Home "ধারাবাহিক গল্প বাউন্ডুলে ঘুড়ি বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-১২

বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-১২

0
171

#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️‍🩹 [পর্ব-১২]
~ আফিয়া আফরিন

হিয়ার ছোট্ট দুটো ঠোঁটের ডগা থেকে ছিটকে আসা আকুল প্রশ্নটা ড্রয়িংরুমের গাম্ভীর্যটাকে এক নিমেষে গলিয়ে জল করে দিল। কাজি সাহেব মোনাজাত শেষে ওনার চশমাটা ঠিক করছেন, শওকত চৌধুরী ম্লান হেসে চোখের কোণটা মুছলেন আর ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা নাজমা বেগমের বুকটা পরম স্বস্তিতে ভরে উঠল। রূপাঞ্জনা হিয়াকে কাছে টেনে মায়াবী গলায় বলল, “হ্যাঁ সোনা, আন্টি আজ থেকে তোমার মা। আর কোনোদিন, কখনোই তোমাকে ছেড়ে কোথাও যাব না।”

ইসরাত পিয়াকে উদ্দেশ্য করে বলল, “দেখেছিস হিয়া পাখি? তোকে বলেছিলাম না? আজ থেকে তুই নতুন মা পাবি! কেমন লাগছে?”

ফুপির মোক্ষম সিলমোহরটা শোনামাত্র হিয়ার মুখের মেঘ এক পলকে কেটে গেল। ও বড্ড কৌতূহল নিয়ে বড় বড় চোখজোড়া রূপুর মুখের ওপর স্থির করে ইশারায় জানতে চাইল, কথাটা সত্যি কি না। রূপু মাথা নেড়ে হিয়াকে সায় দিল। রূপুর সবুজ সংকেত পাওয়া মাত্রই হিয়া ওর পুচকে দুই হাত দিয়ে রূপুর গলাটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁধে মুখ গুঁজল। আধো-আধো গলায় প্রথমবারের মতো ডেকে উঠল, “মা, আমার মা!”

এক অক্ষরের ছোট্ট শব্দটা যখন হিয়ার মুখ থেকে প্রথমবার উচ্চারিত হলো, রূপুর মনে হলো ওর বুকের ভেতর এত বছর ধরে জমে থাকা চারুর চলে যাওয়ার সমস্ত হাহাকার আর শূন্যতা এক পলকে কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল। চোখের বাঁধ ভাঙল। টপটপ করে কয়েক ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল হিয়ার চুলে। রূপু চোখ বন্ধ করে হিয়ার পিঠে পরম মমতায় হাত বুলাতে বুলাতে মনে মনে বলল, ‘আজ থেকে তুই আর মা-হারা নোস রে পাখি, আর আমিও সন্তান-হারা নই। সৃষ্টিকর্তা আজ তোকে দিয়ে আমার ভাঙা বুকটা জুড়িয়ে দিলেন।’

ইয়াজিদ ডাইনিং টেবিলের এক কোণে পাঞ্জাবির হাতা কবজি পর্যন্ত টেনে ওভাবেই শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। তার তীক্ষ্ণ বিচক্ষণ চোখজোড়া আজ লাভ-ক্ষতির হিসাব মেলাচ্ছিল না। হিয়ার মুখ থেকে ‘মা’ ডাকটা শোনামাত্র বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল। এতগুলো বছর এই অবুঝ মেয়েটা মায়ের জন্য ভেতরে ভেতরে কতটা কাঙাল ছিল, তা কেবল সৃষ্টিকর্তাই জানেন। আজ যখন রূপুর বুকে মাথা রেখে হিয়া ওর মায়ের অভাবটা ঘুচিয়ে নিলো, তখন ইয়াজিদের মনে তানিয়াকে হারানোর শেষ অপরাধবোধটুকুও আরেকটু গাঢ় হলো। নাজমা বেগম ধীরপায়ে এগিয়ে এসে রূপুর মাথায় হাত রাখলেন। তার গলাটাও আজ আবেগে বুঁজে এসেছে। তিনি বললেন, “আমার হিয়া পাখি আজ ওর আসল নীড় খুঁজে পেল রে মা। তুমি ওকে যে মায়া দিলে, এর ঋণ শোধ করার সাধ্য আমাদের কারোর নেই।”

রূপু নাজমা বেগমের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসল। হিয়া তখনো রূপুর কোল ছাড়েনি। ও ওখান থেকেই বাবাকে উদ্দেশ্য করে এক হাত নেড়ে ডাকল, “পাপা… দেতো, আমার মা!”

