#বকুলের_মালা_শুকাবে—৩ (এইজ ডিফারেন্ট)
#শার্লিন_হাসান
“এই বুড়ো, তোর সাহস কী করে হয় আমাকে কল দেওয়ার। তোকে পেলে আমি খু ন করে জেলের ভাত খাব।”
কথাটা বলে কয়টা বিশ্রী গালি দেয় রাগিনী। বিশেষত চট্টগ্রামের বিখ্যাত সেই গালিটাই দিয়ে বসে অভিদ সিদ্দিকীকে। কলের ওপাশ থেকে একটাও টু শব্দ করেনি অভিদ। রাগিনী নিজের মতো করে বকেই যাচ্ছে তাকে। যা নয় তাই বলছে। অনেকক্ষণ গালিগালাজ করে রাগিনী হাফিয়ে উঠে কলটা কেটে দেয়। সোজা হয়ে দাড়াতে ভরকে যায় ও। হাঁটায় কেমন একটা গুমোট রাগ পরিলক্ষিত। চোখমুখের চাহনি ভয়ংকর রুপ নিয়েছে। গোটা স্টেশনে ভর দুপুরে খুব একটা ভীড় না থাকলেও মোটামুটি টাইপের ভীড় ছিলো। অভিদ এগিয়ে এসে পরপর তিনটা চ’ড় মারে রাগিনীর গালে। পুরুষালী হাতের চ’ড় খেয়ে রাগিনী আর হুঁশে নেই। চোখ দু’টো নিমিষে বন্ধ হয়ে আসে। মাথা চক্রাকারে ঘুরছে যেনো গোটা স্টেশন তার মাথার উপর ভেঙে পড়বে। ঠাস করে নিচে পড়ে যেতে নিলে অভিদ সিদ্দিকী পুরুষালি বাহু তে আগলে নেয় তাকে। পরক্ষণে কাঁধে তুলে গাড়ির দিকে চলে আসে। ঠাস করে রাগিনীকে সীটে ছুঁড়ে মারে ও। গাড়ির দরজাটা খুবই জোরে বন্ধ করে জোরে জোরে শ্বাস টানে অভিদ। পানির বোতল নিয়ে কয়েক ঢোক পানি পান করে আবারো গাড়িতে বসে যায় ও।
চোয়াল ফুটিয়ে উঠা রাগটা তরতর করে বেড়েই চলছে। শান্ত মানুষের রাগ ভয়ংকর হয়ে থাকে। প্রচুর ভয়ংকর। অভিদ নিজের রাগের একাংশও রাগিনীকে দেখায়নি। গাড়ি চলছে সিদ্দিকী বাড়ির উদ্দেশ্যে। এর মাঝে রফিকুল ইসলাম চৌধুরী কল করেন নাতনির খোঁজে। অভিদ কল রিসিভ করে বলে, “দাদাভাই চিন্তা করবেন না। রাগিনী আমার কাছে আছে।”
“কোথায় পেলে তাকে?”
“সেসব নাহয় পরে বলি। বাকী অর্ধেক বিয়ে দেখতে চাইলে আমার বাড়িতে চলে আসতে পারেন। এখন রাখছি আমি।”
কথাটা বলে কল কেটে দেয় ও। রাগিনীর দিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে চাহনি বদলে ফেলে। এরকম বেয়ারা বেয়া দব মেয়েদের মাথায় তুলে আছা র মারা উচিত। অভিদ সিদ্দিকী নিজেও বুঝতে পারছেনা, দুনিয়ায় ভালো মেয়ে থাকতে ক্যান সে এই বেয়া দব মেয়েটাকে বিয়ে করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। কেন? কী এমন পেয়েছে ও মেয়েটার মাঝে?
★★★
ফাহমিদা সিদ্দিকী এখনো বিলাপ করে যাচ্ছেন। আয়ান মায়ের বিলাপে বিরক্ত হলেও আর কিছু বলতে যায়না। অভিদ এসে বাকিটা বুঝে নিবে। তার কথায় থামবে না উনি। অভিদ একটু কড়াগলায় বললে সব ঠান্ডা হয়ে যাবে। অভিদের বোন, আদিবা সিদ্দিকী কিছুক্ষণ পরপর বিরক্ত হয়ে মাকে বলছে, “এবার থামবে তুমি? বিরক্ত হয়ে গেছি আমি। সেই কখন থেকে কেঁদেই চলেছ।”
“এই বিয়ে মানি না আমি। ওরকম বেয়া দব মেয়ে হবে আমার বাড়ির বউ? আয়ান বাবা তোকে মা ভালো মেয়ে দেখে বিয়ে করাব।”
“ঠিক আছে আম্মা।”
আয়ানের কথায় ফাহমিদার কলিজা একটু হলেও ঠান্ডা হয়েছে। আদিবা ভাইয়ের ফোনে কল দেয়। রিসিভ হতে একটু বিরক্তি নিয়ে বলে, “কই তুমি? এই মেয়ের পেছনে পড়ে থেকে এতো নাটক করার মানে হয়? দুনিয়ায় কী মেয়ের অভাব পড়েছে?”
