Home "ধারাবাহিক গল্প বাউন্ডুলে ঘুড়ি বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০৫

বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-০৫

0
167

#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️‍🩹 [পর্ব-০৫]
~ আফিয়া আফরিন

এমন তীক্ষ্ণ প্রশ্নে রূপাঞ্জনা প্রথমে থতমত খেয়ে গেল। পেছন ফিরে তাকাল। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ইয়াজিদকে চিনতে বিন্দুমাত্র সমস্যা হলো না। মাঝরাতের শুনশান রাস্তায় একজন পুরুষ মানুষের এমন সরাসরি চোর সম্বোধনটা রূপুর আত্মসম্মানে গিয়ে লাগল। সে ওড়না দিয়ে চোখের পানিটুকু তাড়াহুড়ো করে মুছে নিজেকে সামলে নিল। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় ইয়াজিদের দিকে তাকিয়ে চড়া গলায় বলল,
“মুখ সামলে কথা বলুন মিস্টার! দেখে কি আমাকে চোর মনে হচ্ছে আপনার? একটা মেয়েকে মাঝরাতে দেখেছেন বলেই সে চোরের মতো চুরি করতে এসেছে, আপনার কমন সেন্স এই বলে?”

ইয়াজিদ হাত দুটো বুকের ওপর বেঁধে আগের মতোই শক্ত গলায় বলল, “কমন সেন্স মাঝরাতে একটা মেয়েকে অন্যের বাড়ির পেছনের অন্ধকার বাগানে গুটিগুটি পায়ে হাঁটতে দেখলে চোর ছাড়া অন্য কিছু ভাবার অবকাশ দেয় না মিস। আর যদি চোর না-ই হন, তাহলে ওদিকের অন্ধকার কোণায় আপনি কী করছিলেন?”

রূপু চুপ হয়ে গেল। কী উত্তর দেবে? কি বলবে যে, এই বাড়ির দক্ষিণ পাশের বাগানে নিজের মেয়ের কবর খুঁজতে এসেছিল? কিভাবে বলবে যে ও শওকত চৌধুরীর মেয়ে, যে বাবার ওপর অভিমান করে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কাঁদছে? কীভাবে পারিবারিক কষ্টের কথা একজন অপরিচিত পুরুষের সামনে উগরে দেবে? রূপু নিজেকে শান্ত করে বলল, “আমি রাস্তায় হাঁটতে এসেছিলাম। বাতাস খাচ্ছিলাম। আর আপনাদের পেছনের দেয়ালের ওখান দিয়ে একটা বিড়াল যাচ্ছিল, ওটার আওয়াজ পেয়ে জাস্ট দেখতে গিয়েছিলাম। ব্যস! এর বেশি কিছু না।”

ইয়াজিদ শুষ্ক তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। বলল, “হাঁটতে এসেছিলেন? তাও রাত দুটোয়? আর অন্যের বাড়ির দেয়ালে বিড়াল দেখছিলেন? বাহ্! বেশ বানিয়ে বলতে পারেন তো। দেখুন, আপনি শওকত চাচার মেয়ে বলেই আমি ভদ্রভাবে কথা বলছি। চাচা ওদিকে মলিন মুখে আপনার জন্য দিনরাত অপেক্ষা করেন, আর আপনি এখানে মাঝরাতে বাড়ির চারপাশে এভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছেন? কাহিনী কি?”

ইয়াজিদের মুখে এ কথা শুনে রূপাঞ্জনা পুরো চমকে ওঠে। বুকের ভেতরটা ধক করে ওঠে। এই লোকটাকে সাথে বাবা কি বলেছে? কেনো বলেছে? রূপাঞ্জনা বিরক্ত হলেও নিজের ভেতরের আকস্মিক ঝড়টুকু বাইরে প্রকাশ পেতে দিল না। নিজেকে শক্ত করে ইয়াজিদের দিকে তাকিয়ে অবজ্ঞার সুরে বলল, “কাহিনী কী বা না কী, তা দিয়ে আপনার দরকার নেই মিস্টার। আমার বাবা কার জন্য অপেক্ষা করছেন, সেটা ওনার আর আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। মাঝরাতে রাস্তায় দাঁড়িয়ে একজন অপরিচিত পরপুরুষের কাছে আমি আমার জীবনের জবাবদিহি করতে বাধ্য নই।”

