#প্রেম_প্রয়াস
#মাশফিয়াত_সুইটি(ছদ্মনাম)
পর্ব:০৪
‘রাকারে তোর ভাইরে ছাড়া আমি থাকতে পারবো না, কেউ না জানলেও তুই তো জানিস আমি রাদিফ ভাইকে কতোটা ভালোবাসি রাদিফ ভাই ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করতে পারবো না আমি।’
রাকার চোখে সবেমাত্র ঘুম এসেছিল আর তখনি তাশফা তাকে ফোন করে কেঁদে কেঁদে কথাগুলো বলছিল। কপালে বিরক্তির ছাপ ফোঁটে উঠেছে রাকা ক্লান্ত গলায়,
– নে’শা করেছিস নাকি? এতো রাতে কিসব বলছিস?
– তুই আমার কষ্টটা বুঝছিস না তুই না আমার বেস্টি।
– ঠিক করে বললে তো বুঝবো, আর তোকে কেই বা অন্য কাউকে বিয়ে করতে বলেছে?
– আম্মু বলেছে, জানিস আম্মু আমার খালাতো ভাই নিহানের সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক করেছে নিহানকে আমি বলেছি যে আমি রাদিফ ভাইকে পছন্দ করি কিন্তু তারপরেও বিয়েতে রাজি হয়ে গেছে।
রাকা শুয়া থেকে উঠে বসে,
– কি বললি? আন্টি তোর বিয়ে ঠিক করেছে?
– হুম সেই ছোটবেলা থেকেই নাকি।
– আঙ্কেল জানে সবটা?
– আরে হ্যা বাবা সব জানে।
– এখন কি হবে?
– আমি কি করে জানবো? তোর ভাই যদি আমারে পাত্তা দিতো তাহলে ওর সঙ্গে পালিয়ে যেতে পারতাম কিন্তু না তোর ওই বজ্জাত ভাই তো আমারে পাত্তা দেয় না এখন আমার কি হবে রে আমার মৃ’ত্যু’র জন্য কিন্তু তোর ভাই দায়ী থাকবে।
– কি বলিস ম’র’বি কিভাবে?
– তোর ভাইরে না পাইলে ওয়েট আমি ম’র’বো কেন? তোর ভাইরে মারবো, এ্যা এ্যা….
– আবার কাঁদিস কেন? আচ্ছা আমি বুদ্ধি বের করছি কিভাবে বিয়েটা ভাঙ্গা যায় চাপ নিস না কাল তোদের বাড়িতে আসছি এখন ঘুমা।
– সত্যি?
– আরে হ্যা।
ফোন কেটে চোখের পানি মুছে কিছুটা স্বস্তি নিয়ে ঘুমাতে চলে গেল তাশফা।
_______________
ভোরের আলো ফুটে গেছে তাশফা ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে নাস্তা সেরে কলেজে যাওয়ার জন্য রেডি হতে যাচ্ছিল কিন্তু তার মা এসে,
– আজ মেহেদী অনুষ্ঠান হবে তোর আর নিহানের তাই এ ক’দিন কলেজে যেতে হবে না আমি ছুটি নিয়ে নিয়েছি।
– গতকাল দেখে গেল আর আজ থেকে শুরু বিয়ের কার্যক্রম!
– আগে থেকেই কথা হয়ে গিয়েছিল বললাম না।
তাশফা কিছু বললো না বিছানার এক কোণে গুটিসুটি মেরে বসে আছে। একটু পরেই রাকা চলে আসলো,রাকাকে দেখে তাশফার মুখে হাঁসি ফুটে উঠেছে দৌড়ে গিয়ে রাকাকে জড়িয়ে ধরে,
– বান্ধবী তুই এসেছিস।
– হুম ছাড় তো এবার একটু দম নেই।
তাশফা রাকাকে ছেড়ে দিল রাকা বিছানায় বসতেই তাশফার মা এসে রাকার হাতে জুস দিয়ে,
– গরমের মধ্যে আসলে নাও এটা খেয়ে নাও আর আজ কিন্তু এখানেই থাকবে।
– কেন আন্টি কিছু আছে নাকি?
