Home "ধারাবাহিক গল্প বাউন্ডুলে ঘুড়ি বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০১

বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০১

0
222

#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️‍🩹 [সূচনা পর্ব]
~ আফিয়া আফরিন

মা আবার পাত্রী দেখছে, অথচ ইয়াজিদের ইচ্ছেই নেই দ্বিতীয়বার বিয়ে করার। তানিয়া তো ছিলই জীবনে! ওর আস্ত একটা স্মৃতি আছে, তা নিয়েই সুন্দর এক জীবন কাটিয়ে দেওয়া যায়। বয়সও তো কম না, ৩২ বছর। এই বয়সে আবার বিয়ে? হাহা, হাস্যকর! মা কেন যে এমন করে?
শপিংমলের ট্রলিটা ঠেলতে ঠেলতে ইয়াজিদ মনে মনে ভাবছিল এসব কথা। মাথায় সারাক্ষণ এই একটা চিন্তাই ঘুরপাক খায়। হঠাৎ খেয়াল হতেই পাশে তাকিয়ে বুক কেঁপে উঠল। চার বছরের ফুটফুটে মেয়েটা এতক্ষণ হাত ধরেই ছিল, এখন পাশে কেউ নেই! কখন যে হাত ছেড়ে কোথায় চলে গেছে, ইয়াজিদ টেরই পায়নি। মুহূর্তের মধ্যে ইয়াজিদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। চারপাশের কোলাহল ছাপিয়ে তার নিজের কণ্ঠটাই বোবা হয়ে গেল। কলিজার টুকরো মেয়েটা কোথায় গেল?
“হিয়া! মা, কোথায় তুমি?” শপিংমলের জাঁকজমকপূর্ণ ভিড়ের মাঝে দিশেহারার মতো চারদিকে তাকাতে লাগল ইয়াজিদ। হাতের শপিং ব্যাগ, ট্রলি সব একপাশে ফেলে দিয়ে পাগলের মতো কিডস কর্নারের দিকে ছুটে গেল। চারপাশের এত খেলনা আর চিলড্রেনস জোনের ভিড়ে চোখজোড়া শুধু মেয়েকে খুঁজছে। হন্যে হয়ে খুঁজতে খুঁজতে সে গলা চিরে ডাকতে থাকে, “হিয়া মা, মা! বাবা ডাকছে তোমায়। হিয়া, কোথায় তুমি?”

এদিকে রুপাঞ্জনা শপিংমলে এসেছিল নিজের কিছু জরুরি কেনাকাটা করতে। ব্যাগ হাতে একটার পর একটা শপ পার হওয়ার সময় আচমকা চোখ পড়ে ছোট্ট একটা বাচ্চার দিকে। বাচ্চাটা গোল গোল চোখে ইতিউতি তাকিয়ে ভয়ার্ত মুখে কাউকে খুঁজছে। রুপাঞ্জনা চারপাশটা ভালো করে দেখল, কিন্তু এইটুকুন বাচ্চার সাথে কোনো বড় মানুষকে দেখতে পেল না। আশঙ্কা নিয়ে ও বাচ্চাটার দিকে এগিয়ে এলো। একটু নিচু হয়ে পরম মমতায় মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ছোটো বাচ্চারা কেন এভাবে একলা ঘোরাফেরা করছে? তোমার আম্মু-আব্বু কোথায় মা?”

মেয়েটা ভীতি জড়ানো চোখে নিজের ছোট্ট হাতের আঙুল কামড়ে রুপাঞ্জনার দিকে তাকাল। ঠোঁট ফুলিয়ে কেঁদে ফেলার মতো করে আদো-আদো গলায় বলল, “পাপাতে খুঁজে পাচ্ছি না। পাপা তখনি হাত ছেড়ে কুথায় জেনো চলে গেল।”

রুপাঞ্জনার মনটা খারাপ হয়ে গেল। আলতো করে হিয়ার হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে চারদিকে তাকাতে লাগল। উপায় ন পেয়ে মেয়েটার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। ওর চোখের পানিটুকু আলতো করে মুছে দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “বাবু, তুমি তোমার মা-বাবার ফোন নাম্বার জানো?”

