#প্রেম_তুমি #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব___________১১
আরিয়ান কেবিনে শুয়ে একদৃষ্টিতে সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে আছ। মাথার যন্ত্রণাটা এখনো আছে , কিন্তু তার চেয়েও বড় যন্ত্রণা বুকের ভেতর হচ্ছে। এক্সিডেন্টের ঠিক আগের মুহূর্তের দৃশ্যটা আরিয়ানএর চোখে ভাসছে—মিথিলার ঘৃণাভরা চাহনি । বিড়বিড় করে নিজের অজান্তেই বললে, “মিথি…”
ঠিক সেই সময় কেবিনের দরজায় শব্দ হলো। আরিয়ান ভাবলো হয়তো নার্স কিংবা রেড ওহম এসেছে। আরিয়াননা দেখেই বললো , “কারো ভিতরে আসার দরকার নেই , আমি একা থাকতে চাই।”
কিন্তু কোনো উত্তর এল না। শুধু এক জোড়া পায়ের শব্দ বেডের খুব কাছে এসে থামল। মিষ্টি সুবাসটা আরিয়ান এর নাকে আসতেই হৃদস্পন্দন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আরিয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। সামনে দাঁড়িয়ে আছে মিথিলা।
চোখ দুটো লাল হয়ে ফুলে আছে, মুখটা ফ্যাকাশে।
মিথিলা কাঁপা কাঁপা হাতটা আরিয়ানের কপালে রাখল। মিথিলার আঙুলের শীতল স্পর্শ আরিয়ানের সব যন্ত্রণা যেন নিমিষেই শুষে নিল। মিথিলা ভাঙা গলায় বললেন, “কেন এমন করলেন আরিয়ান? নিজেকে শেষ করে দিলে কি আমার ওপর প্রতিশোধ নেওয়া হতো?”
আরিয়ান মিথিলার হাতটা নিজের হাতের মুঠোয় নেয়। মিথিলার স্পর্শে আরিয়ান এক অদ্ভুত শক্তি অনুভব করল। “তুমি তো মুক্তি চেয়েছিলে মিথি। আমার মৃত্যু হয়তো তোমাকে সেই কাঙ্ক্ষিত স্বাধীনতা দেবে। কিন্তু মরতেও পারলাম না…
মিথিলা অন্য হাত দিয়ে আরিয়ানের মুখ চেপে ধরে ।
“চুপ করুন! আর একবারও মরার কথা বলবেন না। আমি আপনাকে ঘৃণা করি বলেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আপনার নিথর দেহ দেখার ক্ষমতা আমার নেই।”
আরিয়ান মিথিলার হাত সরিয়ে দিয়ে হুট করেই ওকে নিজের বুকের দিকে টেনে নিল।
আরিয়ান মিথিলাকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরল, যেন সে কোনো অমূল্য সম্পদ ফিরে পেয়েছে যা সে প্রায় হারিয়েই ফেলেছিল। এই প্রথম মিথিলা আরিয়ানের মধ্যে ; এক বিধ্বস্ত, ভেঙে যাওয়া মানুষের অস্তিত্ব টের পেল।
মিথিলা প্রথমে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। “তুমি জানো না মিথি… তোমার হাতের চড়টা আমাকে যতটা না কষ্ট দিয়েছে, তার চেয়ে বেশি পুড়িয়েছে তোমার ওই ঘৃণাভরা চোখ দুটো। আমি ভেবেছিলাম তুমি মুক্তি চাও…
, “সবাই কি মরে গিয়ে মুক্তি দেয়? আপনি কি জানেন না আপনার মৃত্যু মানে আমার জন্য সারা জীবনের এক জীবন্ত দাফন? আপনার ওপর আমার রাগ আছে, অভিমান আছে… কিন্তু আপনার বিনাশ আমি কোনোদিনও চাইতে পারব না।”
আরিয়ান মিথিলাকে নিজের থেকে একটু সরিয়ে চোখের দিকে তাকায়! ধূসর চোখে আজ কোনো দম্ভ নেই, আছে এক গভীর আর্তি। আরিয়ান মিথিলার চোখের জল নিজের হাত দিয়ে মুছিয়ে দিয়ে বলল,
“তবে কি এখনো আমাকে ঘৃণা করো মিথিলা? নাকি এই চোখের জল অন্য কিছু বলছে?”
মিথিলা কোনো উত্তর দিল না।
আরিয়ান মিথিলাকে নিজের বুকের সাথে আরও শক্ত করে মিশিয়ে নিল। ঠোঁটের কোণে স্বস্তির একটা হাসি ফুটে উঠল। ভেতর থেকে আরিয়ান আজ সত্যিই খুব খুশি।
আরিয়ান আলতো করে মিথিলার চিবুকটা ধরে মুখটা সামান্য তুলল। মিথিলার চোখের পাতায় তখনও মুক্তোর মতো অশ্রুবিন্দু জমে আছে। আরিয়ান ধীর লয়ে, পরম যত্নে আরিয়ান মিথিলার কপালে নিজের ঠোঁট ছোঁয়ায় ।
আরিয়ানের ঠোঁটের উষ্ণতা মিথিলার শরীরের প্রতিটি স্নায়ুতে যেন এক প্রশান্তির ঢেউ বইয়ে দিল। কপালে দীর্ঘ চুম্বনের পর আরিয়ান আবার মিথিলাকে নিজের বুকের মাঝে টেনে নিল। ব্যান্ডেজ করা হাতটা দিয়ে মিথিলার পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে আরিয়ান মিথির চুলে মুখ গুঁজে দিলো!
