#বকুলের_মালা_শুকাবে—২
#শার্লিন_হাসান
বত্রিশ বছরের অভিদ সিদ্দিকী, ষোলো বছরের মেয়েকে বিয়ে করবে শুনে ফাহমিদা সিদ্দিকীর মাথায় হাত। বড় ছেলে আয়ান মা’কে বয়সের ব্যপারটা জানিয়েছে। অভিদ সিদ্দিকী বাসায় এসে সোজা নিজের রুমে চলে গেছে। বিয়ের ব্যপার বা কনের ব্যপার নিয়ে কথা বলতে আগ্রহী না সে। বিয়ে করবে সে, বউ পছন্দ হয়েছে তার তাহলে বাকীসব গসিপ পরে হবে। কিন্তু সমস্যা তো একটাই রাগিনীর বয়সটা। তার কাছে এসব মেটার করেনা। পারিবারিক ভাবে বিয়ে হবে, রেজিস্ট্রার সেটা রাগিনীর পূর্ণ বয়স হলেই। এক গাদা চিন্তা ভাবনা মাথায় নিয়ে ব্যালকনিতে বসে সিগারেট ধরায় অভিদ। সেটায় দু-টান দিতে মনে হলো, মাথাটা হালকা হয়ে গেছে। টেনশন নামক জিনিসটাও উবে গেছে।
রাত ভর কান্নাকাটি করে সকালের দিকে ঘুমিয়েছে রাগিনী। কিন্তু বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারেনি ও। দরজায় ঠকঠক আওয়াজে ঘুমটা ভেঙেই গেলো। আড়মোড়া ভে’ঙে উঠে বসতে মনে হলো গলায় যেন দমটা আটকে আছে। নিজেকে এতোটা ভঙ্গুর লাগছে। মনে হলো, এই বাড়ির কেউই তার আপন না। বাবা, দাদা-দাদী কেউই না। উঠে দরজাটা খুলে দিতে রাগিনীর ছোট ফুফি মাহিন চৌধুরী প্রবেশ করে।
ছোটো ফুফি হোস্টেল থেকে ফিরেছেন সকাল সকাল। তিনি মেডিকেলের স্টুডেন্ট। পড়াশোনায় বেশি ভালো। দাদাভাইয়ের স্বপ্ন ছিলো ফুফিকে ডক্টর বানাবেন। রাগিনীদের ফ্যামিলিতে ডক্টর,ইঞ্জিনিয়ার, টিচার এসব মানুষ দিয়ে ভর্তি। সবার মাঝে ওই একমাত্র ছেলেমানুষদের ইভ’টিজিং করা,যাকে তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়ায় পিএইচডি করা মেয়েমানুষ ছিলো। এমন কেন দিন বাদ যায়নি যে রাগিনীর নামে নালিশ আসেনি। পাড়ায় দস্যু মেয়ে হিসেবে তার বেশ দুর্নাম আছে। কিন্তু চৌধুরী বংশের বলে কেউ তেমন কিছু বলার সাহস পেতো না। এলাকায় তার বাপ-দাদারা বেশ প্রভাবশালী। সেজন্য সেও মুক্ত পাখির মতো উড়ে বেড়াতাম।
ছোট ফুফি মাহিন ডাক দিতে ঘোর থেকে বেরোয় রাগিনী। কেঁদেকেটে চোখমুখ লাল করে বসে আছে মেয়েটা৷ মাহিমা ভাইস্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলেন, “আমার ত বিশ্বাস হচ্ছেনা এতো পিচ্চি মেয়েকে বাবা বিয়ে দিয়ে দিবেন। ভাইয়াও একমত। কিন্তু তুমি কী এমন করেছ যে এরকম সিদ্ধান্ত নিয়েছে?”
রাগিনী অসহায় চোখে চেয়ে জিব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে, “আমি তো গতএকমাসে কারোর সাথেই ঝামেলা করিনি। কিন্তু….
” কী?”
“ওই পরীক্ষা দিয়ে আসার সময়।”
“কী?”
“একজনের সাথে বিরাট ঝামেলা হয়েছিল।”
“কী ঝামেলা?”
“অল্পের জন্য আমার নামে মামলা দেয়নি।”
“সে লোকটা কে?”
