#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️🩹 [পর্ব-০৪]
~ আফিয়া আফরিন
পরদিন সকালে যথারীতি একবুক ক্লান্তি আর একাকীত্ব নিয়ে ইয়াজিদ অফিসে পৌঁছাল। কাল রাতে হিয়ার মলিন মুখটা দেখার পর থেকে মনের ভেতর কেমন যেন একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। তবে কাদের প্রয়োজনে নিজের ডেস্কে বসার পর ব্যক্তিগত সব চিন্তা ঝেড়ে ফেলে ফাইলে মন দিল। ঠিক দুপুর নাগাদ ইয়াজিদের কেবিনের দরজায় নক পড়ল। পিয়ন এসে একটা ভিজিটিং কার্ড বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “স্যার, একজন ম্যাম আপনার সাথে দেখা করতে এসেছেন। ওনার নাম রাইসা ইসলাম।”
ইয়াজিদ কার্ডটার দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকাল। এই নামের কোনো ক্লায়েন্টের সাথে তো আজকে অ্যাপয়েন্টমেন্ট থাকার কথা নয়। সে ভেতরে আসার অনুমতি দিতেই সুগন্ধি ছড়িয়ে কেবিনে ঢুকল একজন আধুনিক তরুণী। ইয়াজিদকে ইশারায় বসতে বলে রাইসা নিজেই সামনের চেয়ারটা টেনে বসে পড়ল। কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াই বেশ চটপটে গলায় বলল, “হাই মিস্টার ইয়াজিদ! আমি রাইসা। আই থিঙ্ক, নাজমা আন্টি অলরেডি আমার কথা আপনাকে জানিয়েছেন? মানে ওনার কথামতোই আজ ডিরেক্ট আপনার অফিসে আসা।”
ইয়াজিদ মনে মনে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মায়ের যে এত বুদ্ধি, তা সে সত্যিই জানত না! অফিসে পাত্রী পাঠিয়ে দেওয়া একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব। ইয়াজিদ বিরক্তিটা আড়াল করে মুখে পেশাদারিত্বের এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটিয়ে বলল, “ও আচ্ছা, মা আপনাকে পাঠিয়েছেন। বসুন। তা কী মনে করে?”
রাইসা কাঁধের ব্যাগটা পাশে রেখে একটু গা এলিয়ে বসল। তারপর ইয়াজিদের কেবিনটার দিকে চারপাশ ঘুরে তাকিয়ে বলল, “আসলে আন্টি তো আমাদের ফ্যামিলির সাথে কথা বলেছেন। আই নো, আপনার একটা পাস্ট আছে, একটা মেয়েও আছে। টু বি অনেস্ট ইয়াজিদ, এই জেনারেশনে এসব কোনো বিগ ডিল না। আমি খুব প্র্যাক্টিক্যাল আর ক্যারিয়ার-ওরিয়েন্টেড মেয়ে। তাই ভাবলাম, ফ্যামিলিগত ফর্মালিটিজে যাওয়ার আগে আমাদের নিজেদের একটু আন্ডারস্ট্যান্ডিংটা ক্লিয়ার করে নেওয়া দরকার। রাইট?”
