#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️🩹 [পর্ব-০২]
~ আফিয়া আফরিন
বৃদ্ধের আকুল আর্তনাদ শুনে ইয়াজিদ মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। তারপর সম্বিৎ ফিরতেই সে দ্রুত এগিয়ে এসে লোকটাকে আগলে নেয়। শশব্যস্তে বলে, “চাচা, চাচা শান্ত হোন! কী হয়েছে আপনার?”
এই বৃদ্ধ মানুষটি বিশাল রুপচারু ভিলা’র মালিক শওকত চৌধুরী। ভদ্রলোক একাই থাকেন এখানে। কিন্তু এই মুহূর্তে উনার জরাজীর্ণ অবস্থা দেখে ইয়াজিদ ভেতরে ভেতরে ভীষণ খটকা খেল। সে কিছুতেই হিসাব মেলাতে পারছিল না! এই বাড়ির মালিকের সাথে ওই খিটখিটে মেয়েটার কী সম্পর্ক? হ্যাঁ মেয়েটাকে বড্ড খিটখিটে আর নিষ্ঠুর প্রকৃতির’ই মনে হয়েছে। ভদ্রলোক ওভাবে আকুল হয়ে, কান্নাভেজা গলায় ‘মা মা’ করে ডাকলেন, তবুও মেয়েটা একবার পেছন ফিরে তাকাল না! কেমন অভদ্রের মতো, পাথরের মতো শক্ত হয়ে চলে গেল!
ইয়াজিদ শওকত চৌধুরীকে আলতো করে ধরে ভেতরের ঘরে এনে বসাল। এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি এনে ওনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “চাচা, একটু পানি খান। প্লিজ, নিজেকে একটু শান্ত করুন। এই বয়সে এত উত্তেজনা আপনার শরীরের জন্য একদম ঠিক না।”
শওকত চৌধুরী কাঁপাকাঁপা হাতে পানির গ্লাসটা নিলেন। এক চুমুক পানি খেয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, যা নিস্তব্ধ সন্ধ্যায় বেশ ভারী শোনাল। তিনি শূন্য দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন ওনার চারপাশের পৃথিবীটা থমকে গেছে। ইয়াজিদ বিষয়টা নিয়ে খুব বেশি আগ্রহ দেখাতে চাইল না। ভাবল, অন্যের পারিবারিক বিষয়ে হুট করে নাক গলানো ঠিক হবে না। তাই সে চুপ করেই রইল। শওকত চৌধুরী নিজেই গ্লাসটা টেবিলের ওপর রেখে শূন্যে হাত বাড়িয়ে ভাঙা গলায় বলতে লাগলেন, “দেখলে বাবা? চোখের সামনে দিয়ে চলে গেল। একবার… একটা বারের জন্যও আমার দিকে ফিরে তাকাল না। এতটা ঘৃণা ও বুকে পুষে রেখেছে?”
চাচার বুকফাটা হাহাকার আর আফসোস মাখা কথা শুনে ইয়াজিদ নিজের কৌতূহল চেপে রাখতে পারল না। জিজ্ঞেস করল, “চাচা, কিছু মনে করবেন না। কিন্তু… উনি আসলে কে?”
শওকত চৌধুরী দুই হাতে নিজের মুখটা ঢাকলেন। ওনার আঙুলের ফাঁক গলে নোনা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। এরপর মাথা তুলে ভেজা চোখে ইয়াজিদের দিকে তাকিয়ে রুদ্ধশ্বাসে বললেন, “ও আমার রুপু… আমার একমাত্র অভিমানী মেয়েটা!”
ইয়াজিদ প্রচণ্ড অবাক হয়ে পিঠ সোজা হয়ে বসল! অবিশ্বাস্য গলায় বলল, “আপনার মেয়ে? মানে… আপনার নিজের মেয়ে?”
