#প্রণয়ের_সূচনা
#লেখিকা_Nazia_Shifa
#পর্ব_২২
____________________________
রুম জুড়ে নিরবতা,বিছানায় বসে আছে প্রণয়, তার কিছু টা দূরে দাঁড়িয়ে আছে ইরা আর সূচনা। বিগত বিশ মিনিট ধরে এই পরিস্থিতিতে ই আছে তারা।নিরবতার অবসান ঘটলো ইরার প্রশ্নে।
–‘ভাইয়া আমরা কী সত্যি সত্যি চলে যাব।
ইরার চাপা,ভারী কণ্ঠ। তার প্রশ্নের উত্তর দিল না প্রণয়।ইরা আবার প্রশ্ন করল-
–‘ভাইয়া আমরা কী আব্বুর,,,,
মুখের প্রশ্ন মুখেই থাকল ইরার।প্রণয় ঝট করে তাকালো তার দিকে। আঁখি জোড়া যেন জলন্ত তার,চোখ দিয়ে ই ভস্ম করে দিবে ইরাকে।ইরা কেঁপে উঠলো তার দৃষ্টি দেখে।সাথে সাথে পিছিয়ে গেল দু কদম। সূচনার আড়াল হলো না কিছু। সেই প্রশ্নের পর প্রণয়ের চোখমুখ একেবারে শক্ত, গম্ভীর রূপ ধারণ করেছে,ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে সে। সূচনা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো তার দিকে।ইরার মুখশ্রীতে ভ/য়ের ছাপ।ভীত মুখশ্রীতে বারবার আড় চোখে দেখছে প্রণয়কে। সূচনা বুঝে উঠতে পারলনা কিছু। ইরা তার বাবার কথা বলায় প্রণয়ের এমন দৃষ্টির মানে কী? এ পর্যন্ত প্রণয়ের মা/য়ের কথা শুনলেও বাবার কথা নিয়ে তেমন আলোচনা হয়নি,এ প্রশ্ন টা আগে থেকেই ছিল তার মনে, এবার গাঢ় হলো আরও।
মিসেস আফিয়া হন্তদন্ত হয়ে রুমে আসলেন।প্রণয়ের পাশে বসে তার হাত ধরে কড়া গলায় শোধালেন –
–‘কেউ কোথাও যাবে না।আমি এই বিষয়ে আর কোনো কথা শুনতে চাইনা।
সূচনা আর ইরা প্রণয়ের মুখ পানে তাকালো।মিসেস আফিয়া কাঁদতে কাঁদতে বললেন-
–‘তুই কী চাস আমি এখন তোকে অনুরোধ করি? আমি তাতেও রাজি কিন্তু আমার ছেলে মেয়েরা কোথাও যাবে না,আমি যেতে দিবনা।
প্রণয় নিশ্চুপ রইলো পুরোটা সময়। মিসেস আফিয়া একের পর এক কথা বলেই যাচ্ছেন।
_________________________________
–‘ আফিয়া তুমি কি তোমার সিদ্ধান্তেই অটল থাকবে?তারা সত্যি আসবে না? ব্যাপারটা কেমন দেখায় না?
বিছানায় বসে ছিলেন মিসেস আফিয়া,তখনই প্রশ্ন টা করলেন ইসহাক সাহেব। মিসেস আফিয়া রুদ্ধ কণ্ঠে জবাব দিলেন –
–‘ আমার মেয়ের বিয়ে, তার বিয়ে তে তার মা-বাবা,ভাই-ভাবি,বোনরা উপস্থিত আছি সেটা কি যথেষ্ট না?
–‘তবুও।
–‘আমি আর এ বিষয়ে কথা বলতে চাইনা,তাদের আনা হলে তারা আবার কথা বলবে আমি চাইনা ওরা আর কোনো কথা শুনুক।এই ভুল কয়েকবার করেছি আর না।
ইসহাক সাহেব বললেন না আর কিছু। কিন্তু মনে মনে খুশি হলেন। তার বোনের ছেলে মেয়ে প্রণয় আর ইরা। আজকাল এমন কয়জন স্ত্রী আছে যারা নিজের স্বামীর মৃত বোনের ছেলেমেয়েদের নিজের সন্তানের মতো আগলে রাখে।সত্যি ই তো ওনার ভাগ্য ভালো যে মিসেস আফিয়া কে নিজের স্ত্রী হিসেবে পেয়েছেন।দাড়ানো ছিলেন উনি,মিসেস আফিয়ার পাশে যেয়ে বসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন একহাতে।মুচকি হসলেন দুজনই।
_____________________________
দিনা আর তিথি গোমরা মুখ নিয়ে বসে আছে প্রণয়ের রুমে।বিছানার দুপাশে দুজন দু দিকে মুখ ঘুড়িয়ে রেখেছে। মূলত রা/গ করেছে তারা প্রণয়ের সাথে,তার চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে। ক্লান্ত শরীর নিয়ে রুমে ঢুকতেই দর্শন হলো গোমরা মুখ দু’টো।ভ্রু কুচকে তাকিয়ে রইলো প্রণয়।সে জানে তাদের এখানে এভাবে বসে থাকার কারণ।আজকে প্রথম না, যখন যখন এরা দু’জন প্রণয়ের ওপর রা/গ করেছে তখন তখনই এভাবে তার রুমে গোমরা মুখ নিয়ে বসে থেকে রা/গের প্রকাশ করেছে।প্রণয় তাদের সামনে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো-
–‘ কী হয়েছে মুখ এমন পে/চার মতো করে রেখেছিস কেন?এমনিতেই তো দুটা দেখতে পে/ত্নীর মতো এখন আরও ভয়ংক/র লাগছে।
তিথি কথা বললো না, দিনা ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললো –
–‘ বাই এনি চান্স তুই যদি আমার ছোট হতি না, তাহলে দিনের মধ্যে একবার হলেও কানের নিচে দিতাম তোর।শুধু ছোট দেখে কিছু বলতে পারিনা।নিজেকে একেবারে মহান মনে করে, সব কিছু সেক্রি/ফাইস করে দিবে মানুষের জন্য, মানুষের ভালো চিন্তা করে।এহহহ আসছে,, শখ কত মহান সাজতে আসে।
দিনার কথা শুনে নিঃশব্দে হাসলো প্রণয়। দুজনের মাঝে যে ফাকা জায়গাটুকু সেখানটা দখল করে বসে পড়ল সে।দিনা আর তিথির দু হাত নিজের হাতের মাঝে নিয়ে কোমল স্বরে বললো-
–‘যাইনি তো, যাবনা।কিন্তু তোরা এমন ভাব করছিস যেন চলে গেছি।
–‘ আর কখনো বলবেনা যাওয়ার কথা, প্রমিজ করো।
প্রণয়ের সামনে আরেক হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললো তিথি। প্রণয় হাতের ওপর হাত রেখে বললো-
–‘প্রমিজ বলব না আর।
দুইজন দুইদিক দিয়ে জড়িয়ে ধরলো প্রণয়কে।
–‘আমরা বাদ গেলাম কেন?
