বিষ করেছি পান পর্ব-৫+৬

0
538

#বিষ_করেছি_পান(৫)

(কপি করা নিষেধ)
সকাল আটটা। ছুটি এখনো ঘুমে। মেয়েটাতো এতোক্ষন ঘুমায় না। আজ এতো ঘুমুচ্ছে কেনো? রুম্পা রিতীকে ডেকে ছুটির রুমে পাঠিয়ে দিলো। রিতী এসেই ছুটিকে তাড়া দিলো।
— এই ছুটি উঠ উঠ স্কুলে যাবিনা? নয়টা বাজতে চললো।
— চলুক।
— তোর ক্লাস কয়টায়? সাড়ে দশটা থেকে না ক্লাস? ভুলে গেলি?
— গেলাম।
রিতী ছুটির দিকে এসে মাথা নিচু করে। ছুটি বেঘোরে ঘুমাচ্ছে। ঘুমের মধ্যেই তাহলে কথা বলছে। কাধ ধরে রিতী ঝাঁকায়। রিতীকে ধাক্কা দিয়ে ছুটি পাশ ফিরে শোয়। নাহ!একে এভাবে তুলা যাবেনা। পানি মেরে তুলতে হবে। রিতী বাথরুমের দিকে যায়। পায়ে কি যেনো একটা বাজে। শাড়ি! লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। কার শাড়ি? এমন শাড়ি তো মায়ের নেই। শাড়িটা হাতে তুলে নেয়। নাকে একটা বিচ্ছিরি গন্ধ লাগে।সাথে সাথে রিতী শাড়িটা ফেলে দেয়। ছুটির দিকে চেঁচিয়ে বলে,
— শাড়ি কার?ইস কি গন্ধ! গোবরের গন্ধ আসছে শাড়ি থেকে আর তুই এটা ঘরে তুলে রেখেছিস? কোন ডাস্টবিন থেকে তুলে এনেছিস?
ছুটি আড়মোড়া ভেঙে বসে। বিরক্তি নিয়ে বলে,
— ইস আপু ঘুমাতে তো দিবে। সাত সকালে ষাঁড়ের মতো চিল্লাচ্ছো কেনো? এমনিতেই রাতে ঘুমাতে পারিনি,এখন না ঘুমালে সারাটা দিন আমার গচ্চা যাবে।
— সারারাত ঘুমাস নি মানে? তুই তো শুয়ে পড়লেই ঘুমাস। কি করেছিস সারা রাত?
রিতী সন্দেহভাজন দৃষ্টিতে তাকায়। আঙুল দিয়ে শাসিয়ে বলে,
— ছুটি! কি করেছিস বল। গোবর কোই থেকে মাখিয়ে নিয়ে এসেছিস। এই এদিকে আয় তো। উঠ।
রিতী ছুটির হাত ধরে টেনে উঠায়। ছুটির কাছে আসতেই গোবরের সেই গন্ধ টা পায়। চিৎকার দিয়ে বলে,
— ছুটি!তোর শরীর থেকেও গোবরের গন্ধ আসছে। তুই গোবর নিয়ে সারারাত বিছানায় কাটিয়েছিস ছিহ!
ছুটি আহত দৃষ্টি তে শাড়িটির দিকে তাকায়। তারপর নিজের দিকে। জামার কোনায় ছোট ছোট গোবরের ফোটা দেখা যাচ্ছে। কাল রাতে যা করেছে! দৌড়াতে গিয়ে গোবরের কাঁদিতে একটু পড়ে গিয়েছিলো। ক্লান্ত দেহ নিয়ে আর ফ্রেস হওয়া হয়নি। শাড়িটা কোনমতে খুলে বিছানায় ঝাপ দিয়েছিলো। একঘুমে এইযে উঠলো। রিতীর দিকে তাকিয়ে ঢুক গিললো। রিতী যা বোঝার বুঝে গেলো। কোন মতে জিজ্ঞাসা করলো,
— রাতে বাইরে ছিলি?
