প্রেমপ্রদীপ পর্ব-৫১+৫২

0
2669

#প্রেমপ্রদীপ
Part–51
Arishan_Nur (ছদ্মনাম)

শ্রাবণ জোর গলায় বলে,আব্বু এইসব মিথ্যা কথা। আয়েশা মিথ্যা বলছে৷ আর ওকে বিয়ে করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়!

আয়েশা একথা শুনে আরো শব্দ করে কেদে দেয়।

ফুপু রাগান্বিত গলায় বলে, শ্রাবণ ঠিক ঠিক করে বল তো? তুই চাচ্ছিস টা কি? আমার মেয়েটার সর্বনাশ করে তুই কি মজাটা পাচ্ছিস?

শ্রাবণ ভ্রু কুচকে বলে, আমি ওর কোন সবনাশ ই করি নি। করার নিয়ত ও নাই। আয়েশা নিজেই নিজের সর্বনাশ ঘটাতে চাচ্ছে।

শৌখিন শিকদার সাহেব দাঁড়িয়ে গেলেন। এতোক্ষন চুপ থাকলেও এখন তিনি বলতে লাগলো, আমি এতো কিছু জানি না শ্রাবণ। আয়েশা গত কালকেই আমাকে তোমার ব্যপারে অভিযোগ দিয়েছে আর আজকেই নিজ চোখে আমি সেই নমুনা দেখতে পেলাম। তোমাকে কিন্তু কোন মেয়েকে অসম্মান করার শিক্ষা আমি বা তোমার মা দেইনি। তারপর ও তুমি এতোটা নিচে কিভাবে নামতে পারলে? নিজের বংশ স্ট্যাটাস এইসব ভুলে গেলে কিভাবে? তুমি ফাকা বাসা পেয়ে যা করতে ধরেছিলে এইসব তো লো মেন্টালিটির মানুষ ও করে না।

— বাবা। তুমি সত্য টা জানো না৷ আয়েশাই,,,,,,

তার আগেই ফুপু বলে উঠে, সব দোষ আমার মেয়ের। ভাই দেখলে, তোমার ছেলের কোন দোষ নাই!

শৌখিন সাহেব কড়া গলায় বলে, আমি এতোসব বুঝি না। ভাই বাংলাদেশে আসলে তোমার আর আয়েশার বিয়ে পড়ানো হবে৷

শ্রাবণ বলে উঠে, আমি মরে গেলেও আয়েশাকে বিয়ে করবনা৷

ফুপু বলে উঠে, আমার মেয়ের জন্য তো মাত্রই মরিয়া হচ্ছিলি, এখন আবার কি হলো? মন উঠে গেল?

— মন তো বসেই নি কোন দিন তাই উঠার কোন চান্স নেই। আব্বু আমি যাচ্ছি।

শৌখিন সাহেব তাকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে শ্রাবণ কড়া গলায় পুনরায় বলে উঠে, আমাকে আটকানোর চেষ্টা করে লাভ নেই আমি গেলাম। আল্লাহ হাফেজ।

বলে শ্রাবণ গটগট করে আয়েশাদের ডুব্লেক্স বাসার বাইরে চলে এলো। তার ফুপুর বাসার অপজিটেই চায়ের দোকান। সেখানে গিয়ে এক কাপ চা বানাতে বলে সে সিগারেট ধরায়। মাথা জাম হয়ে গেছে তার। কি ডেঞ্জারাস মেয়ে সে! বাপ রে বাপ!

শ্রাবণ সিগারেট টানছে আর ভাবছে, তার বাবা এতো সহজ পাত্র না। আজকেই বিয়ে পড়ায় দিত, ভাগ্য ভালো ফুপা ছিল না। কিন্তু যতো দূর সে জানে ফুপু আসবে। খুব দ্রুত আসবে। ফুপা আসলে তার বাঁচার রাস্তা বন্ধ। তাই যা করার দ্রুত করতে হবে৷ আলিয়ার কাছে যেতে হবে তাকে। শ্রাবণ চা না খেয়েই হাটা দিল সামনের দিকে।

★★★

আলিয়া বিকেলে হাসপাতাল থেকে ফিরে বড্ড ক্লান্ত। দুচোখ জুড়ে ঘুম আর ঘুম। কিন্তু সে জানে বিছানায় গেলে আর ঘুম হবে না। তখনি তাকে আপা ডাইনিং রুম থেকে ডাকতে লাগে।

সে চুল মুছে, ভেজা চুল ছাড়তে ছাড়তে আপার কাছে গেল। আপা মুচকি হেসে তার প্লেটে খাবার বেড়ে দিচ্ছে।

আপার বিয়ে দ্বিতীয় দিন আজ। ডাইনিং রুমে কাচ্চির গন্ধ মো মো করছে। বিয়ের অনুষ্ঠানে বেচে যাওয়া কাচ্চি আর রোস্ট আপা তাকে গরম করে দিয়েছে খাওয়ার জন্য। আলিয়া হাসপাতাল থেকে ফিরেই ভাত খেয়ে নেয়।

সে চেয়ারে বসে আপার দিকে তাকালো। ইশ আপাকে আজকে কি যে অপূর্ব লাগছে! গোলাপি রঙের একটা সালোয়ার কামিজ পড়েছে। চুল গুলো বেনি করা। আপার চেহারায় একটা অন্য রকম আভা ছড়িয়ে আছে। সেই সাথে যুক্ত হয়েছে নাকের দুল। আপা আজকে নাক ফুড়িয়েছে। নাকের ডান পাশে ছোট দুলটা মুক্তার মতো চকচক করছে। কি যে সুন্দর লাগছে আপাকে! ভাইয়া এই অবস্থায় আওয়াকে দেখলে নিশ্চয়ই আরেক দফা প্রেমে পড়ে যাবে।

আয়না বলে উঠে, কাবাবটা গরমে দিয়েছি। অপেক্ষা কর। আর সালাদ বানিয়ে দিব?

