#ভালোবাসার_উল্টো_পিঠে
#পঁচিশ
প্রজ্ঞা জামান দৃঢ়তা
সন্ধ্যার আকাশে একটু একটু করে অন্ধকার নেমে এসেছে। সারাদিন অকারণ আকাশের মন খারাপ ছিল। এই সুন্দর সময়টাতে তো মন খারাপ করে থাকার কথা নয়।
তারপরও সব কেমন যেন গুমোট হয়ে রয়েছে।
হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে কোথা থেকে এক পশলা বৃষ্টি ঝরঝরিয়ে পড়ল। সেই বৃষ্টি কী রিদ্ধিমার চোখের জল আড়াল করতে পারবে! নাকি তার কষ্টগুলোকে আড়াল করতে পারবে!
ছাদের কার্নিশে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সে। তিরতির করে বয়ে যাওয়া বাতাসের ঝাপটা শরীর ভেদ করে হাড়ে শীতের কাঁপুনি দিচ্ছে।
সে ভাবছে, “জীবনে আমি অনেক খারাপ সময় দেখেছি। বিশ্বাস করে ঠকেছি। আঘাতে অপমানে নিজেকে তুচ্ছ ভেবেছি। কিন্তু আজকের দিনটার অপেক্ষা কোনোদিন করিনি। সবসময় এটাই ভেবেছি আমার জীবনে আর কোনোদিন কোনো পুরুষের জায়গা হবে না। জীবনে কিছু মানুষের আগমন ভেতরটায় ভয় ঢুকিয়ে দেয়। এত ভয় যে, ফিরে তাকাতেও ভয় করে। চাইলেও তা এড়িয়ে যাওয়া যায় না।
কিন্তু শাহানেওয়াজ শেখ!
সে কেন কোনোদিন তার মনের কথা আমার সামনে জাহির করার চেষ্টা করেনি। কেন আমার দূর্বলতার সুযোগ নেয়নি! তবে কী আমার ধারণা ভুল? সব পুরুষ এক হয় না। সবাই মাহিদ হয় না!
সবসময় শাহানেওয়াজ শেখ নিজেকে আমার থেকে আড়ালে রেখেছে। একই বাড়িতে থাকার পরও কখনো বিরক্ত করতে আসেনি। কিন্তু তার কাছে টাকা ছিল, ক্ষমতা ছিল তারপরও নিজেরটুকু আদায় করার জন্য কিছুই করেননি। চাইলে জোর করতে পারত। চাইলে এমন অনেক কিছু করতে পারত যা তার জন্য সহজ ছিল। কিন্তু সে শুধু বিনা আশায় নিজেকে উৎসর্গ করে দিল! আর আমি শুধু নিয়েই গেলাম। তার ঋণ কোনোদিন শোধ করার সুযোগও পাব না। আর কখনো দেখা হবে কিনা আমি জানিও না। শুধু জানি আমি আজীবন তার কাছে কৃতজ্ঞ হয়ে থাকব।
আমার আল্লাহর উপর ভরসা করে আমি সব ছেড়ে দিয়েছি। উনার থেকে বেশি ভালো আমার কেই-বা চাইবে । জীবনে সবসময় আমি আল্লাহর কাছে নির্দিষ্ট করে প্রয়োজনীয় জিনিস চেয়েছি। কখন উনার উপর ভরসা করে বলিনি, “হে! আমার রব, আপনি আমার জন্য সেটাই করেন, যেটা আপনি ভালো মনে করেন।”
যদি এভাবে জীবনের শুরু থেকে সব চাইতাম তবে আমার জীবন আল্লাহ সুবান্নলাহ তা’য়ালা আরও সুন্দর করে দিতেন। কিন্তু আমার চাওয়া মানুষ আমায় কতটা যন্ত্রণা দিতে পারে এটা আমি কখনো ভাবিনি। আমার নিজের জন্য চাওয়া নির্দিষ্ট মানুষগুলো আমার যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাহিদ আমার জীবনে যে কারণেই আসুক তাতে আমি সুখি হতে না পারলেও আল্লাহর কাছাকাছি আসতে পেরেছি। আমার মালিকের হেদায়েত প্রাপ্ত হয়েছি। যে আমি আধুনিক জীবনের নামে বেপর্দায় চলাফেরা করতাম। যে আমি গুনাহ আর নেকির মাঝে পার্থক্য বুঝতে পারতাম না। সে আমি আল্লাহর রাস্তায় আসতে পেরেছি। নিজের যন্ত্রণা প্রকাশ করার জন্য একমাত্র ভরসার আল্লাহকে পেয়েছি। এই তো অনেক। সব খারাপের পেছনে একটা ভালো থাকে।
