#প্রেম_তুমি #লেখিকা_ইনায়া_জারিশ
#পর্ব___________১২
কেবিনের দরজাটা ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়। মিথিলার চলে যাওয়ার পর পুরো রুমটা হঠাৎ করেই ফাঁকা ফাঁকা লাগে আরিয়ানের কাছে। কিছুক্ষণ আগেও যেখানে মিথিলার উপস্থিতি পুরো জায়গাটাকে উষ্ণ করে রেখেছিল, এখন সেখানে এক ধরনের নিঃশব্দ শূন্যতা।
আরিয়ান চোখ বন্ধ করে মাথাটা বালিশে ঠেকিয়ে রাখে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন অদ্ভুতভাবে হালকা লাগছে আবার ভারীও লাগছে। মিথিলার কথাগুলো বারবার কানে বাজছে—
“ভালোবাসা নয়—শ্বাসরোধ হতো…”
আরিয়ান গভীর একটা শ্বাস নেয়। নিজের অজান্তেই বলে, “আমি কি সত্যিই এতটাই ভুল ছিলাম, মিথি…”
ওদিকে মিথিলা হাসপাতালের করিডোর দিয়ে হাঁটছে। চোখের কোণ এখনও ভেজা। নিজের ভেতরের ঝড়টা সামলাতে চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না।
মিথিলা থেমে যায় এক জায়গায়। দেয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে ।
আরিয়ানের অসহায় মুখটা, শিশুর মতো নির্ভরতা—সবকিছু যেন মিথিলার মনকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
“কেন এমন করছেন আপনি…”
মিথিলা জানে—রাগ, অভিমান সবকিছু এখনও আছে। কিন্তু আরিয়ানকে ওই অবস্থায় দেখে… সেই রাগগুলো আর আগের মতো তীব্র লাগছে না।
.
অফিসে এসে কাজের মধ্যে নিজেকে ডুবিয়ে রাখার চেষ্টা করে মিথিলা। মনটা হাসপাতালে পড়ে আছে ।
ফাইলের দিকে তাকিয়ে থেকেও কিছুই বুঝতে পারে না।
ক্লারা বলে ওঠে, “ঠিক আছো তো??
মিথিলা চমকে উঠে হালকা হাসি দেয়, “হ্যাঁ, আমি ঠিক আছি।”
.
সন্ধ্যা হয়ে আসে।
হাসপাতালের কেবিনে বসে আছে আরিয়ান। চোখ বারবার দরজার দিকে চলে যাচ্ছে।
“বলেছিল আসবে…” আরিয়ান নিজের মনে মনে বলে উঠে!
একটা অদ্ভুত অস্থিরতা কাজ করছে ওর ভেতরে।ঠাৎ দরজায় হালকা নক।
“ভিতরে আসো,”
দরজা খুলে মিথিলা ঢোকে।
সাধারণ একটা সালোয়ার কামিজ, চুল খোলা, মুখে ক্লান্তি—তবুও আরিয়ানের চোখে আজ মিথিলা যেন সবচেয়ে সুন্দর।
আরিয়ানের ঠোঁটের কোণে অজান্তেই হাসি ফুটে ওঠে।
“জানতাম তুমি আসবে,”
মিথিলা ভ্রু কুঁচকে তাকায়, “এত আত্মবিশ্বাস?”
আরিয়ান মৃদু হেসে বলে, “কারণ তুমি আমাকে পুরোপুরি ছেড়ে যেতে পারো না।” আমি জানি
কথাটা শুনে মিথিলা চুপ করে যায়।এই কথাটার জবাব ওর কাছে নেই।
.
মিথিলা ব্যাগটা টেবিলে রাখে। “ওষুধ খেয়েছেন?”
“না,”
“কেন?”
“তুমি খাওয়াবে বলে,”
“আপনি একদম বাচ্চা হয়ে গেছেন।”
মিথিলা ওষুধ এগিয়ে পানির গ্লাস ধরিয়ে দেয়!
আরিয়ান চোখ সরায় না এক মুহূর্তের জন্যও।
আরিয়ান মিথিলার আঙুল ধরে ফেলে।মিথিলা চমকে উঠে,!
“কি করছেন?”
“একটু থাকো… প্লিজ।”
শব্দটা যেন মিথিলার সব প্রতিরোধ দুর্বল করে দিলো ।
.
___________
হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পাওয়ার পর অবশেষে —আরিয়ান বাড়িতে ফিরছে ।
গাড়িটা গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢোকে।
গাড়ি থামতেই মিথিলার বুকটা করে কেঁপে ওঠে।
এই বাড়ি…এই দরজা…এই পথ…
সবকিছুই তো একদিন ছেড়ে চলে গিয়েছিল মিথিলা…পা নামানোর আগেই মিথিলার মনে পড়ে সেই দিনটা—
যেদিন চোখে জল নিয়ে, বুক ভরা কষ্ট নিয়ে এই বাড়ির দরজা পেরিয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল মিথিলা।
আজ আবার ফিরছে…কিন্তু আগের মতো নয়।সবকিছু যেন বদলে গেছে।
.
মিথিলা গাড়ি থেকে নামতে যায়—
ঠিক তখনই আরিয়ান দরজা খুলে নামল।
মিথিলা কিছু বুঝে ওঠার আগেই—
আরিয়ান এক ঝটকায় মিথিলাকে কোলে তুলে নিল!
“আরিয়ান! আপনি কি করছেন? নামান আমাকে!”
