#প্রেম_তুমি #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব___________৫
হুইলচেয়ারের সেই মানুষটি আজ দাঁড়িয়ে আছে। আরিয়ানের গম্ভীর ব্যক্তিত্বের আড়ালে কী চলছে, তা ওই স্থির ধূসর চোখ দেখে বোঝার সাধ্য নেই।
মিথিলার হুঁশ ফিরল। মিথিলা দেয়াল ঘেঁষে বসে আছে । নিজের পোশাক সামলে উঠে দাঁড়ালো । মনের ভেতর তখন তোলপাড় চলছে মিথিলার । ‘আরিয়ান হাঁটতে পারে!’—এই একটা বাক্য ওর মাথায় ঘুর পাক খাচ্ছে!
মিথিলা আরিয়ানের দিকে তাকায় । টানা ৩২ দিন পর আবারও ঐ ধূসর চোখজোড়ার সাথে মিথিলার চোখজোড়া মিলিত হলো। মিথিলার মনে পড়ে গেল নাতাশার খিলখিল হাসি আর আরিয়ানের নির্লিপ্ততা। সেসব কতটা যন্ত্রনাদায়ক ছিল। যেসব কষ্ট আরিয়ান মিথিলাকে দিয়েছে তা মিথিলা কোনোদিনও ভুলবে না।
আরিয়ান এখন , উনি হাঁটতে পারে কি না, ওনার জীবনে কী হয়েছে—তা জানার বিন্দুমাত্র কৌতূহল মিথিলার নেই। এই লোকের কাছে কোনো মর্যাদা ছিল না, কোনোদিন হবেও না। তা মিথিলা জানে।
মিথিলা নিচু হয়ে তুষারের ওপর পড়ে থাকা নিজের ব্যাগটা তুলে নিল। তারপর আরিয়ানের চোখের দিকে একবার স্থিরভাবে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে কৃতজ্ঞতা ছিল—ওকে ওই নরপশুদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য। কৃতজ্ঞতার পরেই ছিল এক গভীর দূরত্ব।
যেন চোখে চোখ রেখেই বুঝিয়ে দিল—”বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ, কিন্তু আমাদের পথ আর এক নয়।”
আরিয়ান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
মিথিলা পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই আরিয়ান এক ঝটকায় ওর পথ আটকে দাঁড়ালো । আরিয়ানের দীর্ঘদেহী অবয়ব আর ব্যক্তিত্বের সামনে মিথিলা মুহূর্তেই থমকে গেল। আরিয়ান তার শক্তিশালী হাত দিয়ে মিথিলাকে টেনে পাশের দেয়ালের সাথে চেপে ধরল।
আরিয়ানের একটা হাত মিথিলার মাথার পাশে দেয়ালে রাখা,। দুজনের মাঝে দূরত্ব বলতে আর কিছু নেই। আরিয়ানের ঠোঁট মিথিলার ঠোঁটে আছড়ে পড়ল।
আরিয়ান যেন ক্ষিপ্র বাঘ । আরিয়ানের ঠোঁটের আগ্রাসন আরও তীব্র হলো। মিথিলার দম বন্ধ হয়ে আসছে , মিথিলা নিজেকে ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে , কিন্তু আরিয়ানের কাছে তার শক্তি ছিল নগণ্য। কিছুক্ষন পর আরিয়ান মিথিলার ঠোঁট ছেড়ে দেয়।
দুজনেই হাপাচ্ছে। মিথিলা থরথর করে কাঁপছে । আরিয়ানের ঠোঁটের দহন জ্বলজ্বল করছে ওর ঠোঁটে। আরিয়ান কোনো কথা না বলে শুধু গভীর এক দৃষ্টিতে মিথিলার দিকে তাকিয়ে রইল।
আরিয়ানের ধূসর চোখ দুটো এখন ঠিক মিথিলার চোখের ওপর স্থির। মিথিলার কান্না পাচ্ছে।
কিছুক্ষন পর নিস্তব্ধতা ভেঙে মিথিলা বলল, “ছেড়ে দিন।”
