#বকুলের_মালা_শুকাবে—৬
#শার্লিন_হাসান
জামাকাপড় পাল্টে রুমে এসে বসেছে রাগিনী। রাগে শরীরের প্রতিটা রগ যেনো ফুলেফেঁপে উঠছে। অভিদের এতো সাহস কী করে সাহস হয় ওর মাথায় পানি ঢালার। বুড়ো লোক তাকে কিছুতেই শান্তি দিবেনা। কিছুতেই না। অসহ্য একটা!
অনেকক্ষণ বসে থেকে রাগ কমিয়ে,বাইরের দিকে যেতে গেলে অভিদ কড়া হুশিয়ারি দিয়ে বলে, “স্বামীর পাশে এসে ঘুমাও।”
“চোপ। তোকে দেখলেই আমার খু ন চেপে বসে আবার ঘুমাব কী?”
“আসো খু ন করো।”
রাগিনী চেতে উঠে। তেড়েফুঁড়ে গিয়ে অভিদের শার্টের কলার ধরতে গিয়েও থেমে যায়। কী মনে হতে মুখ ঝামটি মেরে ব্যালকনিতে চলে যায়। মূহুর্তে কনুই আর কোমড়ের ব্যাথাটা টনটনে হয়ে উঠে। বেড থেকে পড়ে ভালোই ব্যাথা পেয়েছে ও। তারউপর বুড়ো লোকটাও তার উপর এসে পড়েছে। আটচল্লিশ কেজি ওজনের শরীরে ষাটোর্ধ ওজনের লোক এসে পড়লে সামলানো তো কষ্টকর। মেজাজটা চরম খিটখিটে হয়ে আছে। তারউপর অভিদের ব্যবহার তার পছন্দ হচ্ছেনা। দম বন্ধ হয়ে আসে নিজের কথা ভাবলেই। সব কী মনে নিবে? সব মেনে নিবে? এই জেদটা রাখা কী ঠিক হবে? দিনশেষে যদি এই খেলায় হারটাই মেনে নিতে হয় তখন এতোকিছু করে কী হবে? তিক্ত মনে নিয়ে আনমনা হয়ে মেঝেতে দপ করে বসে পড়ে রাগিনী। দেওয়ালে হেলান দিয়ে বাইরে তাকায়। টুপ করে দুফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। ওর ধ্যাণ ভাঙেনা তখনো। খুব করে কান্না পাচ্ছে তার। হাউমাউ করে কান্না করতে ইচ্ছে করছে। মূহুর্তে ফুঁপিয়ে ওঠে ও। দুহাটুতে মুখ গুঁজে রেখে শব্দ কান্নায় ভে’ঙে যায় রাগিনী।
গ্রিলের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রাগিনীকে পরখ করছে অভিদ। এই মূহুর্তে কিছু বলার মতো খুঁজে পেলো না ও। ও কী বেশি করে ফেলেছে মেয়েটার সাথে? বোধহয় পানি ঢালাটা ঠিক হয়নি। মোটেও না। কিছু সময় পেরিয়ে যেতে অভিদ সিদ্দিকী রাগিনীর পাশে বসে। ওর কাঁধে হাত রাখতে রাগিনী মুখ তুলে তাকায়। অভিদকে দেখে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া দেখায়না। বরং মুখ ঘুরিয়ে নেয় অন্যদিকে। অভিদ রাগিনীর দিকে চেয়ে বলে, “তোমার চোখের পানি মুছে দেওয়ার অধিকার দিবে?”
স্তিমিতনেত্রের দৃষ্টিটা অভিদের পিঙ্গল চোখের দিকে স্থির হয়। আবদারটা কীরকম? স্নিগ্ধ? সুন্দর? নাকী মায়ায় জড়ানো? রাগিনী নিজেকে স্বাভাবিক রেখে উঠে দাঁড়ায়। কোন জবাব না দিয়ে অভিদকে পাশ কাটিয়ে রুমে চলে যায়। অভিদ সিদ্দিকী ও বউয়ের পিছুপিছু ছুটে। রাগিনী খাটের সাথে হেলান দিয়ে বসে। অভিদ ড্রয়ার থেকে ঔষধ বের করে আনে। রাগিনীর সামনে বসে বলে, “ক্যান আই হেল্প ইয়্যু?”
“চ ড় মেরে স্যরি বলাটা আমার পছন্দ না।”
“আচ্ছা বুঝলাম আমাকে পছন্দ না। নিজে ঔষধটা লাগিয়ে নিও।”
“দরকার নেই।”
“রাগিনী অ্যাম রিয়েলি স্যরি।”
রাগিনী জবাব দেয়না। অভিদের হাত থেকে ঔষধটা নিয়ে আঙুলের মাথায় নেয়। অভিদের দিকে তাকিয়ে বলে, “ঘুরে বসুন।”
“কিন্তু ব্যাথা তো তুমি পেয়েছ।”
“আমি কী বলেছি আপনি ব্যাথা পেয়েছেন?”