মেয়েটা মাথা দুই দিকে নেড়ে ঠোঁট উল্টে বলল, “নাআআআ।”

“আচ্ছা চলো, তোমার আম্মু-আব্বুকে খুঁজি।” বলে রুপাঞ্জনা ওকে কোলে তুলে নেয়। রুপাঞ্জনার গলা জড়িয়ে ধরে মেয়েটা বড় বড় চোখে তাকিয়ে বলল, “আমাল মা নাই। বাবাল সাথে এছেছি। মা তলে গেতে।”

রুপাঞ্জনা অবাক হয়ে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, “কোথায় গেছে?”

হিয়া আকাশের দিকে আঙুল তুলে বলল, “অনেক দুলে। দাদু বলেছে, আক্যাশে।”
ওর কথা শুনে রুপাঞ্জনার মনটা এক নিমেষেই ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। এইটুকুন একটা বাচ্চা, অথচ মাতৃহীন! বুকের ভেতর কেমন মোচড় দিয়ে উঠল তার। সে আর দেরি না করে হিয়াকে কোলে নিয়েই আশেপাশে ওর বাবাকে খুঁজতে লাগল। পুরো কিডস জোনটা হিয়াকে কোলে নিয়ে হন্যে হয়ে ঘুরে এলো, যদি দূর থেকেও কেউ বাচ্চাটাকে খুঁজতে খুঁজতে এগিয়ে আসে। কিন্তু অনেকক্ষণ পরেও কেউ এলো না! অবশেষে রুপাঞ্জনা দেরি না করে সোজা শপিংমলের ইনফরমেশন কাউন্টারের দিকে পা বাড়াল। ততক্ষণে মেয়েটা ভয় পেয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। চোখ দুটো লাল করে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। রুপাঞ্জনা কাউন্টারে গিয়ে অস্থির গলায় বলল, “এক্সকিউজ মি! এই বাচ্চাটা ওর বাবাকে খুঁজে পাচ্ছে না। শপিংমলের ভেতর কোথাও হারিয়ে গেছে। এখন কী করা যায় বলুন তো? একটু অ্যানাউন্স করার ব্যবস্থা করা যাবে?”

কাউন্টারের লোকটা রুপাঞ্জনার কোলছ মেয়েটাকে দেখেই চটপট বলে উঠল, “ম্যাম!” বলেই সে ড্রয়ার থেকে তড়িঘড়ি একটা কাগজ এগিয়ে দিল। লোকটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল, “এই মেয়েটাই বোধহয় ওর বাবার সাথে এসেছিল। ওর বাবা একটু আগে পাগলের মতো হন্যে হয়ে মেয়েকে খুঁজছিল। বাহিরে খুঁজতে যাওয়ার আগে আমাকে এই চিরকুটে ওনার নাম আর ফোন নাম্বার দিয়ে গেছেন, যেন মেয়েটার খোঁজ মিললে আমরা ওনাকে জানাই। আপনি কাইন্ডলি এই নাম্বারে একটু যোগাযোগ করুন।”

রুপাঞ্জনা হাফ ছেড়ে বাঁচল। কাগজটা হাতে নিয়ে দ্রুত বলল, “ওকে ওকে, আমি এখনই কল দিচ্ছি।”

কাউন্টার থেকে এগিয়ে এসে রুপাঞ্জনা মেয়েটাকে আরও শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ওর চোখের জল মুছে দিয়ে আদুরে গলায় বলল, “কান্নাকাটি করে না লক্ষ্মীটি। আমি তোমার বাবাকে ফোন দিচ্ছি। এখনই তোমার পাপা চলে আসবে।”

হিয়া রুপাঞ্জনার কাঁধে মাথা রেখে কান্নাভেজা গলায় আবদার করল, “পাপা যাবোওও।”

