Home "ধারাবাহিক গল্প বাউন্ডুলে ঘুড়ি বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-১১

বাউন্ডুলে ঘুড়ি পর্ব-১১

0
241

#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️‍🩹 [পর্ব-১১, প্রথমাংশ]
~ আফিয়া আফরিন

ইয়াজিদ কয়েক সেকেন্ডের জন্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে রইল। তার তীক্ষ্ণ ও বিচক্ষণ মস্তিষ্ক দ্রুত পুরো সমীকরণটা মেলানোর চেষ্টা করল।
ওদিকে রূপুর অবস্থাও এক। ওর ফর্সা মুখটা মুহূর্তের জন্য ফ্যাকাসে হয়ে গেল। বাবার আকুলতা, চারুর বয়সী একটা মেয়ের মাতৃত্বের অভাব পূরণ করার তাগিদ; সেই মেয়েটা তবে হিয়া? আর পাত্র এই খ্যাপাটে মেজাজের মানুষটা? নিয়তি যে এভাবে ওর সাথে রসিকতা করবে, ভাবতেও পারেনি।
তবে ওরা কেউ কাঁচা বয়সের আবেগপ্রবণ তরুণ-তরুণী নয় যে রেস্তোরাঁর মাঝখানে দাঁড়িয়ে দৃশ্য তৈরি করবে। দুজনেরই অতীত ও বয়স তাদের ভেতরে পরিপক্ব গাম্ভীর্য এনে দিয়েছে। তাই ধাক্কাটা সামলে নিতে দুজনের মাত্র কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল। ইয়াজিদ নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বলল, “বসুন।”

রূপাঞ্জনা চেয়ারটা টেনে বসল। টেবিলে রাখা কাঁচের পানির গ্লাসটার দিকে তাকিয়ে তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। তারপর সরাসরি ইয়াজিদের দিকে তাকিয়ে স্বাভাবিক গলায় বলল, “বোঝাই যাচ্ছে, আমাদের দুজনের পরিবার আমাদের অন্ধকারে রেখে এই আয়োজনটা করেছে। আপনি কি আগে থেকে কিছু জানতেন?”

“বিন্দুমাত্র না। মা আর হিয়া গত দুদিন ধরে রহস্যের জাল বুনেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই জালের শেষপ্রান্তে আপনি দাঁড়িয়ে আছেন, সেটা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।”

“আমার বাবাও তাই করেছেন।” রূপু শাড়ির আঁচলটা আঙুলে জড়াতে জড়াতে বলল, “হিয়ার প্রতি আমার মায়া দেখে বাবা ভেবে বসে আছেন, আমি হয়ত ফের নতুন করে বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু সে আসলে ভেতরের শূন্যতাটা বুঝতে চাচ্ছে না। নিজের মতো করে ভালো চান।”

ইয়াজিদ আলগা কথা বলল না। সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “তাহলে এখন আপনার সিদ্ধান্ত কী? আপনি তো নিশ্চয়ই শুধু বাবার কথা রাখতেই এখানে এসেছেন?”

“হ্যাঁ।” রূপু একটুও সময় না নিয়ে সরাসরি বলল, “আমি এখানে এসেছিলাম ওপাশে যে-ই থাকুক, তাকে সরাসরি ‘না’ বলে দিতে। আমার অতীত আমাকে এমন এক জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে যেখানে বিয়ে শব্দটা আমার কাছে একটা কুৎসিত প্রহসন ছাড়া আর কিছু না। আমি কোনো মানুষের জীবনের দায় নিতে পারব না, নিজেরটাও কাউকে দিতে পারব না। তবে…” রূপু একটু থামল। তারপর নিচু গলায় বলল, “তবে ওপাশে হিয়া আছে জানলে হয়তো আমি আসার আগে আরেকবার ভাবতাম। মেয়েটাকে আমি সত্যি বড্ড ভালোবেসে ফেলেছি।”

ইয়াজিদ চুপ করে রইল। ক্যাফের ওয়েটার এসে ওদের সামনে কফির দুটো কাপ রেখে গেল। কফির ধোঁয়া তাদের মাঝখানের নীরবতাটাকে আরও একটু ভারী করে তুলল। ইয়াজিদ কফির কাপে চামচ নাড়তে নাড়তে বলল, “আমার অবস্থাও আলাদা কিছু নয়। তানিয়া চলে যাওয়ার পর আমার জীবনে আমি আর কাউকে জড়াতে চাইনি। কিন্তু দিনশেষে মা যখন বলল, তখন কয়েকজনের সাথে আলাপ হয়েছে আর সবার মাঝেই একটা মেকি ভাব ছিল।” সে কফির কাপে চুমুক দিয়ে রূপুর দিকে তাকাল। ফের বলল, “আমরা দুজনেই দুটো ভিন্ন ঝড়ে বিধ্বস্ত মানুষ। আপনি কারো প্রতারণার ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন, আর আমি তানিয়াকে হারানোর গ্লানি। আমাদের কারও মনেই নতুন করে প্রেম জাগানোর মতোন ফুরফুরে হাওয়া নেই। কিন্তু…”

ইয়াজিদ চুপ করে গেল। তার বিচক্ষণতা আর অকপট স্বীকারোক্তি রূপাঞ্জনার ভালো লাগল। ও কফির কাপটা হাতে নিয়ে জানালার বাইরের ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকাল। নিয়ন আলোর নিচে শহরের মানুষগুলো ছুটছে। তারপর ধীর গলায় বলল, “প্রেম বা ভালোবাসা এক জনমের নয়, ইয়াজিদ সাহেব। ওটা আমার জীবন থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। আমরা যদি তাদের কথা রাখতে গিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিই, তবে সেটা কি হিয়া বা আমাদের প্রতি সুবিচার হবে?”