— না। লাগবে না আপা। আব্বু কই?

— আব্বু আর নানা তো বাইরে গেল।

— ওহ।

আয়না আলিয়ার প্লেটে কাবাব দিয়ে নিজের রুমে ঢুকে পড়ে। আজকে একবারো সমুদ্রের সঙ্গে কথা হয়নি। ফুপাকে হাসপাতালে চেক আপ করানোর জন্য নিয়ে যাবে আজ। সমুদ্র কি গিয়েছিল? আর যদি গিয়ে থাকে তাহলে ডাক্তার কি বলল? আয়নার মধ্যে অস্থিরতা বিরাজ করতে লাগলো।

আলিয়া খেয়ে দেয়ে নিজের রুমে গেল। খাওয়ার পর চাংগা লাগছে তার। সে নিজের পড়ার টেবিলের সামনে গেল। আলিয়ার হুট করে চোখ যায় বুক সেলফের দিকে। সেখানে সুন্দর মতো সাজিয়ে রাখা আছে, শেহজাদী বইটা। সে টান মেরে বই টা বের করে।

শেহজাদীর প্রচ্ছদ টা দেখে যে কেউ মুগ্ধ হবে। এত্তো সুন্দর! একটা রাজপ্রাসাদের ছবি আকা। রাজপ্রাসাদের দোতলা। দোতলার রেলিং ছাড়া মোটা সিমেন্টের বারান্দায় একটা গোলাপি শাড়ি পড়া মেয়ে বসে আছে । মেয়েটা পেছন হয়ে বসে আছে জন্য চেহারা দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু ছবিটা এমন যে মনে হবে এক দমকা হাওয়ায় মেয়েটার শাড়ির আচল ও চুল উড়ছে।

এই প্রচ্ছদ দেখে যে কেউ ওয়াও বলবেই। এই প্রচ্ছদ টা নাকি শ্রাবণ নিজেই একেছে। আলিয়া আর শ্রাবণের কাছে এই বইটা খুব স্পেশাল ও মূল্যবান।

এই শেহজাদী বইটা শ্রাবণ আলিয়াকে উৎসর্গ
করেছে। আলিয়া পেজ উল্টিয়ে উৎসর্গ পত্রে গেলো। গোটা গোটা ছাপা অক্ষরে লেখা, উৎসর্গ এরপর নিচে লেখা আমার শেহজাদীকে।

আলিয়ার মুখে সঙ্গে সঙ্গে এক চিলকে হাসি ফুটল। এরপর দুই লাইনের মতো গ্যাপ দিয়ে কিছু কথা লেখা। সেগুলো পড়তে লাগে আলিয়া৷

আমার শেহজাদীর ঠোঁটের কোণের এক চিলকে হাসি আমার সারা দিনের ক্লান্তি ঘুচিয়ে দেয়। শেহজাদী সাহেবাকে কোন উপহার দেওয়ার সামর্থ্য এই অধমের নেই। তাই এক খন্ড ভালোবাসা তার নামে লিখে দিচ্ছি। সে কি গ্রহণ করবে এই অধমের ভালোবাসা?

আলিয়া পর পর পৃষ্ঠা উল্টিয়ে যাচ্ছে। হুট করে ৫৫ নাম্বার পেজে গিয়ে চোখ আটকা পড়ে। ৫৫ নাম্বার পেজের মাঝ প্যারায় মোটা কালো কালিতে দুই লাইন লেখা। সে আনমনে পড়তে লাগে,

নারীর –কাদলে সান্ত্বনা ও সাজলে প্রশংসা
চাই-ই-চাই!

আলিয়া অবাক হলো। আসলেই তো! শ্রাবণের বলা এই কথাটা আসলেই সত্য। এই যে সে কাদে, মনে মনে আশা রাখে কেউ তাকে বুকে আগলে নিবে, কেউ তার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলবে, কেদো না। তুমি কাদলে আমার পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়৷

আবার যখন খুব করে সাজে তখন মন চায় কেউ বলে উঠুক, তোমায় দারুন লাগছে৷ মেয়ে তুমি এতো সুন্দর কেন বল তো?

শ্রাবণ এই সুক্ষ্ম বিষয়টা কিভাবে ধরতে পারলো? সে লেখক এইজন্য নাকি তার স্পেশাল কোন ক্ষমতা আছে?

সে ফোস করে একটা নিশ্বাস ছাড়লো। তখনি বেল বেজে উঠল।

আলিয়া ওড়না গায়ে দিয়ে গেট খুলতে গেল। গেট খুলে দিতেই তার চোখ কপালে। যাকে নিয়ে ভাবছিল সে তার সামনে দাড়িয়ে আছে। এটা কিভাবে পসিবেল?