রুপাঞ্জনা ওর গালে চুমু খেয়ে সান্ত্বনা দিল, “হ্যাঁ, পাপার কাছেই নিয়ে যাবো তো সোনা।” বলেই সে হাতের ভাজ করা কাগজটা খুলল। সেখানে স্পষ্ট অক্ষরে লেখা আছে, ইয়াজিদ আহমেদ। 01756******

রুপাঞ্জনা নিজের ফোনটা বের করে ডায়াল করতে শুরু করল। ওপাশে রিং হতেই এক বুক উৎকণ্ঠা নিয়ে কেউ একজন ফোনটা রিসিভ করল। রুপাঞ্জনা শান্ত গলায় বলল, “হ্যালো, আপনি কি ইয়াজিদ আহমেদ বলছেন?”

ওপাশ থেকে দিশেহারা কণ্ঠ ভেসে এলো, “জি, আমি ইয়াজিদ। আপনি কে?”

রুপাঞ্জনা উত্তর দিল, “আমি রুপাঞ্জনা চৌধুরী। আমি আপনার মেয়ের খোঁজ দেওয়ার জন্য ফোন করেছি। ও একদম ঠিক আছে, আমার কাছেই আছে।”

মেয়ের খবর শুনতেই ওপাশে ইয়াজিদের যেন মৃতদেহে প্রাণ ফিরে এলো। সে হন্তদন্ত হয়ে প্রায় চিৎকার করে বলল, “কোথায় আছেন আপনি? দয়া করে তাড়াতাড়ি আমাকে বলুন! আমি এখনই আসছি, প্লিজ বলুন আপনি কোথায়?”

রুপাঞ্জনা ওপাশের আকুতি বুঝতে পারল কিন্তু সে কিছুটা গম্ভীর হয়ে বলল, “আপনাকে আসতে হবে না। আপনি বরং আমাকে আপনার বাড়ির ঠিকানাটা দিন, আমি নিজেই আপনার মেয়েকে পৌঁছে দিয়ে আসছি।”

ইয়াজিদ বলল, “কিন্তু আপনি কেন কষ্ট করবেন? আমি তো শপিংমলের আশেপাশেই আছি, এসে নিয়ে যাচ্ছি।”

রুপাঞ্জনা একটু কড়া আর চড়া সুরে বলল, “একটা ছোট্ট বাচ্চাকে শপিংমলে এনে এভাবে কেউ হারিয়ে ফেলে? আপনি কেমন বাবা বলুন তো? আপনার কাছে এইটুকুন একটা বাচ্চাকে একা ছাড়ার ভরসা কী, শুনি? আমি নিজেই ওকে বাসায় দিয়ে আসব, আপনি ঠিকানাটা দিন।”

ইয়াজিদ নিজের ভুল বুঝতে পেরে আর তর্ক করল না। লজ্জিত ও কৃতজ্ঞ গলায় বলল, “ঠিক আছে। আমার বাসা খিলগাঁওয়ে। খিলগাঁও চৌধুরী পাড়া, ৪ নং রোড, ১১ নং লেন। বাসার নাম ‘রুপচারু ভিলা’। ওখান থেকে আপনি সোজা একটা রিকশা নিয়ে পশ্চিমে আসবেন, তারপর ডানে একটা গলি…”

ইয়াজিদ ডিটেইলসে ঠিকানা বলেই যাচ্ছিল। কিন্তু এদিকে বাড়ির বাড়ির নামটা শোনামাত্রই রুপাঞ্জনা স্তব্ধ হয়ে গেল। হাত-পা জমে বরফ হয়ে গেল। ‘রুপচারু ভিলা’ এই নামটার সাথে যে জীবনের একটা বড় অতীত আর স্মৃতি জড়িয়ে আছে। রুপাঞ্জনা চমকে উঠে মনে মনে ভাবল, এও কি সম্ভব? তারপর বলল, “আসছি আমি।”

রুপাঞ্জনা হিয়াকে কোলে নিয়ে একটা রিকশা ডেকে উঠল। খিলগাঁও চৌধুরী পাড়ার উদ্দেশ্যে রিকশা চলতে শুরু করতেই হু হু করে ঠান্ডা বাতাস এসে লাগল গায়ে। অল্প সময়ের জার্নিতেই বাচ্চাটার সাথে রুপাঞ্জনার বেশ মিষ্টি ভাব জমে উঠল। বাচ্চাটার চঞ্চলতা আর আদো-আদো কথা রুপাঞ্জনার মনটাকে হালকা করে দিল। কোলে বসে মেয়েটা রুপাঞ্জনার গলার চেইনটা হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে নিজের থেকেই সব বলতে শুরু করল। রুপাঞ্জনা ওর চুলে হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা সোনা, তোমার নাম কী?”