“সুবিচার-অবিচারের হিসাবটা না হয় ওনাদের ওপরেই ছেড়ে দিই?” ইয়াজিদ শান্ত কণ্ঠে বলল, “জোর করে কোন কিছুই হয় না। আপনি আপনার বাবাকে গিয়ে যা বলার বলুন, আমি আমার মাকে বলব। আমাদের অদ্ভুত মোলাকাতটা না হয় আজ এখানেই একটা ভদ্রস্থ সমাপ্তি পাক। বাকিটা নিয়তি যা ভালো বোঝে, করবে।”

রূপু কফির কাপটা টেবিলের ওপর রাখল। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, “ধন্যবাদ ইয়াজিদ সাহেব, আপনার স্পষ্টবাদিতার জন্য। ভালো থাকবেন।”
ইয়াজিদও উঠে দাঁড়াল। পথ এক হলেও দুজন আলাদা পথে রওনা দিল। ইয়াজিদ রিকশা না নিয়ে প্রগতি সরণির ফুটপাত ধরে ধীরপায়ে হাঁটা দিল। রূপু একটা সিএনজি নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলো, ওর চোখের কোণায় চারুর মুখটার পাশাপাশি হিয়ার মায়াবী নিষ্পাপ অবয়বটাও বারবার ভেসে উঠছিল।
.
বিকেলের আলো ফুরিয়ে ড্রয়িংরুমে সাঁঝের অন্ধকার নামার আয়োজন চলছে, তখন ইয়াজিদ কলিংবেল চাপল। দরজা খুলে দিলেন নাজমা বেগম। ওনার চোখেমুখে কৌতূহল আর এক বুক আশা। ইয়াজিদ ঘরে ঢুকে সোফায় ল্যাপটপ ব্যাগটা রাখল, তারপর ভণিতা না করে সরাসরি মায়ের মুখোমুখি গিয়ে দাঁড়াল। নাজমা বেগম অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী রে? দেখা হলো? কেমন দেখলি মেয়েকে?”

“মা, রূপাঞ্জনাকে আমি আগে থেকেই চিনি। কিন্তু মা, আমি এই বিয়েতে রাজি হতে পারছি না।”

ছেলের মুখে চটজলদি ‘না’ শুনে নাজমা বেগমের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। তিনি কড়া গলায় বললেন, “কেন রাজি হতে পারছিস না? রূপুর মতোন ওমন লক্ষ্মী মেয়ে, যে হিয়াকে নিজের মেয়ের মতো ভালোবেসে বুকে টেনে নিয়েছে, ওর মধ্যে তুই কী খামতি পেলি শুনি?”

“রূপাঞ্জনার কোনো খামতি নেই মা। কিন্তু উনার একটা অতীত আছে মা, যার ক্ষত এখনো কাঁচা। সে নিজের মন থেকে এই বিয়েতে বিন্দুমাত্র সায় দিতে পারছে না। শুধুমাত্র তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে এখানে এসেছিল। একটা মেয়ে যেখানে মানসিকভাবেই প্রস্তুত নয়, সেখানে জোর করাটা চরম অবিচার হবে। ওনার নিজেরও একটা সিদ্ধান্ত আছে, আর আমি ওনার সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাতে চাই।”
নাজমা বেগম স্তব্ধ হয়ে ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ইয়াজিদের অকাট্য যুক্তির পিঠে ওনার আর কোনো কথা বলার শক্তি রইল না। তার মনের চমৎকার রঙিন স্বপ্নটা এক নিমেষেই ফিকে হয়ে এলো।

শওকত চৌধুরী সোফায় বসে মেয়ের দিকে চশমার ওপর দিয়ে তাকিয়ে আছেন। মেঝের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ধীর গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “রূপু? ইয়াজিদকে কেমন লাগল মা?”

রূপুর বুকের ভেতরটা অপরাধবোধে মুচড়ে উঠলেও কণ্ঠস্বর অসম্ভব দৃঢ় রেখে বলল, “বাবা, ইয়াজিদ সাহেব মানুষ হিসেবে ভীষণ মার্জিত আর স্পষ্টভাষী। উনার মতোন একজন বিচক্ষণ মানুষ সত্যি খুব কম দেখা যায়। কিন্তু বাবা, আমি এই বিয়েটা করতে পারব না।”

“কেন পারবি না মা? ছেলেটার তো কোনো দোষ নেই।”

“দোষ ওনার নয় বাবা, দোষ পরিস্থিতির। ইয়াজিদ সাহেব নিজেও তার অতীত ভুলতে পারেননি, আর আমিও আমার ভাঙা মন নিয়ে নতুন কোনো সংসার সাজাতে পারব না। আমরা দুজনেই ‘না’ বলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। বাবা, তুমি যদি আমার একটুখানি শান্তি চাও, তবে প্লিজ এই বিয়ে নিয়ে আর জোরাজুরি করো না। আমি তোমার ছায়াতেই আজীবন কাটিয়ে দিতে চাই।”

তিনি আর কিছু বললেন না। জোর করে খাঁচায় পাখি বন্দি করা যায়, কিন্তু ভাঙা ডানায় ওড়ার আনন্দ ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। দুটো ভিন্ন বাড়িতে, দুটো ভিন্ন ভাঙা মন তাদের মা-বাবাকে নিজেদের চূড়ান্ত অনীহার কথা জানিয়ে দিল। আপাতদৃষ্টিতে কাহিনীর এখানেই ইতি ঘটার কথা ছিল, কিন্তু নিয়তির জাদুর কাঠি যে অলক্ষ্যে তাদের দুজনকে হিয়ার সুতোয় বেঁধে ফেলেছে, সেই বাঁধন এত সহজে আলগা হওয়ার নয়!