ইয়াজিদ মেয়ের অনাবিল আনন্দ দেখে চেনা গম্ভীর খোলসটা ভেঙে আলতো করে হাসল। তার পা দুটো ওদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও, বুক চিরে আসা এক পশলা অচেনা টানাপোড়েনে সে ওখান থেকে সোজা নিজের ঘরে চলে এলো। দরজাটা আটকে দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য দেয়ালটার দিকে তাকাল। আগের দিন রাতেই ইয়াজিদ এই ঘরের দেয়াল আর টেবিল থেকে তানিয়ার সব ছবি সযত্নে সরিয়ে ড্রয়ারে লক করে রেখেছিল। কারণ, তার মনটা একটা কথা স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছিল; যে মানুষটা সব হারিয়ে একটা মাতৃহীন বাচ্চার দায়িত্ব নিতে এই ঘরে পা রাখছে, তার মন ছোট করার অধিকার ইয়াজিদের নেই। তানিয়া তার জীবনের প্রথম প্রেম, তার ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখের একান্তে লুকিয়ে থাকা এক টুকরো অধ্যায় হয়েই মনের মাঝখানটায় থাকুক। ওকে আর ঘরের দেয়ালে ঝুলিয়ে রেখে নতুন করে আসা মানুষটার সামনে অদৃশ্য অপরাধবোধের দেয়াল তোলার প্রয়োজন নেই।
এমনকি হিয়ার সামনেও তানিয়ার ছবিটা সে আর ওভাবে প্রকাশ করবে না। কেনই বা করবে? মেয়ে তো আজ নতুন মা পেয়ে তার আঁচল আঁকড়ে ধরে ‘মা মা’ করে ডাকা শুরু করে দিয়েছে। বাচ্চার চপল মনে তানিয়ার ম্লান অতীত আর শূন্যতার চেয়ে রূপুর জীবন্ত কোলটাই এখন সত্য। অতীত অতীতেই সুন্দর, বর্তমানকে নিজের মতো করে ডানা মেলতে দেওয়াটাই বোধহয় শ্রেয়।
.
নতুন মাকে পেয়ে হিয়ার আনন্দ যেন ধরে না। ছোট্ট পাখিটা রূপুর কোল থেকে এক মুহূর্তের জন্যও নামতে চাইছে না। কখনো রূপুর শাড়ির আঁচলটা মুঠো করে ধরছে, কখনো চিবুক ছুঁয়ে দিচ্ছে, আবার কখনো খুশিতে খিলখিল করে হেসে উঠে ড্রয়িংরুমের সবাইকে পুচকে আঙুল উঁচিয়ে দেখাচ্ছে; যেন ও দুনিয়ার সবচেয়ে দামী কোনো গুপ্তধন খুঁজে পেয়েছে! বাচ্চার বাঁধভাঙা চপলতা আর অনাবিল আনন্দ দেখে উপস্থিত সবার বুকেই এক পশলা স্বস্তির বাতাস বয়ে গেল।
আর রূপাঞ্জনা? ছোট্ট ‘মা’ ডাক যখন বারবার ওর কানে এসে আছড়ে পড়ছে, ভেতরের পুরো জগতটা এক নিমেষে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা কেমন যেন হু হু করে উঠল, শরীর জুড়ে বয়ে গেল তীব্র অচেনা শিহরণ। এতদিন ভেতরটা যে একাকীত্ব আর মাতৃত্বের হাহাকারে খাঁ খাঁ করছিল, হিয়ার একটা ডাকে সেই তপ্ত মরুভূমিতে শ্রাবণের বৃষ্টি নামিয়ে দিল। ও চোখ বন্ধ করে হিয়াকে নিজের বুকের পাঁজরের সাথে আরও শক্ত করে মিশিয়ে নিল। আজ থেকে শূন্য বুকটার আসল অধিকার শুধুই এই নিষ্পাপ পাখিটার।

