Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-১৫+১৬

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-১৫+১৬

0
664

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ১৫

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

রাত তখন গভীর। পৃথিবীটা যেন কালো মখমলের চাদরে মুড়ে নিয়েছে। চারপাশে নেমে এসেছে নিশ্ছিদ্র নীরবতা। আকাশের তারাগুলোও আজ যেন একটু বেশিই নিস্তেজ, দিয়া দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়, ঘুম আসছে না কিছুতেই। তবে নির্ণয় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দিয়া খানিক্ষণ ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। ভালো লাগছে না মোটেই।

দূরে ওই মেঘলা আকাশটার দিকে তাকিয়ে কী যেন ভাবলো দিয়া। এরপর গুটি গুটি পায়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। কয়েক কদম ফেলে গিয়ে দাঁড়ালো নদীর ঘরের দরজার সামনে। তবে দরজায় টোকা দিতে গিয়েও বার বার থেমে যাচ্ছে, সংকোচবোধ হচ্ছে। তাই খানিক্ষণ ওভাবেই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থেকে চলে আসলো নিজেদের ঘরে।

ঘরে ঢুকে দরজা আটকাতেই চোখে পড়লো নির্ণয় বিছানার উপর বসে আছে। দিয়া কপাল কুঁচকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়ালো নির্ণয়ের থেকে খানিকটা দূরে। প্রশ্ন করল-

—“এভাবে বসে আছেন ক্যান? কিছু কি দরকার?”

নির্ণয় কোনো জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলো-

—“কোথায় গিয়েছিলে এতো রাতে?”

দিয়া বুঝতে পারছে না এই মূহুর্তে নির্ণয় রেগে আছে কি না। তবে দিয়া কোনো রকম ভনিতা ছাড়াই বললো-

—“নদীর ঘরে গিয়েছিলাম’

—“মিথ্যে কথা বললে জান নিয়ে নিব”

দিয়া ভ্রু যুগল কুঁচকে তাকালো নির্ণয়ের দিকে-

—“আপনার কী মনে হচ্ছে আমি মিথ্যে কথা বলছি?”

—“হ্যাঁ মনে হচ্ছে”

দিয়া ঘুরে গিয়ে বিছানায় শুতে শুতে বললো-

—“স্বাভাবিক’

নির্ণয় রেগে গেলো দিয়ার এহেন খাপছাড়া জবাব শুনে। এক ঝটকায় উঠে বসলো দিয়ার পেটের উপর, শক্ত করে চেপে ধরলো দিয়ার চিবুক।

—“কি সমস্যা ইদানিং একটু বেশি বাড়াবাড়ি করছিস যে”

দিয়া জবাব দিলো না শুধু চেয়ে রইলো নির্ণয়ের মুখের দিকে। নির্ণয়ের যেন এতে আরো রাগ বাড়লো-

—“এ্যাই চুত-মারানি জবাব দে। কে দিয়েছে তোকে এতো সাহস?”

দিয়া কোনো রকমে ঠোঁট নাড়িয়ে বললো-

—“ থুতনিটা ছাড়েন নয়তো উত্তর দিব কীভাবে?”

নির্ণয় মূহুর্তে ছেঁড়ে দিলো দিয়ার চিবুক। দাঁতে দাঁত পিষে বললো-

—“কোথায় গিয়েছিলি সত্যি করে বল”

—“আমি সত্যি বলছি’ আমি নদীর ঘরে গিয়েছিলাম ওর সাথে কথা বলতে তবে..

—“তবে কী?”

—“আমি ওর ঘরের দরজার কাছ থেকে ফিরে এসেছি।

—“ক্যান?”

—“আমি জানি না”

—“ঠিক আছে ঘুমা..”