শ্রাবণ আলিয়াকে দেখে শান্তি পেল। এতোক্ষন তার জানটা শুকিয়ে ছিল। এখন আলিয়াকে দেখে তার জানে পানি এলো।

সে বলে উঠে, আলুভর্তা! তোমার সাথে জরুরি কিছু কথা আছে। প্লিজ বাইরে আসো।

আলিয়া কঠিন গলায় বলে, না৷

–প্লিজ কাল নাগিনী আমার!

আলিয়া কটমট চোখে শ্রাবণের দিকে তাকালো।

শ্রাবণ চুপসে গিয়ে বলে, ইয়ে মানে,,, তুমি তো আমার শেহজাদী। প্লিজ রাগ করে থেকো না। অনেক তো হলো,,,,,

এমন সময় আয়না রুম থেকে হাক পেড়ে বলে, কে এসেছে আলিয়া?

শ্রাবণ ভয় পেয়ে যায়। আলিয়া যদি বলে তোমার জামাইয়ের ফুপুত ভাই এসেছে। ব্যাপার টা খুব বাজে হবে। জামাই নেই কিন্তু জামাইয়ের ভাই এসেছে!

আলিয়া বলে উঠে, আপা পাশের বাসার রিন্তি এসেছে। আমি ওর সাথে ছাদে যাই?

আয়না ওপাশ থেকে বলে, আচ্ছা গেট লাগিয়ে যা। তাড়াতাড়ি আসিস।

এই কথা শুনা মাত্র শ্রাবণ আলিয়াকে নিয়ে ছাদের দিকে হাটা দিল।

আলিয়া বিরক্তি সুরে বলে, কি চাই?

শ্রাবণ সোজাসাপটা উত্তর দিল, তোমাকে।

–হুয়াট!

— আই মিন, আলিয়া বি সিরিয়াস।

— আমি সিরিয়াস ই থাকি।তুমি সবকিছু কে ফান মনে করো। আমি না।

শ্রাবণ করুণ চোখে আলিয়ার দিকে তাকিয়ে বলে, আলিয়া আমি অনেক বড় বিপদে পড়ে গেছি। প্লিজ আমাকে উদ্ধার কর।

আলিয়ার বুক ছ্যাত করে উঠে। কি হয়েছে শ্রাবণের। সে মাত্র শ্রাবণ কে খেয়াল করল। তার চোখ ভেজা ভেজা৷

আলিয়া কোমল গলায় বলে, কি হয়েছে তোমার?

–বাবা আমাকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দিতে চাচ্ছে। কিন্তু আমি বিয়ে করতে চাই না। প্লিজ আলিয়া আমাকে বাচাও।

আলিয়ার হুট করে কি যেন হলো। সে হো হো করে হেসে উঠে।

শ্রাবণ করুণ চোখে তাকিয়ে থেকে বলে, আমার দুঃখে তুমি হাসছো?

আলিয়া হাসি থামিয়ে দিয়ে বলে উঠে, তুমি যেসব কথা বলছো এগুলা তো মেয়েরা বলে। ছেলেদেরকে কেউ জোর করে বিয়ে দেয় নাকি?

–নারী-পুরুষের বৈষম্য বন্ধ কর৷ আর আমাকে ফাসানো হচ্ছে৷

— মানে?

— মানে হলো আই লাভ ইউ। আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। দেখ, আমার কাছে কালকে দুপুর পর্যন্ত টাইম আছে। এর মধ্যে যদি তুমি আমাকে মাফ করে না দাও। তাহলে আমি মিরপুর শেওড়াপাড়ার মাঝ রাস্তায় শুয়ে পড়ব। গাড়ি আমার গায়ে উঠালেও সরব না৷

আলিয়া মজা করে বলে, শেওড়া পাড়ায় মেট্রোরেলের জন্য যে জ্যাম পড়ে মনে হয় না তোমার কিছু হবে।

শ্রাবণ মুখ ভোতা করে বলে, আমাকে ক্ষমা করবে?

— না।

— কেন?

— ইউ আর এ সাপ। সাপ আর শক্রুকে কভু ভরসা করিতে নেই।

— তুমি আমাকে সাপ বানিয়ে দিলে?

— তুমি যদি আমাকে ছলনাময়ী বলতে পারো তবে আমি কেন তোমাকে সাপ বলতে পারব না?

শ্রাবণ আলিয়ার হাত চেপে ধরে বলে, ঠিক বলেছো শক্রুকে বিশ্বাস করতে নেই। আমি না বুঝেই বন্ধু বেশে থাকা শক্রুকে ভরসা করে হারে হারে পস্তাচ্ছি। ভারচুয়ালে সে আমার সব অস্তিত্ব বিলীন করে দিয়েছিল।

আলিয়া অবাক হলো। আসলেই তো। শ্রাবনের আগের একাউন্ট, পেজ কিছু ই নেই! সব নতুন করে খোলা। শ্রাবণের ফ্যান-ফলোয়ার অনেক বেশী ছিল আগে কিন্তু এখন তার হাফ ও নেই৷ আলিয়া মনে করলো, শেষ বার তাদের যে-সব চ্যাট হয়েছিল সেখানে শ্রাবণের টাইপিং স্টাইল কিছুটা আলাদা ছিল। তার মানে কি শ্রাবণ যা বলছে সব সত্য? আসলেই হ্যাক হয়েছিল?

