Home "ধারাবাহিক গল্প ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-২৮+২৯

ফিরেছি তোর আঙ্গিনায় পর্ব-২৮+২৯

0
505

#ফিরেছি_তোর_আঙিনায়
পর্ব —২৮
মৌমো তিতলী 🦋

গাড়িটা প্রায় উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে আয়াত।
রাতের ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তায় একের পর এক গাড়িকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলেছে সে। স্টিয়ারিং ধরা দুটো হাত থরথর করে কাঁপছে। তবুও নিজেকে শক্ত রাখার প্রাণপণ চেষ্টা করছে।

পেছনের সিটে মৌমিতার কোলে মাথা রেখে আধচেতন অবস্থায় শুয়ে আছে নোরা। যন্ত্রণায় মুখ নীল হয়ে গেছে মেয়েটার।

মৌমিতা এক হাতে নোরার মাথা আগলে রেখেছে, অন্য হাত দিয়ে বারবার ওর কপালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

— নোরা… শুনতে পাচ্ছিস? চোখ বন্ধ করিস না প্লিজ… আমার দিকে তাকা..

কিন্তু নোরার কোনো উত্তর নেই। মুখ থেকে অদ্ভুত একরকম গোঙানির আওয়াজ ছাড়া কিছুই বের হচ্ছেনা। যন্ত্রণায় তার শরীর বারবার কেঁপে উঠছে।

আয়াত রিয়ার ভিউ মিররে একবার তাকিয়েই আবার চোখ ফিরিয়ে নিলো। প্রেয়সীর এসিড দগ্ধ হয়ে যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকার এই দৃশ্য সহ্য করার শক্তি তার আর নেই।

কয়েক মিনিটের মধ্যেই গাড়ি এসে থামলো শহরের অন্যতম বড় একটি প্রাইভেট হাসপাতালে।

গাড়ি থামার আগেই হাসপাতালের জরুরি বিভাগের কর্মীরা স্ট্রেচার নিয়ে এগিয়ে এলেন।
আয়াত নিজেই নোরাকে কোলে তুলে স্ট্রেচারে শুইয়ে দিল। পাগলের মতো শুধু একটা কথাই বলতে লাগলো,,

— প্লিজ… ওকে বাঁচান… প্লিজ…

ডিউটিরত ডাক্তার আয়াত কে দেখা মাত্রই চিনতে পেরেছেন। ঘটনা কি সেটা নিয়ে না ভেবে দ্রুত পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে উচ্চস্বরে নির্দেশ দিলেন,,

— ইমার্জেন্সি প্রস্তুত করুন কুইক। বার্ন ও ট্রমা টিমকে খবর দিন হারিআপ!

কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই স্ট্রেচার দ্রুত Emergency department এর ভেতরে মিলিয়ে গেলেন।

আয়াত আর মৌমিতা এলোমেলো ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। অপারেশন থিয়েটারের দরজা বন্ধ হয়ে গেল তাদের চোখের সামনেই।

হঠাৎ করেই যেন আয়াতের পৃথিবীটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
করিডোরের সাদা দেয়ালের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে আয়াত।
তার মনে হচ্ছে সবকিছু যেন দুঃস্বপ্ন। ঘুম ভেঙ্গে গেলেই দেখবেন সব ঠিক আছে,তার ভালোবাসা সুস্থ আছে,তার নোরার কিচ্ছু হয়নি।
এই তো মাত্র কিছুক্ষণ আগেও নোরা খিলখিল করে হাসছিল। আইসক্রিম নিয়ে মৌমিতার সঙ্গে ঝগড়া করছিল।
আর এখন…

দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ফ্লোরেই বসে পড়লো আয়াত। অসীম কষ্টের ধাক্কা আর সইতে না পেরে ডুকরে কেঁদে উঠলো সে।

এদিকে মৌমিতা আর নিজেকে সামলে রাখতে পারলো না। দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েই ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো। প্রথমবারের মতো নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছে তার। বিড়বিড় করে বললো,,,