ইয়াজিদ রাইসার বসার ভঙ্গি আর কথা বলার ধরণটা খেয়াল করছিল। শান্ত গলায় বলল, “হুম, অবশ্যই। বলুন।”
রাইসা হাতের নখগুলো দেখতে দেখতে হালকা চালে বলল, “দেখুন, বিয়ের পর আমি আমার ক্যারিয়ার স্যাক্রিফাইস করতে পারব না। আর আন্টি বলছিলেন আপনার মেয়ের কথা… আই ডোন্ট মাইন্ড। তবে সত্যি বলতে, বাচ্চাদের ২৪ ঘণ্টা টেককেয়ার করা, ওদের পেছনে সারাদিন টাইম দেওয়া; এসব আমার পক্ষে পসিবল না। নিজেরটাই করতাম না, আর এত পরের বাচ্চা… আমার স্পেস আমার কাছে খুব ইম্পর্ট্যান্ট। বাচ্চার জন্য তো ডে-কেয়ার সেন্টার বা ভালো ন্যানি রাখাই যায়, তাই না? আজকাল সবাই সেটাই করে। এতে বাচ্চারও ডিসিপ্লিন শেখা হয়, আর আমাদের লাইফেও বার্ডেন থাকে না।”
বার্ডেন শব্দটা ইয়াজিদের কানে তীরের মতো বিঁধল। যে হিয়া তার কলিজার টুকরো, চোখের মণি; সেই হিয়াকে এই মেয়েটি দায়িত্ব এড়ানোর বস্তু হিসেবে ধরে নিয়েছে! রাইসা যে হিয়াকে কোনোদিনও মায়ের ভালোবাসা দিতে পারবে না, বরং আয়ার হাতে সঁপে দিয়ে নিজের আভিজাত্য বজায় রাখবে; তা ওর একটা কথাতেই স্পষ্ট হয়ে গেল। ইয়াজিদ চোয়াল শক্ত করল, তবে রাগ প্রকাশ করল না। অত্যন্ত স্বাভাবিক গলায় বলল, “আপনার চিন্তাভাবনা আসলেই অনেক আধুনিক মিস রাইসা। তবে আমার মেয়ে কোনো ডে-কেয়ার সেন্টারে বড় হয়নি, আর ওকে আমি কোনো আয়ার হাতেও ছেড়ে দিতে পারব না।”
“ও কাম অন ইয়াজিদ! আপনি বড্ড ইমোশনাল। প্র্যাক্টিক্যাল হোন। বাচ্চার মায়া কাটিয়ে নিজের লাইফটাও তো এনজয় করতে হবে, নাকি?”
ইয়াজিদ ডেসকের ওপর রাখা হিয়ার ছোট্ট হাসিমুখের ছবির দিকে তাকাল। তারপর রাইসার দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত মার্জিত গলায় বলল, “ধন্যবাদ মিস রাইসা, আপনার প্র্যাক্টিক্যাল ভিউসগুলো শেয়ার করার জন্য। আমি বিষয়টা নিয়ে ভাবব। আপাতত আমার একটা মিটিং আছে…”
রাইসা ইয়াজিদের চোখের ভেতরের কাঠিন্যটা পুরোপুরি বুঝতে পারল না। উঠে দাঁড়িয়ে হেসে বলল, “শিওর! আশা করি পজিটিভ কিছুই ভাববেন। বাই!”
রাইসা কেবিন থেকে বের হয়ে যেতেই ইয়াজিদ চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ দুটো বন্ধ করল। তার মনে দপ করে একটা জেদ চেপে বসল। নিজেকে কোনোমতে শান্ত করে টেবিল থেকে ফোনটা তুলে নিল এবং সরাসরি মাকে ফোন দিল। ওপাশ থেকে নাজমা বেগম কলটা রিসিভ করতেই ইয়াজিদ ভূমিকা না করে শক্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “মা, তুমি কি আমার মেয়েকে বোঝা ভাবছ? যদি তা-ই মনে হয়, তবে আমাকে পরিষ্কার করে বলে দাও। আমি আজকেই হিয়াকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে আলাদা কোথাও চলে যাব।”
ছেলের মুখে এমন কথা শুনে ওপাশে নাজমা বেগম থতমত খেয়ে গেলেন। বুকটা ওনার ধক করে উঠল, অজানা ভয়ে তিনি দস্তুরমতো কেঁপে উঠলেন। ইয়াজিদ যে তার কলিজার টুকরো আর হিয়াকে যে তিনি কতটা ভালোবাসেন, তা কেউ বলার অপেক্ষা রাখে না। তিনি বেশ ঘাবড়ে গিয়ে কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কেন বাবা? কী হয়েছে তোর? হুট করে এমন অলক্ষুণে কথা কেন মুখে আনছিস? হিয়া বুড়ি কি আমার পর? কী হয়েছে বলবি তো!”