—“ঘুমোবই তো আগে নামেন আপনি আমার ওপর থেকে”

নির্ণয় প্রথমে বুঝলো না দিয়ার কথার মানে। কপাল কুঁচকে তাকালো ওর দিকে। দিয়া ফের বলে উঠলো-

—“নামেন বলছি”

নির্ণয়ের খেয়াল আসতেই চটজলদি নেমে পড়ল দিয়ার পেটের উপর থেকে। আমতা আমতা করে বললো-

—“স্যরি”

দিয়া মুখ বাঁকিয়ে ওপর পাশে ঘুরে শুয়ে পড়লো। নির্ণয় খানিক্ষণ ওভাবেই বসে থেকে ফের কাঁথা টেনে শুয়ে পড়লো। তবে ঘুম আসছে না কিছুতেই। বারবার দুঃস্বপ্নের কথা মনে পড়ছে। তবে নির্ণয় তা বেশি একটা পাত্তা দিলো না। ঘুমানোর জন্য চোখ দুটো বুঝে রইলো।

__________________

ফজরের আজান কানে বাজতেই ঘুম ছুটে গেলো নদীর। চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে। হাত টা কেমন অবশ হয়ে গেছে। নদী বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো। সারারাত বারান্দায় ঘুমিয়েছে। নদী শক্ত হাতে এলোমেলো চুল গুলো খোঁপা বেঁধে চললো ওয়াশরুমে। নিজেকে পরিস্কার করা দরকার রক্ত লেগে আছে জামা কাপড়ে।

বেশ কিছু সময় পর ফ্রেশ হয়ে বের হলো নদী। পরনে তার সাদা রঙের থ্রিপিস। জামার হাতা টা ফুল হাতা, হয়তো কাঁটা দাগ গুলো ডাকার জন্যই পড়েছে। বেশ কিছুক্ষণ বিছানায় বসে থেকে কিছু একটা ভেবে জায়নামাজ বিছিয়ে নামাজে দাঁড়ালো। অনেকদিন নামাজ পড়ে না।

নামাজ শেষে মোনাজাতে দুই হাত তুলে মন খুলে কাঁদলো মেয়েটা। মালিকের কাছে নালিশ দিলো খুব করে। এরপর জায়নামাজ উঠিয়ে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে।

সকালের ঠান্ডা হাওয়ায় মনটা বেশ হাল্কা হলো। তাই তো শরীরে উর্না জড়িয়ে দিয়ার ঘরের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো। দরজায় টোকা দিয়ে নিচু স্বরে ডাকলো-

—“দিয়া উঠেছিস?”

ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না। নদী বুঝলো দিয়া উঠেনি’ তাই আগের তুলনায় খানিকটা জোরে ডাকলো-

—“এ্যাই দিয়াআআআআআ উঠঠঠঠঠঠ”

দিয়া ঘুম থেকে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসল। চোখ দুটো কচলাতে কচলাতে দরজার কাছে এসে দরজা খুলে ঘুমু ঘুমু গলায় বললো-

—“আমমমমম…

দরজার ওপাশে নদীকে দেখে কথা আটকে গেলো দিয়ার। বড় বড় চোখ করে তাকালো নদীর দিকে। ও বেশ অবাক হয়েছে নদী কে সকাল সকাল এখানে দেখে।

—“এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? ভুত দেখে ফেললি নাকি?

দিয়া দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে বলল-

—“হ্যাঁ.. না না’

—“কি বলছিস হ্যাঁ না না’ তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে আয় বাহিরে হাঁটতে যাব।”

দিয়া কোনো জবাব দিলো না। চুপচাপ ঘরের ভেতরে চলে গেল। কয়েক সেকেন্ডের ভেতরে আবার ফিরেও এলো। উর্না গায়ে জরিয়ে এক গাল হেঁসে বললো-

—“চলো’

নদী অবাক হলো, ও ভাবতেও পারেনি দিয়া ওর একবার বলাতেই রাজি হয়ে যাবে-

—“তুই সত্যিই যাবি আমার সাথে?”

দিয়া নদীর হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে বললো-

—“হ্যাঁ অবশ্যই যাব কেনো কোনো সন্দেহ আছে?

নদী দিয়ার সাথে পা মিলাতে মিলাতে দুই পাশে মাথা নাড়িয়ে বলল-

—“নাহহহ’

নদী মৃদু হেঁসে বলল-

—“তাহলে চলো অনেকদিন আমরা এক সাথে বেরোই না!”