— আল্লাহ…নোরার কিছু যেন না হয়…

কাঁদতে কাঁদতেই কাঁপা হাতে আশাকুঞ্জে ফোন করলো সে। ফোন তুললেন আশালতা বেগম।
সবকিছু শুনে আশালতা বেগমের হাত থেকে ফোনটাই প্রায় পড়ে যাচ্ছিল। বিপাশা মাহমুদ পাশেই ছিলেন। সবকিছু শুনে হতবাক হয়ে বসে রইলেন তিনি।

শাহেদা খানম কিছুই বুঝতে না পেরে শুধু বললেন,,,

— কী হইছে? কেউ কিছু কও…

কিছুক্ষণের মধ্যেই আশালতা বেগম, বিপাশা মাহমুদ এবং শহরের বাইরে থাকা সাদমান চৌধুরীকেও খবর দেওয়া হলো।

ব্যবসায়িক কাজ ফেলে তিনি দ্রুত ঢাকার উদ্দেশে রওনা দিলেন।

শাহেদা খানম যেতে চাইলেও শারীরিক অবস্থার কারণে তাঁকে বাড়িতেই থাকতে হলো। হসপিটালে যাওয়া,ভীড়,এসব ধকল তিনি এই মুহূর্তে নিতে পারবেন না। অগত্যা বৃদ্ধা মহিলা শুধু দু’হাত তুলে বারবার দোয়া করতে লাগলেন।

— আল্লাহ… মাইয়াডারে তুমি হেফাজত কইরো…আমি কইছিলাম এহন বাইরে যায়ও না। দেখলা আল্লাহ কি বিপদ ডা ঘটলো! আল্লাহ তুমি সহায় হও ! মাইয়াডা যেন ঠিক হইয়া যায়!

প্রায় চল্লিশ মিনিট পর হাসপাতালে পৌঁছালেন আশালতা বেগম ও বিপাশা মাহমুদ।

করিডোরে বসে থাকা আয়াতকে দেখে বিপাশা মাহমুদের বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো।
ছেলেটা মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখ দুটো লাল।
মুখে কোনো কথা নেই।

তিনি ছেলের মাথায় হাত রাখতেই আয়াত ছোট্ট বাচ্চার মতো মায়ের হাত শক্ত করে ধরে ফেললো।

খুব কষ্টে বললো,,,

— আম্মু… আমার নোরা,,,,আমার নোরার কিছু হবে না তো আম্মু?

বিপাশা মাহমুদ নিজের চোখের জল লুকিয়ে বললেন,,,

— ইনশাআল্লাহ কিছু হবে না বাবা। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখ।

এর কিছুক্ষণ পরেই হাসপাতালের সামনে এসে থামলো আদিত্যর ট্যাক্সি। দ্রুত নেমে ভেতরে ঢুকলো আদিত্য।
করিডোরে ঢুকেই মৌমিতাকে দেখতে পেল।

এতক্ষণ ধরে নিজেকে কোনো রকমে সামলে রাখা মৌমিতা আদিত্যকে দেখামাত্র আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না।

দৌড়ে গিয়ে তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো।

— আদিত্য…নোরা!

কথাটা শেষ করার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়লো সে।
আদিত্য কোনো কথা বললো না। আলতো করে মৌমিতার মাথায় একটি চুমু এঁকে দিল।
তারপর ধীরে ধীরে মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বললো,

— শশশ কাঁদে না। ডক্টর দেখছেন তো। নোরার কিচ্ছু হবে না দেখো। তুমি একটু শান্ত হও। আমার কথা শোনো জান! কিছু হবে না… আমরা সবাই আছি তো।
মৌমিতা শুধু মাথা নেড়ে কাঁদতেই থাকলো।

সময় যেন আজ এগোতেই চাইছে না।

এক ঘণ্টা…দুই ঘণ্টা…তিন ঘণ্টা…
অবশেষে অপারেশন থিয়েটারের লাল বাতিটা নিভে গেল। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এলেন প্রধান সার্জন হিমেল দত্ত।

সবাই একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালো।

আয়াত প্রায় দৌড়ে গিয়ে ডাক্তারের সামনে দাঁড়ালো।

— ডাক্টর দত্ত… নোরা কেমন আছে? ও ঠিক আছে তো?