ইয়াজিদ তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “কী হয়েছে জানতে চাও মা? তাহলে শোনো। তোমার পাঠানো অতি আধুনিক আর ওভার স্মার্ট মেয়ে রাইসা আজ সরাসরি আমার অফিসে এসেছিল। এসে সে আমাকে কী জ্ঞান দিয়ে গেল জানো? সে বিয়ের পর আমার হিয়া পাখির দায়িত্ব নিতে পারবে না। চার বছরের একটা বাচ্চার পেছনে সময় দিলে ওনার ক্যারিয়ারের ক্ষতি হবে! ওনার মতে, হিয়া নাকি ওনার লাইফে বাড়তি বোঝা! তাই বিয়ের পর হিয়াকে কোনো ডে-কেয়ার সেন্টারে কিংবা আয়ার হাতে ফেলে রাখতে হবে।”
নাজমা বেগম স্তব্ধ হয়ে গেলেন। ইয়াজিদ ওনার নীরবতা ভেঙে আরও ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলল, “যে মেয়ে বিয়ের আগেই আমার মাতৃহীন বাচ্চাটাকে নিজের জীবনের বোঝা ভাবছে, সে ঘরে এসে হিয়াকে কতটা অত্যাচার করবে, সেটা কি তোমার বুদ্ধিমান মাথায় একবারও আসেনি মা? শুধু আমার একাকীত্ব দূর করার জন্য তুমি এমন একটা পাথর মনের মেয়েকে আমার মেয়ের মাথায় মা বানিয়ে বসাতে চাচ্ছিলে? নিজের নাতনির জন্য তোমার একটুও মায়া হলো না?”
ছেলের মুখে এমন কঠিন অভিযোগ শুনে নাজমা বেগমের বুকের ভেতরটা ওলটপালট হয়ে গেল। নাতনির প্রতি মায়া নিয়ে ইয়াজিদ প্রশ্ন তুলবে, এটা তিনি স্বপ্নেও ভাবেননি। নিজের অজান্তেই চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এলো। আঁচল দিয়ে মুখটা চেপে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়া গলায় বললেন, “বাবা তুই এভাবে আমার কলিজাটা ছিঁড়ে ফেলিস না রে! আমি ভেবেছিলাম মেয়েটা বুঝি ভালো হবে। সে যে মনে মনে এত বড় বিষাক্ত ফন্দি নিয়ে বসে আছে, তা আমি কেমন করে বুঝব বল? আমি তো তোর ছন্নছাড়া জীবনটার দিকে তাকিয়ে আর হিয়া বুড়ির একটা আশ্রয়ের কথা ভেবে এই ভুলটা করে ফেলেছিলাম রে বাবা! আমার হিয়া বুড়ি আমার জানের জান ইয়াজিদ! ও কি শুধু তোর মেয়ে? ও তানিয়ার শেষ স্মৃতি। তুই শান্ত হ বাবা, একটুও মন খারাপ করিস না। আমি আজকেই বিয়ের সম্বন্ধ ভেঙে দিচ্ছি। তুই বাড়ি আয় বাবা, এসে দেখ মেয়েটা কেমন তোর জন্য পথ চেয়ে বসে আছে।”
মায়ের অকপট অনুশোচনা আর কান্নায় ভেজা কথাগুলো শুনে ইয়াজিদের ভেতরের চড়া রাগটা এক নিমেষেই জল হয়ে গেল। তাই নরম গলায় বলল, “আচ্ছা মা, তুমি কেঁদো না। আমি অফিসের কাজ শেষ করেই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরছি।”
ফোনটা রেখে নাজমা বেগম সোফায় ধপ করে বসে পড়লেন। মা মরা মেয়েটাকে কেউ কি করে বোঝা ভাবতে পারে, বুঝতে পারলেন না।
.
রূপাঞ্জনা সকাল সকাল ছুটে এসেছে সায়েমের বিশ্ববিদ্যালয়ে। যদি এখানকার পুরোনো নথিপত্রে সায়েমের অন্য কোনো ঠিকানার হদিস পাওয়া যায়! সাথে করে নিয়ে এসেছে পরিচিত এক বড় বোনকে। পুরোনো ফাইলগুলো ওলটপালট করতে করতে রূপু যখন সায়েমের নামের একটা ফাইলে হাত দিল, তখন পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মোহিনী আপু কৌতূহল সামলাতে না পেরে জিজ্ঞেস করল, “এই সায়েমটা আসলে কে?”
রূপাঞ্জনা ফাইলের পাতা থেকে চোখ না সরিয়েই বলল, “আমার হাজব্যান্ড।”
মোহিনী চমকে উঠল, “তোমার হাজব্যান্ড! তাহলে তুমি ওনাকে এইভাবে হন্যে হয়ে খুঁজছ কেন রূপা? খোঁজ জানো না?”
