Home "ধারাবাহিক গল্প প্রণয়ের অন্তরমহল প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-২৪

প্রণয়ের অন্তরমহল পর্ব-২৪

0
560

#প্রণয়ের_অন্তরমহল
#তাহরিশমিতা_মুনতাহা
#পর্বঃ২৪

⚠️ অনুমতি ব্যতীত কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

“কি হয়েছে আন্টি? আর আপনারা সবাই এখানে দাঁড়িয়ে কেনো?

আশা বেগম কাঁদতে কাঁদতে কোনো রকমে বললেন-

“নির্ণয়… নির্ণয় ঘরে…….

বাকি টুকু আর বলতে হলো না, ‌ওয়াহিদ যা বুঝার বুঝে গেছে। ও আশা বেগমের হাত টা ছেড়ে দরজায় কড়াঘাত করে ডাকল-

“নির্ণয়… এই নির্ণয় দরজা খোল! এ ভাই দরজা খোল নয়তো কিন্তু দরজা ভেঙ্গে ভেতরে আসবো।

উঁহু ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ এলো না। এতক্ষণ করা ধুড়ুম ধুড়ুম শব্দ টাও বন্ধ হয়ে গেছে। ওয়াহিদ দরজায় লাথি দিতে দিতে ফের বলল-

“নির্ণয় দরজাটা খোল, নয়তো কিন্তু সত্যি সত্যি আমি দরজা ভেঙ্গে ভেতরে আসবো।

তবুও ভেতর থেকে কোনো উত্তর এলো না।
ভেতরটা নিস্তব্ধ, যেন কোনো এক অশুভ নীরবতা ঘরটাকে গিলে খেয়েছে। ওয়াহিদ আর ঝুঁকি নিল না; শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে পরপর দুটো লাথি বসিয়ে দিল দরজায়। ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে কব্জা উপড়ে দরজাটা যখন মেঝেতে আছড়ে পড়ল, সেই বিকট শব্দেও নির্ণয়ের কোনো সাড়া মিলল না।

সবাই যখন হুড়মুড়িয়ে ঘরের ভেতর ঢুকল, সামনের দৃশ্য দেখে আতঙ্কে প্রত্যেকের রক্ত হিম হয়ে গেল। মেঝেতে কালচে রক্তের সমুদ্র, আর তারই এক কোণে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে আছে নির্ণয়। দুই হাঁটুর ওপর হাত রাখা, চোখ দুটো বন্ধ। রক্তমাখা সেই নিথর অবয়ব দেখে বোঝার উপায় নেই সে বেঁচে আছে নাকি চিরতরে হারিয়ে গেছে।

আশা বেগম চিৎকার করে ছেলের দিকে এগিয়ে গিয়ে দপ করে বসলেন ছেলের পাশে। মুখটা নিজের দুই হাতের আজলায় এনে বেকুল কন্ঠে ডাকলেন-

“নির্ণয়, বাবা, এই ..

নির্ণয় মায়ের ডাকে সাড়া দিল না। চোখ দুটো বন্ধ তখনও। ওয়াহিদ হাঁটু গেড়ে বসে নরম গলায় ডেকে বলল-

“নির্ণয়, এই নির্ণয় অনেক হয়েছে তোর এই ড্রামা নে চোখ খোল এবার।

নির্ণয় তবুও চোখ মেলে তাকালো না। কেমন ঢলে পড়ছে শরীর টা। ওয়াহিদ বিপদের আশঙ্কা টের পেয়ে প্রিয়ার উদ্দেশ্যে বলল-

“ড্রাইভার কে বলো গাড়ি বের করতে, আমি ওকে নিয়ে আসছি। যাও হারিয়াপ”

প্রিয়া কাঁদতে কাঁদতে ছুটলো ড্রাইভারের কাছে। পেছন পেছন নির্ণয় কে নিয়ে আসলো ওয়াহিদ। নির্ণয় কে ব্যাক সিটে বসিয়ে আশা বেগম ওয়াহিদ নিলা মিলা সহ আরও দুটো গাড়ি ছুটলো হসপিটালের উদ্দেশ্যে।

__________________

দুবাই মূল শহর থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শান্ত ও নিরিবিলি পাহাড়ঘেরা শহর হাত্তা। সেখানকার পাহাড়ের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা নামকরা এক রেস্টুরেন্টে বসে আছেন এক রহস্যময় ব্যক্তি। তাঁর সারা শরীর কালো পোশাকে আবৃত, যা চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে এক অদ্ভুত বৈপরীত্য তৈরি করেছে।

