প্রণয়ের সূচনা পর্ব-৫২+৫৩+৫৪

0
542

#প্রণয়ের_সূচনা
#লেখিকা_Nazia_Shifa
#পর্ব_৫২
___________________________
নিশ্চুপ ভঙ্গিতে সূচনা বেডে বসে আছে,কাঁপা কাঁপা হাতে সূচনার মাথায় ব্যান্ডেজ করে দিচ্ছে প্রণয়।সূচনা অবাক হচ্ছে প্রনয়ের হাতজোড়া কাঁ পতে দেখে।তবে এই মুহূর্তে প্রশ্ন করার সাহস টুকু পাচ্ছে না।প্রণয় ধীর গতিতে, কাঁপা হাতে, সময় নিয়ে ব্যান্ডেজ চ্যাঞ্জ করে দম নিলো।ফাস্ট এইড বক্স টা যথাস্থানে রেখে সূচনার কাছে আসলো।চোখ মুখ শক্ত করে জিজ্ঞেস করলো-

–‘মাথায় আ ঘাত পেয়েছো কিভাবে?

–‘আ ঘাত পাইনি তো…

–‘তাহলে ব্লিডিং হলো কেনো?সত্যি করে বলো।

সূচনা কিয়ৎক্ষণ চুপ করে রইলো।নিচু স্বরে শুধালো-

–ঃওয়াশরুম থেকে আসার সময় হঠাৎ মাথাটা ঘুরে গিয়েছিলো।দেয়াল ধরে পড়ে যাওয়া থেকে বাচলেও মাথায় হালকা বারি খেয়েছিলাম।দেয়ালের সাথে লেগেই সম্ভবত….

–‘এতক্ষণ বলতে পারোনি?খেয়াল করোনি আ ঘাত?

আচানক ধমকের স্বর শুনে চমকে ঈষৎ কেঁপে উঠলো সূচনা।ভয় পেয়েছে সে।প্রণয় নিজেও চমকালো।নিজের আচরণে নিজেই নিজের উপর রে গে গেলো।ডাক্তার বলে দিয়েছে,সূচনাকে কোনোভাবেই প্রেশার না দিতে,উচ্চ স্বরে কথা বলতেও নিষেধ করেছে।আর সে বারবার তাই করছে।মুখ ঘুরিয়ে লম্বা শ্বাস ফেলে নিজেকে শান্ত করলো প্রণয়।নিজেকে সামলে সূচনার পাশে বসলো।সূচনার কোমল কপোল জোড়ায় নিজের শীতল হাতজোড়া ছোঁয়ালো।নত মুখশ্রী উপরে তুলে নরম সুরে বললো-

–‘আ ..ম সরি।খুব সরি।এগেইন সরি প্রণয়ী।যতবার বলবে ততবার সরি বলবো।তবুও কেদো না প্লিজ।

সূচনা দৃষ্টি নতই রাখলো।মুখ তুলে তাকালো না।প্রণয় পূর্ণ দৃষ্টি রাখলো এবার সূচনার পানে।নির্লিপ্ত কন্ঠে বললো-

–‘কি চাও বলো?

সূচনা ভড়কালো।কি চাইবে সে?আপাতত তো দুইটা জিনিস ই জানতে চায় সে।প্রথমত ৩০ ডিসেম্বর প্রণয়ের জন্মদিন ছাড়া আর কি হয়েছে?দ্বিতীয়ত,চিলেকোঠার ঐ ঘরটাতে কি আছে তা।

–‘কি হলো বলো?

সূচনা এবার প্রণয়ের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মেলালো।ভীত কন্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

–‘যা জিজ্ঞেস করবো সব কিছু বলবেন?

প্রণয় আগের মতোই সহসা জবাব দিলো-

–‘হ্যা বলবো।

সূচনা বড় করে শ্বাস নিলো।বললো-

–‘আমি কি জানতে চাই সেটা তো আপনি জানেন প্রণয়।কি জানেননা?
.
.
পিনপতন নীরবতা, প্রণয় চুপ করে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে।চোখমুখ স্বাভাবিক তার,সূচনা আন্দাজ করতে পারছেনা তার ভাবাবেগ।তার উৎসুক দৃষ্টি বিচরণ করছে প্রণয়ের মুখশ্রী তে।প্রণয় নিরুত্তর থাকায় এবার সূচনা জিজ্ঞেস করেই বসলো-

–‘কিছু বলছেন না কেন?

প্রণয় বোধহয় এই অপেক্ষাতেই ছিল।সে সাথে সাথে জবাব দিয়ে বসলো-

–‘আজ রাতটা কা টুক কাল সব ক্লিয়ার হবে।আর একটা রাত তে ধৈর্য ধরতেই পারবে।পারবে না?

সূচনা ও সময় নিল না,মাথা ওপর নিচ দুলিয়ে সায় দিল ‘সে পারবে।’উত্তর পাওয়ার সাথে সাথে ই প্রণয় ব্যস্ত পায়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল।তার যাওয়ার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইলো সূচনা।কি হচ্ছে? কেন হচ্ছে?কালই বা কী হতে যাচ্ছে?যাই হোক না কেন, খারাপ কিছু যেন না হয়ে থাকে।মনে প্রাণে তাই চাইছে সূচনা।
_____________________________
কুয়াশায় জর্জরিত প্রকৃতি,শীতে সারা শরীরে কাঁপন ধরিয়ে দিলেও ব্যালকনি থেকে সরছে না সূচনা।সবটা ঘোলাটে দেখাচ্ছে,প্রচন্ড শীতে গা জমে যাচ্ছে তবুও সে দাড়িয়ে আছে। গায়ে অবশ্য মোটা সোয়েটার জড়ানো তার।কিন্তু দেখতে গেলে এখানে দাড়িয়ে থাকা শুধু শুধুই,কোনো কারণ নেই।কিন্তু সেসব ভাবার সময় নেই তার মনের। আপাদত প্রণয়ের কথাই ভাবছে সে।কি বলবে প্রণয়?কী রহস্য হতে পারে? কোনো খারাপ কিছু শুনবে?সেটা কী খুব খারাপ কিছু? উফফফ,,এত এত উল্টা পাল্টা ভাবনা কেন আসছে আর এমন উল্টা পাল্টা ভাবনা গুলোই শুধু কেন আসছে?ভেবে পাচ্ছে না সে।

–‘বুড়ি আজকে এমন ঠান্ডায় ব্যালকনিতে কী করে? পাগল টাগল হয়ে গেছে নাকি?

পেছন থেকে শালসহ সূচনাকে জড়িয়ে ধরতে ধরতে কথাগুলো বললো প্রণয়। সূচনা ঈষৎ চমকে উঠলো।ঘাড় বা কিয়ে প্রণয়ের দিক তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো-

–‘বুড়ি বলছেন কাকে হ্যা?