সে বলে উঠে, তুমি না নিজেই ইঞ্জিনিয়ার। তাও কেন হ্যাক হলো?

— ইঞ্জিনিয়ার জন্য ই বুঝেছিলাম হ্যাক হয়েছে৷ আমি সব ঠিক করতে করতেই ও আমার ক্ষতি করে বসে। আসলে ওই দিন আমি অন লাইনে ছিলাম না। ও জানত এই ব্যাপার টা এজন্য হামলা করে যখ আমি অফলাইনে ছিলাম।

— তুমি কি আবির ভাইয়ের কথা বলছো?

— হ্যা৷ ওই শালাই আমার এতো বড় ক্ষতি করছে।

— ওর সাথে না তোমার রগে রগে ভাব ছিল?

শ্রাবণ ক্লান্ত হাসি হেসে বলে, ওই যে সাপ আর শক্রু কে ভরসা করতে নেই। যাইহোক তুমি যদি ক্ষমা না করো তাহলে হয়তো বা আমি গাড়ির তলে গিয়ে মরব না। কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলব। হয়তো আর আগের মতো হাসব না!

আলিয়া চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তারা ছাদের সামনে দাড়িয়ে থাকলেও ভেতরে ঢুকেনি। সিড়িঘরে দাঁড়িয়ে আছে।

আলিয়ার কাছ থেকে কোন উত্তর না পেয়ে শ্রাবণ সিদ্ধান্ত নিল আর বাসায় ফিরবে না৷ এখন থেকে সন্নাসির মতো ঘুরে ঘুরে বেড়াবে। আলিয়া তাকে বিয়ে না করলে সে হিমু হয়ে যাবে। নারায়ণগঞ্জ গিয়ে মাটি খুড়ে পূর্ণিমা রাতে মাটির গর্তে ঢুকে চন্দ্রবিলাস করবে।

সে আলিয়ার হাত ছেড়ে দিয়ে পেছনে ঘুরে হাটা দিবে সঙ্গে সঙ্গে আলিয়া তার কলার চেপে ধরে বলে, এই সাপ! কই যাও?

শ্রাবণ বলে উঠে, এখান থেকে নারায়ণগঞ্জ যাব৷

— নারায়ণগঞ্জের কোথায়?

— নারায়ণগঞ্জের কাছাকাছি। ড্রেজার কলোনি।

— সেখানে গিয়ে কি করবে?

— মাটি খুড়ে হিমুর মতো বসে থাকব।

শ্রাবণ কথা শুনে আলিয়া হেসে বলে, কেন তুমি কি সাপ বা বেজি নাকি পোকা যে মাটির ভেতরে গর্ত ঘুরে বসে থাকবে।

— মহাপুরুষ হবো হিমুর মতো। তারপর আমার দুনিয়া হবে এন্টি লজিক্যাল!

আলিয়া হেসে বলে, মাথা নষ্ট হলো নাকি?

— দেখ আমি আয়েশাকে বিয়ে করব না।

— কেন? ওর সাথে তো ঠিকই ঢ্যাং ঢ্যাং করে নাচলে।

শ্রাবণ হতাশ হয়ে গেল এবং বলল, নাচা আর সংসার করা কি এক?

— জানি না তো।

— জানতেও হবে না কিছু। যত জানবে তত ঝামেলা। শুধু এতোটুকু জেনে রেখো কোন এক পাগল তোমায় পাগল হওয়ার আগে খুব ভালোবাসত।

— এই সাপ! আমি এখনো তোমাকে ভালোবাসি। যাও আজকে এই পূর্নিমা রাতে তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম। পূর্নিমা রাত কাউকে ক্ষমা করার জন্য অত্যন্ত সুসময়!

শ্রাবণের চোখ চিকচিক করতে লাগলো। সে আলিয়াকে চেপে ধরে বলে, জন্ম-জনম ধরে তোমায় ভালোবাসি শেহজাদী। আমি হয়তো বা সুখের সন্ধানে হাটা শুরু করে দিয়েছি!

আলিয়া বলে উঠে, আচ্ছা। আয়েশা কিসে পড়ে?

— ওই জঘন্য মেয়েটার কথা কেন বলছো? বাদ দাও।

— না। শ্রাবণ। ওকে কষ্ট দিয়ে আমি নতুন করে কিছু শুরু করতে চাই না। ও তোমায় ভালোবাসে। মেয়েটা তো বেশি বড় না। ইমম্যাচিউর। মাত্র টিন এজ থেকে বেরিয়ে বড় হচ্ছে। ও ভুল করে ফেলেছে। তোমার উচিত ছিল ওকে গালিগালাজ না করে সুন্দর করে বোঝানো। তুমি তা করো নি। এখন ফোন দিয়ে ওকে বুঝাও। ও যা করছে তাতে যদি ও সফল হয় তাহলে দুইজন ই কষ্ট পাবে।

— ও একটা ডাইনি। ওরে থাপরানো দরকার

আলিয়া হেসে বলে, ভুল আমরা সবাই করে ।বসি।

— ফোন দিয়ে কি বলব?

— লেখব সাহেব ফ্যাক্ট তুলে ধরবেন৷

সে ফোন দিল। আয়েশা সঙ্গে সঙ্গে ফোন ধরে। শ্রাবণ বলে উঠে, আয়েশা আমি দুঃখিত। রিয়েলি আই এম সর‍্যি।

— কেন?

