ভালোবাসার রঙিন প্রজাপতি পর্ব-২১+২২

0
1302

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

২১

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় আমি একটু অবাক হলাম বটে।তবে নিজেকে দ্রুতই সামলে নিলাম।কথা অন্যদিকে নেওয়ার জন্য বললাম,
“আপনি এসময়ে এখানে কি করছেন?ঘুমাননি যে এখনো?”

আদ্রিশ ভাইয়া কিছু না বলে আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন।কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু হাসি দিলেন।সে হাসির শব্দ আমার কান অব্দি পৌঁছালো।উনি এবার বললেন,
“একই প্রশ্ন আমি তোমাকেও করতে পারি।তুমি এতো রাতে এখানে কি করছো?আর ঘুমাওনি কেনো?”

আদ্রিশ ভাইয়ার প্রশ্নের জবাব দেওয়ার ইচ্ছা আমার হলো না।তাই উনার উদ্দেশ্যে বললাম,
“প্রশ্নটা আমি আগে করেছি। তাই জবাবটাও আমি আগে চাই।”

“আমার ঘুম আসছিলো না তাই চলে এলাম।”এই বলে উনি নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইলেন।তা দেখে প্রতিউত্তরে আমি কিছু না বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।কয়েক সেকেন্ড পর আদ্রিশ ভাইয়া জিজ্ঞাস করলেন,
“বাইরে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলে কেনো?”

আমি এবার বেশ অবাক হয়ে গেলাম উনার এ প্রশ্ন শুনে।আমি যে কাঁদছিলাম তা উনি জানলেন কি করে!আজ যেমন আঁধারে পরিবেশ তাতে আমার চোখের পানি তো উনার দেখার কথা নয়।তাহলে কি কান্নার সময় আমার ফুঁপানোর আওয়াজ উনি শুনেছিলেন?
আমি কণ্ঠে যথাসম্ভব বিস্ময়ভাব প্রকাশ করে জিজ্ঞাস করলাম,
“আমি যে কান্না করছিলাম তা আপনি জানলেন কি করে?”

আদ্রিশ ভাইয়া এবার শব্দ করে হেসে বললেন,
“জেনেছি একভাবে।সেটা জরুরি নয়।জরুরি এটা যে,তুমি এতো রাতে বাইরে একা একা দাঁড়িয়ে কান্না করছিলে কেনো?যদি ভূত এসে ঘাড় মটকে দিতো?”
এই বলে উনি কৌতুকের হাসি দিলেন।

আমি এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললাম,
“একই সময়ে মানুষের মনে এক অনুভূতি তীব্রভাবে কাজ করলে অপর অনুভূতি তখন ক্ষীণভাবে কাজ করে।” এই বলে কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে আবারো বললাম,
“আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে।তখন আমার মনে কষ্টের অনুভূতি বেশি ছিলো বলে ভয় নামক কোনো অনুভূতি আমার মধ্যে কাজ করেনি।তাইতো এখানে একা দাঁড়িয়ে থাকার সাহস পেয়েছি।”

আদ্রিশ ভাইয়া ছোট্ট এক নিঃশ্বাস ফেলার আওয়াজ আমার কানে বারি খেলো।এরপর কানে ভেসে এলো উনার আহত স্বর।উনি বললেন,
“এটা মনে রেখো,সুখ দুঃখ ছোঁয়াচে রোগ।একজন সুখে থাকলে যেমন তার আশেপাশের সবাই প্রভাবিত হয় তেমনি একজন দুঃখে থাকলেও তার আশেপাশের সবাই প্রভাবিত হয়।এই যে তুমি কষ্টে আছো,এতে যে তোমার আশেপাশের সবাইও কষ্টে আছে সেটা বুঝছো না বোধদয়। স্বার্থপরের মত নিজের কষ্ট বাড়িয়ে চলছো শুধু।”

আমি এবার অন্যমনস্ক হয়ে বললাম,
“আমার এ কষ্টের কথা কেউ জানে না।তো এখানে আমার কষ্টে প্রভাবিত হওয়ার মানুষও নেই।”

“আচ্ছা?তাই?”

“হুম তাই।”

“তোমার কষ্টের কারন আজ সকালের ঘটনাবলী তাই না?”

“হুম তাই।আর তখনকার ঘটনা এখানকার কেউ জানে না।শুধু আপনি…….”
এই বলে আমি চকিত দৃষ্টিতে আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকালাম।দেখলাম আদ্রিশ ভাইয়া ফোন চালাতে ব্যস্ত।অদ্ভুত তো!কখন উনি ফোন বের করলেন!আমি দেখিইনি!অবশ্য দেখবো কি করে,আমি তো অন্যমনস্ক হয়ে ছিলাম।

আদ্রিশ ভাইয়া চোখমুখ কুঁচকে ফোনের স্ক্রিনের দিকে চেয়ে রইলেন। কি যেনো দেখে ফোনের স্ক্রিন অফ করে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এ ঘটনা নিয়ে এভাবে পরে থাকলে তোমার শরীর খারাপ করতে পারে।অতিরিক্ত দুঃশ্চিতায় শরীর শুকিয়ে যেতে পারে।তখন সবাই তোমাকে দেখে আবার দুঃশ্চিতায় পরে যাবে।ভাববে মেয়ের কি না কি হলো।তখন তোমার এ লুক্কায়িত ঘটনা সবার সামনে চলে আসতে পারে।আর তুমি তো চাও না এ ঘটনা কারোর সামনে আসুক।তাহলে এখন তোমাকে কি করতে হবে?”

আদ্রিশ ভাইয়ার প্রশ্নে আমি থতমত খেয়ে গেলাম।উনি এতো দ্রুত কথাগুলো বললেন যে আমি ঠিকভাবে তা ধরতেই পারলাম না।ফলে উনার প্রশ্নের জবাবও দিতে পারলাম না।এজন্য চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম।উনি আবারো আমাকে প্রশ্ন করলেন,
“কি করতে হবে এখন তোমাকে?বলো?”

“ইয়ে মানে….”

“ইয়ে মানে তোমাকে এখন এ দুঃখ কষ্ট, এই ঘটনা ভুলে যেতে হবে।চিরতরে ভুলে যেতে হবে।আই নো,তোমার পক্ষে এ ঘটনা চিরতরে ভুলে যাওয়া কষ্টকর বটে।তবে চেষ্টা করতে দোষ কোথায়।আর আমার মনে হয় তুমি একটু চেষ্টা করলেই এসব ভুলে থাকতে পারবে।এক্ষেত্রে একটু সময়ের প্রয়োজন হবে।তবে সবার সাথে মন খুলে কথা বললে,মিশলে এটা দ্রুত ভুলে যাবে।”

উনার এত আদেশ নির্দেশ শুনে আমি ক্ষীণ সুরে বললাম,
“হুম।”

আদ্রিশ ভাইয়া তা শুনে একটু জোর গলায় বললেন,
“শুধু হুম নয়।তোমার মধ্যে সেই স্পিরিট দেখতে চাইছি যা একজন কোচ জিতের জন্য তার টিমের মধ্যে দেখতে চায়।” এই বলে উনি উনার দুহাত পিছে নিয়ে একত্রে করে উচ্চ স্বরে বললেন,
“হাও ইজ দা জোশ?”