দরজার কাছে দাড়িয়ে আছে মিহু আর ইরা।অভিমানী কণ্ঠে কথাটুকু বললো মিহু।তিনজন মুচকি হেসে ইশারা করল তাকে।তারাও এসে জড়িয়ে ধরল দুদিক থেকে। ভাই বোনের সুন্দর, মিষ্টি এক মূহুর্তের সাক্ষী হলো দরজার আড়ালে দাড়ানো সূচনা। মিহু, ইরার পেছনে পেছনে ই এসেছিল সে।অথচ তাদের সে খেয়াল ই নেই।সূচনা মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইলো তাদের দিকে। কত সুন্দর মূহুর্ত।সে এই মুহূর্ত পায়নি নিজের আঠারো বছরের জীবনে,সেটা নিয়ে আক্ষেপ ছিল তার এক আকাশ সমান। কিন্তু কী করার,তবে এই মূহুর্তটা দেখতে ভালো লাগছে তার।
______________________________
সন্ধ্যা সাতটা। ড্রয়িং রুমের এক পাশ টা বিশেষভাবে সাজানো হয়েছে।মেহেদীর সমস্ত কার্যক্রম এখানেই হবে। লাল,গোল্ডেন আর কালো রঙের ম্যাট বিছানো ফ্লোরে। তার পেছনে লাল রঙের নেটের উপরে লাল,কমলা,সবুজ রঙের আর্টিফিশিয়াল ফুল,লতা-পাতার ছড়াছড়ি। একপাশে হলুদ রঙা আর্টিফিশিয়াল সূর্য মুখী ফুল নিচ থেকে উপরে উঠে গেছে। গোল্ডেন রঙের মরি/চ বাতি ও জ্ব/লছে।মাঝ বরাবর দু পাশে হলুদ রঙের ময়ূর এর পাখার মতো কিছু, যার মধ্যিখানে বসে আছে দিনা।টকটকে লাল রঙের শারারা তার পড়নে যাতে গোল্ডেন রঙের কারুকার্য শোভা পাচ্ছে। অর্নামেন্টস এর মধ্যে আছে কানে দুল আর মাথায় টিকলি মতো।যেন একদম লাল পরীর মতো লাগছে।তার দু হাতে মেহেদি পড়িয়ে দিচ্ছে দুজন-ইরা আর তৃণা। তৃণা দিনার বান্ধবী।দিনার বন্ধু-বান্ধব খুব একটা নেই। দুই একজন ই আছে আর তারাই নাকি ক্লোজ ফ্রেন্ড তার।তিনজন এসেছে তারা তৃণা সহ। বাকি দুজন হচ্ছে মুনতাহা আর তাসনিন। থিম অনুযায়ী সবার পড়নেই সবুজ রঙের লং কুর্তি সাথে ডিপ পিংক কালারের সালোয়ার আর ওড়না। বাদ যায়নি সূচনা ও। সবার মতো তার পড়নেও সবুজ রঙের লং কুর্তী,ডিপ পিংক কালারের সালোয়ার আর ওড়না। চুল গুলো খোঁপা করা তাতে বেলী ফুলের গাজরা।সাজার ক্ষেত্রে ফাউন্ডেশন, কন্সিলার,হাইলাইটার সবই স্থান পেয়েছে মুখে।তবে নরমাল সজ্জা,অত ভারি না।পো/ড়া জায়গায় ফো/সকা পড়ে গেছে এখন।কোথাও একটু লাগলেই জ্ব/লে উঠছে।তাই হাতে মেহেদি দিবে না বলেই ঠিক করেছে সে। রুম থেকে বের হবার আগে মিসেস দিশার সাথে কথা হয়েছে সূচনার।বিয়ের দিন আসবেন তারা।এই কয়দিনে ইরাদ সম্পর্কে কোনো কথা সে বলেনি,না জিজ্ঞেস করেছে তার কথা,আজকেও করেনি। ইরাদ ও চেষ্টা করেনি কিছু করার,হয়তো করেছে,হয়তো না।কে জানে? সে খবর নেয়ার প্রয়োজন বোধ করেনি। সেই বিকেলের পর প্রণয়কে দুই নয়নে দেখা হয়নি আর। তন্ময় এসেছে আজকে, চট্টগ্রাম গিয়েছিল সে।চট্টগ্রাম থেকে সোজা এখানে এসেছে। ফ্রেশ হয়ে খেয়ে -দেয়ে এখন প্রণয়ের সাথে। আজকেও এসব নিয়ে আলোচনা করতে হবে?আশ্চর্য, তার বোনের বিয়ে অথচ সে অফিসের কাজ নিয়ে পড়ে আছে।অদ্ভুত মানুষ। মিসেস আনহা চলে গেলেও নিহা আর নিষাদ কে আবার রেখে গিয়েছেন। তিথি,মিহু,মুনতাহা,তাসনিন,তনয়া, নিহা আর ফিহা সবাই দিনার সাথেই আছে।সবাই ব্যস্ত মেহেদী নিয়ে। সূচনা একবার সেখানে গিয়ে আবার চলে এসেছে। নিহার মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে সে বিরক্ত।আশ্চর্য, বিরক্ত হলে আসতে কে বলেছিল, ঢং।মনে মনে ডজন খানেক কথা নিহাকে বলেছে সূচনা।ফিহা আর তনয়া দুজন ই মিষ্টি, কিউট একেবারে। তনয়া ক্লাস নাইনে আর ফিহা এবার এসএসসি দিয়েছে।নিহা অনার্স প্রথম বর্ষে পড়ছে,কিছুদিন পর ই হয়তো তার ফাইনাল পরীক্ষা, কথায় কথায় মিসেস আফিয়ার কাছ থেকে শুনেছিল সূচনা। নিষাদ,, এই ছেলেটাকে কেন যেন সূচনার কাছে ভালো ঠেকছে না। তার চাহনি কেমন যেন অদ্ভুত, গায়ে কা/টা দেয়ার মতো। মেয়েরা নাকি দৃষ্টি দেখেই বুঝতে পারে কে তার দিকে কোন নজরে তাকাচ্ছে। সূচনার কাছে এই মূহুর্তে তেমনই মনে হচ্ছে। নিষাদ এসেছে সন্ধ্যার একটু আগে,অফিস শেষ করে। সূচনার সাথে এখন ও তার কথা হয়নি তবে চোখাচোখি হয়েছে কয়েকবার। আসার পর থেকেই ড্রয়িং রুমে বসেছিল নিহার সাথে। কাজের জন্য রান্নাঘর থেকে ড্রয়িং রুমে কয়েকবার আসতে হয়েছে সূচনাকে। অপ্রত্যাশিত ভাবে দুবার চোখাচোখি হয়ে গেছে দুজনের।সূচনা অপ্রস্তুত হয়ে সাথে সাথে চোখ সরিয়ে নিলেও এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল নিষাদ,একটু নড়চড় করে নি। কোনো অপ্রস্তুত ভাব ও ছিল না তার মধ্যে।
___________________________________
–‘স্যার তার সন্ধান পাওয়া গেছে অবশেষে।
তন্ময়ের কথা শুনে বা’কা হাসল প্রণয়। জিজ্ঞেস করলো-
–‘ এতদিন কোথায় ছিলেন জনাব?
–‘ দেশের বাইরে ছিলেন, দেশে এসেছেন দুই বছর আগে মিরপুর ****** হসপিটালে ছিলেন, দেশে এসেই নাকি হসপিটাল চেঞ্জ করেছেন।বর্তমানে চট্টগ্রামে **** হসপিটালে আছেন।
–‘ দ্যাট মিন’স এখন আবার চট্টগ্রাম উড়া/ল দিতে হবে।
–‘জ্বি স্যার কিন্তু এখন তো যাওয়া সম্ভব না আর ওনার কেস টা টাফ। একটু সাবধানে, ভেবে চিন্তে করতে হবে।
–‘ তুমি জানো তোমার কী করতে হবে,এম আই রাইট?
–‘ জ্বী স্যার।
–‘গুড। আর শোনো ওই প্রেজেন্টেশন টা রেডি তো? মাত্র দুইদিন সময় আছে হাতে।
–‘ জ্বি স্যার রেডি আছে।
–‘ পারফেক্ট, এখন চলো।
–‘জ্বি স্যার।
________________________________
–‘তুমি আমার মেহেদী নষ্ট করলে কেন?
ক/র্কশ গলায় ইরাকে কথাটা বলল নিহা। দিনার মেহেদী দেয়া শেষ হলে নিহা নিজেই আসে ইরার কাছে মেহেদী দিতে। ইরা রাজি হতে চায়নি আবার না ও করতে পারলনা।মেহেদী দেয়া শেষ হলে সেখান থেকে উঠতেই নিলেই ইরার মনে হলো কেউ তার ওড়না টেনে ধরেছে যার দরুন হোঁচট খেয়ে পড়তে পড়তে বাঁচে ইরা।কিন্তু তার হাত যে কোনোভাবে ই নিহার হাতে লাগেনি সে সম্পর্কে ও নিশ্চিত ইরা।তাহলে ন/ষ্ট হলো কীভাবে?