হিয়া মাথা উঁচিয়ে বেশ জোর দিয়ে বলল, “হিয়া আহ্যমেদ!”

“বাহ্, খুব সুন্দর নাম তো! তা হিয়া মা কার কার সাথে থাকে বাসায়?”

হিয়া আঙুল গুনে গুনে বলতে লাগল, “পাপা থাকে, দাদু থাকে, আল ফুপি থাকে। ফুপি আমাল সাথে খেলে।”

“আচ্ছা বাবু, তোমরা এখানে কবে থেকে থাকো? অনেক দিন?”

হিয়া মাথা নেড়ে বলল, “নাহ্! ওটাতো আমাদেল নতুন বাছা। আমরা কিছুদিন হলো এছেছি।”
ও আচ্ছা! তারমানে ওরা হয়তো কোনো অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়েছে।
রিকশা ততক্ষণে চৌধুরী পাড়ার ৪ নং রোডে ঢুকে পড়েছে। রুপাঞ্জনার বুকের ভেতর অজানা উত্তেজনা টের পেতে লাগল।
রিকশা যখন রোডের মোড়টা ঘুরল, তখনই দূর থেকে রুপাঞ্জনার চোখে পড়ল ‘রুপচারু ভিলা’র গেটের কাছে একটা লোক অস্থির হয়ে পায়চারি করছে। ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় লোকটাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে এই সেই ইয়াজিদ আহমেদ। বয়স অনুযায়ী তার চেহারায় একটা পরিণত ও গম্ভীর ভাব থাকার কথা থাকলেও, এই মুহূর্তে মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার ধাক্কায় তা পুরো মলিন হয়ে গেছে। পরনে একটা সাধারণ শার্ট আর জিন্স, চুলগুলো উসকোখুসকো। চোখে-মুখে তীব্র অপরাধবোধ, ক্লান্তি আর আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। বউ চলে যাওয়ার পর হয়ত মেয়েটাই তার বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন, মেয়েকে হারানোর ভয়ে লোকটার অবস্থা জরাজীর্ণ; যেন এক নিমেষেই বয়স কয়েক বছর বেড়ে গেছে। হিয়া দূর থেকে পাপাকে চিনে ফেলল। এতক্ষণ রুপাঞ্জনার কোলে শান্ত হয়ে বসে থাকা মেয়েটা হঠাৎ রিকশার ওপরই লাফিয়ে উঠে দুই হাত বাড়িয়ে চিৎকার করে ডাকতে লাগল, “পাপা! পাপা!”

মেয়ের কণ্ঠস্বর কানে আসতেই ইয়াজিদ যেন নতুন জীবন ফিরে পেল। সে চারপাশের সবকিছু ভুলে এক ছুটে রিকশার দিকে এগিয়ে এলো। রিকশাটা থামার তর সইছিল না তার। ইয়াজিদ দুই হাত বাড়িয়ে হিয়াকে রিকশা থেকেই প্রায় ছিনিয়ে নিজের কোলে তুলে নিল। শক্ত করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে মেয়ের কপালে, গালে চুমু খেতে লাগল।

ততক্ষণে রুপাঞ্জনা রিকশা থেকে নেমে দাঁড়াল। বাবা-মেয়ের আবেগঘন পুনর্মিলনের মাঝে সে বিঘ্ন ঘটাল না। রিকশাওয়ালার ভাড়া মিটিয়ে তাকে বিদায় করে শান্ত হয়ে একপাশে দাঁড়াল। ইয়াজিদের রুপাঞ্জনার দিকে খেয়াল হতেই এক বুক কৃতজ্ঞতা আর অপরাধবোধ নিয়ে বলল, “থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ সো মাচ ম্যাডাম! আমার মেয়েটাকে নিরাপদভাবে এভাবে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আমি আপনাকে কীভাবে যে ধন্যবাদ দেব, ভাষা পাচ্ছি না।”