— সেদিন রেস্টুরেন্টে তোমাকে অপমান করা ঠিক হয় নি।

— আমি ফরগিভ ইউ।

— থ্যাংক্সস। এবার শুনো, তুমি আমাকে ভালোবাস তাই না?

–অবশ্যিই।

— আই রেসপেক্ট ইউর ফিলিংস। বাট আয়েশা ভালোবাসা এক তরফা হতে নেই। এক তরফা ভালোবাসা শুধু পোড়ায়। আমি তোমাকে ভালোবাসি না। আমি ভালোবাসি আমার কাল নাগিনী কে। আমি তোমার হলে, আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলব। তুমি নিশ্চয়ই চাবে না তোমার ভালোবাসা ধুকে ধুকে মরে যাক। তুমি আমার কাজিন। তোমার মঙ্গল চাই সবসময়ই। তোমার জন্য দোয়া রইল। আমি চাই তুমি অনেক সাকসেস হও। আকাশ স্পর্শ করার মতো উন্নতি সাধন করো জীবনে। ক্যারিয়ার গড়ো। তোমাকে পাবলিক্যালি অপমান করা অনুচিত হবে আমার। জানো আয়েশা আমাদের গোটা একটা জীবন উচিত-অনুচিত বুঝতে বুঝতেই পার হয়ে যায়। আমি তোমাকে হ্যাপি দেখতে চাই৷ আমাকে ভুলে যাও। যেই ভালোবাসা ক্ষতি বয়ে আনে, সেটা ভালোবাসা না। ভ্রম সেটা!

আয়েশা কাদতে কাদতে বলল, তুমি যেদিন আমাকে এতো লোকের সামনে থাপ্পড় মারলে আমি প্রচুর রেগে যাই। জিদ চেপে যায় আমার মধ্যে। কিন্তু আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি।

I can feel you. নেক্সট টাইম যখন দেখা হবে আমাদের তখন আমাকে কাজিনের নজরে দেখবে। তোমার বয়স কম। বুঝ কম। বাস্তবতার সঙ্গে যখন জড়াবে তখন বুঝবে কি বিপদ ডেকে আনতে যাচ্ছিলে। ভালো থেকো। তোমার জন্য অনেক দোয়া।

— আমি কি তোমার জন্য অপেক্ষা করব?

— না।
— কাদতে পারব তোমার জন্য শেষ বারের মতো?

শ্রাবণ না বলতে গিয়েও আলিয়ার দিকে তাকিয়ে স্মিত হেসে বলে, পারবে।

ওপাশ থেকে আয়েশার কান্নার আওয়াজ ভেসে আসে। শ্রাবণের মায়া লাগে। সে ফোন কেটে দেয়।

চলবে।

#প্রেমপ্রদীপ
Part–52
Arishan_Nur (ছদ্মনাম)

রাত দশটা বাজে।সমুদ্র বাসায় ঢুকল। এতোক্ষন যাবত সে ছাদে ছিল। বাসায় আসতেই দেখল বাবা আর পিউ ড্রয়িং রুমে বসে টিভিতে কি যে অধীর আগ্রহ নিয়ে দেখছে৷

সমুদ্র বাসায় ফিরতেই আবেগ ছেলেকে প্রশ্ন করে, বউমাকে নিয়ে এলি না কেন?

— আব্বু আজকে ওই দিকে যাই নি। আগামীকাল দুপুরে যাব৷

— আচ্ছা।বস আমার পাশে। কথা আছে তোমার সাথে।

সমুদ্র কিছুটা অবাক হলো।এরপর বাবার মুখোমুখি বসল।

আবেগ কিছুটা উচ্চ শব্দে বলে উঠে, রোদেলা! এদিকে একটু আসো তো৷

পিউয়ের চোখে প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কি হতে চলেছে! বাবা কি বলবে?

রোদেলা ড্রয়িং রুমে আসতেই আবেগ বলে উঠে, বস। কথা আছে তোমাদের সঙ্গে।

রোদেলা বসে পড়লে আবেগ বলে উঠে, জানো আমার বহু আগে থেকেই খুব ইচ্ছা ছিল আমার ছেলে-মেয়েরা নিজের বাবার গাড়িতে করে ঘুরবে।প্রতি শুক্রবার আমরা পুরা পরিবার মিলে একসাথে গাড়িতে করে ঘুরতে যাব। বিয়ের পর পর এই ইচ্ছা টাকা না থাকার জন্য পূর্ণ হয়নি। আর যখন টাকা হলো তখন পরিবার টা কাছে পাইনি।

একথাটা সবার মুখে বিষাদ এনে দিল।

আবেগ বলে উঠে, আমি চাইলেই গাড়ি কিনতে পারতাম অনেক আগেই। কিন্তু গাড়ি কিনেই বা কি করব? যদি সেই গাড়িতে আমার ছেলে-মেয়েরাই, স্ত্রীই না উঠে? এইজন্য আর সেই শখ পূর্ণ করিনি। কিন্তু এখন চাচ্ছি গাড়ি কিনতে। আল্লাহর রহমতে গাড়ি কেনার সার্মথ্য আমার অনেক আগেই হয়েছে।

পিউ বলে উঠে, বাবা তোমার ইচ্ছা অবশ্যই পূরণ হওয়া উচিত।

এবারে সমুদ্র বলে উঠে, টাকা থাকলে কালকেই গাড়ি কেনা যাবে। চল কালকে ভালো কোন সো রুমে যাই।