–‘কেন তোমাকে।

–‘কেন? আমাকে কোন দিক দিয়ে বুড়ি লাগে শুনি।

–‘শীত লাগার দিক দিয়ে। তোমার যেই পরিমাণে শীত লাগে বুড়িই তো তুমি। বাচ্চা বুড়ি।

–‘আমি ই বাচ্চা আমিই বুড়ি।বাহ।সবই আমি।

–‘আমার সবকিছু তুমি,সবটা জুড়ে শুধু তুমি আর তুমি।বুঝেছো বোকা মেয়ে?

প্রণয়ের কথা কানে আসতেই চোখ বন্ধ করে নিল সূচনা।কান গ রম হয়ে উঠেছে ইতিমধ্যে, লজ্জা পাচ্ছে সে,কেমন কেমন করছে বুকের ভেতর।ইশশশ!কেমন অনুভূতি।মাঝে মাঝে তার আফসোস হয়, নিজের ওপর রা গ হয়। সে কেন পারেনা নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করতে,কেন তার মনে যা আসে তা বুলিতে ফোটেনা?প্রণয় তো কী সুন্দর সব বলে দেয়।

–‘কী ভাবছো?

সূচনা চুপ না থেকে বলেই দিল-

–‘আফসোস হচ্ছে, রা গ ও হচ্ছে।

–‘কেন?কার ওপর?

–‘নিজের ওপর।আপনি কত সুন্দর গুছিয়ে সব কথা বলতে পারেন,নিজের অনুভূতির প্রকাশ করতে পারেন কিন্তু আমি পারিনা।নিজে তো ব্যক্ত করতে পারিই না উল্টো আপনি করলে লজ্জায় মরিমরি অবস্থা হয়ে যায়। সত্যি ই বোকা আমি।ধুর!

সূচনার বোকা বোকা কথায় প্রণয় হেসে দিল শব্দ করে।তা শুনে সূচনা ঠোঁট উল্টে বললো-

–‘হাসছেন কেন?ঠিক আছে বোকা আমি তাই বলে হাসতে হবে।

প্রণয় হাসি থামালো কোনোরকমে।সূচনাকে নিজের দিকে ঘুড়িয়ে মুখোমুখি দাড় করালো।তার দুই বাহুতে হাত রেখে হাল্কা চাপ দিতেই সূচনা চোখে চোখ রাখলো তার।প্রণয় গাঢ় কণ্ঠে শোধালো-

–‘শোনো তুমি নারী আর লজ্জা নারীর ভূষণ।তুমি লজ্জা না পেলে আমি অত সুন্দর করে কথা বলতে পারতামনা।তুমি লজ্জা না পেলে আমার কথাগুলো ও সুন্দর মনে হত না।তুমি লজ্জা না পেলে বরং আমার হৃদয় ব্য থিত হত।অনুভূতির প্রকাশ দুজনের ই করতে হবে সেটা কী কোথাও লেখা আছে?নেই।তাহলে?ভালোবাসা অপ্রকাশিত ই সুন্দর, তবে মাঝে মাঝে দু’জন দুজনের নিকট একটু আধটু অনুভূতির প্রকাশ করলে ক্ষতি হয় না বিশেষ।তোমার আমার আমাদের অনুভূতি, আমিই না হয় তার বহিঃপ্রকাশ এর দায়িত্ব নিলাম।তুমি লাজ রাঙা হবে সেই মুখ দেখার অধিকার
ও শুধু আমি ই পেলাম।ক্ষতি কী তাতে?

একটা ছেলে এত সুন্দর মন মানসিকতার হতে পারে, এত সুন্দর করে কথা বলতে পারে সেটা প্রণয়কে না জানলে বুঝি বুঝত ই না সূচনা।সে এমন একটা পুরুষকে পেয়েছে নিজের করে,খুশিতে চোখ ছলছল করে উঠলো তার।তার বাবা ঠিকই তো বলেছিল তাকে যে-‘একদিন সে নিজে যেয়ে তাকে বলবে,প্রণয়ের সাথে তার বিয়ে ঠিক করা ওনার বেস্ট সিদ্ধান্ত ছিল।সত্যিই তো জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সিদ্ধান্ত ছিল এটা।সূচনা হাল্কা হেসে প্রণয়কে জড়িয়ে ধরতে ধরতে বললো –

–‘আপনার জন্য অন্তত এই মুহূর্তগুলোর জন্য আমি সারাজীবন আপনার বোকা মেয়ে বনে থাকতেও রাজি।’

প্রণয় হাসলো।চোখে পানি অথচ অধর কোণে মিষ্টি হাসি, কত সুন্দর মুহুর্ত!
________________________________
–‘মিহু প্রণয় তোর কেমন ভাই হয়?তন্ময় কী হয় তোর?

ফোনের ওপাশ থেকে সূচনার উক্ত প্রশ্নটুকু শুনে কয়েক সেকেন্ডের জন্য চুপ করে রইলো মিহু।অতঃপর স্বাভাবিক গলায় উত্তর দিল-

–‘প্রণয় ভাইয়া আমার চাচাতো ভাই আর তন্ময় ভাই আমার নিজের ভাই। আমি, পিহু আর তন্ময় ভাই আমরা তিন ভাইবোন।

মিহু উত্তর দেয়া মাত্র ই সূচনা কল কে টে দিল।মিহু অবাক হলো না তেমন কারণ আজকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি যে তাকে হতে হবে তা আগেই জানা ছিল তার। কল কে টে দিয়ে কিছুক্ষণ থম মে রে বসে রইলো সূচনা। শেষমেশ মিহু ও তাকে মিথ্যা বললো।তন্ময়ের ব্যাপারটা সূচনা কিঞ্চিৎ আন্দাজ করতে পেরেছিল।তন্ময় এর হুটহাট প্রণয়কে স্যার থেকে ভাই ডাকা,প্রণয় যেদিন চট্টগ্রাম গেল সেদিনই মিহুর বড় ভাই সে ও ঢাকার বাইরে গিয়েছিল,যেদিন প্রণয় ফিরেছে সেও সেদিন ই ফিরেছে।আবার একইদিনে তার ও জ্বর হয়েছে তাও বৃষ্টি তে ভেজার কারণেই। অদ্ভুত লাগছিল সূচনার কাছে কারণগুলো।শুধুমাত্র এই কয়টা কথার যুক্তিতে এতবড় কিছু ভেবে নেয়া টা তার কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি তাই অত ঘাটাঘাটি করেনি সেটা নিয়ে। কিন্তু এখন দেখা যায় ঘাটাঘাটি করাটাই উচিত ছিল তাহলে আরও আগেই জেনে যেত হয়তো।
________________________________
দেখতে সকাল থেকে দুপুর, দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। চিলেকোঠার সেই খুপরি রূপি ঘরটার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সূচনা।প্রণয় কল করেছিল একটু আগে। বললো-