শওকত চৌধুরী ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা নাড়লেন। ওনার চোখের কোণ দিয়ে আবার নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে শ্লেষ জড়ানো গলায় বললেন, “হ্যাঁ বাবা, আমার নিজের মেয়ে। সেই যে বছর আটেক আগে এক অভিমানে ও আমার কাছ থেকে দূরে চলে গিয়েছিল, তারপর থেকে আমি ওর জন্য চাতক পাখির মতো পথ চেয়ে বসে আছি। মাঝে শুধু পাঁচ বছর আগে মাত্র তিনদিনের জন্য ওকে একটু চোখের দেখা দেখতে পেয়েছিলাম। ও যখন এসেছিল, আমি ভেবেছিলাম আমার বুক খালি করে যাওয়া রুপু বোধহয় এবার চিরতরে আমার বুকেই ফিরে এসেছে, ও আর কোথাও যাবে না। কিন্তু না বাবা! তিনদিন পর কাউকে একটা শব্দও না বলে, ও আবার চলে গেল। এতটা রাগ, এতটা ক্ষোভ পুষে রেখেছে!” ভদ্রলোক বুকফাটা হাহাকার নিয়ে ইয়াজিদের হাতটা আঁকড়ে ধরলেন, “দোষ না করেও আমি নিজের মেয়ের কাছে সবচেয়ে বড় অপরাধী হয়ে গেছি, ইয়াজিদ। ও আমাকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে রেখেছে। বছরের পর বছর পার হয়ে যাচ্ছে, অথচ আমাকে কোনো রায় দিচ্ছে না; না মৃত্যুদণ্ডের, না যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের! এই ঝুলন্ত অনিশ্চয়তা আর অপরাধবোধের চাবুক মেরে রুপু আমাকে তিল তিল করে মারছে। এরচেয়ে ও যদি আমাকে একটা চূড়ান্ত শাস্তি দিয়ে দিত, তাহলেও হয়তো আমি শান্তি পেতাম বাবা!”
ইয়াজিদ নির্বাক হয়ে ওনার দিকে তাকিয়ে রইল। যে মেয়েটা একটু আগে তার হারিয়ে যাওয়া কলিজার টুকরোকে এত মমতায় আগলে রেখে নিজের দায়িত্বে পৌঁছে দিয়ে গেল, সেই মেয়েটাই নিজের বাবার প্রতি কতটা নির্মম, কতটা পাথরের মতো কঠোর হতে পারে; তার হিসাব ইয়াজিদ কিছুতেই মেলাতে পারছিল না।
শওকত চৌধুরী আর কিছুই বললেন না। ভারী শরীরটা নিয়ে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালেন। ওনার কাঁধ দুটো যেন অদৃশ্য কষ্টের বোঝায় নুয়ে পড়েছে। ইয়াজিদ নির্বাক হয়ে তার গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইল। সবসময় সোজা দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে আজ বড্ড ভঙ্গুর লাগছে।
ইয়াজিদের কাছে তো রুপাঞ্জনার ফোন নম্বরটা আছে! সে চাইলেই এখন নম্বরটা শওকত চৌধুরীকে দিতে পারত। কিন্তু পরক্ষণেই ইয়াজিদ নিজেকে থামাল। ভাবল, তাদের দীর্ঘ পারিবারিক কলহ আর ভেতরের জটিলতা সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। এখানে ভালো করতে গিয়ে নিজের অজান্তেই সে উল্টো আর কোনো ঝামেলা পাকিয়ে ফেলবে না তো? অন্যের ব্যক্তিগত ও স্পর্শকাতর বিষয়ে হুট করে নাক গলানো বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাই নম্বর দেওয়ার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে ইয়াজিদ নিজের ফ্ল্যাটের দিকে পা বাড়াল। ঘড়ির কাঁটা পেরিয়ে গেছে অনেকটাই, মেয়েটা বাবার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে। সমস্ত চিন্তাভাবনা আপাতত একপাশে সরিয়ে রেখে ইয়াজিদ দ্রুত ঘরে ফিরে এলো।
.
