Home "ধারাবাহিক গল্প ভালোবাসার মৌসুম ভালোবাসার মৌসুম পর্ব-১১+১২

ভালোবাসার মৌসুম পর্ব-১১+১২

0
341

#ভালোবাসার_মৌসুম
#aroshi_jahan_isha
পর্ব :১১

আজ শুক্রবার, সপ্তাহে ছুটির দিন। প্রতিটি পরিবারে সেদিন হরেক রকম মজার রান্না বান্না চলে।নীলিমা মায়ের সাথে হাত মিলিয়ে রান্নাায় সাহায্য করছে।সাহায্য বললে ভুল হবে বরং আরও এলোমেলো করে দিচ্ছে। নীলিমার মা আনিকা সিকদার মেয়ের এহেম কান্ডে খানিকটা বিরক্ত হলেন।খুন্তি হাতে নিয়ে মেয়ের দিকে তেরে গেলেন

এই যাবি তুই এখান থেকে,বিরক্ত না করে ছোট বোন টা কে পড়ালেখা করালেও তো পারিস।এক্ষুনি বের হ।

নীলিমা দৌড়ে রান্না ঘড় ছাড়লো।মায়ের পানে চেয়ে মুখ ভেংচি কাটলো।

আব্বু কই তুমি?

নীলিমার ডাকে, নাহিদ সিকদার ছাঁদ থেকে সারা দিলেন।

নীলিমা তাত্ক্ষণিক ছাদে চলে গেলো।
আব্বু কখন থেকে খুজছিলাম তোমাকে!

“তা কেনো সাতসকালে আমার খুজে,

জানো আব্বু আজ আমি আর মাইরা ঘুড়তে যাবো।

বেশ তো যাও না তবে সন্ধ্যার আগে বাড়ি ফিরবে।

তা ফিরবো আমার টাকা লাগবে আব্বু!

নাহিদ সিকদার পাঞ্জাবির পকেট থেকে কুচকুচে ১০০০ টাকার নোট মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিলো।নীলিমা হেসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেলো, অতঃপর দৌড়ে সিরি বেয়ে নিচে নেমে গেলো।

রুমে এসে নূরানি কে ভাব দেখিয়ে টাকা খানা দেখিয়ে বললো, দেখ নূর আব্বু আমাকে কতো ভালোবাসে ১০০০ টাকা দিয়েছে।

নূরানি, চশমা খানা ঠিক করে আপার পানে চাইলো, গম্ভীর কন্ঠে বললো,
°আমার টাকা চাই না আপা।আমার শুধু ভালোবাসা হলেই হবে।তুই সব টাকা নিয়ে যাস তবে আব্বা আম্মুকে আমাকে দিয়ে দিলেই হবে।

নীলিমা কপাল কুঁচকে বললো, আচ্ছা নিয়ে যাস।তবে তার আগে আমাকে বিয়ে দিতে বলিস।আমাকে বিয়ে দিয়ে দিলে তো এমনিতেই চলে যাবো।

১৪ বর্ষীয়া নূরানি সারাদিন বইয়ের পাতায় মুখ গুঁজে রাখবে,বাকিটা সময় বাবা আর মায়ের সাথেই কাটাবে।একদম শান্ত আর গম্ভীর মেয়ে।তবে বড় মেয়ে নীলিমা উড়নচণ্ডী, বদমাইশি করাটাই তার সভাব।

আপা তুই ঠিক বলেছিস বাবাকে আজই বলবো তোকে বিয়ে দিয়ে দিতে।তাহলে বাবা মা আর আমি। আমরা তিনজন সুখে শান্তিতে বাঁচতে পারবো।তোর মতো বাঁদর মেয়ে বিদায় হবে।

নীলিমা খানিকটা ভরকে গেলো ছোট বোনের অমন কথায় মন খারাপ করে বললো,
আমি চলে গেলে কষ্ট পাবি না?

_কষ্ট কেনো পেতে যাবো,ভালোই হবে তুই চলে গেলে।

নীলিমা মুখ বাকিয়ে ওয়াশরুমে চলে গেলো।গোসল করে কালো কামিজ গায়ে জড়িয়ে আয়নার সামনে দাড়িয়ে, সাজতে লাগলো।

সাজুগুজু শেষ করে ব্যাগ হাতে নিয়ে বেরিয়ে পরলো।

ঘড়িতে তখন ১১ টা মতো নীলিমা চৌধুরী নিবাসের সামনে এসে রিক্সা থেকে নামলো। ভারা মিটিয়ে গেইটের সামনে আসতেই দেখা মিললো সাইফুল চাচার সঙ্গে। একগাল হেঁসে কোশল বিনিময়ে করে নিলো।

মাইরা,বেপি তুমি কোথায়?

ড্রইং রুমে এসেই হাক ছেড়ে ডাকতে লাগলো মাইরা কে,মাইরা সিরি বেয়ে নামতে নামতে বললো,
আরে নীলু যে কখন এলি?

“এই তো এখনি এলাম,তা কেয়া বাত হে দোস্ত?

মাইরা নীলিমার মাথায় চাটি মেরে বললো,কি চলছে আপনার মনে?কি মতলব নিয়ে আসছেন এখানে!

মাইরা বেপি তুই ভুলে গেলি আজ আমাদের ঘুড়তে যাবার প্লেন ছিলো।

মাইরা মনে করার চেষ্টা করলো, না মনে পড়ছে না কোথায় যাবার কথা ছিলো!

কোথায় যাবো,

গেলেই তো দেখবি চল না!

না রে নীলু আজ বোধহয় যাওয়া হবে না।

কেনো যাবি না?

ভাল্লাগছে না!

চল ভালো লাগবে!আর তন্ময় ভাই কোথায়?

মাইরা শান্ কন্ঠে বললো,
,কোথাও একটা বেরিয়েছে।

তাহলে তো হলোই কেউ নেই বাসায় চল ঘুড়ে আসি!