–‘কাবার্ডের ভেতর সবুজ রঙের একটা ফাইল আছে, তন্ময় বাসায় আসবে নিতে, দিয়ে দিও।’

তার কথামতো কাবার্ড খুলেই ফাইলটা পেয়েছে সূচনা।ফাইল নেয়ার সময় ছোট একটা নীল রঙের বক্সে চোখ আ টকে যায় তার।সূচনা দেখবে না দেখবে না করেও আগ্রহ দমিয়ে রাখতে পারেনি। হাতে নিয়ে সাথে সাথে ই বক্সটা খুলে ফেলে।ভেতরে ছোট্ট একটা চাবি, কি রিং এ লাগানো।ছোট্ট একটা সাদা কাগজের টুকরো ও আছে। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা – চিলেকোঠার ঘরে।’ লেখাটুকু দেখেই সূচনা বুঝে গেল যা বোঝার অতঃপর দেরি না করে সোজা এসে পড়েছে এখানে।বুকে ফু দিয়ে সাহস জুগিয়ে পা বাড়ালো ঘরে।
.
.
বাইরে থেকে যতটা ছোট মনে হয় ঠিক ততটা ছোট না ঘরটা।মোটামোটি বড়, চওড়া ও বলা যায়,পরিষ্কার ও বলা যায় বটে।যেনো রোজ নিয়ম করে পরিষ্কার করা হয়।কিছু জিনিস পত্র আছে একদম কোণায় কোণায়।সবগুলো জিনিস এখন ও ঠিকভাবে খেয়াল করেনি সূচনা।চিলেকোঠার দরজাটা বন্ধ করে সামনে এগিয়ে গেলো সে।।হাতের ডান পাশে একটা বড় কাঠের বক্স রাখা।গুটিগুটি পায়ে সেটার দিকেই এগোলো সূচনা।বেশ পুরোনো বক্সটা,ওপরের অংশ টা খুলতেই একটা ফুটবল,কয়েকটা বই, একটা ছবি নজরে এলো। সব-কয়টা বই ই বিজ্ঞান বিষয়ক,উল্টে পাল্টে রেখে দিল সূচনা।ছবিটা হাতে তুলে নিল।ধুলো জমেছে,শাড়ীর আচল দিয়ে মুছে নিল। একজন ভদ্রমহিলা তার কোলে বাচ্চা একটা মেয়ে আর এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা ছেলে।ছবিটা ছে ড়া,একটা অংশ নেই।ছি ড়ে ফেলা হয়েছে বোঝা ই যাচ্ছে। ছিঁড়ে যাওয়া অংশ টুকু তাহলে কোথায়?বক্সটাতে খুজলেও পাওয়া গেল না তবে আরও কিছু জিনিস পাওয়া গেছে।বাচ্চাদের কিছু পুরোনো খেলনা,আরও ক’টা বই,একই ভদ্রমহিলার সাথে সেই ছেলেটার আরও কয়েকটা ছবি।তার মধ্যে আগেরটার মতোই দুটো ছবি ছে ড়া।ছেলেটার বয়স আনুমানিক ১১-১২ হবে।ছেলেটা কে?প্রণয়? মনে মনে আওড়ালো সূচনা।সেখান থেকে সরে এসে সামনে তাকাতেই চোখ
আ টকে গেল সামনের দেয়ালে।সামনের দেয়ালে ছোট এক অংশ দখল করে আছে যার উপর লাল পর্দা টেনে দেওয়া।সূচনা কম্পিত হাতজোড়া বাড়িয়ে পর্দাটা সরালো।তৎক্ষনাত বিষ্ময়বিশ্ট চোখজোড়া থমকে গেলো।শুভ্র রঙা বোর্ডটায় বিভিন্ন খবরের কাগজ,ছবি আটকানো।সূচনা ফোনের ফ্ল্যাশ লাইট অন করলো।তীর্যক চোখে একে একে সব কটা ছবি দেখলো।বোর্ডের বাম পাশের নিচের দিকে একটা পুরোনো খবরের কাগজের কিছু অংশ আটকানো।নিচু হয়ে সেখানটায় নজর দিলো সূচনা।দেখেই আন্দাজ করে ফেললো কাগজটা অনেক পুরোনো।ফট করেই তার আন্দাজ টা ঠিক বের হলো।২০০৫ সাল,৩১ ডিসেম্বর লেখা হেডলাইন টাই বুঝিয়ে দিলো যে তার আন্দাজ ঠিক।সুইসাইড কেস বিষয়ক কোনো আর্টিকেল। প্রথম ক’টা লাইন পড়লো সূচনা।ছোট ছোট অক্ষরে লেখা-‘

–‘নামকরা ব্যবসায়ী এহতেশাম আহমেদের স্ত্রী নুরাইয়া আহমেদ আ ত্মহত্যা করেছেন।৩০ শে ডিসেম্বর রাত নয়টা নাগাদ ফ্যানের সাথে ঝোলানো লাশ দেখতে পান তার স্বামী এহতেশাম আহমেদ ।তাদের সংসারে দুই সন্তান আছে..১২ বছরের ছেলে প্রণয় আহমেদ আর ১বছরের মেয়ে ইরা আহমেদ।’

আ ৎকে উঠলো সূচনা, হাত পায়ে কাঁপন ধরে গেছে তার।চোখ ভিজে উঠেছে তার, ভেতরটায় অসহ্য রকমের যন্ত্রণা হচ্ছে। এজন্য ই বুঝি প্রণয় এমন করেছিল তাকে জন্মদিনের উইশ করায়।তার জন্মদিনের দিনই…এসব হয়েছে।চোখ সরিয়ে নিল সূচনা..ডান পাশে আরেকটা খবরের কাগজে চোখ পড়লো।
২০০৬ সালের ১ জানুয়ারি রাতে কার এক্সিডেন্টে মৃত্যু হয়েছে নামকরা ব্যবসায়ী এহতেশাম আহমেদের।এবার যেন আরও চমকে উঠলো সূচনা।একদিনের ব্যবধানে মা বা-বা দুজনের মৃত্যু!এতটা নিষ্ঠুর নিয়তি?মাত্র বারো বছর বয়সে প্রণয় এতকিছু সহ্য করেছে, আর..আর ইরা মাত্র ১বছর বয়সে।ভাবতে পারলনা সূচনা।ছুটে বেড়িয়ে আসলো সেখান থেকে।বাসায় ঢুকে আবার ও সোজা ছুট লাগালো নিজের রুমে।

–‘দেখা হয়েছে?