–‘কী হলো কথা বলছ না কেন? ইচ্ছে করে ই করেছ তাই না? একটু মেহেদী পড়তে এসেছি,দিয়ে দিয়েছ আবার ন/ষ্ট ও করে দিলে।দিনাপু তুমি কিছু বলবে না।
কথার সাথো ন্যা/কা কান্না জুড়ে দিল নিহা।দিনা কিছু বলার আগেই মিহু বললো-
–‘কী বলবে? এমন ন্যা/কা কান্না করছ কেন? এটা অরগ্যানিক মেহেদী নষ্ট হয়েছে মু/ছে ঠিক করে দিবে। এত সিন ক্রিয়েট কেন করছ? ইরা তো ইচ্ছে করে করেনি।
–‘তুমি মাঝে কথা বলছ কেন?
–‘ মুখ আছে কথা বলবই।
–‘তোরা থাম প্লিজ।ইরা তুই রুমে যা এখন অনেকক্ষণ বসেছিলি এবার একটু হাটাহাটি কর আর নিহা তুই লেপ্টে যাওয়া জায়গাটুকু টিস্যু দিয়ে মুছে ফেল তৃণা ঠিক করে দিবে। দয়া করে কাহিনি করিস না আর নিহা।(দিনা)
–‘দিনাপু তুমি আমাকে কেন বলছ?
–‘দিনাপু কারো বোধহয় ঝ/গড়া করার শখ জেগেছে।
চুপ থাকতে বলো না হয় ঝ/গড়া লাগতে সময় লাগবে না।(মিহু)
নিহা কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু বলতে পারল না।রা/গে ফুসফুস করতে চলে গেল।
_______________________________
–‘তুমি হাতে মেহেদী লাগাও নি কেন?
দিনার মেহেদী কার্যক্রম শেষ হয়েছে একটু আগেই।রুমে আসতেই প্রশ্ন করল প্রণয়।সূচনা মুখ বা’কিয়ে বললো-
–‘সারা দিনে কোনো খবর ছিল না আর এখন আসছে মেহেদী লাগাও নি কেন? হুহ।
প্রণয় হাসল কিঞ্চিৎ ঠোট প্রসারিত করে। বললো-
–‘ কেউ কি আমার এটেন্শন চাচ্ছে। এখন ফ্রী আছি সারারাত এটেন্শন দিব। চাইলে আসতে পারে।
–‘বয়েই গেছে আপনার এটেন্শন পেতে।
–‘প্রশ্নের উত্তর দাও।মেহেদী লাগাও নি কেন?
–‘হাতে ফোস/কা পড়েছে।
–‘দেখি
সূচনার হাত ধরতে গেলেই হাত সরিয়ে নিল সূচনা।বললো-
–‘দেখবেন কেন?কিছু হয়নি, বেশি লাগেনি।
–‘ অভিমান করেছে দেখা যায়। কাহিনি কি?
–‘কিসের অভিমান? কিসের কাহিনি?
–‘জানো তো মানুষ তার সাথেই অভিমান করে যার ওপর তার অধিকার থাকে।অবশ্য আমার ওপর তোমার অধিকার আছে সম্পূর্ণ,অধিকার আদায় করে নিলেই হয়।
জবাবে কিছু বলল না সূচনা। আসলেই তো সে কী সত্যি ই অভিমান করেছে?কিন্তু কেন?অধিকার বোধ থেকে?
ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা মেহেদীর কোণ বের করে সূচনার সামনে বসে পড়লো প্রণয়।সূচনার ডান হাতটা ধরে বললো-
–‘দেখি হাতটা।
শক্ত করে ধরেছে প্রণয়, এবার আর ছাড়াতে পারলনা সূচনা।ফোন বের করে গুগল থেকে মেহেদীর ডিজাইন বের করে চুজ করল দুইটা।
.
প্রায় এক ঘন্টা লাগল প্রণয়ের দুই হাতে মেহেদি পড়াতে। পুরোটা সময় সূচনা অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল প্রণয়ের দিকে।বাম হাতের ডিজাইনটুকু পো/ড়া জায়গাটুকু স্পর্শ করে নি।তার নিচেই ইতি ঘটেছে ডিজাইনের।সূচনা জিজ্ঞেস না করে পারলোনা। অবাক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
–‘আপনি মেহেদী দেয়া শিখলেন কিভাবে?
–‘ছোট বেলায় ইরাকে দিয়ে দিয়েছিলাম একবার,তখন অবশ্য অত পারতামনা।তার পরের ঈদে ইরাকে দিয়ে দেয়ার পরে,দিনা ও জেদ ধরল, ওকে ও দিয়ে দিয়েছি। এরপর থেকে প্রতি ঈদে একটু হলেও ওদের হাতে আমার মেহেদী দিয়ে দিতে হয়।
–‘আচ্ছা, আমি দিতে পারিনা।
–‘সমস্যা নেই,,এবার থেকে তোমাকেও দিয়ে দিব।এখন চুপ করে বসে থাকো,একটুও নড়বে না,রং গাঢ় না হলে খবর আছে।আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।
ল/ক্ষী মেয়ের মতো মাথা নাড়ালো সূচনা। চলে গেল প্রণয়। সূচনা হাসছে, কোনো এক অজানা কারণেই খুশি লাগছে তার।নতুন অনুভূতি একেবারে, নিজের স্বামীর হাত থেকে মেহেদী পড়েছে সে।
#চলবে
#প্রণয়ের_সূচনা
#লেখিকা_Nazia_Shifa
#পর্ব_২৩
___________________________
–‘ভাবী তোমাকে মেহেদী লাগিয়ে দিল কে?তুমি না বললে মেহেদী লাগাবে না।
দিনার রুমে আসতেই তিথি সূচনার হাত দেখে উক্ত প্রশ্নটা করে বসল।সূচনা কী উত্তর দিবে খুজে পেলনা।প্রণয় দিয়ে দিয়েছে সেটা সবার সামনে বলতে পারবেনা নাহয় ল/জ্জা দিয়ে একেবারে শেষ করে দিবে বজ্জা/ত মেয়েগুলো। দেখে দেখে ননদ ও পেয়েছে কয়টা,একেবারে ল/জ্জার ‘ল’ ও যেমন নেই।
–‘প্রণয় ভাইয়া দিয়ে দিয়েছে তাই না সূচি থুক্কু ভাবিইই। বাহ রং তো সুন্দর ই হবে, অবশ্য হওয়ার ই কথা বর নিজে তার বউকে মেহেদী পড়িয়ে দিয়েছে।
সূচনা মুখ ফুটে না বললেও মিহু ঠিকই বলে দিল।শুরু হয়ে গেছে তাদের নির্ল/জ্জা মা/র্কা কথা বার্তা।সূচনা দেরি করল না আর মিসেস আফিয়ার দেয়া চুনরি টা দিনাকে দিয়ে ছু/টে বের হলো যেন রুম থেকে।
দিনার রুম থেকে আসতে নিলে তারাহুরোয় ধা/ক্কা লাগল শক্তপোক্ত কোনো জিনিসের সাথে।পড়তে পড়তে বাঁচলো সূচনা। সামনে কোনো জিনিস না স্বয়ং দাড়িয়ে আছে নিষাদ।সূচনার বাম হাতটা নিষাদের হাতে বন্দী।চ/মকে উঠলো সূচনা,যার থেকে দূরত্ব বজায় রাখবে বলে ঠিক করেছে তার সাথেই এমন পরিস্থিতিতে পড়তে হলো।হাত ছাড়িয়ে এক প্রকার ছিট/কে সরে গেল সূচনা।নিষাদের ঠোটের কোনায় বা’কা হাসি,অদ্ভুত চাহনি।তার চাহনি তে সূচনা কেঁপে উঠলো খানিক।আর কোনো দিকে না তাকিয়ে বড় বড় পা ফেলে সোজা এগোলো রুমের দিকে।রুমে এসে দরজা লক করে বেড সাইড টেবিল থেকে পানির গ্লাস নিয়ে এক বারে শেষ করে ফেলল পুরোটা।ধপ করে বসে পড়লো বিছানায়,তার কপাল বেয়ে চি/কন ঘামের রেখার অবস্থান। সেই ছোয়া,চাহনি তাকে এক পুরোনো, বিষাদময় স্মৃতির দাড় প্রান্তে নিয়ে গেল আবার। কিন্তু ডুব দিতে পারলনা সেই অন্ধকারে। তার আগেই প্রণয়ের গলার স্বর।
–‘এভাবে ঘামছ কেন?কী হয়েছে? খা/রাপ লাগছে।
তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সূচনা পাল্টা প্রশ্ন করলো-
–‘আপনি এতক্ষণ কোথায় ছিলেন?