আদ্রিশ ভাইয়ার এহেন কান্ড আর কথাবার্তায় আমি থতমত খেয়ে গেলাম।এরপর কি বলতে হবে তা যেনো বেমালুম ভুলে বসলাম আমি।উনি আমার এ কান্ডে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করলেন না।বরং বরাবর সোজা তাকিয়ে শক্ত কণ্ঠে কথা বলার ভান করে বললেন,
“মিশমিশ,এরপরের লাইন কি তুমি জানো না?”

আদ্রিশ ভাইয়ার কান্ডকারখানায় আমার হুট করেই প্রচুর হাসি পেলো।আমি ফিক করে হেসে বললাম,
“জানি তো।কিন্তু আপনি এমন করছেন কেনো?”

উনি সেই আগের মতোই শক্ত কণ্ঠের ভান করে বললেন,
“নো মোর টকিং,নো মোর লাফিং।আই নিড মাই আন্সার।হাও ইজ দা জোশ?”

উনার এ কথা আমার উপর কোনো প্রভাব ফেললো না।আমি হাসি না থামিয়ে বরং আরো হেসে চলছি।আদ্রিশ ভাইয়াকে এখন ডক্টর কম আর্মি লাগছে বেশি।কমতি আছে শুধু আর্মি সাজপোশাকের।
আমি কোনোমতেই হাসি থামাতে পারছি না।এদিকে উনার কথায় হাসতেও পারছি না।ফলে মুখের উপর হাত চেপে হাসতে লাগলাম আমি।
এরই মধ্যে হুট করে বিদ্যুৎ চলে এলো।এতে যে আমি খানিকটা চমকে উঠবো তাও পারলাম না।কারন এ মূহুর্তে হাসির ব্যামোতে আক্রান্ত আমি।

ওদিকে আমার হাসি দেখে আদ্রিশ ভাইয়াও হেসে ফেলেছেন।তবে সেই ভান করা শক্ত মুখমন্ডলের পিছনে তা লুকিয়ে রেখেছেন উনি।উঠোনে লাগানো হলদে লাইটের আলোয় উনার এ চেপে রাখা হাসি স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমি।
উনি আবারো শক্ত কণ্ঠে বললেন,
“আই সেইড নো মোর লাফিং।আই ওয়ানা টু সি দা স্পিরিট মিশমিশ।
হাও ইজ দা জোশ?”

অনেকক্ষণ হাসতে থাকার ফলে আমার পেটে খিল ধরে গেলো।এজন্য হাসি থামিয়ে সিরিয়াস হওয়ার চেষ্টা করলাম।উনার প্রশ্নের জবাব আত্মবিশ্বাসের সাথে দেওয়ার চেষ্টা করে বললাম,
“হাই, স্যার।”

“স্পিক ইট লাউডলি।হাও ইজ দা জোশ?”

আমি এবার শক্ত এবং একটু উচ্চ স্বরে বললাম,
“হাই, স্যার।”

“হাও ইজ দা জোশ?”

“হাই, স্যার।”
আমার উত্তর কানে পৌঁছাতেই আদ্রিশ ভাইয়াও ফিক করে হেসে ফেললেন।উনার হাসি দেখে আমার চেপে রাখা হাসিও বেরিয়ে এলো।দুজনে সমানতালে হাসতে লাগলাম।

হাসতে হাসতে যখন পেটে খিল ধরে গেলো তখন দুজনে কষ্টেসৃষ্টে হাসি থামাতে চেষ্টা করলাম।কিছুক্ষণ পর সে চেষ্টায় সফলও হলাম।আদ্রিশ ভাইয়া এবার জোরে জোরে শ্বাস টেনে নিয়ে বললেন,
“তো?সাহস এসেছে?”

আমি কয়েকবার জোরে শ্বাস টেনে বললাম,
“হুম…প্রথম প্রথম হাসি পেলেও পরে এটাকে সিরিয়াসলি নিয়ে বললাম।অদ্ভুত হলেও সত্য যে এটা আমার মধ্যে কেমন এক আত্মবিশ্বাস গড়ে তুলেছে।এখন অনেকটাই হালকা লাগছে নিজেকে।”

আমার কথায় আদ্রিশ ভাইয়া তৃপ্তির হাসি দিলেন।খানিক সময় আমার দিকে চেয়ে থেকে বললেন,
“চলো।অনেকক্ষণ এখানে থাকলাম।বেশ রাত হয়ে গিয়েছে।ঘরে যাওয়া যাক এখন।”বলে আদ্রিশ ভাইয়া হাঁটা ধরলেন।উনার পিছুপিছু আমিও হাঁটা ধরলাম।
কয়েক কদম যেতেই আমি আদ্রিশ ভাইয়াকে টিটকারি মেরে বললাম,
“আপনার ডক্টর হওয়া উচিত হয়নি।আপনার তো আর্মি অফিসার হওয়া উচিত।”

আদ্রিশ ভাইয়া গলা খাদে নামানোর ভান করে বললেন,
“নিষেধ ছিলো আর্মি হওয়ায়।”

আমি একটু অবাক হয়ে বললাম,
“নিষেধ ছিলো!কে নিষেধ করলো?”

“হবু বউ।”

আমি একটু থতমত খেয়ে বললাম,
“ঐ সময়ে আপনার হবু বউ নিষেধ করেছিলো!”

আদ্রিশ ভাইয়া এবার আহত স্বরে বললেন,
“হুম।সে আমাকে নিষেধ করেছিলো। ”

“কেনো?”

“সে একা একা থাকবে বলে।”

“মানে?”

“মানে হলো,আমার বউটা মাসের পর মাস আমার ছাড়া থাকতে পারবে না বলে আমি আর্মিতে জয়েন করিনি।এ নিয়ে আমি নিজেও ভেবেছিলাম। অনেক ভাববার পর সিদ্ধান্ত নিলাম,আমার হবু বউকে একা থাকতে দেওয়া যাবেনা।এজন্য আর্মিতে জয়েন করা যাবেনা।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় আমি ফিক করে হেসে ফেললাম।উনার কথা বলার ধরন এমন ছিলো যে মনে হচ্ছিলো উনি আমাকে রূপকথার কাহিনি শুনাচ্ছেন।কথার ধরনেই আমি বুঝতে পারি আদ্রিশ ভাইয়া বানিয়ে বানিয়ে কথাটা বললো।

আদ্রিশ ভাইয়া আমার হাসির শব্দ শুনে বললেন,
“আহহা,মেয়েটা হাসে কেনো?সিরিয়াস কথায় হাসতে নেই মিশমিশ।”

আমি ঠোঁট চেপে হাসি আটকে রাখার চেষ্টায় বললাম,
“জানি, কত সিরিয়াস কথা বলছেন আপনি।”

এতক্ষণে আমরা ডাইনিং এ চলে এসেছি। আদ্রিশ ভাইয়া এবার আমার উদ্দেশ্যে স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন,
“রুমে যাও।আর হ্যাঁ,শুনো।নদীর সাথে বেশি বেশি টাইম স্পেন্ড করো।বাচাল মেয়েটার কথায় তালে থাকলে তুমি দ্রুতই সব ভুলে যেতে পারবে।ও ওর মনমতো যা বলে তাই করো।দেখো,মন ভালো থাকবে।”