“আমি দেখলে সমস্যা কী?”
“কী অস ভ্য।”
দাঁতে দাঁত চেপে বলে রাগিনী। অভিদ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “তুমি না দেখালেও আমি সব ভেবে নিয়েছি।”
রাগিনী নাকমুখ কুঁচকে বলে, “মুখের লাগাম হারিয়ে গেছে।”
অভিদ সিদ্দিকী মৃদু হাসে। দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয় রাগিনীর থেকে। রাগিনী তার মৃদু ভদ্রতা দেখে মুখ বাকায়। কনুই আর কোমড়ে ঔষধ লাগিয়ে সটান হয়ে শুয়ে পড়ে। অভিদ যে তার পাশে শোয়া সেসব নিয়ে আর ভাবেনি সে। ঝগড়া করার এনার্জিও নেই। চোখ বুজতে ঘুমের ঘরে ডুবে যায়।
★★★
“আপনাদের মেয়েকে কী জীবনেও কাজ শেখাননি? আচ্ছা কাজ বাদ দিলাম। ব্যবহারও কী শেখাননি?”
কলের এপাশে ফাহমিদা সিদ্দিকী কুসুমকলির উদ্দেশ্যে বাকয়টা ছুঁড়ে দেন। অপাশ থেকে জবাব আসে, “ও এরকমই। আপনাদের ছেলে জেনেশুনে বিয়ে করেছে। সমস্যা হলে তাকে বলবেন, আমাদের না।”
“আপনাদের বলব না মানে? মেয়ে আপনাদের তো আপনারা দোষগুণ শুনবেন না? ও আমার ননদের সাথে মুখেমুখে তর্ক করেছে। বাকী সব বাদই দিলাম। আমার সংসার ধ্বংস করার জন্য এই মেয়ে আমার ছেলের গলা ঝুলিয়েছেন। নাহলে যে স্বভাব, চরিত্র আর ব্যবহার কোন ভালো ঘরে বিয়ে হতো নাকী?”
“আপনাদের ছেলেই নেচে-কুঁদে বিয়ে করতে এসেছে। আমরা আমাদের মেয়ে বিয়ে দিতে চাইনি।”
“বিয়ে দিতে না চাইলে, নেচে-কুঁদে গেলেই কী বিয়ে হয়ে যায়? আমি কী বোকা? নিজেদের ঝামেলা আমাদের পরিবারে পাঠিয়েছেন। এই বিয়ে আমার পরিবারের কেউই মানে না।”
“আমাদের পরিবারেরও কেউ এই বিয়ে মানে না।”
“আপনি তো ভারী সাংঘাতিক! আমি ছেলের মা কথা বলছি, বিচার দিচ্ছি মেনে নিবেন। মেয়েকে বুঝাবেন তা না তর্ক করছেন। আপনি এমন তো মেয়ে আর কেমন হবে।”
“আপনি নিজের সীমা লঙ্ঘন করছেন।”
ফাহমিদা সিদ্দিকী রেগে বলেন,
“আমি সীমা লঙ্ঘন করলে বিয়েটা কখনোই হতো না।”
“আপনি আপনার ছেলের সাথে কথা বলবেন। অযথা আমাদের সাথে এসব বললে ঝামেলা মিটমাট হবেনা। ভালো থাকবেন।”
কুসুমকলি কল কেটে দিতে শান্তিসুধা মাথায় হাত দিয়ে ফেলেন। কল লাউডস্পিকারে থাকা বিধায় চৌধুরী পরিবারের সকলেই সব শুনেছেন। রফিকুল ইসলাম চৌধুরী এবং রাসেল চৌধুরী সোফায় থমথমে মুখ নিয়ে বসে আছেন। মেয়ে বিয়ে দিয়ে তো আরো বেশি ঝামেলা লেগে গেছে। ছেলে তো ভালো। কিন্তু ছেলের মা তো নাগা মরিচ। তাঁদের মেয়েও তো আরেক হিটার। সব আগুন,তেজ একসাথে পড়ে তো মহা সর্বনাশ বাঁধিয়ে ফেলেছে। রাসেল চৌধুরী ঠিক তখুনি অভিদকে কল দেন। বার কয়েক রিং হতে অভিদ কল তুলে, সালাম জানায়। রাসেল চৌধুরী সালামের জবাব দিয়ে অভিদের সাথে টুকটাক কথা সেরে ফেলেন। নিজের ভেতরে থাকা রাগকে দমিয়ে রেখে তিনি বলেন, “মেহেরকে কলটা দাও।”
অভিদ সিদ্দিকী ঘুমন্ত বউয়ের চেহারায় একনজর দৃষ্টি বুলিয়ে বলে, “রাগিনী ঘুমাচ্ছে।”
“আর্জেন্ট আছে। তুমি ওকে ডেকে তোলো।”
অভিদ কলটা মিউট করে রাগিনীর গলার নিচে, বার কয়েক স্লাইড করে। তাতেও মেয়েটার হেলদোল না পাওয়ায় পুনরায় স্লাইড করতে রাগিনী ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে। অভিদের দিকে রাগী দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে, “ঘুমের সুযোগ নিচ্ছেন?”