–‘ব্যালকনিতে ছিলাম।তোমার কী হয়েছে?
–‘ওহ
প্রণয়ের প্রশ্ন এড়াতে চেষ্টা করেও পারলনা সূচনা।আবার প্রশ্ন করলো প্রণয়।
–‘কী হয়েছে তোমার?
সূচনা জোরপূর্বক হেসে বললো-
–‘কিছু না, দিনাপুর রুম থেকে তাড়াহুড়ো করে এসেছি তো তাই একটু ঘেমে গিয়েছি।
প্রণয় কেমন যেন বিরক্তিমাখা চাহনি নিক্ষেপ করলো যার মানে বুঝল না সূচনা।প্রণয় কড়া কণ্ঠে শোধালো-
–‘ব্যালকনিতে আসো।
প্রণয়ের দিকে না তাকিয়ে ই আমতা আমতা করে সূচনা বললো-
–‘আমাার ভালো লাগছে না,ফ্রেশ হয়ে ঘুমাব। আপনি যান।
কিছু বলল না প্রণয়, তার চোখ রাঙা নিতেই সূচনা উঠে দাড়ালো,চলে গেল তার পিছন পিছন ব্যালকনিতে।
______________________________
–‘আর কতক্ষণ বসে থাকব এভাবে?
ব্যালকনির ফ্লোরে বসে বিরক্তি সাথে ক্লান্তি মাখা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো সূচনা। প্রণয় তার পাশেই বসা।দীর্ঘ এক থেকে দেড় ঘন্টা যাবৎ এভাবেই বসে আছে তারা। প্রণয়ের কোলে ল্যাপ্টপ, আঙুলগুলো যেন ট্রেনের গতিতে চলছে কী-বোর্ডে। সূচনা আবার তার প্রশ্ন টা করলো-
–‘আর কতক্ষণ বসে থাকব এভাবে? আপনি আপনার কাজ করছেন, আমার কাজ নেই কোনো আমাকে যেতে দিন।
পূর্বের থেকে এবার সূচনার কণ্ঠ ছিল কিছু টা উদাস।প্রণয় এখানে বসিয়ে রেখেছে কেন, সেই প্রশ্নের জবাব খুজতে যেয়ে তখনকার ঘটনাটা মাথা থেকে বেড়িয়ে গেছে আপাদত।সূচনার প্রশ্ন শুনে প্রণয় ল্যাপটপ বন্ধ করে পাশে রেখে তার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-
–‘কী হয়েছে? কোনো সমস্যা?
সূচনা হালকা করে ওপর নিচ করলো মাথা। প্রণয় সহসা জিজ্ঞেস করলো-
–‘কী সমস্যা?
সূচনার নত দৃষ্টি।সহসা উত্তর দিতে পারলনা সে,ইতস্তত করতে করতে নিচু স্বরে বললো-
–‘ মে’য়ে’লি সমস্যা।
সূচনার জবাব দিতে দেরি প্রণয় তার ডান হাত ধরে বললো-
–‘চলো।
সূচনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
–‘কোথায় যাব?
–‘চলো আগে,,উঠো।
সূচনার হাত ধরেই তাকে রুমে নিয়ে আসলো প্রণয়।কাবার্ডের সামনে দাড় করিয়ে দিয়ে হাত ছেড়ে দিলো।কাবার্ড খুলে সামনে থেকে ঝোলানো কয়েকটা কাপড় সরাতেই দেখা গেল দু’টো স্যানি/টারি ন্যাপকি/নের প্যাকেট,একটা পলিথিন ব্যাগ ভর্তি চিপস আর চকলেট। সূচনার চোখ সেই দুটো প্যাকেটের ওপরই। তার মানে প্রণয় জানে,কিন্তু কিভাবে?মস্তিষ্কে কড়া নাড়লো প্রশ্নটা। সহসা কোনো উত্তর দাড় করাতে পারল না সে।জিজ্ঞেস ও করতে পারবেনা।লজ্জা লাগছে তার এমন পরিস্থিতি তে পড়ে। যদিও পি/রিয়ড এর বিষয় টা মোটেও ল/জ্জার কোনো বিষয় না। সবার সঠিক জ্ঞান থাকা উচিত।
প্রণয় পুনরায় চলে গেল ব্যালকনিতে।যাওয়ার আগে সূচনার দিকে তাকিয়ে বললো-
–‘ নিজের প্রয়োজন নিজে বুঝে নিতে শিখো।
মিনিট পাচেক থম মে’রে দাড়িয়ে থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল সূচনা।
সূচনা ওয়াশরুম থেকে বেরোনোর পর দেখল প্রণয় বিছানায়,হেলান দিয়ে বসে আছে। গুটিগুটি পায়ে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল সূচনা। তার দিকে একনজর তাকিয়ে শোয়ার জন্য উদ্যত হলো প্রণয়।সূচনা তড়িৎ গতিতে বললো-
–‘শুনুন
প্রণয় সহসা বললো-
–‘বলো
আমতা আমতা করতে করতে সূচনা বললো-
–‘আসলে,, আপনি
–‘আমি কী?
–‘আপনি কীভাবে জানলেন এই সময়ে আমি চকলেট,চিপস এগুলো,,
–‘মিহু বলেছে প্লাস আই হেভ অলসো থ্রী সিস্টার্স আর তাদের অবস্থা ও এমন। তাই জানাটা অত বিশাল ব্যাপার না।
–‘আপনি কিভাবে জানলেন যে,,
–‘সেটা বড় কথা না,,বড় কথা হচ্ছে তুমি বলো নি।তুমি কি বিয়েটাকে সিরিয়াসলি নিচ্ছ না?
প্রণয়ের কণ্ঠে গাম্ভীর্যের ছাপ।সূচনার বু/ক ধ্ব/ক করে উঠলো প্রণয়ের করা প্রশ্নে। সে তড়িৎ গতিতে বললো-
–‘ আপনি এভাবে বলছেন কেন? আমি তো বলেছিলাম আমার সময় লাগবে একটু।
প্রণয় ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললো –
–‘সময় তো দেয়া হচ্ছে, দিব।আমরা একসাথে থাকছি, আমাকে স্বামী হিসেবে মানতে তোমার সময় লাগবে এট লিস্ট বন্ধু তো মানতে পারো। নাহয় কোন বেসিস এ থাকছি একসাথে?আমরা স্বামী -স্ত্রী সেই বেসিসে, কিন্তু তোমার তো সময় লাগবে সেই সম্পর্ক মানতে।তাহলে কী করব বলো।
সূচনা জবাব দিতে পারলনা কোন।চুপ করে তাকিয়ে রইলো নিচের দিকে। প্রণয়ের এমন ব্যবহার তার কাছে নতুন।এই কয়দিনে তো একবারও তার সাথে উচ্চ স্বরে কথা বলেনি।তাহলে আজকে এত রে/গে আছে কেন?