রূপাঞ্জনা বিষাদময় তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “জানলে কি আর এভাবে পাগলের মতো খুঁজে বেড়াতাম বলো? আজ আমার জীবনের অন্ধকারের পেছনে যা কিছু ঘটেছে, সব হয়েছে আমার বাবার চক্রান্তে!” কথাটা বলতে বলতে রূপুর চোখ দুটো ক্ষোভে আর যন্ত্রণায় জ্বলে উঠল।
“ঘটনা কি?”
রূপাঞ্জনা ফাইলটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরে পেছনের দিনগুলোর কথা মনে করে বলতে লাগল, “সায়েমের সাথে আমার সম্পর্ক অনেক আগের। কিন্তু আমার বাবা সম্পর্কটা কোনোদিনও মেনে নেননি। সায়েমকে ‘খারাপ ছেলে’, ‘উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে’ বলে বারবার আমার জীবন থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। একপর্যায়ে বাবা যখন আমার অমতে অন্য কোথাও বিয়ে ঠিক করল, তখন আমি উপায় না দেখে সায়েমের হাত ধরে ঘর ছেড়ে পালিয়ে যাই। সেই সিদ্ধান্তের জন্য আমার মনে আজ পর্যন্ত বিন্দুমাত্র কোনো আফসোস বা অনুশোচনা নেই আপু। ওই ঘটনার পর আমি বাবার মুখ পর্যন্ত দেখিনি, ওনার সাথে সব সম্পর্ক চুকিয়ে দিয়েছিলাম।”
রূপু থামল। চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা অশ্রু ফাইলের ওপর এসে পড়ল। গলাটা একটু পরিষ্কার করে আবার বলতে লাগল, “আজ থেকে বছর পাঁচেক আগের কথা। আমার বাচ্চা হওয়ার সময় হুট করে হাসপাতালের কেবিনে চোখ মেলতেই আমি বাবাকে দেখতে পেয়েছিলাম। তখন আমি তীব্র যন্ত্রণায় আধো-চেতন, আধো-অচেতনের মধ্যে ছিলাম। কিছুই মাথায় ঢুকছিল না যে বাবা সেখানে কীভাবে এল! তার দুদিন বাদে যখন আমার পুরোপুরি জ্ঞান ফিরল, তখন নার্সের মুখ থেকে শুনলাম আমার নাকি একটা ফুটফুটে সুন্দর মেয়ে হয়েছিল, কিন্তু জন্মের দুদিনেই মেয়েটা মারা গেছে!” কথাটা শেষ করতেই রূপুর গলার স্বর বুজে এলো। বুকের ভেতর এক সমুদ্র দুঃখ আর হাহাকার চেপে ধরে বলল, “সন্তান হারানোর তীব্র শোক বুকে নিয়ে আমি কাউকে কিছু না বলে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এসেছিলাম। মনে হয়েছিল সবকিছুর পেছনে আমার বাবার হাত আছে, সব দোষ তার! হাসপাতাল থেকে পালিয়ে এসে আমি আর সায়েমের খোঁজ পাইনি। আমাদের ভাড়া বাসাটা পুরো শূন্য পড়ে ছিল। সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত… আমি সায়েমকে খুঁজেই চলছি। আমার মন বলে ও আমাকে ধোঁকা দিতে পারে না। এর পেছনে নিশ্চয়ই বড় কোনো রহস্য লুকিয়ে আছে!”
মোহিনী রূপুর পিঠে হাত রাখল, “বাই দ্য ওয়ে রূপু, হোয়াটসঅ্যাপ ইজ ইয়োর রানিং এজ নাউ?”
রূপাঞ্জনা মৃদু স্বরে উত্তর দিল, “আঠাশ।”
মোহিনী কপালে হাত দিয়ে প্রায় আর্তনাদ করে ওঠার মতো গলায় বলল, “মাই গড! তখন তাহলে তোমার কত কম বয়স ছিল!”