দেখতে দেখতে আরও দুটো সপ্তাহ কেটে গেল। রেস্তোরাঁর মোলাকাতের পর ইয়াজিদ আর রূপাঞ্জনা ভুল করেও মুখোমুখি হয়নি, ইদানীং রূপু বাগানে আসাও একদম কমিয়ে দিয়েছে। বড়রা নিজেদের মতো করে হিসাব কষে দূরত্ব বজায় রাখলেও, চার বছরের পুচকে হিয়া তো আর বড়দের জটিল মনস্তত্ত্ব বোঝে না! ও বোঝে শুধু ‘লুপু আন্টির’ সাথে বাগানে প্রজাপতি ধরার আনন্দ।
গত তিন-চার দিন ধরে হিয়া বড্ড কান্নাকাটি জুড়ে দিয়েছে। ভাত খেতে বসলে বায়না। ঘুমাতে যাওয়ার আগে চোখ দুটো ছলছল করে ওঠে। বাবাকে জড়িয়ে ধরে আধো-আধো গলায় বলে, “পাপা, লুপু আন্টি আতে না তেন? আন্টি পতা। আমার তায় তিলবে না?”

ইয়াজিদ মেয়ের ছটফটানি দেখে ভেতরে ভেতরে তীব্র অপরাধবোধে ভোগে। বিচক্ষণ মনটাও তখন হিয়ার কান্নার সদুত্তর খুঁজে পায় না। সে শুধু মেয়েকে শক্ত করে বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে চুমু খেয়ে সান্ত্বনা দেয়, কিন্তু হিয়ার মন তাতে একটুও শান্ত হয় না। ওর চপলতা যেন দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।
ওদিকে রূপুর দিনগুলো কাটছিল অস্থিরতার মধ্য দিয়ে। আজ সকাল থেকেই বুকের ভেতরটা কেমন দুরুদুরু কাঁপছে। আজ ওর জীবনের একটা মস্ত বড় দিন, অথচ এই দিনে চারপাশটা বড্ড নিঝুম। আইনি সব প্রক্রিয়া শেষ করে আজ সায়েমের সাথে ডিভোর্সের চূড়ান্ত কাগজপত্রে সই হয়ে গেছে। আজ থেকে রূপু অফিশিয়ালি মুক্ত! সায়েম নামক অভিশাপটা জীবন থেকে চিরতরে মুছে গেছে। কিন্তু এই মুক্তির আনন্দ ওকে একটুও ছুঁতে পারল না। বরং মস্ত বড় একাকীত্ব আর শূন্যতা ওকে গ্রাস করতে চাইল। রূপু ঘরের জানালার গ্রিল ধরে বাইরের আমবাগানটার দিকে তাকিয়ে রইল। বিকেলের ম্লান আলো এসে ওর ফ্যাকাসে মুখে পড়েছে। অবাধ্য মনটা আজ নিজের অজান্তেই পেছনের ফ্ল্যাটের ব্যালকনিটার দিকে চলে গেল। কানে বারবার বাজছিল হিয়ার খিলখিল হাসির শব্দ। রূপু নিজের অজান্তেই ছটফট করতে লাগল। ঘর থেকে বের হয়ে ড্রয়িংরুমে গেল, আবার ঘরে ফিরে এলো। হাত-পা কেমন যেন কাঁপছিল। মাতৃত্বের হাহাকার ভুলতে পারছে না। এই দুটো সপ্তাহ হিয়াকে না দেখে ওর নিজের ভেতরটাও যে কতটা খাঁ খাঁ করছিল, তা কাউকে মুখ ফুটে বলতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল, ও যেন হিয়ার অবুঝ মনটাকেও‌ চরম শাস্তি দিচ্ছে। শওকত চৌধুরী মেয়ের অস্থিরতা লক্ষ্য করছিলেন, কিন্তু তিনি দূর থেকে শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছুই করতে পারলেন না।
ঠিক তখনই সদর দরজায় কলিংবেল বেজে উঠল। রূপু শাড়ির আঁচলটা ঠিক করতে করতে গিয়ে দরজা খুলতেই ওনার চোখজোড়া থমকে গেল। সামনে দাঁড়িয়ে আছেন নাজমা বেগম, ওনার কোলে হিয়া। হিয়ার চোখ দুটো কান্নায় ফুলে একদম লাল হয়ে গেছে, গাল বেয়ে তখনো অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ছে। রূপুকে দেখামাত্রই হিয়া ছোট্ট দুই হাত বাড়িয়ে ওনার চেনা ভাঙা গলায় চিৎকার করে উঠল, “লুপু আন্টিইইইই! আমি আত্তিল!”