ছুটি অপরাধীর মতো তাকালো। কি বুঝে যে সব বুঝে যায় আপুটা ছুটির মাথায় আসেনা। এখন কোথায় ছিলি কি করছিলি না জিজ্ঞেস করলেই বাঁচা যায়। করুন গলায় বললো,
— আপু সরি।
রিতীর গলার রগ ফুলে উঠলো। চোখ বন্ধ করে উপর দিক তাকিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করলো। কতটুকু পারলো জানা গেলো না। তবে বের হবার আগে ঝাল মিটিয়েই গেলো। গোবরের শাড়িটা ছুটির মুখের উপর ছুড়ে — এখনি বিছানার চাদর সহ পরিষ্কার করবি। আমি কিচ্ছু সাফ করবোনা তোর। বলেই ঘট ঘট করে চলে গেলো। ছুটি নাকের উপর থাকা শাড়িটায় একটু নাক টানলো। ওক ওক করতে করতে বাথরুমে ছুটলো। পেটের নাড়িভুঁড়ি যেনো সব বের হয়ে আসার জোগাড়। ওমা কি গন্ধ!

ছাদে কাপড় মেলছে ছুটি। আজ বাধ্য হয়ে বেডশিট সহ তার ধুইতে হয়েছে। যে ধুইতে বলেছে তাকেও ছুটি মনে মনে ধুয়ে দিচ্ছে। একেই বলে যার জন্য করে চুরি তাকেই বলে চোর। ওরে আপুরে! তোর জন্য ই তো এতো বড় একটা অপারেশন করলাম। বুঝলিনারে বুঝলিনা! এই ছুটির ভালোবাসা বুঝলিনা। বক বক করতে করতেই চোখ পড়ে দুই বিল্ডিং পর সুন্দর বারান্দাটির দিকে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই চেঁচামেচি শুনতে পায়। ছাদে কেউ আছে। ছুটি ওড়নাটা কোমড়ে বেঁধে নেয়।একছাদ থেকে অন্য ছাদে লাফ দেওয়া তার জন্য ওয়ান টু ব্যপার। রতনদের বিল্ডিং এর ছাদে চলে আসে। এই ছাদ থেকে বাধনদের ছাদ একতলা নিচু তাই পুরোটাই দেখা যায়। ছাদের কিনারায় পর পর তিনটা জবা গাছ। তার মাঝখান দিয়ে উকি দিতেই ছুটির চোখ আটকে যায়। দেহ থমকে যায়। বুকের ভেতর ঢিপ ঢিপ করতে থাকে। দৃষ্টি কোন ভাবেই সংযত হতে চায়না। মাথাটা আরো ভেতর দিকে ঠেলে দিতেই ভেজা চুল গুলো গাছের ডালে আঁটকে টান পড়ে। চৌঠা ঠোঁটে আহহ শব্দ বেরিয়ে আসে। চুল ছাড়ানোর কোন ভাবগতিই দেখা যায়না। সে একধ্যানে শক্ত পোষ্ট পুরুষালি শরীরটাকে দেখতে ব্যস্ত। ছাদে বসে এভাবেও গোছল করা যায় ছুটির ধ্যানে ছিলোনা। দিক বেদিক ভুলে বসেছে সে। লোমকূপের ধার ঘেঁষে বেয়ে চলা জলের গতি দেখে ছুটির গলা শুকিয়ে যায়।শুকনো ঢুক গিলে বারবার। তবুও বেহায়া নজর সরাতে পারেনা।

বাঁধনের বার বার মনে হচ্ছে তাকে কেউ দেখছে।‌কিন্তু কে দেখবে? আশেপাশে দুটো কাক ছাড়া কাউকেই চোখে পড়ে না। ঝিমার দিকে দেখে সে সানন্দে ফুল গাছে পানি দিচ্ছে। একবার ও বাঁধনের দিকে তাকাচ্ছে না। বাঁধন ঝিমাকে ডেকে বলে,
— দেখতো ঝিমা কেউ আছে নাকি আশেপাশে?