“কাজের কথা থাকলে বলতে পারো। আমার পার্সোনাল ব্যপারে কিছু বলার অধিকার আমি কাউকে দেইনি।”
ভাইয়ের কড়া কথায় আদিবা আর কথা বাড়াতে পারলো না। আমতা-আমতা করে বলে, “আম্মু বিলাপ করছে তোমার শ্বশুর বাড়ি থেকে আসার পরপরই। ওখানেও মেয়ের মায়ের সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে। কেউই এই বিয়ে মানে না।”
“হুম।”
আদিবার রাগ হলো। বিরক্তিতে নাক-মুখ কুঁচকে নিয়ে ঠাস করে কলটা কেটে দেয়। মায়ের রাগটা সে একটু হলেও রিলেট করতে পারছে। ওই বেয়া দব মেয়ের জন্যই এতোকিছু হচ্ছে।
মাগরিবের আযানের পরপরই অভিদ সিদ্দিকী বাড়ি ফিরেছে হবু বউকে নিয়ে। চৌধুরী পরিবার থেকে শুধু মেয়ের বাবা আর দাদা এসেছে। রাগিনী সোফায় বসে আছে রক্তচক্ষু করে। সেখানে উপস্থিত আছে বাকীরাও। পাশে অভিদ সিদ্দিকী বসা। তার পাশাপাশি বসতেও ঘেন্না লাগছে রাগিনীর। হুজুর পুনরায় বিয়ে পড়ানো শুরু করে দেন। রাগিনীকে কবুল বলার জন্য বলা হলে সে চুপ করে থাকে অনেকক্ষণ। তিনটা চ ড় খেয়ে মাথা ঠিক নেই ওর। তারউপর একপ্রকার জোর জাবরদস্তি করে জাগানো হয়েছে তাকে। মাথাটা এখনো জিমিয়ে আছে। শুধুমাত্র তাকে রাগে রাখার জন্য পুরো জীবনটা ধ্বংস করে দিচ্ছে এরা। যে মেয়েটা আজীবন নিজ মর্জিতে চলে এসেছে সে মেয়েটাকে পরের কথায় উঠতে বসতে হবে। ভাবতেই গা জ্বলে যায়। প্রচন্ড রাগ ক্ষোভ পুষে রেখেছে রাগিনী। তারমধ্যে অন্যতম সে আর কখনো চৌধুরী বাড়িতে পা মাড়াবে না।
হুজুর যখন পুনরায় বললো, “বলো মা কবুল?”
রাগিনী নাকমুখ শক্ত করে বিরক্তি নিয়ে বলে, “হ্যাঁ,হ্যাঁ বলছি তো কবুল।”
“আরো দু’বার বলতে হবে কবুল।”
“দুবার কবুল।”
তার ত্যাড়া কথায় অভিদ সিদ্দিকী চোখ রাঙিয়ে তাকাতে রাগিনী মুখ ফিরিয়ে বলে, ‘বুড়ো লোককে কবুল, কবুল।”
রাসেল চৌধুরী ধমকে বলেন, “মুখ সামলে ভদ্র ভাবে কথা বলবে বেয়া দব মেয়ে।”
“আমি আপনার মেয়ে নই। অযথা অধিকার দেখিয়ে শাসন করতে আসবেন না।”
অভিদ সিদ্দিকী সাইন করে পেপারটা রাগিনীর দিকে এগিয়ে দেয়। রাগিনী সেটায় সাইন করে ঝাপসা চোখে। মূহুর্তে আবারো সেন্স লেস হয়ে পড়ে যায় ও। অভিদ সিদ্দিকীর কাঁধের উপর মাথা ভর দিয়ে অজ্ঞান হয়ে আছে রাগিনী। ফাহমিদা সিদ্দিকী দাঁড়িয়ে আছেন নির্বাক দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। বাকীদের মুখে টু শব্দটুকুও নেই।
চৌধুরীদের জন্য রাতের খাবার তৈরি করা হয়। ফাহমিদা সিদ্দিকী সেসবের ধারে কাছেও যাননি। হ্যাল্পিং হ্যান্ড এবং আদিবা সহ সব রান্নাবান্না করেছে। অভিদ রাগিনীকে নিয়ে তার রুমের দিকে হাঁটা ধরে। আয়ান ভাইয়ের যাওয়া দেখে বলে, “ভাবীর জ্ঞান ফিরলে বাসর ঘরে নিও।”
“অজ্ঞান আছে শান্তিতে আছি। জ্ঞান ফিরলে তুলকালাম বাঁধাবে।”
