ভালোবাসার উল্টো পিঠে পর্ব-১০

0
534

#ভালোবাসার_উল্টো_পিঠে
#দশ
প্রজ্ঞা জামান দৃঢ়তা

রাইয়ানকে নিয়ে রিদ্ধিমা গল্প করছে। এত দিনের অনেক কথা জমে আছে। যা আপুনিকে বলতে না পারলে রাইয়ানের যেন শান্তি নেই।

অনেক দিন পর ভাইয়ের কথা শুনতে ভালোই লাগছে তার। আগে যখন রাইয়ান সারাক্ষণ এসে বকবক করত, তখন মনে হত মাথা ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। এইটুকু দূরত্ব কেমন করে যেন সব পাল্টে দিল! পৃথিবীর নিয়ম গুলোও অদ্ভুত! যখন কাছের মানুষ পাশে থাকে তখন কদর করে না। যখন দূরে চলে যেতে লাগে তখন ছোট ছোট বিষয়গুলোও কত বড় সুখের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

রাইয়ানের সাথে গল্প করা অবস্থায় কলিং বেল বেজে উঠল। শরিফা খালা গিয়ে দরজা খুললেন। তিনি রিদ্ধির সামনে এসে দাঁড়ালেন, তার হাতে একটা ফুলের বুকে।

“আম্মা আপনের লাইগ্যা দিয়া গেছে। জামাই বাবা পাঠাইছে মনে অয়। বাপরে কী প্রেরেম না আসতেই ফুল পাঠাই দিছে!”

কথাগুলো বলার সময় শরিফা খালার চোখে-মুখে হাসি খেলা করছে। রিদ্ধির মুখে যেন অন্ধকার নেমে আসছে। সে ভালো করেই জানে মাহিদ তাকে ফুল পাঠাবে না। এ কয়দিনে অন্তত এটা সে বুঝে গেছে। তারসাথে এটাও জানে এই কাজটা কার। সে ভাবল, “আমার জীবনটা শেষ করে দেবে এই এস.এস। একবার সামনে পেলে মাথা ফাটিয়ে তবে ছাড়ব।”

মা রান্নাঘরে ড্রয়িংরুমে রাইয়ান আর শরিফা খালা ছাড়া কেউ নেই। তাড়াতাড়ি করে সে ফুলের বুকেটা নিজের কাছে নিয়ে নিল। দেখল কোথাও চিরকুট আছে কিনা।

আছে প্রতিবারের মতো নিল চিরকুট।

“আপনজনদের মাঝে এসে নিশ্চয়ই ভালো লাগছে। আজ আমারও মন ভালো। কারণটা জানতে চাইবেন না।

এস.এস

চিরকুটটা পড়ে রাগে গজগজ করতে করতে সে বলল, ” কারণ জানতে আমার বয়েই গেছে। এই লোক সামনে থাকলে এই ফুলের বুকে তার মুখে ছুড়ে মারতাম।”

“আপুনি কাকে ছুড়ে মারতে?”

রিদ্ধি হুশিয়ার হয়ে চারদিকে তাকাল। না কেউ শোনেনি।

রিয়ন পাশে এসে বসল। রিদ্ধি রাইয়ানকে ভেতরে পাঠিয়ে দিল।

“ভাই, বাবা বাইরে আসছে না কেন?”

“বাবা লাইব্রেরি রুমে বই পড়ছে। আজকাল ওখানেই বেশি সময় কাটান। কারো সাথে তেমন একটা কথা বলেন না।”

“আমার জন্য সব হয়েছে।” রিদ্ধির চোখ জোড়ায় বৃষ্টি নামল।

রিয়ন বোনের মাথা নিজের কাঁধে টেনে বলল, “ধুর পাগলি সব ঠিক হয়ে যাবে। বাবা রাগ করে আছেন। কিন্তু তোকে দেখে সে রাগ আর থাকবে না। ঠিক মোমের মতো গলে যাবে।”

ভাইয়ের কথায় তার মন ভরলো না। বুক ধুকপুক করছে। সবাইকে তো যেমন তেমন ভাবে ফেস করা গেছে। কিন্তু বাবাকে!