কানে ফোন গুঁজে তিনি কারো সঙ্গে কথা বলছেন, তবে তাঁর দিক থেকে কোনো শব্দ নেই। ফোনের ওপাশ থেকে এক ব্যক্তি নিরন্তর আকুতি জানিয়ে বলে যাচ্ছেন-

“ফিরে এসো! ওর অবস্থা একেবারেই বেগতিক। ওকে এই অবস্থায় দেখলে সত্যি খুব মায়া হয়। অনেকদিনই তো হলো, আর কত? এবার অন্তত চলে এসো, নয়তো ও শোকে শোকে নির্ঘাত মরে যাবে!”

ওপাশের করুণ আর্তি কানে পৌঁছালেও কালো পোশাকধারী মানুষটির অভিব্যক্তিতে কোনো পরিবর্তন এল না। তিনি কোনো উত্তর দিলেন না। ধীরস্থিরভাবে কান থেকে ফোনটা নামিয়ে কলটি কেটে দিলেন। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে এক চিলতে বিদ্রূপের হাসি হাসলেন, যাতে মায়ার চেয়ে নিষ্ঠুরতাই প্রকাশ পেল বেশি।

এরপর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। বিল মিটিয়ে দিয়ে ধীরপায়ে বেড়িয়ে এলেন রেস্টুরেন্ট থেকে। আজ বোধহয় বেক্তিটি একটু বেশিই খুশি কেননা তার ঠোঁট থেকে হাঁসি সরছে না কিছুতে।

__________________

নেওয়াজ মোল্লার শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হওয়ায় হাসপাতাল থেকে তাঁকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে মানুষটি একসময় পুরো বাড়ি মাতিয়ে রাখতেন, তিনি যেন এখন অন্য এক মানুষ। শরীর সুস্থ হলেও মনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ের ছাপ স্পষ্ট। তিনি এখন আর তেমন কারও সাথে কথা বলেন না। দিনের অধিকাংশ সময় বারান্দার চেয়ারে পাথরের মূর্তির মতো চুপচাপ বসে থাকেন। উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন বাইরের ধূসর আকাশের দিকে, যেন সেখানে হারিয়ে যাওয়া কোনো স্মৃতি খুঁজে বেড়াচ্ছেন।

অন্যদিকে নদীও যেন অচেনা হয়ে গেছে। সেই চঞ্চলতা, সেই অকারন হাসাহাসি আর পাগলামি- সবই এখন অতীত। আগের মতো সেই প্রাণোচ্ছ্বল মেয়েটি এখন এক শান্ত আর নির্বাক ছায়ায় পরিণত হয়েছে। তার জেদ নেই, মান-অভিমান নেই; বাড়ির কেউ যখন যা বলে, সে বিনা বাক্যে তা মেনে নেয়। প্রতিবাদ করার শক্তিটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সে।

তবে নদীর চেহারার দিকে তাকালে বুক ফেটে যায়। আগের তুলনায় সে অনেকটাই শুকিয়ে গেছে। সুন্দর ভরাট চেহারাটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ- বোধহয় রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটে তার। চোখের সেই উজ্জ্বলতা হারিয়ে গিয়ে সেখানে এখন খেলা করে এক গভীর শূন্যতা।

আশা বেগমও যেন নিজেকে এক অদৃশ্য দেয়ালে বন্দী করে নিয়েছেন। দিয়াকে হারানোর শোকে তিনি পুরোপুরি দিশেহারা। প্রিয় সন্তানের মৃত্যু তাঁকে এতটাই পাথর করে দিয়েছে যে, তিনি এখন নদীর সাথেও তেমন কোনো কথা বলেন না। নদী কদাচিৎ কোনো প্রয়োজনে ডাকলেও তিনি ঠিকমতো সাড়া দেন না। বাড়ির প্রতিটা কোণে এখন শোকের নিস্তব্ধতা। একেকটা মানুষ যেন একেকটা নিঃসঙ্গ দ্বীপে পরিণত হয়েছে, যেখানে দুঃখ ছাড়া আর কোনো ভাষা নেই।