ঝিমা আশেপাশে চোখ বুলিয়ে জবাব দেয়,
— নাতো ভাইয়া। কেউ নেই। কেনো?
— কিছুনা। তোর পানি দেওয়া শেষ হলে তাড়াতাড়ি রেডি হ। তোকে নামিয়ে তারপর অফিসে যাবো।

ঝিমাকে নামিয়ে যায় বাঁধন। ঝিমা ক্লাসে গিয়ে দেখে ছুটি অলরেডি বসে আছে। তাও আবার চোখ বন্ধ করে। পিঠে একটা চাপড় দিতেই ছুটি চোখ খুলে। ঝিমার দিকে কটমট করে তাকায়।
–কিরে ভুতুনি?দিন দুপুরে ঘুমাস কেনো?
— ঘুমাইনা। সপ্ন দেখি।
— কি সপ্ন?আমাকে নিয়েও দেখ।
— হুম। সপ্নে তুইও আছিস।
— ওয়াও ইন্টারেস্টিং। বল বল।
ছুটি ঝিমার দিকে ঘুরে বসে। বড় বড় করে তাকিয়ে বলে,
— দেখতো চোখের কোন পরিবর্তন হয়েছে নাকি?
–ঠিকিতো আছে।
— উহু। ঠিক নেই। আমার চোখ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। দিন দিন ছানি পড়ছে। এই ছানিটা একটা মানুষের আকৃতির। পুরুষ মানুষের। জানিস সেই পুরুষের বুক ভরা লোম!
— পাগল টাগল হলি নাকি?
— যদি কখনো হয়ে যাই তাহলে একমাত্র তুই চিকিৎসা করবি বুঝলি? তুই হচ্ছিস আমার জানের জিগার বান্ধুবী। আমি পাগল হলে একমাত্র সেই পুরুষ ব্যতীত তোকেই এলাও করবো। তোর বাড়িতে আস্তানাও গাঢ়বো। রেডি হ যদি পাগল টাগল হয়েই যাই।
— বুঝছি আজকে তোর ঘুম কম হয়ছে। চুপচাপ ঘুমা। স্যার আসলে বলবো তোর শরীর খারাপ।
— বিশ্বাস করবে?
— ঝিমা বললে সব বিশ্বাস করবে।
ছুটি তাই করে। বালিশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পরে ।কেউ তাকে ডিস্টাব করেনা। ঘুম ভাঙে বিকাল চারটায়।তাও আবার ছুটির বেলে। মচমচা শরীরটাকে টেনে ঝিমার পিছু পিছু বাইরে আসে। ছুটি দেখে বাঁধন এসেছে ঝিমাকে নিতে। কাছে কুলে অফিস থাকলে এই এক সুবিধা। বাথরুমের কথা বলেও বাইক দিয়ে বোনকে বাড়ি পৌঁছে দেওয়া যায়। ঝিমা হাত নাড়িয়ে বিদায় নিয়ে ফুস করে চলে যায়। ছুটি ধীর পায়ে রিকশার দিকে যায়। ভেতরে ভেতরে অজানা এক কষ্ট ভর করে।কি কষ্ট ছুটি জানেনা।
___________________
— আপু তুমি বিয়ে করবে কবে?