– তাশফা তোমাকে কিছু বলেনি?
রাকা মিথ্যে বলল,
– না তো আন্টি।
– ওর বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে আমার বোনের ছেলের সাথে,ওরা দেরি করতে চাইছে না আজ মেহেদী অনুষ্ঠান তোমাকে আমি ফোন করে বলতাম তুমি তো এসেই পড়েছ ভালোই হয়েছে।
– কিন্তু আন্টি এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে তাশফার মতামত নিয়েছেন?
– ওর মতামত কিসের আমরা তো ওর ভালোই চাই, ছেলে ভালো তবে বিয়ের পরেও পড়াশোনা করবে সমস্যা নেই, তোমরা কথা বলো আমি আসছি অনেক কাজ।
বলেই চলে গেলেন তাশফার মা, তাশফা কাদুকাদু চোখে রাকার দিকে তাকিয়ে,
– রাকারে এবার তোর ভাইয়ের কি হবে তার ঘরে যে সতিন আসছে।
– সতিন! ভাইয়ার সতিন?
– আমার যদি নিহানের সাথে বিয়ে হয়ে যায় তাহলে নিহান তো তোর ভাইয়ের সতিন হবে।
– ছেলেদেরও সতিন হয়?
– জানি না তবে এই বিয়ে না আটকালে তোর ভাইয়ের হবে।
– এখন আমি কি করবো আন্টির কথা শুনে বুঝলাম বিয়ে আটকানো সম্ভব নয় আর ভাইয়াকে গিয়ে সরাসরি আমি কখনো বলতে পারবো না ভাইয়ার যেই রাগ।
কথাটা শুনে তাশফা কেঁদে দিল রাকা তাশফার চোখ মুছে,
– আহা কাঁদে না বাবু।
___________
বিকেলে নিহানদের বাড়ির সবাই এসেছে তাশফাদের বাড়িতে অনেক লাইটিং করা হয়েছে বাড়ির ছাদে মেহেদী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে রাকা বাড়িতে বলে দিয়েছে ফিরতে দেরি হবে তাশফাদের বাড়িতে আছে তাই আর কেউ কিছু বলেনি।
তাশফা সুন্দর একটা হালকা কাজের ল্যাহেঙ্গা পড়েছে সাথে হালকা মেকআপ। রাকা আনন্দে মেহেদী পড়ছে নিহান একপাশে দাঁড়িয়ে ফোনে কথা বলছিল পাশে তাশফাকে দেখে ফোনটা রেখে,
– কিছু বলবে?
– আপনাকে বললাম আমি অন্য কাউকে পছন্দ করি তারপরেও কেন বিয়েতে রাজি হলেন?
– শোনো তোমার বয়সটা পাড় করে এসেছি এই বয়সটা আবেগের যাকে দেখবে তাকেই ভালো লাগবে অথবা কাউকে একান্তই ভালো লাগবে তাই তোমার কথার গুরুত্ব দেওয়া আমায় মানায় না বিয়ের পর সব ঠিক হয়ে যাবে।
– এটা আবেগ নয় আমি সত্যি সত্যি রাদিফ ভাইকে পছন্দ করি আর আমি ওনাকেই চাই।
নিহান ব্রু কুঁচকে,
– কি বললে তুমি কাকে পছন্দ করো?