___________________

রক্তাক্ত অবস্থায় নির্ণয়কে যখন হাসপাতালে নিয়ে আসা হলো, কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে দেখেই শিউরে উঠলেন। চিকিৎসার চেয়েও তিনি যেন বেশি অবাক হলেন নির্ণয়ের উদাসীনতা দেখে। ড্রেসিং করার সময় ডাক্তার তাকে অনেকগুলো কড়া কথা শোনালেন, জীবনের মূল্য নিয়ে, এমন অবিবেচকের মতো কাজ করার পরিণাম নিয়ে অনেক উপদেশ দিলেন। কিন্তু নির্ণয় যেন এক পাথরের মূর্তি। ডাক্তারের কোনো তিরস্কার বা প্রশ্নই তার কানে পৌঁছাল না। সে কোনো জবাব দিল না, এমনকি যন্ত্রণায় একটা উফ শব্দ পর্যন্ত করল না। শূন্য দৃষ্টিতে জানালার ওপাশে তাকিয়ে সে চুপচাপ সব শুনে গেল।

হাতের ব্যান্ডেজটা শেষ হওয়ার মিনিট খানেক পরেই সে বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। ডাক্তার তাকে আরও কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু নির্ণয় কারো কোনো বারণ মানল না। শরীরটা প্রচণ্ড দুর্বল, পা দুটো টলছে, কিন্তু মনের ভেতর একটা তীব্র তাগিদ তাকে স্থির থাকতে দিচ্ছে না।

হাসপাতাল থেকে বেরিয়েই সে ছুটল নির্জন সেই কবরস্থানের দিকে। মনের গহীনে বারবার একটা কথাই বাজছে—’একবার দিয়ার কবরের কাছে যাওয়া উচিত।’ দিয়ার কবরের পাশে না গিয়ে তার এই অস্থিরতা শান্ত হওয়ার নয়। ব্যান্ডেজ করা হাতটা বুকের কাছে আগলে ধরে টলমল পায়ে সে এগিয়ে চলল। চারপাশে মানুষের কোলাহল, যানবাহনের শব্দ, সবই তার কাছে আজ অর্থহীন। তার সমস্ত পৃথিবী এখন গিয়ে থমকে আছে ওই কয়েক হাত মাটির নিচে, যেখানে দিয়া চিরনিদ্রায় শায়িত।

*******

দিয়ার মৃত্যুর পর ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে কয়েকমাস পার হয়ে গেছে। পৃথিবী তার আপন নিয়মে চলছে, চারপাশের ব্যস্ততাও কমেনি একটুও। কিন্তু নির্ণয় যেন সেই প্রথম দিনের ওই অভিশপ্ত মুহূর্তটাতেই থমকে দাঁড়িয়ে আছে। তার জীবনে সময় আর এগোয়নি।

কয়েকমাস আগের সেই চঞ্চল নির্ণয় আর আজকের এই নির্ণয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাত। শরীরের ক্ষত শুকিয়ে দাগ পড়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু মনের ভেতরটা আজও সেই প্রথম দিনের মতোই রক্তাক্ত। প্রতিদিন বিকেলের আলো যখন ম্লান হয়ে আসে, শহরের ব্যস্ততাকে পেছনে ফেলে সে ঠিক পৌঁছে যায় কবরস্থানের সেই নির্জন কোণটায়, যেখানে দিয়া শুয়ে আছে।

শহরের মানুষ হয়তো দিয়াকে ভুলে গেছে, এমনকি বাড়ির লোকেরাও শোকের পাথর বুকে নিয়ে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে, কিন্তু নির্ণয় বদলায়নি। রোজ নিয়ম করে সে দিয়ার কবরের পাশে গিয়ে বসে। কখনো চুপচাপ চেয়ে থাকে মাটির দিকে, কখনো বা বিড়বিড় করে না বলা জমানো কথাগুলো বলে যায়। তার কাছে এই কবরটাই এখন একমাত্র গন্তব্য, এই মাটিটুকুই তার বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন।

বৃষ্টি হোক কিংবা তপ্ত রোদ, নির্ণয়কে সেখানে দেখা যাবেই। যেন সে আজও বিশ্বাস করে, দিয়া তাকে শুনতে পাচ্ছে। তার এই একগুঁয়ে ভালোবাসা আর অন্তহীন শোক দেখে পথচারীরাও দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সবাই ভাবে সময় সব ঠিক করে দেয়, কিন্তু নির্ণয় প্রমাণ করে দিচ্ছে যে, কিছু কিছু শোক সময়ের চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী।

#চলবে