তার উপর কী এক পাগল লোকের পাল্লায় পড়ল। সে কোথায় যাচ্ছে তার সব খবর এই লোক কীভাবে জানে? সে কী রিদ্ধির পেছনে লোক লাগিয়েছে? ভাবতে ভাবতেই দেখল বাবা ড্রয়িংরুমে প্রবেশ করেছেন।

রিদ্ধিমা সোফা থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। হায়দার সাহেব মেয়েকে দেখে থমকে দাঁড়ালেন।

হাসার চেষ্টা করে স্বাভাবিকভাবে জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন আছো?”

“ভালো আছি বাবা। আপনি কেমন আছেন?”

“আলহামদুলিল্লাহ।”

বাবা কত স্বাভাবিকভাবে কথা বলছেন। তাকে দেখে মনেই হচ্ছে না কিছু হয়েছে। রিদ্ধি জানে ভেতরে ভেতরে তিনি কতটা কষ্ট পাচ্ছেন। রিদ্ধির খুব ইচ্ছে করল দৌড়ে বাবার বুকে ঝাপিয়ে পড়তে কিন্তু সে তা করতে পারল না। অপরাধবোধ, জড়তা সব যেন তাকে আটকে রেখেছে।

রিয়ন ইশারায় বাবাকে সালাম করতে বলল। রিদ্ধি ধীরে ধীরে বাবার দিকে এগিয়ে গেল। তিনি সেটা বুঝতে পেরে জায়গা থেকে সরে গেলেন। হাসি মুখে বললেন, ” আমার সুগার বেড়েছে রিয়ন। তোমার মাকে বলে দিয়ো রাতে খাব না।”

কথাটা বলেই বাবা রুমের দিকে চলে গেলেন। রিদ্ধির পা যেন কেউ নিচ থেকে টেনে ধরে রেখেছে। এই মানুষটিকে সে সব থেকে ভালো করে চেনে। সে জানে এ মানুষটি তাকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্যই চলে গেছে। ভেতরটা ভারি হয়ে এলো। বুকের রক্তক্ষরণ অশ্রু হয়ে ঝরে পড়তে লাগল। রিয়ন পেছন থেকে এসে বলল, “সবকিছু এলোমেলো হতে যেমন সময় লাগে। ঠিক হতে তার থেকে বেশি সময় লাগে। ধৈর্য ধর সব ঠিক হয়ে যাবে।”

সে রাতে রিদ্ধিমার ঘুম এলো না। মায়ের পাশে শুয়ে সারারাত কেঁদেছে। বাবাকে আড়াল থেকে দেখে এসেছে বিছানায় শুয়ে আছেন। হয়তো আজ রাতে তিনিও ঘুমাতে পারছেন না কে বলতে পারে!

★★★

রিদ্ধি সকাল বেলা নাস্তা করে বাসায় চলে এলো। আবার কয়দিন পর যাবে বলে জানিয়ে এলো। বাসায় এসে দেখে মাহিদ নেই। জরিনাকে জিজ্ঞেস করলে সে জানায় রাতে সে বাসায় ফিরেনি।

রিদ্ধি কল দিল কিন্তু সে রিসিভ করল না।

আননোন নম্বর থেকে কল আসল। রিদ্ধি জানে এই নম্বর কার। সে ভেবেই রেখেছিল আজ একটা হেস্তনেস্ত করে তারপর ছাড়বে।

“আপনি আমার পেছনে কেন লেগেছেন বলেন তো?”

“আমি কেন আপনার পেছনে লাগতে যাব?” শান্ত স্বরে উত্তর দিল।

“আমি কোথায় যাচ্ছি আপনি কীভাবে জেনে যান?”

ভদ্রলোক মনে হলো হাসছেন, বললেন, “এই অবস্থায় এত রাগ শরীরের জন্য ভালো না। নিজের খেয়াল রাখা উচিত রিদ্ধিমা হায়দার।”

রিদ্ধি শ্বাস নিয়ে নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে বলল,”আপনি কী চান আমার কাছে?”

“আমি চাই আপনি ভালো থাকেন। নিজের খেয়াল রাখেন।”

“স্রেফ এর জন্য আমার পেছনে পড়ে আছেন?”