‘রুপচারু ভিলা’ থেকে বেরিয়ে আসার পর রুপাঞ্জনার অবস্থা জীবন্ত লাশের মতো হয়ে গেল। তার নিজের বর্তমান বাড়িটা বেশ দূরে, শহরের অন্য এক প্রান্তে। পুরোটা পথ কীভাবে রিকশায় করে ফিরে এসেছে, তা নিজেও জানে না। চেনা শহরের চেনা রাস্তাগুলোকেও বড্ড অচেনা আর দীর্ঘ মনে হচ্ছিল।
যখন ও নিজের বাড়ির দরজায় এসে পৌঁছাল, তখন ভেতর থেকে পুরোপুরি বিধ্বস্ত। অথচ বাইরে থেকে ওকে দেখে বোঝার সাধ্য নেই যে বুকের ভেতর কতটা প্রলয়ংকরী ঝড় বয়ে গেছে। রুপাঞ্জনা সহজে ভেঙে পড়ার মতো মেয়ে নয়। দীর্ঘ পাঁচটা বছর একলা লড়েছে, নিজেকে পাথরের মতো শক্ত করে গড়ে তুলেছে। হাজারো কষ্টে, অপমানে আর অবহেলাতেও যে মেয়েটা সহজে চোখের পানি ফেলে না, আজ সেই তার ভেতরের সব আত্মবিশ্বাস চুরমার হয়ে যাচ্ছে। বাবার আকুল আর কান্নায় ভাঙা কণ্ঠস্বর, “মা রূপু… একটিবার ফিরে আয় মা…” এখনও তার কানের পর্দায় তীরের মতো বিঁধছে।
রুমে ঢুকে দরজাটা লক করেই রুপাঞ্জনা দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে স্লাইড করে বসে পড়ল। তীব্র অভিমানে এক ফোঁটা জলও চোখ গলে নামছে না। অথচ বুকের ভেতরটা নিদারুণ শূন্যতায় খাঁ খাঁ করছে। রুপাঞ্জনা দুই হাঁটুতে মুখ গুঁজে শক্ত করে নিজেকে চেপে ধরল। কেন গেল সেই বাড়িতে? কেন তার অবাধ্য পা দুটো তাকে আবার সেই সরোবরের তীরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল? যে অতীতকে সে আট বছর আগে জ্যান্ত কবর দিয়ে এসেছে, আজ কেন সেই অতীতের মুখোমুখি হতে হলো তাকে? আজ এত বছর পর নিজের বাবাকে ওভাবে জরাজীর্ণ আর ভঙ্গুর অবস্থায় দেখেও সে কেন একটুও গলে গেল না? কেন তার বুকের ভেতরের পাথরটা আরও বেশি ভারী হয়ে উঠল? তীব্র মানসিক যন্ত্রণায় রুপাঞ্জনার সমস্ত শরীর কাঁপতে লাগল, অথচ সে কাঁদতেও পারছে না। ভাঙা কাচের ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার চেয়েও অনুভূতিটা অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক মনে হচ্ছে।
রাতের ভয়াবহ মানসিক ঝড় পার করে, সকাল হতেই রুপাঞ্জনা নিজেকে আবার সামলে নিল। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মলিন চেহারাটা ধুয়ে, চুলে টানটান খোঁপা বাঁধল। নিজেকে সে কোনোভাবেই ভেঙে পড়তে দেবে না। ঘর থেকে বের হয়ে প্রতিদিনের চেনা গন্তব্যের দিকে পা বাড়াল। রুপাঞ্জনা বাসার পাশেই একটা প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষিকা। জীবনের দীর্ঘ চলতি পথে রুপাঞ্জনা অনেক বড় বড় কর্পোরেট চাকরির অফার পেয়েছিল। সবকটাই ছিল ভালো মানের এবং অনেক উচ্চপদের চাকরি। এমনকি শিক্ষাগত যোগ্যতা আর মেধার কারণে সুযোগ এসেছিল দেশ ছেড়ে স্থায়ীভাবে দেশের বাইরে চলে যাওয়ার। কিন্তু মোহ আর লোভনীয় সুযোগ একপাশে সরিয়ে রেখে, সে পরম আগ্রহে বেছে নিয়েছে সাধারণ শিক্ষকতা পেশাকে। এর পেছনে কোনো আফসোস নেই বরং এটাই রুপাঞ্জনার জীবনের একমাত্র মানসিক শান্তির জায়গা!
তবে এই ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে আছে বুক কাঁপানো দীর্ঘশ্বাস। রুপাঞ্জনা আসলে নিজের হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে এই ছোট ছোট নিষ্পাপ বাচ্চাদের মাঝে খুঁজে বেড়ায়। আর মাঝেসাঝে পেয়েও যায়! রুপাঞ্জনা ক্লাসরুমে পা রাখার সাথে সাথেই একঝাঁক কচি কণ্ঠের কোলাহল মুখরিত হয়ে উঠল। সব বাচ্চা একসাথে সোৎসাহে বেঞ্চ ছেড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, “গুড মর্নিং, মিস!”