#চলবে

#প্রণয়ের_সূচনা
#লেখিকা_Nazia_Shifa
#পর্ব_৫৩
____________________________
–‘এহতেশাম আহমেদ,নুরাইয়া আহমেদ তাদের দুই সন্তান প্রণয় আহমেদ আর ইরা আহমেদ। চারজনের হাসি খুশী এক পরিবার ছিল।কিন্তু সেই সুখের ইতি ঘটলো যখন প্রণয় অর্থাৎ আমার বয়স ১১ বছর।আম্মু আর তার স্বামীর মধ্যে তৃতীয় জনের আগমন ঘটে। পরকীয়া যাকে বলে, এহতেশাম আহমেদ ওনার অফিসের পি.এস এর সাথে সম্পর্কে জড়ান।তারপর থেকে রাত করে বাড়ি ফেরা,ড্রাংক করা, আম্মুকে কথায় কথায় বা জে কথা শোনানো,আমাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা, অবহেলা করা। এসব নিত্যদিনের কাজ হয়ে গিয়েছিল তার।অবহেলা,অবজ্ঞায় এক বছর পার হলো।২০০৫ সাল ৩০ শে ডিসেম্বর,আমার জন্মদিন, ১১ থেকে ১২ বছরে পা দিব।সেদিন সকালে আম্মু অনুনয়-বিনয় করে তাকে বলেছিলেন –

–‘আজ ওর জন্মদিন একটু তাড়াতাড়ি আসবেন।

উনি জবাব দিলেন না,চলে গেলেন।
তিন ভাই ছিলেন ওনারা,উনিই ছিলেন সবার বড়।দুই চাচার ঘরে পাচ সন্তান, তাদের মধ্যে তন্ময়, মিহু আর পিহু। পিহু তখন ছিল না অবশ্য।তাদেরকে দাওয়াত করেছিলেন আম্মু।তারা আসলেন, রাতে খেলেন,ওনার জন্য অপেক্ষা করতে করতে,শেষে কেক ই কা টা হলো না।মেহমান রা সবাই চলে গেলেন,উনি আসলেন না তখনও।আম্মু জোড় করে আমাকে ঘুমাতে পাঠিয়ে দিলেন,ইরাকে সেদিন নিজের সাথে রাখেননি,আমার রুমে পাঠিয়ে দেন।আম্মুর সো কলড স্বামী আসলেন রাত দেড়টার পরে।ড্রাংকড অবস্থায়,সেদিন আম্মু খুব রে গে গিয়েছিলেন,এতদিনের সব রা গ ক্ষোভ ঝাড়লেন তার ওপর।উনিও রে গে গেলেন, প্রথম বারের মতো আম্মুর গায়ে হাত তুললেন,আম্মু অবাক হয়েছিলেন চেহারা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল।পরমুহূর্তেই ঝাঁঝালো কণ্ঠে তাকে বললেন-

–‘অনেক হয়েছে, আর না।একটা বছর সহ্য করেছি,আর না। আপনার বাড়িতে আর এক মুহূর্ত ও না।আজই চলে যাব আমার সন্তানদের নিয়ে। ডিভোর্স পেপার তাড়াতাড়ি ই পেয়ে যাবেন।’

কথাগুলো বলে আম্মু দরজার দিকে পা বাড়াতে নিলেই থমকে গেলেন,মাথায় হাত দিয়ে বি কট শব্দে চিৎকার দিয়ে উঠলেন।মাথা চেপে ধরেই ধপ করে নিচে পড়ে গেলেন।সামনে তাকিয়ে দেখলাম হাতে ভারি একটা ফ্লাওয়ার ভাস নিয়ে দাড়িয়ে আছেন উনি।ছোট্ট মস্তিষ্ক জানান দিল তখন ঔটা দিয়েই বারি দিয়েছেন আম্মুকে আর এজন্যই আম্মু…আম্মুর চোখ জোড়া বন্ধ হতে বেশি সময় লাগলো না।ঘটনার আকস্মিকতায় হতভম্ব হয়ে গেলাম জানালার আড়ালে দাড়িয়ে থাকা প্রণয় নামের সেই ভীতু ছেলেটা। ছোটবেলা থেকেই বড় ভীতু, গম্ভীর আর চুপচাপ স্বভাবের ছিলাম।চোখের সামনে এমন ঘটনা দেখার পরে ভেতরটা একেবারে পাথর হয়ে গিয়েছিল আমার, সব শক্তি হারিয়ে ফেলেছিলাম।আম্মুর নিথর দেহটার মাথার কাছে বসে উনি গাল জোড়ায় থাপ্পড় দিচ্ছিলেন,কয়েকবার ডাকার পরেও যখন সাড়া পেলেন না, তখন মাথায় বাজ পড়লো ওনার।নেশা উবে গেল বোধহয়, কী করবেন না করবেন ভাবতে ভাবতে হঠাৎ উঠে দাড়ালেন।কাবার্ড থেকে আম্মুর একটা ওড়না নিয়ে ফ্যানের সাথে বাধলেন, আম্মুর নিষ্প্রাণ শরীরটাকে টেনে হিচড়ে উঠালেন,ফ্যানের সাথে ঝু লিয়ে দিলেন।পুরো নিখুঁত ভাবে কাজটা সাড়লেন উনি।দেখে মনেই হবে এটা আ ত্ম হ ত্যা। কয়েকজনকে কল করলেন,একজনকে খুলে বললেন পুরো কাহিনি।কথা শেষ করে বেডে বসতেই বোধহয় ওনার খেয়াল হলো যে এই বাসায় ওনার দুজন ছাড়া ও কেউ আছে।উনি দরজার দিকে ঘুরতেই জানালার কাছ থেকে সরে ভারি শরীরটাকে নিয়ে এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেলাম।১ বছর বয়সী ছোট্ট প্রাণটা, বিছানায় ঘুমাচ্ছে নিশ্চিন্তে।তার দিক এক পলক তাকিয়ে বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর ভান ধরলাম।একটু পরই দরজা ঠেলে কেউ রুমে প্রবেশ করলো,ভালো করে পরখ করে চলে গেলেন।সেদিনই সেই বাড়ি থেকে পালিয়ে আসলাম ইরাকে নিয়ে।ঠাই হয়েছিল আম্মুর ঘনিষ্ঠ এক বান্ধবীর বাড়ি তে।উনি নিজের কাছে লুকিয়ে না রাখলে হয়ত বাচা হতোনা।সেদিন রাতেই টিভিতে নিউজ হলো-