আমি কিছু না বলে হ্যাঁসূচক মাথা নাড়িয়ে চলে আসলাম।রুমে এসে দেখলাম নদী ঘুমিয়ে পরেছে।তাকে ঘুমিয়ে পরতে দেখে আমিও তার পাশে গিয়ে শুয়ে পরলাম।

শুয়ে ভাবতে লাগলাম আজকের পুরো দিনটার কথা।আজ যেমন আমার জীবনের সবচেয়ে খারাপ দিন ছিলো।তেমনি আমার পছন্দের মানুষকে নতুন রূপ জানারও দিন ছিলো।আমি হাজারবার অস্বীকার করলেও আমার মন জানে,আমি আদ্রিশ ভাইয়াকে পছন্দ করতে শুরু করেছি। তবে আজ থেকে নয়।আরো কয়েকদিন আগে থেকে।অবশ্য পছন্দ করা বা না করা নিয়ে কোনো কথা উঠা উচিত নয়।কারন আদ্রিশ ভাইয়ার প্রতি আমার পছন্দ টিকে থাকা উচিত নয়।এর একমাত্র কারন হলো উনার গার্লফ্রেন্ড আছে।

.

সকালের নাস্তা কোনোমতে শেষ করে আমি আর আদ্রিশ ভাইয়া বেরিয়ে পরলাম।আজ উনি নদীকে কিছু উপলক্ষে ট্রিট দিবেন বলে আমাকে নিয়ে যাচ্ছেন রেস্টুরেন্টে।
আজ সকালে আদ্রিশ ভাইয়া বড় মামিকে বললেন,আমাকে নিয়ে একটু বের হবেন।বড় মামি কারন জিজ্ঞাস করলে উনি বললেন,নদীর অনেকদিন আগেকার একটা ট্রিট পেন্ডিং ছিলো।সেটাই আজকে দিবে উনি।এ কথা শুনে নদী বলে গিয়েছে,তার প্রাইভেট ছুটি হওয়ার আগেই যেন আমাকে নিয়ে আদ্রিশ ভাইয়া রেস্টুরেন্টে পৌঁছে যান।এরই পরিপ্রেক্ষিতে উনি আমাকে এখন বেরুচ্ছেন।

বাড়ি থেকে বেড়িয়ে পরার পর ফোনে সময় দেখে আমি বেশ অবাক হলাম।কারন নদীর প্রাইভেট ছুটি হওয়ার এখনো প্রায় এক ঘন্টা পনেরো মিনিট বাকি আছে।এতো আগে রেস্টুরেন্টে কেনো নিয়ে যাচ্ছেন উনি?
আদ্রিশ ভাইয়াকে এ প্রশ্ন করতে উনি এড়িয়ে চলে যান।উনাকে আর প্রশ্ন করে লাভ হবে না বলে আমি আগ বাড়িয়ে আর প্রশ্ন করিনি।

প্রায় পনেরো মিনিট পর অটো একটা সুনসান জায়গায় এসে থামলো।জায়গাটা কেমন একটা ঝোপঝারপূর্ণ।অবশ্য ঝোপঝার বললে ভুল হবে।ছোটখাটো একটা জঙ্গল বললে ভুল হবে না।
এ পরিবেশ দেখেই আমার মধ্যে কেমন এক ভয় এসে ভর করলো।অজানা আশঙ্কায় আমার হৃদয় কেঁপে উঠলো।

আদ্রিশ ভাইয়াকে অটো থেকে নেমে পরতে দেখে আমিও নেমে পরলাম।উনি এবার অটোওয়ালাকে ভাড়া মিটিয়ে আমাকে নিজের পিছুপিছু হাঁটতে নির্দেশ দিলেন।

উনার নির্দেশ মোতাবেক আমি হেঁটে তো চলছি তবে মনের মধ্যে নতুন করে এক ভয়ও জাগিয়ে তুলছি।এই সকাল সকাল বাড়িতে মিথ্যা বলে আমাকে এমন জায়গায় আনার উদ্দেশ্য ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।

আদ্রিশ ভাইয়া পুরোনো ফ্যাক্টরি মতো একটা জায়গায় এসে দাঁড়িয়ে পরলেন।এরপর পকেট থেকে ফোন বের করে নিচু স্বরে কাকে কি যেন বললেন।উনার ফোনকলের মিনিট পাঁচেকের মধ্যে তিন-চারজন ছেলে ফ্যাক্টরি এরিয়া থেকে বেড়িয়ে এলো।নিজেদের সাথে নিয়ে এলো দুজন রক্তাক্ত আহত ছেলেকে।
এসব দেখে আমার মুখ বিস্ময়ে হা হয়ে এলো।মাথায় বেশ কিছু প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগলো।এই তিন-চারজন ছেলে কারা?তাদের সাথে আনা এই রক্তাক্ত ছেলে দুটো কারা?তাদেরকে এভাবে কেনো মারা হয়েছে? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন আমাকে এখানে এদের মাঝে কেনো আনা হয়েছে?
এসব প্রশ্নের উত্তর একমাত্র আদ্রিশ ভাইয়াই দিতে পারবেন।
একটা শুকনো ঢোক গিলে আমি আদ্রিশ ভাইয়ার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করলাম,
“এরা কারা?আর আমাকে এখানে কেনো এনেছেন?”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার প্রশ্ন শুনে পকেটে দু হাত রাখলেন।এরপর বাঁকা হেসে বললেন,
“ভালো করে দেখো তো,এই ইনজ্যুর ছেলে দুটোকে চিনতে পারো নাকি।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় আমি বিস্ময় নিয়ে ছেলে দুটোর দিকে তাকালাম।কয়েক সেকেন্ডের পর্যবেক্ষণে ছেলে দুটোকে চিনতে পারলাম আমি।তাদের চিনতে পেরে আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পরলো।একটা শুকনো ঢোক গিলে কাঁপা-কাঁপা গলায় বললাম,
“গ-গতকালের সে-সেই বখাটে ছেলে দুটো!”

আমার কথায় আদ্রিশ ভাইয়া আফসোসের সুরে বললেন,
“আরে দোস্ত,আরো মারা উচিত ছিলো রে।এতো ইজিলি ও এদের চিনে ফেললো!এর মানে এদের চেহারার নীলনকশা এখনও পরিবর্তন করতে পারিনি আমরা।চল আরো কয়েক ডোজ দিয়ে আসি।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় উপস্থিত সুস্থ সবল ছেলেগুলোর মধ্যে একজন বললো,
“ঠিক বলেছিস।আরো কয়েক ডোজ দিতে হবে এদের।”
এই বলেই উপস্থিত সকলে সমস্বরে হেসে উঠলো।বাকি রইলো সেই বখাটে ছেলে দুটো আর আমি।
সেই চারজন ছেলে ঐ বখাটে ছেলে দুটোকে ধাক্কা মেরে আমার সামনে ফেলে দিলো।হঠাৎ এমন হওয়ায় ভয়ে চমকে উঠলাম আমি।ফলস্বরূপ কয়েক কদম পিছিয়ে এলাম আমি।অনুভব করলাম,বুকের ভেতর দ্রিমদ্রিম আওয়াজ তুলে যাচ্ছে আমার হৃদপিণ্ড।

