#বকুলের_মালা_শুকাবে—৫
#শার্লিন_হাসান
অসাবধানতায় হাতটাই কে টে ফেলে রাগিনী। মূহুর্তে রক্তে ভেসে যায়। আফিয়া সিদ্দিকী মুখ বাঁকিয়ে কানাঘুষা করে বলেন, “বেয়াদবি র ফল।”
রাগিনী বিরক্ত হয়। এ দফায় সে কথা বাড়ালো না। মাছ রেখে চুপচাপ ওঠে ব্যাচিংয়ের কাছে চলে যায়। হাত থেকে গলগল করে র ক্ত ঝড়ছে যা পানির সাথে মিশে হালকা লাল রঙ তৈরি করছে। অভিদ হা হয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়ের এতো জেদ! হাত কে টে গেছে তাও জেদের ঠেলায় কিছুই প্রকাশ করছেনা। র ক্ত ঝরা হাত নিয়ে রাগিনী রুমে আসার পেছন দিয়ে অভিদ আসে। আমতাআমতা করে বলে, “তোমার হাত থেকে র ক্ত ঝরছে। বোসো, আমি ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছি।”
“তার আর প্রয়োজন নেই।”
“শান্ত হও।”
কথাটা বলে রাগিনীর র ক্ত ঝরা হাতে অভিদ ঔষধ লাগিয়ে দিচ্ছে যত্ন সহকারে। এই নিয়ে রাগিনী আর একটাও টু শব্দ করেনি। ডান হাতের বৃদ্ধাঙুলের নিচের অংশ সহ হাতের তালু কে টে ফাঁ ক হয়ে আছে। অভিদ সেদিকে তাকায় আফসোস ভরা দৃষ্টিতে। কী থেকে কী হয়ে গেলো। বলতে বলতে এতোটা কেটে গেলো? রাগিনী নিজের ব্যান্ডেজ করা হাতটা সরিয়ে নেয় অভিদের হাতের মুঠো থেকে। উঠে ব্যালকনিতের দিকে যেতে যেতে জিজ্ঞেস করে, “বিয়ে নিয়ে রঙ তামাশা কবে শেষ হবে?”
“যতদিন পর্যন্ত তুমি বিয়েটা মানছ না ততদিন পর্যন্ত রঙ তামাশা চলতেই থাকবে।”
“আপনি এক কাজ করুন, আমাকে স্ব সন্মানে ছেড়ে দিয়ে নিজের বয়সী বুড়ী কাউকে বিয়ে করে নিন।মানাবে বেশ।”
“আই লাইক বেবিগার্ল। এছাড়া তোমার সবকিছুই ঠিক আছে। আমাকে সামলাতে পারবে। উপর…
ইনিয়েবিনিয়ে কথাটা বলে রাগিনীর দিকে বা’জে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে অভিদ। রাগিনী রাগে গিজগিজ করতে করতে বলে, ” তোকে আমি খু ন করব বুড়োলোক।”
“একদিন আসো, তখন দেখাই দিবনে আমি বুড়ো নাকি ইয়ং। বাই দ্যা ওয়ে তোমার ম্যাজার্মেন্ট বললে না তো।”
“তোকে আমি খু ন করে বিধ বা হবো মনে রাখিস।”
“আরেহ বলো, এতো লজ্জা পাওয়ার কী আছে।”
“লাজ লজ্জা কী বেঁচে দিয়েছেন? অস ভ্য লোক।”
“বউয়ের ম্যাজার্মেন্ট জানা যায়,এটা অসভ্যতামীর কিছুনা।”
রাগিনী এ দফায় অভিদের ডোন্ট কেয়ার ভাব নিয়ে তাকানোতে বিরক্ত হয়। কল দিয়েছেন শান্তিসুধা। অভিদ তার সাথে আলাপ জমিয়েছে বেশ ভালো। রাগিনীর আগের রাগটা এখনো চলমান।ও
তেড়েফুঁড়ে এসে অভিদের দিকে আসে। অভিদ ওর দিকে একনজর তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে ফেলে। নিজের শার্টের কলার ঠিক করে রাগিনীকে উপরনিচ ভালো ভাবে পরখ করে নেয়। রাগিনী রাগে লাল হয়ে আছে। মনে হচ্ছে, বোম ব্লাস্ট হবে একটু পরইই। কাকে জেনো খু ন টুন করে ও এ বাড়ি ছেড়ে পালায়। রাগ যখন সুউচ্চ পাহাড় সম তখন অভিদ ওর দিকে ফোন বাড়িয়ে দিলে রাগিনী দাতে দাঁত চেপে বলে, “আমার প্রেমিক কল দেয়নি যে কথা বলব। আর আমার কোন পরিবার নেই যে কল আসতে পারে। বুঝেছেন আপনি?”