“আপাতত মুড নেই, সেজন্য সুযোগ নেওয়ার প্রশ্নই আসেনা।”
রাগিনী মুখটা ঘুরিয়ে নিতে অভিদ ওর সামনে ফোনটা ধরে। মিউট অন করে দিতে রাগিনী পুনরায় বলে, “কার কল?”
“তোমার বাবা।”
রাগিনী আর কিছু বলেনা। ফোনটা কানের কাছে নিয়ে সালাম দেয়। অপাশ থেকে সালামের জবাব আসে। সেই সাথে রাগিনীর খোঁজ খবর জিজ্ঞেস করে রাসেল চৌধুরী বলেন, “কেমন আছো মেহেরজান?”
“অনেক ভালো আছি। আপনি?”
রাগিনীর ‘তুমি’ সম্বোধন থেকে আপনিতে চলে যাওয়া দেখে রাসেল চৌধুরী রাগটা প্রকাশ করবেন কী করবেন না ঠিক বুঝতে পারলেন না
তিনি আর কথা না বাড়িয়ে বলেন, “তোমার আম্মুর সাথে কথা বলো।”
“পরে সময় বের করে বলব। আপনার আর কিছু বলার আছে?”
“আছে তো অনেক কথাই। কিন্তু সময়টা সঠিক বলে মনে হচ্ছেনা।”
“জীবনের কোন সময়ই সঠিক হয়ে আসেনা। সঠিক করে নিতে হয়।”
“তুমি ওনাদের সাথে বেয়াদবি করো কেন?”
“উমম,বিচার পেয়েছেন যেহেতু, আমি নিজেকে শুধরে নিয়ে এরপর থেকে সবাইকে আদর করব। খুশি?”
“মেহের….
” বেয়াদবিতে খুশি না এখন আদরেও খুশি না। তো কী কোলে নিয়ে নাচব?”
“তুমি অভিদকে কলটা দাও।”
রাগিনী অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে অভিদের দিকে ফোন বাড়িয়ে দিতে রাসেল চৌধুরী বলেন, “ওকে একটু মানুষ করিও। বে য়াদব, অ সভ্য মেয়ে এটা আমার যে বিশ্বাসই হয়না। আমার পরিবারের সন্মান তো খুইয়েছে! প্লিজ তুমি রিস্ক নিও না। ওকে শাসনে রেখো। তোমার আম্মাকে একটু বুঝিয়ো।
সময় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“জ্বী চেষ্টা করব, দোয়া করবেন।”
“তা তো সবসময়। ওকে একটু নমনীয়তা, ভদ্রতা শিখিয়ো সবার আগে।”
“জ্বী।”
রাসেল চৌধুরী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে কলটা রাখেন। অভিদ ফোনটা রেখে সটান হয়ে শুয়ে যায়। রাগিনী উঠে চলে যেতে নিলে ও কড়া কন্ঠে বলে, “রাগিনী বিহেভিয়ার কন্ট্রোলে আনা যায়না?”
“না যায়না। আপনাকে আমি মানিনা, এই বিয়ে মানিনা। কিছু মানি না আমি।”
“সহজে সব মেনে নিতে না পারলে কোলে একটা ধরিয়ে দিলে, সব মেনে নিবা। এখন অপশন আমার চয়েজ তোমার।”
“চয়েজ তোর হে**। তোর খ বর আছে। একদম খু ন করে ফেলব তোকে। আমার বয়স হয়েছে বিয়ের? তুই না আইনের লোক! সচেতন নাগরিক তো বাল্যবিবাহ করতে লজ্জা করেনি?”
“আমি তো বয়স দেখে বিয়ে করিনি, অন্যকিছু দেখে বিয়ে করেছি।”
“অস ভ্য। আমার মুক্তি চাই এসব থেকে। এরকম অস ভ্যের সাথে থাকা যায়না।”
“বিয়ে কোন ছেলে খেলা না। তোমার মাথায় সুবুদ্ধি কবে হবে?”
“অ্যাম ইন লাভ উইদ সামওয়ান।”
#চলবে