কিছুক্ষণ পর সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে চারপাশটা একটু শান্ত হলো, তখন বাড়ির এক কোণের নিরিবিলি ঘরটায় শুরু হলো মা-মেয়ের মিষ্টি, একান্ত গল্প। রূপু বিছানায় দেয়াল ঘেঁষে বসেছে, আর হিয়া কোলের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে ওনার শাড়ির নকশাগুলোর ওপর হাত বোলাচ্ছে। কিছুক্ষণবাদে হিয়া চোখ দুটো রূপুর মুখের ওপর স্থির করে আধো-আধো গলায় জিজ্ঞেস করল, “মা… তুমি আতে আমার তায় তূবে? পাপা তো পতা… পাপা শুদু লেপ্টে কাজ করে।”

রূপু হেসে ফেলল। হিয়ার চুলে বিলি কেটে দিতে দিতে বলল, “হ্যাঁ সোনা, মা আজ থেকে তোমার সাথেই ঘুমাবে।”

হিয়া খুশিতে দুই পা শূন্যে দোলাতে দোলাতে বলল, “হ্যাঁ! পাপাকে পতা তরে দেব। মা, তুমি আমাকে ততাপতির গল্প বলবে না? ওই যে… অতানে ওড়ে?”

“বলব তো মা। শুধু প্রজাপতির গল্প কেন, নীল পরীর গল্প, মেঘের দেশের গল্প, সব বলব। কিন্তু তার আগে আমার লক্ষ্মী বুড়িটাকে ঝটপট এই দুধের গ্লাসটা শেষ করতে হবে।” বলেই রূপু টেবিল থেকে দুধের গ্লাসটা হিয়ার ঠোঁটের কাছে এগিয়ে ধরল। অন্যদিন যে হিয়া দুধের নাম শুনলেই ঘরজুড়ে কান্নাকাটি আর ছটফটানি শুরু করে দিত, আজ মায়ের হাতের ছোঁয়ায় কোনো বায়না ছাড়াই লক্ষ্মী মেয়ের মতো গ্লাসটা ধরে চুমুক দিল। রূপু মন্ত্রমুগ্ধের মতো মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

মা-মেয়ের নিবিড় খুনসুটির মাঝেই দরজায় এসে দাঁড়ালেন নাজমা বেগম। দুজনকে ওভাবে বিছানায় গল্প করতে দেখে হেসে বললেন, “মা-মেয়ের মিষ্টি গল্পের মাঝে আমি কি একটু আসতে পারি?”

“নিশ্চয়ই আসুন আন্টি।”

নাজমা বেগম ভেতরে এসে হিয়ার পাশে বসলেন। চুলে হাত বুলিয়ে আদুরে গলায় বললেন, “দাদুভাই, তুমি একটু পাপার ঘরে যাও তো। তোমার পাপা একা একা বসে আছে। আমি তোমার মায়ের সাথে একটু জরুরি কথা বলি, কেমন?”

‘মা’ শব্দটা রূপুর নতুন পরিচয়ের সিলমোহর হয়ে যেন আবারও হিয়ার কানে বাজল। ও লক্ষ্মী মেয়ের মতো মাথা নেড়ে বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে ইয়াজিদের ঘরের দিকে চলে গেল। হিয়া চলে যেতেই নাজমা বেগম রূপুর হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিলেন। বললেন, “মা, আজ থেকে তো হিয়া তোমার। ওর জীবনের সবটুকু দায়িত্ব তুমি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছ। কিন্তু আমি চাচ্ছিলাম, আজকের রাতটুকুর জন্য হিয়া আমার কাছেই ঘুমাক।”

রূপু অবাক হলো। ওর চোখজোড়ায় দ্বিধা ফুটে উঠল। ও বাঁধা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলল, “হিয়া আমার কাছে থাকলে কোনো অসুবিধা হবে না আন্টি। আমি ওনাকে সামলাতে পারব।”

নাজমা বেগম রূপুর মাথায় পরম মমতায় হাত রেখে হাসলেন। ওনার চোখজোড়া যেন মস্ত বড় অভিজ্ঞতার কথা মনে করিয়ে দিয়ে বলল, “সে তো আমি জানিই মা। হিয়া তো তোমারই মেয়ে, এরপর থেকে তো আজীবন তোমাকেই সামলাতে হবে। কিন্তু আজকে ওকে আমি কোনোভাবে ম্যানেজ করে নিজের কাছে রেখে দেব। আমি চাই, আজকে রাতে তুমি ইয়াজিদের সাথে একটু কথা বলো। নিজেদের মতো করে দুটো কথা বলা বড্ড প্রয়োজন। এক ছাদের নিচে যখন তোমরা নতুন জীবন শুরু করতে যাচ্ছো, তখন ওর মনের দেয়ালগুলো ভাঙা দরকার। আশা করি তুমি আমার কথাটা বুঝতেই পারছ।”