আচ্ছা দাঁড়া তুই আমি তৈরি হয়ে আসছি।

জলদি আয়

হু।

____

তন্ময় কিছু তো বলো?

কি বলবো আমি নাতাশা!

আমরা বিয়ে কবে করছি?

জানি না!

জানো না মানে?তুমি কি ওই মেয়েটাকে পছন্দ করতে শুরু করেছো!যদি তাই হয় তাহলে আমাকে বলো!

তেমন কিছু না নাতাশা”

মিথ্যা বলো না তন্ময়, আমি তোমাকে চিনি,আর খুব ভাৱো করে জানি?সত্যি টা বলো।আমি নিজেকে সামলে নিতে পারবো।আমি দেখেছিতো মাইরা কে।

বাচ্চা একটা মেয়ে,আমি ওকে খুব ভালো করে দেখেছি তোমাকে কাছে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে আছে।
নিজের ফিলিংস নিয়ে মিথ্যা বলার দরকার নেই।

নাতাশা তন্ময়ের হাত ধরে শান্ত কন্ঠে বললো,
বলবে না আমাকে?

“কষ্ট দিতে চাই না।

নাতাশা আকাশ পানে চাইলো, অতঃপর হুট করে তন্ময় কে জড়িয়ে ধরলো,

কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,

আস্ত আমি টা-ই যে দুঃখ বিলাসী, আমাকে আর তুমি কি দুঃখ দিবে।

আমি চাই তুমি সুখে থাকো,তোমার জীবনটা রংধনুর সাত রঙের মতো রঙিন হোক।আমি নাহয় দূর থেকে দেখে নিবো,তোমার আর তোমার প্রেয়সীর সংসার।

তন্ময় ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো, নাতাশার পানে।

আজ আসি কেমন।ভালো থেকো।

নাতাশা আর কিছু শুনলো না,নিজের মতো করে চলে গেলো।তন্ময় মৃদু হেসে বললো, ধন্যবাদ নাতাশা।আমাকে বুঝার জন্য।

___

নীলু কোথায় যাচ্ছিস?

আরে চল না, গেলেই তো দেখবি।

নীলিমাদের রিক্সা এসে থামলো,মির্জা বাড়ির সামনে।

বাড়ির সামনে কারুকাজে বড় বড় করে লেখা, মির্জা ম্যানশন।

নীলিমা আর মাইরা গেইটের সামনে আসতেই দেখা মিললো,একজন দারোয়ানের।

কাকু শুনছেন?

তোমরা কেডা?

মধ্যবয়স্ক পুরুষের কথার বিপরিতে নীলিমা মিষ্টি করে হেসে বললো, আহির স্যার আছে না। আমরা ওনার স্টুডেন্ট,

ও আইচ্ছা, আহেন আপনেরে ভেতরে আহেন!

মাইরা নীলিমার হাতে চিমটি দিয়ে বললো, এখানে কেনো এলি।

জানিস মাইরা,কাল কতো কান্ড ঘটেছে,

কি হয়েছে আবার মাইরার প্রশ্নে নীলিমা একগাল হেঁসে বললো,

কাল তুই চলে যাওয়ার পর শুনলাম,পাভেল কে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

ও নাকি থ্রেট দিয়েছিলো, আমাকে আর তোকে দেখে নিবে।আমাদের নাকি পুড়িয়ে মারবে।

জানিস আহির স্যার কি করেছে?

কি?

ওকে আচ্ছা মতো ধুলাই দিয়েছে।

তা বুঝলাম তবে আমরা এখানে কেনো?

ওনাকে ধন্যবাদ দিবো বলে!

বিশাল বড় বাড়িটা একদম ফাকা।

নীলিমা এদিক সেদিক তাকাতেই একটা পাঁচ বছরের বাচ্চা মেয়েকে দেখতে পেলো।

ওই পিচ্চি এদিকে এসো!

মেয়েটা ধির পায়ে এসে দাড়ালো,

কি চাই?

আহির স্যার আছে?

কেনো পাপাকে দিয়ে কি করবে?

আহির স্যার তোমার পাপা?

“হ্যাঁ”

মাইরা আর নীলিমা একে অপরের পানে চাওয়া চাওই করলো।

তা তোমার পাপা কোথায়?

কেনো আমার পাপাকে দিয়ে তোমার কি কাজ?

সে অনেক কাজ ডাকো তাকে!

আচ্ছা বসো তোমরা,

মেয়েটা ধিরে ধিরে পা ফেলে সিরি বেয়ে যাচ্ছিলো, নীলিমা পিছু ডাকলো, অাদূরে কন্ঠে বললো,

নাম কি তোমার?

আমি আহ্লাদী আর তুমি?

নীলিমা হেসে বললো, আমি নীলিমা আর ও মাইরা।

মেয়েটা হেঁসে চলে গেলো।

শুভ্র শার্ট আর কালো পেন্ট পরে আহির সিরি বেয়ে নিচে নামলো, তার কোলে বাচ্চা মেয়েটা।

মাইরা আর নীলিমা দুজনেই দাঁড়ালো,

আহির কে সালাম দিলো দিলো মাইরা,নীলিমা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে,বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে লোকটা বিবাহিত তার বাচ্চা একটা মেয়ে আছে।

মাইরা আহিরের সাথে কথা বললো,
আহির হেসে বললো,

বসো তোমরা,
আমি এক্ষুণি আসছি!

রেহানা খালা কোথায় তুমি?

রান্না ঘড়ে সবজি কাটছিলো রাহেলা,আহিরের কন্ঠে শুনে বেরিয়ে এলো,

কি হইছে বাবা কিছু কি লাগবো?

