Home "ধারাবাহিক গল্প প্রেম প্রেম পাগলামী প্রেম প্রেম পাগলামী পর্ব-১৫

প্রেম প্রেম পাগলামী পর্ব-১৫

0
258

#প্রেম_প্রেম_পাগলামী
#পর্ব_১৫
#রেবেকা_খাতুন

দীর্ঘ চুম্বন শেষে আহাদ মাহার কপালে নিজের কপাল ঠেকায়। দুজনের গাঢ় নিঃশ্বাস পতিত হয় একে অপরের মুখে। কিছুটা হাঁপাতেও থাকে। একটা সময় পর মাহা বলে ওঠে,
“বললেন না তো, পিছুটান করবেন আমায়?”

“উহু!”
আহাদের এই স্বীকারোক্তিতে মাহার নেত্রদ্বয় ভিজে আসে। কয়েকফোঁটা গড়িয়ে পড়তে গিয়েও পড়তে পারেনা, তার আগেই সেই অশ্রুবিন্দু গুলো শুষে নেয় আহাদ। মাহা কেমন কেঁপে ওঠে। ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে এবার।

“হুস। স্টপ ক্রাইং সুইটহার্ট!”

“থেকে যান নাহ! আমি সরি তো। আর আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলবো না। এবারের মতো কি মাফ করা যায়না? নাকি ওই পৃথাকে বিয়ে করবেন বলে ভেবেছেন? এমন যদি হয় তাহলে আমি মরে…”
মাহা আর কথা শেষ করতে পারেনা, তার আগেই একজোড়া ওষ্ঠের ছোঁয়া তার ওষ্ঠে বিরাজ করতে শুরু করে। তবে এবার আহাদ ঠোঁটের উপর চাপ প্রয়োগ করে, যার দরুণ ঠোঁট কিছুটা কেটে যায়। আহাদের সমস্ত রাগ সে যুদ্ধের ন্যায় মাহার ঠোঁটের উপর দিয়ে চালায়। মাহা ব্যথা পেলেও একটা কথাও বলেনা। চুপচাপ সয়ে নেয় সবটা। একটা সময় পর আহাদ শান্ত হয়। ছেড়ে দেয় মাহার ওষ্ঠদ্বয়।

“আর একবার মরার কথা বলবি তো, তোকে আমি নিজে হাতে মারবো। তবে অন্যভাবে!”

“তাহলে বলুন, যাবেন না।”

“না গেলে আমার লাভ? কি পাবো আমি?”

“সারাজীবনের জন্য আমাকে পেয়ে যাবেন।”

“তাই? তোকে বিশ্বাস করা যায়? এক্ষুণি তো মত চেঞ্জ করে বসে থাকবি। অয়নকে পেলে তার হাত ধরে প্রেমালাপ শুরু করে দিবি।”
অয়নের কথা শুনে মাহার মুখটা চুপসে যায়। সে তো অয়নকে কোনোদিন হাতও ধরতে দেয়নি, তবে সেদিন কি দুর্ভাগ্য ছিল যে, অয়ন তাকে মানানোর জন্য তার হাত ধরেছিল। আর সেদিনই আহাদ সবটা দেখেছিল।

“আপনি সেদিন যেটা দেখেছিলেন….”

“আমি কোনো কিছুর এক্সপ্ল্যানেশন চায়নি।”
মাহার মুখটা চুপসে যায়। আহাদ সেই দিকে নিজের গম্ভীর দৃষ্টি তাক করে।

“অনেক সাজা বাকি মাহা। বর থাকতেও অন্য ছেলেকে বিয়ে করতে চাওয়ার অপরাধে তোকে কি সাজা দেওয়া যায় বলতো? নিজেই নির্ধারণ কর নিজের সাজা। নইলে আমি শান্তি পাবোনা।”

“সাজা তো দিয়েছিলেন। জোর করে নিজের কাছে টেনেছিলেন।”
মাহা কথাটা বলে থামে। ভাবে আহাদ এবার নিশ্চয় খুব রেগে যাবে। হঠাৎ করেই তার এই কথাটা বলা উচিত হয়নি, মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। এবার হয়তো আহাদ একটা শক্তপোক্ত চড় বসিয়ে দেবে, কিংবা শাস্তিস্বরূপ আবারও দূরে সরিয়ে বিদেশ চলে যেতে চাইবে। মাহা এসব ভেবে শুকনো ঢোক গেলে।

