ভালোবাসার উল্টো পিঠে পর্ব-২৪

0
583

#ভালোবাসার_উল্টো_পিঠে
#চব্বিশ
প্রজ্ঞা জামান দৃঢ়তা

শীতের বিকেলের মিষ্টি রোদ একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে। গাড়িতে বসে ভয়, সংকোচ যেন রিদ্ধিকে জড়িয়ে ধরছিল। নানা ভাবনায় কখন গাড়িটা বাসার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতে পারেনি সে। গাড়ির দরজা রিয়ন খুলে দিল। রিদ্ধি দেখল সেই বাড়ি যেখানে সে জীবনের সবচেয়ে বেশি সময় কাটিয়েছে। যেখানে সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কগুলো বুঝতে শিখেছে।

সে অবাক হয়ে গেছে। বাবা-মা, রাইয়ান, খালা, দারোয়ান চাচা সবাই কী তার জন্য অপেক্ষা করছে! এই এতগুলো দিন তারা কী তাকে খুঁজেছে?

ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে গিয়ে বাবাকে সালাম করতে গেল। অদ্ভুত ব্যাপার! যেই বাবার পায়ে হাত রাখল সেই, বুক ফেটে কান্না আসল। হু,হু করে কেঁদে ওঠল। বাবা সালাম করা অবস্থায় তাকে উঠিয়ে বললেন, “কাঁদছিস কেন? সব ঠিক হয়ে যাবে বাবা আছি তো।”

বারবার একটা কথাই তার কানে বাজছে, “বাবা আছি তো!”

সেই ছোট বেলায় বাবা এমন করে বলতেন। কতদিন পর সেই কথা শুনে বুকের উপর থেকে বোঝা কিছুটা হালকা হলো। মাকে জড়িয়ে ধরতেই তিনি কাঁদলেন। রাইয়ান বোনকে জড়িয়ে ধরে বলল, “তুমি খুব পচা। খালি হারিয়ে যাও। তুমি জানো না তুমি না থাকলে আমাল কষ্ট হয়।

রিদ্ধি ভাইয়ের গাল টেনে বলল, “তোমাল আর কষ্ট হবে না। আমি আর কোথাও যাব না।”

তারপরই রাইয়ান রিয়নের কোলে বাবুকে দেখল। বাবা এগিয়ে গিয়ে প্রথমে রিহানকে কোলে নিলেন।

রিদ্ধি অবাক হয়ে দেখল রিহানের কপালে চুমু দেয়ার সময় বাবার চোখে জল পড়ছে। রিদ্ধির বুকের ভেতরটা হিম হয়ে আসল। বাবা তো খুব একটা কাঁদার মানুষ নয়। তবে এখন!

রাইয়ান বাবার কাছে গিয়ে বলল, “এতা কে বাবা?”

বাবা বললেন, “এতা রাইয়ানের বন্ধু। রাইয়ানের সাথে খেলবে। রাইয়ানকে মামা ডাকবে।”

রাইয়ান হা করে চোখ ছোট করে বলল, “দেখি তো আমাল ছোত্ত বন্ধুতাকে। বাবা আগে রাইয়ান সবচেয়ে ছোত ছিল। এখন রাইয়ান বড়। আর বন্ধু ছোত।”

সবাই তার কথা শুনে হাসছে। রিদ্ধি রাইয়ানকে কোলে নিয়ে বলল, “আপুনি এই তা, তা ভাইতাকে খুব মস করেছে জানো?”

আদর পেয়ে যেন রাইয়ানের আহ্লাদ বেড়ে গেল। সে গাল ফুলিয়ে বলল, “আমি তোমার ছাথে কথা বলব না।”

রিদ্ধি তার ফুলো গাল দুটোতে টোকে দিয়ে বলল, “আত্তা বলতে হবে না। বুঝলি রিয়ন আমি তবে চলেই যাই। রাইয়ান আমার ছাথে কথা বলবে না।”

সাথে সাথে রাইয়ান বলল, “আমার বন্ধুকে নেবে না।”

“ওলে বাবা বন্ধুর মাকে যেতে বলছো। অথচ বন্ধুকে থেকে যেতে বলছো!”

“তুমি ওর মা?” রাইয়ান যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। তার চোখ বড় বড় হয়ে গেছে।

রিয়ন তাকে বুঝানোর জন্য বলল, “এসব কথা পরে হবে রাইয়ান। আগে তোমার বন্ধুকে ভেতরে নিয়ে যাই?”