রাতের খাবার শেষে পানি খাচ্ছিলো রিতী। হুট করে ছুটির এমন প্রশ্নে মুখের পানি মাথায় উঠে যায়। খক খক করে কাশতে থাকে। রান্না ঘর থেকে রুম্পা দৌড়ে আসে। কি হলো!কি হলো! আস্তে খাবিনা? বলে দৌড়ে আসে। রিতীর পিঠে হাত বুলিয়ে দেয়। ছুটি উদাস চোখে তাকিয়ে থাকে। কোন হেলদোল নেই। রিতী চোখ রাঙায়। যার অর্থ এসব কি ধরনের কথা?অথচ মুখে কিছুই বলতে পারেনা। রুম্পা বেগম স্বয়ং উপস্থিত থেকে ধীরে ধীরে রিতীকে পানি খাওয়ায়। পরে না আবার পানি খেতে গিয়ৈ তালুতে উঠিয়ে ফেলে। রিতীকে রুমে পাঠিয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পরে পা টিপে টিপে তমাল রিতীর রুমে গিয়ে ঢুকে। রিতী তখন মাথা ঝুমিয়ে দুর্দান্ত এক পড়া শুরু করেছে। তমাল গিয়ে রিতীর গলা জড়িয়ে ধরে। রিতীর পড়ার গতি কমে আসে। তমাল কানে মুখ লাগিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
— বড়াপু তুমি সত্যি বিয়ে করবে?
রিতী তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। রাগটা ঝাড়তে গিয়েও থেমে যায়। পরেনা তমাল ভয় পায়। আর কাছেই আসবে না। মায়ের মতো বলবে বড়াপু রাক্ষসী,কাছে যাবো না। রিতী নরম হয়ে বলে,
— আমার কি বিয়ের বয়স হয়েছে?
তমাল ঠোঁট বাঁকিয়ে কিছুক্ষণ চিন্তা করে বলে,
— জানিনা।
— আমাদের মধ্যে বড় কে?
— বাঁধন ভাই।
— হুম। আগে বাঁধন ভাইয়ের বিয়ে হবে তারপর আমার বিয়ে হবে। যা ঘুমা।
–তোমার কাছে থাকবো।
— সুয়ে পর।
রিতী আবার পড়ায় মনোযোগ দেয়। কাল তার প্রাইভেটে এক্সাম আছে। পড়তেই হবে। ছুটিকে নাহয় পরে দেখা যাবে।

রিতীর এক্সাম শেষ হতেই সূর্য পশ্চিম দিকে পথ ধরেছে। পড়ন্ত বিকেলটা বড্ড বেশি ভালো লাগছে। হাতে যথেষ্ট সময় আছে। রিতীর হাটতে ইচ্ছে করছে প্রচুর। ক্যাম্পাসের রাস্তা টুকু আজ হাঁটবে বলে ঠিক করে। রাস্তার উপর কদম পড়ে আছে। যেগুলো আজ পড়েছে কি সুন্দর দেখাচ্ছে।অথচ কাল যেগুলো পড়েছিলো পচে কাঁদা কাদা হয়ে আছে। পরিস্কারের মামাটা ঠিক মতো পরিষ্কার করেনা। স্যারের কাছে ব্যপারটা তুলে ধরতে হবে। মাঝামাঝি যখন এসেছে তখন অনেক গুলো পায়ের শব্দ পায়। পেছন থেকে যেনো আসছে। কাউকে তাড়া করলে যেমন ঠিক তেমন। সামনে দিয়ে একটা বাইক চলে যায়। আর তার পিছনেই রিতীকে ওভারটেক করে ছুটে কিছু ছেলেপেলের দল। রিতী পিচের উপর থুবড়ে পড়ে। হাত দিয়ে কোনমতে থুতনিটা আটকে নেয়। আহহ করে উঠে জোরে। আওয়াজটা কারো কানে পৌঁছায় না। উঠতেও পারেনা। হাতে বেশ ব্যথা পেয়েছে। থুবড়ে বসেই দেখে বাইকের পেছনের ছেলেটাকে টেনে ধরে রাস্তার উপর ফেলা হয়। ড্রাইভারটা পালিয়ে যায়। ছেলেটাকে কয়েকটা পা একসাথে পিষে নেয়। ছেলেটার আত্মচিৎকারে রিতীর কানে তালা লেগে আসে। আর তাদের হেড যে ছেলেটাকে দেখা যায় তার ঠোঁটের কোনায় সেই বিখ্যাত বেনসন, চোখে কড়কড়ে নিল রোদচশমা, চাপ দাঁড়িতে মোড়ানো রক্তিম একজোড়া গাল।
