#বাদামি_চোখ [০৬]
চোখ সরিয়ে নিলাম আমি! যে চোখ অজুহাতের দায়ে আবদ্ধ, সেই চোখ অপচ্ছায়ার উপর থেকে দূরত্ব বজায় রাখুক।
কিন্তু আমারই বা কি করার আছে? ইচ্ছে করে তো আর সামনে পড়ছিনা। লিয়নই বারবার শুধু সবকিছুতে সামনে আসছে, আবার আসার পেছনেও আছে জোরালো কারণ । দুই পরিবারের ভালো সম্পর্কের খাতিরে সেও না এসে পারবেনা। তবে আমার কেন জানি মনে হচ্ছে বিষয়টা ধিরে ধিরে বিকট আকার ধারণ করবে! বিয়ের পরে দেখা যাবে প্রতিদিনই লিয়নের সাথে আমার দেখা হচ্ছে।
আবার কোনো একদিন প্রসঙ্গের দরুন আমাদের পুরনো সম্পর্কের কথা উঠে আসবে। বিষয়টা তো তখন দুই পরিবারে বিরাট ঝামেলার সৃষ্টি করবে।
তখন তনয়ের পরিবার আবার লিয়নের পরিবারও অল্পকিছুতে আমাদের অতীতের উপর আঙুল তুলবে, আমার আত্মসম্মানবোধ কি তখন অটুট থাকবে? তাছাড়া তনয় হঠাৎ এসব শুনলে আমার উপর থেকে বিশ্বাস হারাবে!
আচ্ছা আমার কি সবকিছু তনয়কে আগেই জানানো উচিত ? তনয় তো কিছু জানে বলে একদমই সন্দেহ করতে পারছিনা, আবার নিজে থেকে কিছু বলার সাহসও করতে পারছিনা আমি। আজকেই বলবো নাকি অন্য সময়? কিন্তু এসব শুনে সে কেমন রিয়েক্ট করবে সেটা ভেবেই আমার ভেতরে চাপা ভয় বেড়ে চলেছে।
না না এটাকে আর বাড়তে দেওয়া যাবেনা। আমাকে যত দ্রুত সম্ভব বলার প্রস্তুতি নিতে হতে হবে।
এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেলো গায়ে হলুদ অনুষ্ঠান।
সবাই নাচছে গাইছে ফূর্তি করছে। আমিও সব ভাবনা তাড়িয়ে এসবের ভীড়েই আটকে গেলাম।
এদিকে তনয়কেও নিয়ে আসা হয়েছে, বিভিন্নভাবে আমাদেরকে শুধু ক্যামেরার মাথা ধরানো ফ্ল্যাশেই তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে, সবার কথা কথা শুনে শুনে নিজেদের অঙ্গভঙ্গী পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
ওর সাথে একটু কথা বলার সময়টুকুও যে আজ পাবো তারও কোনো সম্ভাবনা দেখছিনা।
‘
ঘড়িতে প্রায় ১২ বেজে পনেরো মিনিট। সবকিছু এখনো পুরো দমেই চলছিলো।
কিন্তু হঠাৎ সেসময় আমার ফোন হাতে ভাবি স্টেজে উঠে বললো,
‘ নিবিতা দেখো তো, বারবার এতো ফোন কে দিচ্ছে?
আমি ফোন হাতে নিয়ে তনয়সহ সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে তাকালাম। নাম্বারটা আমি চিনিনা, তাও আবার অদ্ভুত সংখ্যায়!
আমি ফোন রিসিভ করলাম, আমাদের চারদিকে গান বাজনার আওয়াজে ঠিকমতো কিছু শুনতেও পাচ্ছিনা। লাউডস্পিকার বাড়িয়ে সেটার পরিমাণ একটু কমিয়ে নিয়ে তারপর কানে দিয়ে বললাম,
‘ কে বলছেন প্লিজ জোরে কথা বলুন, এখানে অনেক আওয়াজ।
তখন মেয়েলি কণ্ঠস্বরে আওয়াজ আসলো,
‘ বেশ ফূর্তিতেই আছেন তাহলে বাদামি চোখওয়ালি?