ভয়ে আতঙ্কে বখাটে সে ছেলে দুটোর দিকে তাকালাম আমি।তাদের পরিহিত অর্ধ ছেঁড়া শার্ট,প্যান্ট, হাত পায়ে জমাট বাঁধা রক্ত আর মুখের কাঁটা ছেঁড়া দেখে বুঝতে পারলাম বেশ ভালোমতোই এদের ধোলাই দেওয়া হয়েছে।এদের এমন অবস্থা দেখে আমি ভেতরে ভেতরে আঁতকে উঠলাম।একটু মায়া হলো এদের প্রতি।তবে এ মায়াকে ছাপিয়ে মনে একধরনের প্রশান্তি অনুভব করলাম আমি।

উপস্থিত সকলের হাসি ঠাট্টা শেষে বখাটে ছেলে দুটো খুব কষ্টে শোয়া থেকে উঠে বসে পরলো।তাদের মধ্যে একজন নিজের আধ ভাঙা শরীর নিয়ে বেশ কষ্টে আদ্রিশ ভাইয়ার সামনে হাত জোর করে বললো,
“ভাইজান,বহুত বড় ভুল হইয়া গেছে।মাফ কইরা দেন।আর জীবনেও এমনডা হইবো না।”

উপস্থিত সেই চারটা ছেলের মধ্যে একজন বললো,
“এটাকে ভুল বললি?”

এ প্রশ্নে সেই বখাটে ছেলেটা কণ্ঠে তীব্র আতঙ্ক প্রকাশ করে বললো,
“না না ভাই।ভুল না।গুনাহ হইছে। গুনাহ হইছে।”

এ কথায় সকলে আবারো সমস্বরে হেসে উঠলো।খানিক বাদে আদ্রিশ ভাইয়া গভীর চিন্তিত কণ্ঠে বললেন,
“হারুন ভাই,আমি ভাবছিলাম যে,এদের স্কেলেটন বের করে ওকে দিয়ে দিবো।এমনিতে আর কয়দিন পর মেডিকেলের ক্লাস শুরু হলো ওর স্কেলেটনের প্রয়োজন পরবে।এই নর্দমার কিটগুলোর স্কেলেটন বের করে নিলে ওকে ত্রিশ চল্লিশ হাজার টাকা দিয়ে আর স্কেলেটন কিনতে হবে না।কি বলেন ভাই?”

সেই চারজনের মধ্যে হয়তো হারুন নামের ছেলেটি বলে উঠলো,
“ঠিক বলেছিস তুই আদ্রিশ।এখন তো এদের দাম নাই।মরার পর যে এদের স্কেলেটনের ত্রিশ চল্লিশ হাজার টাকা দাম হবে, এই তো এদের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়।”

এসব কথাবার্তা শুনে বখাটে ছেলে দুটো ভয়ার্ত কণ্ঠে একত্রে বলে উঠলো,
“ইসকেলেটন কি ভাই?”

সেই চারজন ছেলেদের মধ্যে একজন তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বললো,
“ইসকেলেটন না রে পাগলা স্কেলেটন।স্কেলেটন মানে কঙ্কাল।মরার পর তোদের কঙ্কাল ব্যবহার করা কথা চলছে।”

এই বলে ছেলেটা বাকি সবার সাথে হাই ফাইভ দিয়ে সমস্বরে হেসে উঠলো।এদের এ হাসিতে বখাটে ছেলে দুটোর চোখেমুখে দেখা দিলো মরণ ভয়,আতঙ্ক।
এদিকে আমি এই বৈঠক দেখে হতবিহ্বল হয়ে পরলাম।বিস্ময় নিয়ে ভাবতে লাগলাম আদ্রিশ ভাইয়াসহ এদের কাজগুলো।

®সারা মেহেক

#চলবে

#ভালোবাসার_রঙিন_প্রজাপতি
#লেখনীতে:সারা মেহেক

২২

ছেলেগুলো ব্যাথার ফলে চোখ কুঁচকে বন্ধ করে রেখেছে।সাথে দু হাত দিয়ে সারা শরীরে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।
আমি কিছুক্ষণ তাদের দিকে তাকিয়ে থেকে আদ্রিশ ভাইয়াকে জিজ্ঞাস করলাম,
“এদেরকে পেলেন কোথায়?আর কিভাবেই বা পেলেন?”

আদ্রিশ ভাইয়া আমার প্রশ্নে বিস্তৃত হেসে বললেন,
“গতকাল তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আবারো সেই মুদিখানায় গিয়েছিলাম।সেই দোকানদারের কাছ থেকে ছেলে দুটোর আড্ডাখানার ঠিকানা নিলাম।অতঃপর সে আড্ডাখানায় গিয়ে উপস্থিত হলাম আমরা।মানে আমি, পিয়াস,এনাম,পুলক আর হারুন ভাই।
ওহ,তোমাকে তো ওদের সাথে পরিচয়ই করিয়ে দেওয়া হয়নি।”
এই বলে উনি স্বাস্থ্যবান দেখতে ছেলেটার দিকে ইশারা করে বললেন,
“উনি হলেন হারুন ভাই।ভাইয়ার ফ্রেন্ড।রাজনীতি করে আরকি।এলাকায় বেশ দাপট উনার।আমরা যেকোনো প্রবলেমে পরলে হারুন ভাই-ই আমাদের হেল্প করেন।আজও হেল্প করেছে।”
উনি এবার বাকি তিনটা ছেলের দিকে ইশারা করে বললেন,
“এরা হলো আমার তিন বজ্জাত ফ্রেন্ড। স্কুল থেকে ফ্রেন্ডশিপ আমাদের।আমি গ্রামে আসলেই ওদের সাথে আড্ডা দেই।
তো এখন,এদের ধোলাই দেওয়ার কথায় আসা যাক।
সেই আড্ডাখানা থেকে এই কুকুর দুটোকে ধরে আনলাম এই ফ্যাক্টরিতে।এই জায়গাটা হারুন ভাইদের।এজন্য এখানে এদের ধোলাই দিতে একটুও অসুবিধা হয়নি।
সন্ধ্যা থেকে থেমে থেমে আমরা পাঁচজন এই কু** দুইটাকে মেরেছি।ইচ্ছামত মেরেছি।
তুমি জানো না,এরা শুধু তোমার সাথে ওমনটা করেনি।ঐ গ্রামের প্রায় প্রতিটা মেয়ে এদের দুজনের দ্বারা মলেস্টের শিকার হয়েছে।আমরা গতকাল যে বাড়িতে গিয়ে পানি খেলাম সে বাড়ির মেয়েকেও এরা ডিস্টার্ব করতো।আশেপাশের দু তিনটা মেয়েকে তো এরা উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে রেপ করারও ট্রাই করেছিলো।আল্লাহ মেয়েগুলো বাঁচিয়েছে বলে তারা বেঁচে গিয়েছিলো।এই এতো কিছু মেয়েগুলোর সাথে হয়েছিলো তবুও তারা নিজেদের মানসম্মান হারানোর ভয়ে চুপ ছিলো।মুখ বুজে সব সহ্য করে গিয়েছে।ইভেন তুমিও তাই করছো।”

আদ্রিশ ভাইয়া কথা শেষ করেই রাগান্বিত দৃষ্টিতে বখাটে ছেলে দুটোর দিকে তাকালেন।এতেই তারা ভয়ে তটস্থ হয়ে গেলো।আমিও প্রচণ্ড রাগে ছেলে দুটোর দিকে তাকালাম।এ মূহুর্তে তাদের চেহারা দেখেই রাগে আমার সারা শরীর রিরি করতে লাগলো।রাগের সাথে প্রচণ্ড ঘৃণাও হলো তাদের প্রতি।মানুষ কতোটা নিচে নামলে এমন জঘন্য সব কাজ করতে পারে তা এদেরকে স্বচক্ষে না দেখলে জানতাম না।

আদ্রিশ ভাইয়া এবার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এদের স্কেলেটন বের করার আইডিটা দারুন না?”

