Home "ধারাবাহিক গল্প প্রেম তুমি প্রেম তুমি পর্ব-০৩

প্রেম তুমি পর্ব-০৩

0
2184

#প্রেম_তুমি #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব__________৩

পরদিন সকালে ড্রয়িংরুমে আসতেই আমার পা দুটো থমকে গেল। মাঝেমধ্যে মনে হয়, চোখ দুটো যদি অন্ধ হতো, তবে হয়তো এই দৃশ্যগুলো দেখে কলিজাটা এভাবে ছিঁড়ে যেত না।

লিভিং রুমের সোফায় আরিয়ান বসে আছেন, আর নাতাশা ওনার হাত ধরে বসে আছে। নাতাশা খুব আদুরে গলায় হাসছে আর বলছে, “আরিয়ান, মনে আছে আমেরিকায় আমরা যখন একসাথে কফি শপে বসতাম?

আরিয়ানকে দেখলাম না করার কোনো চেষ্টা করছেন না। এক বছর ধরে যে মানুষটা আমার ছোঁয়াটুকুও সহ্য করতে পারেনি, সে আজ নাতাশার এতটা ঘনিষ্ঠতা পরম তৃপ্তিতে উপভোগ করছে।
আমি হাতে কফির কাপ নিয়ে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। নিজেকে খুব অপরাধী মনে হচ্ছিল, যেন আমি ওনাদের সুন্দর মুহূর্তের মাঝে এক বিষাক্ত কাঁটা।
নাতাশা আমাকে দেখে আরও যেন বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়ার নাটক শুরু করল। আরিয়ানের কাঁধে মাথা রেখে বাঁকা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওহ মিথিলা! তুমি কি এখনো দাঁড়িয়ে আছো? কফিটা রেখে যাও।
আরিয়ান একবার আমার দিকে তাকালেন।

আমি নিঃশব্দে কফি রেখে নিজের ঘরের দিকে চলে এলাম। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের প্রতিফলনটা দেখলাম।

নাতাশার খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে আসছে। আমি জানালার কাঁচের ওপর কপাল ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বললাম—

“আরিয়ান, আপনার হৃদয়ে কি আমার এক ফোঁটা জায়গা নেই?

অভাগী মিথিলার এই আর্তনাদ শোনার মতো কেউ নেই।

নিজের ঘরের ভেতর স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বাইরের ওই রঙিন হাসির শব্দগুলো কানে এসে বিঁধছে। নাতাশা আরিয়ানের হাতে হাত রেখে যে সুখের জগত বুনছে, সেখানে আমার মতো এক তুচ্ছ সেবিকার কোনো স্থান নেই।

হঠাৎ বুকের ভেতর থেকে একটা পাথর নেমে গেল। অনেক তো হলো! এক বছর তো ওনার পায়ের ধুলো হয়ে পড়ে রইলাম। বিনিময়ে কী পেলাম? একটু সম্মান? না, তাও না। যার জন্য নিজের রক্ত জল করে সেবা করেছি, সে যদি অন্যের ছোঁয়াতে এভাবে আমুদে মেতে উঠতে পারে, তবে আমার এই মায়ার আর কোনো মূল্য নেই।

নিজের ব্যাগটা আলমারির থেকে নামালাম। এক বছর আগে সৎ মা যখন এটা গুছিয়ে দিয়েছিলেন, তখন আমি কান্না করছিলাম। আর আজ, আজ আমার চোখে এক ফোঁটা জল নেই। বরং মনে হচ্ছে, এই বিষাক্ত মায়া থেকে নিজেকে মুক্তি দেওয়ার সময় এসেছে।

আমি মনে মনে ঠিক করলাম—”এখানে আর নয়।”

