Home "ধারাবাহিক গল্প ভালোবাসার মৌসুম ভালোবাসার মৌসুম পর্ব-০৫

ভালোবাসার মৌসুম পর্ব-০৫

0
308

#ভালোবাসার_মৌসুম
#aroshi_jahan_isha (বেলিপ্রিয়া)
পর্ব : ৫

শ্রাবণের সকাল,শেষ রাতে ধরুনি জুড়ে বৃষ্টি নেমেছিলো।বৃষ্টির পানি এখনও জমে আছে পিচ ঢালা রাস্তায়। রাস্তা পাশে থাকা সবুজ ঘাসে পানিতে টুইটুম্বুর,
আকাশে এখনও সূর্য ওঠে নি,ঘড়ির কাঁটায় বোধহয় সকাল ৬ টা বাজে।আকাশটা কেমন ধূসর কালার হয়ে আছে।

ঢাকা-চট্রগ্রাম হাইওয়ের দুপাশে ভেজা সবুজ ফসলের মাঠ।দূর দূরান্ত জুড়ে ধান খেত,প্রকৃতি সবুজের সৌন্দর্যে মেতে আছে।

পিচ ঢালা রাস্তায় ছুটে চলছে চার চাকার একখানা সাফেদ রঙের গাড়ি।রাস্তায় পরে থাকা গাছের পাতা গুলো পিসে দিচ্ছে গাড়ির চাকা।

প্রভাতের এই মৃদু মন্দ হিমেল হাওয়া কারো কাছে প্রশান্তির আর কারও কাছে বিষাদের।

তানিশা তিন্নি খুনসুটিতে মেতে আছে, রুবি খিলখিলিয়ে হাসছে তাদের কান্ডে।তন্ময় গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে ফ্রন্ট মিররে দেখছে তাদের, হুট করে খেয়াল করলো মাইরা একপাশে বসে আছে আনমনে। বিষাদে ছেয়ে আছে তার মুখমন্ডল।

এগারোটা নাগাদ চট্টগ্রামে এসে পৌঁছালো সবাই।রুবির বাপের বাড়িটা বেশ বড়ো,বাড়িতে বিশাল এক উঠোন তার পাশেই তিন তলা বিশিষ্ট একখানা বিল্ডিং।

রুবির একমাত্র ভাই রুবাব সওদাগর, বয়স ৫০ পেরিয়ে। এক ছেলে দুই মেয়ে,বড় মেয়ে পিহু আর ছোট্ট মেয়ে পাখি, বয়স ১৬ হবে আর ছেলে তিয়াশ বয়স ১২ কি ১৩ হবে।

সওদাগর বাড়িতে আজ আত্মীয়দের আমেজ।পিহুর দুই মামা,এক খালা এবং কাজিন রা সব হৈ-হুল্লোড় করছে।আজ রং খেলা হবে বিধায় বাড়ির ছাঁদে আয়োজন চলছে।

রুবাব সওদাগরের একমাত্র বোন রুবি,ছোট বেলায় বাবা মা হারিয়ে বোন কে নিজের প্রাণ বানিয়েছে। বড়ো আদরের বোন রুবি তার, সেই সুবাধে চৌধুরী নিবাসের প্রতিটা সদস্য তার প্রিয় আত্মীয়। বিশেষ করে তন্ময় কে তার দারুণ লাগে।ছোট বেলায় যখন আসতো সারাদিন তার পেছনে ঘুরঘুর করতো।

সবার সাথে কুশল বিনিময় করার এক পর্যায় পিহুর খালা মাইরার দিকে আঙুল দিয়ে বললো,

“রুবি এই মাইয়া কে?ওরে তো ঠিক চিনলাম না”!

মাইরা ইতস্তত বোধ করলো, সবার পানে নজর দিলো,রুবি খানিকক্ষণ চুপ থেকে বললো,তন্ময়ের বউ ”

তন্ময় ভরকে গেলো, কেশে উঠলো।
কাকিয়ায় পানে চেয়ে বললো, কি বলছো এসব?

পিহু ফোড়ন কেটে বললো,
লজ্জা পেতে হবে না ভাইয়া, এ যুগে এসে লজ্জা পেলে কি হয় বলো?

তন্ময় পিহু”র কান টেনে ধরে বললো, পেকে গেছিস না?

