Home "ধারাবাহিক গল্প বন্য প্রণয় বন্য প্রণয় পর্ব-২৮+২৯

বন্য প্রণয় পর্ব-২৮+২৯

0
758

#বন্য_প্রণয়
#পর্ব_২৮
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

( প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত।)

ঘড়ির কাঁটায় রাত এখন ঠিক বারোটা বাজতে দুই মিনিট বাকি। হঠাৎ তাহমির মৃদু আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলো সহনের। এমনিতে ঘুম পাতলা ছিল। চোখ মেলে তাকিয়ে পাশে তাহমিকে না দেখতে পেয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলো সে। বাতি জ্বেলে দেখল পুরো ঘরে তাহমি নেই । আওয়াজটা তবে বেলকনি থেকে এসেছিল ভেবে সেদিকে এগিয়ে গেলো সহন। সামনে নজর বুলিয়ে দেখার আগেই রুমে অন্ধকার নেমে এলো। চমকাল সহন। কী হচ্ছে তার সাথে? আর তাহমি কোথায়? সবাই ঠিক আছে তো! এরমধ্যেই দেয়ালঘড়ির টিকটিক আওয়াজে কান খাড়া হয়ে যায় সহনের। রাত বারোটা বেজেছে,ঘড়িটা তেমনই জানান দিলো। সহসা চোখের সামনে একটা মোমবাতি জ্বলে উঠলো সহনের। তারপর দুটো থেকে তিনটে, তিনটে থেকে চারটে! বেলকনিতে মোমবাতির আলোর সৌন্দর্যে এবার সবকিছু পরিষ্কার হয়ে গেলো সহনের সামনে। তাহমি ঠোঁটের কোণে মিষ্টি হাসির রেখা ফুটিয়ে বলে চলেছে,
” হ্যাপি বার্থডে টু ইউ! হ্যাপি বার্থডে টু ইউ! হ্যাপি বার্থডে ডিয়ার সহন…”
সহন থমকে গেছে তাহমির পাগলামিতে। ছোটো টেবিলের উপর রাখা আছে সহনের ফেভারিট চকলেট ফ্লেভারের কেক। সাথে কিছু লাল রঙের বেলুন আছে সাজানো। বেলকনির ফ্লোরেও সাদা ও নীল রঙের বেলুনের ছড়াছড়ি। কেকটার উপর সুন্দর করে লেখা আছে,
❝ তোমার প্রতিটি জন্মদিন যেনো তোমার বউয়ের হাতের কেক খেয়েই কাটে!❞

” তাহমি! ভাই রে ভাই তুই এসব করেছিস! ”
সহন কিছু বলতে পারলো না। তাহমিকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল।
” ভাই না বউ হবে! ‌যাগগে এসব পরে করবি চল আগে কেক কেটে নিবি। খেয়ে বল কেমন হয়েছে। ”
সহন ছাড়লো না। জড়িয়ে ধরে রেখেই শুধালো,
” তুই বানিয়েছিস কেক?”
” হুম। ”
তাহমি মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। সহন আঁতকে উঠলো তাতে। পুরনো দূর্ঘটনাটা আবারও মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো তার।
” তুই একা একা আবারও রান্নাঘরে গিয়েছিলি? যদি আবারও কোনো দূর্ঘটনা ঘটে যেতো!”
” শান্ত হ প্লিজ। একবার অঘটন ঘটেছে বলে কী বারবার ঘটবে? তাছাড়া আমি ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছি। ওড়না সাবধানে পেচিয়ে রেখে কাজ করেছি। এখন ছাড় আমাকে। কেক কাটতে হবে না? ”
তাহমি একপ্রকার সহনকে সরিয়ে ছাড়িয়ে নিলো নিজেকে। সহনের ভীষণ খুশি লাগছে। প্রিয় মানুষটি জন্মদিনে এভাবে সারপ্রাইজ দিলে সবারই ভালো লাগে। তাহমি সহনকে নিয়ে টেবিলের সামনে দাঁড় করলো। সহন ফু দিয়ে একে একে সবগুলো মোমবাতি নিভিয়ে ফেলেছে। তাহমি আস্তে আস্তে হাতে তালি দিয়ে উইশ করে যাচ্ছে। এরমধ্যেই ইলেকট্রিক রঙিন লাইট জ্বলতে শুরু করেছে বারান্দায়। কী সুন্দর একটা পরিবেশ!
” এতকিছু কখন করলি! আমি কিছু টের পেলামও না।”
সহন বিস্ময় নিয়ে শুধালো তাহমিকে। তাহমি তাড়া দিলো।
” সেসব পরে আগে কেক কাটতে শুরু কর। ”
” ওকে। ”
সহন কেক কাটলো। প্রথমে তাহমিকে এক টুকরো কেক খাইয়ে দিয়ে তারপর নিজেও খেলো। তাহমিও খাইয়ে দিলো কেক সহনকে।