“জি, স্রেফ এর জন্যই।”

“ওকে, তবে আমি যদি নিজের খেয়াল নিজে রাখি আপনি আমার পিছু ছেড়ে দেবেন তো?”

কিছুক্ষণ নীরবে কেটে যাওয়ার পর উত্তর এলো, “সত্যি যদি আপনি নিজের খেয়াল রাখেন। কে আপনার জন্য ক্ষতিকর, কে আপনার জন্য ভালো বুঝতে পারেন তবে আমি কথা দিচ্ছি কোনোদিন আমি আপনার পিছু নেব না।”

“ঠিক আছে। আমি রিদ্ধিমা হায়দার আপনাকে কথা দিচ্ছি। আমি নিজের খেয়াল নিজেই রাখব। কোনো মাফিয়ার ছায়ার প্রয়োজন আমার নেই।”

আরও কিছুক্ষণ নীরবে কেটে গেল। তারপর উত্তর এলো, “ভালো থাকবেন রিদ্ধি।”

শেষের কথাটা বলার সময় মনে হলো এত সুন্দর এত শান্ত গলায় স্বর রিদ্ধি কোনোদিন শুনেনি। কিছু একটা ছিল তার গলায় যার জন্য রিদ্ধিকে বাধ্য করেছে সেটা ভাবতে। এই প্রথম ভদ্রলোক তাকে পুরো নাম সহ নয়, বরং রিদ্ধি বলে ডেকেছে।

কল কেটে গেলেও রিদ্ধি অনেক চেয়েও এই বিষয়টা মন থেকে সরাতে পারল না। দেখল মাহিদ এসেছে।

কোথায় ছিল জিজ্ঞেস করায় জানাল বন্ধুদের সাথে ছিল। ও বাসায় ছিল না তাই মাহিদ তাকে মিস করছিল। বন্ধুদের সাথে থাকলে খারাপ লাগবে না তাই চলে গেল তাদের কাছে।

রিদ্ধি খুব খুশি হলো তাকে মিস করেছে শুনে।

সারাদিন মাহিদ আর বের হলো না। ওই বাসায় কী হয়েছে সব জানতে চাইল। রাতে ঘুমাতে যেয়ে সে রিদ্ধির মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, “রিদ্ধি অফিসের সমস্যা খুব বেড়ে গেছে। দশ লাখ টাকা ইমারজেন্সি প্রয়োজন। তুমি কী আমাকে সাহায্য করতে পারবে?”

রিদ্ধি বোকার মতো বলল, “আমি কীভাবে সাহায্য করব। গহনা তো আর নেই।”

“তোমার বাবার তো টাকার অভাব নেই। দশ লাখ টাকা ধার হিসেবে এনে দাও। আমি দু’মাসেই পরিশোধ করে দেব। প্লিজ রিদ্ধি আমায় বাঁচাও।”

রিদ্ধি মাহিদের হাত নিজের মাথা থেকে সরিয়ে বলল, “আমি পারব না মাহিদ। বাবা আমার সাথে কথা পর্যন্ত বলেননি। আমি কোন মুখে টাকা চাইব?”

“রিদ্ধি তোমার বাবার কাছে তুমি পুরো দুনিয়া। তুমি বললে তিনি তোমায় ফেরাতে পারবেন না। প্লিজ আমায় উদ্ধার করো এই শেষ বার। আর বলব না।”

“আমার পক্ষে সম্ভব নয় মাহিদ। আমি তোমাকে আমার পরিবারের সামনে ছোট করতে পারব না।”

“বাবা মায়ের কাছে ছোট-বড় কী রিদ্ধি? ছেলে-মেয়েদের বিপদে বাবা-মা তো সাহায্য করেন।”

রিদ্ধি অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। এই ছেলে তাকে বিয়ের আগে বলেছিল। তোমার বাবার যত টাকাই থাক আমি কখনো নিজেকে তার কাছে ছোট করব না। যদি দিনে এনে দিনে খাই, তাও না। আর আজ সেই মানুষের মুখে একি শুনছে সে!

“আমি সকালে তোমায় ও বাড়ি নামিয়ে দিয়ে আসব রিদ্ধি।”

রিদ্ধির কিছু ভালো লাগছে না। অন্যদিকে ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করল। কিন্তু ঘুম তার চোখে এলে তো!

চলবে