ডাক্তার দত্ত কিছুক্ষণ নীরব থেকে বললেন,,,

— আপাতত রোগী বিপদমুক্ত। আমরা প্রাথমিক চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করেছি।

সবাই যেন একসঙ্গে একটু নিঃশ্বাস ফেললো।

কিন্তু আদিত্য খেয়াল করলো ডাক্তারের মুখের গম্ভীর ভাব এখনও কাটেনি। আদিত্য বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন,,,

— একচুয়ালি এসিডের মাত্রা বেশি থাকার কারণে পেশেন্টের গলা, বুকের একপাশ এবং শরীরের কিছু অংশে গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। রোগীকে দীর্ঘ সময় চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।

আয়াতের বুক ধক করে উঠলো। স্তব্ধ হয়ে ডক্টরের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে সে। আদিত্য প্রশ্ন করে,,,

— আর কোন সমস্যা ডক্টর…?

ডাক্তার ধীরে স্বরে বললেন,,

— গলার অংশ বেশি দগ্ধ হওয়ায় পেশেন্টের ভোকাল কর্ড মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। তবে আশঙ্কা আছে, সুস্থ হতে পারলেও হয়তো আগের মতো স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারবেন না। আর যদি আল্লাহর রহমতে কথা বলতেও পারেন তাহলেও বেশ সময় লাগতে পারে, কিংবা দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও বাইরের দেশের উন্নত মানের স্পিচ থেরাপির প্রয়োজন হতে পারে।

ডক্টর দত্তের কথাগুলো যেন বজ্রপাত হয়ে আঘাত করলো আয়াতের বুকে। সে কয়েক পা পিছিয়ে দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো।

চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়ছে। তার মাথায় শুধু একটাই কথা ঘুরছে,,

যে মেয়েটার কণ্ঠস্বর শুনে সে বারবার মুগ্ধ হতো,,যার কথার ফুলঝুরিতে আয়াতের বক্ষ শীতল হতো.. যদি সেই কণ্ঠই হারিয়ে যায়? কিভাবে বাঁচবে মেয়েটা! জ্ঞান ফিরলে কিভাবে সামলাবে সে নোরা কে!

মৌমিতা মুখ চেপে কেঁদে উঠলো,,

— না আল্লাহ… এমনটা করবেন না… আল্লাহ এমনটা করতে পারেন না নোরার সাথে। কিচ্ছু হবে না ওর।

বিপাশা মাহমুদের মুখটা থমথমে হয়ে আছে।
আশালতা বেগমও নিঃশব্দে হাত তুলে প্রার্থনা করলেন।

আদিত্য এগিয়ে এসে ডাক্তারের সঙ্গে আলাদা করে কথা বললো,,

— ডক্টর, চিকিৎসার জন্য যা যা দরকার, সব করবেন। অর্থ নিয়ে একটুও ভাববেন না। দেশের বাইরে নিতে হলে সেটাও করা হবে। শুধু ওকে সুস্থ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করুন।

ডাক্তার মাথা নেড়ে বললেন,,,

— আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি মিঃ চৌধুরী।

এরপর কেটে গেল দুটো দীর্ঘ দিন।

এই দুদিনে হাসপাতালের করিডোরটাই যেন আয়াতের পৃথিবী হয়ে গেছে। একবারের জন্যও সে হাসপাতাল ছেড়ে কোথাও যায়নি।
ইমার্জেন্সি কেবিনের সামনেই কখনো চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে, দোয়া পড়ছে, কখনো জানালার বাইরে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।

মৌমিতার অবস্থাও প্রায় একই।

বান্ধবীর হাত ধরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকে।
মাঝেমধ্যে আড়ালে চোখের জল মুছে।

আশালতা বেগম আর বিপাশা মাহমুদ বাড়ি ও হাসপাতাল দুই জায়গাই সামলানোর চেষ্টা করছেন।
আশাকুঞ্জে বিয়ের সব প্রস্তুতি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে।
যে বাড়িটা কয়েকদিন আগেও আলো আর আনন্দে ভরে ছিল, সেখানে এখন নেমে এসেছে এক থমথমে নীরবতা।

সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে আদিত্য।
একদিকে অফিসের দায়িত্ব। অন্যদিকে হাসপাতালের সব দায় দায়িত্বও সেই পালন করছে, চিকিৎসকদের সঙ্গে যোগাযোগ, পরিবারের সবাইকে সামলানো, আর ভেঙে পড়া আয়াত ও মৌমিতার পাশে থাকা সবটাই করছে আদিত্য।
প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ছুটে বেড়াচ্ছে সে। তবু মুখে একবারও বিরক্তি বা ক্লান্তির ছাপ নেই।

অন্যদিকে…
সোহেল এখন পুলিশ হেফাজতে।
তার বিরুদ্ধে আয়াত-নোরার মানহানি, নোরার ওপর পরিকল্পিত এসিড হামলা এবং আরও কিছু গুরুতর অপরাধের অভিযোগে মামলা হয়েছে।

তদন্তকারী অফিসাররা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে, প্রচুর টর্চার করা হয়েছে সোহেল কে। কেউ তার প্রতি বিন্দুমাত্র দয়া দেখায়নি। সাথে আইনি প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে।

হেফাজতের নির্জন সময়গুলোতে সোহেলের ভেতরেও ধীরে ধীরে ভয় আর অনুশোচনা জমতে শুরু করেছে।
বারবার তার মনে একটাই প্রশ্ন ফিরে আসছে
কেন সে প্রতিশোধের পথ বেছে নিল? নিজের রাগ আর হিংসাকে যদি সেদিন থামাতে পারতো…
তাহলে আজ হয়তো এই অন্ধকার পরিণতির মুখোমুখি হতে হতো না। জেলখানার আবছায়া সেলের ভেতরে রাগে, দুঃখে আর আফসোসে নিজের মাথার চুল টেনে ছিঁড়তে লাগলো সোহেল!

চলবে…

#ফিরেছি_তোর_আঙিনায়
পর্ব—২৯
মৌমো তিতলী 🦋

দুটো দীর্ঘ রাত আর দুটো বিষণ্ন দিন পেরিয়ে গেছে।
হাসপাতালের আইসিইউ ফ্লোর জুড়ে ফিনাইলের গন্ধ ছড়িয়ে আছে। নিস্তব্ধ করিডোরে নার্সদের দ্রুত পায়ের শব্দ যেন সময়কে আরও ভারী করে তুলেছে।

ভোরের সূর্য ধীরে ধীরে হাসপাতালের কাঁচের জানালা ভেদ করে কেবিনের ভেতরে ঢুকছে। স্নিগ্ধ সোনালি আলো এসে পড়েছে বিছানায় শুয়ে থাকা নোরার মুখে।
মুখটা ভীষণ নিষ্পাপ লাগছে তার।
শুধু গলার নিচ থেকে ব্যান্ডেজে মোড়ানো পুরো অংশটা যেন নির্মম বাস্তবতার সাক্ষী হয়ে ফুটে আছে।
বেডের একপাশে মাথা নিচু করে বসে আছে আয়াত।
এই দু তিনদিন ধরে এক মিনিটের জন্যও হাসপাতাল ছাড়েনি সে।
চোখের নিচে গভীর কালচে দাগ পড়েছে। দাড়িগুলো বেড়েছে বেশ। চুলগুলো এলোমেলো।
পরপর কয়েক রাত না ঘুমানোর ক্লান্তি পুরো মুখজুড়ে স্পষ্ট। তবুও তার দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্যও নোরার মুখের দিকে থেকে সরেনি একদন্ড।
নোরার হাতটা নিজের দুই হাতের ভেতর শক্ত করে ধরে রেখেছে সে।
মাঝে মাঝেই খুবই অস্ফুট স্বরে বলছে,,,

— জান… আর কত ঘুমাবে? আমি কিন্তু অপেক্ষা করছি। একবার শুধু চোখ খুলে আমার দিকে তাকাও..
আমাদের না কয়েকদিন পর বিয়ে! এভাবে থাকলে কিভাবে হবে জান? চোখ মেলে তাকাও একবার!
.
কথাগুলো বলতে বলতে কখন যে নিজের অজান্তেই চোখ ভিজে ওঠে, তা নিজেও বুঝতে পারে না আয়াত।
ঠিক তখনই…