হুম খালা দুজন গেস্ট এসেছে ওদের জন্য কিছু নিয়ে আসো।

রাহেলা সঙ্গে সঙ্গে রান্না ঘড়ে চলে গেলো,জলদি করে আগে দুটো শরবত বানালো,তারপর হরেকরকম ফল মিষ্টি আরও কতকিছু প্লেটে সাজাতে লাগলো।

আহ্লাদী আম্মু তুমি ঘড়ে যাও,পাপা আসছি!

না পাপা আমি তোমার সাথেই থাকবো।

দুষ্টুমি করে না আম্মু ।

আমি তো দুষ্টুমি করি নি পাপা!থাকি না তোমার সাথে আর ওই আন্টিদের সাথে কথা বলাবে না আমাকে?

আচ্ছা চলো,দুষ্টমি করবে না।ওকে।

ওকে পাপা।

তা মিস এখানে কেনো? কোনো প্রবলেম?

মাইরা নীলিমার হাতে চিমটি কেটে ইশারা করলো কথা বলার জন্য, বেচারি নীলিমা স্তব্ধ হয়ে বসে আছে।সব কথা গুলিয়ে যাচ্ছে। কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না।

মাইরা আমতা আমতা করে বলতে লাগলো,

thank you so much sir কাল যদি আপনি না থাকতেন তাহলে না জানি কি হয়ে যেতো!আর নীলিমাকে তো মেরেই ফেলতো।

It’s okay মাইরা tnx বলার কিছু হয় নি তোমরা আমার স্টুডেন্ট, এটা আমার দায়িত্ব।

মাইরা মৃদু হেসে বললো, তারপরেও আপনাকে ধন্যবাদ।

রাহেলা সব নাস্তা এনে ট্রি টেবিলে সাজিয়ে রাখলো।
মাইরা লজ্জা পেলো, তারওপর বেয়াদব নীলিমা সং সেজে চুপকরে বসে আছে।

এসবের কি দরকার ছিলো স্যার?

লজ্জা পেও না, তোমরা এখন আমার গেস্ট, প্লিজ খাও।

মাইরা হেসে শরবতের গ্লাস হাতে নিলো নীলিমাকেও দিলো।বেচারি নীলিমা একটানে সবটা শেষ করে, মাইরার হাতের টাও খেয়ে নিলো।

মাইরা আর আহির ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে।

আন্টি তোমার কি খিদে পেয়েছে?

আহ্লাদীর প্রশ্নে ভেবাচেকা খেয়ে গেলো, নীলিমা।

নিজেকে সামলে নিয়ে বললো, তেমন কিছু না একটু পানি পিপাসা পেয়েছিলো।

আমরা তাহলে আজ আসি!এই মাইরা চল।

মাইরা ব্যাগ হাতে নিয়ে দাড়ালো।

আহিরের পানে তাকিয়ে হেসে বললো, আসি স্যার।

দু’জনেই যেতে পা বাড়ালেই আহ্লাদী তার ছোট্ট হাতে নীলিমার ওড়না ধরে ফেললো,

তুমি চলে যাবে আন্টি?

হু,

একটু থাকো না!

নীলিমা মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসলো, আহ্লাদীর গালে হাত রেখে বললো, আমার অনেক কাজ আছে সোনা।অন্যদিন আসবো কেমন?

তা তোমার আম্মু কই দেখলাম না তো?তুমি বরং তোমার আম্মুর সাথে খেলো” যাও তোমার আম্মুর কাছে যাও।

আহির নীলিমার থেকে টেনে দূরে সরিয়ে নিলো আহ্লাদী কে।

নীলিমা ভরকে গেলো,মাইরাও ভরকে গেলো।

জাস্ট স্টপিড!

নীলিমা ভয় পেলো,আহির রাগান্বিত কন্ঠে। দু পা পিছিয়ে গেলো।

মাইরাও খানিকটা অবাক হলো,তবে তার ফোনের কর্কশ শব্দে বিরক্ত হয়ে ফোন খানা হাতে নিতেই বেশ আশ্চর্য হলো।তন্ময় তাকে কল দিচ্ছে কেনো।

হু বলেন?

ফোনের উপাশ থেকে তন্ময়ের শান্ত কন্ঠ,
কোথায় আপনি মিসেস তন্ময় চৌধুরী?

মাইরা অবাক হলো,তন্ময়ের এমন সম্বোধনে।

কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো, নীলিমার সাথে।

বাড়ি আসুন,আপনার জন্য অপেক্ষা করছি!
কল কেটে গেলো।মাইরা কিছু বুঝতে পারলো না।তবে নীলিমার পানে চেয়ে মৃদু হেসে বললো,নীলু তুই বাড়ি চলে যা আমিও বাড়ি যাচ্ছি।

____

পাপা তুমি আন্টিকে বকছো কেনো?

বকছি না আম্মু শুধু চুপ থাকতে বলছি।

নীলিমা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো।কান্না রত মুখে আহ্লাদীর পানে চেয়ে বললো, সরি সোনা আমি বুঝতে পারি নি।তাই তোমাকে তোমার মায়ের কথা জিজ্ঞেস করেছি।সরি আমি চলে যাচ্ছি।

আহ্লাদী নীলিমার হাত ধরে বসলো।

তুমি কোথাও যেও না আন্টি।আমার সাথে খেলবে চলো।

না সোনা তোমার পাপা বোধহয় আমাকে পছন্দ করে না।

আহ্লাদী আহিরের পানে চাইলো, তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,
°পাপা আন্টি যা বলছে সব সত্যি?

তোমাকে বড়দের মধ্যে কথা বলতে হবে না আহ্লাদী? চুপচাপ নিজের রুমে যাও।নাহয় কিন্তু মাইর খাবে।

ছোট্ট আহ্লাদী অভিমান করলো,চুপচাপ চলে গেলো, কেবল পিছু ফিরে নীলিমার পানে একবার চাইলো,

নীলিমার বেশ মায়া হলো মেয়েটার জন্য,
এটা কি ঠিক করলেন আপনি?