আমি বখাটে ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে প্রচণ্ড রাগ নিয়ে বললাম,
“হুম।একদম ফাটাফাটি আইডিয়া।আমার তো মন বলছে জ্যান্ত থাকতেই এদের কঙ্কাল বের করে নেই।একদম গায়ের চামড়া ছিঁড়ে, প্রতিটা মাংশপেশি আলাদা করে কঙ্কাল বের করা উচিত।প্রতিটা মূহুর্ত যখন যন্ত্রণায় কাটবে তখন আমার আর মেয়েগুলোর যন্ত্রণা উপলব্ধি করতে পারবে এই শয়তানগুলো।”

আমার কথায় বখাটে ছেলেগুলোর মধ্যে একজন ভয়ার্ত কণ্ঠে বলল,
“ও ভাবি মাফ কইরা দেন এবারের মত।জীবনে ভুলেও কোনো মাইয়ার দিকে তাকামু না।মাফ কইরা দেন আমাদের।”

আমি তাদের কথার কোনো তোয়াক্কা করলাম না।বরং মনে মনে যত গালি পারি সবই এদের উদ্দেশ্যে দিলাম আমি।এতেও শান্তি পেলাম না।মন বলছে এদের ইচ্ছামত ধোলাই দেই।একদম মুভির হিরোগুলোর মত।টপাস টপাস করে মারবো।এতেই যেন শান্তি। তবে এ শান্তি বাস্তবে উপলব্ধি করার মত পরিস্থিতি নেই।এ শান্তি এদের মনে মনে মেরে,মনে মনেই উপলব্ধি করাই সম্ভব আমার পক্ষে।

“পিয়াস, ঐ হকিস্টিকটা ওকে দে তো।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় আমি বিস্ময় নিয়ে উনার দিকে তাকালাম।উনার উদ্দেশ্যে কিছু বলার আগেই পিয়াস ভাইয়া আমার উদ্দেশ্যে একটা হকিস্টিক ছুঁড়ে দিয়ে বললেন,
“ভাবি,ক্যাচ ইট।”

পিয়াস ভাইয়ার কথায় আমি চমকে উনার দিক থেকে আসা হকিস্টিকটা ধরে ফেললাম।এ সামান্য কাজেই আমি নিজের প্রতি বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাস করলাম,’ক্যাচটা আমি ধরতে পেরেছি তাহলে???’
এমন প্রশ্ন নিজেকে জিজ্ঞাস করার কারন,আমি সহজে ক্যাচ করতে পারিনা।খুব কম ক্ষেত্রেই আমি ঠিকঠাক কোনো জিনিস ক্যাচ করতে পারি।সেই কম ক্ষেত্রের মধ্যে এটাও পরলো আজকে।এই হকিস্টিকটা যে আমি ক্যাচ করতে পারবো তা ভাবিনি কখনো।

হকিস্টিকটা হাতে নিয়ে আমি আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে প্রশ্নসূচক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি।আমার এ দৃষ্টির উদ্দেশ্যে হয়তো বুঝতে পেরেছেন উনি।তাইতো বাঁকা হেসে বললেন,
“তোমার মনের যত রাগ,ক্ষোভ, কষ্ট আছে তা ওদের উপর মিটিয়ে নাও।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় আমি থ বনে গেলাম।বিস্ময় নিয়ে চিন্তা করলাম দুটি কথা।এক.আদ্রিশ ভাইয়া আমার মনের কথা জানলো কি করে!দুই.এদেরকে পিটাবো কি করে!
এসব মারামারি আমার দ্বারা কল্পনাতেই সম্ভব। বাস্তবে আমার দ্বারা এদের মার খাওয়ানো মানে যুগের পর যুগ অপেক্ষা করা।মুভির হিরোদের মত মারামারির কথা চিন্তায় আনলেও তা আমি বাস্তবে কিছুতেই করে উঠতে পারবো না।কিছুটা অসম্ভব কাজ বটে!

আমাকে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আদ্রিশ ভাইয়া বললেন,
“কি হলো?দাঁড়িয়ে আছো কেনো?এদের প্রতি কি মায়া হচ্ছে?”

উনার প্রশ্নে আমি সাথে সাথে শক্ত কণ্ঠে বলে উঠলাম,
“ইম্পসিবল। এদের প্রতি ভুলেও মায়া আসবে না মনে।এরা যেমন জঘন্য মানুষ, তাতে মায়া আসা দূরের কথা,খানিকটা সহানুভূতিও কাজ করবে না।”

“তো?চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছো কেনো?মনের ঝাল মিটিয়ে নাও এদেরকে মেরে।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথায় এবার আমি মিয়িয়ে গেলাম।মিনমিনে গলায় মাথা নিচু করে বললাম,
“আমার দ্বারা মারামারি সম্ভব নয়।”

আদ্রিশ ভাইয়া সহ বাকি সবাই হো হো করে হেসে উঠলো আমার কথায়।এতে খানিকটা লজ্জিত বোধ করলাম আমি।
আদ্রিশ ভাইয়া আবারো বললেন,
“সম্ভব নয় বলে কোনো কথা আপাতত বলো না।এখন সব অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলো।তোমার সাথে যা করেছে এরা তাতে কি তোমার একটুও রাগ হচ্ছে না ওদের উপর?”

আমি মাথা উঁচু করে বললাম,
“হচ্ছে তো।কিন্তু মারবো কি করে?মানে আরকি,বলছিলাম যে,আমি কখনো কাউকে এভাবে মারিনি।তাও আবার হকিস্টিক দিয়ে।”

আমার কথা শেষ হওয়া মাত্র এনাম ভাইয়া তড়িৎ গতিতে আমার কাছ থেকে হকিস্টিকটা নিয়ে নিলেন।শক্ত হাতে যে ভঙ্গিতে হকিস্টিক ধরতে হয় সে ভঙ্গিতে ধরে বললেন,
“এই যে এভাবে ধরবেন।তারপর এভাবে মারবেন।”
এই বলে উনি সেই ছেলেদুটোর বাহুতে ঠাসঠাস করে চারটা বারি মারলেন।এতে ছেলে দুটো আবারো ব্যাথায় কুঁকড়ে উঠলো।আর এদের এ কাণ্ডে না চাইতেও আমার প্রচুর হাসি পেলো।

আদ্রিশ ভাইয়া এবার এনাম ভাইয়ার কাছ থেকে হকিস্টিকটা নিয়ে আমার হাত ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
“এই তো এভাবে মারবে।মনের যত সুপ্ত রাগ আছে তা এদের উপর ঝেরে দেওয়ার মোক্ষম সুযোগ আজ।”