চলবে,

#বিষ_করেছি_পান(৬)

(কপি করা নিষেধ)
রাস্তার পাশে আমিন ফার্মেসি। রিতী বসে আছে বেঞ্চির উপর। হাত দুটো ধরে আছে সোহাগ। সেই হাত ব্যন্ডেজ করছে হাতুড়ি ডাক্তার। ওষুধের যে তেজ! যতবার জলে উঠছিলো। ততোবার ই রিতী চোখ কুঁচকে নিচ্ছিলো। রিতীকে দেখে সোহাগের ভীষণ ভালো লাগছে। রিতী কষ্ট পাচ্ছে দেখে আরো ভালো লাগছে।
— আংকেল আগেই ব্যন্ডেজ করবেন না। আরেকটু ব্যাথা পাবার বাকি আছে।
সোহাগ হাতের ঘড়িটা দিয়ে রিতীর হাতে জোরে বারি দেয়। রিতী ব্যথায় ওমাগো বলে চিৎকার করে উঠে। ডাক্তার হকচকিয়ে বলে উঠে
— আরে আরে কি করছেন?
— আপনি চুপ থাকেন। নেন আবার ওষুধ লাগান।
রিতী ভেজা চোখে সোহাগের দিকে তাকায়। সোহাগের মুখটা শক্ত হয়ে আছে। ঠোঁটের কোনে লেগে আছে বাকা হাসি। ফর্সা মুখটা রিতীর কাছে ভয়ঙ্কর লাগছে। বড্ড ভয়ঙ্কর! ডাক্তার চুপসে গেছে। এতোক্ষণের ধারনা পাল্টে গেছে। রিতীর উপর কেয়ারিং ভাব দেখে ভেবেছিলো মেয়েটা লাকি। কেয়ারিং বয়ফ্রেন্ড পেয়েছে। এবার মনে হচ্ছে মেয়েটা আনলাকি। এক পাষন্ড খারাপ ছেলের কবলে পরেছে। যদিও মুখ দেখে বুঝার উপায় নেই। আজকাল ভালোমানুষী চেহারা কোনটা আর খারাপ মানুষী চেহেরা কোনটা বোঝা দায়! হাতে ঔষধ পড়তেই রিতী আরেকবার চোখ মুখ কুঁচকে নিলো। তা দেখে সোহাগের ঠোঁট জোড়া প্রশস্ত হাসলো। রিতী আড়চোখে দেখলো। সোহাগ একটু অন্যমনস্ক হতেই সামনে বসা ডাক্তারকে আস্তে আস্তে বললো,
— আংকেল আমাকে একটু বাড়ি পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে দিবেন? আমি বাড়ি যেতে চাই।
— তোমার বয়ফ্রেন্ড?
রিতী মাথা নাড়ালো। যার অর্থ আমার বয়ফ্রেন্ড না। ডাক্তার যা বোঝার বুঝে গেলো। সোহাগ সিগারেট ধরিয়েছে। রিতীর সামনে ধোঁয়া ছাড়তেই রিতী খক খক করে কেশে উঠলো। নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। ডাক্তার বললো,
— ভাই একটু বাইরে গিয়ে স্মোক করে আসেন।
সোহাগ কথা বাড়ালো না। রিতীর দিকে তাকিয়ে মেকি হাসলো। ধপ ধপ পা ফেলে ফার্মেসির সামনে এক কোনায় দাঁড়িয়ে স্মোক করতে লাগলো।

রিতীকে ধরে কোন মতে রিকশায় বসিয়ে দিয়েছে আমিন ডাক্তার। রিকশা টান দিতে বলেই পিছু ফিরতে দেখে সোহাগের মুখটা ঠিক তার মুখের উপরে। হাইটে ছোট হওয়ায় একটু লম্বা মানুষ কাছে আসলে ঘাড় বাঁকিয়ে চোগে চোখ রাখতে হয়। সোহাগ ভ্রু নাচায়।
— কি? হু? খুব সাহস না?