রাকা তাদের মাঝে এসে গেল তাশফাকে টানতে টানতে,
– এখানে কি করছিস চল মেহেদী পড়বি।
✰✰
রাত এগারোটা মেহেদী পড়ে শুকিয়ে হাত ধুয়েও ফেলেছে তাশফা। রাকার ইচ্ছে ছিল আজ তাশফার সাথেই থাকার কিন্তু রাদিফ থাকতে তা কিছুতেই সম্ভব নয়। সে বোনকে আর যাই হোক রাতে একা কোথাও ছাড়বে না তাই রাকাকে নিতে চলে এসেছে।
তাশফার বাবা-মা রাদিফকে দেখে খুশি হয়েছেন আপ্যায়ন করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন কিন্তু রাদিফ অনেক কষ্টে আটকেছে। তাশফার বাবা-মা রাদিফের ব্যাপারে জানে তাই তার ব্যবহারে তাকে ভালোই লেগেছে উনাদের।
ইতোমধ্যে রাদিফ জেনে গেছে তাশফার বিয়ে ঠিক হওয়ায় কথা কিন্তু তার মুখ দেখে বুঝা যাচ্ছে না সে খুশি হয়েছে নাকি হয়নি। রাকা অনিচ্ছা সত্ত্বেও গিয়ে গাড়িতে বসেছে কিন্তু এর মধ্যে তাশফাকে রাদিফ একবারও দেখতে পেল না। গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতে যাবে ঠিক সেই সময় হাতে টান অনুভব করলো রাদিফ। কেউ পেছন থেকে তার হাত টেনে ধরেছে পেছনে ঘুরতেই তাশফাকে দেখে কিছুটা চমকে গেল। তাশফা রাদিফের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দু’জনের দৃষ্টি দু’জনের দিকে স্থির।
যে তাশফা রাদিফকে দেখে ভয় পেত পালাতো আজ তার চোখে কোন ভয় নেই ফোলা ফোলা চোখ নিয়ে তাকিয়ে আছে দেখেই বুঝা যাচ্ছে অনেক কান্না করেছে। তবে আজকের তাশফাকে দেখতে রাদিফের বেশ ভালো লাগছে। নিজের মনকে শান্ত করে রাদিফ তাশফাকে কিছু বলতে যাবে সাথে সাথে তাশফা তার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে। কান্নার বেগ বেড়ে গেছে তাশফার এহেম কাজে রাদিফ বিষ্মিত হয়ে গেছে আজকের তাশফা তার কাছে খুব অচেনা। তাশফা ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে,
– রাদিফ ভাই বিশ্বাস করুন আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি আপনাকে ছাড়া আমি আর কাউকে বিয়ে করতে পারবো না এই বিয়েতে আমি একদম রাজি না একবার বাবা আর আম্মুর সঙ্গে কথা বলুন না কেউ আমার কথা শুনছেই না আপনি যা বলবেন আমি তাই করবো একটুও আপনাকে বিরক্ত করবো না শুধু আপনি এই বিয়েটা আটকে দিন।
রাদিফ যেন জমে গেছে নিজের থেকে তাশফাকে ছাড়িয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে,
– এসব পাগলামির মানে হয় তোমার বাবা-মা তোমার ভালো চায় হয়তো ছেলে ভালো তাই তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়ার জন্য রাজি হয়েছে।
– আমার ভালো লাগবে না আমার শুধু আপনাকে লাগবে।
– এসব বাচ্চামি বাদ দাও আশেপাশের মানুষ দেখলে তোমাকেই খারাপ বলবে,বাড়ির ভেতরে যাও।
– রাদিফ ভাই!
রাদিফ নিজের দৃষ্টি সরিয়ে তাশফাকে এড়িয়ে গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল। তাশফা এখনো অসহায় দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে আছে। পুরো কাহিনীটাই রাকা গাড়ির ভেতরের আয়নাতে দেখেছে মনে সাহস সঞ্চয় করে,
– ভাইয়া কেন এমন করছিস? তাশু সত্যি তোকে ভালোবাসে এমন তো নয় যে তোর জীবনে অন্য কোন মেয়ে আছে তাহলে ওকে ভালোবাসতে সমস্যা কোথায়? তুই তো ওকে ভালো করেই চিনিস ও একটা ভালো মেয়ে কেন কষ্ট দিচ্ছিস?
– ছোট ছোটর মতো থাক আমি কি করবো না করবো সেটা আমার ব্যাপার এ নিয়ে আমি আর কিছু শুনতে চাই না।
রাদিফের ধমক খেয়ে চুপ করে গেছে রাকা। গাড়ি তার আপন গতিতে চলছে।
চলবে……..