বাচ্চাদের চিলতে রোদের মতো নিষ্পাপ হাসিমুখ আর সমস্বরের চিৎকার মুহূর্তের মধ্যেই রুপাঞ্জনার মনের সব মেঘ কেটে দিল। ওদের চঞ্চলতা, খুনসুটি আর নির্ভেজাল আনন্দের মাঝেই রুপাঞ্জনা প্রতিদিন নতুন করে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পায়। রাতের সব বিধ্বস্ততা ভুলে সে-ও মুখে মিষ্টি হাসি ফুটিয়ে বাচ্চাদের বলল, “গুড মর্নিং, মাই লিটল অ্যাঞ্জেলস! সবাই বসো।”
.
এদিকে সকাল হতেই ইয়াজিদের ঘরে এলাহী কাণ্ড শুরু হয়ে গেল। সকাল সকাল অফিস যাওয়ার জন্য হন্তদন্ত হয়ে রেডি হচ্ছে সে। ইয়াজিদ পেশায় একটি স্বনামধন্য বেসরকারি ব্যাংকের ব্রাঞ্চ ম্যানেজার। ব্যাংকের গুরুগম্ভীর দায়িত্ব, পরিপাটি হয়ে থাকা আর সারাক্ষণ নিয়মের মধ্যে চলাটা তার অভ্যাসে পরিণত হলেও, ঘরের ভেতর সে একদম উল্টো!
বিশেষ করে আজ রেডি হওয়ার সময় হাতের কাছে কোনো জিনিসই খুঁজে পাচ্ছে না। ঘড়ির কাঁটা তরতর করে এগিয়ে চলেছে, অথচ ইয়াজিদের খোঁজ চলছেই। টাই পাওয়া গেল তো শার্ট উধাও, আবার কষ্টমষ্টে শার্ট খুঁজে বের করল তো প্যান্টের হদিস নেই! আর এসবের পেছনে কার কারসাজি, তা ইয়াজিদের খুব ভালো করেই জানা। ছোট্ট হিয়া বুড়ির কাজ এগুলো। সারাদিন টো টো করে সারা ঘরের মধ্যে ঘুরঘুর করবে, আর নিজের খুশিমতো বাবার টাই, বেল্ট, রুমাল সব টেনেটুনে এদিক-ওদিক ফেলে দিয়ে ঘর এলোমেলো করে রাখবে।
সব হারিয়ে বিরক্ত হয়ে ইয়াজিদ ঘর থেকে এলাহী ডাক ছাড়ল, “মা! ও মা… আমার নেভি ব্লু টাইটা দেখেছ? কোথাও পাচ্ছি না তো!”
নাজমা বেগম রান্নাঘরে ছেলের জন্য পরোটা ভাজছিলেন। ছেলের মরণ-ডাক শুনেও ইচ্ছে করেই কোনো জবাব দিলেন না, যেন শুনতেই পাননি। মনে মনে ভাবলেন, ‘এই হয়েছে আমার এক ছেলে! সারাক্ষণ মা ওটা কোথায়? মা সেটা কোথায়? শুরু হয়ে যায়। এই বুড়ো বয়সে ছেলের এই নিত্যদিনের খোঁজাখুঁজির যন্ত্রণা আর ভালো লাগে? একটা বিয়েথা করে বউ আনলেই তো পারে, তাহলে মায়ের আর এই ঝক্কি পোহাতে হয় না!’
ইয়াজিদ আবার ঘর থেকে চিল্লিয়ে বলল, “কী হলো মা, কথা বলছ না কেন?”
নাজমা বেগম খুন্তি হাতে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে এলেন। কোমরে হাত দিয়ে কপালে কুঁচকে ছেলের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে বললেন, “ষাঁড়ের মত চিল্লাস কেন শুনি? আমি কি তোর টাইয়ের পাহারাদার? ব্যাংকে গিয়ে তো বড় বড় ফাইল ঠিকই খুঁজে পাস, আর ঘরের এক ইঞ্চি টাই চোখে পড়ে না? বলি, একটা বিয়ে করে বউ ঘরে আনলেই তো পারিস! বউ থাকলে কি আর সকাল সকাল মাকে এভাবে ডাক ছাড়তে হতো? সে-ই সব গুছিয়ে তোর হাতের কাছে এনে দিত। কিন্তু না, নবাবপুত্তুর তো আমার বিয়ে করবেন না!”