নদী ঠোঁট প্রশারিত করে হাঁসলো। নিজেই দিয়ার হাত শক্ত করে ধরে দৌড়ে ছুটলো খাল পাড়ের দিকে। যেন দুই স্বাধীন বিহঙ্গ, প্রথমবারের মতো উড়াল দিলো দিগন্তের পানে।

__________________

নির্ণয়ের ঘুম ভাঙল সকাল সাতটার দিকে ফোনের শব্দে। নাম্বার না দেখেই রিসিভ করে কানে ধরলো। ঘুমু ঘুমু গলায় বললো-

—“আপনি যেই নাম্বারে ফোন দিয়েছেন সে এখন ঘুমোতে ব্যস্ত’ দয়া করে অনেক্ষণ পর আবার ট্রাই করুন”

নির্ণয় ফোনটা রাখার জন্য উদ্যত হতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো আশা বেগমের কর্কশ কন্ঠ স্বর”

—“এ্যাই জমিদারের পোলা’ তরে কইছিলাম না ওই বাড়িতে থাকার দরকার নাই”

নির্ণয় এমন কর্কশ কন্ঠ স্বর শুনে তড়িঘড়ি করে উঠে বসল। চোখ দুটো কচলিয়ে ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মেকি হেঁসে বলল-

—“আসলে মা হয়েছে কী…

—“হয়েছে’ বুঝেছি কী হয়েছে’

—“হুঁ’

—“আগামী দুই ঘন্টার ভেতরে বাড়ি ফিরবি’

—“কিন্তু মাআআআ…

—“কোনো কিন্তু নয়, যা বলেছি তাই কর’

নির্ণয় বিরশ কন্ঠে বলল-

—“আচ্ছা ঠিক আছে”

আশা বেগম এক গাল হেঁসে ফোন কেটে দিলেন। নির্ণয় নিজের চুল গুলো টেনে ধরে বসে রইলো, মাথাটা খুব ধরেছে। পাশ ফিরে দিয়া কে না দেখে রাগ আরো বাড়লো দিগুন। শরীর থেকে কাঁথা ঝটকা দিয়ে ফেলে উঠে দাঁড়ালো। গায়ে শার্ট জড়াতে জড়াতে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো। রান্না ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলো দিয়া নেই। রুহানি বেগমের উদ্দেশ্যে বললো-

—“আম্মু আপনার মেয়ে কোথায়?”

রুহানি বেগম তরকারি নাড়তে নাড়তে বললেন-

—“নদীর সাথে বেরিয়েছে সকালে”

নির্ণয় কপাল কুঁচকে তাকালো বলল-

—“নদীর সাথে?

রুহানি বেগমের সুজাসাপ্টা উত্তর-

—“হ্যাঁ’ তোমার শ্বশুর আব্বা তো তাই বললেন”

—“ওহ্ আচ্ছা কখন বেরিয়েছে?”

—“ওই ছটার দিকে”

নির্ণয় আর কিছু বলল না চুপচাপ ফিরে এলো ঘরে। বারান্দায় দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ সিগারেট ফুঁকলো। এরপর ফ্রেশ হয়ে এসে বসলো উঠোনের মাঝখানে।

________________

দিয়া আর নদী হাঁসতে হাঁসতে ঢুকলো বাড়ির ভেতরে। দুজনের মধ্যে যে সব ঠিক হয়ে গেছে তা তাদের দেখেই বুঝা যাচ্ছে।

দিয়া কয়েকবার নদীকে জিজ্ঞাসা করেছে ওর হাসবেন্ড কোথায়? কেনো ও ফিরে এলো?

তবে নদী সেসব প্রশ্নের কোনো রকম উত্তর দেয়নি! এড়িয়ে গিয়েছে বরাবরই। তাই দিয়া ও আর প্রশ্ন করেনি। নদী কে আজ একটু স্বাভাবিক দেখে বেশ ভালো লাগছে দিয়ার। কতদিন মেয়েটা মন খুলে হাঁসে না।

ওদের এমন হাঁসি ঠাট্টা করতে দেখে চোখ ছানাবড়া সকলের। নির্ণয় বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। নেওয়াজ মোল্লা ও রুহানি বেগম ও তাই। উনাদের এমন ভাবে নিজেদের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে অপ্রস্তুত হলো দু’জনেই। নিজেদের মুখের দিকে চাওয়া চাওয়ি করল একবার। অতঃপর দিয়া মিনমিনে গলায় বলল-

—“ওভাবে তাকিয়ে কী দেখছো? আমরা কি কিছু করেছি?”