দীর্ঘ তিনদিন পর নিজের হাতের মুঠোয় ধরে রাখা নোরার আঙুলে খুব সামান্য নড়াচড়া অনুভব করলো আয়াত।
প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারলো না সে।
আয়াত ঝুঁকে এলো আরও কাছে। নোরার চোখের পাতাগুলো কেঁপে কেঁপে উঠছে।
আয়াতের বুকের ভেতরটা যেন হঠাৎ করেই ধুকপুক করে উঠলো।

— নোরা…
আরও একবার ডাকলো সে।
— জান…

ধীরে ধীরে চোখ খুললো নোরা। কেবিনের ইলেকট্রনিক নিয়ন আলোয় অভ্যস্ত হতে কয়েক সেকেন্ড সময় লাগলো।
ঝাপসা চোখে প্রথমেই সে আয়াতের মুখটা দেখলো।
নোরা কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো আয়াতের মুখের দিকে।
মনে হচ্ছে যেন কিছুই বুঝতে পারছে না।

আয়াতের ঠোঁটে হাসি ফুটে উঠলো। চোখ বেয়ে নেমে এলো স্বস্তির জল। অস্ফুট স্বরে বলল,,,

— আলহামদুলিল্লাহ…

আয়াত আর নিজেকে সামলাতে পারলো না।
নোরার কপালে খুব আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো।
কানের কাছে মুখ নিয়ে হাস্কি স্বরে বলল,,

— আমার জানটা ফিরে এসেছে…এত ঘুমানো কিন্তু ভালো না। আমরা সবাই কিন্তু তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

নোরা শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে।
ক্লান্ত, অবসন্ন চোখে। তারপর খুব ধীরে ঠোঁট নাড়লো।
মনে হলো কিছু বলতে চাইছে।

আয়াত তাড়াতাড়ি আরও ঝুঁকে এলো,,,

— কী বলছো? বলো…

নোরা আবারও ঠোঁট নাড়লো কিন্তু…
মুখ থেকে বেরিয়ে এলো ভাঙা, কর্কশ, অস্পষ্ট এক শব্দ
শব্দটা যেন গলার কোথাও আটকে গেছে।
নোরা আবার চেষ্টা করলো,,

—..আ…য়া…

তারপর তীব্র যন্ত্রণায় চোখ বন্ধ করে ফেললো।
আয়াতের মুখের হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল।
তার বুকের ভেতর হঠাৎ অজানা একটা শঙ্কা চেপে বসলো।
আয়াত দ্রুত ছুটলো ডক্টর হিমেল দত্তকে ডাকতে।

আয়াত বেরিয়ে যেতেই তখনই কেবিনের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো মৌমিতা। হাতে ছিল গরম দুধের ফ্লাস্ক।
ভেতরে ঢুকেই দেখলো নোরা জেগে উঠেছে। দরজা থেকে দৌড়ে কাছে এলো সে,,,

— নোরা!
চোখের জল আটকে রাখতে পারলো না মৌমিতা।
— আলহামদুলিল্লাহ…তুই জেগে উঠেছিস…

মৌমিতা কে দেখে নোরা খুব কষ্ট করে হাসার চেষ্টা করলো।
আবারও ঠোঁট নাড়লো।

—মৌ…

কিন্তু আগের মতোই শব্দগুলো গলার ভেতর থেকে ভেঙে ভেঙে এলো।
নোরা নিজেই অবাক হয়ে গেল নিজের গলার স্বরে।
আবার চেষ্টা করলো কিন্তু আবারও ব্যর্থ হলো।
হঠাৎ করেই নোরার চোখে আতঙ্ক নেমে এলো।
সে নিজের গলায় হাত দিয়ে মৌমিতার দিকে তাকালো।
বারবার যেন বলতে চাইছে,,,

—এই মৌ আমি কথা বলতে পারছি না কেন?

