#প্রনয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ২৫
অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫
দেখতে দেখতে ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে কেটে গেছে দীর্ঘ চারটি বছর। সময়ের হিসেবে এ কেবল কয়েক হাজার দিন আর মাস মাত্র, কিন্তু নির্ণয়ের জীবনে তা হয়ে উঠেছে এক অনন্ত অন্ধকার যাত্রা। দিয়াকে হারানোর পর তার ভেতরের মনুষ্যত্বটা যেন আজ এক জীবন্ত ধ্বংসাবশেষ। পৃথিবী তার স্বাভাবিক নিয়মে অনেকটা পথ এগিয়ে গেছে, কত শত মানুষের আসা-যাওয়া হলো, কিন্তু নির্ণয়ের জীবনে সেই চার বছর আগের ধূসর সন্ধাটা আর কাটে না।
এই দীর্ঘ সময়ে নির্ণয়কে চিনতে হলে কয়েকবার তাকাতে হয়। লম্বা, জট পাকানো বন্য হয়ে ওঠা দাড়ি! অগোছালো রুক্ষ চুল আর চোখের নিচে চার বছরের অনিদ্রার কালচে গভীর ছাপ। সবকিছু মিলে তাকে এখন আর মানুষ নয়, বরং এক নিঃশেষিত ছায়া বলে ভ্রম হয়। তার চোখদুটো এমন নিস্প্রভ, যেন বহু বছরের কান্নার স্রোত সেখানে শুকিয়ে গিয়ে স্থায়ী লবণের মরুভূমি তৈরি করেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর আর ভয়ংকর সত্য হলো- দিয়ার কবরের পাশ থেকে তাকে এই চার বছরেও আলাদা করা যায়নি। হাজারো দিন সে রোদে পুড়েছে, চার-চারটি বর্ষার বৃষ্টিতে ভিজেছে, রাতের হাড়কাঁপানো শীতে কুঁকড়ে পড়ে থেকেছে- তবু তার জায়গা বদলায়নি। কবরের পাশে বসে থাকলে তার মনে হয় দিয়া ঠিক তার পাশেই আছে; যেন অতল পৃথিবীর নিচ থেকে দিয়া তার নিঃশব্দ উপস্থিতি দিয়ে নির্ণয়কে চার বছর ধরে আগলে রেখেছে।
লোকজন প্রথম প্রথম অনেক আসত, বোঝাত—“জীবন তো বয়ে যায়, কতকাল আর এভাবে থাকবে?” কিন্তু সময়ের সাথে সাথে লোকজনও আসা কমিয়ে দিয়েছে। তারা বুঝে গেছে, নির্ণয়ের জীবন ঐ সাড়ে তিন হাত মাটির নিচেই সমাধিস্থ হয়ে গেছে। সে আর কিচ্ছু চায় না; কেবল চায় সেই নিস্তব্ধ কবরের পাশে মিশে থাকতে। কবরের ঠান্ডা মাটি ছুঁলে সে এখনো দিয়ার অস্তিত্ব টের পায়। শুধু ওপারের দুর্ভেদ্য নীরবতা ভেদ করে কোনো কথা আসে না।
এখন নির্ণয়ের দিন-রাতের একমাত্র পরিচয়, দিয়ার স্মৃতি, দুঃখে জমাট বাঁধা পাথর হয়ে যাওয়া এক হৃদয়, আর সেই নিঃশব্দ কবর। কেউ জানে না এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার শেষ কোথায়, শুধু মনে হয় নির্ণয় তার জীবনের সবটুকু প্রাণশক্তি দিয়ার সঙ্গে ওই মাটির নিচেই চার বছর আগে কবর দিয়ে এসেছে।
নির্ণয় আজ চার বছর ধরে এই মাটির স্তূপ আঁকড়ে পড়ে আছে। অথচ যখন দিয়া পাশে ছিল, তখন হয়তো সে ভাবতেও পারেনি জীবনটা এমন নিঃস্ব হয়ে যাবে। মানুষ বড় অদ্ভুত! দাঁত থাকতে যেমন কেউ দাঁতের মর্যাদা বোঝে না, প্রিয় মানুষটা পাশে থাকতেও আমরা তেমনি তার মূল্য বুঝতে পারি না। কিন্তু হীরা যখন হারিয়ে যায়, তখন মরুভূমির বালুকা রাশি হাতড়ে কী লাভ?”