অন্য দিকে ফিরে মিনিট পাচেক এর মতো চুপ করে রইল প্রণয়।তারপর সূচনার দিকে ঘুরে নরম স্বরে বললো-
–‘ শোনো,একটা মেয়ের যখন বিয়ে হয়ে যায় তখন সে কোথায় থাকে?শশুর বাড়ী,কারণ সেটাই তখন তার ঠিকানা হয়।হ্যা তার বাবার বাড়ীর পরিবার আছে কিন্তু তখন শশুর বাড়ীর পরিবারটাই তখন তার বেশি আপন করে নিতে হয়।তোমাকে বিয়ে করেছি আমি,তোমার শশুর বাড়ী এটা।এখানকার লোকজন ও তোমার আপন। তাদের প্রয়োজন-অপ্রয়োজন,পছন্দ -অপছন্দের খেয়াল রাখার পাশাপাশি নিজের দিকটাও খেয়াল রাখতে হবে।আর সেটা নিজেরই রাখতে হবে। নিজের ভালো নিজেরই বুঝতে হয়, সবাই সবসময় থাকেনা।তুমি যার দরুন এই পরিবারে এসেছ সে ও একসময় থাকবেনা তাই এখন থেকেই শিখে নাও।
সূচনা চট করে তাকালো প্রণয়ের দিকে।যার দরুন সে এখানে এসেছে সে ও একসময় থাকবে না।কথাটা বুঝতে সমস্যা হয়নি তার। কোনো এক অজানা ভয়ে ই বু/কের ভেতর মোচ/ড় দিয়ে উঠলো তার। প্রণয় সূচনার দিকেই তাকিয়ে আছে।সূচনার ব্যথাতুর দৃষ্টি, বা’কা হাসি আনল প্রণয়ের অধরে। আর কথা বাড়ালো না প্রণয়।বললো-
–‘কী করবে ভেবে নিও।এতক্ষণ তোমার পিরিয়ডের ব্যাপারটা না বলার শাস্তিস্বরূপ ই আমার সা/থে বসিয়ে রেখেছিলাম। এখন ঘুমাও।
সূচনা কিছু বলতে নিলেই প্রণয় মুখে আঙুল দিয়ে চুপ করতে ইশারা করলো।সূচনা আর কিছু বললো না তাই।
শুয়ে পড়ল দুজনই।প্রণয়ের দিক পিঠ করে শুয়েছে সূচনা।মাঝে প্রতিদিনের মতো একটা কোল/বালিশ দেয়া।সূচনা ঘুমায়নি,ঘুম ধরা দিচ্ছে না তার চোখে।আচ্ছা প্রণয় কী ঘুমিয়ে গেছে? প্রশ্ন টা আসতেই ভাবল উঁকি দিয়ে দেখবে। যেই ভাবা সেই কাজ। পাশ ফিরে তাকাতেই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল সূচনা। তার দিকে ফিরেই শুয়েছে প্রণয়।তার গভীর উন্মুক্ত নয়ন জোড়া।অন্ধকারে আবদ্ধ হলো দুজন দুজনের দৃষ্টিতে।
______________________________
বেলা গড়িয়ে অনেক এখন।সকাল থেকে দুপুর আর দুপুর পেড়িয়ে এখন বিকেল। সারাদিন কাজে কাজেই পেরিয়েছে সবার। কাজের ফা/কে অবশ্য সূচনার খবর নিতে ভুলেনি প্রণয়। হাত পরিষ্কার করে অয়েন্টমেন্ট ও লাগিয়ে দিয়েছে।সকাল আর দুপুর এর খাবারটা একসাথেই খেয়েছে সবাই।দিনার এই বাড়ির মেয়ে হিসেবে শেষ মূহুর্তগুলো যেন সুন্দর হয় তার প্রয়াস। তারপরে আসবে তবে তখন এ বাড়ির মেয়ে হওয়ার পাশাপাশি কারো বাড়ির বউ ও হবে তার আরেকটা পরিচয়।মাঝে সকালে ঘটে গেছে এক ঘটনা।সেটা হাস্যকর নাকি লজ্জাজনক বলা দায়।দিনার জন্য কিছু গিফ্ট পাঠিয়েছিল জাওয়াদ।ডেলিভারি বয় বাসায় পোঁছে দেয়ার পর তা প্রথম হাতে পড়ে মিহুর।দুষ্টুমির ছলে সেই গিফ্টের প্যাকেটের সাথে একটা চিঠি জুড়ে দেয় সে।তবে সেটা যেই সেই চিঠি না।বা/সর রাতে দিনার সাথে চন্দ্র বিলাস,বারান্দাবিলাস,গল্প করা,তার চুলে হাত বুলিয়ে দিবে,তাদের প্রেমকাহিনী, সব প্রেমপত্র আরও কত কি।সব লিখে দিয়েছে একেবারে।দুর্ভাগ্যক্রমে সেটা যেয়ে পড়েছে ইসহাক সাহেব এর হাতে।কিন্তু ওনার প্রতিক্রিয়া ছিল শূণ্য।তবে মিসেস আফিয়ার চোখে ঠিকই পড়েছে,মুচকি হাসছিলেন উনি।মিসেস আফিয়া যখন জিজ্ঞেস করলেন –
–‘কী হয়েছে?
ইসহাক সাহেব কিছু টা নিচু স্বরে বললেন-
–‘আমাদের সময়ের কথা মনে পড়ে গেল।চিঠি লিখতাম কত এক জন আরেকজনকে।এভাবেই তো প্ল্যান করতাম এটা করব, সেটা করব। রঙিন সময় ছিল কত।
মিসেস আফিয়া ও তখন লজ্জা মিশ্রিত হাসি দিয়েছেন।
_______________________________
–‘এটা কী পড়েছো?
হলুদের জন্য তৈরি হচ্ছিল সূচনা।তার পড়নে মেরুন রঙের গাউন। সেটা দেখেই প্রশ্ন করলো প্রণয়।সূচনা ভ্রু কুচকে পাল্টা প্রশ্ন করলো-
–‘কেন কী হয়েছে? ভালো দেখাচ্ছে না?
–‘না সুন্দর লাগছে,কিন্তু এটা পড়বে না।
কাবার্ড থেকে একটা ব্যাগ সূচনার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো-
–‘এইটা পড়বে, যাও চেন্জ করে আসো।কুইক
–‘কী এটা?
–‘আমার মাথা।
–‘আচ্ছা খু/লে দিন তাহলে।
–‘কী খু/লে দিব?
–‘কেন মাথা।
–‘বেশি কথা বলো কেন?যাও চেঞ্জ করে আসো।
–‘আমি চেন্জ করতে পারবনা এখন।
–‘যাবে না?
–‘নাহ।
প্রণয় চুপ থাকল কিছুক্ষণ।তারপর বললো –
–‘আমি কি চিন্তা করেছি জানো।
সূচনা উৎসুক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-
–‘কী?
–‘এটাই যে তুমি আমার কথা না শুনলে আর আমার মুখের ওপর কথা বললে ব্যালকনি থেকে ছু/ড়ে ফেলে দিব।দোতলা থেকে পড়লে বিশেষ কোনো ক্ষতি হবে না।শুধু হাত-পায়ে ব্যথা পাবে,ভে/ঙেও যেতে পারে।এই তো।
–‘ভ/য় দেখাচ্ছেন?