নাজমা বেগমের দূরদর্শী কথাগুলো রূপুর মনের ভেতর গিয়ে বিঁধল। একজন মা হিসেবে সে হয়ত ওদের মধ্যকার আড়ষ্টতা আর দেয়ালটুকু ভাঙার জন্যই এই সুযোগটা করে দিতে চাইছেন। রূপুর ভেতরের পরিণত মনটাও সায় দিল। তাছাড়া, ইয়াজিদ সাহেবের সাথে ওর নিজেরও কিছু জরুরি কথা বলা বড্ড প্রয়োজন; যে কথাগুলো ওদের অলিখিত চুক্তির মতো সম্পর্কের ভবিষ্যৎ শান্তিময় করতে পারে। রূপু বলল, “ঠিক আছে আন্টি, আপনি যেভাবে ভালো মনে করেন।”

নাজমা বেগম হিয়াকে নিজের ঘরে নিয়ে যাওয়ার পর রূপু বেশ কিছুক্ষণ নিজের ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল। সবটা নিজের কাছেই অলৌকিক উপন্যাসের মতো ঠেকছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধীরপায়ে ঘর থেকে বের হয়ে ইয়াজিদের ঘরের দিকে রওনা হলো।
ঘরের দরজাটা খোলাই ছিল। ইয়াজিদ খাটের এক কোণায় পাঞ্জাবিটা পরেই চুপচাপ হেলান দিয়ে কিছু ভাবছিল ছিল। রূপুর পায়ের মৃদু শব্দে সে চট করে মাথা তুলে তাকাল। রূপুকে একা ঘরে ঢুকতে দেখে ইয়াজিদ কিছুটা অবাক হলো। তার চোখ দুটো রূপুর পেছনে হিয়াকে খুঁজল। সে স্বভাবসুলভ গম্ভীর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “হিয়া? ও কোথায়?”

রূপু দরজার পাল্লাটা আলতো করে ভিজিয়ে দিয়ে ঘরের ভেতরে এসে দাঁড়াল। শান্ত গলায় বলল, “আন্টি ওকে নিজের ঘরে নিয়ে গেছেন। আজকে রাতটা হিয়া ওনার কাছেই ঘুমাবে।”

ইয়াজিদের ভ্রু দুটো মুহূর্তের জন্য কুঁচকে গেল। মনটা মায়ের এই চালটা চট করে ধরে ফেলল। সে সোজা হয়ে বসে খানিকটা বিরক্ত ও আড়ষ্ট গলায় বলল, “কেন? মা হিয়াকে নিয়ে গেল কেন? হিয়া তো আপনার কাছেই লক্ষ্মী মেয়ের মতো ছিল।”

“আন্টি চাইলেন আমরা দুজনে যেন নিজেদের মতো করে কিছু কথা বলে নিই। এক ছাদের নিচে যখন থাকতে যাচ্ছি, তখন কিছু কথা স্পষ্ট হওয়া দরকার।”

ইয়াজিদ ভেতরের অতি-সতর্ক পুরুষালি অহং বা জেদটা নিঝুম ঘরের আবহে বেশিক্ষণ টিকতে দিল না। সে খাট থেকে ঝটপট উঠে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবির হাতাটা ঠিক করতে করতে বলল, “তার কোনো প্রয়োজন নেই। আজ অনেক ধকল গেছে, আপনি বিশ্রাম নিন। আমি বরং বাইরের ড্রয়িংরুমের সোফাটায় গিয়ে…”

কথাটা শেষ না করেই ইয়াজিদ ধীরপায়ে ঘর থেকে বের হয়ে যেতে নিল। তার পালিয়ে যাওয়ার ভঙ্গি দেখে রূপুর ঠোঁটের কোণে ম্লান হাসি ফুটে উঠল। ও পিছু ডাকল, “শুনুন!”

ইয়াজিদের পা দুটো দরজার কাছাকাছি এসে থমকে গেল। সে পেছনে ফিরে তাকাল। চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। রূপু তার দিকে সোজা তাকিয়ে বলল, “আপনার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা আছে। দরজা থেকে ফিরে এসে প্লিজ একটু বসুন।”

ইয়াজিদ তপ্ত নিশ্বাস ফেলে আর না করতে পারল না। সে ফিরে এসে ঘরের সিঙ্গেল সোফাটায় বসল। দুই হাত এক করে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “বলুন, কী বলতে চান?”