–‘ শহরের অন্যতম ব্যবসায়ী এহতেশাম আহমেদ এর স্ত্রী সুইসাইড করেছেন,রাত দেড়টার পর অফিস থেকে বাসায় ফেরার পড়ে নিজের রুমে যেয়ে স্ত্রীর ঝু লন্ত লাশ দেখতে পান খোদ এহতেশাম আহমেদ।ওনার দুই সন্তান ও নিখোজ সেই ঘটনার পর থেকে।’

কত সুন্দর করে একটা খু ন কে সুইসা ইড বলে চালিয়ে দিলেন।স্ত্রী হারানো আর সন্তানদের নিখোঁজ এর সংবাদে নাকি ভেঙে পড়েছেন উনি।হাসি পেল খুব ওনার এসব মিথ্যায়।আম্মু মা রা গিয়েছেন তার জন্য বিন্দু মাত্র কান্না আসতো না আমার।একটা দিন আন্টি অনেক কষ্টে ইরাকে সামলে ছিলেন।এহতেশাম সাহেব খুজে নিতেন হয়তো আমাদের কিন্তু সেই সুযোগ পাননি।তার পরের দিন রাতে টিভিতে নিউজ হলো –

–‘শহরের অন্যতম ব্যবসায়ী এহতেশাম আহমেদ এর মৃত্যু হয়েছে কার এক্সিডেন্টে।

কেউ বলছিল বিজনেসে দ্রুত উন্নতির কারণে ওনার নিজের বিজনেস পার্টনার রাই ওনার দুঃসময়ের ফায়দা নিয়ে ওনাকে আ ঘাত করেছেন।মে রেই ফেলেছেন হা হা হা হা। আবার কেউ বলছিল মানসিক অবস্থা খারাপ ছিল তাই ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিতে পারেননি আর মনোযোগ ক্ষুণ্ণ হয়ে এক্সিডেন্ট হয়ে গেছে। কিন্তু ঔ যে বলে না ‘রিভেন্জ অফ নেচার’ ওনার সাথে ওটাই হয়েছে তবে উনি ওনার পাপের শাস্তি টা একটু বেশি তাড়াতাড়ি ই পেয়ে গেছেন।তবে মারা যাওয়ার আগে উনি টাকা দিয়ে যাদের কিনে রেখে গিয়েছিলেন তারা তাদের কাজ ঠিকই করেছে।আম্মুর মা র্ডার কেসটাকে সু ইসা ইড কেস বলে চালিয়ে দিয়েছেন।আম্মুর পোস্টমর্টেম এর ফেক রিপোর্ট বানিয়েছেন **** হসপিটালের ডাক্তার.আনান সিদ্দিকী আর কেস সামলেছেন অফিসার আদনান হাসান। কিছু দিন আগেই সা সপেন্ড করা হয়েছে ওনাকে। ঘুষ নিয়ে হাতেনাতে ধরা পড়েছেন।কে ধরিয়ে দিয়েছে জিজ্ঞেস করবে না?
আমি ই বলছি – মুগ্ধ..মুগ্ধ খুলেছে তার মুখোশ, বুদ্ধি ছিল আমার তাই ক্রেডিট তো আমার ও আছে।হা হা।আর ঔ যে ডাক্তার.আনান সিদ্দিকী উনিও তো মা রা গিয়েছেন কিছুদিন আগে।উনি নাকি কয় তলা থেকে লাফ দিয়েছে..হাহ সুইসাইড নাকি মার্ডার নাকি কোনো এক্সিডেন্ট এখনও বের করেতো পারেনি কেউ।আর তার বুঝদার ভাগ্নে বলছে তাকে মা র্ডার করা হয়েছে।সে কী বলেছে জানো?তার মামাকে নাকি আমি মে রে ফেলেছি।বাই দা ওয়ে মিহু আমার চাচাতো বোন।আর সেটা তোমাকে বলতে না করেছিলাম আমি ই।তন্ময় যে আমার চাচাতো ভাই সেটা খুব কম মানুষ ই জানে।মিহু আর তন্ময় শুরু থেকেই আমার পাশে ছিল আর আছে। কিন্তু এহতেশাম আহমেদ এর দুই ভাই, তাদের স্ত্রী তারা কখনোই আমাদের পাশে ছিলেন না।এহতেশাম আহমেদের মারা যাওয়া নিয়ে ও কারো মাথা ব্যথা ছিল না। আমরা দুইটা ছেলে মেয়ে আমাদের কী হবে সেটা নিয়ে ও এক মুহূর্ত ভাবেননি তারা।একদিন জিজ্ঞেস ও করেনি কেউ আমরা কোথায় আছি?কীভাবে আছি?মামা মামীর কাছে বড় হচ্ছিলাম দুজন।দিনা নিজের বোনের মতো করে ইরাকে স্নেহ করেছে।ইরা জানে না সবটা, শুধু জানে যে আমার বার্থডের দিন আম্মু আর এহতেশাম সাহেবের কার এক্সিডেন্টে মৃত্যু হয়েছিল।আর তাই আমি আমার বার্থডে সেলিব্রেট করি না। আম্মুর সেই বান্ধবী উনি আর ওনার স্বামী, তারা দুজনও নিজের সবটা দিয়ে আমাদের সাহায্য করেছেন।তারা এখনো নিজের ছেলের মতো আদর করেন আমায়।মিহুর আম্মু আব্বু কেউ খোজ না নিলেও মিহু আর তন্ময়ের সাথে সবসময় যোগাযোগ থাকতো।আমাদের সাথে যোগাযোগ রাখার কারণে মিহু আর তন্ময়ের সাথে তাদের বাবা মা র মনোমালিন্য হওয়ায় নিষেধ করেছিলাম যেন যোগাযোগ না রাখে।কিন্তু ওরা শোনেনি।মিহুর সাথে তার মায়ের সম্পর্ক ভালো না,কেন জানো?আমাদের জন্য, আমাদের সাথে সম্পর্ক রাখাটা ওনার পছন্দ না।কিন্তু ওরা দুজন স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে -‘সম্পর্ক নষ্ট করবেনা। তারা আছে এখনও পাশে।আর..

কথা থামিয়ে দিল প্রণয়,পকেট থেকে রিং হতে থাকা ফোনটা বের করলো।তন্ময়ের কল এসেছে,ফোন রিসিভ করতেই বা কা হাসলো প্রণয়।শুধু বললো-

–‘ঠিক আছে পাঠা।

একটু পরই মেসেজের টুং শব্দ হলো।প্রণয় কি যেন দেখলো ফোনে।তারপর সূচনার দিকে তাকিয়ে বললো-

–‘দুইটা গুড নিউজ আছে দেখবে?