******
তখন রাত প্রায় আটটা। চার বছরের ধুলোবালি মাখা শীর্ণ শরীর নিয়ে নির্ণয় দুই হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে দিয়ার কবর। অদূরের এক টঙের দোকান থেকে ভেসে আসছে গানের কয়েকটি লিরিক্স- কোনো অধীর সুরের করুণ টান।
নির্ণয় ধীরে চোখ তুলে তাকাল খোলা আকাশের দিকে। আকাশটাও সেদিন অদ্ভুত স্থির, অদ্ভুত নির্জন। আর ঠিক তখনই- সেই ভেসে আসা গানের সুর ধরে, হঠাৎ করেই নির্ণয় তার ফাটল ধরা ভাঙা গলায় গেয়ে উঠল:
“এই হৃদয়ে তুমি ছিলে ব্যথা ছিল না… হঠাৎ করে হারিয়ে গেলে- ফিরে এলে না।”
“এখন বন্ধু আমার রাতেরও আঁকাশ… ওর ঘরে তো আমার বসবাস।”
“বন্ধু আমার চাঁদের জোছনাআআ… এখন আমার কাঁদে না….
_______________
চারটি বছর শুধু মানুষের চেহারাই বদলে দেয়নি, বদলে দিয়েছে দুই পরিবারের চিরচেনা সেই হৃদ্যতাকেও। চার বছর সময়ের হিসেবে খুব বেশি না হলেও, খাঁন বাড়ি আর মোল্লা বাড়ির সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে ফেলার জন্য এই সময়টুকু ছিল যথেষ্ট। এক সময় যে দুই বাড়ির ভাব ছিল গলায় গলায়, তা আজ আর দেখা যায় না মোটেই।
খাঁন বাড়ির কেউই এখন আর ওদিকের মেঠো পথ মাড়িয়ে মোল্লা বাড়িতে যায় না। অথচ একটা সময় ছিল যখন এই দুই বাড়ির মানুষ একে অপরের হাঁড়ির খবর রাখত। দিয়ার মৃত্যুর পর সেই চেনা যাতায়াতটা ধীরে ধীরে ফিকে হতে হতে এখন একদমই বন্ধ। সম্পর্কের সেই মধুর টান এখন আর নেই; মাঝখানে কেবল জমে আছে একরাশ পাহাড় সমান নীরবতা আর অব্যক্ত কিছু অভিমান।
মোল্লা বাড়ির কেউও এখন আর ওদিকটায় ভিড়ে না ভুলেও। দিয়া বেঁচে থাকতে নির্ণয় তার ওপর যে অমানুষিক অত্যাচার আর নির্যাতন চালিয়েছিল, তা মোল্লা বাড়ির প্রতিটি সদস্যের হৃদয়ে গভীর ক্ষত করে দিয়ে গেছে। সেই ঘৃণার কারণেই আজ খাঁন বাড়ির ছায়া মাড়াতেও তাদের গা রি রি করে ওঠে। যদি ভুল করেও রাস্তায় একে অপরের মুখোমুখি হয়, তখন আগের মতো প্রাণখোলা হাসি বা কুশল বিনিময় হয় না। খাঁন বাড়ির লোকজনকে দেখলে মোল্লা বাড়ির মানুষের চোখে ফুটে ওঠে একরাশ ঘৃণা আর ধিক্কার, যার ভয়ে খাঁন বাড়ির লোকজন অপরাধবোধে মাথা নিচু করে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। দুই পরিবারের সেই আত্মার বন্ধন এখন কেবল নামমাত্র টিকে আছে।
মোল্লা বাড়ির মানুষগুলো ভাবে, এই যে নির্ণয় আজ কবরের পাশে পড়ে মরছে, এ আসলে তার কৃতকর্মের ফল। যে দিয়াকে সে জীবিত অবস্থায় একটু শান্তি দেয়নি, আজ মরে যাওয়ার পর তাকে ফিরে পাওয়ার জন্য এই আর্তনাদ এক নিদারুণ পরিহাস ছাড়া আর কিছুই নয়।
________________
এদিকে নদীও যেন বদলে যাওয়া সময়ের এক শান্ত সাক্ষী। চার বছর আগের সেই চঞ্চল, জেদি আর একগুঁয়ে নদীকে এখন আর খুঁজে পাওয়া দায়। যে নদী আগে নিজের পছন্দমতো সব পাওয়ার জন্য ঘর-বাড়ি মাথায় তুলত, যাকে কোনো কিছুতে না বলা ছিল দুঃসাধ্য, আজ সেই মেয়েটিই এক শান্ত ছায়ায় পরিণত হয়েছে।
মেয়েটা এখন আর আগের মতো জোরজবরদস্তি করে কোনো কিছু পাওয়ার চেষ্টা করে না। জীবন তাকে এক কঠিন শিক্ষা দিয়েছে- সবকিছু চাইলেই পাওয়া যায় না, আর যা জোর করে পাওয়া যায়, তার মাঝে কোনো সুখ থাকে না। দিয়ার মৃত্যু আর দুই পরিবারের এই ধ্বংসস্তূপ দেখে সে নিজের সবটুকু অহংকার আর জেদ বিসর্জন দিয়েছে। বাড়ির কেউ যখন যা বলে, সে বিনা বাক্যে তা মেনে নেয়। তার সেই হাসাহাসি, অকারন পাগলামি এখন কেবলই অতীত স্মৃতি।