★★★
মাগরিবের আজানের সুরেলা ধ্বনিতে চারপাশ মুখরিত হয়ে উঠেছে। রিদ্ধিমা ধীর পায়ে নিচে নেমে ফ্রেশ হয়ে নামাজে দাঁড়িয়েছে। নামাজ শেষ করে মোনাজাত ধরে আল্লাহর কাছে হাত উঠাতেই তার ভেতরকার যন্ত্রণাগুলো অশ্রু হয়ে ঝরতে লাগল। অনেকক্ষণ কাঁদার পর বলল, “হে! আমার মালিক। আমার জীবনের জন্য আপনি সেটাই করেন যেটায় আমার সন্তানের জন্য ভালো হয়। আমার সন্তান ভালো থাকে। আমার নিজের জন্য আমি আর কোনোদিন কিছু চাইব না। শুধু আমার উপর আপনি রাজি হোন। আমাকে আপনার রাস্তায় চলার তৌফিক দান করুন। জীবনে যত রকম পরীক্ষার মধ্যেই আমায় পড়তে হোক না কেন। আমি যেন সর্বদা আপনার দেখানো পথে চলতে পারি। ধৈর্য যেন আমার নিশ্বাস হয়। সততা যেন আমার মেকাপ হয়। পর্দা যেন আমার সম্মান হয়। আমাকে আপনার দাসী বানিয়ে নিন। আমাকে আপনার প্রিয় বান্দা বানিয়ে নিন। আমাকে শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষা করুন। আমাকে আপনার করে নিন আমার মালিক। আমাকে আপনার করে নিন।”
রিদ্ধিমা কাঁদছে অঝোরে কাঁদছে। সে জানে তার সব যন্ত্রণা কোনো দ্বিধা ছাড়াই একমাত্র মহান রবের কাছে বলতে পারলে তার ভেতরটা শান্ত হয়ে যায়। এমন এক তৃপ্তিতে হৃদয় ভরে যায় যা প্রকাশ করার মতো নয়।
★★★
রাত আটটা। কাজী সাহেব চলে এসেছেন। বরও এসে গেছে। ডক্টর হুমায়রাকে রিদ্ধি কল দিয়েছে। তিনি নাফিসাকে সাথে নিয়ে এসেছেন। রিদ্ধি অনেক বার বারন করার পরও মেরুন রঙের জামদানী শাড়ি পরিয়ে দিয়েছে। শাড়ির সাথে হিজাব করেছে। সে বলেছে তার বাবা ভাইদের ছাড়া কারো সামনে যেন যেতে না হয়। সবাই তাতেই মত দিয়েছে। রিদ্ধির বাবা খুব খুশি মেয়ের এ-ই পরিবর্তনে। তিনি সবসময় এটাই চাইতেন। কিন্তু যে চাকরি তিনি করতেন। এতে সারাজীবন বাইরে কাটিয়ে দিতে হয়েছে। তাই তো চেয়েও অনেক কিছু হয়ে উঠেনি।
রিহান বিছানায় শুয়ে হাত-পা ছড়িয়ে খেলছে। রিদ্ধিমাকে ছেলের পাশে এসে বসেছে। দু’হাতে আঁজলা ভরে ছেলে মুখখানা ধরে কপালে চুমু দিচ্ছে। তার চোখ বেয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়ছে। ডক্টর হুমায়রা তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, “রিদ্ধিমা আল্লাহ তোমার ভাগ্যে নিশ্চয়ই ভালো কিছু রেখেছেন। চিন্তা করো না।”
রিদ্ধিমা কিছু বলল না। নাফিসা ছেলেকে কোলে নিতে চাইলে সে বারন করল। নিজেই কোলে নিল। মা এসে বললেন, “কাজী সাহেব ডাকছেন হয়েছে তোমাদের?”