রূপু উদাসীন গলায় বলল, “হুমম, বিশ।”
মোহিনী রূপুর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ঝাঁকুনি দিয়ে বলল, “তুমি ওই বয়সের আবেগটাকে এখনও নিজের ভেতরে এভাবে ধরে রেখেছ কেন? হাজব্যান্ডের খোঁজ করছ, সেটা ঠিক আছে; একজন মেয়ে হিসেবে আমি তোমার লড়াইটাকে সম্মান করি। কিন্তু তুমি তোমার বাবার সাথে দেখা করছ না কেন, আমাকে বলবে? তিনি যদি তখন কোনো অন্যায় বা অপরাধ করেও থাকেন, এতগুলো বছর পর তিনি নিশ্চয়ই তীব্র অপরাধবোধে ভুগছেন। মানুষটা বুড়ো হয়ে গেছেন রে রূপু! তাকে তুমি এভাবে শাস্তি দিচ্ছ? কেন দেখা করছ না?”
মোহিনীর যৌক্তিক প্রশ্নের বিপরীতে রূপাঞ্জনা উত্তর দিল না। পাথর বনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মুখে কিছু না বললেও মনের ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছিল। সে মনে মনে ভাবল, ‘বাবার সাথে দেখা করতে হলে যে আমাকে সায়েমকে খুঁজে পেতে হবে আপু! সায়েমকে সাথে না নিয়ে আমি বাবার সামনে গিয়ে দাঁড়ালে বাবার দেওয়া অপবাদগুলো যে আজীবনের জন্য সত্যি হয়ে যাবে। আমি তো শুধু সায়েমকে খুঁজছি না, আমি আমার বিশ বছরের ভালোবাসার পবিত্রতা আর জেদটাকেও খুঁজছি!’
.
অফিসের বিরক্তিকর অধ্যায় শেষে ইয়াজিদ যখন বাড়ি ফিরল, তখন তার মুখাবয়বে ক্লান্তির চেয়েও বেশি ছিল নীরবতা। সকালের রাইসা সংক্রান্ত ঘটনা নিয়ে বাড়িতে উচ্চবাচ্য করল না। মায়ের অপরাধী মুখটার দিকে তাকিয়ে হেসেছিল। যেন বলতে চেয়েছিল, ‘আমি জানি মা, তুমি আমার খারাপ চাওনি।’
হিয়া বুড়িকে খাইয়ে-দাইয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল। গতরাতের মন খারাপের পর হিয়া বাবাকে একমুহূর্তের জন্যও ছাড়েনি। পাপার চওড়া বুকের ওপর ছোট্ট হাত দুটো রেখে, চিবুকে নাক ঘষে ঘষে একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। হিয়া ঘুমিয়ে পড়ার পর ইয়াজিদ ওকে আলতো করে বিছানায় শুইয়ে দিল। চারপাশটা নিঝুম, নিস্তব্ধ। ঘরের ড্রিম লাইটের আবছা নীল আলোয় ইয়াজিদ আলমারির ড্রয়ার থেকে পুরোনো ডায়েরি বের করল, যার ভাঁজে পরম যত্নে লুকিয়ে রাখা তানিয়ার হাসিমুখের ছবিটা। ছবিটা হাতে নিতেই ইয়াজিদের চোখের কোণটা টলমল করে উঠল। তানিয়ার মায়াবী মুখের ওপর আলতো করে কাঁপাকাঁপা আঙুলগুলো বুলিয়ে দিল। ছবির তানিয়া আগের মতোই একরাশ আলো ছড়িয়ে হাসছে, যেন এখনই বলে উঠবে, ‘কী গো নবাব সাহেব? এত রাত পর্যন্ত জেগে আছ কেন?’