আমি এই ধরনের অদ্ভুত প্রশ্নে প্রচন্ডরকম অবাক হলাম। কে আমার সাথে এভাবে কথা বলতে পারে?
আমি আমার অন্যহাত দিয়ে কথাগুলো স্পিকারের মুখোমুখি করার চেষ্টা করে বললাম,
‘ আমার বিয়েতে আমি ফূর্তিতে থাকবোনা? এটা কেমন প্রশ্ন? আর আপনি কে বলুন?
ফোনের ওপাশের মেয়েটা জোরালো শব্দে বললো,
‘ আমি কে? আমি কে জিজ্ঞাসা করছো তুমি? শুনো বলি, তুমি যেই আসনে এই মূহুর্তে বসে আছো সেই আসনে আমার বসে থাকার কথা ছিল। আমিই আজ গায়ে হলুদ মেখে নিজের হলুদ সন্ধ্যা সম্পন্ন করতাম!
আর আমার পাশে থাকতো সেই মানুষটা, যে এই মূহুর্তে তোমার পাশে আছে। কিন্তু আমি পারিনি, আমি পারিনি তোমার জন্য। তুমি আমার জীবনটা মারাত্মক পরিধিতে পৌঁছে দিয়ে একদম তছনছ করে দিয়েছো নিবিতা।
মেয়েটার কথা শুনে আমি এবার অবাকের শেষ চূড়ান্তে পৌঁছে গেলাম। ধমকের সাথে বললাম,
‘ কে আপনি? আর এসব কি বলছেন? আর আমার জন্য পারেননি মানে? আমি কি করেছি? আশ্চর্য!
মেয়েটা বেসুরে হাসতে হাসতে জবাব দিলো,
‘ কারণ আমার চোখ তোমার মতো বাদামি নয়। তাই আমি তোমার স্থানে বসার অধিকার হারিয়েছি। তোমার জন্য আমি আজ কনের বেশে থাকতে পারলাম না মিসস তনয় হায়দার!
এটা শুনে আমি পুরো স্তব্ধ হয়ে গেছি। কি বলছে সে? কে এই মেয়ে? বাদামি চোখ নিয়ে এটা আবার কিরকম নতুন ইস্যু? একজন বিচ্ছেদ ঘটালো এটার অধিকারী বলে , আবার আরেকজন বলছে তার অধিকার হরণ হয়েছে এটা নেই বলে! মধ্যে আমি একটা মাধ্যম! কি আছে এসবের পেছনে?
এদিকে তনয় আমাকে লক্ষ্য করছে, সে হাত নেড়ে জিজ্ঞাসা করলো,
‘ কার সাথে এভাবে রেগে কথা বলছো? দেখো ওরা তোমার ফোন শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছে। তাড়াতাড়ি রাখো এটা।
আমি তনয়ের কথা শুনে ফোনে খেয়াল করে দেখলাম লাইনটা এর মধ্যে কেটে গেছে। আমি বড় করে একটা ঢোক গিলে তনয়কে নাম্বারটা দেখিয়ে বললাম,
‘ নাম্বারটা চিনেন?
তনয় হেসে বললো,
‘ অদ্ভুত নাম্বার। না চিনিনা। কি বললো? আচ্ছা এসব পরে দেখবো। এখন সামনে মনোযোগ দাও।
আমি ফোনটা আমার বসার পাশেই রাখলাম। কিন্তু আমার ভেতরে কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। কে এই মেয়ে? তনয়ের সাথে তার কি কোন সম্পর্ক ছিল?
কিন্তু তনয়কে যতটা চিনেছি সে বড্ড সরল, এমন কিছু হলে সে আমাকে অবশ্যই কিছু বলতো। আগে থেকে আমাকে জানাতো!
আমি আমার মনকে স্থির করার চেষ্টা করলাম, এসব নিশ্চয়ই ষড়যন্ত্র। কেউ আমাদের বিয়েটা গন্ডগোল বাঁধিয়ে ভেঙে দিতে চাইছে।
কিন্তু এসব এই সময়ে এসে কে করবে? লিয়ন?