ইয়াজিদ রূপুর অতিরিক্ত অহংকার দেখে বলল, “অপরিচিত ভাবলে ভুল করবেন মিস রূপাঞ্জনা চৌধুরী। আপনি যে বললেন অপরিচিত মানুষের কাছে জবাবদিহি করবেন না; তা অপরিচিত মানুষের কাছে কেউ নিজের বাড়ির গোপন কথাবার্তা বা কাহিনী শেয়ার করবে না নিশ্চয়ই! কিন্তু আমি সব জানি। শওকত চাচা প্রতিদিন সন্ধ্যায় গেটের সামনে মলিন মুখে কার জন্য চাতক পাখির মতো চেয়ে থাকেন, সেটা এখন মোটামুটি এলাকার সবার জানা। অবশ্য আপনার মতো কঠিন মনের মেয়ের কাছে এসবের কোনো মূল্য নেই। যে মেয়ে জেদের বশে নিজের জন্মদাতা বাবাকে এভাবে তিলে তিলে শেষ করে দিতে পারে, তাকে লোকলজ্জা বা বাবার কষ্টের কথা আর কী বোঝাবো!”

বাবার প্রতি ইয়াজিদের সাফাই আর নিজের ওপর এমন চড়া অভিযোগ রূপু আর করতে পারল না। এত বছরের জমে থাকা কষ্ট আর অভিমান ক্ষোভে রূপ নিল। সে ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “নিষ্ঠুর আমি নই, নিষ্ঠুর আমার বাবা! যার চক্রান্তে আমার পুরো জীবনটা নরক হয়ে গেছে। আপনি বাইরের লোক, ওনার মলিন মুখের নাটক দেখে ওনাকে চেনার দাবি করবেন না। ওনার ভেতরের আসল রূপটা আপনি জানেন না।” বলেই রূপু আর সেখানে দাঁড়ানোর প্রয়োজন মনে করল না। চট করে ঘুরে হনহন করে অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। তখনই মাঝরাতের নিস্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে পেছন থেকে অতি পরিচিত ভাঙা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, “রূপু… দাঁড়া! তোর মেয়েকে না দেখে কোথায় চলে যাচ্ছিস মা? দেখবি না ওকে?”

বাবার মুখে ‘মেয়ে’ আর তাকে ‘দেখার’ কথা শুনতেই রূপুর পা দুটো ওখানেই মাটির সাথে জমে গেল। ও আর এক কদমও সামনে বাড়াতে পারল না। অবাধ্য শরীরটা অবশ হয়ে এলো। যে মেয়েকে দশমাস গর্ভে ধারণ করেও বুকে জড়িয়ে ধরতে পারেনি, যেই মেয়েকে চোখের দেখা দেখতে পারেনি, যেই মেয়ের শোকে আজো রাতে কেঁদে বালিশ ভেজায়, সেই মেয়ে? রুপু অনেক খুঁজেছে কিন্তু কবরটা পায়নি তাই হতাশ হয়ে ফিরে আসছিল।
এখন বাবার কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে ধীরে ধীরে পেছন ফিরে তাকাল। ল্যাম্পপোস্টের হলদেটে আলোয় দেখল, শওকত চৌধুরী গেটের একপাশে দাঁড়িয়ে আছেন। ওনার চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে।

রূপু নিজের ভেতরের সবটুকু শক্তি সঞ্চয় করে ফের পেছন ফিরে তাকিয়ে তীব্র অভিমান আর জেদ নিয়ে বলল, “তোমার মুখ থেকে এই কথা শোনার পরও তোমার সাথে আমি দেখা করব না। তোমার বাড়ির চৌকাঠ আমি মাড়াব না!”

শওকত চৌধুরী বুকভাঙা গলায় কেঁদে উঠে বললেন, “কেন মা? কেন দেখা করবি না?”

রূপু চোখের পানি মুছে চিবুক শক্ত করে বলল, “কারণ আমি একা তোমার সামনে দাঁড়াব না। যেদিন আমি সায়েমকে খুঁজে পাব, সেইদিন সায়েমের হাত ধরে সগৌরবে তোমার মুখোমুখি হব। তার আগে নয়! তুমি সবসময় সায়েমকে আমার থেকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলে। ও যেন আমার জীবনটা ধ্বংস না করে, সেই দোহাই দিয়েছ। আমি সায়েমকে সাথে নিয়েই তোমার সামনে আসব, আর তোমার দেওয়া প্রতিটা অপবাদ মিথ্যা প্রমাণ করব। আমি তোমাকে দেখিয়ে দেব যে আমার ভালোবাসার পবিত্রতা আর আমার জেদ ভুল ছিল না! কিন্তু তার আগে, আমার যে মৃত মেয়েকে তুমি আমার কেড়ে নিয়ে পাঁচটা বছর ধরে লুকিয়ে রেখেছ, তার হিসাব কিন্তু তোমাকে দিতেই হবে!”
রূপুর অনমনীয় জেদের ফুলকিতে শওকত চৌধুরী একেবারে নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ওদিকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াজিদও পুরো স্তব্ধ!
নিজের মনের ভেতর চলা হাজারো ওলটপালটের মাঝে রূপু আর একমুহূর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে অশ্রুসিক্ত চোখে চলে যেতে উদ্যত হলো, তখনই শওকত চৌধুরী কাঁপাকাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে আর্তনাদ করে উঠলেন, “সায়েমের খোঁজও আমি জানি রে মা… আমি জানি!”