সূচনা থেমে থেমে জিজ্ঞেস করলো-

–‘ক..কীসের.. গুড নি..উজ?

–‘সি।

ফোনটা সূচনার সামনে ধরে বললো প্রণয়।ভিডিও একটা,যেটা দেখে স্বাভাবিকের চেয়ে চোখ জোড়া বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেছে সূচনার। ঘাম ছুটছে তার,কাঁপা কাপা কণ্ঠে শুধু জিজ্ঞেস করলো-

–‘রি..রিয়াদ। ও ও..কে পু..পুলিশে ধ..ধরেছে কেন?

–‘হ্যা রিয়াদ।আনান সিদ্দিকীর সেই বুঝদার ভাগ্নে। যে আমার ওপর খু নের আরোপ লাগিয়েছে।ডু ইউ বিলিভ ইট?আচ্ছা তুমি জিজ্ঞেস করলে না আম্মুর সেই বান্ধবীর ব্যাপারে?ওনার নাম কী জানো?

সূচনা প্রশ্নসূচক চোখ জোড়া প্রণয়ের দিকে তাক করলো।প্রণয় মিহি হাসি দিয়ে বললো-

–‘মিসেস দিশা,দিশা আন্টি আর এখন দিশা মা।

সূচনা বিস্মায়াবিষ্ট চোখে তাকিয়ে রইলো। সব গুলিয়ে ফেলছে সে।দিশা মা মানে তার মা?মানে তার আম্মু আব্বু আগে থেকেই প্রণয়ের সাথে পরিচিত?শুরু থেকেই তাদের সম্পর্কে সব জানে ওনারা?সূচনা মাথা চেপে ধরে ফ্লোরে বসে পড়তে নিলেই প্রণয় দুবাহু ধরে দাড় করালো।তার দুই গালে হাত রেখে বললো-

–‘ রিয়াদ তোমার সাথে যা করেছে সেটা জানার পরে আমি তাকে ছেড়ে দিব সেটা ভাবলে কী করে?তারওপর তার সাথে আমারও কিছু হিসেব নিকাশ বাকি,তার স্ত্রী আর তোমার বান্ধবী স্নেহা।তারা ও তো রিয়াদের শাস্তি চায়।এতগুলো মানুষের সাথে অন্যায় করার পর তাকে শাস্তি না দিয়ে কী পারা যায় বলো?মে রে ফেলতে তো পারি না,যতই হোক সে মানুষ।তাকে হত্যা করার অধিকার নেই।তাই ছোট্ট শা স্তি দিলাম।

সূচনা আগের থেকেও বেশি অবাক বনে গেল। রিয়াদের নিজের স্ত্রী ও তার শাস্তি চায় কিন্তু কেন?স্ত্রী হয়ে সে নিজের স্বামীর শাস্তি চাচ্ছে?আর স্নেহা..স্নেহা কীসের শাস্তি চাইবে?কেন চাইবে?আগা গোড়া কিছু বুঝল না সূচনা।প্রণয় ভালো করে ই বুঝতে পারলো তার অবস্থা। তাই নরম স্বরে বললো-

–‘আমি জানি তুমি কী ভাবছো কিন্তু তার উত্তর পাওয়ার জন্য আরও কিছু ঘন্টার অপেক্ষা সহ্য করতে হবে তোমায়।কারণ তোমার প্রশ্নের উত্তর কালকে পাবে।একেবারে পাই টু পাই, প্রতি টা প্রশ্নের উত্তর, হেডলাইন হবে পেপারে,টিভিতে নিউজ হবে।তারপর আমার কাছে এসো কিছু না বুঝলে বুঝিয়ে দিব।

তার কথার পৃষ্ঠে সূচনা শুধু এতটুকু বললো-

–‘আমি আম্মুর কাছে যাব প্রণয়। নিয়ে চলুন, বারণ শুনব না আমি।

#প্রণয়ের_সূচনা
#লেখিকা_Nazia_Shifa
#পর্ব_৫৪
_____________________________
ড্রয়িংরুমের সোফায় মুখোমুখি হয়ে বসে আছেন মিসেস দিশা আর সুচনা। সূচনা কে নিয়ে তাদের বাসায় এসেছে প্রনয়। এত রাতে তাদের কে দেখে মিসেস দিশা আর আরহাম সাহেব দুজনই ঘা বড়ে গিয়েছিলেন। এদিকে দুজনের মধ্যে একজন ও কিছু খুলে বলছে না। মিসেস দিশা ঘাবড়ানো কন্ঠে জিজ্ঞাসা করলেন-

–‘কি হয়েছে একটু খুলে বলবি তো?

সূচনা সহসা বলে উঠলো-

–‘সত্যিটা শুনতে চাই,যেটা আমার কাছ থেকে লুকানো হয়েছে।

মিসেস দিনার টন ক নড়লো যেন,ফট করে তাকালেন প্রনয়ের দিকে।প্রনয়ের মুখয়ব আর দৃষ্টি দেখে যা বোঝার বুঝে নিলেন। চোখের সামনে পুরোনো ঘটনা গুলো ভেসে উঠলো ওনার।ভারী হয়ে উঠলো বুক। গম্ভীর কন্ঠে বললেন-

–‘কী জানতে চাও তা বলো।

সূচনা পূর্ণ দৃষ্টি রাখলো মিসেস দিশার উপর। ম্লানমুখে বললো-

–‘ তুমি প্রনয়কে আগে থেকেই চিনো ?নুরাইয়া আন্টি তোমার..?