না না এ তো একটা মেয়ে ছিল! লিয়ন এটা এখন কেন করবে? বিয়ে নিয়ে আলাপ আলোচনার প্রথম থেকেই তো সে ছিলো, চাইলে পারতো তখনি কিছু করতে। এসময় এসে অন্তত এসব কিছু করার প্রয়োজন ছিল না।
তবে ওই মেয়েটার কথা কি সত্যি?
কিচ্ছু ভাবতে পারছিনা আমি! মেয়েটার কথা সত্যি হলে তো তনয়ও লিয়নের মতোই একজন অপরাধী, যে আমার সাথে না হোক অন্য কারো সাথে অন্যায় করেছে।
আমি আর আশেপাশে আনন্দ উল্লাসে মনোযোগ দিতে পারছিনা।
তনয় বিষয়টা খেয়াল করছে বারবার। বেশ খানিক্ষন পেরুনোর পরে আমার অস্থিরতার ভেতর ফোনের এসএমএস ভাইব্রেট বেজে ওঠলো। আমি তাড়ার সাথে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলাম সেই নাম্বারেই এসএমএসটা এসেছে।
লিখেছে,
‘ শুধু বিয়ে করতে পারবে,কিন্তু সুখী হতে পারবেনা তনয়ের সাথে। আমি থাকতে তা হতে দিবোনা।
এটা দেখতেই আমার বুকে অদ্ভুত একটা কম্পন হলো। আমার সন্দেহ পুরোপুরি পৌঁছালো লিয়নের উপর। আমি উঁকি মেরে ওকে খোঁজার আগেই দেখি সে তার মা’র সাথে বসে কথা বলছে।
আমি তবুও সন্দেহ দূর করতে পারলাম না, কিন্তু আবার আমার সন্দেহের মোড় ঘুরে গেলো নিমিষের মধ্যে , লিয়নের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই দেখি আরেকটা এসএমএস এসেছে, লিখেছে..
‘ এখনো সময় আছে কিছু করো।
লিয়নের হাতে তো ফোনও নেই আর কোনো মেয়েও এই। সে এসব করছেনা তাহলে কে আবার এই অন্য মানুষ ? আমি তনয়কে ইশারা করে বেশ সাহস নিয়ে বললাম,
‘ আপনার সাথে আমার কথা আছে, যেভাবেই হোক এখান থেকে উঠে অন্য কোথাও আসার ব্যবস্থা করেন, খুব দ্রুত।
তনয় ভ্রু কোঁচকে বললো,
‘ একি তোমাকে অনেক্ষণ থেকে বিষন্ন দেখছি। সবকিছু ঠিক আছে তো?
আমি মাথা নেড়ে বললাম,
‘ হ্যাঁ সব ঠিক আছে। কিন্তু আপনার সাথে আমার কিছু জরুরি কথা শেয়ার করতে হবে । আপনি এদিকটা সামলে আমার সাথে একটু আলাদা আসুন।
আমার কথা শুনে তনয়ও বেশ ভীত হয়ে বললো,
‘ আচ্ছা তুমি দাঁড়াও, এক্ষুনি আমি এখান থেকে উঠতেছি।
বলেই তনয় তার মাকে ডেকে কানে কানে কিছু বললো।
তনয়ের মা আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
‘ নিবিতা আসো আমার সাথে।
আমি উনার হাত ধরে সেখান থেকে নেমে এগিয়ে যাচ্ছি, তৎক্ষনাৎ একটা মানুষের উপর আমার চোখ আটকে গেলো, আর আমি থমকে দাঁড়িয়ে অস্পষ্ট স্বরে কিছু উচ্চারণ করতে চাইলাম! কিন্তু তার আগেই তনয়ের মা আমার হাত ধরে সেই জায়গাটা ত্যাগ করলো।
চলবে….
লেখাঃ #তাজরীন_খন্দকার