নদী নিজের হাতের শাপলা ফুল দুটো মুচড়াচ্ছে অনবরত। দিয়া তা দেখে নদীর হাতটা ধরে খাবার টেবিলের দিকে যেতে যেতে বললো-

—“আম্মু খাবার দেও ক্ষুধা লেগেছে খুব”

দুই মেয়েকে আবার এক সাথে দেখে রুহানি বেগমের চোখ দুটো ছলছল করছে। তবে সে তা লুকিয়ে এক গাল হেঁসে বললেন-

—“বসে’ নির্ণয় বাবা তুমিও বসো’ নদীর আব্বু আপনিও বসেন, সবাই এক সাথেই খায়”

নেওয়াজ মোল্লা বা নির্ণয় কেউ কোনো কথা বললো না চুপচাপ গিয়ে বসলো খাবার টেবিলে।

_______________

—“কি হয়েছে আপনাকে আপসেট দেখাচ্ছে কেনো?

নির্ণয় কোনো জবাব দিলো না। এক দ্যানে গাড়ি ড্রাইভ করছে। ওরা নাস্তা করেই বেরিয়ে পড়েছে খাঁন বাড়ির উদ্দেশ্যে। দিয়া কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে নির্ণয়ের দিকে। লোকটাকে বুঝা বড় দায়। দিয়াকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে নির্ণয় গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিলো। দিয়া ভয়ে খামচে ধরলো নির্ণয়ের হাত-

—“স্পিড কমান প্লিজ আমার ভয় করছে”

নির্ণয় বাঁকা হেঁসে বলল-

—“আমাকে না বলে বাড়ির বাহিরে যাওয়ার সময় ভয় লাগে নি?”

দিয়া শুকনো ঢোঁক গিলে বললো-

—“আপনি সেই জন্য রেগে আছেন?

নির্ণয় জবাব দিলো না। গাড়ির স্পিড আরো খানিকটা বাড়িয়ে দিলো। দিয়ার ভয়ে জান যায় যায় অবস্থা।

—“স্পিড টা কমান প্লিজ। কী করছেন টা কি? পাগল হয়ে গেছেন?”

নির্ণয় ঠোঁট বাঁকিয়ে হাঁসলো। বললো-

—“ভয় লাগছে?

—“হ্যাঁ খুউবব”

—“স্পিড কমিয়ে দিব?”

—“হ্যাঁ প্লিজ”

নির্ণয় শয়তানী হেঁসে গাড়ির স্পিড আরো খানিকটা বাড়িয়ে দিলো। ফাঁকা রাস্তায় সো সো শব্দ তুলে ছুটছে নির্ণয়ের বিএমডব্লিউ। দিয়া দুই হাতে খামচে ধরে আছে নির্ণয়ের হাত। চোখ দুটো খিচে বন্ধ করে রেখেছে।

কয়েক মিনিটের ব্যবধানে গাড়িটা এসে থামলো খাঁন মঞ্জিলের বিশাল গেঁটের সামনে। দিয়া তড়িঘড়ি করে গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। এই বুঝি প্রান পাখিটা খাঁচা ছেঁড়ে পালাচ্ছিলো। দিয়া বাড়ির ভেতরে যেতে যেতে বিড়বিড় করে বললো-

—“অমানুষ একটা”

#চলবে

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ১৬

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

বিয়ের আসরে একরাশ চাপা গুঞ্জনের মধ্যে দিয়া বসে আছে, যেন এক স্নিগ্ধ, রক্তিম অপ্সরা। আজ তার জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা, কিন্তু এই শুভলগ্নে তার হৃদয়জুড়ে নেমে এসেছে এক হিমশীতল শূন্যতা। সেজেছে সে, বেনারসির টকটকে লাল শাড়িতে, রঙটা যেন তার অব্যক্ত বেদনারই প্রতিচ্ছবি। সোনার গয়না আর ভারি মেকআপে- লাজুক হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা, কিন্তু ভেতরের তোলপাড় তার স্থির চোখ দুটিতে স্পষ্ট। মায়াবী সেই রূপ আজ এমন এক দুর্লভ ঔজ্জ্বল্য পেয়েছে যে, আসরের সকলের চোখ আটকে গেছে তার দিকে। তাকে সত্যি আজ পরীর মতো সুন্দর লাগছে, তবে এই সৌন্দর্য যেন এক বিষাদের চাঁদরে মোড়া।