–‘বান্ধবী..আমার বান্ধবী নুরাইয়া,বোনের মতো সম্পর্ক ছিল দুজনের। বিয়ের পরেও আমাদের সেই সম্পর্কে বিন্দু মাত্র পরিবর্তন আসেনি।নুরাইয়া আর ওর ভাই থাকতো ওদের ফুফুর বাড়িতে।বাবা -মা মারা যাওয়ার পরে ঠাই হয়েছিল সেখানেই।ওর ফুফা ফুফী ওকে খুব অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দেন ।বড়লোক ছেলে তারওপর নুরয়াইয়া সুন্দর হওয়ায় ছেলে পক্ষের কোনো দাবি দাওয়া ছিল না।ওদের আ্যরেন্জ ম্যারেজ ছিল,ওর স্বামীর সাথে ওর বয়সের ফারাক থাকলেও খুব ভালো ছিল, সুখেই ছিল দুজন। প্রনয়ের জন্ম,বেড়ে ওঠা, সব কিছু নিয়ে বেশ আনন্দে দিন পার করছিল। কিন্তু ইরা ওর পেটে আসার পর থেকেই ঝামেলা টা শুরু হয়। ইরাকে কনসিভ করার কথাটা ওর স্বামীকে জানানোর পর সে সোজা বলে দেয় এবোশনের কথা। কিন্তু নূরাইয়া কোনো ভাবেই রাজি হয়নি, কিভাবে হবে?মা তো! নিজের সন্তানকে কী কোনো মা মে রে ফেলতে পারে? তার জন্য পা ষান হতেও ভয়ংকর রকমের পাষা ন হৃদয়ের অধিকারী হতে হয়।কিন্তু নূরাইয়া তো একদম মোমের ন্যায় ছিল, হালকা তাপে গলে যাওয়ার মতো,সহজ-সরল একদম।তাইতো নিজের স্বামীর পরকীয়া সম্পর্কে ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি,সন্দেহ জিনিসটা আসেইনি ওর মাথায়,বড্ড বিশ্বাস করতো যে।রোজ রোজ এই প্রেগ্ন্যান্সি নিয়ে ঝ গড়া হত তাদের। আমিও প্রেগন্যান্ট ছিলাম তখন নয় মাসের। তুই পেটে এসেছিলি।ঐ অবস্থায় আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি ওকে দেখতে যাওয়ার। কিন্তু সব ঘটনাই বলেছিল আমাকে। নুরাইয়া ওর প্রেগনেন্সির সাত মাসের সময় জানতে পারে ওর স্বামীর পরকীয়ার কথা।বিশ্বাস ভেঙ্গে চুরমার হওয়ার পর ও নিজেকে সামলে নিয়েছিল। প্রেগনেন্সির নয়টা মাস পী ড়া দায়ক ছিল ওর জন্য কিন্তু সব কিছু ছাপিয়ে সে নিজের সন্তানকে জন্ম দিয়েছে। হসপিটালের পেমেন্ট,ওকে বাসায় নিয়ে যাওয়া,সব ওর স্বামীই করেছিল। কিন্তু টাকা দেয়া ছাড়া, স্ত্রী-সন্তানদের কোনো কিছুর ই কোনো খেয়াল ওনার ছিল না। তারপর একদিন নুরাইয়া সামনাসামনি তাকে বলে দিল যে, সে জানে তার পরকীয়ার কথা।এতে লাভ তার স্বামীর ই হয়েছে। তার এতো দিন যে লুকোচুরি করতে হতো সেটা বন্ধ হয়ে গেল। তারপর থেকে লোকসম্মুখেই শুরু হলো নোং রামি। ছেলে-মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে নুরাইয়া পড়ে ছিল সেখানেই। কিন্তু তারপর… তারপর… তারপর সব শেষ হয়ে গেল এক রাতে….তুই ছোট ছিলি, এক বছর কয় মাস হবে।২০০৫ সালের ৩০ শে ডিসেম্বর প্রনয়ের জন্ম দিন ছিল।১২ তম জন্মদিন,নুরাইয়া আমাদেরও দাওয়াত করেছিল,কিন্তু যাওয়া হয়নি কারণ তুই সেদিন অনেক বেশি অসুস্থ ছিলি। তাই যখন বললাম, তুই অসুস্থ যেতে পারবো না ও তোর খেয়াল রাখার জন্য এক গাদা জ্ঞান দিল।আর সে..টাই ছিল ওর সাথে আমার শে..শেষ কথোপকথন।’

মিসেস দিশা শেষের কথাখানি বলতে বলতে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। সূচনাও কাদছে।প্রণয় স্বাভাবিক ভাবেই বসে আছে।তার পাশেই নত মস্তকে বসে আছেন আরহাম সাহেব, ওনার চোখ জোড়াও ছলছল করছে। স্ত্রীর এই প্রিয় বান্ধবীর সম্পর্কে তো উনিও জানেন, তার করুন মৃত্যুর কথা জানেন।মিসেস দিশা নিজেকে সংযত করলেন, আবারো বলা শুরু করলেন-

–‘তখন রাত তিনটা কী তার একটু কম হবে, কলিং বেল এর আওয়াজ, দরজায় বিরতীহীন কড়াঘাতে আর ভীত কন্ঠের “আন্টি” ডাক শুনে যখন দরজা খুললাম বুক ধ্ব ক করে উঠলো!প্রনয় দাড়িয়ে আছে ছোট্ট ইরাকে নিয়ে।ঘেমে নেয়ে একাকার অবস্থা তার,
বড় বড় দম নিচ্ছিল সে। কিছু বলার আগেই এক প্রকার দৌড়ে এসে ঘরে ঢুকে সদর দরজা বন্ধ করে দেয়।তোর আব্বু আর আমি বারবার জিজ্ঞেস করছিলাম কি হয়েছে? কি হয়েছে? তার পৃষ্ঠে সে এতোটুকুই বলেছিল-

–‘আন্টি ইরাকে একটু ঘুম পাড়িয়ে দিবেন? তার কোল থেকে ছোট্ট প্রান টাকে নিয়ে গেলাম রুমে। পরিশ্রম করতে হলোনা খুব তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে গেল। ঘুমন্ত তোর পাশেই শুইয়ে রেখে বাইরে আসলাম। তার পর সেই নির্মম সত্যের মুখোমুখি হলাম।নুরাইয়ার মৃত্যুর খবরে আমি ভেঙে পরেছিলাম একদম,দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল,বুক ফেটে কান্না আসতো। শুধু ভাবতাম আমারই এই অবস্থা,প্রণয় এর অবস্থা কেমন?কিন্তু ছেলটা একেবারে পাথরের ন্যায় হয়ে গিয়েছিল।কান্না করতে দেখিনি আমি একবারও।ওর আত্মিয় স্বজন দের সাথে সাথে এমনিতেও সম্পর্ক ছিল না,আর যখন শুনলো সে ‘আত্মহত্যা’ করেছে , তখন ঝামেলায় জরিয়ে যাবে ভেবে বিধায় আর পরিচয়ই দেয়নি। অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করলাম পরের দিন রাতের ট্রেনেই তোর দাদা বাড়ি চলে যাবো ওদের নিয়ে। কারন তখন একটা জিনিসই মাথায় ঘুরছিল যে- আর যাইহোক ওদের দুজনের জীবন বাঁচাতে হবে।ঐ পিশা চটার হাতে পড়তে দেয়া যাবেনা। ভাবনা অনুযায়ী সব কিছুই ঠিক ছিল। কিন্তু যাওয়া হয়নি। কারন সেদিন রাতেই খবর আসে তার মৃত্যুর কথা। সেদিন বিকেলে প্রনয়দের খোঁজে আমাদের বাসায়ও এসেছিল কিন্তু আল্লাহ সহায় ছিলেন বলেই হাতে পড়েনি তার। ওনার মৃত্যুর পর সব ধামা চাপা পড়ে যায়। কারন কারোরই মাথা ব্যথা ছিল না ওনার মৃত্যু নিয়ে না ওনার না নুরাইয়ার..ওর ভাই মানে প্রনয়ের মামা ইসহাক ভাই তাও চেয়েছিলেন আইনি ব্যবস্থা নিতে.. কিন্তু কী করবেন?যার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিবেন সেই তো মা রা গেছে।আর তার মৃত্যুর আগেই সবকিছুই টাকা দিয়েযা করার করে গিয়েছিল।আর উনি প্রনয় আর ইরার কথা ভেবেও আর কিছু বলেননি। তখন আর্থিক অবস্থা ও তেমন উন্নত ছিল না।শুধু প্রণয় আর ইরাকে নিজের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন উনি।তারপর থেকে ওরা তাদের কাছেই বড় হয়েছে।ইরা কিছু ই জানেনা এসবের।আমিই নিষেধ করেছিলাম কারণ আমার ব্যাপারে একটু বলতে গেলে পুরো ঘটনা সামনে এসে পড়ার ভয় ছিল তাই।প্রণয়ের সাথে যোগাযোগ ছিল সবসময় ই।কিন্তু ও যে তোকে আগে থেকেই চিনত বা জানত এমন না।তোকে যেদিন দেখতে এসেছে সেদিনই প্রথম দেখেছিল তোকে।তোর বাবার পছন্দ ছিল,আমার ও অমত ছিল না তাই,আমরাই কথা এগিয়েছিলাম আগে।