” সাড়ে বারোটা বাজল প্রায়। এখনও কি আমি তোমার সাথে বসে থাকবো? ঘুমুতে হবে না? ”
অনিমা আয়ানের কোলে বসেই এতক্ষণ ধরে বকবক করে যাচ্ছে। বেচারার উরুতে ব্যথা হয়ে গেছে। ধমক দিতেও পারছে না আর বকলেও ঝামেলা। এখন অনিমা কাঁদা শুরু করলে আরেক বিপত্তি বাঁধবে। এতো ছোটো মেয়ের সাথে মানুষ কেমনে প্রেম করে সেসব ভাবতে গেলেও নিজেকে আসল বলদ মনে হচ্ছে আয়ানের। অনিমা ধীরে সুস্থে এবার কোল থেকে নেমে বিছানায় বসলো। ঘুম এসেছে মেয়েটার চোখে। চোখমুখ দেখেই সেটা বুঝতে পারছে আয়ান। বিছানায় সোজা হয়ে শুয়ে আয়ানের এক হাত ধরে হেঁচকা টান দিয়ে তার পাশেই শুইয়ে দিলো অনিমা।
” শোনো না, আমি একটু তোমাকে জড়িয়ে ঘুমাই তারপর তুমি যেও পরে।”
আহ্লাদী স্বরে বললো অনিমা। আয়ান গেলো তাতে চটে।
” তোমার যে মাথার স্ক্রু ঢিলা সেটা জানতাম কিন্তু ঢিলার বদলে যে সবগুলো যে ড্যামেজ সেটা আজকে বুঝতে পারছি এখন। একটা পুরুষ মানুষকে কোনো ভয়ডর নেই! আর না আছে কোনো বাবার ভয়।”
অনিমা আয়ানের কথায় পাত্তা দিলো না। আস্তে করে আয়ানের বুকের উপর মাথা রেখে আয়ানের বুকের উপর আবার হাত রাখল। আয়ান কিঞ্চিৎ নড়ে উঠলো তাতে। নিশুতি রাতে, ফাঁকা ঘরে একটা মেয়ে এত কাছাকাছি থাকলে নিজেকে কত কষ্টে নিয়ন্ত্রণ করতে হয় সেটা বুঝতে পারছে আয়ান। তার উপর যদি মেয়েটি ভালোবাসার মানুষ হয় তাহলে তো বেয়ারা মন কথাই শুনতে চায় না। এই মেয়ে কি তা বোঝে? শুধু তা থৈথৈ করতে জানে। যা-ও মাঝখানে ধমক খেয়ে শান্ত হয়ে গেছিল এখন তো পুরোদমে ক্ষেপেছে আবার।
” তুমি চুপ করো তো। কীসের ভয় তোমাকে? কেমন একটা লোক! কোথায় এখন নিজে থেকে দুষ্টমি করবা,দু’একটা রসাল চুম্মচাটি দিবা! তা না করে শাষণ করো কেন? জন্মের সময় কি মা মুখে মধু দেননি? ”
অনিমা বুকে নাক ডুবিয়ে দিয়ে আয়ানের শরীরের ঘ্রাণ নিচ্ছে। তপ্ত নিঃশ্বাসে আয়ান এদিকে জ্বলেপুড়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই মেয়েকে সেসব বলতে গেলে আরও পেয়ে বসবে। আয়ান গম্ভীর কণ্ঠে বললো,
” আমার মুখে মধু দেননি আসলেই। আর নিজের ভেতরের মধু এখন জমিয়ে রাখো। অনিমা এসব করার বয়স হয়নি তোমার। এইচএসসি পরীক্ষা যাক তারপর সব হবে। আর এখন থেকে তোমার সো কলড বান্ধবীদের সাথে চলাফেরা করবা না। কতগুলো অকালপক্ব! ”
” চুপ করো বললাম আবারও হুহ্। এসব নরমাল বিষয়। প্রেম করলে করতেই পারে। যার যার পারসোনাল বিষয়। যদিও আমি ইন্টিমেট হওয়া সাপোর্ট করি না বাট আদর তো করাই যায় বলো?”
আয়ান অনিমার কথায় লজ্জা পাবে নাকি রাগ করবে বুঝতে পারছে না। এতটুকু মেয়ে কীসব বলছে! এগুলো করাই যায়?
” এসব শেখো স্কুলে গিয়ে? যখন ছেলেগুলো সবকিছু লুটেপুটে খেয়ে চলে যাবে তখন তোমার বান্ধবীরা বুঝবে মজা। এরা মজা নিতে আসে দায়িত্ব নিতে না। ধুর! কাকে কী বোঝাচ্ছি আমি। সরো তো বাল আমি বাসায় যাবো। এরকম করলে কিন্তু আর কখনো ডাকলেও আসবো না অনিমা।”