বাবার মুখ থেকে এই নামটা আর তার খোঁজ জানার কথা শুনতেই রূপুর ভেতরের সব জেদ, অহংকারের দেয়াল একনিমেষে বালির বাঁধের মতো ভেঙে পড়ল। সায়েম! যার জন্য ও বিগত পাঁচটি বছর ধরে ও ঢাকা শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছে, তার খোঁজ বাবার কাছে আছে? রূপু আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না। আর কোনো জেদ বা দূরত্ব বজায় রাখার শক্তি ওর রইল না। ছুটে এসে বাবার সামনে দাঁড়াল, তার দু হাত জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে অনুরোধ করতে লাগল, “কোথায়? কোথায় সায়েম? বলো বাবা, দোহাই তোমার বলো! ও কোথায় আছে? আমাকে ওর কাছে নিয়ে চলো বাবা!”

শওকত চৌধুরী পরম মমতায় রূপুর মাথায় হাত রাখলেন। ভাঙা গলায় বললেন, “নিয়ে যাব মা, তোকে সায়েমের কাছেই নিয়ে যাব। আমি তো পাঁচটা বছর ধরে তোকেই খুঁজে বেড়াচ্ছিলাম রে মা! কিন্তু তার আগে… আগে তুই একবার তোর চারুকে দেখে যা মা!”

‘চারু’ রূপাঞ্জনার মেয়েটা, যে জন্মের পর একটুও মায়ের আদর পায়নি। শওকত চৌধুরী নিজেই নাতনীর নাম রেখেছিলেন ‘চারু’। এই বাড়িটার নাম আগে ছিল ‘প্রতীক্ষালয়’। কিন্তু পাঁচ বছর আগে জীবনের কালো অধ্যায়ের পর শওকত চৌধুরী ওনার একমাত্র মেয়ে রূপাঞ্জনা আর মৃত নাতনীর স্মৃতিরক্ষার্থেই বাড়িটির নাম পরিবর্তন করে রেখেছিলেন ‘রূপচারু ভিলা’।
রূপু আর না করল না। মনের ভেতর সায়েমের খোঁজ পাওয়ার তীব্র লোভ আর নিজের না দেখা সন্তানকে সমাধি দেখার অদম্য ব্যাকুলতায় বাবার সাথে বাড়ির ভেতরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। তবে যাওয়ার আগে চট করে ঘুরে তাকাল ল্যাম্পপোস্টের নিচে দাঁড়িয়ে থাকা স্তব্ধ ইয়াজিদের দিকে। একটু আগে এই লোকটা চোর অপবাদ দিয়ে কথা শুনিয়েছিল! রূপু ইয়াজিদের চোখের দিকে সটান তাকিয়ে শক্ত গলায় বলল, “মিস্টার ইয়াজিদ! আপনিও আমাদের সাথে আসুন। একটু আগে যাকে আপনি মাঝরাতে চোরের মতো অন্যের বাগান হাতড়াতে দেখে কড়া কড়া কথা শোনালেন, সে এই বাড়িতে কী চুরি করতে এসেছে; সেটা আপনি নিজের চোখে এসে দেখে যান!”