” আমি তোমাকে কোথাও যেতে দেব না,” আরিয়ান খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল।
মিথিলা আরিয়ানকে বাধা দিল না। আরিয়ান এর বুকের ধুকপুকানি আজ মিথিলার কাছে এক সুরের মতো মনে হচ্ছে।
কেটে গেছে ৪ দিন। গত ৪ দিনে আরিয়ানের শারীরিক অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। তবে আরিয়ান এর ভেতরে যে পরিবর্তনটা এসেছে, সেটা ওষুধের চেয়েও বেশি মিথিলার উপস্থিতির জাদুতে।
মিথিলা আজ নিজে হাতে রান্না করে নিয়ে এসেছে! বক্সটা খুলে আরিয়ানের সামনে ধরল, আরিয়ান আধশোয়া হয়ে আছে , খাবারের ঘ্রাণ নাকে আসতেই চোখ দুটো চকচক করে উঠল। আরিয়ান যেন ধৈর্য হারালো। ব্যান্ডেজ করা হাতটা দিয়েই খাবারটা নিজের কাছে টেনে নিলো ।
এরপর মিথিলা যা দেখল, তাতে ও অবাক হয়ে গেল। যে আরিয়ান সব সময় ম্যানারস নিয়ে চলে, সেই আরিয়ান আজ কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে পাগলের মতো খেতে শুরু করেছে। যেন বহু যুগ ধরে অভুক্ত! আরিয়ানের খাওয়ার ব্যাকুলতা দেখে মনে হচ্ছে, এই খাবারের প্রতিটি দানা তার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার ।
মিথিলা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইল। অস্ফুট স্বরে বলল, “আরিয়ান! একটু ধীরে খান। কেউ তো কেড়ে নিচ্ছে না। এভাবে পাগলের মতো খাচ্ছেন কেন?”
আরিয়ান খাওয়ার মাঝখানেই একবার থামে। ঠোঁটের কোণে খাবারের অবশিষ্টাংশ লেগে আছে, চোখের দৃষ্টিতে তৃপ্তি।
“জানো মিথি, কতদিন তোমার হাতের রান্না খাই না?
… এই স্বাদটার জন্য আমি হাহাকার করেছি। অভ্যাস তো খুব বাজে জিনিস, তাই না?
আরিয়ানের কথাগুলো মিথিলার বুকে তীরের মতো বিঁধল।
মিথিলার চোখ দুটো আবার নোনা জলে ভরে এল। আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কান্না পেয়ে গেল এটা দেখে যে, এই দোর্দণ্ড প্রতাপশালী মানুষটা কেবল ওর হাতের একটুখানি খাবারের জন্য কতটা কাঙাল হয়ে ছিলো।
মিথিলা ওড়না দিয়ে নিজের চোখের জলটুকু মুছে নিল।
মিথিলা আরিয়ানের একদম কাছে গিয়ে বসল।
“হয়েছে, আর নিজের হাতে খেতে হবে না। আপনার ব্যান্ডেজ করা হাতে লাগছে তো! আমি খাইয়ে দিচ্ছি।”
আরিয়ান কোনো প্রতিবাদ করল না। বরং খুব বাধ্য ছেলের মতো মিথিলার দিকে তাকিয়ে রইল। ।”
মিথিলার চোখের পানি আবার টপ টপ করে পড়ছে। বুঝতে পারছে আরিয়ান আজ কতটা নিঃস্বার্থভাবে নিজের দুর্বলতাগুলো ওর সামনে তুলে ধরছে।
খাওয়ানো শেষ হলে মিথিলা যত্ন করে আরিয়ানের মুখটা টিস্যু দিয়ে মুছে দিল। আরিয়ান মিথিলার হাতটা ধরে ফেলল।
“মিথিলা, আমাকে ক্ষমা করে দাও। আমি জানি আমি তোমার সাথে খুব খারাপ ব্যবহার করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, তোমাকে হারানোর ভয়টা আমাকে পাগল করে ফেলেছিল বলেই আমি অতটা নিষ্ঠুর হয়েছিলাম,” !
“আগে আপনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠুন আরিয়ান। বাকি সব কথা না হয় পরে হবে।”
আরিয়ান তার ব্যান্ডেজ করা হাতটা দিয়ে মিথিলার হাত নিয়ে নিজের গালে ছোয়ায়। ।
মিথিলা উঠে দাঁড়াতেই আরিয়ান ওনার হাতটা আরও শক্ত করে ধরলেন।
“কোথায় যাচ্ছ? কিছুক্ষণ বসো না আমার পাশে।”
“অফিসে যেতে হবে আরিয়ান। লাঞ্চের সময় শেষ হয়ে আসছে,” মিথিলা শান্ত গলায় বলল।
আরিয়ান এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, “আমি জানি তোমাকে অনেক কষ্ট দিয়েছি। এমনকি এই প্রজেক্টেও তোমাকে রাখা হয়েছিল কেবল আমার চোখের সামনে রাখার জন্য। কিন্তু বিশ্বাস করো মিথি, তোমাকে এক মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করা মানে আমার পুরো অস্তিত্বটা অর্থহীন হয়ে যাওয়া। তুমি কি কোনোদিন বুঝতে পারবে, তোমাকে হারানোর এক ভয়াবহ আতঙ্ক”।
“সবাইকে আগলে রাখার ধরণ এক হয় না আরিয়ান। আপনি যেভাবে আমাকে শিকল দিয়ে বাঁধতে চেয়েছিলেন, তাতে ভালোবাসা নয়—শ্বাসরোধ হতো। কিন্তু আজকের এই দুর্ঘটনা বোধহয় আমাদের দুজনের চোখেই অনেক কিছু বদলে দিল।”
আরিয়ান বালিশে হেলান দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল । “যাও,।
তবে আমি তোমার আসার অপেক্ষায় দিন গুনব।”
-চলবে –