–‘আরে না,,আমি তো ওয়া/র্নিং দিলাম।তাড়াতাড়ি যাও ঘটনা ঘটাতে আবার সময় লাগবে না আমার।
রা/গে দাঁত কিড়মিড় করতে করতে প্রণয়ের দেয়া শপিং ব্যাগটা নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুক/লো সূচনা।
পার্পল কালার এর গাউন, তার মধ্যে হাতে গোল্ডেন রঙের কাজ করা,সাথে গোল্ডেন রঙের ওড়না। এতক্ষণ ক্যাচ/ক্যচ করলেও জামাটা বেশ পছন্দ হয়েছে তার।এই জামা পড়ার পর প্রণয় যখন দেখবে তখন কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে? নিজের মাথায় নিজেই চাটি মা/রল সূচনা।মনে মনে বললো –
–‘ইদানীং কী সব উল্টা পাল্টা ভাবছিস?মাথা টাথা গেছে একেবারে।
ওয়াশরুম থেকে বের হবার পর সূচনা উৎসুক দৃষ্টি রাখলো প্রণয়ের দিকে। কিন্তু প্রণয় কিছু ই বললো না।তার হাতে আরেকটা ব্যাগ ধরিয়ে দিয়ে নিজের জামাকাপড় নিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেল।অবাক না হয়ে পারলনা।মনে মনে গু/ষ্টি উদ্ধার করে হাতের ব্যাগটা খু/ললো।এক মুঠো বেগুনি রঙের কাচের চূড়ি,সাথে গোল্ডেন রঙের মোটা চূড়ি একটা,গোল্ডেন রঙের হিজাব, আর আংটি । মুচকি হাসলো সূচনা। প্রণয়ের দেয়া দ্বিতীয় উপহার এটা। তার পছন্দ মতো।সবকিছু নিয়ে রেডি হতে বসলো সে।
মিনিট তিরিশেক পরই ওয়াশরুমের দরজা খুলে গেল,পার্পল কালারের পাঞ্জাবি পড়া প্রণয় বেড়িয়ে এলো।হলদেটে ফর্সা রঙে পার্পল কালার টা খুব মানিয়েছে।হুট করে খেয়াল হলো সে আর প্রণয় একই রঙ পড়েছে।তাহলে কি প্রণয় ইচ্ছে করে করেছে এমনটা?ওয়াশরুম থেকে বেড়িয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মতো করেই রেডি হচ্ছে প্রণয়।সূচনা আড় চোখে তাকাচ্ছে তার দিকে। আচ্ছা সে এখানে বসে আছে কেন? হুট করেই মনে হলো তার কথাটা।আসলেই তো এখানে বসে আছে কেন? সে আসুক তার মতো, তাকে তো আর বলেনি অপেক্ষা করতে।সূচনা বিছানা থেকে উঠে যাওয়া ধরলেই প্রণয় কড়া গলায় বললো –
–‘চুপচাপ বসে থাকো।আমার হয়নি এখনো।
প্রণয়ের কড়া কণ্ঠ পেয়ে আর কিছু বললো না সূচনা। প্রায়,দশমিনিট এর মাথায় প্রণয় বললো-
–‘চলো ল্যাভেন্ডার।
সূচনা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলো। প্রণয় সূচনার ওপর ঝুঁকে তার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো-
–‘পার্পেল কালারে একদম ল্যাভেন্ডার লাগছে, ইচ্ছে করছে ফুলদানিতে সাজিয়ে রাখি।
প্রণয়ের ফিচেল কণ্ঠে বলা উক্তি।প্রণয়ের খোচাখোচা দাড়িগুলো সূচনার গা/লে লাগছে,মৃদু ব্যথা লাগলেও শিহরিত হলো সমস্ত কায়া।আখি জোরা বন্ধ থাকা অবস্থাতেই মন গহীনে উকি দিল কিছু ভাবনা। সে আর প্রণয় দুজনই পার্পল কালার পড়েছে, তাদের যদি একটা মেয়ে থাকত তাহলে তাকেও নিশ্চয়ই পার্পল কালারের ড্রেস ই পড়াতো।তখন তাদের পরিবার হতো ল্যাভেন্ডার পরিবার।আচ্ছা তার মেয়ের নাম কী হতো?”প্রাণ?” #প্রণয়ের_সূচনা সূচনার প্রাণ?
–‘যাবে না আমি চলে যাব?
ঘোর ভাঙ/লো সূচনার।প্রণয় সোজা হয়ে দাড়িয়ে আছে তার সামনে।একটু আগের ভাবনার কথাগুলো মনে পড়তেই সূচনা কুঁকড়ে গেল। কীসব ভাবছিলো সে?উদ্ভট সব ভাবনা। মেয়ে আবার মেয়ের নাম ও ভেবে ফেলেছে।হুমায়ূন আহমেদ এর বৃষ্টিবিলাস এর শামার মতো অবস্থা হয়ে গেছে তার।যদিও শামা বিয়ে না হতেই মেয়ের কথা ভাবছিল আর তার তো বিয়ে হয়েছে তাও।
–‘গেলাম আমি
–‘আরে দাড়ান আমি আসছি তো।
–‘ফাস্ট।
–‘হু।
পাশাপাশি দুজন পা বাড়ালো রুম থেকে বেরোতে।সূচনার ভাবনা অনুযায়ী ল্যাভেন্ডার পরিবার না হলেও ল্যাভেন্ডার কপোত-কপোতী লাগছে তাদের।
_________________________
–‘আপনি এখানে কী করছেন?দরজা লক করেছেন কেন?
রুমে একাই ছিল সূচনা।বাকিরা সবাই ব্যস্ত ছাদে, ছেলে পক্ষ থেকে দিনার জন্য হলুদ নিয়ে এসেছে জাওয়াদ এর কয়েকটা কাজিন।সবাই এখন ছাদেই তাদের নিয়ে ব্যস্ত।ফোন নিতে রুমে এসেছিল সূচনা।তখন তাড়াহুড়ায় নিতে ভুলে গিয়েছিল। দরজা লক করার শব্দে পেছনে ঘুরতেই দেখল দরজার সামনে নিষাদ দাড়িয়ে আছে।ঠোঁটে শয়/তানি হাসি তার।সূচনার তাকে দেখতে নিকৃ/ষ্ট লাগছে এই মুহূর্তে।ভয়ে বু/ক কা/পছে সূচনার।সূচনার প্রশ্ন শোনার পরে নিষাদ আস্তে
আস্তে এগোতে লাগল তার দিকে। সূচনা কাপ/ছে থরথর করে।চোখের সামনে স্পষ্ট হচ্ছে কিছু দৃশ্য।সেই দৃশ্য গুলো স্পষ্ট হওয়ার সাথে ঝাপসা হতে লাগল তার দৃষ্টি।
#চলবে
#প্রণয়ের_সূচনা
#লেখিকা_Nazia_Shifa
#পর্ব_২৪
____________________________
হলুদের অনুষ্ঠানের আয়োজন ছাদেই করা হয়েছে। সবাই ছাঁদেই আছে।প্রণয় সূচনার সাথে আসলেও এখন মেহমানদারি তে ব্যস্ত। সূচনা তিথি,মিহু,তৃণাদের সাথে বসে আছে।ফিহা, তনয়া ও আছে সাথে।নিহা কোথায় কে জানে? এই দুইদিনে দুইটা জিনিস খেয়াল করেছে সূচনা।নিহা আর নিষাদের মধ্যে সখ্যতা বেশি,কিন্তু ফিহা টা একটু অন্যরকম।নিহা কিছুটা গা/য়ে পড়া স্বভাবের ও।ছেলে দেখলেই রং বদলে যায়।ব্যাপারটা মোটেও ভালো লাগে নি সূচনার।মেয়ে হয়ে ছেলেদের সাথে এত কী?আশ্চর্য!সূচনা সহ বাকি সব মেয়েরাই পার্পল কালারের শাড়ী পড়েছে সবাই।সূচনা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো-
–‘তোমরা না বললে লাল রঙের শাড়ী পড়বে?