মাত্র দুটো শব্দ।
আরিয়ান ধীরে ধীরে হাত সরিয়ে নিলো ।
মিথিলা আর এক সেকেন্ড সেখানে দাঁড়াল না।
নিজের ব্যাগটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে হনহন করে হোটেলের দিকে হাঁটতে শুরু করল। একবারও পিছন ফিরে দেখল না—
হোটেলে ফিরে নিজের রুমের দরজা বন্ধ করে মিথিলা মেঝেতে বসে পড়ল।
মিথিলা দ্রুত ওয়াশরুমে গিয়ে মুখে পানির ঝাপটা দিল। নিজের ঠোঁট দুটো ডলে ডলে পরিষ্কার করার চেষ্টা করল ও, যেন আরিয়ানের স্পর্শের শেষ চিহ্নটুকুও মুছে যায়। কিন্তু মনের ভেতর যে তোলপাড় শুরু হয়েছে, তা মুছবে কে। মিথিলা ভেবে পাচ্ছে না আরিয়ান কেন এমন করলো।
মিথিলা মনে মনে ঠিক করে নেয় যাই হয়ে যাক আরিয়ানকে তার জীবনে আর আসতে দিবে না। সে আত্মসম্মান নিয়ে বাঁচবে।
মিথিলার মনের মানচিত্রে আরিয়ানের সীমানা মুছে গেছে।
লাইটটা নিভিয়ে মিথিলা বিছানায় গা এলিয়ে দিল।
__________________
পরের দিন সারাদিন মিথিলা নিজের মতো ঘুরে বেড়ালো মন ভালো করতে। ছবি তুলে জারাকে পাঠালো।
হোটেলে ফিরে ফ্রেশ হয়ে মিথিলা বারান্দায় আসতেই ওর চোখ গেল ঠিক উল্টো দিকের হোটেলটার দিকে। দুই হোটেলের মাঝের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয়। আর ঠিক সেখানেই, সেই হোটেলের বারান্দায় রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে আছে এক দীর্ঘদেহী পুরুষ।
আরিয়ান! গম্ভীর ব্যক্তিত্ব আর সুঠাম অবয়ব অন্ধকারেও স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। হাতে একটা জ্বলন্ত সিগারেট, আরিয়ানের স্থির ধূসর চোখ জোড়া ঠিক মিথিলার বারান্দার দিকেই নিবদ্ধ।
মিথিলার বুকটা ধক করে উঠল। সারাটা দিন ও নিজেকে ভুলিয়ে রেখেছিল, নিজেকে সময় দিয়েছিল—কিন্তু আরিয়ান এখানে। চায় টা কি এই লোকটা মিথিলা তো চলে এসেছে। কোনো দাবিও রাখে নি। তাহলে আরিয়ান বা এমন করছে কেন।
আরিয়ানের তীক্ষ্ণ চাউনি বলে দিচ্ছিল, মিথিলা যেখানেই যাক, আরিয়ানের নজর থেকে মুক্তি নেই।
আরিয়ান কোনো নড়াচড়া করল না, শুধু স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন। যেন এক শিকারি—যে তার হারানো অধিকার ফিরে পেতে ছায়ার মতো পিছু নিয়েছে।
মিথিলা রেলিংটা শক্ত করে ধরল। মনে মনে বলল, *”
“আপনি কেন এসেছেন আরিয়ান? কেন আমার এই তিলে তিলে গড়া শান্তিটুকু নষ্ট করতে চাইছেন? আমি তো আপনাকে মুক্তি দিয়ে এসেছি।”*
মিথিলা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ও এক ঝটকায় বারান্দার কাঁচের দরজাটা টেনে পর্দা টেনে দিল। বিছানায় এসে শুয়ে পড়লেও ওর মনে হচ্ছিল, দেয়াল আর পর্দার ওপাশে ধূসর চোখ দুটো এখনো ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
চলবে…