শেষের কথাগুলো ধমকে বলে ও। অভিদ সিদ্দিকী কিছুক্ষণ নীরবতা পালন করে বলে, “কথা বলো।”
“পারব না।”
“আমি কথা বলতে বলেছি।”
“বলব না কী করবেন শুনি? মে রে ফেলবেন? ত মা রুন না। আমি ম রেই যেতে চাই।”
অভিদ রাগে গিজগিজ করতে করতে কলটা কেটে ফোনটা বিছানার উপর ছুঁড়ে ফেলে তর্জনী উঁচু করে বলে, “বেয়াদবির সীমা লঙ্ঘন করবে না তুমি।”
“আমার থেকে দূরে থাকুন।”
“আমি আমার জীবনে এতোটা বেয়া দব এতোটা বেয়া দ ব কখনো দেখিনি রাগিনী। খোদা তোমাকে মাটি দিয়ে তৈরি করেছে নাকী সাক্ষাৎ আগুন দিয়ে? এতো তেজ কেন তোমার?”
রাগিনীর জবাব দেওয়ার ইচ্ছে হলোনা। তবুও গা ছাড়া ভাব নিয়ে জবাব দেয়, “আপনার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার মুড নেই আপাতত। অন্য সময় জিজ্ঞেস করিয়েন।”
অভিদ রাগে গিজগিজ করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। রাগিনী রাগে গিজগিজ করতে করতে সামনে থাকা গ্লাসটা হাতে তুলে ফ্লোরে আছা ড় মা রে। তবুও রাগ দমাতে পারছেনা ও। জীবনটা আর ভালো লাগেনা। লাগছেনা। কী যেনো নেই! কিছু একটা নেই। কেউ একটা নেই। সে নেই জিনিসটা কী? মনের সুখ বোধহয়। অভিদকে দেখলে তার ঘেন্না লাগে প্রচন্ড। কেন সেটা জানেনা। তবুও ঘেন্নায় মন ভরে আছে। হয়ত অভিদকে সে পছন্দ করেনা সেজন্য তার কথাবার্তা, গা ঘেঁষা সবটাই বিরক্ত লাগে ওর।
★★★
দুপুরের খাবার খেতে বসেছে রাগিনী। উপস্থিত আছে শাশুড়ী মহলের সবাই। রাগিনী কোন কথা না বলে, চামচ দিয়ে পোলাও আর মাংশ ছিঁ ড়ে খাচ্ছে। পাশের চেয়ারে অভিদ নিজের মতো করে খাচ্ছে। রাগিনীর দিকে একবারও তাকায়নি ও। ওদের এই দূরত্বটা প্রায় সবারই চোখে পড়ছে। আফিয়া সিদ্দিকী ভাবী ফাহমিদার কানে কথা তুলেন, “কী মেয়ে বিয়ে করলো? কেউই কাউকে পছন্দ করেনা। এটা তো সিনেমা না যে এভাবে কাটবে। এটা বাস্তবতা। ঘর সংসার করতে হবে তো নাকী? আর এলাকায় এসব খবর লিক হলে মান সন্মান কিছু কী থাকবে?”
“জানি না আমি। আমাকে এসব বইলেন না তো আপা। যার বউ সে বুঝবে। মান সন্মানের ভয় তার নাই, তাহলে আমরা একা কেন ভয় করব? দুনিয়ায় তো মেয়ের অকাল পড়সে যে জেনেশুনে এরকম বেয়া দব ঘরে তুলতে হবে।”
রাগিনী নাকমুখ কুঁচকে বলে, “বদনাম করলে একটু দূরে গিয়ে রেখেঢেকে বদনাম করিয়েন। এগুলো বদনামের পর্যায়ে পড়ে নাকী? আমার বদনাম আমিই শুনতে পাচ্ছি।”
রাগিনীর কথায় অভিদ চোখ রাঙানি দিয়ে বলে, “চুপচাপ খাবার খাও। বাড়াবাড়ি করলে খবর আছে।”
রাগিনী নিজের রাগকে দমিয়ে রাখে। দুই লোকমা খেয়ে সবার সামনেই খাবার প্লেটে পানি ঢেলে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে উঠে চলে যায় সেখান থেকে। সে সুযোগে আফিয়া সিদ্দিকী নাকমুখ কুঁচকে বলেন, “একে তো বেয়া দব তারউপর অল ক্ষুণে। অভিদ তুমি ওকে নিয়ে বাকী জীবন কাটাবে কীভাবে? আমাদের ফ্যামিলি রুলসের ছিটেফোঁটাও ওর মাঝে নেই। এই ফ্যামিলিতে এরকম বেয়াদ বি কেউ কোনদিন করেনি। ওর এতো সাহস কী করে হয়?”