ইয়াজিদ রূপুর অপ্রত্যাশিত আহ্বানে আর শওকত চাচার কথার গভীরতায় পুরো বাকরুদ্ধ হয়ে ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল। তার ভেতরের গাম্ভীর্য বিরাট রহস্যের বেড়াজালে আটকে গেছে। শওকত চৌধুরী ইয়াজিদের দিকে তাকিয়ে মৃদু ইশারা করতেই ইয়াজিদ বাবা-মেয়ের সাথে রূপচারু ভিলার মেইন গেট গলে ভেতরে প্রবেশ করল।
যেতে যেতে ইয়াজিদের মনে হলো, মাঝরাতে শওকত চৌধুরী কীভাবে জানলেন যে তার মেয়ে এখানে এসেছে? রহস্যটা আসলে লুকিয়ে ছিল গেটের বিশ্বস্ত প্রবীণ দারোয়ানের কাছে। শওকত চৌধুরী দারোয়ানকে কড়া করে বলে রেখেছিলেন সেদিনের ওই মেয়েটা যদি ফের আসে, তবে যেন তক্ষুনি চুপিচুপি ওনাকে খবর দেওয়া হয়। দারোয়ানও কথামতো কাজ করেছে। রূপু গেটের সামনে আসতেই সে ভেতরে গিয়ে শওকত চৌধুরীকে বলে এসেছে।

শওকত চৌধুরী রূপু আর ইয়াজিদকে নিয়ে ধীরপায়ে এগিয়ে গেলেন বাড়ির দক্ষিণ পাশের রহস্যময় বাগানটার দিকে। জায়গাটা মূল বাড়ি থেকে একদম আলাদা, চারপাশটা ঘন লতাগুল্ম আর বড় বড় গাছে ঘেরা। দূর থেকে দেখে কোনোভাবেই মনে হয় না যে এটা এই বাড়িরই কোনো অংশ। ইয়াজিদ চারপাশটা দেখে মনে মনে ভীষণ অবাক হলো। সে কোনো ঘটনার ইতিবৃত্ত না চাইতেও পরিস্থিতি দেখে আঁচ করতে পারল; এখানে শওকত চৌধুরীর বিরাট পারিবারিক ট্র্যাজেডি আর রহস্য লুকিয়ে আছে, যা বাইরের মানুষ হিসেবে সত্যিই তার জানার কথা ছিল না।
কবরের কাছাকাছি আসতেই রূপুর মাতৃত্বের হাহাকার বাঁধ মানল না। বাবা ইশারা করতেই রূপু অন্ধকারের মধ্যে ধপ করে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। পরম মমতায় দু হাতে কবরের শীতল ভেজা মাটি খামচে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। পাঁচ বছর ধরে জমে থাকা কান্না, হাহাকার আর তীব্র অপরাধবোধ ওর কান্নার বেগ বাড়িয়ে দিল। গলা থেকে শুধু একটাই শব্দ বের হচ্ছিল, “আমার চারু… আমার সোনা মা…”

ইয়াজিদের মনে হলো এই মুহূর্তে তার এখানে থাকাটা সমীচীন নয়। সে শওকত চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “চাচা, আসছি আমি। আপনি ওনাকে সামলান।”

শওকত চৌধুরী ইয়াজিদের পিঠে হাত রেখে ক্লান্ত গলায় বললেন, “যাও বাবা।”
ইয়াজিদ অন্ধকার বাগান ছেড়ে সামনের দিকে হেঁটে গেল। সে যাওয়ার পর নিঝুম মাঝরাতে নির্জন বাগানে কেবল বাবা আর মেয়ের আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হলো। রূপু তখনো কাঁদছে। শওকত চৌধুরী মেয়ের পাশে এসে বসলেন। কাঁপাকাঁপা হাতটা রূপুর মাথায় রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “আজ থেকে আট বছর আগের কথা তোর মনে আছে রূপু? তুই আমার ওপর অভিমান করে সায়েমের সাথে পালিয়ে গিয়েছিলি। আমি তোকে হন্যে হয়ে খুঁজেছি, কিন্তু কোথাও পাইনি। তারপর হুট করেই বছর পাঁচেক আগে একদিন মাঝরাতে আমার পরিচিত ডাক্তারের মাধ্যমে খবর পেলাম তুই একটা সরকারি হাসপাতালের লেবার ওয়ার্ডে ভর্তি আছিস। একজন লোক তোকে সেখানে ভর্তি করিয়ে দিয়েই নাকি চম্পট দিয়েছে, ওনার কোনো খোঁজ নেই!”

বাবার কথা শুনে রূপু কান্না থামিয়ে তার মুখের দিকে তাকাল। শওকত চৌধুরী চোখ মুছে বলতে লাগলেন, “আমি যখন পাগলের মতো ছুটে হাসপাতালে পৌঁছালাম, ডাক্তাররা বলল তোর কন্ডিশন অত্যন্ত সিরিয়াস। তুই তীব্র যন্ত্রণায় অচেতন। তখনই… তোর কোল আলো করে জন্ম নিল চারু! ডাক্তাররা অনেক চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা করতে পারল না মা। জন্মের দুদিন পরেই আমাদের পাখিটা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেল। আমি নিজের হাতে ওর ছোট্ট শরীরটা হাসপাতাল থেকে নিয়ে এসে এখানে সমাহিত করেছি মা। আমি তোকে ধোঁকা দিইনি রূপু, তোর কোল খালি করে দেওয়ার মতো অত বড় পাপ এই বাবা করেনি রে মা… করেনি!”