হারুন ভাইয়া বললেন,
“হুম।সব রাগ বের করে দাও এদের উপর।গতকাল তোমাকে যা যা বলেছে সেসবের কষ্টকে রাগে পরিণত করো।আই থিংক তুমি পারবে।
আর তুমি যদি এদের মারতেই না পারো তাহলে আমাদের এদের মারবার দরকারই ছিলো না।তোমাকে এখানে আনা হয়েছে এদেরকে দুই চার ঘা দেওয়ার জন্য।তো,শক্ত হাতে হকিস্টিকটা ধরো।আর ইচ্ছামত মারো।যত মারতে পারবে তত মারো।বাট এদের মারো এটলিস্ট।”

হারুন ভাইয়ার কথা শেষ হতেই এনাম ভাইয়া,পিয়াস ভাইয়া আর পুলক ভাইয়া আমাকে মোটিভেট করতে লাগলেন।এদিকে উনাদের এ মোটিভেট করা দেখে বখাটে দুটো আমার কাছে আকুতি মিনতি করছে।আমার অবস্থা এমন যে,উনাদের সবার মোটিভেশনাল কথা শুনে মোটিভেট হচ্ছি,কিন্তু বখাটেদের আকুতিমিনতি দেখে হাসিতে ফেটে পরছি।ফলে সব মোটিভেশান হাসির সাথে ভেসে চলে যাচ্ছে।কি এক ঝামেলা।

চোখ বন্ধ করে লম্বা কয়েকটা শ্বাস টেনে নিয়ে শক্ত হাতে হকিস্টিকটা ধরলাম।এরপর চোখ খুলে বখাটে ছেলেগুলোর দিকে এগিয়ে গেলাম।তারা এখনও আমার উদ্দেশ্যে আকুতিমিনতি করে যাচ্ছে।তবে তাদের এ আকুতিমিনতি এখন কানে নিলাম না আমি।বরং শক্ত মনে শক্ত হাতে হকিস্টিক দিয়ে একটা বখাটের হাতে ঠাস করে এক বারি বসিয়ে দিলাম।সাথে সাথে সে ব্যাথায় ‘আহ,উহ’ বলে চেঁচিয়ে উঠলো।তার এ চেঁচানো দেখে অপর বখাটে ছেলেটাও ভয়ে চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকালো।যেন সে ভাবতেই পারেনি আমি তাদেরকে এমন করে মারবো।

আমি অপর বখাটে ছেলেটাকে মারার প্রস্তুতি নিতেই আদ্রিশ ভাইয়া বাদে সকলে একসাথে সিঁটি বাজালো।পুলক ভাইয়া উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন,
“ভাবী….আপনার হাতে জাদু আছে।এবার জমবে খেলা।এবার এরা বুঝবে কত ধানে কত চাল।”
এই বলে তিনি আবারো সিঁটি বাজালেন।
পুলক ভাইয়ার কথা শুনে আমি হাসতে লাগলাম।ওদিকে বখাটে ছেলেদুটোর মধ্যে একজন ভয়ার্ত কণ্ঠে বলে উঠলো,
“আমার কত ধানে কত চাল লাগবো না।আমি ধানও চাইনা, চালও চাইনা।আমি মুক্তি চাই ভাই।”
বখাটে ছেলেটার এ কথায় আদ্রিশ ভাইয়াসহ সকলে হেসে উঠলেন।এ মূহুর্তে এই শয়তানদের জন্য কোনো মায়ামমতা, সহানুভূতি দেখানো উচিত না।এরা সোজা কথার মানুষ না।এরা মার খেয়ে সোজা হওয়ার মানুষ।হিন্দিতে একটা প্রবাদ আছে,’লাথো কি ভূত, বাতো সে নেহি মানতি’।এদের হয়েছে তাই।

আমি বখাটে ছেলে দুটোর দিকে চেয়ে আবারো চোখ বন্ধ করে লম্বা এক শ্বাস টেনে নিলাম।মনের ভেতর জমে থাকা সব রাগ এনে জড়ো করলাম।এ রাগ এখন দরকার আমার।এই সুপ্ত রাগ কাজে লাগিয়েই তো এই শয়তানগুলোকে একটু হলেও শায়েস্তা করতে পারবো আমি।
শক্ত হাতে হকিস্টিক ধরে দুমাদুম কয়েকটা মারলাম বখাটে দুটোকে।কেমন মার মেরেছি তা বখাটে দুটো আর আমার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পাঁচজন মানুষ বেশ ভালোমতোই জেনে গেলো।

আমি হকিস্টিকটা ফেলে এসে আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকালাম।আমার চোখেমুখে তৃপ্তির হাসি।বাকি সবার চোখেমুখেও একই হাসির রেখা দেখা দিচ্ছে। সবার এ হাসি দেখে মনে হচ্ছে আমি হয়তো এভারেস্ট জয়ের মত একটা অসম্ভব রকমের কাজ করে এসেছি।
আমাকে দেখে এনাম ভাইয়া হাসিমুখে বললেন,
“বাহ ভাবী।আপনার হাতে এতো শক্তি তা আজকে এখানে উপস্থিত না থাকলে জানতেই পারতাম না। ”

এনাম ভাইয়ার মুখে ‘ভাবী’ সম্বোধন শুনে বিষম খেলাম আমি।বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞাস করলাম,
“আপনি৷ আমাকে ভাবী ডাকছেন কেনো!”

আমার কথায় পিয়াস ভাইয়া বিস্ময়ে মুখ হা করে বললেন,
“সে কি ভাবী!আমি এর আগে বললাম তখন তো সমস্যা হয়নি।তাহলে এখন এমন বলছেন যে?”

পিয়াস ভাইয়ার কথা শুনে আমি আরেকদফা বিস্মিত হলাম।উনি আমাকে কখন ভাবী বলে সম্বোধন করলেন তা ঠিক মনে আসছে না।
আমি আমতাআমতা করে বললাম,
“আপনিও বলেছেন?কখন বলেছেন ঠিক মনে করতে পারছি না।”

“আরে এদেরকে মারার আগেই তো বললাম।ঐ যে হকিস্টিকটা ক্যাচ করতে বলার সময়।”

“সত্যি বলেছেন?তাহলে আমি শুনলাম না কি করে মনে আসছে না।
হয়তো,মন অন্যদিকে ছিলো বলে।মানে,বখাটে দুটোর উপর খুব রেগে ছিলাম তো এতক্ষণ। তাই কে কি বলে সম্বোধন করলো তাতে অতো গুরুত্ব দেয়নি।”
এই বলে আমি চুপ করে নিচে তাকিয়ে রইলাম।ভাবছি, ঠিক কখন এই ‘ভাবী’ সম্বোধনটা আমার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করেছেন উনারা।
খানিকক্ষণ ভেবেও সে সময়টা সামনে আনতে পারলাম না আমি।উনারা এর আগে যা যা আমাকে বলেছেন তার সবটা শুনলেও সম্বোধনে গুরুত্ব দিয়ে শুনিনি আমি।অবশ্য গুরুত্ব না দেওয়ার কারনও তো আছে।সে সময় বখাটে দুটোর উপর এতো রাগ উঠেছিলো যে কারোর সম্বোধনে যায়আসেনি তখন।তবে এখন যায়আসছে আমার।

পিয়াস ভাইয়া আমার কথার মর্মার্থ বুঝতে পেরে বিস্তৃত হেসে বললেন,
“ওহ আচ্ছা, এই কারন ভাবী।”

পিয়াস ভাইয়ার কথা শুনে আমি এবার সংকুচিত হয়ে এলাম।এভাবে এতোগুলো মানুষের সামনে ‘ভাবী’ সম্বোধনটা বেশ লজ্জায় ফেলে দিচ্ছে আমাকে।
তাইতো আমি অনুরোধের গলায় বললাম,
“ভাইয়া,এভাবে অকারনে এতোগুলো মানুষের সামনে ভাবী ডাকবেন না প্লিজ।”

আমার কথায় এবার পুলক ভাইয়া বললেন,
“অকারণে আর কোথায়?বন্ধুর বউকে ভাবী ডাকবো না তো কি ডাকবো?”

