#প্রেম_তুমি #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব_____________৪
আজ আমার পরনে সাধারণ একটা জ্যাকেট আর জিন্স, আজ নিজেকে খুব হালকা মনে হচ্ছে।
বাসে করে বিশাল আইটি ফার্মের সামনে পৌঁছালাম, তখন বুকটা একটু দুরুদুরু করছিল। কাঁচের বিশাল বিল্ডিং, ভেতরে সবাই ব্যস্ত। আমি ভেতরে ঢুকে রিসেপশনে নিজের পরিচয় দিলাম। কিছুক্ষণ পর আমাকে ভেতরে ডাকা হলো।
ইন্টারভিউ বোর্ডে থাকা জার্মান ভদ্রলোক আমার সিভিটা দেখে অবাক হয়ে বললেন, “আপনার একাডেমিক রেজাল্ট তো চমৎকার!
ইন্টারভিউ শেষে তিনি জানালেন, আমাকে ট্রায়াল পিরিয়ডে রাখা হচ্ছে। বেতন যা ধরা হলো, তা দিয়ে আমি অনায়াসেই নিজের একটা থাকার জায়গা আর খাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারব। অফিস থেকে বের হয়ে আসার সময় আমার চোখে খুশির জল চলে এল।
বিকেলে জারার কাছে ফেরার পথে একটা ছোট কফিশপে বসলাম। কফিতে চুমুক দিতেই মনে পড়ল আরিয়ানের কথা! আরিয়ানের সেই ধূসর চোখগুলো কি একবারের জন্যও আমাকে খুঁজছে?
না, মিথিলা! আর নয়। যার কাছে তুমি কেবল ‘সার্ভিস’ ছিলে, তার জন্য আর চোখের জল ফেলবে না।
আমি জারাকে জড়িয়ে ধরলাম। ও খুশিতে আমাকে নিয়ে ডিনার করতে বাইরে যাওয়ার জোর করল। আমরা রাস্তার ধারের একটা ছোট দোকানে বসে কিছু খাবার খেলাম।
এভাবেই একমাস কেটে গেলো।
মাসের শেষ দিনটি আমার কাছে কেবল একটি তারিখ ছিল না, এটি ছিল আমার নতুন ভাবে বেঁচে থাকার পরিশ্রমের ফসল । হাতে যখন প্রথম বেতনের খামটা পেলাম, তখন আঙুলগুলো কাঁপছিল।
বেতন পেয়েই প্রথম কাজটা করলাম জারার জন্য। মেয়েটা না থাকলে আমার কি হতো জানি না । আমি ওর জন্য খুব সুন্দর একটা ড্রেস আর চকোলেট কিনলাম। জারা যখন ড্রেসটা দেখল, ওর চোখে যে আনন্দ দেখলাম, তা দেখে আমার খুব ভালো লাগলো। জারাকে ওর দেওয়া ধারের টাকাগুলো ফেরত দিতে চাইলে ও নিতে চাইল না, কিন্তু আমি জোর করে ওর হাতে গুঁজে দিলাম। কারণ, আমি
আর কারোর কাছে ঋণী হয়ে থাকতে চাই না।
নিজের জন্য এক জোড়া জুতো কিনলাম। আয়নায় তাকিয়ে নিজেকে দেখে হাসলাম। এই হাসিতে কোনো গ্লানি নেই, নেই কোনো লুকানো দীর্ঘশ্বাস।
হাতে আরও কিছু টাকা জমিয়েছি। মনে মনে ঠিক করেছি, আগামী সপ্তাহে কোনো একটা সুন্দর শহরে ঘুরতে যাব। একা। আজ আমি এক মুক্ত পাখি। ইচ্ছে হলে রাস্তার ধারের কফি খাব, ইচ্ছে হলে তুষারের ওপর দিয়ে উদ্দেশ্যহীনভাবে হাঁটব।
এখন আমি যা খুশি তাই করতে পারি।
মাঝেমধ্যে রাতে ঘুমানোর আগে খুব অদ্ভুত একটা চিন্তা মাথায় আসে—”আরিয়ান কি এখন নিজের পায়ে দাঁড়াতে পেরেছে? পরক্ষণেই মাথা ঝাড়া দিয়ে চিন্তাটা দূর করি। যার কাছে আমার এক বছরের ত্যাগের কোনো মূল্য ছিল না, তার বর্তমান বা ভবিষ্যৎ নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আমার নেই।
আমি এখন নিজের সাম্রাজ্যের রানী।
আমার প্রথম সোলো ট্রিপের গন্তব্য জার্মানির এক রূপকথার মতো শহর—হাইডেলবার্গ, ট্রেন থেকে নামতেই এক হিমেল হাওয়া আমাকে স্বাগত জানাল। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে ছোট ছোট রঙিন ঘর, আর তার মাঝখান দিয়ে বয়ে চলেছে নেকার নদী। চারদিকে এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
আমি নেকার নদীর ধারের সেই বিখ্যাত ‘ফিলোসফার্স ওয়াক’ দিয়ে হাঁটতে শুরু করলাম। রাস্তার দুপাশে ফুটে থাকা নাম না জানা ফুল এর আস্তরণ। ওখান থেকে পুরো শহরটাকে একদম ছবির মতো দেখা যাচ্ছিল। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা সেই প্রাচীন হাইডেলবার্গ দুর্গ যার ভাঙা পাথরগুলো যেন আমার নিজের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি—
আমি ওল্ড ব্রিজের ওপর দাঁড়ালাম। নদীর জলের কুলকুল শব্দ আর দূরে চার্চের ঘণ্টার আওয়াজ… এক অদ্ভুত একাকীত্ব, কিন্তু তাতে কোনো বিষণ্ণতা নেই।
দুপুরের দিকে একটা ছোট্ট ক্যাফেতে বসলাম। নদীর একদম ধারে। নিজের জন্য এক কাপ হট চকোলেট আর অ্যাপেল স্ট্রুডেল অর্ডার করলাম। এক চামচ মুখে দিতেই মনে হলো, স্বাধীনতার স্বাদ বোধহয় এমনই মিষ্টি হয়!