কথাটা শুনে রাইয়ান ব্যস্ত হয়ে গেল। রিদ্ধির চোখে বারবার জল আসছে। এত সুখ! এত সুখ সে পাওয়ার যোগ্য! এখানে এসে মনে হচ্ছে সে আগের রিদ্ধি আছে। এতটুকু কারো ব্যবহারে পরিবর্তন নেই। বাবাও আগের মতো হয়ে গেছেন।

কেউ তাকে কিচ্ছু জিজ্ঞেস করছে না। সে কোথায় ছিল! কার কাছে ছিল? কিচ্ছু না! একেই কী তবে রক্তের সম্পর্ক বলে! এটাই কী পরিবার! এত শক্ত, মজবুত সম্পর্ক আর কোথায় থাকতে পারে! তারপরও আমরা কেন পথভ্রষ্ট হয়ে যাই! কেন সব ছেড়ে চলে যাই!

★★★

রিদ্ধি নিজের বাসায় এসেছে প্রায় মাসখানেক হতে চলল। এর মধ্যে নাফিসা অনেকবার তাদের দেখতে এসেছে। রিদ্ধি শাহানেওয়াজের কথা জিজ্ঞেস করতেই সে জানাল। সে এখনও ফিরেনি। কথাটা শুনতেই রিদ্ধির ভয় করে। তার নানাভাই বাংলাদেশ, মায়ানমারের নাফ যুদ্ধের সময় শহীদ হয়েছেন। দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। তাই তার ভয় করে। বাবা আগে যতবার অপারেশনে যেতেন তার ভয় হত। বাবা এখন রিটায়ার্ড করেছেন তাই চিন্তা নেই। কিন্তু যেই মানুষটা তার জন্য এত করল তার কিছু হয়ে যাক সে কখনো চায় না। তাই তো সব থাকার শর্তেও কিছু একটা না থাকার ভয় মনের ভেতর ঝেঁকে বসেছে।

তার কেবলই মনে হয় মানুষটার ফিরে আসা অনেক জরুরি। তার সাথে অনেক হিসেব বাকি। নাফিসা বারবার তাকে নিরাশ করে চলে যায়। সে নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে তার সুস্থতা চেয়ে দোয়া চাইতে থাকে। তার বিশ্বাস আল্লাহর কাছে চাইলে তিনি কক্ষনো ফিরিয়ে দেন না।

রিদ্ধি রিহানকে নিয়ে নিজের ঘরে খেলছিল। এমন সময় রাইয়ান তার সামনে এসে বলল, “আপুনি বন্ধু আমাকে মামা ডাকে না কেন?”

রিদ্ধি তার ফোলা গালগুলো টেনে বলল, “ডাকবে রিহানের মামা। এত্তু সবর করা লাগবে যে।”

তাদের কথার মাধ্যমে রিদ্ধির বাবা ঢুকলেন। রাইয়ানকে অন্য রুমে যেতে বললেন।

বাবা রিহানকে আদর করে কিছু বলার জন্য ইতস্তত করতে লাগলেন। রিদ্ধি সেটা বুঝতে পেরে বলল, “বাবা কিছু বলবে?”

তিনি মেয়ের মাথায় হাত রেখে বললেন, “মা, আমি জানি তোর জীবনে অনেক ঝড় গেছে। এবার তোর একটা ব্যবস্থা করতে চাই।”

কথার ধরন বুঝতে পেরে রিদ্ধির বুকের ভেতর ধুকপুক করে উঠল। বিশ্বাস ভালোবাসা নিয়ে সে একজনকে ভালোবেসেছিল। কিন্তু আখেরে লাভ কি হলো! অপমান, অবহেলা ছাড়া কিছুই পায়নি। আবার এমন কিছুতে এগুতে পারবে না। যে ভয় মনের ভেতর রয়েছে তা কাটিয়ে উঠা সম্ভব নয়। কিন্তু বাবা যদি এমন কিছু বলেন তাহলে কি করবে সে!