“চিনিনা আমি।”
মাহিন ভ্রু জোড়া সংকুচিত করে ফেলে। মেয়ের কথার ধরণ ভালো ঠেকছেনা তার কাছে। সেজন্য আর কিছু বললোনা। এমনিতে হুট করে বিয়েটা হচ্ছে সেজন্য বিধ্বস্ত দেখাচ্ছে তাকে। মাহিন কথা না বাড়িয়ে রুম ত্যাগ করার সময় রাগিনী চিৎকার করে বলে, “তুমি তো এখনো বিয়ে করোনি। তাহলে আমি কেন বিয়ে করব? তাও ষোল বছরে? ওনারা সবাই কী পাগল? আমি এই বিয়ে করব না।”
“গতকাল রাতে নাকী মত দিয়েছ শুনলাম। এখন এটা বলছ কেন?”
রাগিনী চুপসে যায়। মাহিন রুম ত্যাগ করতে রাগিনী নিজের ফোনটা নিয়ে সেটা ওপেন করে। বয়স্ক লোকটার পাঠানো ছবিগুলোর দিকে আরেকবার তাকায়। মূহুর্তে চোখ ভেসে উঠে তার। এইসব এডিট করা ছবি দেখিয়ে তাকে বিয়ে করার জন্য ফোর্স করছে লোকটা। সে বাকী আবার পড়াশোনা করা ভদ্রলোক। ভাবতে রাগিনীর ঘৃণায় মনটা ভরে যায়। কথার এতো বিশ্রী অবস্থা! কীভাবে তার মেজারমেন্ট জিজ্ঞেস করলো। একটুও মুখে বাঁধেনি।
রাগিনীর আম্মু, বড়আম্মু সবাই রান্নাবান্না করছে সকাল থেকে। দাদী শান্তিসুধা চৌধুরী বসে আছেন সোফায়। মাহিন গিয়ে পাশে বসতে মেয়ের চোখমুখ দেখে তিনি জিজ্ঞেস করেন, “রাগিনী আবার তোমার সাথে কিছু করেছে নাকী?”
“কী আর বলবে! যতটুকু বলেছে, বুঝতে বাকি নেই বেয়াদব মেয়েমানুষ। আমি বুঝিনা ওকে কী ছোট বেলা থেকে কেউ শাসন দেয়নি? মেয়েমানুষ এতো উশৃংখল, উগ্র হয় কীভাবে?”
“সেজন্যই বিয়ে দিয়ে দিচ্ছি। ওকে কেউই কন্ট্রোল করতে পারবেনা আদর আর মায়ার জন্য।”
“ছেলে কে?”
“তোমার দাদার আত্মীয় লাগে। হুটহাট প্রস্তাব দিয়েছেন আর বিয়েটা তাড়াতাড়ি সারতে চান ওনারা। সেজন্য আর না করেনি কেউ। ছেলেও লাখে একজন।”
“ভালো হলেই ভালো। তবুও একে মানুষ করুক।”
ওরনায় মুখ মুছতে মুছতে লিভিং রুমে আসেন রাগিনীর আম্মু কুসুম কলি। মেয়ের উগ্রতা আর উশৃংখলতার জন্য কতরকম কথা শুনতে হয়েছে। কম মার খায়নি তার হাতে কিন্তু সোজা হলোনা।
মাহিনের দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন, “আমি জানিনা এই মেয়ে কার মতো হয়েছে।”
“যখন যেটা চায় সেটা তো হাজির করা হয় সেজন্য এমন। একটু অভাব বুঝাতেন, রাগচাপে রাখতেন তাহলে ভালো হতো। হয়েছে তো মায়ের মতোই। মাথার তার চারটা ছিঁড়া। মানসিক রোগী ছিলো পুরাই। ওটাই পেয়েছে মেয়ে।”
তাঁদের আলোচনায় ভাঁটা পড়ে যখন অতিথি দু’জন ব্যাগ নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে। মূহুর্তে অতিথি অ্যাপায়নে মরিয়া হয়ে উঠেন চৌধুরী পরিবার। রাগিনীর বিয়ের শপিংগুলো সব পাঠানো হয়েছে। মাহিন সেগুলো নিয়ে রাগিনীর রুমে প্রবেশ করে। রাগিনী তখন কলে কথা বলছিলো। মাহিনকে দেখে কল রেখে দেয়। তিনটা ট্রলি রাগিনীর রুমে রেখে মাহিন বলে, “চেক করে দেখতে পারো।”
“তুমি এখন আসতে পারো।”