নাজমা বেগম বড্ড অপরাধীর মতো মুখ করে রূপুর দিকে তাকিয়ে বললেন, “কিছু মনে করো না মা। মেয়েটা গত তিনদিন ধরে কিচ্ছু মুখে তুলছে না, তোমার জন্য ছটফট করে কাঁদছে। ওর কান্না আর সইতে না পেরে শেষমেশ আমিই ওকে তোমার দ্বারে নিয়ে এলাম মা…”

হিয়াকে ওভাবে ছটফট করতে দেখে রূপুর ভেতরের অনমনীয় দেয়াল এক নিমেষে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। ওর চোখ বেয়ে টপটপ করে পানি গড়িয়ে পড়ল। ও এক ঝটকায় নাজমা বেগমের কোল থেকে হিয়াকে কোলে তুলে নিল। রূপুর ছটফটানি আর হিয়ার আঁকড়ে ধরা; যেন দুটো তৃষ্ণার্ত প্রাণ অনেকদিন পর ওদের চেনা নীড় খুঁজে পেল।
.
.
.
চলবে…
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ১৪৮০

#বাউন্ডুলে_ঘুড়ি❤️‍🩹 [পর্ব-১১, বর্ধিতাংশ]
~ আফিয়া আফরিন

হিয়া রূপুর গলাটা পুচকে দুটো হাত দিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন হাত আলগা করলেই আন্টি আবার কোথাও হারিয়ে যাবে! ভেজা গালটা রূপুর কাঁধে লেপ্টে দিয়ে বড় বড় চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “লুপু আন্টি, তুমি বাগানে যাও না তেন?”

“আন্টি একটু ব্যস্ত ছিলাম সোনা।”

“আমরা আবার ততাপতি দলবো। বাতায় ভালো লাতে না আমার।”

রূপু হিয়ার গালে একটা চুমু খেয়ে বলল, “হ্যাঁ সোনা, আমরা আবার প্রজাপতি ধরব। তুমি আর কাঁদবে না, কেমন?”

এদিকে নাজমা বেগম অপরাধীর মতো গলায় বললেন, “কিছু মনে করো না মা। জানি তোমরা আমার উপর মনে মনে বড্ড বিরক্ত হয়ে আছো। তোমরা যে যার মতো নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলে। কিন্তু এই অবুঝ মেয়েটাকে তো আমরা বেঁধে রাখতে পারলাম না। মেয়েটা কিচ্ছু মুখে তুলছে না, শুধু ছটফট করে কাঁদছে।”

রূপু বলল, “ঠিক করেছেন আন্টি। বড়দের ভুলের শাস্তি নিষ্পাপ বাচ্চাটা কেন পাবে? ওর জন্য আমার নিজের ভেতরটাও ছটফট করছিল।”

নাজমা বেগম একটু ইতস্তত করে বললেন, “তাহলে হিয়াকে কি তোমার কাছে কিছুক্ষণ রেখে যেতে পারি? ও তো তোমাকে ছাড়া এখন কোথাও যাবে না।”

রূপু সাথে সাথে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল, “হ্যাঁ আন্টি, আপনি একদম নিশ্চিন্তে যান। হিয়া আমার কাছেই থাকুক, আমি ওকে খাইয়ে দিচ্ছি।”
নাজমা বেগম শওকত চৌধুরীর সাথে কথা বলে বাড়ি থেকে বের হয়ে গেলেন। রূপু হিয়াকে কোলে নিয়েই রান্নাঘরের দিকে রওনা হলো ওর জন্য হালকা কিছু খাবার তৈরি করতে। হিয়া কোলের মধ্যে বসেই রূপুর গালটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে বলল, “তুমি আর পতা আন্টি হবে না তো?”

রূপু হেসে ফেলল, “না বাবা, আর পঁচা আন্টি হব না।”
.
ওদিকে সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নামার মুখে ইয়াজিদ যখন বাসায় ফিরল, তখন সারা বাড়ি নিঝুম। মাকে জিজ্ঞেস করতেই উনি বললেন, “হিয়া বাড়িতে নাই। রূপাঞ্জনার কাছে দিয়ে এসেছি কিছুক্ষণের জন্য।”

ইয়াজিদ চমকে উঠল। বিরক্ত হয়ে বলল, “মা, তুমি এটা কী করলে? রূপাঞ্জনা আমাদের পরিষ্কার ওনার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে, আমিও আমারটা বলেছি। তারপরও তুমি হিয়াকে তার কাছে কেন রেখে এলে? ওরা ভাববে আমরা জেনেশুনে বাচ্চার দোহাই দিয়ে ওদের ওপর জোর খাটাচ্ছি!”

নাজমা বেগম বেশ কড়া গলায় বললেন, “জোর আমরা খাটাচ্ছি, নাকি তুই নিজের জেদ নিয়ে বসে আছিস ইয়াজিদ? তুই তো পণ্ডিত্য আর মনের দুঃখ নিয়ে দিনরাত কাগজে মুখ গুঁজে বসে থাকিস। দুনিয়ার সব লাভ-ক্ষতির হিসাব তোর মাথায় খুব ভালো মেলে, কিন্তু নিজের মেয়েটার মনের খবর রাখার সময় তো তোর হয় না! মেয়েটা যে গত তিনদিন ধরে তোর ওপর অভিমান করে না খেয়ে শুকিয়ে যাচ্ছিল, রূপুর জন্য ছটফট করে কাঁদছিল, সেই খবর কি তুই রেখেছিস? তুই তোর অতীত নিয়ে ঘরে খিল এঁটে বসে আছিস, কিন্তু আমার নিষ্পাপ নাতনিটা মায়ের আদরের জন্য কতটা কাঙাল, সেটা তুই কোনোদিনও চোখ মেলে দেখলি না। তুই পারিসনি ওকে শান্ত করতে, অথচ রূপুর কোলে যেতেই মেয়েটা কান্না ভুলে হাসিমুখে আছে। এখনো যদি তুই তোর তথাকথিত আত্মসম্মান আর জেদ নিয়ে বসে থাকিস, তবে মনে রাখিস; বাপ হিসেবে তুই তোর মেয়ের প্রতি সবথেকে বড় অন্যায়টা করছিস!”