রূপু খাটের এক পাশে দূরত্ব বজায় রেখে বসল। শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়িয়ে পরিণত গলায় বলল, “আজ থেকে আমরা আইনিভাবে স্বামী-স্ত্রী ঠিকই, কিন্তু আমরা দুজনেই জানি এই বিয়ের ভিত্তিটা কী। আমি আপনার মাতৃহারা মেয়ের মায়ের অভাব পূরণ করতে এই ঘরে পা রেখেছি। তাই আমাদের মধ্যকার সম্পর্কটা সাধারণ নবদম্পতির মতো হবে না। এখানে মেলোড্রামা বা অধিকার খাটানোর জায়গা নেই। আমাদের শুরুটা স্পষ্ট বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে হওয়া উচিত।”

“আমি আপনার বাস্তবসম্মত চিন্তাকে শ্রদ্ধা করি, রূপাঞ্জনা। এই বিয়ে বিষয়ক সিদ্ধান্তে আপনার ঠিক কী মতামত বা আপনার কী চাওয়া, সেটা বলুন। আমি আপনার প্রতিটি মতামতকে সর্বোচ্চ সম্মান জানাব।”

রূপু বলল, “দেখুন ইয়াজিদ সাহেব, আপনার মাতৃহারা মেয়ের মায়ের অভাব পূরণ করতে আসছি বলেই যে শুধু আমার মতামতকে সম্মান করতে হবে, বিষয়টা কিন্তু তা নয়। আমি একজন মানুষ, আমার নিজস্ব একটা সত্ত্বা আছে। আমি স্পষ্ট কথাবার্তা বলতে পছন্দ করি। তাই বিয়ের প্রথম রাতেই সেসব স্পষ্ট করে নেওয়া ভালো, যাতে ভবিষ্যতে কোনো কথায় আমাদের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি না হয়।” ইয়াজিদ রূপুর দিকে তাকিয়ে রইল। রূপু বলতে লাগল, “প্রথমত, আমি আপনার জীবনে বা আপনার ঘরে আপনার প্রয়াত স্ত্রী তানিয়ার জায়গা নিতে আসিনি। তার সম্মান ও অধিকার ওনার জায়গাতেই থাকবে। আমি তানিয়া হতে আসিনি, আমি রূপাঞ্জনা হয়েই হিয়ার মা হতে এসেছি। দ্বিতীয়ত, হিয়ার প্রতি আমার মায়া বা অধিকারের জায়গায় আপনি বাবা হিসেবে কোনো দেওয়াল তুলবেন না। আর তৃতীয়ত, আমাদের এই এক ছাদের নিচের জীবনটা হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর বন্ধুত্বের; কোনো কৃত্রিম বা স্বামী-স্ত্রীর অভিনয়ের নয়। আপনার কি এতে কোনো আপত্তি আছে?”

ইয়াজিদ রূপুর দিকে তাকিয়ে ঠোঁটের কোণে অনেকদিন পর এক চিলতে চওড়া আর স্বস্তির হাসি ফুটিয়ে বলল, “কোনো আপত্তি নেই, রূপাঞ্জনা।” পরক্ষণেই তার ঠোঁটের কোণের স্বস্তির হাসিটা গম্ভীর বিষাদে রূপ নিল। সে সোফায় সোজা হয়ে বসে জানালার বাইরের নিকষ কালো অন্ধকারটার দিকে তাকাল। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে নিজের কণ্ঠস্বরটাকে যতটা সম্ভব নিয়ন্ত্রণ করে বলল, “আমি আপনার স্পষ্টবাদিতাকে সম্মান জানাই, রূপাঞ্জনা। তাই আমার দিকটাও আপনার কাছে পরিষ্কার করে দেওয়া উচিত। সোজা কথায় আমাকে দিয়ে আর যাই হোক, ভালোবাসা হবে না।”

ইয়াজিদ উত্তরের আশায় রূপুর দিকে তাকিয়ে রইল। রূপু বলল, “আপনি বলতে থাকুন।”

