঝুমুরকে।

‘আসো আম্মা,ভাতের থাল দেও!’

ঝুমুর ভাতের থালা এগিয়ে দিলে আজিজ সাহেব হাত ধুয়ে মেয়েকে খাইয়ে দিচ্ছেন। কে বলবে এটা বারো-তেরো বছরের একটা মেয়ে! বাবার কাছে একদমই শিশুর মতো হয়ে যায়। বড্ড ভালোবাসেন আজিজ সাহেব ছোট মেয়েকে৷ ছোট মেয়ে অন্ত প্রাণ তার। আসলাম বড় ভাইকে খোঁচা দিয়ে বললো,

‘ভাইজান, এই মাইয়ারে যে এমনে আদর যতন করতাছেন, দেখবেন আপনের এই মাইয়াই একদিন আপনার নাক কা’টা’ইবে!’

#চলবে