নীলিমার প্রশ্নে আহির ভ্রু কুঁচকে বললো,

তুমি আমাকে শিখাবে আমি কিভাবে আমার মেয়ের সাথে কথা বলবো?

আমি কেনো আপনাকে শেখাবো,আপনি কিন্তু বাচ্চা মেয়েটাকে বকা না দিলেও পারতেন?

মেয়েটা আমার,ওর জন্য আমি আছি?তোমাকে ওর ব্যেপারে নাক গলাতে হবে না।

নীলিমা অপমানিত বোধ করলো তবুও হেসে উড়িয়ে দিলো,

নির্লজ্জের মতো প্রশ্ন করলো,

আপনার ওয়াইফ কোথায় স্যার?
আহির শান্ত কন্ঠে উত্তর দিলো,বেঁচে নেই!

নীলিমা ফের কিছু জিজ্ঞেস করবে তার আগেই আহির মুখের উপর দড়জা লাগিয়ে দিলো।

নীলিমা ফুসে ওঠলো,মুখ বাকিয়ে বাড়ির দিকে হাটা ধরলো,,,,,,,,,

চলবে………

#ভালোবাসার_মৌসুম
#aroshi_jahan_isha
পর্ব ১২

ধরুনি জুড়ে সন্ধ্যা নামার পূর্বাভাষ,প্রকৃতি তখন বিষন্ন অথচ মুগ্ধকর।পশ্চিমা আকাশ তখন রক্ত লাল রুপে রঞ্জিত হয়েছে। পাখিরা নীরে ফেরার পায়তারা করছে।

“নীলিমা লেকের পানিতে পা ভিজিয়ে বসে আছে, দৃষ্টি তার দূর আকাশে। মস্তিষ্ক এলোমেলো ঠেকছে। মনে শ খানেক প্রশ্ন তার উত্তর অজানা।কে দেবে তার এতো প্রশ্নের উত্তর। কারো কাছে কি আদৌও আছে তার কিশোরী মনের নিষিদ্ধ অনুভূতি আর অজানা প্রশ্নের উত্তর।

” হায় আল্লাহ তোমার এই পাপি বান্দাকে পথ দেখাও?
কি করবো আমি?কার কাছে বলবো আমার সুপ্ত অনুভূতির কথা।কে শুনবে আমার অবাধ্য হৃৎস্পন্দনের ধুকপুকানি। কেউ কি শুনবে? কেউ কি বুঝবে আমাকে?

দূর আকাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কথাগুলো এক নিশ্বাসে বললো নীলিমা।চোখের কোনে চিকচিক করছে মুক্তর নায় অশ্রু কনা।ভাবতেই বুকের বা পাশে চিন চিনিয়ে ব্যথা অনুভব করলো,

আহির স্যার বিবাহিত তার পাঁচ বছরের একটা মেয়ে আছে?আর তার ওয়াইফ কি সত্যি বেঁচে নেই!না আর ভাবতে ভালো লাগছে না।

লেকের ধারে রাখা পার্স ব্যাগ খানা হাতে নিয়ে এলোমেলো পায়ে হাটা ধরলো বাড়ির পথে।
এক বুক হতাশা আর দীর্ঘ শ্বাস বুকে নিয়ে।

______

চৌধুরী নিবাসে আজ ভরপুর মানুষ, বাড়ির প্রতিটা সদস্য আজ বাড়িতে। মধ্যাহ্নের শেষ প্রহরে বাড়ি এসেছে সবাই।মাইরা বাড়ি ফেরার আগেই সবাই চলে এসেছে।তাহসিন চৌধুরীর সাথেই কেবল কথা হয়েছে মাইরার অতঃপর নিজ কক্ষে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে পা বাড়ালো তন্ময়ের রুমের দিকে।

“আসবো!
শান্ত কন্ঠে কথাখানি বললো মাইরা দড়জার সামনে দাড়িয়ে।

এসো,

আমায় কেনো জলদি করে বাড়ি ফিরতে বললেন!কিছু বলবেন?

তন্ময় শান্ত কন্ঠে বললো,হু বলবো তো!

বলুন কি বলবেন?

” আজ নয় অন্য কোনোদিন বলি!

মাইরা ভ্রু কুঁচকে বললো, কেনো?

ওসব জানতে চেও না মেয়ে, সময় হলে নাহয় নিজ থেকে বলবো।

মাইরা মৃদু হেসে মাথা নাড়লো।
অতঃপর মাইরা বিদায় নিয়ে নিজ কক্ষের দিকে হাটা ধরলো, মনটা আজ আনন্দে পুলকিত হয়ে আছে। তন্ময় তাকে কল করেছে। তাকে কিছু বলবে বলেছে,তবে কি বলবে?হুট করে সেদিনের কথাখানা মনে পড়লো, আমার ডিবোর্স চাই!
মনটা নিমিষেই বিষন্ন হয়ে গেলো,তবে কি আজও বিচ্ছেদের কথা বলতো।
“না এসব তুই কি ভাবছিস মাইরা সবসময় নেগেটিভ ভাবিস না একটু পজিটিভ ভাব।তানিশাার রুমের সামনে আসতেই থমকে দাঁড়ালো মাইরা।

ভ্রু কুঁচকে মনে মনে,
তানিশা কি কাঁদছে?কিন্তু কেনো?আমি কি দেখবো গিয়ে, না যদি রেগে যায় দুটো তীক্ষ্ণ কথা শুনিয়ে দেয়!

এ কথা ভেবে হাটা ধরলো, তবে হুট করেই থেমে গেলো।ধীর পায়ে ভিরানো দড়জা খানা খুলে প্রবেশ করলো।অন্ধকার রুমে।সুইচ বোর্ড টিপে লাইট খানা জ্বালাতেই, ঘাবড়ে গেলো তানিশা।

মাইরার তীক্ষ্ণ নজরে তা এড়ালো না।
কপাল কুঁচকে চেয়ে রইলো, পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করলো।

তানিশা হততন্ত হয়ে চোখ মুছে নিলো,কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,
তু-তুমি এখানে ক-কি করছো?