পিহু ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠলো,
“তন্ময় ভাই ছাড়ো লাগছে,ভাবি কিছু বলো ভাইয়া কে,আউচচচচচ ছাড়ো ভাইয়ায়াাাাাাাাা,,,,,,,,,,,

মাইরা বোকার মতো চেয়ে রইলো, তার কানে এখনো বাজছে রুবির বলা কথাখানি,
” তন্ময়ের বউ ”

সে কি সত্যি তন্ময়ের বউ,না তন্ময়ের বউ তো সে হতে পারে নি,হলে তো তার একটা সংসার হতো।তবে কেনো চার বছরে তার একটা সংসার হয় নি।কেনো সে তন্ময়ের বুকের বা পাঁজরে মাথা রাখতে পারে নি?
হ্যাঁ তন্ময়ের বউ সে কাগজে কলমে হলেও সত্যিটা তো ভিন্ন।

মাইরার ভাবনার মাঝেই, পিহু মাইরার বাহু আঁকড়ে ধরে বললো, ভাবি চলো।

মাইরা হকচকিয়ে গেলো, পিহু ভ্রু কুঁচকে বললো, কি হলো চলো।

মাইরা মৃদু হেসে বললো, হু চলো”

দুতলার শেষ কক্ষের দাঁড়ে এসে থামলো পিহু, মিষ্টি করে হেসে বললো, যাও রুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে চটজলদি তৈরি হয়ে নাও রং খেলা শুরু হয়ে যাবে,আমি আসছি”

বলেই হনহনিয়ে চলে গেলো, মাইরা মৃদু হেসে কক্ষে প্রবেশ করতেই ভরকে গেলো,অনাকাঙ্ক্ষিত মানব কে দেখে অবাক হলো।আশ্চর্য বনে কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইলো অর্ধনগ্ন মানবের পানে,কোমরে জড়ানো একখানা সাদা তোয়ালে, উন্মুক্ত তার শরীর, মাএই গোসল করেছে বোধহয় কপালে লেপ্টে আছে ভেজা চুল। গায়ে বিন্দু বিন্দু পানি জমেছে।

দুজনে চোখাচোখি হতেই, মাইরা চোখ বন্ধ করে চিৎকার দিতে যাবে অমনি তার মুখ চেপে ধরলো তন্ময়। মাইরার নিশ্বাস টা বোধহয় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পায়তারা করছে।কাঁপা কাঁপা চোখে চাইলো,তার হয়েও না হওয়া মানবের পানে,দুজনেই চেয়ে রইলো একে অপরের পানে,
“একজনের চোখে অভিযোগ, অপর জনের চোখে কৌতূহল ”

মাইরার হাত খানা তন্ময়ের উন্মুক্ত কোমরে,যদিও এতে ওর হেলদোল নেই। কেবল চেয়ে আছে তার খুব প্রিয় একটা মানুষের পানে।যার কাছে সে অবাঞ্চিতা।

তন্ময় হুট করে মাইরা কে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো,

অষ্টাদশী তল সামলাতে না পেরে ছিটকে পরলো আলামরির দড়জায়, পিঠ গিয়ে ঠেকলো একখানা লোহার তৈরি কিছু একটাতে, সঙ্গে সঙ্গে রমনী ব্যথায় কুঁকড়ে ওঠলো,বা চোখ গড়িয়ে অশ্রু পড়লো।

তন্ময় হতভম্ব হয়ে ছুটে এলো,মাইরার বাহু ধরে বললো, ব্যথা পেয়েছো,আমি সরি বুঝতে পারি নি তুমি এভাবে পড়ে যাবে।কোথায় লেগেছে দেখি।

মাইরা মাথা নেড়ে বলে ওঠলো, না লাগেনি ঠিক আছি আমি।আপনি চিন্তিত হবেন না।

তন্ময় শুনলো না অষ্টাদশীর কথা অধিকার খাটিয়ে পাজ কোল করে বিছানায় এনে বসিয়ে দিলো,

মাইরা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে আছে,বিশ্বাস করতে পারছে না তন্ময় তাকে নিয়ে ভাবছে।

মাইরার পিঠে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চুল গুলো সরিয়ে দিলো তন্ময়, দৃশ্যমান হলো অষ্টাদশীর রক্তাক্ত পিঠ খানা। নীল রঙের কামিজ খানা লেপ্টে আছে রক্তে ভিজে, তন্ময় আঁতকে উঠলো,আদুরে কন্ঠে শুধালো,
রক্ত পরছে নিশ্চয়ই খুব ব্যথা করছে!

মাইরা ঝলঝল নয়নে চাইলো,চিন্তায় আধখানা হয়ে যাওয়া মুখশ্রীতে।ইস কি চিন্তা সেই চোখে,
মানুষ”টাকে রোজ এভাবে চিন্তিত করে দিলে মন্দ হতো হতো না।এতে মাইরা খানিকটা রক্তাক্ত হলেও যায় আসে না,

কি হলো,দেখি কতোটুকু কেটেছে?

