ভালোবাসার মৌসুম
সূচনা পর্ব
কলমে #aroshi_jahan_isha
ক্যালেন্ডারের পাতায় তখন আষাঢ় মাসের মাঝামাঝি।চারিদিকে তখন বৃষ্টির আমেজ শহরের অলিগলি থেকে পিচঢালা রাস্তায় ও বৃষ্টির পানি জমে টুইটুম্বুর। বাড়ির বেলকনিতে জমে থাকে বৃষ্টির ফুটা।এমনই এক বৃষ্টিময় সকালে শুভ্র কামিজ পরিহিত অষ্টাদশী রমনী মাইরা সিরি বেয়ে নিচে নামছিলো ধীরে ধীরে, লম্বা রেশমি চুল গুলো বাম কাঁধে পরে আছে অযত্নে।
সিরির শেষ প্রান্তে এসে পা থেমে গেলো মাইরার, চোখ জোড়া স্থির হয়ে রইলো সামনে দাড়িয়ে থাকা মানবের পানে।
আজ থেকে ঠিক ৪ বছর আগে এই মানুষটার সাথেই তার বিয়ে হয়েছিলো।
আর বিয়ের রাতেই মানুষটা তাকে ফেলে পারি জমিয়ে ছিলো সুদূর আমেরিকায়।
৪ বছর পর সেই মানুষটাই তার সামনে দাড়িয়ে আছে,সেই মুখ সেই মানুষ যার সাথে তার সাত জন্মের বন্ধন হয়েছিলো।
গায়ে থাকা ডার্ক নেভি ব্লু শার্ট খানা লেপ্টে আছে শরিরের সঙ্গে।
চার বছরে মানুষটা চেহারায় খানিকটা পরিবর্তন এসেছে,মুখ মন্ডলে হালকা চাপ দাড়ি। চোখের চাহনি তীক্ষ অথচ শান্ত, চোখের মনি নীল সচারাচর এরম চোখের অধিকারি মানুষ দেখা যায় না। উচ্চতায় কতো হবে হয়তো ৬ ফিট ৩ গলার বাম পাশে কুচকুচে কালো একখানা তিল।শুভ্র গায়ের রং বিদেশের মাটিতে থেকে যেনো তা আরও খানিকটা উজ্জ্বল হয়েছে।
তন্ময় হ্যাঁ মানুষটার নাম তন্ময় চৌধুরী, চৌধুরী নিবাসের প্রান সে।
মাইরা যখন তন্ময়ের পানে ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে ছিলো তখনই তন্ময়ের একমাত্র বোন তানিশা তন্ময় কে দেখে আনন্দে পুলকিত হয়ে ওঠলো।
ভাইয়া তু…..তুমি?
তন্ময় তানিশার পানে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলো।
তানিশা দৌড়ে এসে তার ভাইকে জড়িয়ে ধরলো,
মাইরার চোখ বেয়ে এক ফুটা অশ্রু গড়িয়ে পড়লো, অতঃপর দৌড়ে সিরি বেয়ে নিজের কক্ষে চলে গেলো।
তন্ময় আর তানিশা চেয়ে রইলো শুভ্র বালিকার পানে।
একে একে বাড়ির প্রতিটা সদস্য উপস্থিত হলো ড্রইং রুমে,
তন্ময়ের বাবা মিস্টার তাহসিন চৌধুরী ছেলেকে দেখে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন,কিছুটা রাগ আর ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেন তন্ময়ের পানে।
তন্ময়ের মা নেই তানিশার জন্মের ৫ বছর পরেই মারা যায়।
তন্ময়ের চাচা তুষার চৌধুরী তার স্ত্রী রুমি চৌধুরী এবং একমাত্র মেয়ে তন্নি বয়স ১০। এই হলো চৌধুরী নিবাসের সদস্য যদিও তাহসিন এবং তুষার চৌধুরীর একটা বোন আছে তার নাম জেবা সে বর্তমানে তার সপরিবারে কানাডায় থাকে।
একে একে সবার সাথে কুশল বিনিময় করে তন্ময় নিজের কক্ষে গেলো।লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলো।
সময়টা তখন গোধূলি লগ্ন পাখিরা ঝাঁক বেঁধে নিরে ফিরছে। পশ্চিমা আকাশটা তখন লাল বর্ণ ধারন করেছে, ধরনির বুকে বৃষ্টির কোনো চিহ্ন নেই অথচ সকালে তুমুল বৃষ্টি ছিলো।
মাইরা দুতলা বাড়ির ছাঁদে দাড়িয়ে আছে দৃষ্টি তার বহু দূরে, চোখ দুটো চিকচিক করছে। মাইরা দু’হাত ছাঁদের রেলিং এ রেখে চোখ বন্ধ করে পারি জমালো ৪ বছর আগের সেই অপ্রত্যাশিত অতীতের অধ্যায়।
অতীত
_________
আমার বয়স তখন সবে ১৪ চতুর্দশী উড়নচণ্ডী কন্যা তখন। রেশবপুর গ্রামে আমার জন্ম তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে জন্মের ৭ বছর পরেই বাবা কে হারাই।অতঃপর ঠাই মিলে চাচা চাচির সংসারে,অবাঞ্চিতা এক মানবী হয়ে।