রূপাঞ্জনা চোখজোড়া মুছে কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করল, “সায়েমকে… সায়েমকে পাওনি বাবা?”

“না মা, ও আর ফিরে আসেনি। তারপর তুইও হাসপাতাল থেকে কাউকে কিছু না বলে চলে গেলি, তোকেও আর পেলাম না। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলি মা? বুড়ো বাপটাকে এইভাবে একলা ফেলে তুই কোথায় চলে গিয়েছিলি?”

রূপু বাবার কথাগুলোর উত্তর দিল না। সায়েমের ফেরার খবর না পেয়ে বুকের ভেতরটা তীব্র অস্থিরতায় মোচড় দিয়ে উঠল। বাবার হাত দুটো চেপে ধরে আকুল হয়ে বলল, “বাবা, তুমি তো বললে তুমি ওর খোঁজ জানো। আমাকে সায়েমের কাছে নিয়ে যাও বাবা। ও কেমন আছে? ভালো আছে তো ও? বলো আমাকে?”

শওকত চৌধুরী মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত গলায় বললেন, “নিয়ে যাব মা, নিয়ে যাব…”

“এক্ষুনি চলো বাবা! আমি আর একটা মুহূর্তও অপেক্ষা করতে পারছি না।”

“ভোরের আলো ফুটুক, আমরা তখনই রওনা হব।”

রূপু উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় আছে ও বাবা? অনেক দূরে?”

“আছে মা, দেশেই আছে।”

রূপুর চোখে আশার আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল, “আমি যাব। ও যেখানেই থাকুক আমি যাব এবং ওকে ফিরিয়ে আনব। পাঁচটা বছর ধরে আমি যেমন ওকে খুঁজেছি, ও নিশ্চয়ই আমাকেও ওভাবেই খুঁজছে, তাইনা বাবা?”

মেয়ের অন্ধ বিশ্বাস দেখে শওকত চৌধুরী বিষাদের হাসি হাসলেন। সেই হাসির আড়ালে কী যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে, তা রূপাঞ্জনা বুঝতে পারল না। কবরটার দিকে তাকিয়ে বাবাকে বলল, “তুমি এখন বাড়িতে যাও বাবা, ভেতরে গিয়ে রেস্ট নাও। আমি এখানে আর একটু সময় একা থাকতে চাই।”

শওকত চৌধুরী মেয়ের দিকে তাকিয়ে শঙ্কার সুরে জিজ্ঞেস করলেন, “আবার ফাঁকি দিবি না তো মা?”

রূপু ম্লান হেসে বলল, “অন্তত সায়েমের খোঁজ পাওয়ার আগ পর্যন্ত তো না বাবা।” শওকত চৌধুরী কথা বাড়ালেন না। ধীরপায়ে বাড়ির ভেতরের দিকে চলে গেলেন। রূপু একা কবরের পাশে ভোরের আলো ফোঁটা পর্যন্ত বসে রইল। সায়েমকে ফিরে পেলেই চারুর শূণ্যতা ওর জীবন থেকে এক নিমেষে কেটে যাবে।
.
কুয়াশাচ্ছন্ন ভোরের আলো ফুটতেই শওকত চৌধুরী আর রূপাঞ্জনা গাড়ি নিয়ে কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। গাড়ি ছুটে চলেছে পিচঢালা পথ ধরে। জানালার বাইরে দ্রুত মিলিয়ে যাওয়া গাছপালা আর দূর সীমানার দিকে তাকিয়ে রূপু মনে মনে শান্তি অনুভব করল। বুকের ভেতর জমানো সবটুকু আকুলতা দিয়ে মনে মনে আউড়ে চলল, ‘সায়েম, আমি আসছি। নরকযন্ত্রণা আর অন্তহীন অপেক্ষার প্রহর শেষ করতে আমি তোমার কাছে আসছি… আর মাত্র কিছুটা সময়, তারপর আমাদের আর কেউ আলাদা করতে পারবে না!’ কিন্তু রূপু তখনও জানত না, কক্সবাজারের নীল জলরাশির প্রান্তে ওর জন্য নিয়তি কি লিখে রেখেছিল!
.
.
.
চলবে…