ইয়াজিদ ছবিটা বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরল। পেছনের সুন্দর, আবেগী মুহূর্তগুলো চোখের সামনে চলচ্ছবির মতো ভেসে উঠতে লাগল। তানিয়া থাকতে রাতগুলো এত নীরব অসহায় ছিল না। কত খুনসুটি, কত মিষ্টি মধুর ঝগড়া জড়িয়ে ছিল চার দেয়ালে! বৃষ্টির দিনে তানিয়ার জোর করে বানানো খিচুড়ি, ইয়াজিদের অফিসের লেট লতিফ স্বভাব নিয়ে কৃত্রিম রাগ, আর রাত জেগে দুজনে মিলে বারান্দায় বসে এক কাপ চা ভাগ করে খাওয়ার দিনগুলো… এই সেদিনের কথা! তানিয়ার ওড়না টেনে ধরা, আর ওর মিষ্টি করে বলা, ‘ধুর ছাড়ো তো, কেউ দেখে ফেলবে।’ বলে লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়ার মুহূর্তগুলো আজ শুধুই একলা রাতের দীর্ঘশ্বাস।
ইয়াজিদ ছবিটার দিকে আবার তাকাল। তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল তানিয়ার ছবির কাঁচের ওপর। বুঁজে আসা গলায় ফিসফিস করে বলে উঠল, “কেন চলে গেলে তানিয়া? তুমি তো জানতে, তোমাকে ছাড়া ইয়াজিদ একমুহূর্তও গুছিয়ে চলতে পারে না। তাহলে এত বড় দুনিয়ায় আমাকে এভাবে একা ফেলে যাওয়ার নির্মম সিদ্ধান্তটা কীভাবে নিলে?” সে হিয়ার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আবার ছবির দিকে চোখ ফেরাল। বুকচেরা হাহাকার নিয়ে বলল, “মেয়েটা যখন আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলে, ‘পাপা, আমাকে একটা মাম্মাম এনে দাও’, তখন কলিজাটা চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যায় তানিয়া। আমি কীভাবে বোঝাই, ওর মাম্মামের জায়গাটা নেওয়ার মতো ক্ষমতা এই পৃথিবীর কোনো নারীর নেই? আমাদের ছোট্ট পাখিটাকে কেউ বুকে টেনে নেবে না। তুমি ওপার থেকে একবার এসে দেখে যাও তোমার ভালোবাসার মানুষটা ভেতরে ভেতরে কতটা ছন্নছাড়া, কতটা নিঃস্ব হয়ে বেঁচে আছে!”
ইয়াজিদ ছবিটা পরম যত্নে ডায়েরির ভাঁজে রেখে দিল। বুকের ভেতর জমে থাকা ভারী কষ্টটা ঘরের চার দেয়ালে দমবন্ধ পরিবেশ তৈরি করছে। একটু খোলা বাতাসের আশায় সে বিছানা ছেড়ে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। রাতের শীতল হাওয়া গায়ে লাগল। শূন্য রাস্তায় চোখ রেখে যখন নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে, তখনই হঠাৎ নিচের অন্ধকারে একটা খসখস শব্দ হলো। ইয়াজিদ ভ্রু কুঁচকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। আবছা আলো-আঁধারিতে দেখল, কেউ একজন বাড়ির পেছনের দেয়াল ঘেঁষে, দক্ষিণ পাশের বাগানটার দিক থেকে গুটিগুটি পায়ে মেইন গেটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে!
এই মাঝরাতে ওদিকে কে যাবে? চোর নাকি? ইয়াজিদের মনে খটকা লাগল। সে দেরি না করে, নিজের ভেতরের অস্থিরতা সামলে দ্রুত ঘর থেকে বের হলো। সিঁড়ি বেয়ে নিঃশব্দে নিচে নেমে এলো। নিচে নেমে এপাশ-ওপাশ ভালো করে খুঁজল, কাউকেই দেখতে পেল না। এরপর হনহন করে মেইন গেটের দিকে এগিয়ে গেল। গেটের পাশে থাকা সিকিউরিটি গার্ডকে ডাক দিতে যাবে, তখনই মূল ফটকের বাইরের ল্যাম্পপোস্টের আবছা আলোয় চোখে পড়ল অবয়বটা। চোর নয়, একটা মেয়ে! গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে ওড়না দিয়ে চোখ মুছছে। ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলোয় মুখটা স্পষ্ট হতেই ইয়াজিদ চমকে উঠল। রূপাঞ্জনা চৌধুরী! পায়ের আওয়াজ পেয়ে রূপুও চট করে ঘুরে তাকাল। ব্যস, মাঝরাতের নিস্তব্ধতায় দুজনের চোখাচোখি হয়ে গেল। রূপুর চোখে পানি চিকচিক করছে, আর ইয়াজিদের চোখে বিস্ময়। ইয়াজিদ এগিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি? এত রাতে এভাবে চুপিচুপি চোরের মতো কী করতে এসেছিলেন এখানে?”
.
.
.
চলবে…
[কার্টেসি ছাড়া কপি করা নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ২১৬৭