নাফিসা জানাল হয়েছে। মা এসে রিদ্ধির মাথায় হাত রেখে ধরা গলায় বললেন, “আল্লাহ সব ঠিক করে দিবেন মা। আমার কলিজার টুকরা তুই। তোর জন্য আল্লাহর নিকট সবসময় দোয়া করি মা।”
রিদ্ধিমা মায়ের বুকে মাথা রাখল। এমন সময় রিয়ন রুমে আসল। বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “ছি! তোকে এত বাজে লাগছে। দেখ তোর বর না পালিয়ে যায়। বেচেরার কপালে শেষে কিনা এমন পেত্নী জুটছে। হায়! কপাল!”
রিয়নের কথা শুনে রিদ্ধি রাগী রাগী মুখ করে বলল, “দেখব কোন দেশের রাজকুমারী নিয়ে আসেন আপনি। ছোট বেলায় আমার যত চুল ছিঁড়েছিস। সেই রাজকুমারীর তত চুল যদি না ছিঁড়েছি। আমার নাম রিদ্ধিমা হায়দার না।”
“ইশ! কত শখ! তোকে আজ বিদেয় করে দিচ্ছি। আর এ বাড়ি আসবি না বলে দিচ্ছি। আমার বউয়ের পিছে লাগলে আমি তোর বাকি চুল গুলোও ছিড়ে নেব। হুম।”
মা এসে রিয়নের কান ধরে বললেন, “সারাক্ষণ আমার মেয়ের পেছনে লাগা তাই না।”
সবাই হাসছে। রিদ্ধিও কান্না চোখে হাসছে। রিয়ন বোনের পাশে এসে বলল, “চল আমি নিয়ে যাচ্ছি।”
রিদ্ধি ভাইয়ের মাথায় গাট্টা মেরে হাসল।
★★★
রিদ্ধিমার দুই ফুফু, তিন খালা, আর কাজিনরা ছাড়া তেমন কাউকে বলা হয়নি। সে বাবাকে বারন করেছে। অকারণে কাউকে ডাকার কোনো মানে হয় না। সবার মন মানসিকতাও এক নয়। এক একজন, এক এক রকমের কথা বলবে। তাই কাউকে ডাকা হয়নি।
রিদ্ধিমাকে তার রুমে রাখা হলো। তার সামনে ফুলের পর্দা দেয়া। পর্দার অপর পাশে বরকে বসানো হয়েছে। কেউ চাইলেও ওপাশ থেকে রিদ্ধিমাকে দেখতে পারবে না। সে খুশি হলো। তার ইচ্ছার মর্যাদা দেয়া হয়েছে। কারো সামনে অন্তত তাকে যেতে হচ্ছে না।
রিয়ন রিদ্ধিমার কানে কানে বলল, “তোর হবু বর রিহানকে কোলে নিতে চাইছে। ওকে আমার কাছে দে।”
রিদ্ধিমা চেয়েছিল বিয়ে হওয়ার সময় রিহান তার কোলে থাকবে। কিন্তু এখন এই লোক কেন চাইছে! মায়ের দিকে তাকাতেই তিনি ইশারায় সায় দিলেন। তাই অগত্যা তাকে রিহানকে দিতেই হলো।
কাজী সাহেব বারবার তাকে কবুল বলার জন্য বলছে।
বাবা তার মাথায় হাত দিয়ে সাইন করতে বললেন। কিন্তু তার চোখ ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে। চোখ বন্ধ করে জোরে শ্বাস নিল। বুকের ভেতরটা কবুতরের দূর্বল সিনার মতো বড্ড নাজুক, বড্ড নড়বড়ে হয়ে আছে। জীবনে দ্বিতীয় বার এক অজানার উদ্দেশ্যে পা বাড়াচ্ছে। চোখ বন্ধ করে মনে মনে বলল, “হে! আমার রব! আমার অজানা যাত্রায় আমার সহায় হোন। আমায় ধৈর্য দিন।”
তারপর শান্ত গলায় তিনবার বলল, “বিসমিল্লাহ কবুল।”
রিদ্ধিমার চোখ বন্ধ টপটপ করে চোখের জল পড়ছে।
চলবে।