আবেগ বলে উঠে, আমি শৌখিনের সঙ্গে কথা বলেছি। ও যাবে আমাদের সঙ্গে ও তো ব্যবসা-বানিজ্য করে। এইসব ভালো বুঝে৷

— আচ্ছা।

আবেগ কিছুটা থেমে বলে উঠে, কালকে দুপুরে একজন অথিতি নিমন্ত্রণে আসবে। সবাই বাসায় থাকবে।

পিউ মাথা নেড়ে বলে উঠে, আচ্ছা বাবা। আমি তো সবসময়ই বাসায় থাকি।

আবেগ বলে, সমুদ্র তুমি কাল সকালেই বউমাকে নিয়ে আসবে। দুপুরে ওরা আসবে, তখন বউমা থাকলে আমি খুশি হবো।

— আচ্ছা। বাবা।

— আর হ্যা বিকেলে সো রুমে যাব। কালকে অফিস থেকে ছুটি নিলে অসুবিধা হবে?

— কালকে এমনিতেই বন্ধ।

— কেন?

— বাবা কালকে শুক্রবার।

— ওহ। দেখলে বার-তারিখের হিসাব আর মনে থাকে না।

সমুদ্র মৃদ্যু হাসে। বাবা এতো স্বাভাবিক আছে কিভাবে? ওনাকে কি মা কিছু বলেনি? সমুদ্র বারবার মায়ের দিকে তাকাচ্ছে। মা ও তার দিকেই তাকিয়ে আছে। তার চাউনি দেখেই বোঝা যাচ্ছে মা বাবাকে কিছু বলেনি।

সমুদ্র ফোস করে একটা শ্বাস ছাড়ে। মা ভালোই করেছে বাবাকে না জানিয়ে। আপাতত বাবাকে খুব খুশি মনে হচ্ছে। পিউয়ের সাথে কি নিয়ে যেন কথা হচ্ছে। আচ্ছা বাবা কি তার চেয়ে বেশি পিউকে ভালোবাসে? পিউ মাত্র কিছু দিন আগে বাংলাদেশে ব্যাক করেছে। আর এতেই বাবা আর সে কত গল্প গুজব করে। আর বাবার সঙ্গে সমুদ্র ছোট বেলা থেকেই থাকছে।তাও এভাবে গল্প করেনি কোন দিন। পিউয়ের অট্টহাসির শব্দে সমুদ্র নিজেও হেসে দিল কিঞ্চিৎ। তার বোনকে হাসলে খুব চমৎকার দেখায়। মজার বিষয় হলো পিউ হাসলে তার ডান গালে হালকা টোল পড়ে। খুব নিখুঁত ভাবে লক্ষ না করলে বোঝা যায় না যে পিউয়ের ডান গালে টোল পড়ে!

সমুদ্র তার মাকে বলে উঠে, এক কাপ চা বানাতে পারবেন?

রোদেলা চমকে উঠে বলে, এখন? এখন তো রাতের ভাত খাওয়ার সময়। এই সময় চা খেলে ক্ষুধা নষ্ট হয়ে যাবে।

মায়ের কথা শুনে সমুদ্রের হাসি পেল ক্ষুধা নষ্ট হয় নাকি আবার! মজার কথা তো!

সে বলে উঠে, তাহলে চা বানানোর দরকার নেই। আপাতত ক্ষুধা নষ্ট করার ইচ্ছা আমার নেই।

রোদেলা সুক্ষ্ম চোখে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। ছেলে তার বড্ড বুদ্ধিমান। হুটহাট কথার প্যাচে তাকে প্যাচিয়ে ফেলে। কিন্তু আজ ছেলের চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, ছেলে তার উপর রেগে নেই। বেশ সহজ গলায়ই কথা বলছে। বিয়ের পর থেকে ছেলের এই পরিবর্তন টা চোখে পড়ার মতো। এখন আর একটুতেই রেগে যাচ্ছে না ছেলে।

ইভানা হুট করে ছুটে এসে বলে, ভাই! দেখো না এতো রাত হলো শ্রাবণ তো এখনো বাসায় আসেনি।

আবেহ বিচলিত হয়ে গেল এবং বলল, শ্রাবণ বাসায় নেই?

— নাহ। সেই যে দুপুরে গেছে এখনো ফিরেনি। ওর বাবা বারবার ফোন দিচ্ছে। ও তো খুব চিন্তা করছে।

— কোন বন্ধুর বাসায় গিয়েছে?