ইয়াজিদ এক মুহূর্তও দেরি করল না। পরনের শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে, ল্যাপটপ ব্যাগটা ড্রয়িংরুমের সোফায় ছুঁড়ে ফেলে সে দ্রুত পায়ে রওনা দিল। ইয়াজিদের বিচক্ষণ মনে তীব্র অস্বস্তি হচ্ছে। রূপাঞ্জনার সাথে তার সরাসরি কথা হয়েছে। তারপরেও মা হিয়াকে এভাবে একা কেন রেখে গেল? রূপু কি তাদের ভুল বুঝবে না? তার আত্মসম্মানে লাগবে না? তাছাড়া, হিয়াকেই বা কেন বারবার ওভাবে পাঠানো হচ্ছে? যে সম্পর্কের কোনো ভবিষ্যৎ নেই, সেখানে একটা নিষ্পাপ বাচ্চাকে কেন এভাবে এক পাক্ষিক মায়ায় অভ্যস্ত করা হচ্ছে? দিনশেষে মায়ার টান তো বড্ড সুক্ষ্ম, যন্ত্রণাদায়ক। মায়ার জালে হিয়াকে এভাবে জড়িয়ে ফেলাটা কি ঠিক হচ্ছে? অবুঝ মেয়েটাকে সে কীভাবে সামলাবে?
বাড়ির সদর দরজাটা খোলাই ছিল। ইয়াজিদ কলিংবেল বাজাল। রূপু এসে দরজা খুলে দিল। ইয়াজিদ ভেতরের জড়তাটুকু দ্রুত সামলে নিয়ে বলল, “মা নাকি হিয়াকে আপনার কাছে রেখে গেছেন? ও বড্ড জ্বালাতন করছিল বোধহয়…”

“একদমই না। হিয়া মোটেও জ্বালাতন করছে না, ও তো লক্ষ্মী মেয়ের মতো খাচ্ছে।”

ইয়াজিদ দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়েই আড়ষ্টতা নিয়ে এদিক-ওদিক তাকাল। চোখ দুটো ড্রয়িংরুমে হিয়াকে খুঁজছিল। সে আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করল, “হিয়া কোথায়?”

রূপু হেসে বলল, “ভেতরে আছে, ডাইনিং টেবিলে বসে নিজের হাতে সুজি খাওয়ার চেষ্টা করছে। আপনি ভেতরে আসুন। আপনার সাথে আমার কিছু কথা আছে।”

ইয়াজিদ থমকে গেল। সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই বলল, “যা বলার এখানেই বলুন।”

রূপু তার অতিরিক্ত গম্ভীর ভাব দেখে দরজার চৌকাঠে হাত রেখে বাঁকা হাসল। তারপর বেশ মজা করেই বলল, “কেন? ভেতরে এসে বসলে কি নিজেকে খুব একটা সেফ মনে করবেন না? আমি কিন্তু বাঘ-ভাল্লুক কিছু নই।”

ইয়াজিদের গম্ভীর মুখখানা কেমন হাঁ হয়ে গেল। সে পুরোপুরি অপ্রস্তুত হয়ে বোকা বোকা স্বরে বলে উঠল, “না, না… আরে তা নয়! মানে আমি বলছিলাম যে…”

“তাহলে বসুন, তারপর বলছি। দরজায় এভাবে হন্তদন্ত হয়ে দাঁড়িয়ে কি জরুরি কথা বলা যায়?”
কথাটা বলেই রূপাঞ্জনা দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে ইয়াজিদকে ভেতরে ঢোকার জায়গা করে দিল। ইয়াজিদ আর না করতে পারল না। তার ভেতরের তীব্র অস্বস্তিটুকু কোনোমতে চেপে সে ধীরপায়ে ভেতরে ঢুকে সোফায় বসল। রূপু ইয়াজিদকে বসিয়ে রেখে ঝটপট রান্নাঘরে চলে গেল। মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই রূপু ট্রে-তে করে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম কফি নিয়ে ফিরে এলো। ইয়াজিদের সামনের সেন্টার টেবিলে কফির কাপটা নামিয়ে রেখে ও সামনের সিঙ্গেল সোফাটায় এসে বসল। ইয়াজিদ কফির কাপের দিকে না তাকিয়ে সরাসরি রূপুর শান্ত মুখের দিকে তাকাল। রূপু শাড়ির কুঁচিটা ঠিক করে নিয়ে সহজ ও স্বাভাবিক গলায় কথা শুরু করল, “হিয়াকে কি আমার কাছে রাখা যায়?”

ইয়াজিদ ওর আকস্মিক ও অদ্ভুত প্রস্তাবে চমকে উঠল। তার ভ্রু কুঁচকে গেল। সে খানিকটা থতমত খেয়ে বলল, “মানে?”

রূপু কফির কাপটা তার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, “মানে, যতটুকু সময় আপনি বাসায় থাকেন না ততটুকু সময় ও যদি আমার কাছে থাকে তবে আপনার কোনো আপত্তি আছে?”