আয়ানের নীরব হুমকিতে কিছুটা ভয় পেয়ে গেলো অনিমা। খানিকক্ষণ চুপ থেকে দূরে সরে শুয়ে বললো,
” ঠিক আছে যাও আর সাবধানে যেও। শুভ রাত্রি। ”

আয়ান হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। দ্রুত উঠে দাঁড়ালো সে। জানালার দিকে এগিয়ে গেলো কয়েক কদমে। কিন্তু আবারও পেছনে ফিরে তাকালো একবার। মেয়েটা এরমধ্যে চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। আয়ান দ্রুত পা ফেলে অনিমার পাশে দাঁড়িয়ে ঝুঁকে কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে আবারও জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। অনিমা ইচ্ছে করে চোখ বন্ধ করে চুপ করে আছে। কারণ তাকিয়ে থাকলে এই ছোঁয়াটুকু তার জুটতো না।

” তৃষা আই এম সরি ডিয়ার। প্লিজ বইগুলো নাও। সামনে তোমার পরীক্ষা। না পড়লে কীভাবে হবে? ”

পড়ার টেবিলে বসে তৃষা ফোনে পিডিএফ দেখে পড়ছে। বই ছিঁড়ে ফেলার পর বিভিন্নভাবে খোঁজাখুঁজি করে পিডিএফ যোগাড় করেছিল। রাতে বাসায় ফেরার সময় অনিক আবার বই কিনে নিয়ে এসেছে। তৃষাকে অনেকবার সাধার পরেও সে বইগুলো ছুঁয়ে অবধি দেখেনি।
” আপনাকে সেসব ভাবতে হবে না। রাত একটার বেশি বাজতে চললো,আপনি ঘুমাতে যান ডাক্তার সাহেব। আমার পড়া শেষ হলে আমি ঘুমাবো। আর যদি অন্য কিছু প্রয়োজন হয় তবে চলুন, আপনার প্রয়োজন মিটিয়ে তারপর আমি পড়তে বসবো আবারও। ”
তৃষার ভাবলেশহীন কথাগুলো অনিকের বুকে তীরের মতো বিঁধল। অনিক নিজেও তো চায় না ওরকম করতে। কিন্তু হুটহাট পুরনো স্মৃতিগুলো এসে সবকিছু এলোমেলো করে দেয়। মনে হয় তৃষাও হারিয়ে যাচ্ছে কিংবা যাবে। আগে সমস্যাটা সামলে নিতে পারতো অনিক। কিন্তু বিয়ের পর তো তৃষা কাছে আসায় ভয়টা বেড়ে গেছে। তৃষা তো জানে তার অতীত। তবুও কেনো বোঝে না? এ পৃথিবীতে কি কেউ কাউকে বোঝে না? অনিক তৃষার পায়ের কাছে ফ্লোরে বসে পড়লো। বইগুলোও ফ্লোরে রাখা। তৃষা চমকাল খানিকটা। অনিকের দিকে দৃষ্টিপাত করতেই ভীষণ মায়া লাগছে তৃষার। মানুষটা কি এরকমই? না-কি কোনো সমস্যা হচ্ছে তার?
” তৃষা এভাবে বলো কেনো? আমি কি শুধু শারীরিক চাহিদা মেটানোর জন্য তোমাকে বিয়ে করেছি? বিশ্বাস করো তৃষা আমি চাই না তোমাকে কষ্ট দিতে। তবুও দিয়ে ফেলি!”
অনিকের অসহায়ত্ব তৃষাকে আঘাত করছে হৃদয়ে। তৃষাও চেয়ার ছেড়ে ফ্লোরে বসে পড়লো।