অন্যদিকে, শহরের পিচঢালা পথ ধরে উন্মত্ত গতিতে ছুটে চলেছে নির্ণয়ের গাড়ি। গতিসীমা ছাড়িয়ে সে যেন সময়কেই অতিক্রম করতে চায়। স্টিয়ারিং-এ ধরা তার হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠেছে, আর চোখ দুটো যেন আগুনের গোলা। দীর্ঘ রাত জাগা কিংবা অক্লান্ত পরিশ্রমের ক্লান্তি নয়, এ হলো কান্না আটকে রাখার প্রাণান্তকর চেষ্টার ফল। প্রিয়তমার স্মৃতি, তাকে স্পর্শ করার, তাকে ভালোবাসার প্রতিটি মুহূর্ত, সব কিছু মিলে এক তীক্ষ্ণ শূলের মতো বিঁধছে তার হৃদয়ে।

“দিয়া আজ অন্য কারো হয়ে যাবে! অন্য কেউ তাকে স্পর্শ করবে, তার ঠোঁটে রাখবে ভালোবাসার চিহ্ন…”

এই চিন্তাটাই তাকে এক ভয়ংকর পশুর মতো করে তুলেছে। তার হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, কিন্তু বাইরে প্রচণ্ড জিদ আর অস্বীকারের কঠিন দেওয়াল। তার কাছে এই বিয়ে কেবল একটি শুভ অনুষ্ঠান নয়, এ হলো এক নিষ্ঠুর চুরি। তার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, তার প্রিয় মানুষটি! সে কোনোভাবেই অন্য কারো হতে পারে না। নির্ণয়ের সমস্ত সত্তা চিৎকার করে বলছে: “আমি বেঁচে থাকতে দিয়া অন্য কারো হবে, এ হতে পারে না! কখনোই না, কোনোভাবেই না!” তার গাড়ির হেডলাইট যেন অন্ধকার ফুঁড়ে লক্ষ্যের দিকে ছুটছে, আর গন্তব্য হলো- এক হয় মিলন, নয় ধ্বংস।

আসরের সব আলো যেন এখন এক বিন্দুতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে দিয়ার ওপর। সম্মুখে গম্ভীর মুখে বসে আছেন ইমাম সাহেব, হাতের নথিপত্র আর পাশে বসা সাক্ষীরা। সবার দৃষ্টি এখন লালে মোড়া এই বধূর দিকে। প্রশ্নটি ভীষণ স্পষ্ট, অথচ আকাশ-পাতাল ভারী: “আপনি কি অমুককে আপনার স্বামী রূপে কবুল করলেন?”

ইমাম সাহেবের কণ্ঠস্বর ঘরে এক গাঢ় নীরবতা নামিয়ে আনলো। এই একটি শব্দই আজ নির্ধারণ করবে দিয়ার জীবনের গতিপথ। কিন্তু শব্দটি যেন তার কণ্ঠনালীতে এসে আটকে যাচ্ছে। দিয়ার চোখের পাতাদুটো কাঁপছে, আর হৃদয়ের ভেতরে শুধু একটাই নাম বাজছে- নির্ণয়”

ঘরের নীরবতা ততক্ষণে অস্বস্তিকর হয়ে উঠেছে। অনেকক্ষণ কেটে গেল… যা মনে হলো যেন অনন্তকাল। অবশেষে, এক শুকনো ঢোঁক গিলে দিয়া মাথাটি আরও নামিয়ে নিল। অত্যন্ত নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে শব্দটি উচ্চারিত হলো, যা কেবল তার কাছাকাছি থাকা মানুষেরাই শুনতে পেল। একটি শব্দ যা ফিরিয়ে আনার কোনো উপায় নেই, একটি শব্দ যা তার জীবনের সবচেয়ে বড় বিচ্ছেদকে সিলমোহর দিল:

“কবুল… আলহামদুলিল্লাহ।”

শব্দটি উচ্চারিত হলো। দিয়া চিরজীবনের জন্য অন্য কারো হয়ে গেলো। দিয়া কে তুলে দেওয়া হচ্ছে বরের গাড়িতে। ততক্ষণে নির্ণয় এসে পৌঁছালো তবে বড্ডো দেরি হয়ে গেছে যে, দিয়া গাড়িতে উঠে বসছে। নির্ণয় পিছু ডাকছে বারংবার। তবে নির্ণয়ের ডাক কারোরই কান অব্দি পৌঁছালো না বোধহয়। গাড়িটা সো সো শব্দ তুলে ছুটে চললো নিজ গন্তব্যে।

………….

গাড়ির ইঞ্জিনের ভয়ংকর গর্জন, বিয়ে বাড়ীতে থাকা সকলের কান্নারত কণ্ঠস্বর। সবকিছু যেন এক লহমায় ছিঁড়ে গেল। তীব্র আতঙ্কে চিৎকার করে ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে বসলো নির্ণয়। পরিবেশ শান্ত হলেও তার হৃদপিণ্ড তখনও তীব্র গতিতে ঢোলের মতো বেজে চলেছে। তার শরীর জুড়ে যেন হিমশীতল স্রোত বইছে! এই ঠান্ডার মধ্যেও সে ঘেমে একাকার। কপাল বেয়ে ঘামের রেখাগুলো যেন ছোট নদীর মতো অনবরত গড়িয়ে পড়ছে, যা তার অস্থিরতা ও আতঙ্ককে আরও প্রকট করে তুলেছে।

নির্ণয় চোখ রগড়ে চারপাশের পরিচিত আবছা আলোয় দৃষ্টি বুলিয়ে বুঝতে পারলো, এতক্ষণ যা দেখছিল, তা ছিল এক ভয়ংকর বিভ্রম, এক দুঃস্বপ্ন। চারপাশে তার নিজের ঘরের চেনা দেওয়াল, আসবাবপত্র, তবুও যেন স্বস্তি আসছে না। স্বপ্নটি এতটাই জীবন্ত ছিল যে, সেই দৃশ্য এখনো তার চোখের সামনে ভাসছে।

নির্ণয় কপালে স্লাইড করতে করতে ভাবলো এই স্বপ্নের মানে। সব ধরনের চিন্তার ঢেউ আছড়ে পড়ল তার মনে। এই স্বপ্ন, যেখানে দিয়া লাল শাড়িতে অন্যের জন্য ‘কবুল’ বলছে, এটা তো প্রথম নয়। আজ নিয়ে টানা দু’দিন সে একই ধরনের দৃশ্য দেখলো। স্বপ্নের রেশ তখনও কাটেনি, কিন্তু এই পুনরাবৃত্তির অন্তর্নিহিত অর্থ নির্ণয় করতে গিয়ে সে এক গভীর গোলকধাঁধায় পড়লো।

“এ কেমন স্বপ্ন? মনের গভীরের ভয়গুলো কি এভাবে দিনের পর দিন বাস্তব হয়ে ফিরে আসছে?”

এই অশুভ স্বপ্নের কি কোনো ইঙ্গিত আছে, নাকি এটি নিছকই মনের অত্যধিক দুশ্চিন্তার ফল? তা সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারলো না। শুধু একটি ভয়ংকর আশঙ্কা তার বুকের ভেতরে চেপে বসে রইলো।

…………..

কিছুক্ষণ পর খেয়াল আসতেই পাশ ফিরে তাকাতেই চোখ পড়লো খালি বিছানায়। এই গভীর রাতে দিয়া কোথায় গেল? দুঃস্বপ্নের গাঢ় রেশ তখনও লেগে আছে, আর এই শূন্যতা তার ভয়কে যেন আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠল।

নির্ণয় তাড়াহুড়ো করে বিছানা থেকে নেমে দ্রুত লাইট জ্বালালো। উজ্জ্বল আলোয় ঘর ভেসে গেলেও দিয়া নেই। আতঙ্কিত কণ্ঠে সে কয়েকবার দিয়াকে ডাকলো, কিন্তু তার কোনো সাড়াশব্দ নেই। নির্ণয়ের ভয় তখন চরম সীমায় পৌঁছে গেছে।