আয়ান গলা খাঁকারি দিয়ে সরে পরে বড় ভাই-ভাবীর থেকে। অভিদ রাগিনীকে বেডে সুন্দর মতো শুইয়ে রেখে বাইরে চলে আসে। রফিকুল ইসলাম চৌধুরী এবং রাসেল চৌধুরীর সাথে খোশগল্প করতে করতে রাতের খাবারটা শেষ করে সে। ওনাদের বিদায় জানানো হতে অভিদ সিদ্দিকী মেইন ডোর লক করতে ফাহমিদা সিদ্দিকীর বিলাপ শুরু হয়ে যায়। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলেন, “এই মেয়ে কী জাতের? তুমি কী দেখে বিয়েটা করলা? না তোমায় শান্তি দিবে না আমাদের।”
“আপনাদের সাথে ঝামেলা করবেনা আম্মা। বাকীসব আমি বুঝে নেব।”
“এই বিয়ে মানিনা আমি।”
“তাহলে আমার কিছু করার নেই। আমার বউ মানতে আমার আপত্তি নেই।”
কথাটা বলে সে রুমে চলে আসে। ফাহমিদা সিদ্দিকী ছেলের যাওয়ার দিকে একনজর তাকিয়ে রুমে চলে যান। গিয়ে নিজের বোনকে কল দিয়ে বিলাপ আরম্ভ করে দেন।
★★★
“এ্যাই মেয়ে উঠো বলছি। চোখ খুলে তাকাও, বাসর ঘরে বসে তোমার নাটক দেখার ইচ্ছে নেই আমার।”
রাগিনীর সায় শব্দ নেই। অভিদ সিদ্দিকী নাকমুখ কুঁচকে রাগিনীর সামনে বসে। ওর দুগালে আলতো স্পর্শ দিয়ে জাগানোর চেষ্টা করে। কাজ না হতে,গ্লাস থেকে পানি নিয়ে ছিটা দেয়। বেশ কিছুক্ষণ চেষ্টা করে রাগিনী পিটপিট চোখ মেলে তাকাতে অভিদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। রাগিনী চোখ মেলে বার কয়েক চোখের পলক ফেলে আবারো ঘুমিয়ে যায়। অভিদ সিদ্দিকী নাকমুখ কুঁচকে নিয়ে বলে, “এই মেয়ে উঠো বলছি। অনেক ঘুমিয়েছো।”
রাগিনী বিরক্তিতে নাকমুখ কুঁচকে ফেলে। চোখ মেলে উঠে বসতে গেলে অভিদ হাত বাড়াতে ও সেই হাত ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। মূহুর্তে বমি করে ভরিয়ে দেয় বিছানা মেঝে। অভিদ সিদ্দিকী নাকমুখ কুঁচকে জোরে ধমক দিয়ে বলে, “সেন্স নেই তোমার?”
রাগিনী রেগে বলে, “তোর আছে সেন্স? আগে নিজেরটা দেখ অ সভ্য।”
“এই মেয়ে মুখ সামলে।”
“তোরটা সামলে রাখ গোলামেরপুত। আমারটা ঠিকই আছে।”
“আজকে প্রচুর গাল দিয়েছ আমায়। চ ড় খেয়ে শিক্ষা হয়নি?”
রাগিনী জবাব দিলোনা। অভিদকে ডিঙিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। আশেপাশে তাকিয়ে ওয়াশরুমের খুঁজ করতে অভিদ আঙুল দিয়ে ইশারা করলে রাগিনী রাগে গিজগিজ করতে করতে চলে যায়। অভিদ চাদর তুলে নোংরা মেঝে মুছে সেটা এক সাইডে রেখে দেয়। দরজা খুলে রাগিনীর জন্য খাবার নিয়ে আসে।
মাথায় পানি ঢেলে ফ্রেশ হয়ে রুমে আসে রাগিনী। অভিদ খাবারের প্লেট রেখে বেড শিট নামায়। রাগিনী বিরক্ত হয়ে গলায় থাকা গহনাটা খুলে মেঝেতে ছুঁড়ে মারে। অভিদ তার দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলে, “এগুলো কেমন কাজ? ভালো না লাগলে এক জায়গায় রাখো, অযথা গহনা ছুড়ছ কেন?”
“আপনার উপদেশ আমি কেন শুনব?”
অভিদ জবাব দিলোনা। রাগ টুকু নিজের মাঝে দমিয়ে নিয়ে বেড শিট বিছিয়ে নেয়। হাত পা ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে। রাগিনীর দিকে একনজর তাকিয়ে বলে, “চেঞ্জ করে খাবার খেয়ে শুয়ে পড়ো। অ্যাম টায়ার্ড তাই আজকে তোমার সাইজ জানা হবেনা।”
রাগিনী হাতের কাছে থাকা লোশনের বোতলটা অভিদের মুখ বরাবর ছুঁড়ে মেরে চিৎকার করে বলে,”বুড়ো তোর সংসার আমি করব না। অসভ্য কোথাকার।”
#চলবে