রুপাঞ্জনা তখনও কিছুটা গম্ভীর। সরাসরি ইয়াজিদের দিকে তাকিয়ে কড়া সুরেই প্রশ্ন করল, “এভাবে বাচ্চাটাকে একলা ছেড়ে দিয়েছিলেন কেন?”

ইয়াজিদ লজ্জিত মুখে মাথা নিচু করে বলল, “আসলে… আমি একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলাম।”

“তা ঠিক আছে, কিন্তু আপনার অন্যমনস্কতা আর উদাসীনতার ভুক্তভোগী এইটুকু একটা মেয়েকে কেন হতে হবে বলুন তো? বাচ্চা একটা মেয়ে! যদি কোনো আজেবাজে মানুষের নজরে পড়ত, তখন কী করতেন?”

ইয়াজিদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আপনি একদম ঠিক বলেছেন। আল্লাহর অশেষ রহমত যে ও আপনার মতো মানুষের কাছে এসেছিল। ম্যাডাম, প্লিজ একটু আমাদের বাড়িতে আসুন। ভেতরে আমার মা আছেন, সে-ও হিয়ার জন্য খুব চিন্তা করছিল। আপনি এলে ওনারও খুব ভালো লাগবে।”

রুপাঞ্জনা বলল, “আজকে আর যাব না। আমার একটু জরুরি কাজ আছে, দেরি হয়ে যাচ্ছে।”

ইয়াজিদ ইতস্তত করে বলল, “খুবই দুঃখিত, আমার কারণে আপনার অনেকটা সময় নষ্ট হয়ে গেল। বাট… অন্তত এক কাপ চা খেয়ে গেলে আমার নিজের কাছে ভালো লাগত।”

“আচ্ছা, আরেকদিন আসব!” রুপাঞ্জনা মিষ্টি করে হিয়াকে বলল, “টা-টা বাবু, ভালো থেকো।” এরপর হিয়াকে আদর করে বিদায় নিল।
রুপাঞ্জনা একটু এগিয়ে গিয়ে পেছনে ফিরে তাকাল, দেখল ইয়াজিদ ততক্ষণে হিয়াকে কোলে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেছে। চারপাশটা একটু ফাঁকা হতেই রুপাঞ্জনা ‘রুপচারু ভিলা’র মূল ফটকের কাছে এসে দাঁড়াল। বুকের ভেতর হু হু করে উঠল পুরনো দিনের কত শত স্মৃতিতে! দোতলার ছাদের এককোণে এখনও বাগানবিলাস ফুলগাছটা লতিয়ে ঝুলছে। রুপাঞ্জনা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। ছাদে এখনও আগের মতোই ফুলগাছগুলো সারিবদ্ধভাবে রয়েছে। ওগুলো কি মরে গেছে, নাকি কেউ ওগুলোর নিয়মিত যত্ন নেয়? ও চলে আসার পর গাছগুলোর কী অবস্থা হয়েছে, কে জানে! স্মৃতির অতল থেকে বাস্তবে ফিরল রুপাঞ্জনা। গেটের পাশে থাকা গার্ড সিকিউরিটি রুমে বসে ছিল। রুপাঞ্জনা গার্ডকে কিছু একটা বলল। তারপর ধীর পায়ে, অদ্ভুত অনুভূতি বুকে চেপে ‘রুপচারু ভিলা’র মূল ফটক দিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
এই ৭ তলা বাড়িটি সত্যি অপূর্ব স্থাপত্য। বিশাল জায়গা জুড়ে ঠিক মাঝখানটায় অবস্থিত বাড়িটি যেন নিজস্ব রাজত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পুরো আবাসনটি একটি গোল ব্র্যাকেটের নিখুঁত সীমানায় সীমাবদ্ধ, যা একে চারপাশের অন্য সব কোলাহল থেকে আলাদা করে রেখেছে। বাড়ির আশেপাশেও প্রচুর খোলা জায়গা। অবশ্য ফাঁকা জায়গা বললেও ভুল হবে, কারণ সবখানেই সবুজের সমারোহ; নানা জাতের গাছে গাছালিতে ছেয়ে আছে চারপাশ। আর পেছনদিকে রয়েছে ত্রিভুজ আকৃতির একটি চমৎকার জলাশয়। রূপাঞ্জনার কাছে একসময় তা ছিল সরোবর। ল্যাম্পপোস্টের আলো আর চাঁদের আভা সরোবরের শান্ত জলে প্রতিফলিত হয়ে অতীত মনে করাচ্ছে।