পুলক ভাইয়ার কথায় আমি বিস্ময়ের চরম সীমায় পৌঁছে গেলাম।উনার এ কথার মানে বুঝতে পাক্কা এক মিনিট সময় লাগলো আমার।’বন্ধুর বউ’ মানে!কি সব বলছেন উনারা!কথার আগামাথা আছে আদৌ!উনাদের মুখে এ ‘ভাবী,বন্ধুর বউ’ শব্দগুলো শুনে যেমন লজ্জা লাগছে,তেমন অদ্ভুত লাগছে।আবার একটু রাগও লাগছে।তবে উনাদের উপর তো এ রাগ আর দেখানো সম্ভব নয়।তাই ঠাণ্ডা মাথায় খানিকটা সিরিয়াস ভঙ্গিতে বললাম,
“ভাইয়া,এখন মজা করা বাদ দিন প্লিজ।খুব অকোয়ার্ড ফিল করছি।”

আমার কথার প্রতিউত্তরে পুলক ভাইয়া হয়তো কিছু বলতে চাইছিলেন।কিন্তু তার আগেই আদ্রিশ ভাইয়া পিছন থেকে এসে পুলক ভাইয়ার কাঁধে হাত রাখলেন।আমার দিকে একবার তাকিয়ে আবারো পুলক ভাইয়ার দিকে তাকালেন উনি।চোর ধরা পরে যাওয়ার মত চুপসে বললেন,
“দোস্ত,তোরা আমার মাথা কাটার জন্য সবসময় পরে থাকিস কেনো বলতো?”

আদ্রিশ ভাইয়া আর হারুন ভাইয়া এতক্ষণ আমাদের থেকে দূরে দাঁড়িয়ে কিছু নিয়ে কথাবার্তা বলছিলেন।উনাদের কথা শেষ হতেই হারুন ভাইয়া ফ্যাক্টরির মধ্যে চলে গেলেন।আর আদ্রিশ ভাইয়া এখানে চলে এলেন।

আদ্রিশ ভাইয়ার কথা শুনে এবার পুলক ভাইয়া চোখ বড় বড় করে বিস্ময় নিয়ে বললেন,
“আমরা কি করলাম ব্যাটা?”

আদ্রিশ ভাইয়া এবার পুলক ভাইয়ার সামনে এসে দাঁড়িয়ে পরলেন।ঠোঁটে জোরপূর্বক হাসি এনে বললেন,
“শুধু শুধু এতোগুলো মানুষের সামনে ওকে ভাবী বলছিস কেনো?দেখছিস না মেয়েটা অকোওয়ার্ড ফিল করছে?”

পুলক ভাইয়া কিছু বলবেন তার আগেই আদ্রিশ ভাইয়া উনাকে জড়িয়ে ধরে কানে কানে কিছু একটা বললেন।এ বিষয়টা স্পষ্ট দেখতে পেলাম আমি।উনাদের এ কাণ্ডকারখানা দেখে মনের মধ্যে খানিক সময়ের জন্য সন্দেহের এক বাতিক দেখা দিয়েছিলো।তবে মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে তা উড়িয়ে দিলাম আমি।কারন এসব ভিত্তিহীন সন্দেহের কোনো কারন হয়না।

আদ্রিশ ভাইয়া পুলক ভাইয়াকে ছেড়ে দিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন,
“আচ্ছা,যাই এখন।নদীর প্রাইভেট ছুটি হয়ে যাবে হয়তো কিছুক্ষণের মাঝেই। ”

পুলক ভাইয়া বিস্তৃত হেসে বললেন,
“আচ্ছা যা।বিকালে আসছিস তো তাইনা?”

“হুম আসবো।”
এই বলে আদ্রিশ ভাইয়া উনার তিন বন্ধুর উদ্দেশ্যে চোখের ইশারায় কিছু বললেন।উনাদের এ ইশারা, আমি শুধু চোখ দিয়ে দেখেই গেলাম।মাথায় আর কিছু ঢুকলো না।
উনাদের এ ইশারা ইশারা খেলা শেষ হতেই আদ্রিশ ভাইয়া আমাকে বললেন,
“চলো।যাওয়া যাক।”

আমি এবার মৃদু সবার উদ্দেশ্য বললাম,
“ধন্যবাদ সবাইকে।আমার জন্য আপনারা এতো কিছু করেছেন এর জন্য হয়তো ধন্যবাদ বললেও কম হবে।কিন্তু আপাতত ধন্যবাদ বলা ছাড়া আর কিছু করার নেই আমার।”

আমার কথা শেষ হতে না হতেই পুলক ভাইয়া গৌরবের হাসি দিয়ে বললেন,
“ধন্যবাদ বলে ছোট করবেন না ভাবী।” এই বলে উনি জিব কেটে মূহুর্তেই নিজেকে সংশোধন করে নিয়ে বললেন,
“ওপস সরি।ভাবী না।অনলি মিম।রাইট?”

আমি মৃদু হেসে মাথা দুলিয়ে বললাম,
“রাইট।”

সাথে সাথে এনাম ভাইয়া বলে উঠলেন,
“আমাদেরকে বেশি বেশি ধন্যবাদ দিন।কারন আপনার হিরোর চেয়ে আমরাই বখাটে দুটোকে বেশি মেরেছি।আপনার হিরো তো…..”