কিন্তু কোনো ভাষা বের হচ্ছে না। শুধু ভাঙা কর্কশ আওয়াজ ছাড়া।

মৌমিতার বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। মুহূর্তেই তার চোখ ভিজে গেল। কিন্তু সে জানে,এখন যদি সে কাঁদে…নোরা আরও ভেঙে পড়বে।

সে দ্রুত নিজের চোখের জল মুছে জোর করে হাসলো।
নোরার হাত নিজের দুই হাতে নিয়ে বললো,,

— এই পাগলী..এত চিন্তা করছিস কেন?
ডক্টর বলেছে তোর গলায় সামান্য ইনজুরি হয়েছে।কয়েকদিন বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। তুই শুধু রিল্যাক্স কর। আমরা সবাই আছি না?

নোরা স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো।
মনে হচ্ছে সে পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছে না।
তারপরও মৌমিতার চোখের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে মাথা নাড়লো।

ঠিক তখনই দরজায় দেখা গেলো ডক্টর কে। ভেতরে ঢুকলেন ডক্টর হিমেল দত্ত। সঙ্গে আদিত্য আর আয়াতও।

ডক্টর এগিয়ে এসে নোরার নার্ভ পরীক্ষা করলেন।
অক্সিজেন স্যাচুরেশন দেখলেন। ব্যান্ডেজের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করলেন। তারপর মুচকি হেসে বললেন,,,

— গুড মর্নিং, মিস কেমন লাগছে এখন?

নোরা খুব কষ্ট করে হাসলো।
উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতেই আবারও অস্পষ্ট শব্দ বের হলো।

ডক্টর দত্ত থামিয়ে দিয়ে শান্ত গলায় বললেন,,
— না…এখন কথা বলার চেষ্টা করবেন না। এখন যত কম বলবেন, তত দ্রুত সুস্থ হবেন। আমরা তো আছি।সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে নোরার মাথায় হাত রাখলেন,,

— সাহস রাখুন। আপনাকে কিন্তু খুব দ্রুত সুস্থ হতে হবে। কারণ আপনার সুস্থতার জন্য কিন্তু অনেক মানুষ অপেক্ষা করছে।

ডক্টরের কথায় নোরা চোখ ঘুরিয়ে পাশেই অবস্থানরত আয়াতের মুখের দিকে তাকিয়ে নোরা ধীরে ধীরে নিজের চোখ বন্ধ করলো। তার চোখের কোণে একফোঁটা টলটলে জল চিকচিক করে উঠলো।

ডক্টর হিমেল দত্ত শেষবারের মতো নোরার রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে নরম স্বরে বললেন,,,

— আপাতত বিশ্রামই সবচেয়ে জরুরি। বেশি কথা বলার চেষ্টা করবেন না। শরীর ধীরে ধীরে সাড়া দিচ্ছে। ইনশাআল্লাহ আরও ভালো হবে।
নোরার মাথায় আলতো করে হাত রেখে তিনি দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন।
বের হওয়ার আগে আয়াত আর আদিত্যর দিকে তাকিয়ে বললেন,,,

— মিস্টার আয়াত… মিস্টার আদিত্য… আপনাদের সঙ্গে একটু কথা ছিল। প্লিজ আমার চেম্বারে আসবেন।

ডাক্তারের গলার গাম্ভীর্য দুজনের কারোরই চোখ এড়ালো না। আয়াত একবার নোরার দিকে তাকালো।
মেয়েটা এখনও নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
মৌমিতা তার পাশে বসে হাত ধরে রেখেছে।

আয়াত খুব আস্তে নোরার কপালে হাত বুলিয়ে দিল।

— আমি আসছি জান… একদম কাছেই আছি।

নোরা কিছু বলতে চাইলো। ঠোঁট নড়লো,,

—আ…য়
এরপর আর কিছু বের হলো না।

আয়াত কষ্ট লুকিয়ে মুচকি হেসে মাথা নাড়লো,,

— কিছু বলতে হবে না জান। শুধু বিশ্রাম নাও। আমি এক্ষুনি আসছি।

তারপর আদিত্যকে নিয়ে বেরিয়ে গেলো কেবিন থেকে।

ডক্টর হিমেল দত্তের চেম্বারে প্রবেশ করতেই পরিবেশটা থমথমে হয়ে উঠলো।
ডক্টর কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইলেন। তারপর টেবিলের ওপর রাখা সিটি স্ক্যান, ল্যারিংগোস্কোপি আর অন্যান্য রিপোর্ট সামনে এগিয়ে দিলেন।

— বসুন।

আয়াত বসলো না। অস্থির হয়ে দাঁড়িয়েই বললো,,,

— ডক্টর… প্লিজ সরাসরি বলুন। নোরার কন্ডিশন কি? ও কেনো কথা বলতে পারছে না? নোরা ঠিক হয়ে যাবে তো?