রুপাঞ্জনা হন্যে হয়ে বাড়ির পেছনদিকের সরোবরের আশেপাশে কিছু একটা খুঁজে বেড়াচ্ছিল। কখনো গাছের আড়ালে, কখনো অন্ধকার কোণায়; সবখানে ওর চোখজোড়া তৃষ্ণার্তের মতো কিছু হাতড়াচ্ছে।
আর পুরো বিষয়টাই ওপর থেকে জানালা দিয়ে পরখ করছিল ইয়াজিদ। সে ভীষণ অবাক হলো! উনি তো তৎক্ষণাৎ বিদায় নিয়ে বেরিয়ে গেলেন, তবে আবার এসেছেন কেন? আর এই নির্জন জায়গায় ওনার কী প্রয়োজন? অন্ধকার হলেও ল্যাম্পপোস্টের আলোয় রুপাঞ্জনা চৌধুরীকে স্পষ্ট দেখতে পারছিল ইয়াজিদ। মনে খটকা লাগল। বিষয়খণ্ডটা নিচে নেমে দেখা দরকার। উনি কে? দেখে তো ভালোমানুষ মনে হয়েছিল, তবে এই অদ্ভুত আচরণের মানে কী? ইয়াজিদ হিয়াকে নিজের মায়ের কাছে রেখে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল।
এদিকে রুপাঞ্জনাও কাঙ্ক্ষিত প্রয়োজনীয় জিনিসটা না পেয়ে চরম হতাশ হয়ে ফিরে আসছিল। বুকের ভেতর চাপা দীর্ঘশ্বাস। যখন মূল ফটকের কাছাকাছি এলো, তখনই বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা একজন ষাটোর্ধ্ব ভদ্রলোকের সাথে সরাসরি চোখাচোখি হলো। সেই মুহূর্তেই ইয়াজিদও ওপর থেকে নেমে সেখানে এসে দাঁড়িয়েছে। ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ ভদ্রলোক রুপাঞ্জনার দিকে তাকিয়ে রইলেন অবশ এবং কাঁপাকাঁপা দৃষ্টিতে। রুপাঞ্জনাও দেখল তাকে। অদ্ভুত ব্যাপার, চেনা মানুষকে এত বছর পর সামনে দেখেও ওর চোখে নোনা পানির বন্যা এলো না, বুকের ভেতর কিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেল না, এমনকি দীর্ঘদিনের জমানো অভিমানে পা দুটো থমকেও দাঁড়াল না। তীব্র শূন্যতা আর পাথর চাপা দেওয়া অনুভূতি নিয়ে রূপাঞ্জনা স্থির রইল। ভদ্রলোকের ঝাপসা দৃষ্টি আর আকুতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে পাশ কাটিয়ে হনহন করে বেরিয়ে এলো। কিন্তু মূল ফটকটা পার হতেই, পেছন থেকে বৃদ্ধের কান্নায় ভাঙা কণ্ঠস্বর রাতের নিস্তব্ধতা চিরে বাতাসে ভেসে এলো, “মা রূপু… মা, যাস না রে মা! একটিবার ফিরে আয় মা… মা…”
.
.

চলবে।
[কার্টেসি ছাড়া কপি করা নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ১৯৫০