চলবে,

#বন্য_প্রণয়
#পর্ব_২৯
#তাসমিয়া_তাসনিন_প্রিয়া

( কঠোরভাবে প্রাপ্তবয়স্ক ও মুক্তমনাদের জন্য উন্মুক্ত।)

অনিকের অসহায়ত্ব তৃষাকে আঘাত করছে হৃদয়ে। তৃষাও চেয়ার ছেড়ে ফ্লোরে বসে পড়লো। হাতে হাত রাখল অনিক। তৃষা এগিয়ে গিয়ে দু’জনার মাথা ঠেকাল মাথায়।
” আমিও আপনাকে আঘাত করে কথা বলতে চাইনি। আমার মন মানসিকতা খারাপ থাকে। বিয়ের আগে যে আপনাকে পেয়েছিলাম,বিয়ের পরে সেই আপনাকে আমি পাচ্ছি না। সম্পূর্ণ আলাদা মানুষ মনে হচ্ছে আমার। যেনো একের ভেতর দু’টি সত্তার বসবাস! ”
অনিক চমকাল। মস্তিষ্কে একটা কথা বারবার আনাগোনা করতে লাগলো ❝ একের ভেতর দু’টি সত্তার বসবাস!❞ আসলেই কি তেমন কিছু? তার কি কোনো মানসিক রোগ হয়েছে? নিজেকে সামলে নিল লোকটা। আলতো করে নাকের ডগায় ঠোঁট ছুঁইয়ে দিলো তৃষার। তৃষার গাল বেয়ে টপটপ করে পানি ঝরছে। অনিক আলগোছে সেই পানিটুকু মুছে দিল।
” তৃষা আমি ডাক্তার দেখাবো। আমি সব রকমভাবে চেষ্টা করবো নিজেকে স্বাভাবিক রাখার। তুমি একটু ততদিন আমাকে সহ্য করে নাও লক্ষ্মী বউ আমার। ”
” ঠিক আছে। আমিও চাই আমাদের একটা সুন্দর সংসার হোক। দু’জনের সুখের সংসার। তারজন্য আমি অবশ্যই ধৈর্য ধারণ করবো।”
তৃষা নিজে থেকেই জড়িয়ে ধরলো অনিককে। অনিক তৃষার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে মাথার তালুতে ওষ্ঠ ছুঁইয়ে দিলো।

সকালবেলা তড়িঘড়ি করে বাসার কাজকর্ম সব শেষ করে বাসা থেকে স্কুলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে বের হয়েছে তাহমি। এমনিতে বাসে করে যায় তবে মাঝে মধ্যে আবার রিকশায় চড়েও যাওয়া হয়। আজকে অবশ্য বাসে উঠেছে। লোকাল বাসের হেলপার গুলোকে ভীষণ অসহ্য লাগে তাহমির। লাগার অবশ্য কারণ আছে। এই যে একটু আগে, ওভারব্রিজের নিচে নেমে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো তাহমি। বলার অপেক্ষা রাখে না বাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। এরমধ্যে একসাথে দু’টো বাস থামলো। দু’জন হেলেপার সামনে এসে শুরু করলো প্যাসেঞ্জার নিয়ে কাড়াকাড়ি। একজন বলতেছে,
❝ আপা আমগো বাসে আহেন। এক্কেরে সামনে সিট আছে।❞
অন্য জন আবার বললো,