“ওকে কিছু বলবে না আপা। ও নিজেই জেনেশুনে এরকম বেয়া দব বিয়ে করেছে। আমার ছেলের মতো ভদ্রসভ্য ছেলেমানুষ এই মহল্লায় আছে নাকী? আর ও কীনা বিয়ে করেছে সেরা বেয়াদ ব মেয়ে।”
রাগিনী চোখমুখ কুঁচকে রুমের দরজার লক করার সময় বিড়বিড় করে বলে, “হ্যাঁ,এতোই ভদ্রসভ্য ছেলেমানুষ তার, যে মেয়ে দেখতে গিয়ে তার সাইজ জানতে চায়। এদেরকে খাঁটি ভাষায় বলো অস ভ্য।”
অভিদের খালামনি ফাহিমা বোনের দুঃখ কষ্টে জর্জরিত হয়ে উঠেন। তাকে স্বান্তনা দিতে গিয়ে বলেন, “আমার বোনের আর সুখের ভাত খাওয়া হবেনা। যেই বউ, ও ম রে গেলেও ফিরেও তাকাবে না। অভিদ এখনো সময় আছে ভালো ডিসিশান নেও। তোমার লেভেল দেখো আর ওরটা দেখো।!
” আমি ওকে সঠিক লাইনে আনব।”
“দুইদিন পর মান সন্মান ডুবাবে তখন তুমি কী করবে? দেখো না, এই মেয়ে বিয়ের দিনও পালিয়েছে।”
অভিদ সিদ্দিকী আর খাবার খেতে পারলো না। হাত ধুয়েমুছে উঠে যায়। সবার উদ্দেশ্যে বলে, “ও দ্বিতীয়বার বেয়াদ বি করার সুযোগ পাবেনা। আম্মা, এতো অস্থির হইয়ো না। আমি আছি তো নাকী?”
ফাহমিদা সিদ্দিকী আর কিছু বললেন না। অভিদ রাগ দমিয়ে রেখে রুমে প্রবেশ করে। রাগিনী তখন বসে ছিলো একা একা। কিছুই করছেনা সে। অভিদ শার্টের হাতা গুটাতে গুটাতে এগিয়ে আসে। রাগিনীর দিকে রক্তচক্ষু করে বাজখাঁই কন্ঠে বলে, “বেয়াদ বি কমানো হোক নাহলে কড়া ডোজ পড়বে সকাল,বিকাল,দুপুর,সন্ধ্যা এবং সারা রাত।”
“আপনি আমায় মার বেন এই তো?”
“কখন বলেছি এটা?”
“তো?”
নাকমুখ কুঁচকে বলে রাগিনী। অভিদ লম্বা দু’টো শ্বাস নিয়ে বলে, “কাউকে মেরে কখনোই ঠিক করা যায়না। কড়া আদরে রেখে ঠিক করতে হয়। উমম, এখন থেকে শুরু করব নাকী?”
“এই বুড়ো মুখ সামলে কথা বলবি। আমার গায়ে টাচ করলে তোর পরিণতি খারাপ করে ফেলব। এতো সাহস? এতো সাহস তোর?”
অভিদ জবাব দিলোনা। খাটে হাত পা ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে পড়ে রাগিনীকে টেনে নিজপর কাছাকাছিতে নিয়ে আসলে, ও হাফাতে হাফাতে হাত পা ছুটাতে থাকে। অভিদও তাকে ঠেলে বেড সাইডে নিয়ে আসে। রাগিনী রাগে ক্ষোভে সরে আসতে গেলে, শরীরের কমার্ধেক বেডে থাকে। বাকীটা অভিদের হাতে নিবদ্ধ। ও চোখমুখ খিঁচে বলে, “ছাড়বেন না পড়ে ব্যাথা পাব।”
“ধরলেও কিন্তু ব্যাথা পাবে। একটু বেশিইই আরকী… এই ধরো কান্না করার মতো ব্যাথা…”
রাগিনী চোখমুখ খিঁচে অভিদকে ধাক্কা দিতে গেলে অভিদ সুন্দর করে হাতটা সরিয়ে আনলে শব্দ করে মেঝেতে পড়ে যায় রাগিনী। অভিদ বেড সাইডে থুঁতনি রেখে রাগিনীর দিকে তাকিয়ে কুটিল হাসি দিয়ে বলে,
“বুড়ো লোকের হাতে শক্তি কম সেজন্য ছেড়ে দিয়েছে তোমার মতো লিলিপুটকে। বেশি ব্যাথা পেয়েছ নাকী?”