মাইরা শান্ত কন্ঠে উওর দিলো!

তুমি কাঁদছো তানিশা!

তানিশা বিছানা ছেড়ে হকচকিয়ে ওঠলো,আমতা আমতা করে বললো,ক কই কাঁদছি!

” মিথ্যা বলো না!আমি বাচ্চা নই তানিশা,বলতে পারো আমাকে কি হয়েছে।

তানিশা ওড়নার কোনা পেঁচাতে পেঁচাতে বললো,মিথ্যা বলবো কেনো”

সেটা তুমি জানো?কেনো মিথ্যা বলছো!

তানিশা টলমলে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো মাইরার পানে।

মাইরা তানিশার হাত খানা আলতো করে ধরে মিহি কন্ঠে বললো,

আমি কাউকে বলবো না তানিশা,তুমি আমার বোনের মতো,নিরদ্বিধায় সব বলতো পারো।

“বলবো তোমাকে!

কেনো নয় বলো?কাউকে কিছু বলবো না আমি!বিশ্বাস করতে পারো।ঠকবে না।

তানিশা আচমকা মাইরাকে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠলো,

কাঁদছো কেনো,বলো আমাকে না বললে সমাধান হবে কি করে?বলো না?

মাইরা আমি খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছি!

” মাইরা খানিকটা ভ্রু কুঁচকে বললো, কি করেছো বলো?

মাইরা আমার মনে হচ্ছে আমি_আমি

“কি তুমি বলো?

আমি বোধের প্রেগন্যান্ট!

মাইরা চমকালো, ভরকালো অবাক হলো,আহত দৃষ্টি তে চাইলো তানিশার পানে।হাত খানা ছেড়ে দু পা পিছিয়ে গেলো।

তানিশা এগিয়ে এলো,মাইরার হাত চেপে ধরলো,কাঁদতে কাঁদতে বললো,

প্লিজ কাউকে বলো না।বাবা আমাকে মেরে ফেলবে।আর ভাইয়া আমার সাথে কথা বলবে না।আর সবাই আমাকে ঘৃণা করবে,আমি সইতে পারবো না ঘৃণা, মরে যাবো যে!

মাইরা বিরক্ত হয়ে তানিশার মুখ চেপে ধরলো,
” কি সব আবোল তাবোল বকছো,মরে যাবে মানে।আর প্রেগন্যান্ট বললেই হলো।
তোমার কোথাও ভুল হয়েছে, তানিশা হয়তো তোমার পি*রি*য়*ড মিস হয়েছে।সে আমারও হয় এতে চিন্তিত হওয়ার কিছু হয় নি।আর তোমার কি জামাই আছে যে প্রেগন্যান্ট হবে?

তানিশা ফ্লোরে বসে পড়লো, বিছানায় মাথা রেখে কাঁদতে কাঁদতে বললো,

তুমি বুঝতে পারছো না মাইরা,আমি খুব বড়ো ভুল করে ফেলেছি।আমি খুব বাজে ভাবে ফেঁসে গেছি মাইরা,

মাইরা”র হৃদপিণ্ড কেঁপে ওঠলো,তবে কি তানিশা বয়ঃসন্ধি কালের আবেগে পড়ে না এসব হতে পারে না।

তুমি কি বলছো এসব,আচ্ছা মেনে নিলাম কই প্রেগ্ন্যাসির কিট কোথায় দেখাও দেখি?

তানিশা ফুপাতে ফুপাতে বিছানার নিচ থেকে একখানা প্রেগন্যান্সির কিট বের করে মাইরার হাতে দিলো,

মাইরা দু পা পিছিয়ে গেলো, আহত হলো বটে প্রেগন্যান্সির কিটে জলজল করছে দু খানা লাল দাগ।
মাইরা থমকালো,ভয় পেলো হৃদপিণ্ডটা দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করলো,কাঁপা কাঁপা কন্ঠে বললো,

এটা সত্যি নয় মিথ্যা তাই না তানিশা?

না গো সব সত্যি সব সত্যি! বলেই মাইরা কে জড়িয়ে ধরলো তানিশা।

মাইরা তানিশা কে শান্ত করে বিছানায় বসিয়ে দিলো, অতঃপর প্রেগন্যান্সির কিট খানা নিজের ওড়নার আড়ালে লুকিয়ে নিলো,নখ কামড়ে কিছু ভাবলো,

শুনো তানিশা তুমি একদম চিন্তা করো না।আর কাউকে এসব বলো না,ঠিকআছে।কাল আমরা ডক্টরের কাছে যাবো।তারপর শিওর হবো সত্যি তুমি কনসিভ করেছো কি!

পজিটিভ আসলে কি করবো মাইরা

“জানি না!

আমি মরে যাবো!

একদম চুপ!”বেশি কথা বলবে না,
এখন ঘুমিয়ে পড়ো কাল সকালে দেখা যাবে।আমি আসছি।মাইরা চলে যেতে গিয়ে ফের পিছু ফিরে চাইলো,

” এতো ভেবো না,কাল দেখা যাবে কি হয়।আমি আছি তো তোমার পাশে।

তানিশা মৃদু হাসলো,

°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°°

ঘড়ির কাঁটায় তখন মধ্যাহ্নের সূচনা,প্রকৃতি জুড়ে ভ্যাবসা গরম।রাস্তার পথচারীরা গরমে অতিষ্ঠ হয়ে ওঠেছে, কেউ কেউ রাস্তার ধারে ফুটপাতে বিক্রি করা শরবত পান করছে।আবার কেউ দ্রুত গতিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে ব্যেস্ত।

ওনি ৬ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট!