— মেয়েটা বাড়ি যাবে তাই রিকশায় উঠিয়ে দিলাম।
— আপনের গার্লফ্রেন্ড লাগে? হু? আমার নিয়ে আসছি দেখেন নাই? দরদ উথলে ওঠে তাইনা? কথা কসনাকে? ঐ ?
কলার টেনে ধরে সোহাগ। দোকানের কর্মচারী বেরিয়ে আসে। আশেপাশের মানুষ বেরিয়ে আসে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। যারা সোহাগকে চিনতো তারা ফোন দেয় রমিজ উদ্দিনের কাছে। রমিজ উদ্দিন নিজে আসেনা। পাঠিয়ে দেয় সোহাগের সাঙ্গপাঙ্গকে। পাঁচ মিনিটে ই তারা হাজির হয়। সোহাগ কে ছাড়িয়ে নিতেই সোহাগ শার্ট ঝাড়া দিয়ে সামনে যা পায় তাই লাথি মেরে বাইকের চাবি নিয়ে বেরিয়ে আসে। রিতী গলির মোড়ে পৌছোনোর আগেই পৌঁছে যায় সোহাগ। রিকশাওয়ালা কে ধমক দিতেই রিকশাওয়ালা রিকশা থামিয়ে এক সাইডে গিয়ে দাঁড়ায়। রিতীর দিকে আঙুল তুলে বলে,
— খুব সাহস না? ঐ নাম। রিকশা থেকে নাম। নাম বলতাছি।
রিতী শক্ত হয়ে বসে আছে। সে নামবে না। পেয়েছেটাকি? এইভাবে রাস্তায় একটা মেয়েকে হেনস্তা করবে কেউ কিছুই বলবেনা? সত্যিই বলবেনা। এলাকার সবাই এই বখাটেকে হারে হারে চিনে। কেউ কিছু বলতে এলে সোজা গিয়ে কলার চেপে ধরে। বড় ছোট কেউ পরোয়া করেনা। আস্ত বেয়াদব ছেলে একটা। রিতী নিজের পজিশন দেখে। এদিকটায় তার কলোনির কেউ বসেনা। আরেকটু এগিয়ে যাওয়ার পর রিকশা থামালেই হতো। সেখানে কলোনির মানুষ গুলোর আনাগোনা বেশ চলে। সেখানে কিছু বলতে পারতোনা। সোহাগ আবার গর্জে উঠে। রিতী ভয় পায়না। আজ তার ভয় নেই। এতো এতো শকড পাবার পর ভয় কাজ করার কথা না। অনুভুতি রা সব উড়ে গেছে। প্রথমে একটা ছেলেকে এভাবে মারলো। তারপর রিতীকে টানতে টানতে ফার্মেসিতে নিয়ে গেলো। ব্যথা হাতে আরো ব্যথা দিলো। ডাক্তারের সাথে ঝামেলা বাধালো। এখন রাস্তায় এসে বখাটে গিরি করছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে টিজ করা সিগারেট খাওয়া এসব কমন ব্যপার ছিলো। আজ একসাথে এতো রুপ রিতীকে অনুভুতি শূন্য করে দিয়েছে। এর জন্য ই বুঝি লোকে বখাটে সোহাগ বলে। এতো দিন শুনে আসছে সোহাগ বখাটের দল এটা করেছে ওটা করেছে কিন্তু আজ নিজের চোখে দেখছে কি লেভেলের খারাপ ছেলেটা।
রিতীর নামার কোনো ইচ্ছে নেই দেখে সোহাগ লাফ দিয়ে রিকশায় উঠে বসে। ব্যান্ডেজ করা হাত ধরে বলে,
— গইরামি করস? গইরামী ছুটাইয়া ফালামু। আমার উপর মাথা ঘোরাস। এতো সাহস তোর হইলো কোই থেকে? কথা কসনাকে? ঐ ?