“ওটা আমার অধিকারের মধ্যে পড়ে। আর তোরও উচিত আমার অধিকারে নিজেকে সামিল করা। করেও ছিলিস। তুই মোটেও অস্বীকার করতে পারবিনা, গভীর মুহূর্তে তুই নিজে আমার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছিলিস। তাই তো আমি আরো মত্ত হয়েছিলাম। করিসনি?”
মাহা মাথা নীচু করে ফেলে। আহাদ তার থুতনি ধরে উপরে তোলে।

“আমি অপরাধ করেছি, কিন্তু সেই অপরাধে আরো গভীর ভাবে তুই আমাকে টেনেছিস। সামিল করেছিস।”

“কারণ আমি আপনাকে ভালোবাসি।”

“তাহলে অন্যকাউকে কেন বিয়ে করতে চেয়েছিলিস? একটাবার আমার কথা মনে হয়নি? একটাবার বিয়ের কথা জানাতে ইচ্ছা করেনি? বাড়িতেও কেউ আমাকে জানালনা। কেন? কিসের জন্য!”
আহাদের এই রাগ মিশ্রিত কন্ঠে মাহা কেঁদে দেয়। এই তো কত কাছে ছিল, মাহাকে ভালোবাসছিল। যদিও এখনও কাছেই আছে, কিন্তু মাহাকে এবার ধমকাচ্ছে। ভালোবাসার ভ ও মাহা তার মাঝে খুঁজে পাচ্ছেনা।

“বাচ্চাদের মতো কাঁদবিনা মাহা। আমার কথার জবাব দে।”

“আপনিই তো চলে গেছিলেন। খোঁজ নিয়েছিলেন আমার? বলেছিলেন ভালোবাসি?”

“নাও তো বলিনি।”

“হ্যাঁও বলেননি।”
মাহা অভিমানী কন্ঠে কথাগুলো বলে। আহাদ এবার থেমে যায়। যেসব প্রশ্ন যে তার প্রেয়সীকে কাঁদিয়ে ছাড়ছে, সেসব প্রশ্ন সে আর করবেনা ঠিক করে।

“আচ্ছা আর কিছু বলবনা। কাঁদেনা জান।”
কথাটা বলে আহাদ মাহার চোখের পানি মুছিয়ে দেয়। আলতো হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে।

“মাহা…!”
আহাদ ধীর কন্ঠে ডাক দেয়। মাহা নাক টেনে জবাব দেয়,
“হুঁ!”

“আমাকে মাফ করে দিস। আমি সেদিন ওসব করতে চাইনি, আসলে তোকে নিজের কাছে রাখার কোনো পথ খুঁজে পাইনি। আমি পাগলের মত ছুটে এসেছিলাম। তোর সাথে যোগাযোগও করতে পারছিলাম না। উন্মাদ, বদ্ধ পাগল হয়ে আমি ওসব করে ফেলেছি। তোকে তোর নারী সত্তায় তোর অনুমতি না নিয়েই আঘাত করেছি, তোকে জোর করেছি। সবকিছুর জন্য আমাকে মাফ করে দিস মাহা। তুই আমাকে ভালোবাসিস সেটা জানার পর অপরাধবোধ কমলেও মনের মাঝে একটা পাথর জমে আছে। মাফ করে দে মাহা। একটাবার বল মাফ করেছিস?”
মাহা শক্ত হাতে আহাদকে জড়িয়ে ধরে।
“আপনার অধিকার ওটা। আমি সম্পূর্ণটাই আপনার। সেখানে অনুমতির কোনো প্রয়োজন নেই।”

“তাহলে আমাকে মাফ করে দিয়েছিস?”

“হুঁ।”
আহাদের ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে ওঠে।

“রোজকার মত আজও আমার রুমে চলে আসবি, তবে এবার আর লুকিয়ে নয় আমার সজ্ঞানে!”

“তারমানে…তারমানে আপনি জেগে থাকতেন?”
মাহা শুকনো ঢোক গিলে কথাটা বলে।

আহাদ রহস্যময়ী হাসি হেসে বলে,
“প্রেয়সীর সঙ্গ পেতে তো জেগে থাকতেই হতো। নইলে কি আর জানতে পারতাম, সে কতটা আমাকে ভালোবাসে।”

“আপনি সব জেনেও এসব করলেন? চলে যেতে চাইলেন?”

“জানতাম, কিন্তু তাও তোর মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম। ভালো লাগে তো। কেন বুঝিস না?”