ইয়াজিদ এক সেকেন্ডও সময় নিল না। স্বভাবসুলভ অনমনীয় ও গম্ভীর কণ্ঠে সরাসরি বলল, “অবশ্যই আছে।”

রূপু তার তাত্ক্ষণিক নেতিবাচক জবাবে একটুও রেগে গেল না। শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল, “কেন? ও আমার কাছে খারাপ থাকবে না ইয়াজিদ সাহেব, সেটার নিশ্চয়তা আমি আপনাকে দিতে পারি।”

ইয়াজিদ একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে সোফায় হেলান দিয়ে বসল। তার কণ্ঠস্বর এবার অসম্ভব দৃঢ় শোনাল। সে বলল, “আমি ওকে এই অভ্যাসটা করাতে চাচ্ছি না, রূপাঞ্জনা। দেখুন, হিয়া বড্ড ছোট। ওর মনটা এখনো ভীষণ সংবেদনশীল। ও কোনোদিন মায়ের আদর পায়নি। ওকে জন্ম দেওয়ার সময়ই ওর মা মারা গেছে। ওর পুরো পৃথিবীটা জুড়েই মস্ত বড় শূন্যতা। এখন সে যদি আপনার এত কাছাকাছি আসে, আপনার কাছে থেকে ওর খামোখা মায়া বাড়বে। ওর অবুঝ মনটা ভাববে আপনিই ওনার সব। কিন্তু দিনশেষে ও যখন জানতে পারবে আপনি ওনার কেউ নন, তখন ও বড্ড কষ্ট পাবে। আমি ওর ছোট্ট মনের ওপর আর কোনো নতুন আঘাত সইতে পারব না।”

রূপাঞ্জনা ইয়াজিদের কথাগুলো খুব শান্ত হয়ে শুনল। তারপর ধীর গলায় বলল, “আপনার ভয়টা আমি বুঝতে পারছি ইয়াজিদ সাহেব। একজন বাবা হিসেবে আপনার আগলে রাখার চেষ্টাটা বড্ড স্বাভাবিক। কিন্তু আপনি কি একটা বিষয় খেয়াল করেছেন? মায়ার হিসাব-নিকাশ কিন্তু আমরা বড়রা করি, বাচ্চারা নয়। হিয়া অলরেডি আমার মায়ায় পড়ে গেছে। ও যে গত তিনদিন ধরে না খেয়ে ছটফট করছে, ওটা কি ওর মায়ার টান ছিল না? আপনি ওকে আটকে রেখে ওর মন থেকে কি আমার এই অভাবটা মুছে দিতে পেরেছেন? পারেননি।” রূপু একটু থামল। জানালার বাইরে অন্ধকার আকাশের দিকে তাকিয়ে একটা মৃদু দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার ইয়াজিদের দিকে তাকাল। বলতে লাগল, “আমার ডিভোর্সের আইনি প্রক্রিয়াটা পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে। এখন থেকে আমি কাগজ-কলমে সম্পূর্ণ মুক্ত। মুক্তির এই দিনে আমার চারপাশটা বড্ড নিঝুম লাগছিল, ঠিক তখনই হিয়া এসে আমার বুকে আছড়ে পড়ল। ওর ছোট্ট দুটো হাতের ছোঁয়ায় আমার ভেতরের সব একাকীত্ব এক নিমেষে কেটে গেছে। আমি আপনাকে কোনো মিথ্যে আশা দিচ্ছি না, কিংবা বাচ্চার দোহাই দিয়ে আপনার জীবনে জড়াতেও চাচ্ছি না। আমরা বড়রা আমাদের অতীত, জেদ আর আত্মসম্মান নিয়ে যত খুশি দূরে থাকি না কেন, এই নিষ্পাপ বাচ্চাটার ওপর তার কোনো প্রভাব পড়বে না। ও আমার কাছে আসবে, প্রজাপতি ধরবে, খেলবে; এতে কোনো শর্ত থাকবে না, কোনো ভবিষ্যতের হিসাব থাকবে না। হিয়া আমার হারানো মাতৃত্বের জাদুর কাঠি। আপনি আপনার জেদ আর ভয় দিয়ে ওর খুশিতে বাঁধা দেবেন না, এটাই আপনার কাছে আমার অনুরোধ। মায়াকে এত ভয় পাবেন না ইয়াজিদ সাহেব, কিছু মায়া মানুষকে ভাঙার জন্য নয়, নতুন করে বাঁচানোর জন্য আসে।”

রূপাঞ্জনার কথা শুনে ইয়াজিদ বেশ কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তার মস্তিষ্ক এই সূক্ষ্ম সমীকরণটা চট করে মেলাতে পারল না। সে বলল, “আমি আপনার কথাটা ঠিক বুঝতে পারলাম না, রূপাঞ্জনা। আপনি ঠিক কী বলতে চাচ্ছেন?”

রূপু চট করে উত্তর দিল না। কোলের ওপর রাখা হাত দুটোর দিকে তাকিয়ে অনেকক্ষণ গভীর ভাবনায় ডুবে রইল। ড্রয়িংরুমের দেয়াল ঘড়িটার টিকটিক শব্দ তখন ওদের মাঝখানের নীরবতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলছিল। বেশ খানিকটা সময় নিয়ে মনের ভেতরের সব দ্বিধাদ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলে রূপু চোখ তুলল। স্পষ্ট গলায় বলল, “আমি বিয়ে করতে রাজি। যদি সম্পর্কের আইনি সিলমোহর ছাড়া আপনি হিয়াকে আমার কাছে রাখতে স্বস্তি না পান, তবে আমি আপনার সাথে বিয়েটা করতে রাজি। তবে একটা কথা স্পষ্ট জানিয়ে রাখি; আমি নতুন সংসারের মোহে বা নিজের একাকীত্ব ঘোচাতে এই সিদ্ধান্ত নিচ্ছি না, আমি শুধু হিয়ার জন্য এই বিয়েটা করব।”