রিতীর হাত ধরে ঝাকি দেয়। রিতীর আত্মায় পানি চলে আসে। হাত সরিয়ে নেবার চেষ্টা করে,
— আপনি কি চান কথাটা আমার বাবার কানে যাক?
— মুখ সেলাই করে দিমু একেবারে। কলেজে কি হয়ছে তুই দেখস নাই।
— আমি এখনের কথা বলছি। দেখেন আশেপাশের মানুষ দেখে দেখে যাচ্ছে।
— তো কি হয়ছে?
— আপনি আমাকে ডিস্টাব কেনো করেন সোহাগ ভাই? আমি আপনার কি ক্ষতি করছি?
সোহাগ রিতিকে ছেড়ে দেয়। রিতীর চোখে চোখ রেখে বাজে ইশারা করে। মুহুর্তেই রিতীর শরীরের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে যায়। মনে হয় কোন নর্দমায় ঢুবে আছে। দিক বেদিক চিন্তা না করে একলাফে রিকশা থেকে নেমে পড়ে। তর্জনী আঙ্গুল তুলে শাশিয়ে বলে,
— আপনি আর জীবনেও আমার সামনে আসবেন না।আরেকবার যদি আমাকে ডিস্টার্ব করেন আমি নিজে আপনার কথা বাবাকে বলে দিবো। তখন দেখবেন কি হয়।
— শ্বশুর বাবা আমার কচুটিও কাটতে পারবেনা।‌ আমিও দেখে নিবো।
রিতী একমুহুর্ত দাঁড়ায় না। দৌড়েই বাড়ি চলে আসে। বাবাকে আজ বিচার দিয়েই ছাড়বে। তারপর যা হবার হোক। বাবা মার রুমে গিয়ে কাউকে পায়না। মা মা বলে ডাকতে ডাকতে থাকে। ছুটির রুম থেকে রুম্পা সাড়া দেয়। রিতী সেখানে গিয়ে দেখে এলাহি কাণ্ড। শাড়ি, গহনা, জামা কাপড় সব প্যাকিং করা হচ্ছে। ছুটি ও মায়ের সাথে সাথে গুছিয়ে দিচ্ছে। তমাল ফোনে মনযোগ দিয়ে গেমস খেলছে। ছানোয়ার রিতীকে দেখেই চেয়ার থেকে উঠে আসে। রুম্পা তাড়াতাড়ি এসে রিতীর হাত দুটো ধরে। আতঙ্ক স্বরে বলে,
— ওমা! এ সর্বনাশ ঘটালি কখন! রিতীর বাবা দেখো এর জন্য ই আমার মনটা এতোক্ষণ কু গাইছিলো। আমার কান্না তো তুমি বিশ্বাস করলেনা।
— তুমি কেদেছো? দেখেতো বোঝা যাচ্ছে না। কাজল একটুও ছত্রেনি।
— চুপ কর। কিভাবে একাজ ঘটিয়ে এলি। তোর বাবা তো সারা শহর তোকে খুঁজে হয়রান হয়ে ফিরলো।
— এতো কম সময়ে!
ছানোয়ার রুম্মাকে ধমকে বললো,
— চুপ করতো। যত্তসব ভিত্তিহীন কথা সব এই মহিলার মুখ থেকেই বের হয়।
রিতীকে আদরের সুরে বললো,– আসো তো মা।
রিতীকে নিয়ে বিছানায় বসলো। হাত দুটো দেখে জিজ্ঞেস করলো,
— ব্যথা পেলে কিভাবে?
— পরে গিয়ে।
— সাবধানে চলবে। জানোতো কত চিন্তায় ছিলাম? তোমার কলেজ রোড়ে একটা এক্সিডেন্ট হয়েছে। ছেলেটাকে এভাবে মেরেছে যে হসপিটালে আইসিউ তে ভর্তি করানো হয়েছে। বাঁচবে কিনা মরবে আল্লাহ জানেন। তোমার কলেজে গিয়ে দেখি তুমি নেই। আশেপাশে খুঁজেও পায়নি।
— ছেলেটার কি অপরাধ বাবা?