নিজেকে এভাবে প্রতিদিন তিল তিল করে মারতে আমি আর পারব না। আরিয়ান হয়তো কোনোদিন বুঝবেন যে, একটা পঙ্গু মানুষকে ভালোবেসে আঁকড়ে ধরা কতটা কঠিন ছিল, আর সেই হাত ছেড়ে চলে যাওয়াটা তার চেয়েও বেশি যন্ত্রণার।

আমি ড্রয়ার খুলে বিয়ের সময়কার সেই লাল শাড়িটা বের করলাম। ওটা ভাঁজ করে ব্যাগে রাখলাম না। বরং ওটা টেবিলের ওপর ছড়িয়ে রাখলাম। যেন ওটা দেখলেই আরিয়ান বুঝতে পারে, এক বছর আগে যে মেয়েটা বউ সেজে এসেছিল, আজ সে তার সবটুকু অধিকার আর মায়া এই ঘরেই ফেলে রেখে চলে যাচ্ছে।

পা টিপে টিপে লিভিং রুমের দিকে তাকালাম। আরিয়ান নাতাশার হাত ধরে কিছু একটা বলছেন। দুজনেই খুব সুখী। আমি একটা ছোট চিরকুট লিখলাম—

“আপনার সব ওষুধ আর থেরাপির চার্ট টেবিলের ওপর রাখা আছে। নাতাশা আপুকে বুঝিয়ে দেবেন। আজ থেকে আপনার সেবার জন্য আর কোনো ‘কেয়ারটেকার’ লাগবে না। ভালো থাকবেন আপনার ভালোবাসার মানুষকে নিয়ে।”

চিরকুটটা টেবিলের কোণায় কফি কাপের নিচে রাখলাম। আরিয়ানের দেওয়া কোনো গয়না আমি সাথে নিলাম না।

জার্মানির এই কনকনে শীতে বাইরের দরজাটা যখন আমি খুললাম, তখন এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস আমার মুখে এসে লাগল। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, আমার ভেতরের দহনটা যেন শান্ত হয়ে গেল। আমি আর একবারও পিছন ফিরে তাকালাম না।

অভাগী মিথিলা আজ আর আর্তনাদ করছে না, সে আজ নিজের আত্মসম্মান নিয়ে অজানার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করল।

কনকনে ঠান্ডা বাতাস আমার চাদর ভেদ করে শরীরে বিঁধছে। তুষারপাতের সাদা চাদরে চারপাশ ঢাকা, ঠিক যেন আমার জীবনের মতোই সব বিবর্ণ আর প্রাণহীন। আমি ব্যাগটা হাতে নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা পার্কের কাঠের বেঞ্চে এসে বসলাম।

পার্কের এই নির্জনতায় চারপাশটা বড্ড অচেনা লাগছে। আমার আপন বলতে কেউ নেই, নেই মাথা গোঁজার ঠাঁই। যার ওপর নির্ভর করে দেশ-মাটি সব ছেড়েছিলাম, সে আজ নাতাশার হাত ধরে তার নিজের জগতে ব্যস্ত। পার্কে বসে থাকা মানুষগুলো যে যার মতো করে কথা বলছে,

ব্যাগটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে আমি বসে রইলাম। এক বছর—এই তো সেদিনও আরিয়ানের ওষুধের টাইম মেনটেন করতে করতে আমার দিন কেটে যেত। আজ এই পার্কে বসে মনে হচ্ছে, ওই ঘরটা কি সত্যিই আমার ছিল? নাকি ওটা ছিল আরিয়ানের তৈরি এক সুন্দর জেলখানা, যেখানে আমি ছিলাম কেবল একজন নিরব সেবিকা?