রাগিনী কোন জবাব দিতে পারলো না। মাথাটা জিম ধরে আছে। সেই সাথে হাত,কোমড় দু’টোতেই ভালোই ব্যাথা পেয়েছে ও। অভিদ আর তার দিকে তাকালো না। নিজের বালিশে এসে শুয়ে পড়ে সুন্দর করে। রাগিনী মেঝেতে অনেকক্ষণ স্থির হয়ে ছিলো। বহু কষ্টে উঠে মেঝেতে বসে ও। অভিদের দিকে নজর যেতে রাগে জেদে শরীর জ্বলে যায়। তাকে মেঝেতে ফেলে দিয়ে শান্তিতে ঘুমানোর পায়তারা। চুপচাপ উঠে পানি ভরতি গ্লাসটা হাতে নেয় ও। চুপিসারে অভিদের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় ও। যেই না পানিগুলো অভিদের মুখ বরাবর ছুঁড়ে মারতে তখুনি অভিদ ওর হাত ধরে গ্লাসের পানি ওর দিকেই ছুঁড়ে মারে। মূহুর্তে রাগিনীর মনটা ক্ষোভে পরিপূর্ণ হয়ে উঠে। গায়ের জোর দিয়ে ও কখনোই এই বু ড়ো লোকের সাথে পারবে না। অভিদ হতাশার চাহনি দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বসে রয়। রাগিনী নিজের ভেজা শরীরের দিকে তাকিয়ে রাগে গিজগিজ করতে করতে জগটা হাতে নেয়। অভিদ দ্রুত ওর পিছু পিছু গেলে পানি ছুঁড়ে মারতে গেলে রাগিনীকে নিজের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে নেয় ও। দু’হাতের উপর অভিদের হাতের বাঁধন রাখা।
ডান হাতে থাকা জগটা নিজের হাতে নেয় অভিদ। অতঃপর রাগিনীকে ছেড়ে দিয়ে ওর মাথায় সবটুকু পানি ঢেলে দিয়ে জগটা রেখে দেয়। মুচকি হাসি দিয়ে বলে, “আশা করি তোমার মাথা ঠান্ডা হয়েছে।”
“তোকে একদিন আমি খু ন করে বিধ বা হবো মনে রাখিস।”
অভিদ সেসব পাত্তা দিলোনা। মনটা একটু শান্ত হয়েছে এই মেয়েকে শায়েস্তা করে। কিন্তু এতো ধানিলংকা। আবার নতুন কোন পরিকল্পনা বানিয়ে ওর সন্মান ডুবায় কে জানে! রাগিনী নিজের ভেজা শাড়ির দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলেনা। ও জানে গায়ের জোর বা কথা কোনটা দিয়েই ও অভিদের সাথে পারবেনা। অভিদ সিদ্দিকী একটু কড়া কন্ঠে বলে, “রাগিনী, প্লিজ শান্তি দাও। মেনে নিতে শিখো, মানিয়ে নিতে শিখো বিশ্বাস করো অনেক আদরে রাখব তোমায়। শুধু একটু ভদ্র হও, একটু নম্র হও। ভালো মেয়ে হও। আমার বয়স নিয়ে তোমার এতো সমস্যা? তুমি আমার সাথে ক্লোজ হও, মন খুলে কথা বলো দেখবে আমরাও ভালো ফ্রেন্ড হবো তখন তোমার কাছে এইজ গ্যান মনে হবেনা। শুধু একটু শান্ত হও।”
“তোর সাথে ফ্রেন্ড হতেও রুচিতে বাঁধে আমার। কোন মুখে এসব অফার দিচ্ছিস? লজ্জা করেনা? তোকে দেখলেই আমার ঘেন্না লাগে ঘেন্না। আমার সামনে আসবি না তুই। একদমই না।”
কথাটা বলে ও চেঞ্জ করতে চলে যায়। অভিদ শুধু ওর যাওয়ার দিকে একনজর তাকিয়ে রয়।
#চলবে