ডক্টর গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেললেন,,,

— দেখুন মিঃ আয়াত আমি প্রথম দিনই একটা আশঙ্কার কথা বলেছিলাম।

আয়াতের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। কোনমতে ঢোক গিলে বললো,,,

— রিপোর্টে কি সেটা কনফার্ম হয়েছে?

ডক্টর ধীরে মাথা নাড়লেন।
— সিচুয়েশান দেখে তো সেটাই মনে হচ্ছে।

কেবিনে মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধতা নেমে এলো।
তিনি রিপোর্টের একটি অংশ দেখিয়ে বললেন,,,

— এসিডের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে গলার বাম অংশে। বাহ্যিক ক্ষতের পাশাপাশি ভেতরের টিস্যুও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আয়াত নিঃশ্বাস আটকে শুনছে। আদিত্য আয়াতের কাঁধে ভরসার হাত রাখে।

ডক্টর আবার বললেন,,

— সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো… মিস নোরার ভোকাল কর্ড উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আয়াতের অন্তরটা কেঁপে উঠলো,,,

— মানে…?

— এই মুহূর্তে ও যেভাবে অস্পষ্ট শব্দ করছে, সেটাই স্বাভাবিক। আমরা আশঙ্কা করছি, চিকিৎসা ছাড়া ও আগের মতো স্বাভাবিক কণ্ঠে কথা বলতে পারবে না।

কথাগুলো যেন ছুরি হয়ে বিঁধলো আয়াতের বুকে।
সে ধীরে ধীরে পাশের চেয়ারে বসে পড়লো। আদিত্য দুহাতে জড়িয়ে ধরলো আয়াত কে।

মাথাটা দু’হাতে চেপে ধরলো আয়াত। তার মনে পড়লো,,নোরার সেই প্রাণখোলা হাসি…রাগ করে কথা বলা,আবার কখনও লজ্জায় ফিসফিস করে কথা বলা।
সবকিছু কি তাহলে চিরদিনের জন্য হারিয়ে যাবে?

চোখ বেয়ে নীরবে জল গড়িয়ে পড়লো।
আদিত্য আয়াত কে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ডক্টর হিমেল কে জিজ্ঞেস করলো,,,

— চিকিৎসার কোনো উপায় নেই ডক্টর?

ডক্টর কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন,,,

— অবশ্যই উপায় আছে।

দুজনেই একসঙ্গে তাকালো আগ্রহী দৃষ্টিতে।
ডক্টর দত্ত বললেন,,,

— বাংলাদেশে আমরা যতটুকু পারি করবো। কিন্তু নোরার কেসটা খুব সেনসিটিভ।
তিনি ডেস্কের ড্রয়ার খুলে একটি কার্ড বের করলেন।
কার্ডের ওপর লেখা,,

Professor Dr. Alexander Morgan.Consultant – Reconstructive Laryngeal & Plastic Surgery
Toronto, Canada

ডক্টর কার্ডটা আদিত্যর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। বললেন,,,
—কানাডায় নিউরো সার্জানের হায়ার স্টাডির সময় আমি ওনাকে অ্যাসিস্ট করেছি। আলেকজান্ডার মর্গান বিশ্বের অন্যতম সেরা ল্যারিঞ্জিয়াল রিকনস্ট্রাকশন সার্জন। অনেক অসম্ভব কেসেও উনি সফল হয়েছেন আমরা দেখেছি।

আয়াত সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো। তার চোখে আবার আশার ক্ষীণ আলো জ্বলে উঠেছে।

— তাহলে… আমরা কানাডা যাবো। ডক্টর মর্গান কে দিয়েই নোরার ট্রিটমেন্ট করাবো।

ডক্টর শান্ত স্বরে বললেন,,,

— যত দ্রুত সম্ভব গেলে ভালো। মিস নোরার ভোকাল কর্ডের পাশাপাশি প্লাস্টিক ও রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারিরও প্রয়োজন হতে পারে। তাই সময় নষ্ট করবেন না।