ডক্টরের কথা শুনে অবাক হয় নি মাইরা আর তানিশা।

বাচ্চার কন্ডিশন ঠিকাছে তো ডক্টর?শান্ত কন্ঠে কথা খানা বললো মাইরা।

হুম বাচ্চা ঠিক আছে,আর আমি কিছু ঔষধ ঠিক মতো খাবেন,আর এ সময় ঘন ঘন ভ*মি হতে পারে,আর মাথা চক্কর দিতে পারে এতে চিন্তার কিছু নেই।
আর হ্যাঁ অবশ্যই সাবধানে চলাফেরা করবেন।

হুম পেসেন্টের নাম যেনো কি?

তানিশা কিছু বলতে যাবে তার আগেই মাইরা ফোড়ন কেটে বললো,মাইরা-মাইরা চৌধুরী।
হাসবেন্ড এর নাম?
মাইরা চোখ বন্ধ করে দীর্ঘ শ্বাস নিয়ে বললো,

“তন্ময় চৌধুরী”

তানিশা ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো মাইরার পানে।কি বলছে মেয়েটা,মাথা খারাপ হয়ে গেছে নাকি!

ব্যস্ত রাস্তার ফুটপাত দিয়ে হাঁটছে দুই বিষন্ন রমনী, দু’জনের মধ্যেই নিরবতা। নিরবতা ভেঙ্গে তানিশা শুধালো,

আমার নামের জায়গায় নিজের নাম কেনো দিলে?

লোকে জানলে তোমায় মন্দ বলবে যে!

কতক্ষণ লুকিয়ে রাখবে সত্যি টা”

“সৃষ্টি কর্তা যতোক্ষণ চাইবে ততোক্ষণ।

আচ্ছা মাইরা,বাচ্চা টা নষ্ট করে ফেলি চলো না!নিচের পেটে হাত দিয়ে কথাখানি বললো, তানিশা।

মাইরা রক্তিম চোখে চাইলো তার পানে,অনাকাঙ্ক্ষিত ভাবে তার গালে সজোরে একটা থাপ্পড় বসিয়ে দিলো।

তানিশা কেঁদে ওঠলো, কাঁদতে কাঁদতে বললো,কার পরিচয় দিবো আমি ওকে,ও যদি জানতে চায় তার বাবা কোথায় আমি কি বলবো,আমি কি ওক বলতে পারবো যে তুমি অবৈধ সন্তান, তোমার বাবা তোমার মা কে ঠকিয়ে পালিয়ে গেছে,কাপুরুষ সে।

মাইরা আদুরে হাতে তানিশার গালে হাত দিয়ে বললো,
এতো ভেবো না,বাচ্চাটা নাহয় আমার পরিচয়ে বড় হবে,আমিই নাহয় ওর মা হবো।তুমি বরং ওকে আমায় দিয়ে দিও,

এসব কি বলছো দিয়ে দেবো?

আমি বুঝি ওর মা হতে পারবো না?কথাটা বলেই ঠোঁট কামড়ে কাঁদলো মাইরা

তানিশা মাইরা কে জড়িয়ে ধরে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠলো,
তুমি যোগ্য মা হবে গো।আমি হতে পারবো না,আমি যোগ্য মা হতে পারবো না।

ওভাবে বলো না তানিশা,আপাতত এসব কাউকে বলো না,

এখন নাহয় নাই-বা বললাম তবে আস্তে আস্তে সবাই তো সব জেনে যাবে।

কেউ কিচ্ছু জানবে না।

মাতৃত্বের পরিবর্তন লুকাবো কি করে!

হ্যাঁ সত্যি তো কি করে লুকাবে,আচ্ছা তানিশা আমি যা বলবো তাই করবে তো!

হু করবো বলো।

শুনো,
সবাই জানবে আমি প্রেগন্যান্ট, তিন চার মাস কেউ টের পাবে না তোমার প্রেগন্যান্সি,৪ মাসের মাথায় আমরা কোথাও একটা চলে যাবো।

কোথায় যাবো?

সে পরে ভেবে দেখবো।

মাইরা ভাইয়া কে কি বলবে।

তোমাকে ওসব ভাবতে হবে না,আপাতত চুপ থাকো।সময়ের ওপর সব ছেড়ে দেও।

হুম,চলো বাড়ি যাই।

হুম চলো,

____

আয় না আপা আজ একটু বাইরে খেতে যাই!

চোখের চশমা খানা ঠিক করে কথাখানি বললো নূরানি।

নীলিমা ভ্রু কুঁচকে বললো,
“আজ সূর্য কোনদিকে ওঠেছে রে নূর?

নূরানি কোমরে হাত দিয়ে বললো,রোজ যে দিকে ওঠে সেদিকেই।

তা বুঝলাম তবে ভুতের মুখে রাম রাম।কিভেবে বইয়ের মাতা থেকে মুখ তুলে বাইরে যেতে চাস।

নূরানি মন খারাপ করে বললো,
আপা মজা নিচ্ছিস,তুই না রোজ আমায় বলিস আয় নূর খেতে চাই বাইরে ঘুড়ে আসি।আর আজ যেই আমি যেতে চাইলাম ওমনি তুই নাটক শুরু করে দিলি।

আমি বুঝি নাটক করি?

হুম আমার আপা তো নাইকা নাটক তো করবিই।বলেই ফিক করে হেসে দিলো।

নীলিমা বোনের গালে চুমু একে দিলো।অতঃপর বাবা মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাটা ধরলো।

নূরানি বোনের বিষন্ন মুখপানে তাকিয়ে রইলো খানিকক্ষণ, চশমা খানা ঠিক করে ভাবতে লাগলো,
” কি হলো আমার আপার কাল বাড়ি ফেরার পর থেকে কেমন চুপসে আছে।দীর্ঘ শ্বাস ফেলে নীলিমার হাতটা শক্ত করে ধরলো।

*****
পাপা আমি আইসক্রিম খাবো!
ছোট্ট আহ্লাদী অদুরে আবদারে এক বালতি পানি ঢেলে আহির তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,
” একদম না তোর এমনি তেই ঠান্ডা লেগে আছে, তার ওপর আইসক্রিম খেলে তো যাচ্ছে তাই অবস্থা হবে।অন্য কিছু খাবে চলো।

পাপা প্লিজ চলো না আইসক্রিম খাই”

না মা, অন্য কিছু খাবে চলো।

আহ্লাদী মাথা নিচু আহিরের কাঁধে রেখে দিলো।
মন খারাপ করে যেই না গাল ফুলালো ওমনি খানিকের পরিচিত মুখখানা দেখা ফিক করে হেসে ওঠলো।

পাপা আমাকে নিচে নামাও,

কেনো মা?