“পৃথার সাথে যে বিয়ে দেবে বলছে, ওটা কি হবে? আমি কিন্তু আপনাকে মেরে ফেলবো।”

“আমি আছি তো। সামলে নেবো।”
মাহা আর কিছু বলেনা। লেপ্টে রয় আহাদের বুকে।

————-

আহাদের রুম থেকে বেরিয়ে পৃথা আকসা বেগমের রুমে গিয়ে থামে। কেঁদে কেঁদে সবটা বলতে থাকে ওনাকে। আকসা বেগম অনেকক্ষণ ধরে মেয়েটাকে শান্ত করায় লিপ্ত হন। নানান সান্ত্বনার বানী আওড়ান,
“কাঁদেনা মা। আমি আছি তো। আজকেই আহাদের সাথে আবার কথা বলবো। চলে যেতে বলবো তাকে। তারপর তোকেও পাঠিয়ে দেবো।”

“আহাদ ভাই আমাকে মেনে নেবেনা। কখনও নেবেনা।”

“ছেলেদের মন গলতে কতক্ষণ?”

‘কিন্তু…”

“আমি আছি তো। আগে আহাদকে বিদেশ চলে যেতে বলি, তারপর অয়নের সাথে কথা বলবো। আহাদ না থাকলে ওই মেয়ে অয়নকে বিয়ে করতে বাধ্য হবে, তারপর তোর রাস্তা পরিষ্কার! আহাদ তোর হবে।”

“সত্যিই হবে তো?”

“আরে হবে হবে। না হয়ে যাবে কোথায়? হতেই হবে।”
পৃথা তার ফুপির কথা বিশ্বাস করে নেয়, আনন্দে জড়িয়ে ধরে আকসা বেগমকে।

——–

ডিনারে আজ মাহা আগে আগেই এসে বসেছে। মনটা কেমন চনমনে। হেনা বেগম মেয়েকে এহেন রূপে দেখে হাসেন। তবে আহাদের চলে যাওয়ার ব্যাপারটা নিজেও চিন্তায় আছেন, বুঝতে পারেন না, আহাদের চলে যাওয়ার কথা শুনে তাও মেয়েটা হাসিখুশি আছে কি করে!

মিসা এসে বসে মাহার সামনের চেয়ারে। চোখ দিয়ে বারবার ইশারা করে মাহাকে নানান লজ্জায় ফেলে সে। মাহাও লজ্জায় মাথা তুলতে পারেনা। সব দোষ দেয় আহাদকে। লোকটা দরজা খোলা রেখেই রোম্যান্স শুরু করে দিয়েছিল। যদি অন্য কেউ আসতো? মাহা তো লজ্জায় কাউকে আর মুখ দেখাতেই পারতোনা।

পরপর সকলে এসে খাবার টেবিলে বসে। সবশেষে আসে আহাদ। এসে সে মাহার পাশের চেয়ারে বসে। মাহার কেমন হাঁসফাঁস শুরু হয়। হেনা বেগম আর আকসা সবাইকে খাবার পরিবেশন করেন। খাবার টেবিলে পিনপতন নীরবতা। চুমকি বেগম ইশারায় ননদকে কিছু বোঝান। কাশেম সাহেব চুপচাপ খাচ্ছেন। তবে গলা দিয়ে খাবার নামছেনা পৃথার। আহাদ মাহার পাশে বসেছে এটা মানতে তার ভীষণ অসুবিধা হচ্ছে। মনে মনে হিংসায় জর্জরিত হচ্ছে সে।

“তাহলে কবে যাচ্ছিস আহাদ?”
নীরবতা ভেঙে আকসা বেগমের কথাটা যেন ঝংকার তুলে দেয়।

“কবে যাচ্ছে মানেটা কি? আহাদ কোথাও যাবেনা।”
আরবাজ চৌধুরীর বিরক্তিকর কণ্ঠস্বর।

“সে যেতে চাইলে যাক। মনের প্রশান্তি আনুক।”
আকসা বেগমের কথায় সবাই শান্ত থাকে। মাহা আড়চোখে তাকায় আহাদের দিকে, তবে আহাদ নীরবে খেয়ে যাচ্ছে। যেন খাওয়াটাই এখানে মূল কাজ।

“তোমার মত পরিবর্তনের কারণ কি? সকালেই তো চাইছিলে না আহাদ চলে যাক। তাহলে এখন চাইছো কেন?”

“সে থাকতে চাইছেনা, মাহাকে চাইছেনা। তাহলে মনকে কেন কষ্ট দেবে? তার থেকে মাহাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে যাক।”
আরবাজ চৌধুরী বিরোধিতা করে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আহাদ বলে ওঠে,
“আমি কোথাও যাচ্ছিনা। আর না মাহাকে ডিভোর্স দিচ্ছি। মাহা আমার সাথেই থাকবে। এই মুহূর্ত থেকে, সারাজীবনের জন্য।”

চলবে……