মায়ের কথা শুনে ইয়াজিদ কপাল চাপড়াল। এই এক মা তার, সুযোগ পেলেই হলো, যেকোনো কথার সুতো ধরে টেনেটুনে সেই বিয়ের পিঁড়িতে এনেই দাঁড় করাবে! সে মায়ের দিকে তাকিয়ে অসহায় আত্মসমর্পণ মার্কা হাসি দিয়ে বলল, “মা, সকাল সকাল প্লিজ শুরু করো না তো! এমনিতেই লেট হয়ে যাচ্ছে।”
নাজমা বেগম ছেলের মলিন মুখের দিকে তাকিয়ে আর কথা বাড়ালেন না। মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন ছেলের নাশতা রেডি করতে। মা চোখের আড়াল হতেই ইয়াজিদ ঘরের দরজাটা আলতো করে ভিজিয়ে দিল। ভেতরের চঞ্চল পরিবেশটা কেমন নিঝুম হয়ে এলো। ইয়াজিদ প্যান্টের পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করল। ভেতরের গোপন পকেট থেকে বের করে আনল একটা ছোট্ট, যত্নে রাখা ছবি। তানিয়ার ছবি! ছবির তানিয়া আগের মতোই মিষ্টি করে তাকিয়ে আছে যেন এইমাত্র বলে উঠবে, ‘এই যে ব্যাংকার সাহেব, আজকেও টাই খুঁজে পাচ্ছ না, তাই তো?’
ইয়াজিদ ছবির ওপর আলতো করে বুড়ো আঙুলটা বোলাল। বলল, “কেন যে এত তাড়া ছিল তোমার? কেন এভাবে মাঝপথে আমাকে একলা ফেলে চলে গেলে তুমি? দেখছ তো, তোমার মেয়েটা প্রতিদিন কেমন হুলস্থুল বাধায় ঘরে! তুমি থাকলে কি আজ মা আমাকে এভাবে বিয়ের কথা বলে খোঁচাতে পারত? তুমি ছাড়া যে ইয়াজিদের জীবনে দ্বিতীয় কোনো নারীর আসার অধিকারই নেই, এটা কেন কেউ বুঝতে চায় না তানিয়া?” ইয়াজিদ আবার ছবিটা সযত্নে মানিব্যাগে লুকিয়ে ফেলল। তানিয়া নেই, কিন্তু ওর রেখে যাওয়া ভালোবাসা আর হিয়াই ইয়াজিদের পুরো পৃথিবী!
টাইটা কোনোমতে খুঁজে পেয়ে ইয়াজিদ ডাইনিং টেবিলে এসে খেতে বসল। নাজমা বেগম গরম পরোটা আর ডিম ভাজি সামনে এগিয়ে দিলেন। ইয়াজিদ মুখে প্রথম লোকমাটা তুলতেই নাজমা বেগম পাশ বসে সুযোগ বুঝে আবার সুর তুললেন, “বাবা, কালকে একটা মেয়ে দেখেছিলাম। দেখতে কিন্তু বেশ…”
ইয়াজিদ মুখের খাবারটা কোনোমতে গিলে চেহারায় চরম বিরক্তি ফুটিয়ে বলল, “মা প্লিজ! সকাল সকাল খাওয়াটার মাঝে অন্তত এই আলাপটা তুলো না।”
নাজমা খুন্তিটা টেবিলের ওপর একটু জোর দিয়েই রাখলেন। ওনার চোখে-মুখে ক্ষোভ আর অভিমান স্পষ্ট। চড়া সুরে বললেন, “কেন? কেন প্লিজ? আমি মরার পর তোর মেয়েটাকে কে দেখবে রে? তোর মেয়েটা মা ছাড়া বড় হচ্ছে, তুই চাকরির চক্করে সারাদিন বাইরে বাইরে থাকিস, ঠিকমতো তোকে কাছে পায় না ও। এভাবে একটা বাচ্চা বড় হতে পারে?”
ইয়াজিদ মায়ের হাতটা আলতো করে ছুঁয়ে শান্ত গলায় বলল, “তুমি আছ তো মা। তুমি থাকতে হিয়ার আর কার অভাব?”
নাজমা বেগম আরও রেগে গেলেন। হাতটা ঝটকা দিয়ে সরিয়ে নিয়ে বললেন, “আমি আর তোর মেয়েকে দেখতে পারব না, ব্যস! অনেক ধকল গেছে আমার ওপর দিয়ে। তুই এবার তোর মেয়েরে নিয়ে যেখানে খুশি চলে যা, আমি আর এই বুড়ো বয়সে ঝক্কি সামলাতে পারছি না!”