মুখের উপর কড়া জবাব দেয় রাগিনী। মাহিন আর কিছু বলেনি। এই মেয়ের কথাবার্তা এমনই। হুটহাট মুখের উপর একটা বলে দিবে। সেই আগে থেকে। একরোখা জেদি মেয়ে। খুব সম্ভবত মাথায় একটু প্রব্লেম আছে ছোট থেকে। মাহিন যেতে রাগিনী রাগে ক্ষোভে বিয়ের ট্রলিতে দু চারটা লা থি দেয়। তাতেও জেনো ক্ষোভ কমেনি তার। কিন্তু বিয়েটা করে চৌধুরী বাড়ির চার দেওয়াল পেরুতে পারলে সে আর কখনো এ বাড়ি আসবেনা। কখনো না। ঘৃণায় বুকটা ভার হয়ে আছে। এতো অভিযোগ জমেছে কেন? না চাইতেও চোখে পানি চলে আসে। সেজন্য বোধহয় বলে, ‘দাপট আর বেয়াদ বি সবার সাথে সব জায়গায় খাটে না।’
বিয়েটা ঘরোয়া ভাবে অনুষ্ঠিত হবে সেজন্য সিদ্দিক পরিবারের সকলেই উপস্থিত হবেন চৌধুরী বাড়িতে। সেজন্য জোর প্রস্তুতি চলছে। অভিদ সিদ্দিকী সাদা রঙের একটা পাঞ্জাবি এবং রাগিনীর শাড়ির সাথে ম্যাচ করা কটি গায়ে চড়িয়ে বেরিয়েছে বাসা থেকে। তার একবোন এসেছে শুধু। আরেকজনের এক্সাম চলে সেজন্য সে হোস্টেলেই।
ঠিক দেড়টায় চৌধুরী ভিলায় অভিদ সিদ্দিকীর বিয়ের গাড়ি এসে থামে। খুব সাদামাটা ভাবে বিয়েটা হচ্ছে সেজন্য বিয়ের বাড়ির তেমন আমেজ নেই বললেই চলে। অভিদ সিদ্দিকীকে ফুল দিয়ে ওয়েলকাম করা হয়। চৌধুরী পরিবারের সকলের মুখে হাসি লেপ্টে আছে।
খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হতে হুজুর বিয়ে পড়ানোর জন্য প্রথমে অভিদের কাছে বসেন।
মাহিন এবং শান্তিসুধা রাগিনীর রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করতে রুমটা অন্ধকার দেখে। মূহুর্তে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠে শান্তিসুধার। আবার কোন অঘটন ঘটেনি তো? এই দস্যু মেয়ে আবারো তাদের মানসন্মান নিয়ে টান দিচ্ছে না তো?
মাহিন চৌধুরী রুমটা তন্নতন্ন করে খুঁজেও রাগিনীর অস্তিত্ব মিলাতে পারেনি। দু’জনে মাথায় হাত দিয়ে ব্যপারটা রফিকুল ইসলাম চৌধুরীর কানে তুলতে উনি ঠান্ডা মাথায় গিয়ে অভিদের কাছে বসেন। বাড়ির মহিলা সদস্যদের মাথায় তখন হাত। অভিদ সিদ্দিকী সবার চোখমুখ পরখ করে কিছু একটা আঁচ করতে পেরেছে। অর্ধবিবাহিত অভিদ সিদ্দিকী ফিক সাহেবের চোখমুখের দিকে একনজর তাকিয়ে বলে “বাকী অর্ধেক বিয়ে আমার বাসায় হবে। সন্ধ্যায় চলে আসবেন দাদাশ্বশুর।”
“কিন্তু তুমি আর রাগিনী দুজন তো বলেছ এই বিয়েতে সম্মতি আছে তাহলে ও পালালো কেন?”
রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে আসে অভিদ সিদ্দিকীর। বিয়ের দিন রীতিমতো তাকে হেনস্তা এবং অপমান করেছে হাঁটুর বয়সী মেয়েটা। সে তার জীবনে এতোটা উগ্র,বেয়াদব মেয়ে দেখেনি। রাসেল চৌধুরী কিছু কিছু জায়গায় কল দিয়ে মেয়ের খোঁজ লাগিয়ে দিয়েছেন। এই মূহুর্তে রাগ দেখানোটা বোকামির পর্যায়ে পড়ে। মেয়েকে ঠিক মতো মানুষ করাতে পারেননি তিনি।
একাই গাড়ি নিয়ে শ্বশুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেছে অভিদ। ডান হাতে স্টিয়ারিং কন্ট্রোল করছে বা হাতের কল, মেসেজ দিচ্ছে একের পর এক। মোড় ঘুরে মধ্যবাজারে এসে থামে অভিদ। দোকান থেকে একটা ঠান্ডা পানির বোতল ক্রয় করে ঠান্ডা মাথায় সেটা পান করে নেয়। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভাবে। ঠিক কোথায় যেতে পারে রাগিনী। সে কী বিয়ের সাজে বেরিয়েছে?