বাবা আগেত মতোই মাথায় হাত রেখে বললেন, “জীবনে অনেক কিছু আসে, আবার চলেও যায়। এটাই জীবনের নিয়ম। আজ যা চলে যাওয়ায় কষ্ট হচ্ছে, একদিন তার চলে যাওয়াটা মহান আল্লাহর দেয়া নেয়ামত মনে হবে। জীবন কোনো ছোট বিষয় না। চাইলে এক পলকে কাটিয়ে দেয়া যায় না। আমি জানি তুই অনেক শক্ত মেয়ে। তাও আমার কেন যেন মনে হয় জীবনে এমন অনেক কিছু ডিজার্ভ করিস যা এখনো পাসনি। এ পৃথিবীতে সব মানুষ এক নয়। কিছু মানুষ আছে যারা তোর ভালো চায়। আমি বা তোর মা আমরা চাই না তুই সেসব সুখ থেকে বঞ্চিত থাকিস। আমি জানি তুই স্বাধীন একজন মানুষ
আমি সেদিনও তোর সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করিনি। আজও করব না। শুধু বলব ছেলেটা খুব ভালো। আমার অনেক পছন্দের। তোর জীবনের প্রতিটি কথা আমি তাকে বলেছি। সে মনোযোগ দিয়ে শুনেছে। এবং আমার কাছে তোকে ভিক্ষা চেয়েছে। আমি বলেছি তোর সাথে দেখা করতে।

কিন্তু সে বলেছে তোকে না দেখে তোর সম্পর্কে শুনেই সে তোকে বিয়ে করতে রাজি। আর রিহানের ছবি দেখে বলেছে আমাদের সম্পর্ক যদি হয়। তবে রিহান আমার ছেলে বলেই পরিচিত পাবে।

রিদ্ধি হতভম্ব হয়ে আছে। একটা মানুষ না দেখে বাচ্চাসহ ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করতে রাজি হয়ে গেল! হঠাৎ তার মনটা বলে উঠল তবে কী পৃথিবীতে মাহিদদের থেকে শাহানেওয়াজদের সংখ্যা বেশি!
এক শাহানেওয়াজ শেখ যে কোনোকিছু আশা না করে তাকে শুধু দিয়েই গেছে। আর এক এ-ই লোক যে না দেখেই তাকে বিয়ে করতে চাইছে। এই পৃথিবী সম্পর্কে তার যে গভীর তিক্ততা সৃষ্টি হয়েছে। সবসময় মনে হয়েছে খারাপ মানুষ ছাড়া ভালো মানুষ খুব নগন্য। কিন্তু আজ মনে হচ্ছে খুঁজতে গেলে হয়তো ভালো মানুষই বেশি মনে হবে।

সে ভাবল, “সারাজীবন বাবাকে কষ্ট দিয়েছি। আজ প্রথম বাবা নিজ থেকে আমার কাছে একটা আবদার নিয়ে এসেছেন। আমার কী উচিত তাকে ফিরিয়ে দেয়া! আমার মনের ভেতর পুরুষের যে চিত্র অঙ্কিত হয়েছে তা সরিয়ে নতুন কিছু আঁকা কী এতটাই সহজ!

কিন্তু বাবা! এই মানুষটা আমাকে শুধু দিয়েই গেলেন। আমি বারবার তার লজ্জার কারণ হয়েছি। তাকে ছেড়ে চলে গেছি। এই একটা বছর কোথায় ছিলাম একটা বার জিজ্ঞেস পর্যন্ত করেননি। আজ আমি তাকে কী করে নিরাশ করি।”

তারপর বাবার হাতটা রিদ্ধি মুঠোয় ধরে বলল, “বাবা আমার ভালো তোমার থেকে বেশি কে চাইবে। তুমি যা চাও তাই করো। শুধু একটা কথা আমার রিহানের কোনো ক্ষতি যেন না হয়।”

বাবা রিদ্ধির মাথাটা টেনে বুকে জড়িয়ে নিলেন। তারপর দু’ফোঁটা জল তার চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। রিদ্ধি বুঝল বাবা কাঁদছেন। এর আগেও বাবা কেঁদেছিলেন সেটা ছিল কষ্টের। আজকের কান্নাটা সুখের। রিদ্ধি স্বস্তিতে চোখ বন্ধ করল। এই প্রথম বাবাকে শান্তি দিয়ে নিজেই শান্তি পাচ্ছে। তারপর হঠাৎ বুকের ভেতর একটা ব্যথা খোঁচাতে লাগল।

“শাহানেওয়াজ শেখ!”

চলবে