সে ধীরে পায়ে এগিয়ে গেল বারান্দার দিকে, যেখানে খোলা হাওয়ায় দোলনা পাতা। বারান্দায় যেতেই নির্ণয়ের দৃষ্টি আটকে গেলো। নির্ণয় দেখলো দিয়া দোলনায় শুয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন।

দৃশ্যটি দেখামাত্র নির্ণয়ের বুকের ওপর থেকে যেন একটি ভারী পাথর নেমে গেল। এতক্ষণের আতঙ্ক আর অস্থিরতা এক লহমায় শান্ত হয়ে এলো। সে অত্যন্ত ধীর পায়ে এগিয়ে গেল দোলনার দিকে। পাশে বসে ঘুমন্ত দিয়ার মুখের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। দুঃস্বপ্নের চাপ আর হারানোর ভয় তাকে গ্রাস করেছিল, আর সেই ভয় থেকে মুক্তি পেয়ে ভালোবাসার এক উন্মত্ত স্রোত অনুভব করলো সে। গভীর আবেগে, সে উন্মাদের ন্যায় দিয়ার সারা মুখে চুমু খেলো—কপালে, চোখে, গালে—যেন এই স্পর্শের মাধ্যমে সে নিশ্চিত হতে চাইল যে দিয়া একান্তই তার।

এরপর, অত্যন্ত আলতো হাতে দিয়াকে কোলে তুলে নিল। তার হাত এতটাই সাবধানী ছিল, যেন দিয়া কোনো কাঁচের পুতুল অথবা শিশির ভেজা কোমল পাপড়ি- একটু জোরে ধরলেই ভেঙে যাবে বা নষ্ট হয়ে যাবে। স্বপ্নের বিভীষিকা মুছে ফেলে, ভালোবাসার উষ্ণতা নিয়ে সে এগিয়ে গেল বিছানার দিকে।

দিয়াকে বিছানায় শুইয়ে দেওয়ার পর নির্ণয় নিজেও তার পাশে গা এলিয়ে দিল। সে তখনও ঘোরগ্রস্তের মতো ঘুমন্ত দিয়ার নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো এক ধ্যানে। নরম আলোর ছোঁয়ায় দিয়ার মুখমণ্ডল আরও স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে। নির্ণয় নিজের অজান্তেই যেন হিসাব কষছিল- সে মুখে যতই বলুক, দিয়াকে সে ভালোবাসে না, তার উপর কোনো অধিকার নেই। কিন্তু তার মন তো জানে, তার আত্মা তো অস্বীকার করতে পারে না, যে সে দিয়াকে ঠিক কতটা ভালোবাসে। সেই ভালোবাসা কোনো যুক্তি মানে না, কোনো অভিমান মানে না।

গভীর আবেগে আচ্ছন্ন হয়ে নির্ণয় আবারও আলতো করে দিয়ার কপালে চুমু খেলো। এই চুমু শুধু ভালোবাসা নয়, এটি ছিল তার মনের সমস্ত ভয় আর প্রতিজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। এরপর সে পরম আস্থায় ও আহ্লাদে দিয়াকে দুই হাতে বুকে টেনে নিল। নির্ণয় দিয়াকে এমন ভাবে জড়িয়ে ধরলো, যেন এই মুহূর্তে সে দিয়াকে নিজের বুকের ভেতরে ঢুকিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। যাতে কোনো স্বপ্ন, কোনো বাস্তব, কোনো তৃতীয় ব্যক্তি তাকে আর কেড়ে নিতে না পারে। দিয়ার অস্তিত্বের উষ্ণতা তার সমস্ত ভয়কে শান্ত করে দিল। দিয়াও যেন ঘুমের মধ্যেই নির্ভরতার টানে নির্ণয়ের বুকে আরও মিশে গেল।

নির্ণয় তা দেখে ঠোঁট এলিয়ে হাঁসলো। দিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো:

“তুমি শুধু আমার—এই চিরন্তন সত্যকে কোনো দুঃস্বপ্ন বা বাস্তবতায় বদলাতে দেব না আমি।”

#চলবে