মায়ের কৃত্রিম রাগ আর অভিমান দেখে ইয়াজিদ মনে মনে হাসল। সে জানে, মা হিয়াকে কলিজা দিয়ে ভালোবাসে। তাই সে পরোটার টুকরোটা মুখে দিয়ে হেসে বলল, “আচ্ছা মা, তুমিই বলো তো আমাকে এই বুড়ো বয়সে কোন মেয়ে বিয়ে করবে, হ্যাঁ? একে তো এক মেয়ের বাপ আমি! তার ওপর বিপত্নীক, নিজের চালচুলোও নেই! এই ভাঙা কপালে কে আসবে, শুনি?”
নাজমা বেগম ছেলের কথা শুনে চোখ কপালে তুললেন, “কী বললি? তুই বুড়ো? এক মেয়ের বাপ দেখে কি তোর যোগ্যতা কমে গেছে? তোর মতো হিরের টুকরো ছেলের জন্য মেয়েরা লাইনে দাঁড়াবে, বুঝলি?”
মা-ছেলের কথার মাঝেই ওপাশ থেকে হিয়া বুড়ি চোখ ডলতে ডলতে আদো গলায় “পাপা” বলে ডাক দিল। মেয়ের কণ্ঠ শুনে ইয়াজিদ সব রাগ-অভিমান ভুলে মুহূর্তে হেসে ফেলল। দুই হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “এসো মা, পাপার কোলে এসো।”
হিয়া চোখ ডলতে ডলতে এগিয়ে এলো। বাবার কোলে উঠেই ভূমিকা ছাড়া সোজা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, “পাপা, আমাল একটা মাম্মাম লাগবে।”
ছোট্ট বাচ্চার মুখে এমন আকস্মিক আবদার শুনে ইয়াজিদের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। টেবিলের ওপাশে বসা মায়ের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল। তারপর একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস ফেলে অসহায় গলায় মাকে বলল, “এসব তোমার কারসাজি, তাইনা মা? তুমিই সকাল সকাল মেয়েটার মাথায় এসব ঢুকিয়েছ!”
নাজমা বেগম ছেলের অবান্তর অভিযোগে আকাশ থেকে পড়লেন। খুন্তিটা ছেলের দিকে তাক করে চড়া সুরে বললেন, “আচ্ছা? তোর মেয়ের মা লাগবে, সেটাও আমার কারসাজি? বাহ রে বাহ! একটা অবুঝ বাচ্চা নিজের একাকিত্ব থেকে মায়ের অভাব বুঝতে পারছে, আর তুই দোষ দিচ্ছিস আমার? তোর মেয়ের যে একটা মা দরকার, এটা বোঝার জন্য কি আমার শিখিয়ে দেওয়া লাগে? মুখপোড়া ছেলে কোথাকার!”
মায়ের ঝাঁঝালো কথার পর ইয়াজিদ আর সেখানে দাঁড়িয়ে তর্ক করার সাহস পেল না। ঘড়ির কাঁটাও জানান দিচ্ছে অফিসের সময় পার হয়ে যাচ্ছে। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, ঘড়িটা হাতে পরে মানিব্যাগ আর ফাইলপত্র তুলে নিল। যাওয়ার আগে হিয়ার কপালে আলতো করে একটা চুমু দিয়ে নাজমা বেগমের উদ্দেশ্যে বলল, “মা, ওকে দেখো। আমি আসছি।”
ইয়াজিদ হনহন করে দরজা খুলে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল।
ছেলে চোখের আড়াল হতেই নাজমা বেগমের মুখের রাগী ভাবটা কর্পূরের মতো উড়ে গেল। দরজার দিকে তাকিয়ে এক হাত কোমরে রেখে অস্ফুট স্বরে বললেন, “হুহ্! মুখপোড়া ছেলে আমার, তুই বিয়ে করবি না মানে? তোর ‘না’ কে ‘হ্যাঁ’ কীভাবে করাতে হয়, তা নাজমা বেগমের খুব ভালো করেই জানা আছে। তোর অজান্তেই এমন এক পাত্রী তোর ঘাড়ে এনে ফেলব যে তুই বাছাধন ‘উঁ’ করারও সুযোগ পাবি না! তোর বিয়ে আমি করিয়েই ছাড়ব, দেখে নিস!”
.
.
.
চলবে…