চৌধুরী বাড়িতে বসেই ফাহমিদা সিদ্দিকী চোখ কপালে তোলার মতো করে বলেন, “এতো বেয়াদব মেয়ে জীবনেও দেখিনি। তা মানুষ করেননি একে? মেয়েমানুষ হয় কোমল হালকা আঁচে মিইয়ে যাবে কিন্তু আপনাদের মেয়ে তো দেখি গরম লোহা। একটু বারি মারলেই শক্ত।”
কুসুমকলি মুখে সৌজন্যর হাসি ফুটিয়ে বলেন, “আপনাদের ছেলেই আমাদের বেয়াদব মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। নাহলে আমাদের এতো তাড়া ছিলোনা।”
“আমার ছেলে কী বিয়ে করবে! আপনারাই ওর প্রফেশন দেখে ষোলো বছরের মেয়েকে বিয়ে দিচ্ছেন।”
“আপনার মনে হয়না বাড়াবাড়ি পর্যায়ে এগুচ্ছে কথা গুলো?”
কুসুমকলির কথায় ফাহমিদা নাকমুখ কুঁচকে বলে, “আপনার মেয়েকে তো মানুষ করতে পারেননি সেটা স্বীকার করুন।”
“স্বীকার করতে অসুবিধা নেই আমাদের।”
“আমার ছেলের জীবন নষ্ট। এই বিয়ে মানিনা আমি।”
ফাহমিদার কথায় আয়ান সবার দিকে তাকিয়ে বলে, “আপনারা কিছু মনে করবেন না। আম্মার মাথা গরম হয়ে গেছে। ঠান্ডা হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“তুমি চুপ থাকো আয়ান। এই বিয়ে মানি না আমি।”
“আমরাও মানিনা এই বিয়ে।”
দুই বেয়াইনের ঝগড়া লাগা দেখে বাকীরা থামাতে ব্যস্ত হয়ে যায়। ফাহমিদা ছেলেকে কল দিতে ব্যস্ত পান। বার কয়েক ট্রাই করে ব্যর্থ হোন তিনি। আয়ানকে নিয়েই বাসার উদ্দেশ্য রওনা হোন। তারা যেতে চৌধুরী পরিবারে আবারো ঝগড়ার সৃষ্টি হয়।
আধঘন্টার ব্যবধানে খবর আসে রাগিনী কোথায় অবস্থান করছে। অভিদ সিদ্দিকীর ঠোঁটের কোণে আলতো হাসির রেখা স্পর্শ করতে সে গাড়িতে বসে যায়।
রেইল স্টেশনে দাঁড়িয়ে একের পর এক কল করে যাচ্ছে রাগিনী। কিন্তু হুট করে ওপাশের কলটা সুইচড অফ বলছে। চিন্তায় মাথা খেলছে না ওর। বাসা থেকে পালিয়েছে কী আবারো বুড়োকে বিয়ে করার জন্য? মোটেও না! একদমই না। আজকে যেভাবে হোক সে কুমিল্লা ছেড়ে ঢাকা যাবে। কিন্তু তার নির্দিষ্ট মানুষটাই তো আসছেনা। তার ফোন অফ। কোনরকম খোঁজখবর মিলাতে পারছেনা ও। চিন্তিত মুখ নিয়ে রেলস্টেশনের বেঞ্চে ধপ করে বসে পড়ে। মনে হচ্ছে অভিদ সিদ্দিকীর হাতে আবারো ধরা পরবে ও। এবার পড়লে বাঁচার চান্স নেই। রাগিনী মরে গেলেও অভিদকে বিয়ে করবেনা। কোনভাবেই না। ওর সাথে যায় নাকী ওই বুড়োলোকটা! রাগিনীর ভাবনার মাঝেই আননোন নাম্বারে কল আসে। মূহুর্তে যেনো মনের অন্ধকার কেটে যায়।
#চলবে