দু মুঠো ভাত গিলতেও চাচির অনুমতি নিতে হতো।আমার চাচাতো বোন মীম তার পাতে জুটতো মাংস ভাত আর আমার পাতে ডাল ভাত,এক মুঠো ভাতের জন্য কতোযে চাচির পায়ে ধরেছি তার হিসেব নেই,দেখতে দেখতে বড় হলাম ১৪ বছরের কিশোরীতে রুপান্তরিত হলাম তখন আমি অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছিলাম,হুট করে একদিন বাবা মানে তন্ময়ের বাবা তাহসিন চৌধুরী আমাদের বাড়িতে যান,আমার বাবার বন্ধু ছিলেন তবে কোনো কারনে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।তারপরে আর যোগাযোগ হয় নি,আমি যখন চৌদ্দবছরের তখন তার আগমনে বদলে যায় আমার জীবন, চাচা চাচির কাছে আমাকে চায় যেনো তাকে দিয়ে দেয় সে আমাকে মেয়ের মতো রাখবে তবে চাচি তখন বুদ্ধি খাটায়।আমাকে সে দেবে না,যদি নিতেই চায় তবে যেনো তার ছেলের বউ করে আনে আর চাচিকে ১০ লক্ষ টাকা দেওয়া হয়।
তাহসিন চৌধুরী তখন রাজি হয় চাচির এহেম প্রস্তাবে।
সেদিন ছিলো,ডিসেম্বরের ১৩ তারিখ গ্রামে তখন শীতের তান্ডব। সেই সন্ধ্যায় আমার বিয়ে হয় চতুর্দশী এক কন্যার বিবাহ হয় ২৫ বছর বয়সী একজন পুরুষের সঙ্গে। আর বিয়ের রাতেই আমাকে ফেলে আমার স্বামী পারি জমায় সূদুর আমেরিকায়।আর কখনো যোগাযোগ করার প্রয়োজন মনে করে নি হয়তো,বিগত ৪ বছরে তার সাথে আমার কথা হয় নি সাক্ষাৎ হয় নি,কোনোকিছুই হয় নি তবুও আমার বক্ষ মাঝে তার জন্য অনুভূতিরা নেচে বেড়াতো, তার সাথে আমার ক্ষনিকের মূহুর্তে হাতে গুনা ৫/৬ ঘন্টা হবে। তবে কথা হয় নি তবুও আমি তাকে নিয়ে রোজ ভাবতাম। কারণ সে আমার স্বামী আমার অভিভাবক ছিলো।
সে যখন আমাকে একা রেখে চলে গেলো ভিনদেশে তখন আমার জীবনটা আঁধারে তলিয়ে গেলো। তন্ময়ের পরিবারে তখন আমার কোনো মূল্য ছিলো না তানিশা আমাকে দোষী করেছিলো সেদিন তার ভাইয়ের চলে যাওয়ায়।চাচি চাচা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো, ১০ বছরের তন্নিও কথা শুনিয়েছে শুধু তাহসিন চৌধুরী তাকে নিজের মেয়ের জায়গা দিয়েছে।স্কুলে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলো,সহপাঠীরা রেগিং করতো তার স্বামী তাকে ফেলে চলে গেছে, তারপরে কলেজে ওঠলো সেখানেও সবাই রেগিং করতো মাইরা চুপচাপ শুনতো প্রতিবাদ করতো না,সেইসময় তার পাশে একজন এসে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলো সে হলো তাহসিন চৌধুরী মাইরা যেনো আরও একবার বাবা নামক বটগাছটা পেয়েছিলো।সমবয়সী তানিশার সঙ্গেও মাইরার ভাব জমেনি করণ তানিশা নিজের ভাইয়ের বাড়ি ছাড়ার কারণ হিসেবে মাইরার দিকে আঙুল তোলেছিলো।
প্রতিবেশীরাও কথা শুনাতো মাইরা কে মাইরা শুধু শুনতো,কখনো প্রতিবাদ করতো না কিসের প্রতিবাদ করবে তারা তো ভুল কিছু করে নি সত্যিটাই তো বলতো সত্যি তো মাইরা অভাগী কালনাগিনী নয়তো জন্মের ৭ বছরের মাথায় বাপ মা খায় আর বিয়ের পর তাকে ছেড়ে কেনো চলে গেলো তন্ময় থেকে গেলে পাড়তো না।মাইরাকে ভালো না বাসুক তবুও কাছে থাকতে পারলো না।এ নিয়ে শত শত অভিযোগ পুষে রেখেছে অষ্টাদশী রমনী।
কি ভাবছিস মা?
মাইরা খানিকটা ভরকে গেলো কারো কন্ঠে, নিজেকে সামলে নিলো পরক্ষণেই।
পিছু ফিরে তাহসিন চৌধুরী কে দেখে বললো,
বাবা তুমি এখানে?
তাহসিন চৌধুরী মাইরার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন”
“মন খারাপ?
মাইরা মাথা নেড়ে না জানালো?
তাহসিন চৌধুরী মাইরার পানে চেয়ে মৃদু হেসে বললো, বাবার কাছে মিথ্যে বলতেও শিখিস নি, বোকা মেয়ে!
মাইরা জরিয়ে ধরলো বাবাকে, ফুপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বললো,তুমি ছাড়া আর কেউ নেই আমার বাবা,তুমি থেকে যেও সারাজীবন আমার ছায়া হয়ে”!
তাহসিন চৌধুরী আশ্বাস দিয়ে শুধালেন,
আছি তো আমি,চিন্তা কিসের তোর।
দূর থেকে একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখ চেয়ে রইলো তাদের পানে,,,,,,,,,,
চলবে…..