— ড্রাংগসের সাথে নাকি জড়িত। সেখানেই কি একটা ঝামেলা হয়েছে। ওসব কথা বাদ দাও। তাড়াতাড়ি রেডি হও। ঘন্টা খানেক পর বাস ছাড়বে।
— কোথায় যাচ্ছি আমরা?
রুম্পা খুশিতে গদগদ করতে করতে বলেন,
— বিয়েতে যাচ্ছি। তোর লেবু মামার কথা মনে আছে? বাধনের মামা যে । পাঁচ বছর এখানেই ছিলো।
— হ্যা।
— তোর লেবু মামার বিয়ে। হুট করেই ঠিক হয়ে গিয়েছে। কাল গিয়ে কালই বউ তুলে আনবে। রাতের মধ্যে পৌঁছতে হবে। তোকে খুঁজে পেলে তো দুপুরের বাসেই রওনা দিতাম। তোদের ছাড়া নাকি তোদের মামা বিয়েতেই বসবে না।
রিতী ছুটির দিকে তাকায়। ছুটি চোখ টিপে দেয়। কুর্তির কলার উঁচিয়ে বলে,
— তোদের না হয়ে ছুটির হবে বুঝলে? ছুটি ছাড়া লেবু মামা বিয়ে করবে নাকি?
— সেটাই তো বলি। যা গলায় গলায় ভাব তোদের। কিন্তু আমি যাবোটা কিভাবে? হাত দুটো অকেজো করে ফেলেছি।
— তুমি কি হাত দিয়ে হাঁটবে নাকি পা দিয়ে হাঁটবে?
— কাজ কিভাবে করবো?
— কাজ কেনো করবো? আমরা তো মজা করতে যাবো, নাচবো গাইবো আর খাবো।
— সেজন্য আমার হাত দুটো লাগবো।জামা পড়তেও লাগবো। নাচতেও লাগবো। খাইতেও লাগবো।
— তার জন্য নিশ্চয় পার্মানেন্ট হেল্পার ও লাগবো? বলবো নাকি? তাহাকে?
ছুটি ফের চোখ টিপে দেয়। রিতী ছুটির উপর চেঁচিয়ে উঠে।
— খবরদার আর একটা কথা বলবিনা। তুই জানিস ঐ বেটা গুন্ডাটার জন্য আজকে আমার হাতের এই অবস্থা?
— কিহ ? আবার?
রিতী ছুটিকে খুলে বলেই ফুফাতে থাকে। ছুটি রিতীর চোখের জল মুছে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে দৌড় দেয়। শিপ্রুদের বাসায় এসে শিপ্রুর রুমে হুড়মুড় করে ঢুকে। শিপ্রু মৃদু হেসে বলে,
— আস্তে ঘুর্ণিঝড় আস্তে।
— শিপ্রুদা একটা কান্ড ঘটে গেছে। ঐ সোহাগটা আবার আমার আপুর পিছু লেগেছে। আজ তো আপুর হাতদুটোও থেঁতলে দিয়েছে।
— কি বলিস! বেটাকে এতো বড় একটা ডোজ দিলাম তাও বেটা আপুর পিছু ছাড়লো না?
— না। আমিতো ভুত ই সেজেছিলাম। স্বীকারোক্তি তো তোমরা নিয়েছো। স্বীকারোক্তি দেয়নি?
শিপ্রুর মুখটা চুপসে যায়। বিরবিরিয়ে বলে,
— সত্যিইতো স্বীকারোক্তি তো নেয়নি। আমরা তো বেটার অবস্থা দেখেই ফুল ফর্মে উত্তীর্ণ হয়ে গিয়েছি।
ছুটির কন্ঠে কান্না জুড়ে এলো,
— তাহলে এই প্ল্যানের মানে টা কি?

চলবে,