আমি একটা ডায়েরি বের করে লিখতে শুরু করলাম। আজ আমি আর কোনো ‘অভাগী’ নই। এই যে নদীর ওপর দিয়ে নৌকাগুলো যাচ্ছে, ওই যে আকাশে পাখিরা উড়ছে—আমিও তো তাদেরই একজন।
আমি এখন মুক্ত পাখি। আমি এখন মিথিলা—যার নিজের একটা নাম আছে, একটা পরিচয় আছে। ।
স্ট্রিট লাইটগুলো তুষারের আবহে আবছা দেখাচ্ছিল। হোটেলের পথে শর্টকাট নিতে গিয়ে একটা গলির ভেতর ঢুকলাম, আর তখনই বুকটা ধক করে উঠল।
গলির মোড়ে তিনটা ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের চোখেমুখে এক পৈশাচিক উল্লাস। জার্মানির এই নির্জন রাস্তায় এত রাতে আমি যে কতটা অসহায়, তা মুহূর্তেই টের পেলাম। আমি উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করতেই তারা আমার পথ আটকে দাঁড়াল। তাদের একজন খুব নোংরাভাবে হেসে আমার হাতটা টেনে ধরল।
আমি আর্তনাদ করে উঠলাম, “ছেড়ে দাও আমাকে! প্লিজ!”
কিন্তু আমার চিৎকার তুষারের স্তব্ধতায় মিলিয়ে যাচ্ছিল। তারা আমাকে টেনেহিঁচড়ে পাশের একটা অন্ধকার জায়গায় নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল। আমার ব্যাগটা ছিঁড়ে নিচে পড়ে গেল, সুভ্যেনিরগুলো তুষারের ওপর ছড়িয়ে পড়ল। আমি ধস্তাধস্তি করছিলাম, কিন্তু তিনজনের শক্তির কাছে আমি তখন বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ছিলাম। আমার শরীরটা ভয়ে নীল হয়ে আসছিল, আর ঠিক তখনই…
হঠাৎ বাতাসের গতিবেগের মতো অন্ধকার চিরে কেউ একজন উদয় হলো। এক জন দীর্ঘদেহী যুবক। পরনে একটা কুচকুচে কালো শার্ট,! সুঠাম দেহ আর চওড়া কাঁধের সেই ছেলেটির উপস্থিতি পুরো পরিবেশটাকেই যেন স্তব্ধ করে দিল।
একজন ছেলে ওর দিকে তেড়ে যেতেই কালো শার্ট পরা সেই ছেলেটি এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করল না। হাতের চেয়েও পা ব্যবহারে বেশি পটু। অদ্ভুত এক ক্ষিপ্রতায় নিজের লম্বা পা দিয়ে সজোরে এক লাথি মারল ছেলেটার বুকের ওপর। ছেলেটা ছিটকে গিয়ে পাশের দেয়ালের সাথে ধাক্কা খেল। বাকি দুজন হকচকিয়ে গেল, কিন্তু ছেলেটি থামল না। ওনার একেকটা লাথি যেন বিদ্যুৎগতিতে আছড়ে পড়ছিল ওদের ওপর। ওনার সুঠাম বডি আর পেশিবহুল হাতের সঞ্চালন দেখে মনে হচ্ছিল, কোনো অ্যাকশন মুভির হিরো চোখের সামনে বাস্তব হয়ে এসেছে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সেই হায়নাগুলো আর্তনাদ করতে করতে অন্ধকারের দিকে পালিয়ে বাঁচল। আমি তখনো দেয়াল ঘেঁষে মেঝেতে বসে কাঁপছি, দুই হাতে নিজেকে জাপটে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদছি।
আমি ভয়ে আর বিস্ময়ে মাথা তুললাম।
“আরিয়ান…”
চলবে ~