মিহু হাসতে হাসতে বললো-
–‘গা/ধী তুই কিছু কিনতে চাচ্ছিলা না তাই ভাইয়া ইচ্ছে করে এমন করেছে,লাল রঙের শাড়ীর ব্যাপরটা ও মিথ্যা যাতে তোর সন্দেহ না হয়।
মিহুর কথা শুনে সূচনা আরেক দফা অবাক হলো। স্টেজে বসে আছে দিনা। লাল,হলুদ আর গোল্ডেন রঙের সংমিশ্রণ শোভা পাচ্ছে শাড়িতে। শুভ্র ও হলুদ রাঙা ফুলে সজ্জিত সে। একে একে সবাই হলুদ লাগাচ্ছে দিনাকে।প্রণয়কে আর চোখে পড়েনি সূচনার। মিহু,তিথি,তৃণা, তাসনিন সবাই ব্যস্ত ছবি তুলতে।ফিহা,ইরা আর তনয়া আছে সূচনার সাথে।
–‘ভাবি তোমাকে সুন্দর লাগছে অনেক।
পাশ থেকে কথাটুকু বললো তনয়া।সূচনা হালকা হাসল, বললো-
–‘থ্যাঙ্কিউ পাখি,, তোমাকেও সুন্দর লাগছে অনেক, কিউউট পাখি।
–‘ তোমার ফোন কোথায়, চলো ছবি তুলি একটা।
–‘আমার ফোন তো রুমে,এখানে নিয়ে আসিনি।
–‘আমারটা দিয়ে তুলো।(ইরা)
–‘আচ্ছা আমি নিয়ে আসি সমস্যা নেই। (সূচনা)
–‘ঠিক আছে যাও।(ইরা)
চেয়ার থেকে উঠে ছাদের দরজার সামনে আসতেই চোখ আটকে গেল সূচনার। চিলেকোঠার ঘরের সাথে লাগোয়া ছোট্ট একটা ঘর।ঘর বললে ভুল হবে, সূচনার কাছে সেটাকে কোনো পুরাতন পরিত্যক্ত কুঠরির মতো লাগছে। এই বাড়িতে আসার পর আজ প্রথম ছাঁদে এসেছে সে।বিকেলে ও এসেছিল কিন্তু তখন তো চোখে পড়েনি। ছাদের ওপাশ থেকে এদিকটার কিছু দেখা যায় না চিলেকোঠার কারণে।
–‘আপনি এই হানে কি করতাসেন আম্মা?তাত্তারি যান আব্বা দেখলে রা/গ করব।
আচমকা কারো কণ্ঠ পেয়ে সূচনা চ/মকে উঠল কিঞ্চিৎ। পাশে তাকাতেই দেখল ফিরোজা খালার ভীত মুখশ্রী। উনি আবার ও তাড়া দিয়ে বললেন-
–‘আম্মা যান এই হান থেকা। যান যান।
সূচনা ভ্রু কুটি করে জিজ্ঞেস করলো-
–‘কেন খালা কী হয়েছে?
–‘ আব,,ব কি হবে কি,,, কিছু না।আপনি যান তো।আর শোনেন এই দিকে আইবেন না বেশি।
–‘কেন? কোনো বিশেষ নিষেধা/জ্ঞা আছে?
–‘হ্যা ধরেন তাই।আসবেন না, ঠিক আছে?
সূচনা হালকা করে মাথা ঝা/কিয়ে নামতে লাগল সিঁড়ি দিয়ে। তার সন্দেহ হচ্ছে ফিরোজা খালার কথা শুনে। প্রণয় রা/গবে কেন? কী আছে সেখানে?খট/কা লাগছে তার। সিড়ি দিয়ে নামার সময় ই দেখল চারজন কম বয়সী ছেলে আর দুটো মেয়ে।একটা মেয়ের হাতে হলুদের ডালা। বুঝল তারা জাওয়াদের বাড়ি থেকে এসেছে হয়তো।হয়তো তার কাজিন।ভাবতে ভাবতেই ফুরোলো ছাদের সিড়ি।
______________________________
–‘আপনি এখানে কী করছেন?দরজা লক করেছেন কেন?
রুমে একাই ছিল সূচনা।বাকিরা সবাই ব্যস্ত ছাদে, জাওয়াদ এর বাড়ি থেকে দিনার জন্য হলুদ নিয়ে এসেছে জাওয়াদ এর কয়েকটা কাজিন।সবাই এখন ছাদেই তাদের নিয়ে ব্যস্ত।ফোন নিতে রুমে এসেছে সূচনা। দরজা লক করার শব্দে পেছনে ঘুরতেই দেখল দরজার সামনে নিষাদ দাড়িয়ে আছে।ঠোঁটে শয়/তানি হাসি তার।সূচনার তাকে দেখতে নিকৃ/ষ্ট লাগছে এই মুহূর্তে।ভয়ে বু/ক কা/পছে সূচনার।সূচনার প্রশ্ন শোনার পরে নিষাদ আস্তে
আস্তে এগোতে লাগল তার দিকে। সূচনা কাপ/ছে থরথর করে।চোখের সামনে স্পষ্ট হচ্ছে কিছু দৃশ্য।সেই দৃশ্য গুলো স্পষ্ট হওয়ার সাথে ঝাপসা হতে লাগল তার দৃষ্টি। নিষাদ এগোচ্ছে তার দিকে।সূচনা তরতর করে ঘাম/ছে। কম্পনরত কণ্ঠে বললো –
–‘দে,,দেখুন প্লি,, প্লিজ কা,,কাছে আসবেননা।
নিষাদ বা’কা হেসে বললো-
–‘ আরে এতদিন বলেছে প্রণয়কে ভাই মানতে।ভাই মানছি এখন তো আপনি আমার ভাবিই তাই না।সে হিসেবে আমি আপনার দেবর আর শুনেছি ভাবি আর দেবরের সম্পর্ক নাকি অনেক স্পেশাল হয়,মধুর সম্পর্ক।আসুন একটু সম্পর্ক বানাই, পরিচিত হই।
নিষাদের কথা শুনে সূচনার গা রি রি করছে।কী করবে সে? একটু সাহস জুগিয়ে বললো –
–‘দেখুন আমি কিন্তু চিৎকা/র করব।
নিষাদ উচ্চ স্বরে হাসল।বললো-
–‘আচ্ছা চিৎকার করো আমার সমস্যা নেই।কিন্তু কী বলবে?নিষাদ তোমার সম্মানে হাত দেয়ার চেষ্টা করেছে?খা/রাপ ভাবে ছুয়েছে? আচ্ছা বললে না হয় কিন্তু প্রমান আছে তোমার কাছে? নেই। তুমি চিৎ/কার করলে ভড়া বাড়ির লোকজন এসে জিজ্ঞেস করবে “কী হয়েছে? তখন মানসম্মান তোমারই যাবে।আমি তো ছেলে।আমার দিকে আঙুল কে তুলবে?