আদিত্য দৃঢ় গলায় বললো,

— আমরা প্রস্তুত ডক্টর। আপনি আজই ডক্টর মরগ্যানের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করুন।

ডক্টর দত্ত বললেন,,,

— আপনারা ভিসা রেডি করুন। মেডিক্যাল ডকুমেন্টস প্রস্তুত রাখুন। আমি ডক্টর মর্গানের সাথে কথা বলে রাখছি‌।

আয়াত ধীরে ধীরে কার্ডটা হাতে নিয়ে তাতে চোখ বুলিয়ে নিলো। মনে মনে শুধু একটাই প্রতিজ্ঞা করলো সে,,,
“আমি তোমাকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনবো, নোরা। তোমার কণ্ঠও ফিরিয়ে আনবো। তোমার হাসিও ফিরিয়ে আনবো। তোমার শরীরের প্রতিটি ক্ষত মুছে দেওয়ার জন্য পৃথিবীর শেষ প্রান্তেও যেতে হলে যাবো।
কিন্তু তোমাকে আর কাঁদতে দেবো না জান।”

এদিকে কেবিনে…
মৌমিতা নোরার চুলে ধীরে ধীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
নোরা বারবার ঠোঁট নাড়ছে।
—মৌ…আমি…কথা…

শব্দগুলো ভাঙা অস্পষ্ট ,প্রায় বোঝাই যায় না।
কিন্তু মৌমিতা যেন প্রতিটা শব্দই শুনতে পাচ্ছে।
সে নরম হেসে বললো,,,

— আমি বুঝতে পারছি তুই কী বলতে চাইছিস।
তুই ভাবছিস, তুই কেন কথা বলতে পারছিস না,তাই তো?

নোরার চোখ ছলছল করে উঠলো। মৌমিতা সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়লো।
— না একদম না। সমস্যাটা সাময়িক। ডাক্তার আছেন।চিকিৎসা আছে। আর সবার ওপরে আল্লাহ আছেন।
দেখিস… আবার আগের মতোই আমাকে বকাবকি করবি। আমার আইসক্রিমও কেড়ে খেয়ে নিবি।
নোরার চোখের কোণে জমে থাকা জল গড়িয়ে পড়লো।
মৌমিতা তার ওড়নার কিনারা দিয়ে তাড়াতাড়ি সেটা মুছে দিলো,,

— কান্না না। তুই কান্না করলে কিন্তু আমিও কাঁদবো।

নোরা খুব কষ্ট করে ঠোঁটের কোণে ছোট্ট একটা হাসি ফুটিয়ে তুললো। মৌমিতাও হেসে ফেললো।
ঠিক তখনই দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলো আয়াত আর আদিত্য।
আয়াতের চোখ লাল বর্ণ ধারণ করেছে। তবুও নোরার সামনে একটুও ভেঙে পড়লো না। সে বিছানার পাশে এসে খুব স্বাভাবিক গলায় বললো,,,

— কী ম্যাডাম? আমাকে ছাড়া কি গল্প হচ্ছে? এতো সুন্দর হাসি হচ্ছে! আমাকেও বলো।

নোরা তাকিয়ে রইলো। আয়াত ঝুঁকে তার কপালে আলতো একটা চুমু দিয়ে বলল,,,

— একটু ধৈর্য ধরো ,আমরা খুব শিগগিরই বাড়ি ফিরবো। তারপর…তোমার সেই সাধারণ সন্ধ্যাটা আবার কাটাবো। এবার আর কেউ আমাদের আনন্দ কেড়ে নিতে পারবে না।
নোরা চোখ বন্ধ করলো।
তার চোখের কোণ বেয়ে নীরবে গড়িয়ে পড়লো দুফোঁটা অশ্রুবিন্দু।
আয়াত সেই অশ্রু খুব যত্ন করে নিজের আঙুলে মুছে দিল।
তারপর মৃদু হেসে বললো,,

— আমার নোরা কাঁদলে একদম সুন্দর লাগে না। তাই হাসো…তোমার হাসিটাই আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ।
************

চলবে…….