মিসেস দিশা থামলেন এবার,কয়েক মিনিটের জন্য চুপ করে থাকলেন।হুট করে সূচনার এক হাত নিজের হাতে নিয়ে বললেন-

–‘শোন ইরাকে যে কারণে বলিনি তোকেও সেকারণেই বলিনি।ঐ ঘটনার বর্ননা করতে চাইনি।চাইনি সেটা আবার সামনে আসুক।কিন্তু বিয়ের পরে প্রণয়ই বলেছিল যে সময় হলে সে সব বলে দিবে তোকে।তুই ভুল বুঝিস না কাউকে।

সূচনা ক্রন্দনরত কণ্ঠে বললো-

–‘আমি ভুল বুঝচ্ছি না আম্মু, আমার ই দোষ, আমিই তারাহুরো করেছি নাহলে এমনভাবে সবটা সামনে আসত না।আমাকে মাফ করে দিও।আ’ম সরি আম্মু।

মিসেস দিশা কিছু না বলে সূচনাকে জড়িয়ে ধরলেন। তাদের মা মেয়ের মিষ্টি মুহুর্তের সাক্ষী হলেন আরহাম
সাহেব আর প্রণয়।সূচনাকে ছেড়ে দিয়ে মিসেস দিশা প্রণয়ের কাছে গেলেন, প্রণয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন –

–‘শোন বাবা,আমি তোর পাশে ছিলাম না?এখনো কিন্তু আছি আর আমি যতদিন বেচে আছি থাকব।বুঝেছিস?

প্রণয় বাধ্য ছেলের মতোন হাসি টেনে মাথা দুদিকে নাড়ালো।মিসেস দিশা আর আরহাম সাহেব রুমে চলে গেলন তাদের।তারা যেতেই প্রণয় সূচনাকে উদ্দেশ্য করে বললো-

–‘রুমে যাওয়া যাবে?

সূচনা পানিতে টইটুম্বুর আঁখি জোড়া প্রণয়ের দিকে তাক করলো।মাথা দুদিকে নাড়িয়ে নিচু স্বরে বললো-

–‘হু চলুন।
_______________________________
ফ্রেশ হয়ে এসে সোজা বেডে শুয়ে পড়েছে সূচনা।রুমে এসে ‘হু’, ‘হা’ ছাড়া আর কোনো কথা বলেনি সে।তার পাশে ই যে প্রণয় আধশোয়া হয়ে ছিল বেডে সেটাও যেন উপেক্ষা করে গেছে সে।প্রণয় কিঞ্চিৎ অবাক হয়েছে বটে।দু’বার ডাকার পরেও যখন সাড়া দিল না সূচনা।তখন প্রণয় নিজেই তার পাশে শুয়ে তাট বাহু টেনে নিজের দিকে ঘোরালো।জড়িয়ে ধরেই শুয়ে রইলো কতক্ষণ।সূচনা নড়লো না,কিছু বললো ও না।উত্তর জানা স্বত্ত্বেও প্রণয় জিজ্ঞেস করলো-

–‘কাদছো কেন?

ধারণা অনুযায়ী জবাব দিল না,জবাবের অপেক্ষা ও করলো না প্রণয়।সূচনার ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্নার আওয়াজ ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে লাগলো।প্রণয় কিছু বললো না, কান্না করতে মানা ও করলো না।মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো-

–‘ক্ষণিকের কান্না যদি লম্বা সময়ের সুখ দেয় তাহলে কান্না করতে নিষেধ করবনা আমি, বাধ সাধবনা। এই কান্নার সমাপ্তি আজকেই ঘটুক কালকের সকালে তার ছায়া না পড়ুক।’
.
.
.
সকাল দশটা সময়।ব্যস্ত নগরীর কোলাহল রাস্তায়,গাড়ি চলছে থেমে থেমে।একটু জ্যাম ছুটছে গাড়ি একটু এগোচ্ছে। সূচনার বিরক্তি চেপে রেখে বসে আছে, তার পাশে ড্রাইভিং সিটে প্রণয়।এক হাত তার স্টিয়ারিং এ, অন্য হাতে পরিহিত ঘড়িতে বারংবার সময় পরখ করছে। সূচনা এবার কিছু টা অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলো-

–‘কোথায় যাচ্ছি?

–‘পুলিশ স্টেশনে।

প্রণয়ের তৎক্ষনাৎ জবাব।পুলিশ স্টেশনের কথা শুনে সূচনা অবাক হওয়া কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলো-

–‘পুলিশ স্টেশনে? কিন্তু কেন?সেখানে কেন যাব?

–‘বাকি টা জানতে হবেনা?তাই যাব।

–‘কিন্তু?

–‘মুগ্ধ যেতে বলেছে।কেস যেহেতু ও সামলেছে তো ও ই ভালো জানে।তাই যাবো।রিল্যাক্স আমি আছি না।

প্রণয়ের শেষ বাক্য নিরবে হাসলো সূচনা। মনে মনে আওড়ালো –

–‘আপনি আছেন দেখেই তো ভ য় হয়না কোনো কিছু তে,চিন্তা হয় না।

#চলবে