❝ আরে তোরা আর কী সিট দিবার পারবি? আফা এদিকে আইয়েন। একেবারে জানালার পাশে সিট দিয়ামনে। ফুরফুরা বাতাস খাইয়েন।❞
শেষমেশ বিরক্ত হয়ে তাহমি একটা বাসেও উঠেনি। পরের বাসে উঠে বসেছিল।
” আরে তাহমি না? কত বছর পরে দেখা হলো!”
হঠাৎ পুরুষালী আওয়াজে ভাবনার ছেদ ঘটলো তাহমির। ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ তুলে তাকাল সেদিকে। এক পলকে চিনতে পারল লোকটাকে। তার কলেজের ক্লাসমেট ছিল অথবা বলা যায় তাহমির প্রথম প্রেম!
” হ্যাঁ। কেমন আছিস শ্রেয়ান?”
স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করলো তাহমি। শ্রেয়ান হাসলো একটু। লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
” পাশের সিট তো খালি আগে না হয় বসি,তারপর কথা বলবো?”
তাহমি কিছুটা ইতস্ততভাবে বলে, ” হ্যাঁ বস।”
শ্রেয়ান বসলো পাশের সিটে। তাহমি জানালার দিকের সিটে বসেছে।
” আছি আলহামদুলিল্লাহ। তোর খবর কী? বিয়েটিয়ে করেছিস নাকি?”
” আলহামদুলিল্লাহ ভালো। কেন তুই কি বিয়ে না করে দেবদাস হয়ে বসে আছিস?”
” সেটা নয়। তবে বিয়ে করিনি এখনো। তোর তো বিয়ে করার কথা নয়। বিয়েশাদি তো বিশেষ পছন্দ ছিল না। ”
চলন্ত বাস মাঝে মধ্যে থেমে আবারও চলছে। কখনো ঝাঁকি খাচ্ছে তো কখনো সমানভাবে চলছে। তাহমির অপ্রস্তুত লাগছে ভীষণ। কেনো লাগছে নিজে জানে না। যদিও সেরকম সিরিয়াস টাইপের রিলেশনশিপ ছিলো না শ্রেয়ানের সাথে। তবুও কিছু স্মৃতি তো আছেই। তবে সেসব নিছকই অতীত। অতীত বর্তমানে প্রভাব ফেলে।
” আমার বিয়ে হয়ে গেছে। সহনের সাথে। ”
” কী!”
শ্রেয়ান ছোটখাটো একটা শক খেলো মনে হয়। অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাহমির দিকে। তাহমি মৃদু হেসে বললো,
” হুম। শ্রেয়ান চলতি পথে অতীত আমাদের সামনে এসেই পড়ে। তাই বলে বর্তমানের সামনে অতীতকে প্রশ্রয় দিতে নেই। আমাদের সম্পর্ক এখন শুধু ক্লাসমেট ছিলাম। আমার সংসার আছে। তুইও বিয়ে করে নিবি আশা করি। ”
” সত্যি বলতে আমি বিয়ে কেনো করিনি আমি নিজেও জানি না। ভেবেছিলাম হয়তো একদিন তোর সাথে দেখা হবে, আরেকবার সুযোগ চাইব। মিস হয়ে গেলো। শালা সহন মাঝখান থেকে গোল দিলো। যাগগে কংগ্রাচুলেশনস। ”
” ধন্যবাদ দোস্ত। একদিন বাসায় আসিস তাহলে। আমার গন্তব্য এসে গেছে। ”
বাস থামলো। হেলপার যাত্রীদের উদ্দেশ্য বারবার জায়গার নাম বলে যাচ্ছে, কেউ নামার থাকলে যেনো নেমে যায়।
” ঠিক আছে। বিয়ের কার্ড দিতে যাবো একেবারে। ভালো থাকিস।”
” সেইম টু ইউ। ”
তাহমি বাস থেকে নামতেই জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টিপাত করে দীর্ঘশ্বাস ফেললো শ্রেয়ান। সেদিন একটু সিরিয়াস হলে আজকে মানুষটা তার ঘরে থাকতো। এই আফসোস কখনো ঘুচবে না শ্রেয়ানের। তাহমি ছাড়া শ্রেয়ান ভালো নেই এমন না কিন্তু তাহমির শূণ্যতা আজীবন তার জীবনে থেকে যাবে। একজন গেলে একজন আসে ঠিক কিন্তু সেই চলে যাওয়া একজনের মতো আর হয় না দ্বিতীয় কেউ। প্রত্যেকটা মানুষের উপলব্ধি আলাদা।