— উহু। সবাইকেই কল দিলাম। কেউ ওর খবর জানে না। ও তো এতো রাত অব্দি একা বাইরে থাকে না।

আবেগ বলে, চিন্তা করিস না। সমুদ্র তুমি দেখো তো ওর খোজ পাও কিনা৷

সমুদ্র দ্রুত ফোন বের করে ম্যাসেঞ্জারে শ্রাবণ কে নক দেয়। ম্যাসেঞ্জারে শ্রাবণ কে ২০ মিনিট আগে এক্টিভ সো করছে।

সমুদ্র লাগাতার কল দিয়েই যাচ্ছে। শ্রাবণ ফোন ধরছে না। প্রায় আধ ঘন্টা পর বাসার বেল বেজে উঠল।

গেট খুলতেই দেখা গেল শ্রাবণ হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ফুপু তাকে এক দফা বকা-ঝকা করল। তাতে মনে হয় না শ্রাবণের মধ্যে কিছু হলো। সে নির্বিকার।

শ্রাবণ ফ্রেস হয়ে আসলে সবাই একসাথে খেতে বসল। শ্রাবণ কেও বলা হলো সে যেন কাল বাইরে না যায়।

★★★

পরের দিন বেশ সকালেই সমুদ্র আর আবেগ বাজারে গেল। বাজারের সবচেয়ে বড় রুই মাছ কেনা হলো।

রুই মাছ কেনার সময় মাছের কান কিভাবে দেখতে হউ তা সমুদ্র কে আবেগ শিখিয়ে দিল। এরপর ইলিশ মাছ কিনা হলো।

ইলিশ মাছ কেনার সময় আবেগ খুব মনোযোগ দিয়ে সমুদ্র কে মাছ চেনা শেখালো। সমুদ্র ও আগ্রহ নিয়ে সবটা দেখছে।তার বেশ ভালোই লাগছে। মনে হচ্ছে সে ছয় বছরের বাচ্চা ছেলে। বাবা তাকে এ বি সি ডি শেখাচ্ছে।

এরপরে তারা সবজি কিনতে গেল। সবজি কেনার সময় সমুদ্র আজকে নতুন একটা সবজি চিনল।এই সবজি তারা খায় না। সবজিটার নাম চিচিংগা। আকার-আকৃতিতে সব্জিটাকে তার ইন্টারেস্টিং লাগছে।

বাজার শেষ করে আবেগ বাসায় ফিরল। কিন্তু সমুদ্র সোজা আয়ুর কাছ গেল।

সমুদ্রের মনে দুশ্চিন্তা, ভয়, বেদনা একাকার হয়ে আছে। কিন্তু সে কাউকে বুঝতে দিচ্ছে না। এমন কি বাবাকেও না!

আয়নার বাসায় গিয়ে বেল বাজালো। গেট প্রতি সময়ের মতো আলিয়া খুলল।

আলিয়াকে দেখে সমুদ্র নিজেও অবাক। মেয়েটাকে আজকে মাত্রার বেশী বা অতিরিক্ত হাসি-খুশি লাগছে। চোখ-মুখ জ্বলজ্বল করছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে চাঁদ হাতে পেয়েছে সে।

সমুদ্র প্রশ্ন করে, ব্যাপার কি আলিয়া? তোমাকে খুব হাসি-হাসি লাগছে?

আলিয়া একথা শুনে এক গাল হেসে বলে, ভাইয়া আজকে আমি অনেক খুশি। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মেয়ে মনে হচ্ছে নিজেকে। আমার জন্য দোয়া করবেন৷

সমুদ্র আলিয়ার মাথায় হাত রেখে বলে, মহান করুণাময়ের কাছে এই দোয়াই রাখি যেন সে আজীবন তোমাকে এমনিই হাসি-খুশি রাখে।

সমুদ্র কে আরেক দফা নাস্তা খেতে হলো। নাস্তা খাওয়ার পর অথৈ এসে সবার সামনে দাড়িয়েই সমুদ্র কে উদ্দেশ্য করে বলে, বাবা আমার মেয়েটার দায়িত্ব তোমার হাতে দিলাম। মেয়েটা জীবনে অনেক কষ্ট পেয়েছে। আমি জানি তুমি ওকে খুব সুখে রাখবে। বাবা আমাকে ক্ষমা করে দিও।

সমুদ্র এক গ্লাস পানি খেয়ে বলে, মামী এসব কি বলছেন? ক্ষমা চাচ্ছেন কেন?

অথৈ মাথা নিচু করে বলে, তোমার আম্মুর সঙ্গে আমার একটা বিষয়ে মনোমলিণ্য হয়েছিল। এর জের ধরে তার সঙ্গে আমি খারাপ আচরণ ও করেছি।

সমুদ্র মৃদ্যু হেসে বলে, আচ্ছা! ওনার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করেছেন।ওনার কাছে ক্ষমা চান। আমাকে কেন মাধ্যম বানাচ্ছেন?

অথৈ মাথা নিচু রেখেই বলে, ওর সঙ্গে আমি আর কথা বলতে পারব না। মুখ দেখাতে পারব না আমি। কালকে অনেক বড় সত্য জেনে ফেলেছি। এরপর থেকেই অনুতপ্ত আমি। তুমি আমার হয়ে তোমার মাকে বলে দিও আমি খুব লজ্জিত! খুব! এও বলে দিও আমি ক্ষমাপ্রার্থী তার কাছে। যদিও আমাকে ক্ষমা না করলেই খুব খুশি হবো।

সমুদ্র এবারো মিস্টি হাসল। মানুষ বড্ড আজব প্রাণী।

সমুদ্র আয়নাকে নিয়ে বের হলো। বাসার সামনেই রিকশা চেপে দুইজনে পাশাপাশি বসে পড়লো।

আয়না সমুদ্রকে দেখেই বলে, তোমার কি মন খারাপ? চিন্তিত লাগছে অনেক?

সমুদ্র চমকে উঠে বলে, আরে না। চিন্তা কেন করব?

–ওহ। ফুপা ভালো আছেন?

–হুম।

— তুমি কেমন আছো?