“মাইরার ভাবনায় ছেদ পড়লো,অতঃপর ওঠে দাড়ালো তন্ময়ের পানে চেয়ে বললো,

আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি”

“আগে দেখি কতোটা কেটেছে?

মাইরা মৃদু হেসে বললো, আপনি এ ঘড়ে যে পিহু তো আমাকে থাকার জন্য এই রুমটা দেখিয়ে দিয়েছিলো!

তন্ময় কপাল কুঁচকে বললো, ওই কাকিয়া বললো,এখানে যতোদিন থাকবো তোমার সাথে এক রুমে থাকতে,নয়তো সবাই খারাপ ভাববে,

মাইরা শান্ত কন্ঠে বললো, ওহ্

ব্যাগ থেকে সাদা একখানা জরজেট গাউন বের করে নিলো,অতঃপর ওয়াশরুমে চলে গেলো।

প্রায় ২৫ মিনিট মতো সময় নিয়ে গোসল শেষ করে ওয়াশরুম থেকে বের হলো,ফর্সা শরিরের সাদা রঙের গাউন খানা মন্দ লাগছে না। বিশাল ঘেড়ের তৈরি গাউন এর সাথে স্কার্ট প্লাজু আর গলায় সাদা ওড়না, পিঠ পর্যন্ত চুল গুলো ভিজে জবজব হয়ে আছে, ওয়াশরুম থেকে বের হতেই দেখা মিললো তন্ময়ের,সাদা শার্ট, কালো পেন্ট পরিহিত সুদর্শ যুবকের পানে। হাতে তার মলম।

মাইরাকে দেখে এগিয়ে এলো, মাইরা তখন ড্রেসিন টেবিলের আয়নার সামনে দাড়িয়ে। দৃষ্টি তার তন্ময়ের পানে।

তন্ময় ধির পায়ে এগিয়ে এলো, শান্ত কন্ঠে বললো,
মলম লাগিয়ে দিচ্ছি, আর দেখি কতোটা কেটেছে!

মাইরা চুপটি করে দাঁড়িয়ে আছে।

তন্ময় বেশ অধিকার দেখিয়ে মাইরার পিঠে থাকা ভেজা চুল গুলো সরিয়ে দিলো, সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যমান হলো উন্মুক্ত পিঠে রক্তের চিহ্ন। জামার পেছনের গলা অনেকটাই বড় সম্পূর্ণ পিঠ দৃশ্যমান।তন্ময় মাইরার ক্ষত দেখে ভ্রু কুঁচকে বলে ওঠলো,

তুমি কি মানুষ এতোটা কেটেছে অথচ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছো!ব্যথা করছে না তোমার?

মাইরা মৃদু হেসে বললো,
” আমার মন যে কেটে ক্ষত বিক্ষত হয়ে আছে,তাই হয়তো শরীরের ব্যথা পোড়াচ্ছে না।

তন্ময় কপাল কুঁচকে বললো, মানে?

আপনি বুঝবেন না।
জরদি লাগিয়ে দিন ওষুধ আমকে বাহিরে যেতে হবে।

তন্ময় তুলু দিয়ে ক্ষত স্থান পরিষ্কার করে নিলো,মাইরা চোখ বন্ধ করে রইলো,

তন্ময়ের দৃষ্টি অষ্টাদশীর মুখপানে, চোখ ছোট করে মনে মনে আওড়ালো,একটু আগে না বললো ব্যথা লাগছে না খন কেনো ব্যথায় চোখ খিঁচে আছে,ইচ্ছে করে খানিকটা চেপে ধরলো,

অষ্টাদশী নড়ে ওঠলো,হাত উল্টে তন্ময়ের হাত চেপে ধরে বললো, আমাকে কষ্ট দিয়ে কি সুখ পান আপনি?

তন্ময় চুপ করে মলম লাগিয়ে দিলো,অতঃপর মাইরার পানে চেয়ে বললো,

আমি কাউকে কষ্ট দিতে চাইনা মেয়ে,তবে কেউ যদি সেচ্ছায় আমার দহনে পুড়তে আসে তাতে আমার কি দোষ বলো,আমি হলাম তোমার বাগানের নীল রাঙা বিষাক্ত ফুল, যেই ফুল ছুঁতে গেলে বিষাক্ত কাঁটার আঘাত নিশ্চিত অথচ তুমি বিষাক্ত কাটার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হতে মরিয়া হয়ে আছো।

মাইরা ফেল ফেল করে চেয়ে রইলো, অতঃপর হুট করে বলে ওঠলো,

“বিষাক্ত কাটার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েও যদি গোটা আপনি টাকে আমার করে পেয়ে যাই তবে নিরদ্বিধায় ক্ষতবিক্ষত হতে প্রস্তুত যে আমি……..

চলবে……