চারপাশে সবাই তাকিয়ে আছে।
আরিয়ান একদম নির্বিকার।
“চুপচাপ থাকো,”
মিথিলা লজ্জায় লাল হয়ে যায়।
“দেখুক। আজ সবাই জানুক… তুমি এই বাড়ির কী।”
এই কথাটায় মিথিলা থেমে যায়।কিছু বলার ভাষা খুঁজে পায় না।
.
আরিয়ান ধীরে ধীরে মিথিলাকে কোলে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ভেতরে ঢোকে।
প্রতিটা পদক্ষেপ যেন নিজের অধিকারটা নতুন করে জানিয়ে দিচ্ছে।
মিথিলা এই আরিয়ানকে আগে কখনো দেখেনি।
যে মানুষটা সবসময় কঠোর, দূরত্ব বজায় রাখা—
সেই মানুষ আজ নিজের দুর্বলতাকে এত প্রকাশ্যে মেনে নিচ্ছে।
.
মিথিলা আরিয়ান এর দিকে তাকায়।
এই মানুষটা কি সত্যিই বদলাচ্ছে?
নাকি এটা শুধু মুহূর্তের আবেগ?
.
রুমের দরজার সামনে এসে আরিয়ান থামে।
এক মুহূর্তের জন্য দুজনের চোখে চোখ পড়ে।
“এই রুমটা… এবার থেকে শুধু আমার না।”
মিথিলার বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে।
আরিয়ান দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে—
ধীরে ধীরে মিথিলাকে বিছানায় নামিয়ে দেয়।
.
মিথিলা উঠে বসে।
চোখে অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি—
লজ্জা, দ্বিধা, আর কোথাও একটা অচেনা শান্তি।
আরিয়ান কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে থাকে।
“এইবার আর কোথাও যেতে দেব না, মিথি…
তবে এবার শিকল দিয়ে না… নিজের ভালোবাসা দিয়ে।”
.
মিথিলা কিছু বলে না।
নিঃশব্দে বসে থাকে—
_________________
রাত নেমে এসেছে।
মিথিলা বিছানার একপাশে বসে আছে। চারপাশটা চোখে চোখে দেখছে।
এই রুম…
সবকিছুই আগের মতো আছে—
তবুও যেন অনেক কিছু বদলে গেছে।
হঠাৎ দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দে চমকে ওঠে মিথিলা।
আরিয়ান দরজা লক করে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে।
মিথিলার বুকের ভেতর ধড়ফড় শুরু হয়।
“দরজা লক করলেন কেন?”
আরিয়ান থামে না। কাছে এসে দাঁড়ায়।
চোখে সেই গভীর দৃষ্টি—যেটা মিথিলাকে অস্বস্তিতেও ফেলে, আবার টানেও।
“কারণ আজ… আমি কথা শেষ না করে কাউকে যেতে দেব না,”
মিথিলা উঠে দাঁড়ায়।
“কোন কথা?”
আরিয়ান এক পা এগিয়ে আসে।
“আমাদের কথা।”
দুজনের মাঝে দূরত্ব এখন খুবই কম।কিছুক্ষণ কেউ কিছু বলে না।
তারপর আরিয়ান ধীরে বলে—
“আমি জানি, আমি ভুল করেছি। তোমাকে নিজের মতো করে রাখতে গিয়ে… তোমাকে হারানোর মতো অবস্থা করেছি।”
“শুধু অবস্থা না… আপনি আমাকে সত্যিই হারিয়েছিলেন,” ।
কথাটা যেন ছুরির মতো লাগে আরিয়ানের বুকে।
আরিয়ান এক মুহূর্ত চুপ থাকে।
তারপর হাত বাড়িয়ে মিথিলার হাত ধরতে যায়—
মিথিলা হাত সরিয়ে নেয়।
“এত সহজ না, আরিয়ান,” মিথিলা এবার চোখ তুলে তাকায়,
“আজ আপনি ভালো… কাল আবার আগের মতো হয়ে গেলে?”
আরিয়ান নিঃশ্বাস ফেলে।
“হয়তো আমি পারফেক্ট না… কিন্তু এবার চেষ্টা করব তোমাকে ভয় না দেখিয়ে, তোমাকে বুঝে রাখতে।”
.
মিথিলা বলে—
“ভালোবাসা মানে শুধু কাউকে নিজের করে রাখা না…
ভালোবাসা মানে তাকে স্বাধীনতাও দেওয়া।”
আরিয়ান মাথা নেড়ে মেনে নেয়।
“শিখছি…”
.
মিথিলা বিছানার অন্য পাশে গিয়ে বসে পড়ে।
আরিয়ানও ধীরে গিয়ে অন্য পাশে বসে।
দুজনের মাঝে দূরত্ব আছে—
কিন্তু আগের মতো দেয়াল নেই।
.
রাত আরও গভীর হয়।
লাইট অফহয়।
অন্ধকারে শুধু দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ।
কিছুক্ষণ পর—
“মিথি…” ।
“হুম?”
“ধন্যবাদ… ফিরে আসার জন্য।”
মিথিলা চোখ বন্ধ রেখেই বলে—
“আমি পুরোপুরি ফিরিনি এখনো…”
আরিয়ান হেসে ফেলে!
অন্ধকারের মাঝেই—দুজন মানুষ,ধীরে ধীরে একে অপরের দিকে এগিয়ে আসছে…ভালোবাসা দিয়ে,
না বলা অনুভূতি দিয়ে।
.
-চলবে-