চোখ থেকে এক ফোঁটা তপ্ত জল গড়িয়ে বরফশীতল গালের ওপর পড়ল।

হঠাৎ একজন বৃদ্ধা আমার পাশে এসে বসলেন। জার্মানির এই কনকনে শীতেও ওনার চোখে এক অদ্ভুত মায়া। উনি জার্মান ভাষায় কিছু একটা জিজ্ঞেস করলেন, হয়তো জানতে চাইলেন আমি কেন এভাবে একা বসে কাঁদছি। আমি শুধু ম্লান হেসে মাথা নাড়লাম। ভাষা না বুঝলেও মানুষের চোখের ভাষা বোধহয় সব দেশেই এক।

বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে। অদ্ভুতভাবে, এই খোলা আকাশের নিচে বসেও আমার দম বন্ধ লাগছে না। আরিয়ানের ওই অবহেলার রাজপ্রাসাদে প্রতিটি নিঃশ্বাস নিতে আমার কষ্ট হতো।

আমি পার্কের বেঞ্চ ছেড়ে উঠে দাঁড়ালাম। আমি জানি না কাল সকালে আমার কপালে কী লেখা আছে। কিন্তু আজ এই পার্কে বসে আমি একটা শপথ করলাম—”মিথিলা, আর কারো করুণা হয়ে নয়, এবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে শেখো।”

পার্ক থেকে বের হয়ে আমি উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তার দুপাশে থাকা আলোকোজ্জ্বল দোকানগুলো আমার অচেনা এক বিষণ্ণতাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। হঠাৎ একটা বড় কফিশপের সামনে গিয়ে আমার চোখ আটকে গেল। কাঁচের দরজায় একটা বড় নোটিশবোর্ড ঝোলানো—আজকের একটি বিশেষ বড় প্রোগ্রামের জন্য জরুরি ভিত্তিতে ‘ওয়ান-ডে ওয়েটার’ প্রয়োজন।
এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়ালাম। পকেটে থাকা সামান্য কিছু টাকা দিয়ে এই বিদেশের মাটিতে কয়দিন চলবে? আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচতে হলে আগে তো মাথা গোঁজার ঠাঁই আর খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে কফিশপের ভেতরে ঢুকে পড়লাম।
ম্যানেজারকে ইংরেজিতে বুঝিয়ে বলতেই সে আমাকে কাজে নিয়ে নিল। ড্রেস বদলে আমি যখন কাজে নামলাম, তখন দেখি আমার সাথে আরও কয়েকজন কাজ করছে। সেখানেই আমার পরিচয় হলো একটি মেয়ের সাথে—নাম তার জারা। কথা বলে জানলাম সে পাকিস্তানের মেয়ে, এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি পার্ট-টাইম কাজ করে নিজের খরচ চালায়।

জারা কাজ করতে করতে আমাকে বুঝিয়ে দিচ্ছিল কী করতে হবে। ও আমাকে সাহস দিয়ে বলল, “শোনো মিথিলা, এই দেশটা বড্ড কঠিন। এখানে কেউ কারো নয়, কিন্তু নিজের সাহস থাকলে কেউ তোমাকে দমাতেও পারবে না। পড়াশোনা করো আর কাজ করো—দেখবে একদিন এই শহরটাই তোমার আপন হয়ে গেছে।”

জারার কথাগুলো আমার কানে তখন ওষুধের মতো কাজ করছিল। অদ্ভুত এক তৃপ্তি পাচ্ছিলাম আমি।
কাজের ফাঁকে একবার কাঁচের জানলা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকালাম। আরিয়ান কি এখন ডিনার করছে? নাতাশা কি ওকে ঠিকমতো ওষুধটা খাইয়ে দিয়েছে? মনে পড়ার সাথে সাথেই নিজেকে ধমক দিলাম। যাকে আমি চিরকুটে মুক্তি দিয়ে এসেছি, তার কথা ভেবে আর নিজের রাত ভারী করব না।

জারা আমাকে বলল আজ রাতটা ওর ওখানে থাকতে পারি! জারার প্রস্তাবটা শোনার পর মনে হলো অন্ধকারের মাঝে কেউ হঠাৎ মোমবাতি জ্বালিয়ে দিল। এই অচেনা দেশে, সম্পূর্ণ অচেনা মেয়ে আমাকে আশ্রয় দিচ্ছে। আমি কৃতজ্ঞতায় মাথা নাড়লাম।