— একদিনে নিশ্চয়ই ‘আমি ভালো আছি’ থেকে ‘মরে যাচ্ছি তোমাকে ছাড়া’ টাইপ হয়ে যাব না। ওতো উত্তম প্রেমিক হইনি আমি।

আয়না হিহি করে দু দন্ড হেসে বলে, শুধু শুধু অনুভূতি চাপানোর বৃথা চেষ্টা করছো কেন? হু?

সমুদ্রের খুব করে মন চাইল, আয়নাকে শক্ত করে চেপে ধরে বলতে, আমি ভালো নেই আয়ু। বাবা ছাড়া আমি অসহায়! প্লিজ তুমি আমার বাবাকে ঠিক করে দিতে বল!

কিন্তু বলা হলো না আয়ুকে। সে নিজেই বলল না। ইচ্ছা করল না বলতে!

দুপুরের আগে আগেই সমুদ্র আর আয়না চলে এল। আয়না এসেই ফুপুকে রান্নায় সাহায্য করতে লেগে পড়ল। হরেক রকমের রান্নার আয়োজন করা হচ্ছে। আয়না কিছু ই জানে না। কেন রান্না হচ্ছে তাও জানে না! তবুও কোন প্রশ্ন না করে সে রান্নায় সাহায্য করতে লাগে।

সমুদ্র গোসল সেড়ে নিল। এরপর সে, শ্রাবণ আর বাবা মিলে মসজিদে গেল।

★★★
রঙ্গন এই নিয়ে তিনটা পাঞ্জাবি বদলেছে। তার বেশ নার্ভার লাগছে। সে এখন হালকা সবুজ রঙের পাঞ্জাবি পড়ে আছে। সে চুল আছড়ে নিল। এরপর রজব আলীকে ফোন দিল। শেষমেশ বেশি টাকা দিয়ে সে ছোট খাটো এক অভিনেতা কে ধরে এনেছে। তার নাম রজব আলী। পার আওয়ার ১ হাজার বাজেট।

রঙ্গন মনের মধ্যে চিন্তার বস্তা নিয়েই বের হলো। বিয়ের আগে ধরা না খেলেই হয় তার।

পিউয়ের বাসায় পৌছাতেই তার পেটে ব্যথা অনুভব হল। সে বেল বাজাতেই পিউ নিজেই গেট খুলে কিছুটা অবাক হয়ে রঙ্গনককে হাই বলল।

রঙ্গন ভারী অবাক হয়। এই প্রথম কোন পাত্রীকে সে গেট খুলে পাত্র কে হাই বলতে দেখল!

পিউ সেযেগুজেই আছে। সুন্দর একটা সালোয়ার কামিজ পড়া।

রঙ্গন রজব আলীকে নিয়ে সোফায় বসে পড়ল।
সঙ্গে সঙ্গে আবেগ এসে পড়ে রুমে।

রঙ্গন দাঁড়িয়ে যায়।

আবেগ স্মিত হেসে বলে, আরে বস। বস।

রঙ্গন বসে পড়ে এবং রজব আলীকে দেখিয়ে যেই না বলবে উনি আমার বাবা। কিন্তু আফসোস উনি আমার বললেও বাবা শব্দটা মুখ থেকে বের হচ্ছে না তার। কি আশ্চর্য! দুটো মাত্র অক্ষর তাও মুখ দিয়ে এই শব্দ কিছু তেই বের হচ্ছে না তার। এক বছরের বাচ্চাও তো বাবাকে দেখলে বাবা বাবা বলে মাথা ব্যথা করে ফেলে। পাশে বসে থাকা ব্যক্তিটা বাবা নয় জন্যই কি মুখ থেকে বাবা শব্দটা আসছে না!

তাকে চুপ থাকতে দেখে আবেগ নিজ থেকে ই বলে উঠে, তোমার বাবা উনি?

রঙ্গনের যে হ্যা বলবে এটাও বলতে পারছে না। সব কেমন জানি গুলিয়ে যাচ্ছে।

রজব আলী বলে উঠে, জি ভাই সাহেব। কেমন আছেন?

আবেগ বলে উঠে, আছি মোটামুটি আল্লাহর রহমতে।

পিউ রজব আলীকে সালাম দিল। রঙ্গন মাথা নিচু করে ফেলে। তার কেমন জানি লাগছে। মাথা ও ব্যথাও করছে তার!

আবেগ বলে উঠে, পিউ মা নাস্তা পানি নিয়ে এসো।

রঙ্গনের জন্য নাস্তা দেওয়া হলো। সে একটাও মুখে দিতে পারলো না। কেমন জানি লাগছে তার।

ইশরাক রহমান রজব আলীর সঙ্গে কথা বলেই যাচ্ছে। সঙ্গে রোদেলাও টুকটাক কথা বলছে।

সে চুপচাপ বসে আছে। তার কেন যেন চিৎকার করে বলতে মন চাচ্ছে, এই লোক আমার বাবা না! আমার বাবা যেমন ই হোক, যতো অপরাধ ই করুক না কেন সে আমার বাবা। উনি যতোই ভালো হোক আই ডু নট কেয়ার।

প্রথম দিন স্কুল গিয়ে রঙ্গন কেদে দিয়েছিল। আজকে ও খুব করে কান্না করে বলতে মন চাচ্ছে, আমি আমার বাবার কাছে যাব।

চলবে।