তুমি নামাও না প্লিজ!

আহির কোল থেকে নামাতেই মেয়েটা দৌড় দিলো।আহির পিছু ডাকলো।

তবে আহ্লাদী থামলে তো!

কারো স্পর্শে নীলিমা ঘাবড়ে গেলো,
বাচ্চা একটা মেয়ে তার হাত ধরলো,নীলিমা মৃদু হাসলো, আহ্লাদী কে দেখে খানিকটা আশ্চর্য হলো।

করে আপা ও কে চিনিস তুই?
নূরানির প্রশ্নে নীলিমা হেসে বললো, হ্যাঁ চিনি তো ওই আহির স্যারের মেয়ে।

ওহ,

তা আহ্লাদী এখানে কার সাথা এসেছো,
গোলাপি ড্রেস পরিহিত ছোট্ট আহ্লাদী কে অপ্সরার থেকে কম কিছু লাগছে না।

পাপার সাথে এসেছি ওই দেখো পাপা ওখানে,আঙুল দিয়ে আহিরের পানে দেখালো আহ্লাদী।

নীলিমা চাইলো মানুষটার পানে।কালো শার্ট পরিহিত আহিরকে বলিউডের হিরোর চাইতে কম লাগছে না।

নীলিমা আহ্লাদী কে কোলে তুলে নিলো,ওর টমেটোর মতো গালে চুমু একে দিলো।

আহির দৌড়ে এসে আহ্লাদী কে নীলিমার কোল থেকে কেড়ে নিয়ে তীক্ষ্ণ কন্ঠে বললো,

বাচ্চাদেরকে এভাবে চুমু দেওয়া একদম উচিত নয়,কতো জীবানু থাকে মুখে।

নীলিমা অপমানিত বোধ করলো।দাঁত কটমট করে বললো,আপনি কিন্তু অপমান করছেন স্যার!

অপমান কোথায় করলাম,আমি তো শুধু বললাম যে মুখে জীবানু থাকতে পারে।

নীলিমা রাগে কটমট করতে লাগলো,

নূরানি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলো।

আন্টি চলো আমাদের সাথে ডিনার করবে।আহ্লাদীর আদুরে আবদারে নীলিমা গাল ফুলিয়ে বললো,
জানো আহ্লাদী কেউ একজন আমাকে একদম পছন্দ করে না।সে চায় না আমি তোমার সাথে যাই আর তোমাকে আদর না করি।

কে সে আন্টি?

কে আবার তোমার জল্লাদ পাপা।

আপা ওনি তোর স্যার হয় ঠিক করে কথা বল।

চুপ তুই,শুধু দেখ কি করি।
নূরানি চুপসে গেলো। কপাল কুচকে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করলো।

“পাপা তুমি কি আন্টিকে অপছন্দ করো?

আমি কি তা বলেছি!

আন্টি যে বললো,

তোমার পেত্নী আন্টির মাথার তার ছিড়ে গেছে তাই আজেবাজে বকছে।

নীলিমা রাগে কটমট করতে করতে বললো,আহ্লাদী তোমার পাপাকে বলে দেও আমি পেত্নী হলে ওনি জ্বিনের সরদার হু😏

হু তুমি ঠিক বলেছো আন্টি,এবার উচিত পেত্নী আর জ্বিন একসাথে থাকা।

নীলিমা থমকে গেলো,ফ্যালফ্যাল করে চাইলো আহিরের পানে, আহির আহ্লাদী কে চুপ করয়ে কোল থেকে নামিয়ে দিলো।

আহ্লাদী মা তুমি তোমার আন্টিদের নিয়ে আসো,
বলে হাটা ধরলো আহির,

আহ্লাদী নীলিমার হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেলো,নূরানি নীলিমার পিছু ছুটলো।

___

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত ৯ টা বাজে।মাইরা আর তানিশা আজ একসাথে খেতে বসেছে। বাড়ির সবাই ডাইনিং টেবিলে উপস্থিত।

রুবি খাবার বেরে দিচ্ছে। খাওয়ার মাঝে কেউ কারো সাথে তেমন কথা বললো না।তবে তানিশার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি বারবার তন্ময় কে মাইরার পানে তাকিয়ে থাকতে দেখেছে।তবে কি তার ভাই এবার মাইরা কে ভালোবাসতে শুরু করেছে।মৃদু হাসলো তানিশা সঙ্গে সঙ্গে হাসিটা মিলিয়ে গেলো মস্তিষ্কে এসে ঠেকলো তার জন্য আবার কোনো ঝামেলা বাঁধবে না তো?

খাওয়া দাওয়া শেষ করে যে যার রুমে চলে গেলো।

তানিশা চুপটি করে মাইরার রুমে গিয়ে দড়জা বন্ধ করে দিলো।

মাইরা এসব কি ঠিক হচ্ছে, আমার জন্য না আবার তোমার আর ভাই এর সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।

“সম্পর্ক নাহয় আবার জুড়ে নিবো,তবে সম্মান কি ফিরিয়ে দিতে পারবো তোমায়।
মনে রেখো তানিশা তোমার সাথে সাথে পুরো চৌধুরী বাড়ির সম্মান জুড়ে আছে।

আমাকে ক্ষমা করে দিও মাইরা আজ আমার ভুলের জন্য তোমার জীবনটা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।

আমার জীবন কবেই বা গোছানো ছিলো?