রূপুর মুখ থেকে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত এত সহজে বের হতে দেখে ইয়াজিদ এক নিমেষে স্তব্ধ হয়ে গেল! তার পুরো শরীর যেন পাথরের মতো অবশ হয়ে এলো। বিয়ে? অসম্ভব! তানিয়ার জায়গা এই জীবনে আর কোনো নারী নিতে পারবে, এটা সে কোনোদিন তার দূরতম কল্পনাতেও স্থান দেয়নি। এতদিন মা কিংবা অন্য কেউ বিয়ের কথা বললে বিচক্ষণ মন সেটাকে একটা সাধারণ সামাজিক নিয়ম হিসেবেই ভাবত, সহজে এড়িয়ে যেত। কিন্তু আজ রূপাঞ্জনা যখন নিজেই তার চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাবটা মেনে নিল, তখন ইয়াজিদের ভেতরের পুরো জগৎটা ওলটপালট হয়ে গেল! বুকের ভেতর তীব্র ঝড় বয়ে যেতে লাগল, অথচ মুখ দিয়ে একটা শব্দও বের হলো না। সে কেবল শূন্য দৃষ্টিতে রূপুর দিকে তাকিয়ে রইল। ইয়াজিদের এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ় আর ওলটপালট দশা দেখে রূপুর বুঝতে বাকি রইল না তার মনের ভেতর কী চলছে। ও ইয়াজিদকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বলল, “আপনি অযথা ভাবছেন। আমি কোনোদিনও আপনার প্রয়াত স্ত্রীর জায়গা নিতে যাব না, ওনার অধিকার ও সম্মান ওনার জায়গাতেই থাকবে। আমি আপনার জীবনে কোনো অধিকার ফলাতে বা ওনার জায়গা কেড়ে নিতে আসছি না; আমি শুধুমাত্র হিয়াকে চাই। একজন মা হারা অবুঝ শিশুর পাশে ওর ছাদ হয়ে থাকতে চাই। কিন্তু সমাজ বলুন আর আপনার অতি-সতর্ক মন বলুন; কোনোটাতেই তো হিয়াকে এমনি এমনি আমার কাছে রাখবেন না। ওর মনের মায়া বাড়ার ভয়টা আপনার আজীবন তাড়া করে বেড়াবে। তাই হিয়াকে আগলে রাখার জন্য, ওকে আমার কাছে রাখার জন্য বিয়েটাই বোধহয় সবচেয়ে উত্তম আর ভদ্রস্থ মাধ্যম। আমি আন্টির কাছে শুনেছিলাম, আপনি নাকি হিয়ার ভবিষ্যতের জন্য বিয়েটাতে রাজি ছিলেন! তো ঠিক আছে… এখন হিয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে আমারও আর কোনো আপত্তি নেই। এর চেয়ে বেশি আর কিছু আমি বলতে চাচ্ছি না। ভয় হচ্ছে, বেশি কথা বলতে গেলে আবার কোন কথা থেকে সব ওলটপালট হয়ে যায়! হিয়া বাবার কাছে আছে, বাবার সাথে আমার কথা হয়েছে। তিনি আন্টির সাথে কথা বলবেন।”
কথাটা শেষ করে রূপু সোফা ছেড়ে দাঁড়াল আর ইয়াজিদ কফির কাপটা সামনে নিয়ে ওভাবেই পাথরের মতো বসে রইল। তার জাঁদরেল মনটা এই বাস্তবতার সামনে এসে পুরোপুরি হেরে গেছে।

ওই বাড়ি থেকে ইয়াজিদ কীভাবে বের হয়ে এলো, কীভাবে তার পা দুটো নিজেদের ফ্ল্যাটের দরজায় এনে দাঁড় করাল; তার কিছুই মস্তিষ্কে সুসংগতভাবে ধরা দিল না। পুরো শরীরটা কেমন যেন অবশ, মাথাটা প্রচণ্ড ভারী হয়ে আছে। ড্রয়িংরুমে মা কিংবা ইসরাত কেউ ছিল না, হয়তো তারা হিয়াকে নিয়ে রূপুর মেতে থাকার সুযোগে নিজেদের একটু সময় দিচ্ছেন।
ইয়াজিদ ধীরপায়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজাটা আলতো করে ভেজিয়ে দিল। ঘরে আলো জ্বলছিল না। ব্যালকনির খোলা দরজা দিয়ে বাইরের নিয়ন আলো আর রাতের হাওয়া এসে ঘরের ভেতরের অন্ধকারকে রহস্যময় করে তুলেছে। ইয়াজিদ শার্টের বোতামগুলো একে একে আলগা করল। বিছানার এক কোণায় ধপ করে বসে পড়ল। বিয়ে! রূপাঞ্জনা তার চোখের দিকে তাকিয়ে সরাসরি বিয়ের প্রস্তাব মেনে নিয়েছে, শুধু হিয়া পাখির জন্য।
ইয়াজিদের বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে বিছানার পাশের সাইড টেবিলের ড্রয়ারটা টেনে একটা পুরনো, মখমলের লাল ডায়েরি আর ভেতরে সযত্নে রাখা একটা ছবি বের করে আনল। ছবিতে এক চিলতে রোদের মতো হাসছে তানিয়া। হিয়ার মা, তার জীবনের প্রথম বসন্ত, যাকে হারানোর গ্লানি আর শূন্যতা ইয়াজিদকে আজীবন বাউন্ডুলে যাযাবর বানিয়ে রেখেছে। ছবির তানিয়ার মায়াবী মুখের দিকে তাকাতেই ইয়াজিদের চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু গড়িয়ে পড়ল ডায়েরির পাতায়। তার ভীষণ শক্ত, গম্ভীর পুরুষালি খোলসটা নিমেষেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সে ছবিটা বুকের কাছে চেপে ধরে অস্ফুট স্বরে বলে উঠল, “তুমি ছাড়া আর কেউ বুকের বাম পাশে হাত রাখার অধিকার পায়নি তানিয়া, কোনোদিন পাবেও না। কিন্তু আজ… আজ কেন আমার চারপাশটা এমন ওলটপালট হয়ে গেল? আমি কীভাবে অন্য কারো নামের সাথে আমার নাম জড়াব? তুমি কি আমাকে ক্ষমা করতে পারবে?”