সূচনা ব্যথাতুর নয়নে তাকালো তার দিকে। ঘৃ/ণাভরা কণ্ঠে বললো –
–‘ছি’হ’হ তোর মতো ছেলের সামনে দাড়াতেও আমার ঘৃণা লাগছে এখন,মামাী ঠিকই বলেছেন অসুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ তোরা।
নিষাদ এক ঝট/কায় সূচনার সামনে দাড়ালো।বা’কা হেসে বললো-
–‘ তাহলে একটু অসুস্থতা দেখাই না হয়।
সূচনা চ/মকে উঠল,লাফ দিয়ে পিছিয়ে গেল দু কদম।কম্পনরত কায়া আরও কাঁপতে লাগল,শ্বাস ওঠা নামা করছে তার অস্বাভাবিক গতিতে। কেমন যেন ঝাপসা লাগছে সবকিছু। নিষাদ আচমকাই ধরে ফেলল তার ডান হাতটা,মুড়ে ধরল পেছেন। ব্যথায় শব্দ করে কান্না করে দিল সূচনা।আবারো স্পষ্ট হতে লাগল চোখের সামনে কিছু দৃশ্য। তারপর অন্ধকার ছেয়ে গেল সবকিছু তে।
__________________________________
অন্ধকার বদ্ধ রুমে একজন ছেলে আর মেয়ে, আসমানী রঙা শাড়ী পড়া মেয়েটার ভীত-সন্ত্র/স্ত মুখ, তার সামনে দাড়ানো একটা যুবক। মুখে তার পৈশা/চিক হাসি।মেয়েটা অনুনয়-বিনয় করছে ছেলেটার সামনে কিন্তু ছেলেটা শুনছেনা।এগিয়ে আসছে তার দিকে ক্রমাগত। এগিয়ে আসতে আসতে বিছানার শেষ কোণায় পোঁছে গেল মেয়েটা,ছেলেটা তাকে জোরে ধা/ক্কা দিয়ে ফেলে দিল বিছানায়। অধর কোণে পৈশা/চিক হাসি রেখেই বললো-“অবশেষে উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে।”
চিৎ/কার দিয়ে উঠল সূচনা।আশেপাশে তাকালেও বুঝতে বেগ পেতে হলো।তার চিৎ/কার শুনে প্রণয় দৌড়ে আসলো তার কাছে।তার পাশে বসতেই সূচনা ঝা/পটে ধরলো তাকে।প্রণয় বিমূঢ় হয়ে গেল যেন কিন্তু সামলে নিল সাথে সাথেই।তার দুইহাত রাখল সূচনার পিঠে।হাত রাখতেই টের পেল সূচনা কাপ/ছে।খাম/ছে ধরেছে প্রণয়ের পড়নে থাকা বেগুনি রঙা পাঞ্জাবীটার পিঠের দিকটায়।জ্বর কমেছে কিঞ্চিৎ পরিমাণে।নিজের বু/কের দিকে উষ্ণতা অনুভব করতে ই প্রণয় অতি ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো-
–‘কাঁদছ কেন?চিৎ/কার করেছিলে কেন? খা/রাপ স্বপ্ন দেখেছ?তাই বলে এভাবে কাদবে?কিছু হয়নি তে, শুধু জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলে মাত্র।
সূচনা থামলনা।পূর্বের ন্যায় বিসর্জন দিতে থাকল অশ্রু।ব্যথি/ত হলো প্রণয়ের হৃদয়।সে কিভাবে পারল এতটা দায়িত্বহীন হতে?কেন আসলো না ঠিক সময়ে?না চাইতেও ঝাপসা হলো প্রণয়ের নয়ন জোড়া।কিন্তু কপোল বেয়ে পড়ার আগেই সামলে উঠল সে, গ/লা ঝেড়ে পরিষ্কার করে নিল।তার বু/কে ক্রন্দনরত মানবির মুখখানা ধরে উঠাতে চাইলে সে আরও চেপে ধরলো তাকে।প্রণয় হালকা হাসার চেষ্টা করে বললো-
–‘বো/কা মেয়ে, এমন পা/গলের মতো কাদছ কেন?কিছুই হয়নি তোমার।কেউ কিছু করতে পারে নি।কান্না থামাও।নাহলে কিন্তু মা/ইর দিব এখন।
সূচনা নড়লো না,লেপ্টে রইলো প্রণয়ের প্রশস্ত বু/কে।প্রায় দশমিনিট এর মাথায় কান্নার মাত্রা কমলো কিছু টা।সূচনা নাক টানতে টানতে বললো-
–‘আপনি খা/রাপ,অনেক খারাপ,এখনো ব/কছেন আমাকে,আমি থাকব না এখানে,কালকে আম্মুকে ফোন দিয়ে বলব নিয়ে যেতে।
প্রণয় হালকা হাসল,বললো-
–‘সেই যে জড়িয়ে ধরেছ, ছাড়ছই না আবার বলছ থাকবেনা এখানে।
সূচনা পিলে চম/কালো যেন, জড়িয়ে ধরে আছে মানে?নিজের অবস্থান টের পেতেই লজ্জায় কুঁকড়ে গেল একদম।সরে আসতে পারলনা,কেমন যেন অসাড় হয়ে গেছে তার শরীর।প্রণয় বুঝল কি না কে জানে।সূচনার মুখখানা বু/ক থেকে উঠিয়ে দু’হাতের আজলে নিল।চোখ তুলে তার দিকে তাকালো সূচনা। সূচনার কান্না ভেজা অক্ষি পল্লবে পরপর চুমু খেল।সূচনা কিংকর্ত/ব্যবিমুঢ়।চোখ জোড়া তার বন্ধ হয়ে গেল আপনা আপনি। প্রণয় তার কপালের সাথে সূচনার কপাল ঠেকিয়ে স্পষ্ট স্বরে শুধালো –
–‘সদ্য স্ফুটিত কোনো পুষ্পের ন্যায় পবিত্র প্রণয়ী,নিজেকে অপবিত্র ভাবার দুঃসাহস যেন না করে সে।তার অন্তর,কায়া গভীর থেকে গভীর ভাবে স্পর্শ করার অধিকার শুধু তার প্রণয়ের।সেই দুঃসাহস শুধু দেখাবে প্রণয়ীর প্রণয়ই।
কোনো এক অদ্ভুত শিহরণে শিহরিত হলো সূচনার সমস্ত শরীর। কথা দিয়ে ও বুঝি এমন শিহরিত করা যায়, সূচনা লজ্জায় মিয়িয়ে গেল একদম। কান গর/ম হয়ে গেছে তার,মনে হচ্ছে সেখান থেকে ধোয়া বের হচ্ছে। এমন অনুভূতি, এই কথা,ছোয়া যে তার কাছে নয়া নয়া একেবারে।
দরজায় ঠকঠক আওয়াজে ঘোর ভাঙল দুজনের। সূচনাকে ছেড়ে দিয়ে দরজা খুলতে গেল প্রণয়। দরজা খুলতেই মিসেস আফিয়া হন্তদন্ত হয়ে রুমে প্রবেশ করলেন। এসেই সূচনার পাশে বসলেন। ব্যস্ত গলায় জিজ্ঞেস করলেন –
–‘এখন কেমন লাগছে রে? এমন জ্ঞান হারালি কেন হঠাৎ করে? কত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম জানিস। এখন ঠিক লাগছে না?
একনাগাড়ে সব বললেন মিসেস আফিয়া। সূচনা মাথা নাড়িয়ে বুঝালো-সে ঠিক আছে এখন।
সূচনার কপালে হাত রেখে বললেন-
–‘ একটু কমেছে। আমি স্যুপ পাঠাচ্ছি ইরা কে দিয়ে, তারপর খেয়ে ঔষধ নিয়ে লম্বা একটা ঘুম দিবি।ঠিক আছে?
আবারো মাথা নাড়ালো সূচনা। মিসেস আফিয়া একটু মন খারাপে/র স্বরে বললেন-
–‘জানিস তিথি, দিনা বারবার তোর কথা জিজ্ঞেস করছিল।কোনোরকম বুঝিয়েছি।
সূচনা কিছুটা অপরাধীর স্বরেই বললো-
–‘দুঃখীত মামী আসলে,আমি
–‘ এক টা লাগাব কা/নের নিচে।তোকে দুঃখ প্রকাশ করতে বলেছি আমি।তাড়াতাড়ি ঠিক হ’য়ে যা।কালকে তোর নন্দিনীর বিয়ে আর তার ভাবি অসুস্থ হয়ে পড়ে থাকবে এটা কি হয়?
দুইদিকে মাথা নাড়ালো সূচনা।
–‘তাহলে যা বলছি তাই কর।
–‘আচ্ছা।
–‘ঠিক আছে আমি আসি তাহলে।
মিসেস আফিয়া চলে যেতে নিলে সূচনা থামিয়ে দিল তাকে। বললো-
–‘ছোটবেলায় আমি অসুস্থ হলে মনে হত আম্মুকে জড়িয়ে ধরলেই অসুখ পালিয়ে যাবে, তাই জড়িয়ে ধরে রাখতাম আর অদ্ভুত ভাবে অসুখ ও সেড়ে যেত। সত্যি ই সেড়ে যেত না আমার ধারনা ছিক জানিনা কিন্তু সেই অভ্যাসটা আমার এখন ও আছে। আম্মু তো নেই এখানে,আপনাকে একটু জড়িয়ে ধরতে দিবেন মামী?
একটানা কথাগুলো বলে থামল সূচনা। তার কণ্ঠে ছিল আকুলতা। মিসেস আফিয়া কোনো কথা বললেন না সোজা ঝা/পটে ধরলেন সূচনাকে। সূচনার চোখ জোড়া জ্বল/জ্বল করে উঠলো। প্রণয় হাসল,প্রশান্তির হাসি।
#চলবে