তুমি এই অবস্থায় এতো চিন্তিত হয়েও না,নিজেকে সামলাও, আর বাকিটা আমি সামলে নিবো।তবে মনে রেখো পরিস্থিতি যেমনই হোক না কেনো সত্যি টা যেনো কেউ জানতে না পারে।

হুম মনে থাকবে।তুমি খুব ভালো মাইরা।

মাইরা মৃদু হাসলো।

____

আপা তুই কি আহ্লাদীর বাবাকে ভালো বাসিস?

নীলিমা থমকে গেলো দু পা থেমে গেলো,ফুটপাতের রাস্তা ধরে দুবোন হাটছিলো এর মধ্যেই নূরানির এহেম প্রশ্নে থমকালো,চমকে গেলো।

নূরানি ফের প্রশ্ন করলো,কথা বলছিস না কেনো আপা?

তুই বেশি ভাবছিস নূর!

আমি বেশি ভাবছি না আপা,আমি তোকে চিনি!তুই আমার আপা তোর প্রতিটা পদক্ষেপ আমার চেনা।তোর মস্তিষ্ক পড়ার ক্ষমতা আমার একটু হলেও আছে।

তুই ভুল ভাবছিস নূর তেমন কিছু না,আমার বয়ে গেছে এক বাচ্চার বাপ কে ভা-ভালোবাসতে।ওনাকে তো আমার বিরক্ত লাগে।

সত্যি বলছিস তো!

তো মিথ্যা কেনো বলবো,

ভেবে দেখ আপা,যতো দূর জানতে পারলাম আহ্লাদীর কিন্তু মা বেঁচে নেই।না জানি আবার কখন নতুন মা নিয়ে চলে আসে।সময় থাকতে মনের কথা বলে দে নয়তো পরে আফসোস করবি বলে রাখলাম।

কিসের আফসোস?

তুই জানিস, সে কি করে বলবো।

বাবা মেনে নিবে?

তুই তো ভালোবাসি না, মানলেই কি না মানলেই কি?

ভাসিতো!

নূরানি খিলখিলে হেসে উঠলো। নীলিমার গালে হাত রেখে বললো,বাবা মা হয়তো একটু রাগ করবে পরে নিশ্চয়ই মেনে নিবে।

ওনি তো ভালোবাসে না”

তুই কি করে বুঝলি?

সে বুঝবো না।ওনি তো আমাকে একদম অপছন্দ করে।আমাকে কি বলে জানিস আমি নাকি ম্যানার্স জানি না”

নূরানি ঠোঁট টিপে হাসলো, অতঃপর হাটতে হাটতে বললো,
“যদি কেউ আমাকে অপছন্দ করে তবে আমি তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে আমি নামক রোগ ছড়িয়ে দিতাম।অতঃপর ঔষধ হিসবে আমার আমি টাকে তার করে দিতাম”

তোর উচিত এটাই করা।

কিভাবে করবো।

এখন বাড়ি চল পড়ে বলবো,

বলবি তো,

আরে হ্যাঁ বাবা বলবো বলবো এখন চল বাবা মা চিন্তা করবে।

হুম চল।

____

রাতের আধারে আকাশ জুড়ে রুপালী থালার নায় চাঁদের আলো এসে ঠেকছে আহিরের কক্ষে।

ছোট্ট আহ্লাদীর মাথায় বিলি কেটে দিচ্ছে আহির।

জানো বাবা সবার মা আছে শুধু আমার নেই🥹

আহিরের হৃদপিণ্ড কেঁপে ওঠলো, মেয়েটা তার প্রাণ অথচ সেই প্রাণ পাখিটা রোজ রাতে মায়ের অভাবে মন খারাপ করে থাকে।

আচ্ছা বাবা তুমি আমাকে মা এনে দিবে!

আম্মু মা কি কেনার জিনিস যে তোমাকে এনে দিবো।

তাহলে বিয়ে করে মা নিয়ে এসো,

আহ্লাদী এসব কথা কে শিখিয়েছে?

আহ্লাদী খানিকটা কাঁপা কাঁপা গলায় বললো,রাহেলা নানু তো বললো তুমি যদি নতুন বউ নিয়ে আসো তাহলে সে আমার মা হবে।আনবে তো মা।

একদম চুপ করে ঘুমাও,আর একটা কথা বললে থাপ্পড় দিবো।মনে থাকে যেনো,

আহ্লাদী কেঁদে ওঠলো, দু-হাতে মুখ চেপে বালিশে মুখ লুকিয়ে নিলো।

আহির দীর্ঘ শ্বাস ফেলে আহ্লাদী কে কাছে টেনে নিলো,তবে জেদি মেয়েটা অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

আহির শতো চেষ্টা করেও মেয়ের অভিমান ভাঙ্গাতে না পেরে দূর আকাশের পানে চেয়ে, নিঃশব্দে কাদলো।

বিছানা ছেড়ে বেলকনিতে গিয়ে সিগারেট ধরালো,
সিগারেটের ধূোয়ায় ওড়িয়ে দিলো কিছু বিষন্নতা।পকেট থেকে ফোন বের করে একখানা ছবি বের করলো,

হাস্যজ্জল এক রমনী,

কেনো আমাদের ছেড়ে চলে গেলে ফাবিহা।দেখো আমাদের ছোট্ট আহ্লাদী কতোটা কষ্ট পাচ্ছে।আমার কথা নাহয় নাই-বা ভাবলে আহ্লাদীর কথাও ভাবলে না।আমায় নাহলে না-ই-বা ভালোবাসলে আহ্লাদী কে তো বাসতে পারতে।নাকি আহ্লাদী আমার সন্তান বলে ভালোবাসতে পারলে না……..

চলবে……