ইয়াজিদ বলতে লাগল, “তানিয়া চলে যাওয়ার পর আমার ভেতরের আবেগ, অনুভূতি বা কাউকে ভালোবাসার ক্ষমতা; সবকিছুই পাথর হয়ে গেছে। আজ আপনি আমার জীবনে এসেছেন শুধু হিয়ার জন্য, আর আমিও এই বন্ধনে জড়িয়েছি শুধু হিয়ার জন্য। তানিয়া ছাড়া আমার জীবনে অন্য কাউকে বসানোর যোগ্যতা বা মানসিকতা কোনোটিই আমার নেই। আসলে, বাউন্ডুলে ঘুড়ি হলো মুক্ত আকাশের লোভে সুতো ছেঁড়া এমন এক যাযাবর অস্তিত্ব, যে স্বাধীনতার চরম শিখরে পৌঁছাতে গিয়ে হঠাৎ কোনো কাঠখোট্টা ডালে বা একাকী ছাদে আটকে যায়। সে না পারে আবার দিগন্তে ডানা মেলতে, না পারে মাটির টানে নিচে নেমে আসতে; তীব্র শূন্যতা আর হারিয়ে যাওয়া ভালোবাসার মাঝে ঝুলে থাকাই তার নিয়তি। আমি হচ্ছি সেই আটকে যাওয়া ঘুড়ি। আমার থেকে হিয়ার জন্য দায়িত্ব আর আপনার জন্য সর্বোচ্চ সম্মানটুকু পাবেন, কিন্তু কোনো ভালোবাসার দাবি বা আশা আমার কাছে রাখবেন না।”

“আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন ইয়াজিদ সাহেব। আমি আপনার কাছে ভালোবাসার ভিক্ষে বা অধিকার দাবি করতে আসিনি। অতীত আমাকে একটা জিনিস খুব ভালো করে শিখিয়েছে; যেখানে শ্রদ্ধা নেই, সেখানে জোর করে ভালোবাসা খুঁজতে যাওয়াটা বোকামি। আমি নিজেই ভাঙা তরী, আপনার ভাঙা মনের সুতো জোড়া দেওয়ার ইচ্ছে বা মোহ আমার নেই। আমার সমস্ত মায়া, অধিকার আর ভালোবাসা শুধু হিয়াকে ঘিরে। আপনি আপনার একাকী ছাদেই আটকে থাকুন আর দিগন্তেই ডানা মেলুন; তাতে আমার কোনো যায় আসে না, যতক্ষণ না তার আঁচ আমার মেয়ের ওপর এসে পড়ছে। আশা করছি আমাদের মাঝে এই দূরত্ব আর শ্রদ্ধাবোধটুকুই আমাদের এক ছাদের নিচে শান্তিতে বাঁচিয়ে রাখবে।”

রূপুর এই কাটা-কাটা জবাবের পর ইয়াজিদের সব দ্বিধা যেন এক লহমায় কেটে গেল। মনে মনে সে অসীম স্বস্তি পেল। রাতের নিঝুম অন্ধকার দুটো ভিন্ন ঝড়ে ভাঙা মানুষকে অলিখিত চুক্তির ফ্রেমে বেঁধে দিল।
.
পরদিন সকাল। সোনালী রোদের এক চিলতে আলো এসে পড়ল জানালার গ্রিল গলে। আজ আর হিয়ার ঘুম ভাঙানোর জন্য জোরজুলুমের প্রয়োজন হলো না। সকাল হতেই রূপাঞ্জনার শাড়ির আঁচল জড়িয়ে, ওর কোল ঘেঁষে শুরু হলো হিয়ার নতুন দিন। রূপু পরম মমতায় হিয়ার চুলগুলো বেঁধে দিচ্ছিল, আর হিয়া ‘মা মা’ বলে অনবরত ওর দিনযাপনের গল্প শুনিয়ে যাচ্ছিল।
আর ঠিক ওভাবেই ওদের জীবনের সাথে মিলিয়ে শুরু হলো ইয়াজিদেরও নতুন সকাল। ড্রয়িংরুমে এসে যখন সে দেখল ধোঁয়া ওঠা গরম কফি আর হিয়ার খিলখিল হাসির শব্দ একাকার হয়ে গেছে, তখন তার মনটাতেও অচেনা বসন্তের হাওয়া দোলা দিয়ে গেল। সে কিছু না বলে এক বুক স্বস্তি বুকে চেপে ব্যাংকের উদ্দেশ্যে রওনা দিল। নাহ… জীবনকে যতটা কঠিন মনে হয়েছিল জীবন বোধহয় ততটা কঠিন হবে না!
.
.
.
চলবে…
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ২২১৪