নদীর এই পরিবর্তন বাড়ির সবাইকে অবাক করলেও কারো মুখে কোনো রা নেই। সে এখন সংসারের সব কাজ নিঃশব্দে করে যায়, মায়ের ওষুধের কথা মনে করিয়ে দেয়, বাবার বিষণ্ণ মুখে একটু হাঁসি ফুটানোর চেষ্টা করে প্রতিনিয়ত। তার চোখের সেই চপলতা হারিয়ে গিয়ে সেখানে এখন খেলা করে এক গভীর স্থিরতা। সে বুঝে গেছে, জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান জিনিসগুলো যখন হারিয়ে যায়, তখন জীবনের আর কোনো মানেই থাকেনা। আগের সেই জেদি নদী আজ সময়ের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে এক শান্ত মোহনায় এসে দাঁড়িয়েছে।
নেওয়াজ মোল্লা পুরোপুরি সুস্থ হলেও। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন রুহানি বেগম, আগের মত এখন আর কিছু মনে রাখতে পারেন না। সেকেন্ডেই ভুলে যায় সব। তাই বাড়ির সকল দায়িত্ব এখন নদীর ঘাড়ে।
নেওয়াজ মোল্লা এই চার বছরে ভুল করেও কথা বলেননি নদীর সাথে। তার কাছে এই মেয়েটা তার আদরের মেয়ের হত্যাকারী। খুনি এই মেয়েটা। তিনি হাজার বার হাজার ভাবে নদী কে কটুক্তি করে কথা বলেছেন। তবে নদী টু শব্দ অব্দি করেনি। তাই তিনিও এখন শান্ত নদী হয়ে গেছেন।
_________________
রাত তখন প্রায় ১১ টা ছুঁই ছুঁই।
হঠাৎ করেই কবরস্থানের নির্জনতা ভেঙে ভারী বুটের শব্দ শোনা গেল। নির্ণয় তখনও দিয়ার কবরের ওপর মাথা রেখে ফুপিয়ে কাঁদছে। আগন্তুকের ছায়া নির্ণয়ের ওপর পড়তেই সে চমকে মুখ তুলল। দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছে দিয়া।
দিয়া কে দেখে চমৎকার হাঁসলো নির্ণয়। তবে দিয়ার চোখেমুখে এখন আর আগের সেই স্নেহ নেই, সেখানে ঠাঁই করে নিয়েছে এক বিষাক্ত অবজ্ঞা। নির্ণয়কে এই অবস্থায় দেখে দিয়া বিদ্রূপের হাসি হেসে উঠল।
“কী হয়েছে মিস্টার নির্ণয়? খুব তো ভালোবাসা দেখাচ্ছেন! এই হাহাকার, এই লোকদেখানো কান্না কার জন্য? এই আমার জন্য? যাকে আপনি বেঁচে থাকতে প্রতিটা মুহূর্তে নরক যন্ত্রণা দিয়েছিলেন?”
নির্ণয় কোনো উত্তর দিতে পারল না। দিয়ার প্রতিটা শব্দ চাবুকের মতো তার বুকে গিয়ে লাগছে। দিয়া চিৎকার করে ফের বলল-
“আপনার এত নাটক’ লোক দেখানো ভালোবাসা’ নিজের এই হাল’ কবরের মাটি আঁকড়ে পড়ে থেকে কী প্রমাণ করতে চান? আপনি খুব ভালোবাসতেন আমায়? ধিক্কার জানাই আপনার এই ভালোবাসাকে!”
নির্ণয় ধরা গলায় শুধু বলল, “আমি……আমি জানি আমি অপরাধী। কিন্তু আমি আর পারছি না…”
“পারবেন না কেন? আপনাকে পারতে হবে! আপনাকে তিলে তিলে মরতে হবে, ঠিক যেমন ভাবে আমি গুমরে গুমরে মরেছি।”
বাক্য শেষ করে দিয়া আর এক মূহুর্ত দাঁড়ালো না। গটগট করে হেঁটে মিলিয়ে যেতে থাকলো অন্ধকারে। নির্ণয় আকুল কন্ঠে পিছু ডাকলো-
“আল্লাহর দোহাই লাগে আমাকে এভাবে একা রেখে যেওনা, আমি যে আর পারছি না। ফিরে এসো প্লীজ যেওনা। শুনো… শুনো… দাঁড়াও…!!
নির্ণয় উঠে ছুটলো দিয়ার পিছু। তবে দিয়াকে ধারার আগেই দিয়া অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। নির্ণয় ধপ করে বসে পড়লো মাটিতে, আকাশের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল-
“আর কত? আর ঠিক কতকাল এই অগ্নিকুণ্ডে জ্বললে আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে? আর কত নিদারুণ শাস্তি পাব আমি? এই যন্ত্রণার কি তবে কোনো শেষ নেই? আমি যে ক্লান্ত বড্ড ক্লান্ত..!!
#চলবে