‘আপনার হিরো’ শব্দদুটো শুনে মাথার উপর ছোটখাটো একটা বাজ পরলো যেন।আমি এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞাস করতে যাবো তার আগেই এনাম ভাইয়াকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে পুলক ভাইয়া বললেন,
“সরি সরি।ও আসলে বলতে চাইছিলো,আমাদের হিরো।আপনার না।স্লিপ অফ টাং আরকি।”

এই বলে উনি এনাম ভাইয়ার বাহুতে জোরে করে একটা মারলেন।এনাম ভাইয়া সে বাহুতে অপর হাত দিয়ে ঘষতে ঘষতে দাঁত কেলিয়ে হেসে বললেন,
“সরি আসলেই ভুল হয়ে গিয়েছে।”

আমি আস্তে করে বললাম,
“ইটস ওকে।”

পরিবেশটা এখন কেমন যেনো সংকোচময় হয়ে গিয়েছে।এ পরিবেশটাকে পরিবর্তন করতেই হয়তো আদ্রিশ ভাইয়া বললেন,
“ওরা একদম ঠিক বলেছে।বখাটে দুটোকে ওরাই মেরেছে বেশি।আমি খুব কমই মেরেছি।যখন…”

উনাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে পিয়াস ভাইয়া বললেন,
“ও খুব কম মেরেছে ঠিক আছে। কিন্তু যখন মেরেছে একদম ফাটিয়ে মেরেছে।যখন বেশি রাগ উঠেছে তখনই এসে দুমাদুম হকিস্টিক দিয়ে এলোপাতাড়ি মেরেছে ওদের।”

পিয়াস ভাইয়ার কথা শুনে আমি একটু বিস্ময় নিয়ে আদ্রিশ ভাইয়ার দিকে তাকালাম।সাথে সাথে আদ্রিশ ভাইয়া বললেন,
“চলো তো।অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে।”এই বলে উনি হাঁটা শুরু করলেন।আমিও ‘হুম’ বলেই উনার পিছুপিছু হাঁটা শুরু করলাম।তবে যাওয়ার আগে ঘাড় ঘুরিয়ে বখাটে দুটোর দিকে একনজর তাকালাম।দুটো শয়তান নিস্তেজ হয়ে পরে আছে।হয়তো জ্ঞান হারিয়েছে।তাতে আমার কি।এরা এখানে মরে গেলেও আফসোস হতো না আমার।

.

আমি আর আদ্রিশ ভাইয়া পাশাপাশি হাঁটছি।এই জঙ্গলের মতো জায়গা হেঁটে পেরুলেই শহরের মধ্যে ঢুকে পরবো।আর শহরের মধ্যে ঢুকলেই রেস্টুরেন্ট।
চলতে চলতে আদ্রিশ ভাইয়া বললেন,
” তুমি যে ওদের এভাবে মারবে তা ভাবিনি আমরা।”

আদ্রিশ ভাইয়ার কথা শুনে আমি একটু সংকুচিত হয়ে বললাম,
“আসলে আমিও এমনটা ভাবিনি।আমি আসলে কখনো কাউকে এভাবে মারিনি।এদেরকেও হয়তো মারতে পারতাম না।কিন্তু এদের প্রতি এতো রাগ উঠেছিলো যে না মেরে আর পারলাম না।এমন রাগে আমার খুব ভাংচুর করতে মন চায়।কিন্তু করতে পারিনা।আজকেও প্রচণ্ড ভাংচুর করতে মন চাইলো।তাইতো…..”
উনি আমাকে মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে নিঃশব্দে হেসে বললেন,
“তাইতো আজ ঐ বখাটেগুলোর উপর ভাংচুর চালানো হলো।ঠিক বলেছি না?”

আমি একনজর উনার দিকে তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেললাম।মৃদু হেসে বললাম,
“হুম।একদম ঠিক।”

আদ্রিশ ভাইয়া প্যান্টের পকেট থেকে ফোন বের করে একনজর ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা দেখলেন।তারপর আবারো ফোন যথাস্থানে রেখে আমাকে জিজ্ঞাস করলেন,
“এই রাগ গতকাল কোথায় ছিলো?”

আদ্রিশ ভাইয়ার প্রশ্নে আমি উনার দিকে একবার তাকিয়ে মাথা নিচু করে ফেললাম।এ মূহুর্তে বেশ লজ্জিত অনুভব করছি আমি।
ছোট্ট একটা শ্বাস ফেলে উদাস গলায় বললাম,
“গতকাল ওমন সিচুয়েশনে নিজেকে ঠিকভাবে সামলে নিতে পারিনি আমি।হুট করেই নিজেকে মারাত্মক দূর্বল মনে হলো। তখন কি করা উচিত মাথা কাজ করছিলো না।তখন মন আর শরীরের দূর্বলতাই আমাকে ভেঙে দিয়েছিলো।
আসলে আমি দূর্বল হয়ে পরলে প্রচণ্ড রকমের দূর্বল হয়ে পরি।আবার শক্ত থাকলে মোটামুটি ভালোই শক্ত থাকতে পারি।এ দুই সময়ে আমাকে কেউ সামলাতে পারেনা।অবশ্য আমি নিজেকেই নিজে সামলাতে পারিনা।এ সময়ে আবার কারোর কোনোরকম কথাবার্তাই আমার উপর খুব একটা প্রভাব ফেলে না।অন্তত আমার এমনটা মনে হয়।
আর সত্যি বলতে আজকে আমি সাহস পেয়েছি ঐ ছেলে দুটোর দূ্র্বল অবস্থা আর আপনাদের পাঁচজনকে আমার পাশে থাকতে দেখে।এ দুটো কারনই আজ আমাকে বেশ শক্ত করেছে।”
দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে তাকালাম আমি।

এরপর হুট করেই দুজনের মাঝে এসে দাঁড়ালো নিরবতা।তিক্ত নিরবতা।তবে এ নিরবতার মাঝেই আদ্রিশ ভাইয়াকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখলাম আমি আড়চোখে লুকিয়ে দেখা যাকে বলে,বেহায়ার মত তাই করলাম আমি।কেনো যেন উনাকে এভাবে দেখতে খুব ভালো লাগছে।
ভালোলাগার মানুষটাকে লুকিয়ে দেখার মধ্যেও একধরণের স্বর্গীয় সুখ অনুভূত হয় যেন।সে সুখ এ মূহুর্তে আমিও অনুভব করলাম।

আদ্রিশ ভাইয়া পকেটে দুহাত গুঁজে নির্বাক হেঁটে চলছেন।কখনো মাথা নিচু করে হাঁটছেন।তো কখনো মাথা তুলে সামনে তাকিয়ে হাঁটছেন।আমি আড়চোখে উনার দিকে একবার তাকিয়ে আবারো মাথা নিচু করে হাঁটতে লাগলাম।

“এই মাধবীলতা। ”

হঠাৎ আদ্রিশ ভাইয়ার মুখে এ কথা শুনে আমি চমকে উনার দিকে তাকালাম।উনি সাথে সাথে আমার দিকে তাকিয়ে লুকিয়ে হেসে বললেন,
“আমার দিকে না,ঐ যে সামনের মাধবীলতা গাছটার দিকে তাকাও।”

আদ্রিশ ভাইয়ার এ কথায় আমি স্বস্তি ফিরে পেলাম।কিছুক্ষনের জন্য অন্যকিছু মনে করে ফেলেছিলাম আমি।খানিক সময়ের জন্য মনে হয়েছিলো আমি কল্পলোকের জগতে পা রেখেছি।স্বপ্ন বাস্তব হয়েছিলো যেন।সন্দেহ ঠিক হয়েছিলো যেন।তবে উনার শেষকথা আমাকে একদম বাস্তবতার সাথে পরিচয় করে দিলো।একদিকে আমি যেমন একটু খুশি হয়েছিলাম। তেমনি অপরদিকে দুঃখের এক কালো মেঘ এসে ভর করলো আমার মনঃআকাশে।আমি যা ভেবেছিলাম তা সত্যি হলে কি খুব ক্ষতি হতো?

®সারা মেহেক

#চলবে