আকাশে কালো মেঘ জমেছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কালো রঙ করেছে কেউ। ঘনকাল মেঘেরা আর ঠান্ডা হাওয়া কালবৈশাখীর আভাস দিচ্ছে। এখন সময় দুপুরবেলা। রান্না ঘরের টুকটাক কাজ শেষ করে ফরিদা খান গোসল করতে ওয়াশরুমে ঢুকেছেন। আজকে শুক্রবার বলে তাহমি,সহনও আছে বাসায়। তাহমি দুপুরের খাবারগুলো ডাইনিং টেবিলে গুছিয়ে রেখে ছাদের দিকে এগোলো। বৃষ্টি হলে সব জামাকাপড় ভিজে একাকার হয়ে যাবে। ছাদের সিড়ি পর্যন্ত উঠতেই সহনের গলার আওয়াজ শুনতে পেলো সে। কারো সাথে ফোনে কথা বলছে সে। আবহাওয়া এমন তারমধ্য ছাদে বসে কেন থাকতে হবে? থাকবি যখন কাজ করে খাবি। তাহমি গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে গেলো ছাদের উত্তর পাশের বেঞ্চির দিকে।
” ওকে মিস্টার শেখর আপনি আগামীকাল অফিসে আসুন। আমরা বাদবাকি কথা তখন না হ সেড়ে নিবো। ”
সহনের কথা শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিল তাহমি। ফোন কাটতেই আলতো করে ঘাড়ে কামড়ে দিলো সে। সহন লাফিয়ে উঠে দাঁড়ালো। বড়ো বড়ো চোখ মেলে পেছনে তাকিয়ে দেখলো কীসো কামড়াল তাকে। তাহমির তো হেসে হেসে শেষ হওয়ার যোগাড় হয়েছে। লোকটা যে কতটা চমকে গেছে সেটা চোখের চাহনি দেখেই স্পষ্ট বুঝতে পারছে তাহমি।
” তুই! এরকম কেউ করে? ধুর বেটা ভয় পেয়েছি।”
তাহমি সহনের দিকে এগিয়ে পায়ে পা রেখে গলা আঁকড়ে ধরে দাঁড়িয়ে ভ্রু নাচিয়ে বললো,
” কী ভেবেছিস ভ্যাম্পায়ার এসে কামড়ে দিলো? হাহাহা! ”
সহন উত্তর দিলো না। দু’হাতে শক্ত করে তাহমির কোমর চেপে ধরলো। তাহমি শিহরিত হলো। জিহ্বা দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে নিলো সহন। তাহমি সেদিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো। তাহমির ঠোঁটও নিজের জিহ্বা দিয়ে ভিজিয়ে দিলো সহন। থেকে থেকে কেঁপে উঠল মেয়েটা। সহন থামল না তাতে। দীর্ঘদিনের দূরত্ব তাকে অধৈর্য করে তুলেছে। দু’জনের ভেজা ঠোঁট একত্র হলো কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই। হঠাৎ মেঘের গর্জনে নড়েচড়ে উঠলো দু’জন। দু’জন দু’জনার দিকে তাকিয়ে দূরে সরে গেলো। ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়ছে।
” চল জামাকাপড় গুলো নিচে দিয়ে আসি। তারপর আবার আসবো ছাদে।”
কথাগুলো বলতে বলতেই দু’জন একসাথে সমস্ত জামাকাপড় হাতে নিতে শুরু করেছে। বৃষ্টি থেকে থেকে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সিঁড়ির দিকে এগোলো দু’জন।
” আবার কেন?”
” ভিজবো দু’জন। ”
তাহমি মুচকি হাসলো। সহনকে ওখানে দাঁড় করিয়ে রেখে নিজেই সবগুলো জামাকাপড় ঘরে রেখো এলো চট করে। সহন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাহমি আসার অপেক্ষা করছে। বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। সাথে ঝোড়ো হাওয়া বইছে। মিনিট পাঁচেকের মধ্যে তাহমি এলো। সহন কিছু না বলে তাহমিকে কোলে তুলে নিয়ে ছাদের দিকে এগোচ্ছে। ছাদের মাঝখানে এসে দাঁড়াল। বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে দু’জনের গায়ে।

চলবে,