ঠিক তখনই ঘরের নিঝুম অন্ধকারে, ব্যালকনি থেকে আসা এক ঝলক ঠান্ডা হাওয়া যেন কানে কানে তানিয়ার চিরচেনা সেই মিষ্টি কণ্ঠস্বরটা বয়ে নিয়ে এলো। ইয়াজিদের মনে হলো, সেই চপল মেয়েটা ঠিক সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। পরনে নীল শাড়ি, চোখে এক বুক নিঃস্বার্থ ভালোবাসা। কল্পনার তানিয়া ইয়াজিদের কাঁধে হাতটা রেখে বড্ড নরম গলায় বলল, “তুমি এখনো বড্ড ছেলেমানুষ রয়ে গেলে, ইয়াজিদ! নিজের জেদ আর অতীত নিয়ে আর কতদিন এভাবে খাঁচায় বন্দি থাকবে?”

ইয়াজিদ কাল্পনিক অবয়বের দিকে তাকিয়ে কান্নাকাতর গলায় বলল, “তানিয়া, রূপাঞ্জনা রাজি হয়েছে। উনি হিয়ার জন্য আমাকে বিয়ে করতে চায়। উনি বলেছে, কোনোদিনও তোমার জায়গা নেবে না। কিন্তু আমার মন যে সায় দিচ্ছে না। আমি তো শুধু তোমাকেই…”

“আমি জানি, ইয়াজিদ। রূপাঞ্জনা আমার জায়গা নিতে আসছে না, ও আমার রেখে যাওয়া অবুঝ হিয়ার মা হতে আসছে। একটা মাতৃহীন বাচ্চার জন্য মায়ের আঁচলের চেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এই পৃথিবীতে আর কিছু আছে? তুমি তো ওকে শাসন করতে পারো, কিন্তু ওর বুকের ভেতরের মায়ের শূন্যতাটা কি তোমার বিচক্ষণতা দিয়ে মুছতে পেরেছ? পারোনি তো। রূপুর মাঝে হিয়া ওর মরা গাঙে নতুন স্রোত খুঁজে পেয়েছে। একজন বাবা হিসেবে ওর খুশিতে বাঁধা দেওয়ার অধিকার কি তোমার আছে, ইয়াজিদ?”

ইয়াজিদ স্তব্ধ হয়ে রইল। তানিয়া তার চোখের অশ্রুটুকু কাল্পনিক আঁচল দিয়ে মুছে দিয়ে পরম মমতায় বলল, “তোমার সিদ্ধান্তকে আমি বিন্দুমাত্র ভুল ভাবছি না, বরং সম্মান জানাচ্ছি। হিয়ার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য যদি তোমাকে পবিত্র বন্ধনে জড়াতে হয়, তবে তাই হোক। আমি বড্ড শান্তি পাব। এবার শান্ত হও, বাউন্ডুলে ঘুড়িটাকে এবার একটা চেনা লাটাইয়ের সুতোয় বাঁধতে দাও তো।”

বাতাসের এক ঝটকায় কল্পনার তানিয়া কর্পূরের মতো মিলিয়ে গেল। ইয়াজিদ ছবিটা বুকের মাঝখানে চেপে ধরে সোজা হয়ে বসল। তার চোখজোড়া এখনো ভেজা, কিন্তু মনের ভেতরের তীব্র ঝড়টা অলৌকিক শান্তিতে রূপ নিয়েছে। জীবন সত্যি থমকে থাকে না, স্রোত নিজের মতো করেই পথ খুঁজে নেয়।
.
অতঃপর, দেখতে দেখতে সেই কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলে এলো। পবিত্র শুক্রবারে দুই পরিবারের উপস্থিতিতে ঘরোয়াভাবে তাদের বিয়ের রেজিস্ট্রি সম্পন্ন হয়ে গেল। চৌধুরী বাড়ির ডাইনিং রুমটা সামান্য ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছিল। বিয়ের সব ফর্মালিটি শেষ করে যখন কাজি সাহেব মোনাজাত ধরলেন, তখন ঘরের এক কোণায় ইসরাতের কোলে বসে হিয়া ড্যাবড্যাব করে বাবার নতুন রূপ দেখছিল। ও বিয়ের পুরো সমীকরণটা বোঝে না, কিন্তু এটুকু বোঝে; আজ ওর জন্য খুব বিশেষ একটা দিন। মোনাজাত শেষ হতেই হিয়া এক ঝটকায় ইসরাতের কোল থেকে নেমে চপল পায়ে হেঁটে এসে সোজা রূপুর কোলের ওপর উঠে বসল। সরল সুরে বারবার জিজ্ঞেস করতে লাগল, “লুপু আন্টি, লুপু আন্টি… তুমি কি এবার সত্যি সত্যি আমার মা হবে? তুমি আর চলে যাবে না তো?”
.
.
.
চলবে…
[কার্টেসী ছাড়া কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ]
শব্দ সংখ্যা— ২৩৪০