কাজ শেষ হতে হতে রাত প্রায় বারোটা বেজে গেল। সারাদিনের খাটুনি আর মনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝড়ে শরীরটা ভেঙে আসছে । জারা ওর জ্যাকেটের জিপটা টেনে দিয়ে বলল, “চলো মিথিলা, আজ রাতটা আমার কাছেই থাকো। কাল সকালে না হয় দুজনে মিলে তোমার জন্য একটা স্থায়ী ব্যবস্থা ভাবব।”

আমি ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে জারার পিছু পিছু হাঁটতে শুরু করলাম।

জারার রুমটা ছোট হলেও বেশ পরিপাটি। জারা আমাকে বলল “ফ্রেশ হয়ে নাও। আজ যা হয়েছে সব ভুলে যাও। জীবন তোমাকে নতুন সুযোগ দিচ্ছে।”

আমি কম্বলটা গায়ে জড়িয়ে জানালার পাশে বসলাম। কফির কাপ থেকে ধোঁয়া উঠছে। অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা চারদিকে। ঠিক এই সময় মনে পড়ল আরিয়ানের কথা। আজ এক বছর পর এই প্রথম রাত, যখন আমি আরিয়ানের শিয়রে বসে নেই। আজ ওর ব্যথার সময় কে পাশে আছে?
হঠাৎ বুকটা হু হু করে উঠল। কিন্তু পরক্ষণেই ডাইনিং টেবিলের ওপর ফেলে আসা সেই লাল শাড়িটার কথা মনে পড়ল। যে শাড়িটা আমার নতুন জীবনের স্বপ্ন ছিল, সেটা আজ ওখানেই পড়ে আছে—ঠিক যেন আমার মরে যাওয়া ইচ্ছেগুলোর মতো। আরিয়ানের ওই অবহেলার রাজপ্রাসাদের চেয়ে জারার এই ছোট্ট রুমটা আমার কাছে অনেক বেশি নিরাপদ মনে হচ্ছে।

জারা ওর ল্যাপটপ বন্ধ করে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “মিথিলা, তুমি কি জানো? হারানো মানেই সব শেষ নয়। মাঝেমধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্য সবকিছু হারাতে হয়। তুমি আজ যা করেছ, সেটা করতে অনেক সাহসের প্রয়োজন।”

আমি ম্লান হাসলাম। সাহস কি না জানি না, তবে বেঁচে থাকার তাগিদ বোধহয় একেই বলে।

পরদিন সকালে জারার ডাকে ঘুম ভাঙল। ও তৈরি হয়ে নিয়েছে ভার্সিটি যাওয়ার জন্য। ও আমাকে একটা নিউজপেপার আর কিছু ফোন নম্বর দিয়ে বলল, “আমি চললাম। এখানে কিছু ছোটখাটো কাজের ঠিকানা আছে। তুমি ট্রাই করতে পারো। আর হ্যাঁ, আজ রাতেও কিন্তু তুমি এখানেই ফিরবে।”

জারা চলে যাওয়ার পর আমি নিউজপেপারটা হাতে নিলাম। আমার চোখ গেল একটা কলামে—জার্মানির এক নামকরা আইটি ফার্মে একজন পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রয়োজন। বেতনও বেশ ভালো। আমি মনে মনে ভাবলাম, পড়াশোনা তো আমি মন্দ করিনি, তবে কেন চেষ্টা করব না?

আমি তৈরি হয়ে নিলাম। আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে বললাম – “মিথিলা আজ থেকে তুমি স্বাধীন।”

আমি ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম। আমি জানি না এই লড়াইয়ে আমি জিতব কি না, তবে আমি লড়তে প্রস্তুত।
অভাগী মিথিলা আজ আর কারোর করুণা নয়, সে আজ এক লড়াকু নারী।

চলবে ~~